অনুবাদ গল্প

জোমো কেনিয়াটার গল্প: জঙ্গলের ভদ্রলোকেরা

নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান | 8 Aug , 2018  

অনুবাদ: নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান

কেনিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জোমো কেনিয়াটাকে (১৮৯৭ – ১৯৭৮) বলা হয় স্বাধীন কেনিয়ার জাতির জনক। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে কেনিয়ায় স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়। ইংরেজ মিশনারিদের তত্ত্বাবধানে কৈশোরে তাঁর ইংরেজি শিক্ষার হাতেখড়ি। বর্ণাঢ্য জীবনে কখনো ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, কখনো কৃষি-সরঞ্জাম বিক্রেতা, কখনো স্কুলশিক্ষক আবার কখনো বা পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৩১ সালে পাড়ি জমান যুক্তরাজ্যে। দীর্ঘ ১৫ বছরের এই প্রবাসজীবনে তাঁর যোগাযোগ ঘটে অসংখ্য বরেণ্য ব্যক্তিত্বের সাথে। ১৯৩৫-৩৭ সালে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ধ্বণিবিদ্যা বিভাগে ধ্বণিতাত্ত্বিক তথ্যদাতা হিসাবে কাজ করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও ধ্বণিতত্ত্বে সংক্ষিপ্ত শিক্ষালাভ শেষে তিনি সামাজিক নৃতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা আরম্ভ করেন লন্ডন স্কুল অভ ইকোনমিক্সে। অধ্যয়নকালে তাঁর রচিত সামাজিক নৃতত্ত্ব বিষয়ক ইংরেজি নিবন্ধসমূহ ফেসিং মাউন্ট কেনিয়া নামের বই আকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে। “জেন্টলম্যান অফ দ্য জাঙ্গল” শিরোনামের গল্পটিও একই বইয়ের অন্তর্ভুক্ত। উপকথার আদলে লেখা এই গল্পের মাধ্যমে আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসকের শোষণ এবং শোষিত জনতার ‘সম্ভাব্য’ প্রতিবাদের প্রতিকী বর্ণনা দিয়েছেন তিনি।

অনেক অনেক দিন আগে এক হাতির সাথে এক মানুষের বন্ধুত্ব হয়েছিল। জঙ্গলের ধারে লোকটার ছোট্ট কুটির। একদিন প্রচ- ঝড়বৃষ্টি শুরু হলে হাতি তার বন্ধুর কাছে গিয়ে বলে, “মানুষ ভাই, দেখেছ কেমন মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। তুমি কি দয়া করে তোমার কুটিরে আমার শুঁড়টা একটু রাখতে দেবে?” বন্ধুর এহেন অবস্থা দেখে লোকটা জবাব দেয়, “আমার কুটির যে বড্ড ছোট, হাতি ভাই। আমার নিজের থাকার জায়গাটুকু বাদ দিলে, এখানে কেবল তোমার শুঁড়টা কোন মতে ধরবে। খুব সাবধানে তোমার শুঁড় ভেতরে ঢোকাও, কেমন।” হাতি তার বন্ধুকে ধন্যবাদ দিয়ে বলে, “বড় উপকার করলে তুমি। একদিন তোমাকে অবশ্যই এর প্রতিদান দেব।” কিন্তু কুটিরের ভেতর শুঁড় ঢোকানোর পর হাতি আস্তে আস্তে নিজের মাথাও ভেতরে পুরে দেয়। এভাবে ঠেলতে ঠেলতে শেষমেষ সে লোকটাকে কুটিরের একেবারে বাইরে, ঝড়বৃষ্টির মাঝে ছুঁড়ে ফেলে। এরপর আরাম করে শুয়ে পড়তে পড়তে বলে, “বন্ধু, তোমার চামড়া তো আমার চেয়ে বেশী শক্ত। এখানে যখন আমাদের দু’জনের থাকার জায়গা হচ্ছে না, তুমি না হয় বৃষ্টিতেই থাকো। আমি বরং আমার নরম চামড়া এই শিলাবৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাই।”

বন্ধুর এহেন কীর্তি দেখে লোকটা রাগে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে। হৈচৈ শুনে জঙ্গলের জীব-জন্তুরা বেরিয়ে আসে। সবাই ঘিরে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে মানুষের সাথে তার হাতি বন্ধুর বাক-বিতন্ডা। ঝগড়া-ঝাঁটির এক পর্যায়ে সিংহ তেড়ে এসে হুঙ্কার দিয়ে বলে, “আমি যে বনের রাজা, তা কি সবাই ভুলে গেছে? কার এত বড় স্পর্ধা যে আমার রাজ্যের শান্তি বিঘ্নিত করে?” হাতি আবার অরণ্যরাজ্যের একজন উচ্চপদস্থ মন্ত্রী। সিংহের কথা শুনে সে মোলায়েম সুরে জবাব দেয়, “মহারাজ, আপনার রাজ্যের শান্তিতে কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। এই যে ছোট্ট কুটিরে মহারাজ আমাকে দেখছেন, তারই দখল নিয়ে আমার এই বন্ধুর সাথে একটু আলোচনা করছি মাত্র।” সিংহরাজ যে কোন মূল্যে তার রাজ্যে শান্তি চায়। সে তখন উদাত্ত কন্ঠে ঘোষণা দেয়, “আমি এই মূহুর্তে আমার মন্ত্রীদের নির্দেশ দিচ্ছি, তারা যেন ঘটনা খতিয়ে দেখার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করে এবং তদন্ত শেষে যথাযথ প্রতিবেদন পেশ করে।” তারপর সে লোকটাকে বলে, “হাতি আমার রাজ্যের একজন বিশিষ্ট মন্ত্রী। তুমি আমার জনগণের সাথে, বিশেষ করে হাতির সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে খুবই ভাল কাজ করেছ। আর মাথা গরম করো না। তোমার কুটির কেউ কেড়ে নেয়নি। অপেক্ষা করো। আমার রাজসভার অধিবেশন বসলে তোমাকে কথা বলার সুযোগ দেয়া হবে। আমি নিশ্চিত যে তদন্তের ফলাফলে তুমি সন্তুষ্টই হবে।” অরণ্যরাজের মিষ্টি কথায় আশ্বস্ত হয়ে লোকটা সরলমনে অপেক্ষা করতে থাকে। তার বিশ্বাস, তার কুটির সে অবশ্যই ফিরে পাবে।
রাজার হুকুম পেয়ে হাতি অন্যান্য মন্ত্রীদের সাথে নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জঙ্গলের কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ডেকে এনে তদন্ত কমিটির সদস্য করা হয়। সদস্যবৃন্দ যথাক্রমে: (১) জনাব গণ্ডার, (২) জনাব মহিষ; (৩) জনাব কুমির; (৪) সভাপতি পদে মহামান্য শিয়াল; এবং (৫) সাধারণ সম্পাদক পদে জনাব চিতা । সদস্যের এহেন তালিকা দেখে লোকটা প্রতিবাদ করে। সে বলে যে তার পক্ষ থেকে অন্তত একজন সদস্যকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ। কিন্তু তাকে বলা হয় যে তা অসম্ভব। কারণ তার কোন জাত-ভাইয়েরই অরণ্য-আইনের মারপ্যাঁচ বোঝার মতো যথেষ্ট শিক্ষা-দীক্ষা নেই। তাছাড়া, ভয় কী? কমিটির সকল সদস্যই ন্যায়বিচার ও নিরপেক্ষতার জন্য স্বনামধন্য। আর ঈশ্বরই এই ভদ্রলোকদের সমাজপতির মর্যাদা দান করেছেন যাতে তারা দাঁত-নখহীন নিরীহ মানবজাতির সুযোগ-সুবিধার দিকে নজর রাখতে পারে। লোকটাকে জানানো হয় যে সর্বোচ্চ সতর্কতায় তদন্ত শেষে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রতিবেদন পেশ করা হবে। অতএব, সে একদম নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
এরপর সাক্ষ্য-প্রমাণ গ্রহণের জন্য কমিটির বৈঠক বসে। প্রথমেই জনাব হাতিকে তলব করা হয়। বৌয়ের দেয়া একটা চারাগাছ দিয়ে দাঁতন করতে করতে বনেদি ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে হাতি। তারপর ভারিক্কী গলায় বক্তব্য পেশ করে, “উপস্থিত অরণ্যের ভদ্রমহোদয়গণ, যে ঘটনা ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছেন, তা আরেকবার বলে আপনাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি সবসময়ই আমার বন্ধুদের স্বার্থরক্ষাকে নিজের দায়িত্ব বলে মনে করে এসেছি। হয়তো এ কারণেই আমার আর আমার এই মানুষ বন্ধুর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। সে আমাকে ডেকেছিল তার কুটিরকে ঘূর্ণিঝড়ে উড়ে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে। কুটিরের ভেতরে অব্যবহৃত যায়গা থাকায় ঘূর্ণিঝড় ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। আমার মনে হয়েছিল যে এমন অনুন্নত জায়গার সুষ্ঠু ব্যবহার প্রয়োজন। তাই আমি নিজেই সেই খালি জায়গায় বসে আমার বন্ধুর স্বার্থে কাজ করেছি। এমন পরিস্থিতিতে পড়লে আপনারা যে কেউ এভাবেই নিজের কর্তব্য পালন করতেন।”
জনাব হাতির এই অকাট্য যুক্তি শুনে কমিটির সদস্যরা জনাব হায়েনা এবং জঙ্গলের অন্যান্য মুরুব্বিদের মতামত জানতে চায়। সবাই একবাক্যে হাতির বক্তব্যকে সমর্থন করে। তারপর লোকটাকে তলব করা হলে সে তার বয়ান শুরু করে। কিন্তু কমিটির সদস্যরা তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলে, “জনাব মানুষ, দয়া করে আপনার বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক দিকে টেনে নিয়ে যাবেন না। আমরা বিভিন্ন নিরপেক্ষ সূত্র থেকে এরই মধ্যে ঘটনার বিবরণ জানতে পেরেছি। আপনার কাছে আমাদের একটাই প্রশ্ন, জনাব হাতির দখলের আগে আপনার কুটিরের পতিত অংশ কি অন্য কারো দখলে ছিল?” লোকটা বলতে শুরু করে, “না, কিন্তু ” এমন সময় কমিটি ঘোষণা দেয় যে উভয় পক্ষের সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহণ শেষ। এবার সিদ্ধান্তের জন্য কমিটির একান্ত বৈঠক বসবে। জনাব হাতির সৌজন্যে বিশাল ভুরিভোজ শেষে তারা তদন্তের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর লোকটাকে ডেকে এনে রায় ঘোষণা করে। “জনাব মানুষ, আমাদের অভিমত এই যে, আপনার সঙ্কীর্ণ মন-মানসিকতার জন্যই এই দুঃখজনক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে। এর থেকেই বিরোধের সূত্রপাত। আমরা মনে করি, আপনার স্বার্থরক্ষা করে জনাব হাতি তাঁর পবিত্র কর্তব্য পালন করেছেন। এটা পরিষ্কার যে, আপনার ভালোর জন্যই এই জায়গার সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা দরকার। আর যেহেতু এ জায়গা পুরোপুরি ভোগ করার মতো যোগ্যতা আপনার এখনো হয়নি, তাই আমরা মনে করি যে উভয়পক্ষের সুবিধা বজায় রেখে মিমাংসায় আসা উচিৎ। আপনার কুটিরে জনাব হাতির অবস্থান বহাল থাকবে। আর আপনার থাকার উপযোগী কুটির তৈরির জন্য আরেকটা জমি খোঁজার অনুমতি আপনাকে দেয়া হল। আমরা সবাই আপনার সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়ে লক্ষ্য রাখব।”
লোকটার রাজি হওয়া ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। রায় না মানলে কমিটির দাঁত-নখওয়ালা সদস্যদের রোষানলে পড়তে হবে তাকে। তাই সে মেনে নেয় তাদের কথা। কিন্তু আরেকটা কুটির তৈরি হতে না হতেই জনাব গন্ডার এসে হাজির। সে তার শিং বাগিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে সেখানে। ভেতরে ঢুকেই লোকটাকে হুকুম করে কুটির ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। ঘটনার তদন্তের জন্য আবার একটা কমিটি গঠন করা হয়। আবারো সেই আগের মতোই রায়। বারবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। আর এভাবেই একে একে জনাব মহিষ, জনাব চিতা, জনাব হায়েনাসহ বাকি সবার জন্য নতুন নতুন কুটিরের বন্দোবস্ত হয়ে যায়। লোকটা ভেবে দেখে যে তদন্ত কমিটি আসলে তার কোন কাজেই আসেনি। তাই, এদের হাত থেকে বাঁচার জন্য তার নিজেকেই এবার একটা জুৎসই উপায় বের করতে হবে। ভাবতে বসে সে আপনমনে বলে ওঠে, “দুনিয়াতে কেউই ফাটকের ঊর্দ্ধে নয়।” অর্থাৎ, কেউ দু’চার দিনের জন্য লোক ঠকিয়ে পার পেলেও একদিন না একদিন তাকে ঠিকই ধরা পড়তে হয়।
জঙ্গলের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের দখল করা কুটিরগুলো যখন একসময় জরাজীর্ণ হয়ে ভাঙতে বসেছে, তখন এক ভোরে লোকটা কাছে-পিঠেই আরো বড় আর ভাল দেখে একটা কুটির তৈরি করে। নতুন কুটির দেখামাত্র জনাব গন্ডার এক দৌড়ে ছুটে যায় সেখানে। গিয়ে দেখে জনাব হাতি তার আগেই কুটিরে ঢুকে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে। এরপর জনাব চিতার আগমন। এসেই এক লাফে জানালা গলে সোজা ভেতরে। অরণ্যরাজ সিংহ, মহামান্য শেয়াল আর জনাব মহিষ অবশ্য দরজা ঠেলেই কুটিরে পা রাখে। জনাব কুমির কুটিরের চালে শুয়ে আরাম করে রোদ পোহাতে থাকে। এদিকে, জনাব হায়েনা গলা ছেড়ে হাঁক-ডাক জুড়ে দেয় কুটিরের ছায়ায় একটুখানি জায়গার আশায়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি জটিল হতে থাকে। দখল নিয়ে তর্ক-বিতর্কের এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে মারামারি শুরু হয়। সবাই যখন লড়াইয়ে ব্যস্ত, ঠিক তখনই লোকটা তার কুটিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে কুটিরসমেৎ জঙ্গলের নেতারা সব জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আর লোকটা তার জন্মভিটার পথে যেতে যেতে বলে ওঠে, “শান্তি পেতে বেজায় মাশুল, পেলে বটে পয়সা উসুল”। এরপর থেকে পরম সুখে শান্তিতেই তার দিন কাটতে থাকে।

Flag Counter


1 Response

  1. Saifullah says:

    বাহ দারুণ গল্প তো। সুন্দর অনুবাদ করেছেন।
    অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.