অনুবাদ কবিতা

জর্জ সেফেরিস-এর প্রবন্ধ ও কবিতা

kumar_chokrabarty | 30 Aug , 2018  

অনুবাদ: কুমার চক্রবর্তী

আমাদের কালের শিল্প
প্রশ্নটি হলো: সময়ের রাজনৈতিক গোঁড়ামিতে ছড়িয়ে পড়া ধর্মান্ধতার মুখে একজন বুদ্ধিজীবীর করণীয় কী? আমি মনে করি, এ প্রশ্নের উত্তরদাতারা মোটা দাগে দু-ভাগে বিভক্ত: ক. যাঁরা নিজেদের তাঁদের কাজের মধ্যেই উৎসর্গ করতে পছন্দ করেন সচেতন বা অসচেতনভাবে এ কথা বিশ্বাস করেই যে, তাঁদের নিজেদের চেয়ে বরং তাঁদের কাজই এর উত্তম জবাব দেবে (এঁদের মধ্যে কিছু মানুষ প্রতিটি ধর্মান্ধতার বিরোধিতা করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন); এবং খ. যারা সিদ্ধান্ত নেয়, আমি―একজন শিল্পী হিসেবে, রাজনৈতিক জীব হিসেবে নয়―সামাজিক আন্দোলনের চলমান শিবিরের একজন হিসেবে নিজেকে মনে করি; রাজনৈতিক দায়িত্ব এ আলোচনার কোনো অংশ নয়। আমার মনে হয়, এই পরবর্তী শ্রেণির মধ্যে তাঁরাই সর্বোত্তম যারা সম্পূর্ণ সচেতনতার সাথেই তাঁদের করণীয় পছন্দ করেছে। অর্থাৎ, তাঁরা নিজেদের সঠিকভাবে, স্বচ্ছভাবে বলেছে যে, ‘আজ আমরা সংগ্রামরত আর সবকিছুই আমাদের প্রধান সমরনায়কের নির্দেশের অধীন। আগামী সময়ে যুদ্ধশেষে আমরা শিল্পাচারের সময় পাব।’ আমি অবশ্যই বলব, এ কাঠামোর ভেতরে, এ মানুষগুলোকেই আমি পুরোপুরি শ্রদ্ধা করি, যেহেতু একমাত্র যে আলোচনা আমাকে আকৃষ্ট করে তাহলো, যেখানে অংশগ্রহণকারীরা গলাবাজি ধরনের বিকৃতির দ্বারা জলঘোলা করার উদ্যোগ নেয় না।

আর প্রকৃতপক্ষে এটা বলা যৌক্তিক নয় যে, শিল্পের স্বশাসিত হওয়া উচিত কি না। শিল্পে স্বশাসন একটা স্বতঃসিদ্ধ সত্য। শিল্প হচ্ছে দ্বিতীয় বিষয় এবং এ মানদণ্ডে এটা স্বাধীনও হতে পারে আর শিল্প হলো কতিপয় রাজনৈতিক সুযোগের সাফল্য―চলমান এই নির্যাতিত সময়ের একজন শিল্পীর এ সিদ্ধান্ত সঠিক না বেঠিক, তা নিয়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি কি না। দেখুন, প্রতিটি সৎ ও মানবিক কাজের মতোই শিল্পেও আপনি দুজন প্রভুকে সেবা দিতে পারবেন না, বা এখানে অডেন-এর লেখা উল্লেখ করা যায় যিনি সামান্য হলেও স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের গোলামি করেছেন (মি. অডেনের প্রতি সুবিচারের জন্য সম্ভবত বলতেই হয়, সম্প্রতি তিনি ঘোষণা করেছেন, স্পেনীয় গৃহযুদ্ধের ওপর তাঁর লেখা কবিতাটি এখন তাঁর নিজেরই কাছে মনে হয়েছে ‘বাজে’):
‘ শিল্প কোনো জীবন নয়, আর তা হতেও পারে না
সমাজের ধাত্রী ।’

[ নতুন বছরের চিঠি]
একজন শিল্পী যদি রাজনৈতিক লক্ষ্যে সেবা দিতে পছন্দ করেন, আমার বলার কিছু থাকবে না। কারণ যারা শিল্পের জন্য সমর্পিত, তাঁদের জন্য আমার বলার কিছু আছে।
যখন আমি শিল্প নিয়ে কথা বলি, কোনোভাবেই আমি ‘শিল্পের জন্য শিল্প’, এ পুরোনো তত্ত্বে সম্মতি দিই না। এ মতবাদ এখন সকলের কাছেই নিরর্থক, জীবাণুমুক্ত কক্ষে বিকলাঙ্গ ব্যক্তির দক্ষতা প্রদর্শনের মতোই অর্থহীন। আমি মনে করি, অতীত ও বর্তমানের সুন্দর শিল্পকর্মের মাধ্যমে সৃষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলাই পরিচালিত ও শিক্ষিত করতে পারে আমাদের। গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহ পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, এগুলো তাদের সময়ের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিযোগিতা থেকে তেমন একটা দূরে নয়। বলা হয়ে থাকে, ‘মহান শিল্পী তাঁর সময়ের নয়; তিনি নিজেই তাঁর সময়।’ প্রকৃতপক্ষে একজন কবির জীবন হলো তাঁর শিল্পকর্মের ধারণা, আবেগ, প্রতিক্রিয়া ইত্যাদি উপাদানের এক পুঞ্জীভূত অবস্থা। একই সাথে তাঁর চারপাশের হৃদয়জ্বলন, বেদনা, জাঁকজমকতা, অবমাননা ইত্যাদি মানবিকতার অংশ। একজন শিল্পী ‘নিজের প্রতি বেশি বিশ্বস্ত’ এবং এখানে যতটুকু তাঁর মানব-অস্তিত্বের জ্ঞানের গভীরতা নিয়ে, কতটুকু পরিপূর্ণভাবে সে তাঁর সময়কে নিজ শিল্পকর্মে প্রতিফলিত করতে পারে, তা বিবেচ্য। শিল্পী ও তাঁর সময়ের বন্ধন কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বন্ধন নয়, নয় কোনো ভাবপ্রবণ বন্ধন যা দুজন ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে কাছাকাছি নিয়ে আসে। এটা বরং একটা জীবতাত্ত্বিক ঘনিষ্ঠতা যা মা ও শিশুর মাঝে সৃষ্টি করে নাড়ির বন্ধন। ‘কারণ আমরা আমাদের যুগেরই প্রতিনিধি,’ পূর্বে উল্লিখিত কবিই এ কথা বলেন। এটা কীভাবে হতে পারে? আমরা একই রেকাবি থেকে খাবার খাই। আর তা ব্যাখ্যা দেয়, কেন আমরা দেখতে পাই একজন সত্যিকারের কবি, যিনি সবচেয়ে বেশি অযৌক্তিক ও প্রাচীন রাজনৈতিক ধর্মবিশ্বাসকে মান্যতা দেন (আমার বিনয়ী মতামত হলো, রাজনৈতিক প্রবন্ধের মতো রাজনৈতিক কবিতাও পৃথিবীর অন্যতম নৃশংস বস্তু) তিনিও এমন শিল্পকর্ম সৃষ্টি করতে পারেন যা তাঁর অপরিহার্য গুণাবলি ছাড়াও হতে পারে উত্তম পথপ্রদর্শক, এমনকি রাজনৈতিকভাবেও, মানুষের চিন্তার জগতে অন্য যে-কোনো-সংখ্যক রাজনৈতিক বক্তার চাইতে উত্তমরূপে।
কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে শিল্পীকে স্বাধীনতা দিতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সম্ভবত এই অসচরাচর ধারণা পোষণ করি যে অনেক মানুষের আত্মাহুতি ও সাহসিকতার মাধ্যমে সম্পাদিত যে যুদ্ধ, তারও ফসল হচ্ছে এই স্বাধীনতা, যাতে করে আমাদের দেশ মূচ্ছারোগের মতো চেতনহীন মূর্খতার রাষ্ট্রে পরিণত না হয়। আর স্বাধীন মানুষ হিসেবে এভাবে কাজ করতে গিয়ে একজন কবি অসতর্ক প্রচারণামূলক সাহিত্যকর্ম যদি সৃষ্টি করে (এটা, উদাহরণত, ইস্কিলাসের দ্য পার্সিয়ানস), তাহলে এটাকে চাতুরির প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, এটাকে বরং তারিফ করা উচিত আবশ্যকীয়, অপরিহার্য এবং বাধ্যতামূলক দাবি হিসেবে, যা এমনকি লেখকের শত্রুদেরও বাহবা পায়।

পরিশেষে, এ বিশ্বাসকে ধারণ করে, আমার সর্বোত্তম বিচারে আমি বোঝাতে চাই না যে একজন কবি দায়িত্বহীন ব্যক্তি যিনি সবসময় তাঁর কল্পনা ও খামখেয়ালিপনার তাড়নায় ভারসাম্য হারিয়ে বসবেন। বরং আমার বিশ্বাস, একজন প্রকৃত শিল্পী পৃথিবীর সর্বোত্তম দায়িত্ববানদের একজন। জীবনমৃত্যুর মাঝে যে-সংগ্রাম, তার দায়িত্বের বোঝা তিনি বহন করে চলেন। এই মানবিক অবস্থার বাইরে, এর উন্মাদনা ও নিস্তব্ধতায়, কী উপাদান তাঁর সঞ্চয় করার আছে? এ নিরাকার মানবিক উপাদানের মাঝে তিনি কি সঞ্চয় করবেন নাকি পেছনে ফেলে আসবেন যা ভয়াবহভাবে জীবন্ত এবং যা তাঁকে নিদ্রাপথে তাড়িত করে? ‘স্বপ্নের মাঝেই শুরু হয় দায়িত্ববোধের।’
[ প্রবন্ধটি জর্জ সেফেরিস-এর অন দ্য গ্রিক স্টাইল গ্রন্থ থেকে নেওয়া, ইংরেজি অনুবাদ: রেক্স্ ওয়ারনার ও ডি. ফ্রাঙ্গোপাউলোস]


রেক্স ওয়ারনারকে লেখা চিঠি
আমেরিকার কনেকটিকাটের স্টোরসের বাসিন্দা
তাঁর ষাটতম জন্মদিনে

আমাদের দেখা হওয়ার সময়
নপুংসকদের রাজ্যে আকাশকুসুম-কল্পনার এক গল্প বলছিলে তুমি;
ওখানকার ফুটবল খেলার মাঠ
চাক্ষুষ করেছিল নির্লজ্জ হত্যাযজ্ঞ।
এক মর্মরনির্মিত স্টেডিয়াম থেকে ফিরছিলাম
যেখানে একগুঁয়ে আহত এক ম্যারাথন দৌড়বিদ
দেখল রক্তের গভীরে গুনটানা।
এজন্যই অনুভব করলাম কে-ছিলে তুমি, আর তাই বন্ধুত্ব হলো তোমার-আমার।

যুদ্ধে নিকেশ হওয়া এক দেশে ছিলাম আমরা–
তারা এমনকি শিশুদের পুতুলগুলোকেও করে দিয়েছিল খোঁড়া।
আলো ছিল তীব্র আর সঞ্চরণশীল,
সবকিছুকে কামড়ে ধরেছিল, হয়ে পড়েছিল পাথরের মতো শক্ত।
সাইকেল আর ঘুড়ির মাঝ দিয়ে হেঁটে বেড়িয়েছি আমরা,
দেখেছি রং, কিন্তু আমাদের কথাবার্তা
উদ্দেশ্যবিহীনভাবে বিষিয়ে উঠল এক আতংকে।

দিন যায় বছর যায়, আর একসময়
লকলকিয়ে ওঠা বৃক্ষপল্লবিত জমিনে
খুঁজে পেলাম তোমাকে,
যেখানে বিষাক্ত আইভিলতা কখনও-সখনও থাকে অপেক্ষমাণ
পড়ুয়া শিশুরা উদ্ঘাটিত করতে শেখে পুস্তকের জ্ঞানভাণ্ডার,
আর ভালোবাসার গোলকধাঁধা।
সবসময়ই তুমি প্রশংসা করতে হোমার আর তাঁর শিক্ষাকে।
এক কাঠবেড়ালি–আকস্মিক,
বিশাল এক গাছের উপর থেকে আরও উপরে গেল উঠে
আর তা দেখে তুমি খিলখিলিয়ে উঠলে হেসে।

আমাদের জীবন এক নিরন্তর বিচ্ছিন্নতা
আর এর চেয়েও এক কঠিন বাস্তবতা।

এখন, অসংখ্য অলিগলিময় এই শহরে,
আবারও তোমাকে ভাবছি আরেকবার।
সবকিছুই দূরদর্শন,
কাছ থেকেও সহজে ধরতে পারবে না কিছু
এই বৈদ্যুতিক আলোতে,
সমুদ্রতলের এই শুনশান নীরবতায়,
আলোকিত সুউচ্চ অট্টালিকার জানালাগুলোর মৃদু ঝিলিক যেন
বিশাল সমুদ্রদানবের চামড়ার মতো
ভাঙছে ঢেউগুলোকে।
বহুরূপী মানুষেরা পূর্ণ করে চলছে নিজেদের,
কনুই দিয়ে ধাক্কা মারা অগুনতি লোকজন
অন্য এক আনন্দ আর উদ্বেগের আশায়
যাচ্ছিল চলে ওই সময়ে।
শূন্যগর্ভ তারা,– হৃদয়হীন–
সেই পাখির বহুখোপবিশিষ্ট বাসার মতো
যে-পাখির ডাকনাম বাবুই

ফিলেতায়েরুস সোসিউস;
কণ্টকময় অ্যাকাশিয়ার ডালে বা জাদুঘরে
খুঁজলে তুমি তাদের দেখা পাবে।
‘শক্ত খোসার রসালো ফলটির জন্য এখন আমার দুঃখ হয়’
বিশাল নিনেভেহ শহরের দিকে চেয়ে
বিড়বিড় করে চলে নবী জোনাহ।
জাগ্রত স্বপ্নের দিকে মনের অর্গল খুলে দেয় তাঁর কথা
একত্র হয় দৈনন্দিন কাজের দিনক্ষণ:
মুখ হাঁ-করা ষাঁড় আর অশ্ব
আর তাদের জিহ্বা যেন আকস্মিক দেখা ছুরির ফলার মতো;
এল গ্রেকো নামের এক অভিবাসী নরকের ভাষায় বলছে কথা
যা দুর্বোধ্য ঠেকছে সবার কাছে;
আর সেই ভাস্কর
যিনি বিশ্বাস করতেন আকাশটার রং লাল
আর ছিলেন তিনি সংগ্রামরত সর্বগ্রাসী শূন্যতায়
যে-শূন্যতা গ্রাস করছিল তাঁর হাতে থাকা ভাস্কর্য:
নঞর্থকতার দিকে এখনও যা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর, স্থির আর সরু।
চলে গেল তারা চোখের আড়ালে যখন রমণীমোহন যুবক মেগাক্লেস,
বাম বাহুতে ক্রীড়াবিদের তেলের শিশি ঝুলিয়ে,
সশরীরে গিয়ে হাতের তিন আঙুলে ধরে রাখা ডালিম ফল
দিল অর্ঘ্য পার্সেফোনেকে, গদগদচিত্তে।

এখন তোমার বয়স ষাট
কিছুই তোমাকে দেবার নেই আর
এইসব অলস বকবকানি ছাড়া।
এখনও, মনে হয়, আমাকে ঘিরে রেখেছে আর করছে প্ররোচিত
একঝাঁক বাবুই পাখি।

[কবিতাগ্রন্থ: অনুশীলনের খাতা (book of exercises) , ইংরেজি অনুবাদ: এডমান্ড কিলি ও ফিলিপ শেরার্ড]
রেক্স ওয়ারনার: ইংরেজ লেখক, অনুবাদক। গ্রিক সাহিত্যের বিশিষ্ট ইংরেজি অনুবাদক, তিনি সেফেরিসের নির্বাচিত প্রবন্ধ ইংরেজিতে অনুবাদ করেন অন দ্য গ্রিক স্টাইল নামক গ্রন্থে।
নিনেভেহ: মেসোপোটামিয়ার বিখ্যাত প্রাচীন অ্যাসিরীয় শহর, বর্তমানে ইরাকের মসুলের কাছে অবস্থিত।
এল গ্রেকো: স্পেনিশ রেনেসাঁসের চিত্রকর, ভাস্কর ও স্থপতি দোমেনিকোস থেয়োতোকোপউলোস (১৫৪১-১৬১৪)-এর ছদ্মনাম, এল গ্রেকো (দ্য গ্রিক) নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন তিনি। জন্ম রিপাবলিক অব ভেনিসের কান্দিয়ায়, পরে তিনি তোদেলোয় অভিবাসী হন। মৃত্যু স্পেনের তোলেদোয়।
ফিলেতায়েরুস সোসিউস: বাবুই পাখির বৈজ্ঞানিক নাম।
মেগাক্লেস: প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত ব্যক্তি, আধিকারিক।
পার্সেফোনে: দেবতা জেউস ও দিমেতারের কন্যা, অধোজগতের রানি।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.