ভূমেন্দ্র গুহ: পশ্চিমবঙ্গ বলে একটা দেশ যার কোনো পিতা নেই, মাতা নেই, চরিত্র নেই, কিচ্ছু নেই

রাজু আলাউদ্দিন | ১০ আগস্ট ২০১৮ ৫:৫৯ অপরাহ্ন


২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল একেবারে অপরিকল্পিতভাবেই দেখা হয়েছিল কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক ভূমেন্দ্র গুহর সাথে কোলকাতায় তার নিজস্ব বাসভবনে। অসামান্য এই ব্যক্তিত্বের সাথে দেখা করার সুযোগটা করে দিয়েছিল আমার বন্ধু কবি রাহুল পুরকায়স্থ। বিকেলের দিকে রাহুলের সাথে কফি হাউজে দেখা করার কথা। লক্ষ্য ওখানে বসে আড্ডা দেয়া কিংবা রাহুলের হাত ধরে কোলকাতার অলিগলি ঘুরে দেখা। কফি হাউজে পৌঁছাতেই রাহুল বললো, ভূমেনদার সাথে তোমার কখনো আলাপ হয়েছে, পরিচয় আছে তার সাথে? আমি বললাম, এই মশহুর মানুষটির খ্যাতির সুবাস পাচ্ছি অনেক বছর থেকেই, কিন্তু কোনদিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি। দেখা হয়নি কখনো? না। তাহলে চলো ভূমেনদার সাথে তোমার দেখা করিয়ে দেই। সে কি? এখনই? হ্যাঁ, অসুবিধা আছে কোনো? না না, অসুবিধা নেই। আমিতো ভাবতেই পারছি না কিংবদন্তীতুল্য এই মানুষটির সাথে এত সহজেই দেখা করা সম্ভব। রাহুল আমার বিস্ময়সূচক সম্মতি পেয়েই বলে উঠলো, চলো তাহলে। কিন্তু তাকে আগে জানাবে না যে আমরা আসছি? রাহুল প্রায় তোয়াক্কাহীন ভঙ্গিতে বললো, বলতে হবে না, চল। তক্ষুণি একটা ট্যাক্সি ধরে আমরা রওয়ানা হয়ে গেলাম করুণময়ী সল্ট লেকের দিকে। তখন বোধহয় কোন এক ছুটির দিন ছিল সেটা। রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। রাহুল মাঝেমধ্যেই কথার ফাঁকে ফাঁকে আশেপাশে কী যেন খুঁজছিল। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম বোধহয় ভূমেনদার বাড়ি খুঁজছে। কী খুঁজছ জিজ্ঞেস করে তখন কোনো সদুত্তর পাইনি। এর উত্তর পাওয়া গেল পরে, ভূমেনদা আর রাহুলের আলাপচারিতার ভেতরে। সম্ভবত ২০/২৫ মিনিট লেগেছিল তার বাসায় পৌঁছুতে। সুউচ্চ এক ফ্ল্যাট বাড়ির তৃতীয় তলায় গিয়ে রাহুল কলিং বেল-এ টিপ দিতেই এক যুবতী দরজা খুলে দিলেন। সম্ভবত ভূমেনদার মেয়ে হবেন। ভূমেনদা আছেন না?–এটা প্রশ্ন হলেও রাহুল এমনভাবে বললো যেন ভূমেনদা আছেন, রাহুলের এতে কোনো সন্দেহ নেই। স্রেফ সৌজন্যের খাতিরে জিজ্ঞেস করে প্রবেশ করতে হয়, তাই এই প্রশ্ন। সেই নারী আমাদেরকে অতিথি কক্ষে বসিয়ে ভূমেনদাকে ডাকতে গেলেন। অতিথি কক্ষের দক্ষিণদিকে একটা দরজা যেটা যুক্ত হয়েছে এই বাসার একদিকের বারান্দার সাথে। ওখানে একটা জলচৌকিতে বসে উবু হয়ে বসে আছেন তিনি, চারিদিকে শিশুর খেলনার মতো পাণ্ডুলিপি অার বইপত্র ছড়ানো ছিটানো। পড়নে একটা চেক লুঙ্গি, গায়ে হাতাকাটা গেঞ্চি। রাহুলের আওয়াজ পেয়েই তিনি কাত হয়ে রাহুলকে দেখতে পেয়ে উঠে এলেন অতিথি কক্ষে। গায়ের রং ফর্সা। তিনি প্রবেশ করতেই রাহুল তার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমার সম্পর্কে রাহুল এটা সেটা বললো, প্রথম পরিচয় করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা যেমনটা করি থাকি। রাহুলের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, সাহেবকে নিয়ে এলেন, কিন্তু ‘জিনিস’ নিয়ে এলেন না যে। আমি সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে ফেললাম এই ‘জিনিস’-এর মানে। রাহুল জবাবদিহির ভঙ্গিতে জানালো, খুঁজেছি, পেলাম না। সবগুলোই বন্ধ পেলাম। ভূমেনদা রাহুলের উত্তরে নির্বাপিত না হয়ে অন্য একটা ঠিকানা দিলেন। রাহুল সেখানে যেতে উদ্যত হতেই, আমি সদ্য জ্বলে ওঠা উৎসাহের শিখাটিকে ফু দিয়ে নিভিয়ে দেয়ার জন্য বললাম, ভূমেনদা, আজ নয়, কারণ বৌবাচ্চাদেরকে হোটেলে রেখে এসেছি। ওরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। উঠেই আমার উপস্থিতি আশা করবে। সুতরাং, পরের বারের জন্য এই আতিথেয়তা বরাদ্দ থাকুক। ভূমেনদার বয়স তখন ৮২ বছর, এই বয়সেও তিনি দিব্য সিগারেট ফুকছেন, এমনকি সোমরসেও তার আসক্তি অটুট আছে দেখে আমি সত্যি অবাক হয়েছি। নিজে ডাক্তার ছিলেন, খুবই বড় নামকরা ডাক্তার। কিন্তুু বাঙালি-কথিত এইসব ‘বদভ্যাস’ থেকে নিজেকে একটুও দূরে সরিয়ে রাখেননি। তার সাথে এটা সেটা টুকটাক কথাবার্তা চলতেই আমি তার সাথে কথাবার্তা রেকর্ড করার অনুমতি চাইতেই তিনি উদারতার সাথে সম্মতি দিলেন। প্রয়াত ভূমেনদার সাথে আমার আলাপচারিতার পূর্ণ বিবরণটি এখানে প্রকাশ করা হলো। বিডিআর্টসের পাঠকের জন্য অপ্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারটি শ্রুতি থেকে লিপিরূপটি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার অলাত এহসাত।–রাজু আলাউদ্দিন।


রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশে আপনি কত সালে গিয়েছিলেন, ভূমেনদা’?
ভূমেন্দ্র গুহ : মনে নেই। একবার গিয়েছি, তার দু’বছর পর আবার গিয়েছি।

রাজু আলাউদ্দিন : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে, নাকি তার পরে–এইটুকু কি মনে পড়ে?
ভূমেন্দ্র গুহ : স্বাধীন হওয়ার পরে।

রাজু আলাউদ্দিন: কোনো সাহিত্যিক আমন্ত্রণ বা এ রকম, নাকি শুধুই ঘুরতে?
ভূমেন্দ্র গুহ: আমন্ত্রণ-নিমন্ত্রণ তো আমাকে জীবনে কেউ করেই না, আমিও আউট ডোরে হই না।

রাজু আলাউদ্দিন: যদি আমন্ত্রন করে তো….
ভূমেন্দ্র গুহ: না, না, গাটের পয়সা খরচ করে ভাই… এরোপ্লেনের টিকিট কেটে…। প্রথমবার গিয়েছি বাসের টিকিট কেটে। বাসের টিকেট কেটে গেছি ঢাকা। এবং বাসে যেতে যেতে দু’দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি–এই সব গাছপালা তো আমাদের দেশেও ছিল। এই জঙ্গল, জলও তো ছিল। অতবেশি দেখতে পারিনি, যা দেখেছি ওই বাসে। দিন তিনেক ছিলাম সেইবার। ওহ্, ভুল বললাম, বাংলাদেশে তিনবার গেছি।

রাহুল পুরকায়স্থ: ঠিক করে বলুন, তিনবার তো?
ভূমেন্দ্র গুহ: হ্যাঁ হ্যাঁ, তিন বার। একবার গিয়েছি দু’-তিন দিনের জন্য। সেবার একজনের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল–সে বিরাট পুরুষ।
রাহুল পুরকায়স্থ: কারা তারা?
ভূমেন্দ্র গুহ : মনে পড়ছে না। আমার হচ্ছে কি, নাম মনে থাকে না।
রাজু আলাউদ্দিন : মানে, তিনি কি লেখক?
ভূমেন্দ্র গুহ : না না, লেখকও তিনি, সাংবাদিক। প্রত্যেক সার্কেলে তিনি প্রিয়। আহ্ (মনে করতে না পারা জন্য আক্ষেপ সূচক)! অত্যন্ত এনার্জিটিক, অত্যন্ত ভাল মানুষ।
রাহুল পুরকায়স্থ: শামীম রেজা?
ভূমেন্দ্র গুহ : নাহ্। আর কারো নাম বল দেখিন। (আর জানি না– রাহুল)। যাহ্, ওনি বলতে পারবেন হয়তো (রাজু আলাউদ্দিনকে ইঙ্গিত করে)।
রাজু আলাউদ্দিন : বয়স কেমন হতে পারে তার?
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি যখন গিয়েছি তখন তার বয়স ত্রিশ-বত্রিশ বছর। এখন বড় জোড় চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে।

রাজু আলাউদ্দিন : চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ হবে, না?
ভূমেন্দ্র গুহ : উনি অত্যন্ত …. ভাল জানেন। ওই যতটুকু ঢাকাতে থেকেছি। একটা হোটেলে উঠেছিলাম। তৃতীয় শ্রেণির হোটেল সেটা। সে যাক গে। আমাদের সঙ্গে ছিলেন বীথি চট্টোপাধ্যায়। ওর (রাহুলকে ইঙ্গিত করে) কাছের বান্ধবী।
রাহুল পুরকায়স্থ: আমার বন্ধবী নয়, আপনার বন্ধবী (রসিকতার স্বরে)।


ভূমেন্দ্র গুহ :
যাই হোক, বীথি চট্টোপাধ্যায় প্রতিবারই ঢাকায় যায়। প্রতিবারই কবিদের সঙ্গে। সে ঠিক আছে ক্ষণ। আর আমাদের সঙ্গে ছিলেন সমরেশ বসু। বীথি চট্টোপাধ্যায় সন্ধ্যার সময় বললেন, আমি অমুকের বাড়ি থাকবো, চলে যাচ্ছি। আমরা রইলাম।
রাহুল পুরকায়স্থ: সিরাজী নাকি?
ভূমেন্দ্র গুহ : বিরাট বড় লোক।
রাহুল পুরকায়স্থ: সিরাজী, সিরাজী, বললাম তো হাবিবুল্লাহ সিরাজী নাকি?
ভূমেন্দ্র গুহ : যেখানে ছবির গ্যালারি আছে একদিকে, একদিকে অতিথি থাকার জন্য ব্যবস্থা আছে। যাই হোক, বিরাট বড় লোক। তিন-চারতলা বাড়ি। একতলা আছে ছবির মিউজিয়াম, একতলা বাইরের লোকদের থাকবার জন্য। একতলা…
রাহুল পুরকায়স্থ: সৈয়দ শামসুল হক নাকি?
ভূমেন্দ্র গুহ : শামসুল হক তো কবি। কবি না?
রাজু আলাউদ্দিন : জ্বি, হ্যাঁ কবি।
ভূমেন্দ্র গুহ : ওনার অতবড় বাড়ি হবে না, ব্যবসায়িও হবেন হয়তো।
রাজু আলাউদ্দিন : মঈন চৌধুরী কি?
ভূমেন্দ্র গুহ : না, ও (রাহুলকে ইঙ্গিত করে) যে নামটা বলেছিল, কাছাকাছি হয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : সৈয়দ শামসুল হক?
ভূমেন্দ্র গুহ : না না, সৈয়দ তো কবি, ও হতে পারে না।… কোনো কবি কখনো বাড়ি কিনতে পারবে না, ভিত কিনতে পারবে না, মহাপুরুষ হতে পারবে না। প্রথমবার গিয়েছিলাম.. বেলাল দা’ নিয়ে গিয়েছিলেন।

রাজু আলাউদ্দিন : বেলাল চৌধুরী? (পুনর্বার একই ভাবে মাথ নাড়লেন)
রাহুল পুরকায়স্থ: আপনি শুনে খুশি হবেন, বাংলাদেশে ছেলেমেয়েরা সব সঞ্জয় ভট্টাচার্যের নাম করে করে কথা বলে।
ভূমেন্দ্র গুহ : তাই নাকি! বাংলাদেশে সম্ভব। এ দেশে সম্ভব না।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ। সঞ্জয় ভট্টাচার্য তো অবশ্যই।
ভূমেন্দ্র গুহ : পশ্চিমবঙ্গ বলে একটা দেশ যার কোনো পিতা নেই, মাতা নেই, চরিত্র নেই, কিচ্ছু নেই। একেবারে যাযাবর, নয় তো খারাপ করে বলবো।
রাজু আলাউদ্দিন : এতিম হয়ে গেছে?
ভূমেন্দ্র গুহ : হিজড়ে হয়ে গেছে। হিজড়ে।
রাজু আলাউদ্দিন: হিজড়ে!
ভূমেন্দ্র গুহ : বাংলাদেশের পিতা আছে, মাতা আছে। আমি এই মাত্র পড়ছিলাম, জড়দের ছয়টা বৈশিষ্ট্য থাকে। জড় পদার্থ বলতে খারাপ ভাববার কারণ নেই। যে ভারতীয় দর্শন, সেটার মধ্যে আপনারাও ছিলেন; তখনো ভাগ হয়নি, সেই ইরান থেকে আরম্ভ করে ওই মালয় পর্যন্ত বিস্তৃত। সেই ভারতবর্ষের দর্শন ছিল। প্রথম তো দর্শনে হল শাংখ্য। তো বুদ্ধদেব মারার গেছেন। উনি আশি বছর বেঁচে ছিলেন।
তার আগে জন্মেছিলেন কপিল। তিনি শাংখ্য দর্শন লিখেন। লিখলেন না, উনি মুখে মুখে বলে যান যা পরে সংগ্রহ করা হয়। উনি চতুর্দশ শতাব্দিতে কিছু তালিকা করে গেছেন। ছোট্ট ছোট্ট লাইনে, কোনো বড় বাক্য নেই। তার কাছে বুদ্ধদেব পড়াশুনা করেছেন, শ্রী কৃষ্ণ তিনিও পড়াশুনা করেছেন। কপিলাবস্তু শহরটি কপিল দেবের আশির্বাদ নিয়ে ইক্ষাকু রাজারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জায়গাটার নাম কপিলাবস্ত, মানে কপিল যেখানে বসত করেন। কপিল দেব জন্মেছিলেন সেই বসতিতে। বুঝতে পারছেন কত আগে জন্মেছিলেন কপিল। তার একটা কথা আছে ‘জড়’। পৃথিবীটা হচ্ছে জড়। যাকে প্রকৃতি বলি আমরা, যেখানে বসে আছি, কথা বলছি, আমাদের চারপাশে যা আছে, এই যে ওয়ার্ল্ড, হুইচ ইউ সি, এটা জড় পদার্থ। মানে এর সৃষ্টি করার অশেষ ক্ষমতা আছে, এটা সচেতন-সৃষ্টিশীল এই প্রকৃতি। কিন্তু এর অসুবিধা হচ্ছে ততক্ষণ এটা সৃষ্টি করতে পারে না, যতক্ষণ না নির্গুণ অকর্মা চেতন তাকে স্পর্শ করে।


রাজু আলাউদ্দিন : আপনি কলকাতাকে কি সে ভাবে দেখছেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : শুনুন, সেখানে একটা কথা আছে ষড় পদার্থ। ষড় পদার্থ মানে বস্তুর ছ’টা গুণ থাকে।

রাজু আলাউদ্দিন : ওখান থেকেই ষড়-দর্শন?
ভূমেন্দ্র গুহ : ষড়-দর্শন তো ভারতবর্ষের ছয়টা দর্শন, প্রধান দর্শন। ষড় গুণ হচ্ছে একটা জড় পদার্থের, মানে একটা অস্তিত্বের–জন্ম, মৃত্যু, ভিত্তি, সৃষ্টি, ক্রম অবনতি, মৃত্যু–এই ছ’টা স্টেজ। এখন পশ্চিম বঙ্গে ছ’টা স্টেজই শেষ হয়ে গেছে। আর কোনো স্টেজ নেই।

রাজু আলাউদ্দিন : বাংলাদেশে আছে সেটা?
ভূমেন্দ্র গুহ : আছে। কেন আছে? ওরা যুদ্ধ করেছে, রক্ত দিয়ে পেয়েছে বাংলাদেশ। এ রকম মাগনা ব্রিটিশরা দিয়ে গেল দয়া করে–তা তো নয়। ব্রিটিশরা গান্ধীর জন্যে, নেহেরু’র জন্যে স্বাধীনতা দিয়েছে–তেমনটা ভাববেন না । কারো জন্যে নয়। কাজেই সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ারের পরে ওদের একেবারে টাকা-কড়ি অর্থনীতি সবভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে, (উত্তর) আমেরিকার টাকায় বেঁচে আছে, এই তো। সেই সময় দেখলো ভারত ক্রমেই সচেতন হয়ে উঠছে। নৌ-বিদ্রোহ হলো, মধ্য প্রদেশে সৈন্য বিদ্রোহ হলো। তখন তারা মনে মনে হিসেব কষলো ভারতবর্ষের সৈন্যরা যদি বিদ্রোহ করে, নৌ-বাহিনী যদি বিদ্রোহ করে তাহলে সে দেশ শাসন করবো কি করে? এইটুকু তাদের শক্তি। সব মানুষ বিদ্রোহ করলে তখন কী হবে? তার চেয়ে মানে মানে ছেড়ে আসাটাই ভাল।
তখন নৌ-বিদ্রোহ হলো কেন? তার কারণ হলো, সুভাষ বোস। সুভাষ বোস হেরে গেছেন বটে, উনি জানতেন উনি জিতবেন না। ব্যাপারটা হলো আমি না হয় জিতব না, আই নো দ্যাট, বাট দ্যা স্পিরিট উইলবি ট্রান্সমিটেড টু পিপল। বুঝতে পেরেছেন। এইখানেই সুভাষ বোসের জয়। সুভাষ বোস বুঝতেন ফেইক ইজ ফেইক। সেই জন্যে পাবলিকদের বলেছেন, ডোন্ট ওয়ারি। আপনি জানেন বোধ হয় সেই ভারতবর্ষের কালে ব্রিটিশরাজে নৌ-বাহিনী বিদ্রোহ করলো পরাধীন কলকাতায়। কলকাতার পর মাদ্রাজ। প্রত্যেকটা নৌ-পোর্ট বিদ্রোহ করলো, যার যা আছে, ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ উড়িয়ে দিল। বুঝতে পেরেছেন।
এদিকে তার দেখা দেখি মধ্যপ্রদেশে মিরাট ব্যারাক থেকে নাগপুরে, সৈন্যরা রাস্তায় বেরিয়ে এলো। সেখানে ব্যারাক খালি। তখন ব্রিটিশদের বুঝতে বাকি থাকলো না, রাজত্ব ধরে রাখা যাবে না। সৈন্য বাহিনী, পুলিশ, সেনা যদি বিদ্রোহ করে–এরা তো আর ব্রিটিশ নয়, এরা সব ইন্ডিয়ান, এইখানকার।
ভিক্টোরিয়াকে এরা আদি মনে করতো, এখন আর করে না।
এই স্পিরিট কী রকম ছিল? এই স্পিরিট, আজাদ হিন্দ ফৌজ, শাহ নেওয়াজ(পরে মন্ত্রী হয়েছিল), লক্ষ্মী সায়গন, লক্ষ্মী নারায়ণ–এই চারজন। এই চারজনের যখন প্রকাশ্য বিচার শুরু হলো লাল কেল্লায় তখন সমস্ত দেশ ক্ষেপে গেল। বিকজ, এরা হেরে যেতে পারে কিন্তু তার পরতে পরতে হুঙ্কার ছিল।
তখন বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লো নৌ-বাহিনীতে শাহ নেওয়াজের নেতৃত্বে। ব্যারাকে ব্যারাকে খবর গেল। রামেশ্বর খুন হয়ে গেল, রশিদ আলী খুন হয়ে গেল।

রাহুল পুরকায়স্থ: তখন বন্ধু কবিতা লিখলো। সৈয়দ রামেশ্বর।
ভূমেন্দ্র গুহ : কে ?
রাহুল পুরকায়স্থ: নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী।
ভূমেন্দ্র গুহ : তিনি ওভারঅল গুরুদেব। আপনাকে কী বলবো, এরপরে ওকে আকাডেমি দিবে। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সেবারের আকাডেমি পেল সুবোধ সরকার পরে যিনি পশ্চিমবঙ্গের মাথা। নিরেন ছিপছিপে, লম্বা মানুষ। এর পরে পেলেন …। (উৎপল?–রাহুল)। হ্যাঁ, উৎপল পেয়ে গেল। উৎপল পেয়ে গেল উৎপলের গুণে নয়, ওকে দয়া করে দেয়া হলো, ও তখন অসুস্থ বহরমপুরে।

রাজু আলাউদ্দিন : ভূমেন দা’, এরপরে আসছেন রাহুল পুরকায়স্থ (রসিকতার স্বরে)।
রাহুল পুরকায়স্থ:ভূমেন্দ্র গুহ : ওরে সর্বনাশ! সে কি অভিনয়! (সে কি গান এবং সুর ছিল–রাহুল)। সেই মৃণাল(ঘোষ) ভাই। (জাহাজে?–রাহুল)। হ্যাঁ, জাহাজে। আপনি দেখেছেন? (শুনেছি–রাহুল)। আপনি জন্মানই নি। জন্মেছিলেন? (দেখিনি–রাহুল)। শুনেছেন, দেখেননি। (কোলের ওপর রাখা বইয়ের ওপর হাতে পিঠ চাপড়ে) আরে আমি উৎপল দত্তের ‘কল্লোল’ দেখেছি, ‘ফেরারি ফৌজ’ দেখেছি। (‘তীর’? ‘অঙ্গার’ দেখেছেন?– রাহুল)। ‘অঙ্গার’ দেখেছি আমি। উৎপল দত্তের কী দেখিনি আমি, শেষের দিকে যা বাদ পড়ে গেছে। (‘দুঃস্বপ্নের নগরী’? –রাহুল)। হ্যাঁ, বাব্বাহ্, দেখেছি। (এটা দেখেছি আমি– রাহুল)। আপনি ছেলেবেলায় তখন, তাই। আমি তখন ডাক্তারি নিয়ে এতোটা ব্যস্ত ছিলাম যে উৎপল দত্তের শেষের দিকে ‘টিনের তালোয়ার’ ছাড়া আর কোনো কিছুই দেখিনি। ভাবা যায় না।

রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, ভূমেন দা, আপনি তো তিনবার বাংলাদেশে গেলেন। কিন্তু যাকে নিয়ে আপনি আপনার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেছেন, এখনো ব্যয় করে যাচ্ছেন। ওই জীবনানন্দ দাশের বরিশালে কি গিয়েছিলেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : আরে ! বরিশালের লোক তো আমি মশাই, বলে কি বরিশালে গিয়েছি কি না!

রাজু আলাউদ্দিন : না, আপনি তো থাকছেন…
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি এখান থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে বরিশাল। ঢাকা থেকে যেভাবে আমি ছেলেবেলায় যেতাম, জাহাজে চড়ে সেই বিরাট বড়, জাহাজে নয়…(ওই যে, স্টিমার–রাজু আলাউদ্দিন)। আপনাদের ওই ছ্যাঁচছ্যাঁড়া লঞ্চ নয়, বড় বড়, লম্বা লম্বা, রাজ্যের লোক দাঁড়িয়ে থাকে। ওই কাঠের তৈরি বিরাট…(লঞ্চ বলে ওগুলোকে– রাজু আলাউদ্দিন)। লঞ্চে করে গেছি। উনি, হাসনাত ভাই, অনেক চেষ্ট-চরিত্র করে আমাকে লঞ্চের টিকিট কেটে দিয়েছেন। আমি…লঞ্চে গেছি ছেলেবেলার মতো। ছেলেবেলায় সাহস করে দোতলায় উঠতে পারিনি, ডেকে শুয়ে গিয়েছি, ডেকে শুয়েই এসেছি। এবার ফাস্ট ক্লাসে গিয়েছি। একদম টপে বসে। বুঝলাম কী আনন্দে সাহেব বড়লোকেরা যেত। সামনে সামনে সব চেয়ার পাতা আছে, পেছনে চেয়ার পাতা আছে। চেয়ারে শুয়ে শুয়ে…


রাজু আলাউদ্দিন : আপনি বোধ হয় কমলা রঙের ওই জাহাজে উঠেছিলেন।
ভূমেন্দ্র গুহ : না, না। জাহাজটার নাম হচ্ছে, আমি ছেলেবেলায় যেই জাহাজে গিয়েছি সেই জাহাজে। জাহাজের নাম হচ্ছে…
জাহাজে লেখা আছে ‘মেইড ইন গার্ডেনিজ সপ নেপাল’ না কি যেন লেখা ছিল।

রাজু আলাউদ্দিন : একটা প্রশ্ন করি, সেটা হলো, ভূমেনদা, আমাদের নজরে এসেছেন আপনার এই কাজগুলোর কারণে, জীবনানন্দ নিয়ে আপনার যে ব্যাপক উদ্ধারকার্য আর কি, এই কারণে আপনার কবিতা বা অন্যান্য লেখার প্রতি মনোযোগ খানিকটা সরে গেছে, পাঠকদেরও। এবং আপনি নিজেও কি মনে করেন যে, এই জীবনানন্দ দাশ উদ্ধার করতে গিয়ে আপনার নিজের লেখালেখির ক্ষতি…
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি এই বয়সে, শুনুন, জীবনানন্দের কথা বাদ দিন, এই বয়সে আমি দশটা কবিতার বই লিখেছি, দশটা! আমি কবিতা নিয়ে কমসে-কম দশটা প্রবন্ধ করেছি। ও জানে, ভাল বলতে পারবে, কয়টা হবে (রাহুলকে ইঙ্গিত করে), তিন-চারটা হবে, না?
রাহুল পুরকায়স্থ: না, না। বেশি হবে। খান বারো বা বারো-চৌদ্দ হবে।
ভূমেন্দ্র গুহ : দেখেছেন, ভুল বলেছি। আমি দুইটা ইন্টারভিউ দিয়েছি। একটা ইন্টারভিউ দেড়শ পাতা, আরেকটা ইন্টারভিউ পঁচাত্তর পাতা।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, আমি রাহুলের কাছে শুনলাম আসতে আসতে। এবং সেগুলো বেশ ইন্টারেস্টিং।
ভূমেন্দ্র গুহ : কাজ আমি জীবনানন্দ ছাড়া করিনি, তা নয়। আমি একটা মিনিট সময় নষ্ট করিনি। শরীর আমাকে পারমিট করেছে, কিছু না কিছু করেছি। দু’টো উপন্যাস লিখেছি। সাত-আটটা গল্প লিখেছি।

রাজু আলাউদ্দিন : এবং আমি শুনলাম যে, সাফো’র কবিতা আপনিই প্রথম বাংলা ভাষাতে অনুবাদ করেছেন। (হ্যাঁ, প্রথম বাংলাতে অনুবাদ করেছি।–ভূমেন্দ্র গুহ)। এবং ১৯৫২ সালে। রাহুলই আমাকে অবগত করলো। আমি তো এই বিষয়ে অজ্ঞ ছিলাম।
ভূমেন্দ্র গুহ : দান্তে, বিয়াত্রিসে আমিই অনুবাদ করেছি। এবং ‘ভিতানোভা’ আমি অনুবাদ করেছি সেই ১৯৫৫-’৫৬ সালে। তখন আমার বয়স কত হবে। আমি তখনো ডাক্তারি পাশ করিনি। আমরা বয়স কত হবে, ’৫৫ থেকে ৩৩ বাদ দিলে? (রাহুলকে ইঙ্গিত করে)। কত হবে, ২২। তখন আমি দান্তে’র ‘ভিতানোভা’ অনুবাদ করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন : তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রথম থেকেই আপনার নজর পড়েছিল ওপরের দিকে।
ভূমেন্দ্র গুহ : ওই যে, মাননীয় রাহুল বাবুর শ্রী চরণে আমি এখন আছি। (রাহুলকে ইঙ্গিত করে, কর জোড়ে রসিকতার ভঙ্গি ও ভাষায়)। সব উনি জানেন।
রাহুল পুরকায়স্থ: জানার কিছু নেই।
ভূমেন্দ্র গুহ : মানে আমি কি ছিলাম। তার কিছু আছে কি নাই।


রাজু আলাউদ্দিন : তবে একটা জিনিস যেটা মনে হচ্ছে, ভূমেন দা’, সেটা হলো ছোটবেলা থেকেই আপনার নজর ছিল উপরের দিকে। উপরের দিকে বলতে এইটাই বোঝায়, এই যে দান্তে, এদের মতো কবির কবিতা আপনি অনুবাদ করেছেন, তারপরে জীবনানন্দ দাশ, তারপরে সাফো অনুবাদ করেছেন।
ভূমেন্দ্র গুহ : একটা কথা আপনাকে বলছি। ওই যে সংগীত মহলে একটা কথা আছে, ‘নাড়া’ বাঁধতে হয়। শেখার প্রথমেই নাড়া বাঁধতে হয়। যেমন–তুই কার কাছে নাড়া বেঁধেছিস? বলে যে, আলাউদ্দিন খাঁ; আরেক জন বলে তুই কার কাছে নাড়া বেঁধেছিস? বলে, আমি বাহাদুর খাঁ। আমি দেখলাম, শালা, নাড়াই যদি বাঁধতে হয় তাহলে উঁচুতে বাঁধতে হবে। (একদম ভালো কথা বলেছেন। খুবই চমৎকার।–রাজু আলাউদ্দিন)। সুতরাং আমার কবিতা কারো কারো পছন্দ হয় না। কারণ আমার কবিতা তো নাড়া বাঁধা কবিতা। ভালো হবার কথাতো নয়, কবিতা হবে চটুল, তুড়তুড় করবে, আবৃত্তি করা যাবে, নাচা যাবে। এইগুলোই তো কবিতা? আমার কবিতা এইগুলোর ধারে কাছে যায় না। আমার কবিতা, রাহুল জানে, পুরো পশ্চিমবঙ্গে রাহুল একমাত্র মানুষ যিনি আমার কবিতা পড়েন।

রাজু আলাউদ্দিন : না! সেটা পশ্চিমবঙ্গে হতে পারে; কিন্তু বাংলাভাষার কথা যদি বলেন তাহলে পূর্ববঙ্গ যেটা, আদি পূর্ববঙ্গ, এবং এখন যেটা বাংলাদেশ নামে পরিচিত, স্বাধীন সার্বভৌম দেশ, সেইখানে কিন্তু আপনার কবিতার পাঠক আছে।
ভূমেন্দ্র গুহ : জানি না। আপনি বলতেছেন, শুনে আনন্দ হচ্ছে, আমি জানি না।

রাজু আলাউদ্দিন : আমি আপনাকে জেনেই বলছি। এবং আমি নিজেও পাঠক…
ভূমেন্দ্র গুহ : আপনি বলছেন বটে, আমার কাছে মেইন প্রবলেম যে ছ’টা বললাম, যে ছয়টা কোয়ালিটির কথা বললাম, আমার কোয়ালিটির খুব প্রবলেম আছে। আই হ্যাভ নো আদার বিজনেস টু ডু। হাউ আই এ্যাম বর্ন, আই উইল ডাই, ইন দ্যা মিনটাইম হাউ আই ডেভেলপ।

রাজু আলাউদ্দিন : জীবনানন্দ দাশ সম্পর্কিত একটা ছোট্ট প্রশ্ন করতে পারি ? (হ্যাঁ, করেন, করেন।–ভূমেন্দ্র গুহ)। সেটা হলো, এগুলো মানে তো শোনা কথা, কোনো লিখিত ডকুমেন্ট নেই যে, সুধীন দত্ত জীবনানন্দ দাশকে কী চোখে দেখতেন।
ভূমেন্দ্র গুহ : পছন্দ করতেন না, ওনাকে কবিই মনে করতে না। কবিই মনে করতেন না তিনি। আর কী বলবেন। যদিও তাঁকে দিয়ে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় সিগনিকেন্টস্ কবিতা লিখিয়েছেন। সিগনিকেন্টস্ কিছু কবিতা লিখিয়েছেন!


রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু সেগুলো উনি ছাপলেন কি করে, যদি উনি তাকে কবিই মনে না করেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : এদের মাঝখানে বিষ্ণু দে ছিলেন। সুধীন দত্তের ডান হাত ছিলেন বিষ্ণু দে। বিষ্ণু দে’র একসময় জীবনানন্দ দাশের প্রতি ভক্তি ছিল। কাজেই জীবনানন্দ থেকে এনে বিষ্ণু দে’ই ছেপে দিয়েছেন। যে কারণে জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে সুধীন দত্ত একটা কথাও বলেন নি। লিখতে বললেও লিখেন নি। তবে অত্যন্ত উচ্চ মার্গের এ্যাংলিয়ান-বেঙ্গলি তো, জীবনানন্দ’র মৃত্যুর পরে তিনি প্রথম যিনি তার শবদেহ দেখতে গেছেন। কিন্তু তিনি তাকে কোনো কবিই মনে করেন নি। ‘এতো কাটাকুটির পর এই !’–এই রকম করে কথা বলতেন জীবনানন্দ সম্পর্কে। (তাই নাকি!–রাজু আলাউদ্দিন)। সেই সুধীন দত্ত জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর পর প্রথম খবরের কাগজে বেরুনোর সঙ্গে সঙ্গে উনি দেখতে গেছেন। এমনকি পোশাক পাল্টান নি। সেই রাতের সময়ের দড়ি-টরি বাঁধা, কমল মিত্র সিনেমায় পড়তেন, মনে আছে? কি যেন বলে? (রাহুলকে ইঙ্গিত করে)।
রাহুল পুরকায়স্থ: গাউন?
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। নাইট গাউন।
ভূমেন্দ্র গুহ : নাইট গাউন। আমাদের সময় কমল মিত্র সিনেমায় খুব পড়তেন।
রাজু আলাউদ্দিন : নাইট গাউন পড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি!
ভূমেন্দ্র গুহ : হ্যাঁ। ওই অবস্থায় চলে গেছেন। মুখটা ধুয়ে পর্যন্ত যান নি। সবার আগে। এটা হচ্ছে বড় এ্যাংলিয়ান-বেঙ্গলির ক্যারেক্টার।

রাহুল পুরকায়স্থ: জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর পরে যে স্মরণ সভা হয়েছিল না (হ্যাঁ-রাজু আলাউদ্দিন), সেখানে ভূমেন দা’র একটা লেখা ছিল। সেই লেখাটি ‘ময়ুখ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল, সেটা কাব্যসমগ্রের মধ্যে আছে। এই কাব্যসমগ্রটি করতে গিয়ে লিখেছিলাম যে, ভূমেন দা’র কবিতা না, যিনি লিখেছেন কবিতা–ভূমেন্দ্র গুহ–তিনি আসলে কে? তিনি আসলে ভূঁইফোর কি না। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, তার লেখালেখি, দৃষ্টিভঙ্গি সমস্ত কিছু দিয়ে একজন পাঠক যেন তাকে বুঝতে পারে। যেহেতু ভূমেন্দ্র গুহ বহুচলিত কবি নন, যেহেতু ভূমেন্দ্র গুহ বহু পঠিত কবি নন। এবং ভূমেন্দ্র গুহ সম্পর্কে একসময়, কী বলতো, এক ধরনের ভাসা ভাসা মনোভাব, অবহেলার মনোভাব (বা অমনোযোগ–রাজু আলাউদ্দিন)। অমনোযোগ তো বটেই। পরের প্রশ্ন: পরের কাজে, মানে জীবনানন্দ নিয়ে কাজ করে বিখ্যাত, এটা তো রয়েই গেছে।…সমস্তটা মিলে তার দুটো ইন্টারভিউ নিই। তার নিজের লেখা, নিজের সম্পর্কে লেখা, নিজের গদ্য, নিজের কবিতা ভাবনা সব এটার মধ্যে আছে।

রাজু আলাউদ্দিন : মানে এটা ভূমেন্দ্র গুহ অবনিবাস, এই রকম, তাই তো? (হ্যাঁ, অবনিবাসের মতন– রাহুল)। হ্যাঁ, এটা খুব ভাল কাজ হবে। আমার মনে হয় এটা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাওয়া উচিত। আর…
ভূমেন্দ্র গুহ : যেটা সে সময় বলছিলাম, রাহুল দয়া করে যা করার করে দিয়েছে। আমার আর করার কিছু নেই। করার সময় নেই, এ্যাকচুয়ালি।
আমার কথা তুলেছেন যখন বলি, আপনার বাংলাদেশ আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।

রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা, ফাঁসিয়ে দিয়েছে, কীভাবে?
ভূমেন্দ্র গুহ : রাহুল সম্পাদক আমার কাব্যসমগ্রের। আধুনিক নিয়মানুসারে কবিতার বই কয়টা সাজিয়ে দিলাম আর পর-পর-পর-পর-পর করে কবিতা সাজিয়ে নিলাম, গোড়ায় একটা ভূমিকা লিখে দিলাম। (এই ভাবে হচ্ছে, হ্যাঁ।–রাজু আলাউদ্দিন)। রাহুল তা কিন্তু করেনি, নিজেকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে; সবকিছু জড়িয়ে-মড়িয়ে ফাঁসিয়ে দিয়েছে।

রাজু আলাউদ্দিন : না, আমার মনে হয় এইভাবেই হওয়া উচিত। কারণ হলো যে, সম্পাদনা…
ভূমেন্দ্র গুহ : আমাকে বাংলাদেশের জন্য একটা নির্বাচিত জীবনানন্দ কবিতা বই করতে বলা হয়েছে। এবং যিনি করছেন তার উৎসাহ অনেক বেশি।

রাজু আলাউদ্দিন : কারা করছেন, ভূমেন দা?
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি বলতে পারবো না। খেয়াল থাকে না আমার। বাংলাদেশের মানুষ করছে।


রাজু আলাউদ্দিন : কারা করছেন সেটা? কোন প্রকাশনী?
ভূমেন্দ্র গুহ : তা আমি জানি না। আমি শুধু একজন লোককে জানি, তার নাম হচ্ছে, (কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ভেবে) তিনি ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদক, আবুল হাসনাত ভাই।
রাজু আলাউদ্দিন : আবুল হাসনাত। আচ্ছা বুঝতে পারছি, বেঙ্গল পাবলিসার্স থেকে বের হচ্ছে আরকি।
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি জানি না। ওই একটি মাত্র ভদ্রলোককে আমি জানি। উনিই আমাকে ফাঁসিয়েছেন। ওর চাহিদা হলো, বাংলাদেশে জীবনানন্দ বিরাট ভালিউমে আছে, আমি জানি সবগুলো কবিতা বাংলাদেশের পাঠকরা পড়বে। তার আগে, আপনাকে যেটুকু বলা যায়, যা বাকি আছে, আপনি একটা নির্বাচিত সংকলন করুন, যেটা পেলে মোটামুটি জীবনানন্দকে সহজে জানা যায়।
মান্নান সাহেব যেমন আটকে গেছেন সেই ‘বনলতা সেন’-এ, তারপরে আর এগোন নি। (আবদুল মান্নান সৈয়দ?–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ। এই মাত্র একটা লেখা পারলাম, সেই দু’দিন আগে থেকে, সেখানে ‘বেলা-অবেলা-কালবেলা’, ‘সাতটি তারা তিমির’র নিয়ে কোনো কথা নেই। (কী নিয়ে কথা নেই বললেন? –রাজু আলাউদ্দিন)। ‘সাতটি তারা তিমির’ বলে একটা কবিতার বই আছে জীবনানন্দ’র, (জ্বী।-রাজু আলাউদ্দিন), তাঁর শেষ কবিতার বই হলো ‘বেলা অবেলা কালবেলা’—এই দু’টো নিয়ে মান্নান ভাই একটাও কথা বলেন নি। উনি একটা লাইন লিখেছেন, ‘এরপর জীবনানন্দর কবিতা বাঁক নিয়েছে বাস্তবতার দিকে।’ হয়ে গেল জীবনানন্দ শেষ। টুয়েন্টি আপ টু মনন্তর, প্রেম-টেম, ওমুক-তমুক এইসব লিখেছেন। আর জীবনানন্দ নিজে বলে গেছেন, নিজে, চিঠিতে লিখেছেন প্রভাকর সেনকে, যে একটা ইংরেজি অনুবাদে, আধুনিক বাংলা কবিতার অনুবাদ সংকলন বার করেছিলেন তিনি। তার সম্পাদনা করেছেন বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়; ইংরেজিতে কবিতাগুলো অনুবাদ করে দিয়েছিলেন হয় কবিরা, নিজেরা অথবা ট্রান্সম্যান। জীবনানন্দ নিজে অনুবাদ করেন নি, তার কবিতা দেয়া হয়েছিল। জীবনানন্দ তাকে কবিতা বিষয়ে শুধু বলেছেন, আপনি আমার আগের যুগের কবিতাগুলো বাদ দিয়ে যেগুলোকে আমার প্রতিনিধিত্বমূলক মনে করি না, শেষের দিকের কবিতা নিন। ওরা সেটা নেয়নি। দেখবেন ওইগুলো (শেষের দিকের কবিতাগুলো) নাই। প্রভাকর সেনকে বলেছেন–আই আম মিস রিপ্রেজেনটেডে ইন দ্যাট ভলিউম।

রাজু আলাউদ্দিন : তার মানে তাঁর শেষপর্বের কবিতাকে উনি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন।
ভূমেন্দ্র গুহ : প্রথম দিকেরগুলোকে বলতেন, ওগুলো কাঁচা লেখা। এই বাংলাদেশে যে বই করতে যাচ্ছে, তাতে এই পরের কবিতাগুলো যোগ করা হয়েছে।

রাজু আলাউদ্দিন : আচ্ছা এই সূত্রে একটা কৌতুহল আমার, ভূমেন দা’ সেটা হলো, তাঁর যে বিখ্যাত বইটি এখন, যে বইটিকে এখন বাঙালির একধরনের আত্মপরিচয়ের মতো মনে করা হয়, (কী, কোনটি?–ভূমেন্দ্র গুহ), ওই যে‘রূপসী বাংলা’; আপনি যেহেতু বললেন উনার শেষপর্বে কবিতাকে উনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, তাহলে ‘রূপসী বাংলা’র এই কবিতাগুলো সম্পর্কে বা এই পর্ব সম্পর্কে উনি নিরব ছিলেন কেন? উনি কী বলেছেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : নিরবতা ছিল না তো! উনি বিরাট চিঠি লিখেছেন। খামে দু’টো চিঠি পাওয়া গিয়েছিলো। চিঠিদুটো হারিয়ে গেছে পরে।
রাহুল পুরকায়স্থ:‘রূপসী বাংলা’র নাম তো অন্য ছিল। ‘রূপসী বাংলা’ নাম দিয়ে কবিতার লিরিক পাল্টে দেয়া হয়েছিল।
ভূমেন্দ্র গুহ : নাম ছিল ওই তো ‘বাংলার ত্রস্ত্র…’
রাজু আলাউদ্দিন : ‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’। আমার কাছে তো এইটা সঠিক মনে হয়।
ভূমেন্দ্র গুহ : মূলসূত্র ‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’ যদি নাম পাওয়া যায়, তাহলে ইন্টাপ্রিটেশন হবে আলাদা। এতে বাংলা কবিতার ইতিহাস কিন্তু বিকৃত করা হল, জীবনানন্দের চেতনাকে বিনষ্ট করা হল। কারণ ওই নাম পড়ে কিন্তু পূর্বানুমান করি, নাম যদি ডিক্টেড করে কবিতার উপরে, এবং নামটা যেহেতু‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’ প্রস্তাবিত আকারে ছিল সেখানে জীবনানন্দ দাসের বইয়ের নাম যদি হয় ‘রূপসী বাংলা’, তাহলে পুরো অর্থটা চলে যাচ্ছে অন্যদিকে। (হ্যাঁ, হ্যাঁ। অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। প্রায় বিপরীত দিকে চলে যাওয়ার মতো।–রাজু আলাউদ্দিন)। চিনতে পারা গেল না। উপরে নাম যদি ‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’ হয় তাহলে মনে হয় অন্ধকারে দম বন্ধ হয়ে আসছে। তখন ‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি…’ আরো বেশি নিবিড় হচ্ছেন, আরো বেশি আঁকড়ে ধরছেন।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ। আমারও তাই মনে হয়।

ভূমেন্দ্র গুহ : স্যাড, ভ্যারি স্যাড। ‘রূপসী বাংলা’কে আপনি এতো বেশি সিরিয়াস ভাবে কী করে দেখবেন! রাহুল এই ব্যাপারে স্পেশালিস্ট। আপনি ডকুমেন্ট্রি হিসেবে ধরুন না, যে-বাংলা চলে গেছে তা আর মনে পড়বে না, তার ডকুমেন্ট্রি কী হবে? (আমারও তাই মনে হয়–রাজু আলাউদ্দিন)। এবং জীবনানন্দ ওই গ্রন্থ সম্বন্ধে একজনকে লিখেছিলেন, যেটা এডিট করেছিলাম আমি। জীবনানন্দ’র মৃত্যুর পর যতগুলো বই বেরিয়েছে আপ-টু ‘বেলা অবেলা কালবেলা’ সব আমি এডিট করেছি। বাইরে তখন ছিল না, আউটে কিছু ছিল না জিজ্ঞেস করার মতো। বইতে দেখবেন উৎসর্গ-এ লেখা ‘আবহমান বাংলা’, এটা তো আমার তৈরি নয়। জীবনানন্দের চিঠি ছিল, চিঠিতে লিখছেন–‘এক সময় আবেগ তাড়িতে হয়ে আবহমান বাংলার দিকে তাকিয়ে ছিলুম, বস্তুতপক্ষে সেই দাগটা আমাকে বন্দি করে ফেলেছিল।’ লক্ষ্য করবেন ‘রূপসী বাংলা’ লেখাটা এক মাসে লেখা, একটা পুরো কবিতার বই উইদিন ওয়ান মান্থ ওটা হয়ে গেছে।
রাহুল পুরকায়স্থ:রাজু আলাউদ্দিন : একটানে, এক আচ্ছন্নতা থেকে লেখা।
ভূমেন্দ্র গুহ : বলেছেন তো, আমাকে আক্রান্ত করে ফেলেছিল এবং আমি তার বন্দি হয়ে পড়েছিলাম। আমরা বলি না, জোর করে লিখিয়ে নিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন : তাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়ে গেছে আরকি।
ভূমেন্দ্র গুহ : কিন্তু ছাপান নি কেন? লেখা হয়ে যাওয়ার অনেক পরে, তিনি খুব খুঁতখুঁতে লোক ছিলেন তো, কবিতাগুলো এডিট করতে গিয়ে বারবার উল্টায়-পাল্টায়, এক শব্দের স্থলে আরেক শব্দ বসায়, করেন তো? চিঠিটা প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল ‘রূপসী বাংলা’র শেষে, নরেশ গুহ সেটাকে ফেলে দিয়েছেন। মাননীয় নরেশ গুহ ছিলেন সম্পাদক।
আমি পাণ্ডুলিপি করে দিয়েছিলাম তার, নামটা ছিলো–‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’।

রাজু আলাউদ্দিন : এই বইটার এইটা-ই তো নাম হওয়া উচিত।
ভূমেন্দ্র গুহ : সেটাকে ‘রূপসী বাংলা’ নাম করে দিয়েছিলেন ডি.কে। ডি.কে করে দিয়েছিলেন এটা।
রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডি.কে; দীলিপ কুমার।
রাহুল পুরকায়স্থ:ভূমেন্দ্র গুহ : হ্যাঁ। তা এবার আমি যখন করছি এই বইটা, আমার শখ হয়েছিল, আমি এমন নির্বাচক জানেন তো, নির্বাচিত বইয়ে পুরো ‘রূপসী বাংলা’ আছে। বাংলাদেশের সেন্টিমেন্ট ভেবে।

রাজু আলাউদ্দিন : তাতো বটেই।
ভূমেন্দ্র গুহ : একবার ভেবে ছিলাম ‘রূপসী বাংলা’র পাশে ব্র্যাকেটে ‘বাংলার ত্রস্ত্র নীলিমায়’ লিখে দেব কি না।

রাজু আলাউদ্দিন : আমার মনে হয় লিখে দেয়াটাই উচিত।
ভূমেন্দ্র গুহ : কিন্তু এটা ডকুমেন্ট্রি তো নয়। এটা ডকুমেন্টেড হবে, প্রিণ্টেড হয়ে আসবে। আপনি আসলে ভূমিকায় লিখতে পারেন; কিন্তু ওভাবে লিখতে পারেন না।

রাজু আলাউদ্দিন : কারণ ‘রূপসী বাংলা’ আসলে… আমার তো গ্রামের অভিজ্ঞতা কিছুটা অন্তত আছে, তাই বুঝি…
ভূমেন্দ্র গুহ : ওই বাংলা আমি দেখেছি, ওই বাংলার ছেলেবেলাও আমি দেখেছি। ( হ্যাঁ, আপনি দেখেছেন।–রাজু আলাউদ্দিন)। হাঁসের পায়ে ঘুঙুর বাঁধা আমি দেখেছি। আমাদের ছেলেবেলায় গ্রামে দেখছি সন্ধ্যা হলেই মা গিয়ে আয় আয় বলে ডাক দিত, আর সব হাঁস পুশকুনি থেকে উঠে এলো। (হ্যাঁ, হ্যাঁ, পুকুর থেকে সারিবদ্ধ ভাবে উঠে এসে, ঢুকে গেল খোঁয়ারে।–রাজু আলাউদ্দিন)। হ্যাঁ, খোয়ারে ঢুকে গেল।

রাজু আলাউদ্দিন : তারপর সারারাত শিশিরের শব্দে পাতা ঝড়ে–এইটা আপনার…
ভূমেন্দ্র গুহ : শিশির তো পড়েই না এখানে। শিশির দেখতে গেলে তো বরিশালে যেতে হবে।

রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ, ওই গ্রামে, বরিশাল, তারপর ফরিদপুর। আমার বাড়ি হচ্ছে শরিয়তপুর। (কোথায়?–ভূমেন্দ্র গুহ)। শরিয়তপুর, মানে বৃহত্তর ফরিদপুর।
ভূমেন্দ্র গুহ : বৃহত্তর ফরিদপুর। (মানচিত্রে) বরিশালের ঠিক উপরে। হ্যাঁ, বরিশাল একেবারে নীচে, তারপরে ফরিদপুর। তারপরে কুমিল্লা, ত্রিপুরা; তারপরে ঢাকা। এই তো ম্যাপটা! (জ্বী, হ্যাঁ!–রাজু আলাউদ্দিন)। আমার বারান্দায় তাকিয়ে দেখুন গিয়ে, দেখুন, দেয়ালে ঝোলানো আছে। তুইও গিয়ে দেখে আয় (রাহুলকে ইঙ্গিত করে)।
(আমি আর রাহুল পুরকায়স্থ তখন উঠে তার বারান্দায় গেলাম ম্যাপটা দেখার জন্য। তিনি ঘরে বসেই আমাদের ডিক্টেশন দিচ্ছিলেন একদম নির্ভুল ভাবে।)
ভূমেন্দ্র গুহ : দেয়ালটার ডান দিকে।
রাজু আলাউদ্দিন : এই তো, এই যে পিরোজপুর জেলা।
ভূমেন্দ্র গুহ : কী দেখছেন?
রাজু আলাউদ্দিন : এই যে ম্যাপ দেখা যাচ্ছে।
ভূমেন্দ্র গুহ : ম্যাপটা কোথাকার?
রাজু আলাউদ্দিন : ম্যাপটা পিরোজপুরের।
ভূমেন্দ্র গুহ : আমার ভারতবর্ষের একটা ম্যাপ খুঁজে বের করুন তো আমার বাড়িতে। আমরা বাড়িতে ভারতবর্ষের ম্যাপটা বের করুন তো একটা, কিংবা পশ্চিমবঙ্গের। পাবেন না। আমি বাংলাদেশের ম্যাপ ঝুলিয়ে রেখেছি। কেন জানেন? আসতে-যেতে হাত দিয়ে দেখি এইখানে গ্রামটা ছিল, এইখানে নদী ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন : একটা কথা জিজ্ঞেস করি ভূমেন দা’–এগুলো চটুল প্রশ্ন–সেটা হলো, জীবনানন্দ দাশের পাঁচটা কবিতা যদি বলা হয়, কোন পাঁচটি কবিতা আপনার পছন্দ।
ভূমেন্দ্র গুহ : এভাবে বলা যাবে না।
রাজু আলাউদ্দিন : দশটা?
ভূমেন্দ্র গুহ : দশটা, পঁচিশটা, একশটা না, হাজারটাও না। জীবনানন্দ’র কবিতা সব একটা কম্পোজিট স্ট্রাকচার, সৌধ। আপনি হয়তো বলবেন–কবিতা কেন বাছবেন? কোন কবিতা বাছবেন? কোন ঘরের কোণা, কোন জানালাটা ভাল, কোন দরজাটা ভাল। বরঞ্চ যেসব কবিদের মধ্যে এই কম্পোজিট নেই, যারা খুচরো খুচরো কবিতা লিখলো, তাদের ক্ষেত্রে হতে পারে সেই রকম বাছাই। আজকে একটা মেয়েকে নিয়ে লিখলাম, কালকে ওখানে বেড়াতে গিয়ে লিখলাম, পরশুদিন ওখানে তেভাগা আন্দোলন হয়েছে তা নিয়ে লিখলাম, তশ্যুদিন সেখানে রামেশ্বর মারা গেল তাকে নিয়ে লিখলাম। এই কবিতাগুলো খুচরো খুচরো করে বলা যায় ক’টা ভাল কবিতা।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু জীবনানন্দ দাশের মতো কবিদের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায় না?
ভূমেন্দ্র গুহ : কম্পোজিট তো! এ ক্ষেত্রে বাছাইও অসম্পূর্ণ। এই যে বাছাই করেছি, তা সম্পূর্ণ, কোনো দাম নেই, কিচ্ছু নেই। আমার পছন্দ মতো বাছাই করেছি, অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে।

রাজু আলাউদ্দিন : সেই পছন্দের জায়গা থেকে আপনার পছন্দ তো…
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি করেছি কেন? একটা বই করতে হবে বলে। তাছাড়া তো উপায় নেই।

রাজু আলাউদ্দিন : কিন্তু আপনাকে যদি এ রকম সাক্ষাৎকারে বলতে বাধ্য করা হয় তাহলে আপনি কোন পাঁচটি কবিতার কথা বলবেন?
ভূমেন্দ্র গুহ : যেগুলো বলবো সেগুলোও শুনবে না।

রাজু আলাউদ্দিন : একটু শুনি না আপনার কাছ থেকে।
ভূমেন্দ্র গুহ : দেখ তো! শুনতে হয় ক্যাসেটটা চালিয়ে দেই আপনি শুনুন। তারপর আপনিই বলবেন কোনগুলো ভাল।(বলতে বলতে তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতার আবৃত্তির একটা সিডি চালু করলেন।)। দরকার হলে রাহুলকে বলুন। ও আবার মাস্টার। আপনাকে কয়েকটা কবিতা কপি করে দেব। আপনি পড়ে নিবেন।
কবিতা শোনা যায় না, কবিতা পড়তে হয়। রাহুল ভাল কবিতা লিখেন, সে যেসব কবিতা আবৃত্তি করে, তখন তা শোনা যায়। রাহুল নিজেও আবৃত্তি করে।
রাহুল পুরকায়স্থ: আবৃত্তি করি! কে বললো?

ভূমেন্দ্র গুহ : রাহুলকে নিয়ে বিশেষ সভা হয় একটা।
রাহুল পুরকায়স্থ: আবৃত্তি করি কে বললো?
ভূমেন্দ্র গুহ: জীবনানন্দ সভা ঘরে সভা হয়েছে, সেখানে আবৃত্তি করেছে সে নিজে।
রাহুল পুরকায়স্থ: আবৃত্তি নয় তো! (লাজুক ভঙ্গিতে অস্বীকার করতে করতে)
ভূমেন্দ্র গুহ : বুঝেছেন? রাহুলকে নিয়ে কি একটা বিশেষ সভা হয়েছিল জীবনানন্দ সভা ঘরে।
রাহুল পুরকায়স্থ: ভূমেন দা’ সেখানে যায় নি।(অনুযোগের সুরে)
ভূমেন্দ্র গুহ : আমি যাইনি। এই জন্যেই যাইনি, রাহুল পুরকায়স্থ সভায় গিয়ে বসে আছে, তাকে নিয়ে সভা হচ্ছে রাহুল গোঁ ধরে বসে আছে, গলায় অজরঙ্গের মালা পড়ে, (না, না, গলায় কোনো মালা নেই–রহুল)। ওফ্ফফ! এ দৃশ্য আমি দেখতে পারবো না।
রাহুল পুরকায়স্থ: মালা নেই, মালা নেই, গলায় কোনো মালা ছিল না। (দুই হাত নেড়ে রাহুল বারবার অস্বীকার করতে চাইছিল।)
ভূমেন্দ্র গুহ : রাহুলকে যদি দেখি হাতে একটি গ্লাস আছে, তাহলে বুঝতাম এই হলো রাহুল।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে
শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (2) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Dr.j.bhsttacharjee — আগস্ট ১১, ২০১৮ @ ৪:০৭ অপরাহ্ন

      ভুমেন্দ্র গুহের সাক্ষাৎকার ও তার ভেতর দিয়ে ভুমেন্দ্র গুহের অনেক চিত্র ফুটে উঠেছে। জীবনানন্দের কত অজানা কথাও জানা গেল। রাজু ভাই (সব্বাই ওই নামেই ডাকে), খুবিই ভালো লাগলো। প্রবাসে কবিতা পাঠ ভালোই চলছে, তবে ভিডিও টার আওয়াজ কম। ভালো থাকুন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন dilruba shahana — আগস্ট ১৪, ২০১৮ @ ৭:১৬ অপরাহ্ন

      ‘বাংলার ত্রস্ত নীলিমা’! বিস্ময়ে অভিভূত। জীবনানন্দকে বুঝতে আরও আরও কত দিন…
      ধন্যবাদ রা. আ. ও আর্টস বিডিনিউজকে
      দিলরুবা শাহানা
      ১৪.৮.২০১৮

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com