কবিতা

হাতেম মাঝি স্মরণে

রুদ্র সাইফুল | 10 Jul , 2018  

একদা শপথ করেছিলাম কবি হবো এই পৃথিবীর,
কবিতায় বুনবো ঘাসফড়িংয়ের ওড়াউড়ি,
জীবনের রঙিন লেনদেন; আমার স্বাধীনতা।

হাতেম মাঝির কথাও কবিতায় বুনবো ভেবেছিলাম,
যে হাতেম মাঝি উত্তাল একাত্তরের জীবন্ত কিংবদন্তি,
সেবার প্রবল বর্ষণে চারিদিকে বান ডেকেছিলো-
নদী পার করার নামে মাঝ নদীতে ডুবিয়ে মেরেছিলেন
হাফ ডজন খান সেনা, হাতেম মাঝি তখন টগবগে যুবা।

হাতেম মাঝি মেধাবী ছিলেন না কিন্তু বাঙালি ছিলেন,
ঘরে বৃদ্ধ মা আর অন্তঃসত্ত্বা বউ, এই তাঁর সংসার;
ধারালো অস্ত্র, থ্রি নট থ্রি কিংবা স্টেনগান নয়,
নৌকাই ছিলো তাঁর একমাত্র হাতিয়ার।

স্বাধীনতার পরে এক টুকরো কাগজ মিললো হাতে,
লোকে বলে সার্টিফিকেট, হাতেম মাঝি নির্বিকার;
মকতবে টু পাস দেওয়া হাতেম মাঝির বউ বললো,
‘এতে লেখা আছে হাতেম মাঝি একজন মুক্তিযোদ্ধা।’

দীর্ঘ বছর পরে হাতেম মাঝির সঙ্গে আমার দেখা হলো
লাশকাটা ঘরে খুন হয়ে যাওয়া হাতেম মাঝির সঙ্গে,
পুরনো শকুনের নগ্ন থাবায় হাতেম মাঝি লাশঘরে;
নিজামী-মুজাহিদের গাড়িতে পত্পত্ করে উড়ছে তখন
হাতেম মাঝির রক্তে ভেজা লাল-সবুজের পতাকা!

সেদিন কোনো খবরের শিরোনাম হয়নি হাতেম মাঝি,
নিঃস্ব হাতেম মাঝির পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়েছিলো,
বৃদ্ধ স্ত্রী আর মুক্তি নামের বাংলাদেশের বয়সী কন্যাটি
আঁচলে মুখ লুকিয়ে অঝোরে কেঁদেছিলো সেদিন,
শকুনের গাড়িতে পত্পত্ করে উড়তে থাকা পতাকা
দেখে একদলা থুঁ থুঁ বেরিয়ে এলো তাঁদের মুখ থেকে।

হাতেম মাঝিরা মরে যায়, লাশকাটা ঘরে ব্যবচ্ছেদ হয়,
আর আজ হাতেম মাঝিদের লাশের উপরে দাঁড়িয়ে
নগ্ন উল্লাসে মেতে ওঠে শকুনরূপি মূর্খ মেধাবী;
তাহলে কী এই বাংলাদেশ চেয়েছিলেন হাতেম মাঝি?

Flag Counter


2 Responses

  1. দীপু says:

    হাতেম মাঝি সময়ের দর্পনরূপে বিরাজ করছে এই পচে যাওয়া নষ্ট সমাজে, যেখানে মেধাবী নামধারী শকুনের উল্লাস চলে দিনে রাত্রে। গুজবের শহরে মিথ্যারা হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী। ধন্যবাদ কবিকে এমন একটা সমসাময়িক চিত্র তুলে আনার জন্য।

  2. মানিক বৈরাগী says:

    কবি রুদ্র সাইফুল, আমরও একি প্রশ্ন। গাইড বই মুখস্ত মেধাবীদের নিয়ে এই দেশ কতটুকু আগাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.