গদ্য

চাঁদহীন এক আকাশের নিচে

সাধনা আহমেদ | 22 Aug , 2018  

জলের উপর ভেসে থাকা কচুরিপানা কলমীলতা আর পাড়ের ধারে গজিয়ে ওঠা ঢোলকলমীর ফুলে রোদজ্বলা নীল পড়েছে কিছুটা বেগুনী হয়ে। রূপমতিচরের পাশেই চারদিক ধইঞ্চা ঝোপে ঘেরা পানাউল্লারচর–কোনো রকমে ভেসে আছে। অনেক দূরে নদীর দক্ষিণ কিনারে দেখা যায় মুছাপুর আর ইব্রাহিমপুরের সুপারি নারকেল গাছগুলোর মাথায় চকচকে রোদ পিছলে পড়েছে। উত্তরের শিবপুর-কৃষ্ণনগর-শম্ভুপুর-রঘুনাথপুর-নদী থেকে দূরে হলেও গ্রামের মাঝখানের ফসলি জমিগুলো বর্ষার ভাসাজলে ডুবে থাকে চার মাস। পুর্বদিকে-লক্ষ্মীপুর-জগন্নাথপুর পার হয়ে মেঘনা যেখানে তার নীল হাত বাড়িয়ে ব্রহ্মপুত্রের কালকেউটের মতো কালো হাত ছুঁয়েছে মাত্র–কিন্তু বুকে ভরে নেয়নি বলে পাশাপাশি চলা দুই নদীর আলাদা রং বহুদূর থেকেও চেনা যায়। দুইধারা মিলে না কিছুতেই–শুধু একে অপরের চারদিকে ঘোরে আর গরজায়। তাতেই সেখানে সৃষ্টি হয়েছে ভয়ঙ্কর এক ঘূর্ণিপাক। কোনো নৌকা–এই পাঁকে পড়ামাত্র খাড়া হয়ে ঢুকে যায় নদীর গভীরে। মানুষগুলো মেঘনা নদীর তলদেশ বেয়ে দশক্রোস দূরের লালপুরে গিয়ে লাশ হয়ে ভেসে ওঠে। আবার লাশের সন্ধানও মেলে না কখনো। এই ঘূর্ণিপাকের দুইপাড়ে পঞ্চবটি ও গৌরীপুরের মাঝদিয়ে পুর্বদিকের সেই মেঘনায় তাকালে শুধু জল আর জল। সবগুলো চরের মাঝে বিশাল ফসলিহাওর তলিয়ে যায় বর্ষায়। পানাউল্লারচর থেকে লক্ষ্মীপুরের বাঁক পর্যন্ত শ-দুয়েক বিঘা উচু খেতগুলোকে আলগড়া নামে ডাকে সবাই। আলগড়ার ঠিক মাঝখানে বটগাছের মত ছড়িয়ে পড়া বিরাট ঝাকড়া মাথাওয়ালা একটি জাম গাছ। আলগড়াও বর্ষায় দুই-মানুষ ডুবে তলিয়ে থাকে। গাছটিতে–দুই বন্ধু–রাম আর সবুরের বাস। বর্ষায় যখন গাছটি মাথা ভাসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে–তখনও তারা গাছেই থাকে। মাঝিরা দুজনকে নিজেদের খাবার থেকে একটু করে খাবার দিয়ে যায়। আবার তিনটা চর থেকেই কেউ না কেউ মানতের খাবার পাঠায় ওদের জন্য। গাছের মাথায় ধবলবক আর কানিবক বাসা বানায়। শাপলা পাতার উপর হেঁটে হেঁটে জলপোকা খেতে খেতে গিয়ে গাছের ডালে বসে জলপিপিও। রাম আর সবুর পাখিদের স্বজন–মোটেও ভয় পায় না পাখিরা। তবে রাত গভীর হলে বকের ডিম আর বাচ্চার লোভে যখন পানস আর জলঢোরা সাপেরা উঠে যায় গাছে তখন বকের দল একযোগে ক্বউক-ক্বউক করে উঠলে ভয়ে আবার নেমে যায় সাপগুলো। বর্ষাশেষে বকেরা ছানা নিয়ে উড়ে গেলে কাঠঠোকরা-টিয়া-ধানশালিক-গোবরেশালিক-ছাতারে-বটকল- আরো কতো পাখির মেলা বসে এই গাছে। মাঝি–দিনমুনিষ ও দাতব্দিরা–দুপুর বেলা দল বেধে গাছের ছায়ায় খেতে বসে। সবার দেওয়া খাবার পেটপুরে খেয়ে রাম ও সবুর ডালে ঝুলেই প্রতিদিন একই কিচ্ছা বলে। জাম গাছের জন্মকিচ্ছা ।

-এইডা অইতাছে গা শিবঠাহুরের জাম গাছ। শিবঠাহুর যখন সতীর মরা কান্দে লইয়া দুইন্যা জুইরা উড়তে লাগল তখন এই হাওরের উফরে দিয়া যাওনের কালে পক্ষিরা শিবরে কইল-ভগবান–এই হাওরে আমগো বওনের জাগা নাই গা। তহন শিব তার জডা থিক্যা
একটা জটা ছিড়া ফালায়া দিলে হেই জটা থিক্যা এই গাছের জনম অইছে বইল্যা বট গাছের লাহান এমন আজব জডাউলা জাম গাছ অইছে। জলে ডুইব্বা থাইক্যাও মরে না। প্রতিদিন একই গল্প বলে। তাদের গল্প শুনতে চাষি ও মুনিষরা আর না বসে ফিরে যায় খেতের
কাজে। তখন গাছের ডালে বাতাসে ভেসে ঘুম দেয় তারা। মাঝে মধ্যেই গভীর রাতে এদের ঘুমে হানা দেয় অন্য এক ঘুমের রাত। ওই যে উত্তর দিকে সাতটি তাল গাছে শত শত বাবুয়ের ঝুলন্ত দেশ দেখা যায়। যখন ঝাঁক বেধে ওরা নেমে আসতো জালাখেতের মধ্যে–তখন ঠাটানি ঝাকিয়ে বাবুই তাড়াতে তাড়াতে দুপুরের সুরে ডুবে দুই-বন্ধু ঘুম দিতো এই গাছের ছায়ায়। একদিন সেই ঘুম তাদের ভেঙেছিল চাঁদহীন এক আকাশের নিচে।

এক অতিমানবীয় কণ্ঠের ডাকে–চরের মানুষেরা জেনেছিল–যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। তাদের চর দখল করতে আসবে কোনো এক দখলদার বাহিনী। তিনটি চরের কাজিয়াপ্রিয় মানুষেরা ভেবেছিল আমাদের সাথে কাজিয়া? আমাদের চর দখল? লাঠি-দা-বল্লম-রামদা-শরকি-কিরিচ-ধানকাটার দাউকাঁচি-পাট কাটার পাতলা দা-ছেহাইট-গুলতি–সব কিছু বের করে রেখেছিল উঠানের কোণে। যখনই আসবে দখলদাররা তারাও দেখিয়ে দেবে তাদের শক্তি। বৈশাখের সেই পয়লা দিন। ফজরের নামাজ শেষে–তসবি হাতে দরুদের সুর তুলে গ্রামের পথে চলছে যারা। সূর্যপ্রণাম করে স্নানশেষে–জ্বেলেছে যারা আরতির দীপ। পাকা বোরোধানের গুচ্ছ কাটতে যাবার আগে ভরপেট পান্তা খেয়েছে কিংবা সারারাত মাছ ধরে এসে ঘুমিয়েছে। হালখাতার নতুন টালিতে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে প্রণাম করে বসেছে আর প্রতিমা ও পটের
মাটি ছানতে ছানতে কীর্তনের সুরে দিয়েছে টান। বুকে কোরান-শ্লেট-আর হাতে চকখড়ি নিয়ে পাটশালা ও মক্তবের পথে চলেছে যে শিশুরা। চুলে বেনী বেঁধে কাঁচা আম পাড়তে যে দূরন্ত কিশোরীরা চড়ে বসেছে গাছের ডালে। মেহেদিরাঙা হাতে নকসি পিঠার খাঁজ কাটতে কাটতে যে
যুবতীরা ঘোমটার ফাঁকে প্রণয়চোখে চেয়েছে প্রিয়তমের দিকে। যে নারীরা সুতার লাছি পড়িয়েছে চরকায়–নকসিকাঁথা সেলাইয়ের পাটি পেতেছে উঠানে–অথবা বাতাসের বিপরিতে ধরেছে–ধানের আবর্জনা ও চিটাধান উড়ানোর কুলো। সেদ্ধ করার জন্য–দু-মুখো মাটির চুলায়–ধান ভরা হাড়ি চড়িয়ে বসেছে কোলের শিশুকে স্তন দিতে। কুঁজোপিঠে লাঠি ভর করে উঠানের কিনারে কোনো-রকমে এসে বসেছে যে বুড়োবুড়িরা। তারা সবাই আচানক আকাশে দেখেছিল আজব ডানাওয়ালা গর্জিত শকুনের দল। যাদের পেট থেকে এক ফোঁটা দু-ফোঁটা করে লোহার বৃষ্টি নেমে আসছে থেকে থেকে। চরগুলোর কাজিয়াপ্রিয় মানুষদের ভাবনারও অতীত–এই দৃশ্যের কাছে হার মানে তাদের কল্পনার সমস্ত সীমা। নিজ হাতে বানানো তাদের অস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী আরো কিছু আছে নাকি! যার একটি ছোট বিন্দুতে এমন করে টিনের চাল ফুটো করে বেরিয়ে যায়! তবুও অনেকেই উঠান পেরিয়ে দা-বল্লম হাতে নিয়ে ছুটে গিয়েছিল ফসলিখেতের দিকে। লৌহবৃষ্টির তোড় বেড়ে এলে কেউ কেউ যখন পড়েছে চিৎ হয়ে তখন মানুষেরা ভেবেছিল আলগড়ার এই জম্বুবৃক্ষের পরেই–দক্ষিণ দিকের ব্রহ্মপুত্র পেরিয়ে চলে যাবে ওপারে। নদী পার হতে পারলে আর কোনো ভয় নেই। থেমে গেলেই ফিরে আসবে আবার। হাতের কাছে রান্না হওয়া গরম ভাতের হাড়ি ফেলে ছুটেছিল আলগড়ার দিকে। পাকা ধানের সুগন্ধী ফসলি হাওরের চারদিকের নিচু জমিতে–পাট খেতের সবুজ কারুকাজ আর কচি ফলে ভরা একাকী দাঁড়ানো জম্বুবৃক্ষের কাছাকাছি মানুষের ঢল পৌছানোর সাথে সাথেই–ডানা মেলে উড়ে আসা রাক্ষসযানের পেটের ভেতর থেকে মুসলধারে ছিটকে আসা গনগনে ধাতব বৃষ্টি–চোখের নিমেষে হাজার মানুষের বুক–মুড়িচালুনির ঝাজুড় করে দিয়েছিল। ঝাজুড় গলে ধারা মেনে এসে লাল হয়েছিল ব্রহ্মপুত্রের রঙ। সেই রঙ উড়ে গিয়ে আবার লেগেছিল বৈশাখের আকাশে। এরপর কত আকাশের লাল ঝড়ে পড়েছিল এই প্রান্তরে।
চাঁদহীন রাতের ভেতরে–সবুরের ঘুম ভাঙার আগেই সে বুঝতে পারে–কেউ তার বুকের উপর পা দিয়ে ঘুমাচ্ছে। সে ভাবে–রামু ছাড়া আর কে? রামুটা এমনই–ঘুমালে সবসময় গায়ের উপর পা তুলে দেয়। সবুর হাই তুলে চোখ মেলে দেখে রাত হয়ে গেছে। শুয়ে থেকেই আধো ঘুমচোখে ডাকে রামুকে।

–রামু-অ-রামু ওট। রাইত অয়া গেছে গা–

বলতে বলতে সে আড়মোড় ভেঙে উঠে বসার জন্য রামুর পা সড়াতে গিয়ে দেখে–কেউ নয়–একটি রক্তমাখা ছিন্নভিন্ন হাত তাকে আঁকড়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। আকাশ ফাটানো আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে গিয়ে গলা থেকে শুধু গোঙানি বের হয় তার। সেই আওয়াজে–পাশেই পড়ে থাকা রামুরও ঘুম ভাঙে। জেগে বসে দেখে–হাজার ঘুমন্ত মানুষের রক্তে ডুবে আছে তারা। দুজন তাকায় দুজনের দিকে–ফাগুন মাসের শুকিয়ে আসা ডুবার থকথকে কাঁদাজলে–আটকে থাকা দুটি গুতুম মাছের মতো মনে হয় নিজেদের। তাদের মনে পড়ে–দুই বন্ধু হাত ধরে দৌড়াচ্ছিল হাজার মানুষের সাথে। এরপর জেগেছে এখানে। পড়ে থাকা সারি সারি মানুষের শরীর মাড়িয়ে–প্রাণপন ছুটতে থাকে তারা। কিন্তু দৌড়ের গতি আটকে যায় বমির দমকে। কিছুদুর গিয়ে কয়েকটি লাশের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে–হরহর করে পেটের ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে আসার পর তারা দেখে কাটা ধানের আটির উপর পড়ে থাকা লাশের উপরেই নিজেদের পাকস্থলি শূন্য করে দিয়েছে। আবার ছুটতে থাকে। আরেকটি আধকাটা ধান খেতে গিয়ে আছড়ে পড়ে এবার। একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে নিজেদের বুক থেকে উঠে আসা তীব্র ধুকপুকানি শুনতে থাকে। তারার আবছা আলোয়–ফসলি হাওরের উপর দিয়ে বয়ে যায় রক্তগন্ধী বাতাস। মানুষ যে বাহারি মৃত্যুর আকাঙ্ক্ষা করে আজীবন। কোনো একদিন নতুন পোষাক পরে–নশ্বর দেহে অনশ্বর সুগন্ধী মেখে–সেজে গুজে বিলাপাকুল স্বজনদের কাঁধপালকিতে চড়ে অনন্ত বাসরের দিকে রওয়ানা হবার স্বপ্ন দেখে–আজ এখানে তা কোনো পৌরাণিক নগরীর নানা ধ্বংশচিহ্নের চেহারা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

হৃদপিণ্ডের গতি কমে এলে উঠে বসে দুজন। চারদিকের কোথাও একটু কুপিবাতির আলো দেখার আশায়–দশ বছরের দুই বালকের চোখ ঘুরে আসে তাদের চেনা চরের সীমানায়। কিন্তু জমাট অন্ধকার ছাড়া কিছুই ঠেকে না চোখে। তাদের মনে হয় সমস্ত চর উধাও হয়ে গেছে
কোনো দানবের দেশে! আধকাটা ধানখেতের ভেতরে হঠাৎ খসখস আওয়াজে দুজন ফিরে তাকায়। কেউ কি বেঁচে আছে ওখানে? আওয়াজ লক্ষ্য করে এগিয়ে কাছাকাছি যেতেই দেখতে পায় কয়েকটি লাশ ছিড়ে খাচ্ছে শেয়ালের দল। তাদের স্বর থেকে তীক্ষ্ণ আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আবার ছোটে। তখন একটু দূরে বসে থাকা একটি কুকুর ঘেউ ঘেউ করে শেয়ালগুলোর দিকে তেড়ে যায়। হয়তো কারোর পোষা কুকুর। এসেছিল পরিবারের সঙ্গে। এরপর প্রত্যক্ষ করেছে তাদের লাশ হয়ে যাওয়া। শেয়ালরা হয়তো সেই লাশগুলোই খাচ্ছিল। কিন্তু একা বলে ভয়ে চুপ করে বসেছিল দূরে। এখন জীবিত মানুষের আওয়াজ পেয়ে তেড়ে গিয়েছে। জ্বলন্ত চোখের ছায়াপ্রাণীদের চোখ আরো জ্বলে ওঠে। তারা হিসাব করে নিয়েছে কুকুরটির একাকিত্ব। তাই ভ্রুক্ষেপহীন দৃষ্টিতে শুধু একবার কুকুরটির দিকে তাকিয়ে কুড়মুড় করে ভাঙে শিশুর কচি হাড়। থেমে যায় কুকুরটি। এরপর কাটা ধানের আঁটির আড়ালে বসে আকাশের দিকে মুখ তুলে উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। এই উর্ধ্বমুখী
বিলাপ নক্ষত্রলোক স্পর্শ করলেও মৃত চরাচরের হাওয়ায় নতুন কোনো তরঙ্গ তোলে না। ছুটতে ছুটতে তেষ্টায় বুক শুকিয়ে আসতে চাইলে থামে তারা। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে এগুতে থাকে জাম গাছের উত্তরে–বৈশাখের কোমরজলের ব্রহ্মপুত্রের দিকে। পাড়ের
নিচের নরম মাটিতে মৃত শামুক ঝিনুকের খোলা ওদের পায়ের নিচে মৃদু আওয়াজ তোলে। দু-একটি ভেঙে ঢুকে যায় পায়ের তলায় কিন্তু পদতল তাদের অসাড়। নদীতে নেমে যায় দুজন। অন্ধকার–তাতে জলের রঙের বদল চোখ এড়িয়ে যায়। তাদের জিভ জল স্পর্শ
করে বটে। কিন্তু এই স্বাদ যে রক্তের বুঝতে পারে না। কোমর সমান ব্রহ্মপুত্রে বুক ভরেউঠার পর তারা বুঝতে পারে জল আর রক্তের স্বাদ এক নয়। মুহূর্তেই ওদের চোখ আবিস্কার করে এই জল রক্তাভ। যা নিয়েছিলো নদী থেকে আবার তা নদীতেই ফেলে দিতে চায়। কিন্তু এক
ফোঁটাও বের হয়ে আসে না। তখনই মানুষের রক্ত পান করার পাপবোধ জেগে উঠলে একে অপরকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে। কান্নার অনুভব ওদের মনে করিয়ে দেয় পরিবারের কথা। নদী থেকে উঠে আবার ছুটে যায় জাম গাছের কাছে লাশময় ডাঙায়। খুঁজতে থাকে মা-বাবা ভাই-বোনদের। একটির পর একটি লাশ উল্টায়। মুখ দেখে। লাশের মুখে শুকিয়ে যাওয়া রক্ত মুছে নিয়ে চেনার চেষ্টা করে। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা এক নারীকে দেখে দুজন ভাবে হয়তো তাদের কারোর মা। নারীর লাশটি উল্টে দেখে–তাদের কারোরই মা নয়। নারীর বুকের ভিতরে একটি ছোট শিশু। শিশুটি হঠাৎ ফিক্ করে হেসে উঠলে দুজনের বুক ধক্ করে ওঠে। দুই বন্ধু একসাথে হাত
বাড়ায় হাসিমুখের দিকে। পিঠে গুলি লেগে উপুড় হয়ে পড়েছিল মা। মায়ের বুকের চাপের ভেতর শিশুটি তখনো হাসছিল। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলেও তার হাসিটি লেগে আছে মুখে। সেই মুখে হাত রেখে ডুকরে কেঁদে উঠেই চোখ ফিরিয়ে নেয় দুজন। আবার শুরু করে অন্য লাশের মুখ দেখা। শত শত মৃতদেহের মধ্যে মা-বাবাকে খুঁজতে থাকে। হঠাৎ সবুর দেখে দুটি চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে। কতো পরিচিত। মুখের উপর শুকিয়ে যাওয়া রক্তের প্রলেপে হাত বোলায়। চিবুকের কাছের বড় জরুলটিতে হাত পড়তেই বুঝতে পারে এটা তার নিজের বাবার মুখ। চিবুক থেকে একটু নিচে নামতেই গুলি লেগে হা হয়ে যাওয়া কণ্ঠনালীর গহ্বরে হাত ঢুকে যেতেই রামু বলে আর্তনাদ
করে ওঠে।

— রামুউউউউউ…..

সবুরের তীক্ষ্ণ আর্তনাদে চৌচির হয়ে যায় জমাটবাধা অন্ধকার। ততক্ষণে রামুও খুঁজে পেয়েছে তার মায়ের মুখ। বোনটিকে বুকের মধ্যে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে মা। রামুও আর্তনাদ করে

— সবুউউউররর…..

চিৎকারের সাথে সাথে আবার লুটিয়ে পড়ে দুজন। পূর্ব আকাশে রঙের ছোপ জেগে উঠলে ঘেউ ঘেউ আওয়াজের সাথে ঝড়ের বাতাস ওদের চেতনা ফিরিয়ে দেয়। দুই বন্ধু জেগে দেখে ঝড় নয়–শত শত শকুনের ডানার হাওয়ার ঘূর্ণীতে–ঝরে পড়ছে জাম গাছের পাতা। আর রাতের কুকুরটি হাজার মানুষের নিথর শরীরের উপর দিয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটতে ছুটতে আরো খেপে উঠছে। রাতের প্রাণীরা দিনের আলোয় নিশ্চিন্তে মানুষের মাংশ খেয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ তারা দেখে–শেয়াল হায়েনা ও শকুনের দলের মাংশ খাওয়ার মচ্ছবের মধ্যে–দুজন জীবিত মানুষ। একজনের বয়স তাদের থেকে খানিকটা বেশি। আরেকজন প্রাপ্তবয়স্ক। লাশের স্তুপের মধ্যে কিছু খুঁজছে। শিশুরা ভাবে–হয়তো ওই মানুষ দুজনও নিজের স্বজনের সন্ধান করছে। দৌড়ে যায় সে দিকে। কাছে গিয়ে দেখে–স্বজন নয়–লাশ হওয়া নারীদের শরীর থেকে সোনা-রূপার গহনা খুলে নিয়ে লুঙ্গির কোচরে ভরছে। এই দৃশ্যে–শেয়াল শকুন হায়েনা আর মানুষ–একই রেখায় এসে দাঁড়ায় তাদের সামনে। গা গুলিয়ে উঠে গিয়ে–হরহর করে রাতের রক্তপানীয়ের কিছুটা বেরিয়ে এলে–সেই রক্তবমি হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। এরপর শেয়াল-শকুন-হায়েনা তাড়াতে তাড়াতে দুজন ঘুমায়। জাগে। আবার ঘুমায়। এভাবে নিথর মানুষদের পাহাড়া দিতে দিতে উঠে
বসে জাম গাছে। দেখে–সেই কুকুর গাছটি ঘিরে চক্কর দিতে থাকে আর মুখ তুলে তাদের দিকে তাকায়। প্রণীটিও কি আশ্রয় চায় এই গাছে?
জীবিত মানুষেরা যখন এলো তাদের স্বজনের দেহের খোঁজে–ততক্ষণে রাম আর সবুরের জগত গেছে বদলে। লোকে তাদের রামুপাগলা আর সবুর পাগলা বলে ডাকতে শুরু করে। এখনো মাঝে মধ্যেই সেই রাত যখন তাদের ঘুমে হানা দেয় তখন তারা প্রচন্ড রেগে যায়। সারারাত ধরে জামগাছের ডাল ঝাকাতে ঝাকাতে চিৎকার করে শেয়াল-শকুন তাড়াতে তাড়াতে বলতে থাকে:

— মাইনষের লউয়ে গাঙ্গের পানি লাল…পানি হামু কেমনে।
— বুকের ছাতি ফাইট্যা যায় জল হাইতারিনা।
— অই…কেউ কতা কয় না ক্যারে…মাইনষের লউয়ে গাঙ ক্যারে লাল।
— মাইনষের লউয়ে গাঙ ক্যারে লাল অইল…।

রাতভর একে অপরের গলা ধরে চিৎকার করে কাঁদে। বকগুলো ক্বউক ক্বউক করে উড়ে উড়ে কাঁদতে থাকে। শেষ পর্যন্ত কোন এক অচেনা বিলাপের সুর বের হয় তাদের গলা দিয়ে। সেই বিলাপে রূপমতিচরের সবার বুকের ভেতরে মানুষের রক্তে লাল এক-একটি নদীর জন্ম হলে-
তাদেরও বুক ফেটে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে চায় কিন্তু পাঁজরের খাঁচায় আটকে থাকে শব্দের সমুদ্র। মৃতস্বজনদের কথা ভেবে চোখের জলে ভাসতে ভাসতে শুধু পাশ ফিরে শোয়।

(প্রকাশিতব্য গাঙকুমারী নাটকের অংশবিশেষ।)

Flag Counter


6 Responses

  1. জিয়াউল হাসান কিসলু says:

    সত্যি ভালো লেগেছে। খুবই আবেগ ও মর্মস্পর্শী একটি লেখা। নাটক-চলচ্চিত্রের প্লট হতে পারে। লেখা অব্যাহত রেখো। অনেক ভালোবাসা। সাধনা আহমেদ ?

  2. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    পাঁজরের খাঁচায় আটকে থাকে শব্দের সমুদ্র… পড়ার সময়টুকু ভালোলাগা হলো, কিন্তু তৃপ্তি মিটলো না, পুরো নাটকটি পড়তে চাই। ঈদ মোবারক।

  3. গল্পটির আত্মা যখন নাটকের শরীরে গিয়ে আশ্রয় নেবে তখন যে কি দাঁড়াবে সেটা ভাবতেই শিহরণ হচ্ছে৷ একটা অতিপ্রাকৃত জগৎ, অথচ মানুষের জীবনেরই যেন ক্লেদ মাখানো, বাস্তবতা মাখা, আমরা তো দেখেছি এমন ছবি রাষ্ট্রবিপ্লবের ঘোর লাগা ঋতুতে ঋতুতে, মাঝে মাঝে দান্তের নরকের ছবিটাও যেন ক্রমদৃশ্যমান৷ গল্পটা এমন একটা রহস্যমাখা জগতের মাঝমধ্যিখানে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয় মনে হয় যেন আমাদের এপারের লেখক সৈয়দ মুজতবা সিরাজের মায়াময় জগতের মধ্যে এসে পথ হারিয়ে ফেলছি…

  4. তুহিন চৌধুরী says:

    বুকের ছাতি ফাইট্যা যায় জল হাইতারিনা। – ঠিক তেমনি কিছু কইতে / লিখতে পারি না ক্যা রে?
    সুন্দর-অপূর্ব!! ধন্যবাদ, ভালবাসা, অভিনন্দন সাধনা।

  5. Sabyasachi Biswas says:

    শব্দেরা ধ্বনি তৈরী করে। সাধনার রচিত শব্দেরা তৈরী করে চলমান ছবি।জলের উপর ভেসে থাকা কচুরীপানার মত ভেসে ওঠে পানাউল্লা চর। দৃশ্যমান হয় চরের চরিত্র গুলি, ‘মানুষ কুকুর শেয়াল হায়নার মত একই রেখায় ফুটে ওঠে’ সাধনার ক্যানভাসে অনবদ্য প্রতিভাসে।
    নাটকটি পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।অভিনন্দন সাধনা।

  6. Anindya Bandyopadhyay says:

    পশ্চিমবঙ্গে বড় হয়ে যখন এক নদী-মেখলার মাটির গন্ধ পাই কোন লেখায় এমনিতেই হৃদয় আর্দ্র হয়। প্রারম্ভিক বর্ণনা মনে করিয়ে দেয় অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের “নীল কন্ঠ পাখির খোঁজে” উপন্যাসের কথা। কত নাম না জানা পাখি, গাছ, নদী, মানুষের গন্ধ যেন লেগে আছে অতি সযত্নে এই লেখাটিতে। যেন বাংলার সেই স্নেহস্পর্শটি থেকে আমরা চিরকালের মতন নির্বাসিত হয়েছি। গাঙকুমারীর অপেক্ষায় রইলাম। সাফল্য হোক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.