বইয়ের আলোচনা

ঢাকা নিয়ে নতুন দু’টি প্রকাশনা

sumon_k | 18 Sep , 2008  

ঢাকা নিয়ে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে অনেক কিছুই করে যাচ্ছে পুরনো ঢাকার সমাজসেবা মূলক প্রতিষ্ঠান মাওলা বখ্শ সর্দার মেমোরিয়াল ট্রাস্ট। নানা dhaka-boi-1.jpg…….
সম্পাদক: আবদুল মালেক, ঢাকা কেন্দ্রের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত বিনামূল্য পত্রিকা
……..
ধরনের সেবামূলক কাজের পাশাপাশি তাদের রয়েছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও, যার নবতম শাখাটি প্রকাশনা বিষয়ক। ঢাকা কেন্দ্র নামে একটি গবেষণা বিভাগ রয়েছে ট্রাস্টের। নাম থেকেই স্পষ্ট এর কার্যক্রম। এই ঢাকা কেন্দ্রেরই নতুন উদ্যোগ একটি মুখপত্র যার নাম ত্রৈমাসিক ঢাকা। এর প্রথম সংখ্যাটি বেরিয়েছে গত মার্চ মাসে।

১৫ কোটি মানুষের এই দেশে সৃজনশীল সাহিত্য দূরে থাক, প্রবল আগ্রহের বিষয় রাজনীতি (তা-ও সমকালীন) বা শোবিজ জগতের কেচ্ছাকাহিনীতে ভরপুর সংবাদপত্র ও সাময়িকীর পাঠকসংখ্যাই অঙ্গুলিপরিমেয়। সেখানে dhaka-boi-2.jpg …….
ঢাকা রচনাপঞ্জী সংকলন, সংকলক ও সম্পাদক: আবদুল মালেক, প্রচ্ছদ: সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন, ৩০০ টাকা
……
ইতিহাসের মতো একটি ‘নীরস’ ও গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে একটি বাণিজ্যিকভাবে সফল সাময়িকীর আশা বাতুলতা মাত্র। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জার্নালই একমাত্র ভরসা। ত্রৈমাসিক ঢাকা আকারে সীমিত কলেবর এবং পরিসরের (শুধু ঢাকা নিয়ে বলে) প্রকাশনা হলেও এই হাতেগোনা গবেষণাপত্রের ভিড়ে আর একটি সংযোজন বলেই তাকে স্বাগত জানাতে হয়।

ত্রৈমাসিক ঢাকা অল্প পরিসরেও অনেক কিছুকে ধারণ করেছে। মাত্র ৬৪ পৃষ্ঠার বুক সাইজের (১/১৬) আকারের এ প্রকাশনাটি বিষয়বৈচিত্রে ভরপুর এটা মানতেই হবে। প্রথম সংখ্যার উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে রয়েছে রাজধানী ঢাকার ৪শ’ বছর পূর্তি, এ নগরীর ঘরবাড়ির বিবর্তন ও ঠিকাগাড়ি নিয়ে তিনটি নিবন্ধ এবং ঢাকা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শরীফ উদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার। ‘ঢাকাই ছবি/ঢাকার ছবি’ এবং ‘ঢাকার টুকিটাকি’ বিভাগ দুটি দৃশ্যত বৈচিত্র্যের প্রতি সম্পাদকের আগ্রহেরই প্রমাণ। এ লেখাগুলোতে অনেক কৌতূলোদ্দপীক তথ্যের পাশাপাশি ভাবনার খোরাক পাবেন ইতিহাসে আগ্রহী পাঠক।

বিরল পুরনো ছবি ত্রৈমাসিক ঢাকা-র একটি উজ্জ্বল দিক। প্রথম সংখ্যায় ছিল লর্ড ও লেডি কার্জন, স্যার ফুলারের ঢাকা আগমন, পিলখানায় কয়েকশ’ হাতির মিছিল, ঢাকার নবাব ও পঞ্চায়েত সর্দার এবং ভাওয়াল সন্ন্যাসীখ্যাত কুমার রামেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর ছবি। অনুসন্ধিৎসু কিন্তু মহাফেজখানায় প্রবেশাধিকারের অবকাশ বা সুযোগের কোনোটাই নেই এমন মানুষের জন্য এ বিভাগটি হতে পারে হারিয়ে যাওয়া ঢাকার এক চমৎকার জানালা।

(এ সমালোচনা লেখার শেষে ডাকবিভ্রাটের কারণে বেশ দেরিতে হাতে এলো পত্রিকাটির জুনে প্রকাশিত দ্বিতীয় সংখ্যা। ২য় সংখ্যার বিষয় শিল্প ও সংস্কৃতি। এ সংখ্যার বিষয়সূচিতে রয়েছে আত্ম-স্মৃতিকথায় ঢাকার সমাজ ও সংস্কৃতি, ঢাকায় শিখ ধর্মের আবির্ভাব, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনের সাক্ষাৎকার ইত্যাদি বিষয়।)

তবে ঢাকা কেন্দ্র সংবাদ বিভাগটির নিচে আলাদা করে ছোট একটি উপবিভাগে দৈনিক পত্রিকার ঢাকা বিষয়ক পাতা প্রকাশের দিনের উল্লেখ অপ্রয়োজনীয় বলে মনে হয়। এ সমালোচক নিজে একটি শীর্ষ দৈনিকের রাজধানী বিষয়ক সাপ্তাহিক আয়োজনের সঙ্গে নিজে যুক্ত ছিলেন বলে এ ব্যাপারটি তার জানা যে দৈনিক কাগজের ওই অংশটি মূলত নিতান্তই হালকা এবং তাৎক্ষণিক বিষয়ে ভরপুর। আর একটা কথা বলতে হয়, ছাপাখানার ভূত এবং ভাষাগত সৌকর্যের ব্যাপারে সম্পাদককে আর একটু সতর্ক হতে হবে।

ধরে নিচ্ছি প্রকাশনাটি একেবারেই নতুন এবং সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও নিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি চরিত্র নেওয়ার পাশাপাশি এর আরও মানোন্নয়ন ঘটবে।

২.
ঢাকা কেন্দ্রের আরেকটি প্রকাশনা ঢাকা বিষয়ক রচনাপঞ্জী। ২০০৭-এর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এই ‘আকরগ্রন্থে’ ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত প্রায় সমস্ত রচনার উল্লেখ সন্নিবেশিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে মুখবন্ধে জানিয়েছেন সম্পাদক। ২৩৩২টি ভুক্তি রয়েছে এ রচনাপঞ্জীতে। ঢাকা নগরী নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রচনাপঞ্জী এটাই প্রথম বলে উল্লেখ করেছেন এর সংকলক তরুণ গবেষক আবদুল মালেক।

গবেষক ও ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের বইটি যথেষ্ট কাজে লাগবে বলে আশা করা যায়। আমরা জানি ভারত ও ব্রিটেনের গ্রন্থাগার ও আর্কাইভে বহু গ্রন্থ ও দলিল-দস্তাবেজ রয়ে গেছে গোটা ভারতবর্ষের মতো ঢাকা নিয়েও। মুখবন্ধে সম্পাদক বলেছেন, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ওই উৎসগুলো ব্যবহার করা যায়নি। মূলত পারিবারিক আয়ে চলে এমন একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সামর্থ্যরে বিষয়টি মাথায় রাখলে সীমাবদ্ধতাটি বুঝতে আমাদের দেরি হয় না। তাছাড়া সময়ের ব্যাপারিট তো আছেই। আগামীতে নতুন সংস্করণে এটি আরও সমৃদ্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সম্পাদক।

আমরা আশাবাদী হতে চাই ঢাকা কেন্দ্রের সামর্থ বাড়বে এবং মহতী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এরকম প্রয়োজনীয় উদ্যোগে সহায়তার জন্য এগিয়ে আসবে। টাকার অভাব নেই। বহুজাতিক এবং উঠতি দেশীয় পূঁজিপতিরা নানাবিধ উদ্দেশ্যে কী পরিমাণ অর্থব্যয় করছেন তা আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। জ্ঞানের বিকাশের পথে তার ভগ্নাংশও কী তারা বরাদ্দ করতে পারেন না?

রাজধানী ঢাকার চারশতক পূর্তির বছরে এ মহানগরীকে নিয়ে বেশ অনুষ্ঠান-আয়োজন চলছে। ঢাকা নিয়ে যারা সত্যিকার অর্থেই ভাবেন অথবা কমবেশি কাজ করেন তাদের অনেকে এর কিছু আয়োজনের মধ্যে ‘ধান্দাবাজি’ বা অন্তত অযোগ্য লোকের নাম ফাটানোর চেষ্টা দেখছেন। তাদের আশঙ্কা, আমরা জানি, অনেকটাই সত্যি। এরকমই হয়। ভালো কাজের নমুনা চাপা পড়ে যায় প্রচারকামিতার ঢক্কানিণাদে।

আশা করবো ঢাকা কেন্দ্র রাজধানীর চারশ’ বছর পূর্তি ঘিরে একটি ভালো উদ্যোগ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করতে পারবে এবং তাদের মুখপত্র ত্রৈমাসিক ঢাকা দীর্ঘায়ু লাভ করে ঢাকা চর্চাকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.