রেজওয়ান তানিমের কয়েকটি কবিতা

রেজওয়ান তানিম | ২১ জুলাই ২০১৮ ১০:০৫ অপরাহ্ন


চিত্রকর্ম: শিল্পী মোহাম্মদ ইকবাল
দুপুরের রোদ, একা…

কী এক অসভ্য সময়ের কাছে বন্ধক রেখেছি দুপুরের রোদ, নিজেও রাখিনি খোঁজ! ভেতরটুকু ওরা তিলে তিলে করেছে নিঃস্ব; আশ্চর্য নিপুণতায়। বর্ধিত আমিষযুক্ত খাবার, বাড়তি যোগানে যোগানে বানিয়েছে এক লোভী, উৎকট শকুন প্রজন্ম!
এইমাত্র বৃন্তখসা মিষ্টি ফল খেতে এখন অস্বীকার করে সবাই, ওতে নাকি বিষের সন্ধান মেলে। অথচ ওরাই প্যাকেট প্যাকেট বিষাক্ত মাংসের কাছে নিজেকে সঁপে নিশ্চিন্তে ঢেকুর তুলছে। আর নিয়ম করে ওদের নাকে ঘাই মারতে চায় মরা আত্মার আর্তনাদ, মাংসের মাতাল গন্ধের মত সেও ফিরে ফিরে যায় প্রতিক্রিয়াবিহীন!
এইসব দেখি শুনি, কানে তুলো গুঁজে হাটি। আমার রোদ নুয়ে এলেও কিছু আলো তো ছড়ায় এখনো। নগ্নতম নিষ্ঠুরতা গ্রাস করে নিতে এলে আবিষ্কার করি; আমার দুপুরের রোদ, একা!
হয়ে উঠি উন্মাদ ব্রহ্মচারী এক—বিদ্বেষের শীৎকার শুনি নিয়ত; মনে হয় মদিরার ঘোরে প্রলাপ বকছে কেউ মাথার ভেতরে। নির্জন এক কুলায় ফিরব বলে ক্ষ্যাপা বাউল হয়ে দিগ্বিদিক ছুটে বেড়াই। মেলে না তার দেখা। বোধ আসে বিচিত্র অন্ধকারে, সীমাহীন অসভ্যতার সঙ্গমে এইসব ডুবি ভাসি—সমস্তই মিথ্যা, ফেইক। এমনকি মৃত্যুর মত শাশ্বত সত্যটিও বানোয়াট, নত সে অন্ধকারের উজ্জ্বলতার কাছে।

সমর্পণ

একটা ডানাময় জীবন চেয়েছিলাম, পাথুরে রোদের কাছে।

অগুনতি অসুখের পোড়া এই মেঘটুকু পোয়াতি হয়ে
দিয়ে যাক জলের আশীর্বাদ, আর সেটুকু ধারণ করে মিশে যাই
মিশকালো মাটিতে, এই কামনায় বারবার ডাকি
বুদ্ধের মত ধ্যানমগ্ন নির্জন বিকেলকে।

সে আমায় পরামর্শ দেয়, তুই মগ্ন হ, নগ্ন সমর্পণে!
নিজের মাঝে লুকানো যে রোদ, তার খোঁজে নামি দেখি চারপাশে বিস্মৃতির জঞ্জাল।

সেই থেকে ব্রত আর ধ্যানের অন্ধকারে কেটে গেল, সাতটি অসুখ জন্ম।
পরস্পর সমান্তরাল বয়ে বেড়াচ্ছে জন্মপাপের দাগ।

কোন সংক্রামক অতীতের পাপ,
ফিরে ফিরে আসে নতুন জন্মে জানে না
পালক হারানো পানকৌড়িরা।

তাই বারবার ভুলগুলো শিখিয়ে যায় দুঃখ প্রস্থানের পুনঃ পুনঃ পাঠ
অবিশ্বাস ও শ্বাশত সন্দেহের কাছেও নেই
প্রশ্নহীন সমর্পণের সুযোগ; আঁধার ছাড়া কখনো মেলে না জীবনে
মিথ্যাহীন কাম ও কৌমের সন্ধান।

পুনরুত্থান

অপর্যাপ্ত আলোর শোকে যে সব
বেদনার্ত বিকেল, অনেক ক্লান্তিতে শুয়েছিল
উপশম খুঁজে নিতে, তোমাদের কোলে; উপবাস ভঙ্গকালে
একবার চেয়েছি, সে যেন গেয়ে ওঠে জলমোছা দিন
আর উল্টো জীবন ধরে বয়ে বেড়ানো গান—
যারা নত হয়েছিল প্রার্থনায়, অসমাপ্ত সঙ্গমের আহ্বানে!

হয়ত ওরা শুনেছিল কোন এক
পূর্বপুরুষের কাছে, এইরকম বেভুল মেঘ আর
কান্নাময় দিনে পৃথিবী ছেড়েছিলেন
নাজারেথের জলোচ্ছ্বাস, ধ্যানমগ্ন বুদ্ধ!
যে কিনা শপথ নিয়েছিল নশ্বর সকাল শেষে
পুনর্জন্মের গল্প লিখবে বিষন্ন রোববারে।

হায় অন্ধকার,
জানে না এসব পতঙ্গপ্রায় মানুষেরা
পৃথিবীতে হয়ত কখনোই থাকে না কোথাও
এইসব অপার্থিব আর মহৎ মোক্ষ সঙ্গম।
তাই তারা বারবার প্রত্যাখ্যাত হয় আর
ফিরে ফিরে আসে, হেলে পরা বিকেলের
অনেক অসুখ আর বেদনাকে মনে রেখে…

পিণ্ডদান

অথচ আমার খুঁজে দেখবার কথা,
কেউ রাখেনি লিখে যে চুমুনৃত্যের নির্বাক ইতিহাস;
আর দিগন্তের ওপারে সিঁদুররঙ পাখির
অসুখী পাখনা ভরা আগুন!

দৃশ্যের আড়াল থেকে চুরি করে চাঁদ
ছুঁয়েছে যে আহত চোখের ছল, প্রেমজ ভ্রূণ
আর কিছু স্পর্শসুখ- তার কাছে
গতকাল জোছনা খেতে খেতে শুনবার কথা
স্মৃতিসম্ভোগের গান, প্রিয়ন্তিকার
শেমিজ ভিজে যাওয়া মাতাল বর্ষা দিন!

তবু চোখ বন্ধ করলেই, আজকাল
নদী দেখি- স্রাবরক্তের স্রোতে মাঝে মাঝে
যে পোয়াতি হয়, লিখে রাখে
সময়ের পাঁজরে, রক্তে নেয়ে ওঠা শাড়িদের
পরাজয় উপাখ্যান!

হায় অসুখ,
পতঙ্গ প্রণয়ে ক্রমশ মৃত্যু লিখে
উড়ে বেড়াচ্ছে প্রতিশোনোন্মুখ ফিউরির দল!
অথচ কেউ জানল না এই বাদামি বিকেলে
পরাজিত হলেন কপিল। গতকাল
পাখনা পুড়িয়ে অসহায় পিঁপড়েরা ঘোষণা করছে
বিনাশ, পৃথিবীর সব স্নেহপ্রবণ হৃদপিণ্ডের
হয়ে গেছে পিণ্ডদান, সামনে সময়
অদ্ভুত শিশ্নপ্রবণ!

প্রতিনির্বাণ

মায়াহীন প্রস্তরে শুদ্ধতা ছুঁড়ে ফেলে
সই করে গেছি প্রায়শ্চিত্তের প্রতিলিপি
নিত্যদিন বলে গেছি—আমাকে প্রতিনির্বাণ দাও
পুনঃ পুনঃ অসংযমে, হে কপট সময়।

নগ্নতম বিবেকে রূপোর পর্দা নেমে এলে
আমি জপতে শুরু করি, শুদ্ধতম মন্ত্র—
জীবন মিথ্যের মত চিত্রল, শাশ্বত!
লিখে রাখে ভুল ট্রাম চলতে থাকার গান।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Anisuz Zaman — জুলাই ২২, ২০১৮ @ ৭:১৫ অপরাহ্ন

      রেজওয়ান তানিমের কবিতাগুলোয় ভিন্ন এক অনুভূতির জগত নির্মাণের সুরটা আমার ভালো লেগেছে। আশা করি, তানিম এই জগতের একটি পরিপূর্ণতা দেবেন তার পরবর্তী কবিতাসমূহে। কবির জন্য শুভকামনা থাকলো।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন যাযাবর মুসাফির — জুলাই ২৫, ২০১৮ @ ৯:৩৩ পূর্বাহ্ন

      কিছু অনুভূতি যা প্রকাশের ভাষা থাকেনা কেবল উপলব্ধি ছাড়া। ভাবলেশহীন হয়ে যেতে হয় পবিত্র প্রথম গোপন স্পর্শেরই মতো স্থবির। দূর্দান্ত লেখনী। আশা করবো লেখায় ফুটে উঠুক বর্তমান বাংলার বঞ্চনার ইতিহাস।
      শুভকামনা নিরন্তর।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রেজওয়ান তানিম — সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮ @ ৮:২৭ অপরাহ্ন

      @anisuz zaman

      ভাইয়া, অনেক অনেক ভালোবাসা জানবেন।

      @যাযাবর মুসাফির,

      ধন্যবাদ ও শুভকামনা জানবেন…

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com