বইয়ের আলোচনা

সুদূরে দিগন্ত : বাঙালি নারী-জীবনের নিপুণ বয়ান

মোহাম্মদ শেখ সাদী | 24 Jul , 2018  

এক
‘সুদূরে দিগন্ত’ ঐতিহাসিক ও সমাজতাত্ত্বিক বীক্ষার আলোকে রচিত চারশত পৃষ্ঠার একটি উপন্যাস । ২০১৮ সালের একুশে বইমেলায় ‘দেশ পাবলিকেশন্স’ থেকে গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়। উপন্যাসটি মেহেরুন্নেছা রোজীর প্রথম সৃজনশীল কর্মপ্রয়াস হলেও এর আঙ্গিক-গঠন, প্লট-কাহিনি নির্মাণ, ভাষা ও পরিবেশ রচনা, চরিত্র-সৃজন দক্ষতা ও সংলাপ-বয়নের অপূর্ব নিপুণতা সহজেই সকল দুর্বলতা ও আড়ষ্টতাকে ছাপিয়ে গেছে। বোঝা যায়, সুদীর্ঘ পাঠ-পরিক্রমাকে আত্মস্থ করে, বাঙালির বহুকালের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার নিবিড় পাঠ এবং অনুধাবনের মধ্য দিয়েই নিজের অভিজ্ঞতাকে শাণিত করে নিয়েছেন লেখক। এছাড়া লেখকের আত্মজৈবনিক জীবনবীক্ষাও চমৎকারভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে উপন্যাসটির শৈল্পিক নির্মিতিতে।

দুই
‘সুদূরে দিগন্ত’বাঙালি নারী জীবনের পূর্ণাঙ্গ বয়ান- একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। ভারতবর্ষীয় বাঙালি সমাজ-জীবনে নারীর সার্বিক অবস্থান, দেশ-কাল- সমাজ-রাষ্ট্রের পরিবর্তন-বিবর্তনের ধারায় নারী-জীবনের সমাজ-ইতিহাস অনুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে উপন্যাসটিতে। মধ্যযুগের সমাজব্যবস্থায় নারীর অবনমনের কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু সমাজ-ইতিহাসের ক্রমবিকাশের ধারায় অধুনা বিশ্বে নারীর অবস্থান কোথায়? এমনকি আজকের এই একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়েও বাঙালি নারী-জীবন কতটুকু মুক্তি ত্বরান্বিত হয়েছে? – সম্ভবত এই মৌলিক প্রশ্নটির যুক্তি-গ্রাহ্য উত্তর খুঁজে পাবার শৈল্পিক ও সংবেদনশীল অনুসন্ধান রয়েছে ‘সুদূরে দিগন্ত’ গ্রন্থটিতে। নারীও যে আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন সম-তাৎপর্যে উদ্ভাসিত মানুষ- আমাদের সমাজব্যবস্থায় এই প্রত্যাশিত জীবনদৃষ্টি নেই বলেই কখনও নারী-জীবনের সার্বিক মুক্তি ও বিকাশ সম্ভব হয়নি। ঔপন্যাসিক মেহেরুন্নেছা রোজী বাঙালি নারী-জীবনকে ঊনিশ শতকের সূচনালগ্ন থেকে সাম্প্রতিককাল সীমায় স্থাপন করে প্রায় দু’শো বছরের সমাজ-ইতিহাসের নিরিখে নারীর সামূহিক অবস্থানকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছেন। ইউরোপে শিল্প-বিপ্লবের কিছুটা সময় অতিবাহিত হলে ভারতবর্ষেও রেনেসাঁসের হাওয়া বইতে লাগলো। এই নবজাগরণ কলকাতা-কেন্দ্রিক সমাজে বেশ ভালোভাবেই সূচিত হয়েছিল। প্রায় দু’শো বছরের ইংরেজ আমলের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শাসন-শোষণের কথা সকলেরই জানা। তবে ইংরেজ শাসন কিছুটা হলেও আশীর্বাদ বয়ে এনেছিল বাঙালি জীবনে।

এদেশে শিক্ষার প্রসার ইংরেজদের স্পর্শেই সম্ভব হয়েছিল। নারী শিক্ষা-বিস্তারে কোনো কোনো ইংরেজ ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কাজ করেছেন। তবুও সেই সময়ে বাঙালি নারীদের শিক্ষাগ্রহণ কুসংস্কারের বেড়াজাল ডিঙাতে পারেনি। হিন্দু সমাজে একদিকে প্রগতিপন্থী মানবহিতৈষীরা, অন্যদিকে রক্ষণশীল গোঁড়া হিন্দুত্ববাদীরা; এ দুয়ের বিবদমান যুদ্ধংদেহী মনোভাবের ভেতর দিয়ে লেখক নারী জীবনকে চিত্রিত করেছেন আলোচ্য গ্রন্থে। সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক নানা মতবাদ, আন্দোলন-সংগ্রাম ও প্রথা-কুপ্রথার ভেতর দিয়ে নারী জীবনের অসহায়তা, হতাশা-বঞ্চনা, ক্ষোভ, ক্লেদাক্ততা সর্বোপরি অবর্ণনীয় এবং অন্তহীন দুর্ভোগ বস্তুনিষ্ঠ অথচ আবেগঘন সংবেদনশীলতায় ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে। ঊনিশ শতকে নব-উদ্ভূত ধনিক শ্রেণির বেপরোয়া ও উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন কিংবা তথাকথিত ‘বাবু কালচার’ এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে ‘বাঈজি কালচার’; এই কালচারকে আশ্রয় করে বিভিন্ন ঘরানার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মজলিশি চিত্র ও কুশীলবদের কথা, নারীর বহুবর্ণিল চিত্র বহুকৌণিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপায়িত হয়েছে এই উপন্যাসে। ‘সতীদাহ প্রথা’র সমাজ-ইতিহাস, বহুবিবাহ, বিধবা-বিবাহের আর্থ-সামাজিক কারণ; পুরুষতন্ত্র, গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার প্রেক্ষাপটে বাঙালি নারী-জীবনের সামূহিক বিপর্যয় ও অমানবিক অসহায়তাকে বিভিন্ন নারী-চরিত্রের মাধ্যমে সুনিপুণভাবে চিত্রিত করেছেন ঔপন্যাসিক। বুড়ি বা অরন্ধতীর দৃষ্টিতেই উপন্যাসে পুরো দুশো বছরের বাঙালি সমাজের সামূহিক পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং এর কাহিনি বিবৃত হয়েছে। ইংরেজ শাসনামলের পটভূমিকায় এদেশে স্বদেশী আন্দোলন, সিপাহী বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প, ব্রাহ্মসমাজ গঠন, নারীশিক্ষা, দেশভাগ, এমনকি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও উদ্বাস্তু জীবন-সংকটও উঠে এসেছে বিচিত্রভাবে। বিশাল কলেবরের এই উপন্যাসে কাহিনি বিন্যাসে স্থান, কাল, পাত্রের অভ্রান্ত এবং সুচারু সন্নিবেশ রীতিমতো বিস্ময়ের উদ্রেক করে।

তিন
উপন্যাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ নারী চরিত্র দুটো: বুড়ি বা অরন্ধতী এবং হরিদাসী বা আসিরন। হরিদাসীকে কেন্দ্রে স্থাপন করেই উপন্যাসের প্লট নির্মিত হয়েছে সন্দেহ নেই। তবে বুড়ির অবজারবেশন এবং পরবর্তীকালে অরন্ধতীর সম্প্রসারিত জীবনভাষ্য বুড়িকেও কেন্দ্রীয় চরিত্রের মর্যাদায় উত্তীর্ণ করে অনায়াসে। ঊনিশ শতকের বিপন্ন বাঙালি নারী জীবনের মূর্তিমান প্রতিনিধি হরিদাসী। উন্মূল, অসহায়, বিধবা জীবনের করুণ কাহিনী বিধৃত হয়েছে হরিদাসী চরিত্রের সূত্র ধরে। হরিদাসীর বাবা বনমালী বারুই উদার, মানবতাবাদী মানুষ। স্বভাবে বৈরাগ্য এবং উদাসীনতা থাকায় কৈশোরেই নিরুদ্দেশ হয়েছিল সে। এই নিরুদ্দেশ অভিযাত্রায় বনমালীর দেখা হয় স্বদেশী আন্দোলনের ফেরারী আসামী, তেজোদীপ্ত বিপ্লবী যুবক, বহুবিদ্যায় পারদর্শী তরুণপ্রাণ ধীমান ভঞ্জের সাথে। বনমালী ধীমান ভঞ্জের বহুমুখি বিদ্যা-বুদ্ধিতে মুগ্ধ হয়ে তাকে গুরু হিসেবে গ্রহণ করে। ধীমান ভঞ্জের কাছ থেকে চিকিৎসা বিদ্যাও শিখে নেয়। নিবেদিত-প্রাণ ধীমান ভঞ্জ আর্ত-পীড়িত মানুষের সেবা করতে করতেই নিজেকে উৎসর্গ করেন। অত্যন্ত অল্পকালের জন্য তাকে দেখা গেলেও উপন্যাসে তার প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং তার চরিত্র-মাধুর্য চরিত্র-সৃজন কুশলতাকে অনন্যতা দান করেছে। গুরু ধীমান ভঞ্জ মারা গেলে তীর্থে-তীর্থে ঘুরে বেড়ানোকেই বেছে নেন বোহেমিয়ান বনমালী বারুই। নিষ্ঠাবান সম্ভ্রান্ত হিন্দু কৈলাসবাবু তীর্থ-ভ্রমণে এলে বনমালীর সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ঘটনাচক্রে লগ্নভষ্ট্রা কন্যাকে বিবাহ করেন। এ সময়কার পল্লী সমাজে বান্তবানুগ ঘটনা-প্রবাহ, নাটকীয়তা, পারিবারিক কলহ, হিন্দুধর্ম ও ব্রাহ্মধর্ম সংস্কারের মধ্যকার বিরোধাভাস চমৎকার ভাবে এঁকেছেন ঔপন্যাসিক। উদারনৈতিক জীবনদৃষ্টি, প্রথামুক্ত মানবতাবাদী মানুষ বনমালী মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করার ব্রতে কবিরাজী শুরু করেন এবং গ্রামে স্বোপার্জিত অর্থে শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। স্ত্রী-শিক্ষা যদিও সমাজের অনুমোদন লাভ করেনি। এক দুর্যোগঘন রাত্রে জনৈক জমিদারের পুত্রকে চিকিৎসা সেবা দিতে যান তিনি। সেই রাতেই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে তার স্ত্রী মারা যায়। বনমালী আর নতুন বৌয়ের সেই দুর্ভাগা সন্তানই হলো – হরিদাসী। প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে মাতৃহারা হরিদাসীকে বনমালী শ্বশুরালয়ে রেখে আসেন। এবং নিজ হাতে গড়া বিদ্যাপীঠে মনোনিবেশ করেন। বছর দশেক পরে তার ঐকান্তকি প্রচেষ্টায় নারী শিক্ষার দ্বার খুলে যায় তারই বিদ্যাপীঠে। এবার তিনি নিজের কন্যাকে বিদ্যাশিক্ষার জন্য ফিরিয়ে আনতে গিয়ে দেখেন কন্যার বিবাহ ঠিক হয়ে গেছে। শতচেষ্টাতেও বনমালী হরিদাসীর বিবাহ আটকাতে পারেন না। হরিদাসী ছোটবাবুর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসাবে দাম্পত্যজীবনে প্রবেশ করে যেখানে সে একটি মুহূর্তের জন্যও স্ত্রীর মর্যাদা পায়নি। এই সম্পর্কহীন সম্পর্কে হরিদাসী বারংবার দ্রোহী হয়ে উঠেছে। তবুও সে বারবার ছোটবাবুর সাক্ষাত পেতে চেয়েছে। কারণ সবাই জানে তার জ্যাঠাতো দিদি ভূতি নদীর জলে ডুবে মরেছে। কিন্তু সে জানে ভূতিদি কলকাতায় হারিয়ে গিয়েছে। সে ছোটবাবুর কাছে সাহায্য পেতে চেয়েছে এবং বারংবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। তারপর একদিন উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপনে অভ্যস্ত অসংযমী , লোলুপ স্বামী কলকাতায় বাঈজিদের মহলে নির্মমভাবে আহত হয়ে মারা গেলে বিধবা হরিদাসী পিতৃগৃহে ফিরে আসে। নঃিসঙ্গ জীবনাচার, কন্যার অকাল বৈধব্য ইত্যাদি নানাকারণে পীড়িত বনমালীর সুস্থতার জন্য হরিদাসী বাবাকে নিয়ে র্তীথে চলল। র্তীথে যাবার পথে ঘটে যায় কাহিনীর নাটকীয়তা। সে রেলস্টেশনে দেখা পায় ভূতিদির। হরিদাসী জেনে যায়, যে ভূতিদিকে হরিদাসী নিরন্তর খুঁজে চলেছে সেই ভূতিদি আর কেউ নয়, ঝুমুর বাঈ। ছোটবাবুর কাছে হরিদাসী একটি দিনের জন্যও স্ত্রীর মর্যাদা পায়নি সেই ছোটবাবুর নিয়মনিষ্ঠ বিধবা হয়ে জীবন কাটাতে হরিদাসী এতটুকু পেছপা হয়নি। কিন্তু যখন সে জানতে পারে তারই দিদি ভূতির প্রতি ছোটবাবুর আসক্তির কথা এবং ছোটবাবুর কারণেই তারই দিদির জীবন কতটা কণ্টকাকীর্ণ হয়ে উঠেছিল, তখন সে এই জীবন এই সমাজ সর্বোপরি তার এই বৈধব্যবেশের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে। তীর্থে থাকাকালে বনমালীর মৃত্যু হলে সে নিজ গাঁয়ে না ফিরে আশ্রয়ের খোঁজে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে মুসলমান অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের যশোর অঞ্চলের দিকে গন্তব্যহীন যাত্রা করে। তারা লোকমুখে শুনেছে পূর্ববঙ্গের মানুষ এবং সমাজ-ব্যাবস্থা তাদের সমাজ থেকে উদার। ঘটনাক্রমে বুড়ির নানা ফকিরচাঁদের আশ্রয় লাভ করে হরিদাসী ও রামু। লোকগঞ্জনা ও সমাজের প্রতিকূলতাকে কাটাতে ফকিরচাঁদ হরিদাসীকে কন্যারূপে গ্রহণ করলেন। হরিদাসী জীবনের জন্য, বেঁচে থাকার লড়াইয়ে টিকে থাকবার জন্য অতি সহজে ধর্মান্তরিত হলেন। নিজের নাম পাল্টে আসিরণ নামটিকে গ্রহণ করলেন! ফকিরচাঁদের সংসার এবং তার সন্তানদের জন্যই নিজেকে প্রণিপাত করলেন। জীবনে কেবল বেঁচে থাকার কাছে সমর্পিত হলো একজন নারী হরিদাসীর জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা। হরিদাসী চরিত্রে প্রখরতেজা মনোভাবটি আমরা দেখেছি। তার দ্রোহী চৈতন্যটি চকিতে উঁকি দিয়েছিল উচ্ছৃঙ্খল, বেপরোয়া স্বামীর বিপরীতে। কিন্তু সেই দ্রোহ, সেই অমিত সম্ভাবনা সমাজ, সংস্কার, প্রথার বেড়াজাল ডিঙিয়ে বিকশিত হবার পথ পেল না। তবে হরিদাসীর এই দ্রোহী ভাবনার রূপায়ণ দেখি আরেকটি নারী চরিত্রে। সেটি হলো – হরিদাসীর ভূতিদি। সে সুন্দরী, অসম্ভব যৌবনবতী। নারী জীবনের সমস্ত অপ্রাপ্তি, অপূর্ণতার বিরুদ্ধে সে সোচ্চার এবং প্রতিবাদী। উপন্যাসের সবচেয়ে জীবন্ত চরিত্র ভূতিদি। স্বাধীন ইচ্ছা ও স্বভাবের অনুগামী করে জীবনকে পরিচালিত করার মতো দুর্বিনীত স্পর্ধা ভূতিদির ছিল। সে সামান্য পড়াশোনা শিখেছে তার কাকা বনমালীর কাছ থেকে। এছাড়া সঙ্গীত-জ্ঞানও তার ভালো। ভূতরি বেপরোয়া চলন-বলন, কথা-বার্তা এবং রহস্যাবৃত জীবনাচার হরিদাসীকে চিন্তিত করলওে খুব প্রাণবন্ত স্বভাবের কারণেই ভূতিদিকে ভালো লাগে হরিদাসীর। ভূতির স্বামীর বয়স, রুচিবোধ তার সাথে যায় না। ফলে তার দ্রোহ আরও চরমে ওঠে। একদিন বাড়ি থেকে পালিয়ে কলকাতায় চলে যাওয়া এবং ঝুমুরবালা নাম ধারণ করে বাঈজি-জীবন বেছে নেয়া স্বেচ্ছাকৃত হলেও, এর পিছনে বাঙালি নারী-জীবনের শাশ্বতকালের সামূহিক বঞ্চনাবোধের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী চেতনা ক্রিয়াশীল। ভূতিদি নারী-জীবনের অপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। অপরদিকে হরিদাসী প্রতিবাদী হতে চেয়েও জীবনের সাথে আপোষ করেছে। ঊনিশ শতকের বাঙালি সমাজে বাস্তবধর্মী নারী জীবনের দৃষ্টান্ত ভূতি আর হরিদাসী।

উপন্যাসে বিশ-শতক কিংবা একবিংশ শতাব্দীর সমাজ বাস্তবতার নিরিখে বুড়ি বা অরন্ধতীর জীবনের সামগ্রিক রূপায়ণ দেখতে পাই। বুড়ি কৃষিভিত্তিক যৌথ পরিবারের মানুষ। বাবা মেজমিয়া স্কুল মাস্টার। স্কুলের মাহিনা আর কৃষির উপার্জন দিয়ে সংসার চলে। নি¤œ-মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবন সীমায় তাদের জীবন-যাপন, তাদের সংস্কৃতি। বুড়ির শৈশবকাল থেকে তার জীবনের পরিণতি এই উপন্যাসে ঠাঁই পেয়েছে। তার নানা ফকিরচাঁদ। এই ফরিকচাঁদই হরিদাসীকে কন্যা হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিলেন। বুড়ির দৃষ্টিতেই পুরো উপন্যাসের ঘটনা-পরম্পরা বর্ণিত হয়েছে। হরিদাসীর আসিরন হবার ঘটনাটি সত্যাশ্রয়ীও বটে। ছোটবেলা থেকেই বুড়ি একটু ভিন্নধর্মী, অনুসন্ধিৎসু এবং দৃঢ়চেতা। বুড়ির দেখা বাঙালি মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত কৃষিভিত্তিক জীবন ও সমাজের নিখুঁত বাস্তব-চিত্র ফুটে উঠেছে উপন্যাসটিতে। গ্রামজীবনের নিটোল প্রকৃতি ও জীবনপ্রবাহও উপেক্ষিত থাকেনি লেখকের বিবরণে। একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন-নিরাশা, সংগ্রামশীলতা ও সংবেদনশীলতা নিপুণ শিল্পীর নিবিড় মমতায় অংকিত হয়েছে উপন্যাসটিতে। বাঙালি কৃষি-পরিবার অথবা মধ্যবিত্তের সংসারে পুত্র-সন্তান লাভের আকাঙ্ক্ষা এবং পুত্র-সন্তানের প্রতি প্রবল পক্ষপাতই একজন কন্যা-শিশুর বিকাশমানতার পথে প্রতিবন্ধকতা – তার নির্মোহ পর্যবেক্ষণ রয়েছে গ্রন্থটিতে। খুব ছোটবেলায় বুড়ির সদ্যোজাত ভাই অর্থাৎ মেজবৌ ও মেজমিয়ার পুত্রসন্তানরে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মেজবৌয়ের উপলব্ধি হয় গ্রাম থেকে শহরভিত্তিক জীবন অনেক শ্রেয়। কিন্তু সেই উন্নত জীবনের প্রেক্ষাপট জুড়ে থাকে বুড়ির ভাই বাবু। মায়ের স্নেহের ব্যাপারেও বুড়ির পর্যবেক্ষণ যথার্থ। বুড়ির ভাই বাবু পুত্রসন্তান বলে মায়ের সমস্ত মনোযোগ, অপত্যস্নেহ বাবুকে ঘিরেই আবর্তিত হতে দেখি। সন্তানদেরে ভবিষ্যৎ, অধিকতর সমৃদ্ধ জীবনের প্রত্যাশায় মেজবৌয়ের ক্রমাগত তাগিদ ও তাড়নায় অনেকটা অনিচ্ছাসত্তে¡ও মেজমিয়া গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে যায়। জীবন-সংগ্রাম আরও ঘনীভূত হয়। বাসা-ভাড়া ও সংসার পরিচালনার উচ্চ খরচের চাপ বইতে না পেরে মেজমিয়া শিক্ষকতা ও টিউশনে অধিক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তার ওপর মেজবৌয়ের শহরে একটি বাড়ি করার স্বপ্ন এবং ক্রমাগত তাড়া মেজমিয়াকে ব্যতিব্যস্ত রাখে। এভাবেই বাঙালির আবহমানকালের গ্রামজীবনের সাথে বিচ্ছিন্ন হবার অন্তর্লীন সত্যভাষণ বিধৃত হয় লেখকের সৃজন কুশলতায়। যৌথ পরিবার ভেঙে এভাবে অণু পরিবার তৈরি হবার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে উপন্যাসে। মানুষ বস্তুত সুখি হতে যায়। মেজবৌ, মেজমিয়ারাও সুখি হতে চেয়েছে। নিজেদের সুখ যখন সন্তানদের ঘিরে, তখন পুত্রসন্তান বাবুর পড়াশোনায় অনীহা, বেপরোয়া জীবন-যাপন তাদেরকে উদ্বিগ্ন করে। অপরদিকে, কন্যাসন্তান বুড়ি পড়াশোনায় ভালো ফল করলেও, তাকে নিয়ে অভিভাবকদের জোরালো কোনো আশাবাদের চিত্র আমরা দেখি না। এর তলদেশের সূক্ষ্ণ কারণটি লেখকের দৃষ্টি এড়ায়নি। সামাজিক স্তরবিন্যাসের দিক থেকে বাঙালি নিম্ন-মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারে কন্যা-সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার মতো মনোভঙ্গি বা মানসিকতা কয়েক দশক আগেও সৃষ্টি হয়নি। এমন সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বুড়ির ভালো রেজাল্ট বাবা-মায়ের সম্মতি লাভে সহায়ক হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার। বুড়ির সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়, জীবনকে বদলে দেবার নিবিড় প্রেরণা তাকে সামনের দিকে তাড়িত করতে লাগলো। ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হতে থাকে বুড়ি। গভীর জীবনবোধ, সংবেদনশীলতা, প্রখর প্রজ্ঞার দীপ্তি আমরা তার চরিত্রে খুঁজে পাই। এই পর্বে এক পরিণত আধুনিক নারী অরন্ধতীকে পাই বুড়ির চৈতন্যের ক্রমবিবর্তনের ধারায়। আধুনিক কিংবা নাগরিক জীবনে সম্পর্কের বিচিত্র রূপ-রূপায়ণ প্রত্যক্ষ করি বুড়ির বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন ও পরবর্তী বৈবাহিক জীবনে। সমাজ ও জীবন-বাস্তবতার পটভূমিতে প্রেম, বিবাহ এমনকি বিবাহ-বহির্ভূত নর-নারীর সম্পর্কের বিজ্ঞানভিত্তিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও নিবিড় পাঠ খুঁজে পাওয়া যায় এই পর্বে। বলা যায়, নর-নারীর সম্পর্কের যথার্থ ব্যবচ্ছেদ এটি; যেখানে সম্পর্কের চড়াই-উৎরাই, বিরহ-মিলন, বিচ্ছেদ-হতাশা, ভাঙন প্রভৃতির কার্য-কারণ সূত্রের মতো রূপায়িত হয়েছে। আদর্শিক গরমিলের জন্য অরন্ধতী প্রথম জীবনের পুরুষটিকে গ্রহণ করতে না পারা, বন্ধু হৃদ্যকে বিয়ে করে সংসার পাতা অরন্ধতীর কোনো ভুল সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন নয়। কিন্তু দাম্পত্যজীবনে প্রতি পলে অরন্ধতী স্বপ্নভঙ্গের শিকার হয়। একদিকে প্রখর আত্মর্মযাদাসম্পন্ন উচ্চশিক্ষিত অরন্ধতী অন্যদিকে স্থুল পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাচেতনায় লালিত হৃদ্যের মা ভাই বোন। একদিকে অরন্ধতীর প্রতি হৃদ্যের ঘরের লোকের অহেতুক বৈরিতা অন্যদিকে সে বৈরিতার প্রতি হৃদ্যের উদাসীনতা। অরন্ধতীকে অভিমানী করে তোলে। তাদের দাম্পত্যজীবনে সৃষ্টি হয় সীমাহীন দুরত্ব। এবং একদিন সেই দূরত্বের মাঝে এসে দাঁড়ায় মহুয়া – যে তার দাম্পত্যজীবনের স্বপ্নগুলোকে বিবর্ণ করে দেয়। অরন্ধতীর জীবনকেও নানভাবে দুর্বিষহ করে তোলে। উদ্দাম, অসংবৃত-যৌবনা মহুয়ার প্রেম-ভালোবাসা শরীরসর্বস্ব। মহুয়ার সাথে স্বামীর এই সখ্যতাকে অরুন্ধুতি তার অন্তসারশুন্য দাম্পত্য জীবনের প্রতিরুপ হিসেবেই মনে করে। কিন্তু অরন্ধতী হরিদাসী নয়। সে বিশ্বাস করে শুধু খেয়ে পরে বেঁচে থাকা আর আশ্রয়ের জন্যই জীবন নয়। জীবনের বৃহত্তর-মহত্তর তাৎপর্য আছে। দাম্পত্যজীবন ব্যর্থ হলেই বেঁচে থাকা অর্থহীন হয়ে যায় না; জীবন মূল্যহীন হয়ে পড়ে না। সে শিক্ষিতা, আত্মমর্যাদাশীল তেজোদীপ্ত নারী। সে জেনেছে প্রেম-ভালোবাসার অসারতার কথা। তার সত্যিকারের ভালোবাসা যখন উপেক্ষিত হয়েছে, তখন এই জোড়াতালির সম্পর্ক আর বিশাল ফাঁকির জীবন থেকে সরে দাঁড়িয়েছে।

চার
পাঠকের চকিতে মনে পড়ে যাবে ‘ঘরে-বাইরে’, ‘গৃহদাহ’, ‘রাত ভ‘রে বৃষ্টি’ উপন্যাস কিংবা ‘নষ্টনীড়’ গল্পের কথা। তবে ‘সুদূরে দিগন্ত’পাঠকের কাছে মনে হবে উল্লিখিত কালজয়ী গ্রন্থগুলোরও সম্প্রসারিত ভাষ্য। দেশ-কাল ও জীবন-বাস্তবতার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে একবিংশ শতাব্দীর একজন দৃঢ়চেতা শিক্ষিত নারী মিথ্যা, ফাঁকি কিংবা অন্তঃসারশূন্য সম্পর্ককে আর স্বীকার করছে না। অসাড় সম্পর্কে কোনোভাবেই আর সে থাকতে চাইছে না। সে নির্দ্বিধায় স্বাধীন, মর্যাদাশীল জীবনের খোঁজে বেরিয়ে পড়ছে। জীবনে আত্মমর্যাদাশীল মানুষের মতো বাঁচতে চাইছে। পরাঙমুখ কিংবা পরগাছা নারী হয়ে নয়। নারী যে পরাশ্রয়ী নয়, তারও যে বেঁচে থাকার মধ্যে আনন্দ, সত্য, মর্যাদা ও স্বাধীনতা আছে মানুষের মতো- এই নির্মোহ অথচ নৈর্ব্যক্তিক সত্যভাষণটি দৃপ্তকণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে চূড়ান্তভাবে। উপন্যাসের ভাষা ও পরিবেশ রচনা শিল্প-সফল। বিশাল কলেবরের উপন্যাসে অসংখ্য প্রধান-অপ্রধান পুরুষ ও নারী চরিত্র সৃজনে লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। সংলাপ-রচনা পাত্র-পাত্রীর সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী বাস্তবানুগ হয়েছে। যশোর অঞ্চলের উপভাষায় সংলাপ রচনা সাবলীল ও সঙ্গতিপূর্ণ হয়েছে। এছাড়া লেখকের উদার-মুক্ত-মানবতাবাদী জীবন-দর্শন উপন্যাসটিকে বিশিষ্টতা দান করেছে।

Flag Counter


1 Response

  1. Hossain Mahmud says:

    ‘সুদূরে দিগন্ত’প্রসঙ্গে
    মেহেরুন্নেছা রোজীর লেখা কখনো পড়িনি। তবে তার ‘সুদূরে দিগন্ত ‘উপন্যাস নিয়ে মোহাম্মদ শেখ সাদীর আলোচনাটি পড়ে আকৃষ্ট হলাম। এটি এক বিশাল উপন্যাস যাতে দুই শতাব্দী জোড়া বিশাল বালুকাবেলায় নানা মানুষের জীবন চিত্র শিল্পসফল ভাবে আঁকা হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। আফশোস, আমাদের কত গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিকই না পাঠক চক্ষুর আড়ালে রয়ে গেলেন।তাদেরকে দেশের পাঠকদের সামনে তুলে ধরা কতই না জরুরি। মেহেরুন্নেছা রোজীকে সশ্রদ্ধ সালাম জানাই। এ সম্মানিতা লেখিকার জীবন বা আর লেখালেখি সম্পর্কে কিছু জানি না। অথচ জানতে খুবই আগ্রহ বোধ করছি। তার দীর্ঘ ও সৃজনশীল জীবন কামনা করি। আমাদের বড় পত্রিকাগুলোর ঈদ সংখ্যায় তার লেখা যায় কিনা জানি না, যাওয়া উচিত। দেশ পাবলিকেশন্সের প্রকাশিত উপন্যাসটি সংগ্রহ করতে পারব কিনা জানি না, ফোন নম্বর থাকলে কোনো কোনো পাঠকের জন্য ভালো হত। ২৫.০৭.১৮

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.