অনুবাদ, রোজনামচা

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ৩)

hossain_m | 15 Sep , 2008  

কিস্তি ১কিস্তি ২

genet_brown.jpg
অ্যালান ব্রাউনের আঁকা জঁ জনে

কিস্তি ৩

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)

১৭/১০/৬৯

দ্য প্লেগ (Le Peste) সঙ্গে ছিল, পড়ার প্রায় শেষের দিকে। ক্যাফে প্যারিসের চত্বরে যেয়ে আমরা বসি।

তুমি দেখি এখনও প্লেগ পড়ছো? জনে জানতে চান।

এক্কেবারে শেষের দিকে চলে এসেছি।

আর আমার ব্যালকনি (Balcon) ওটা কি পড়েছো?

না এখনও হয়ে উঠেনি।

না ক্যান?

মাসের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছি, যাতে আমি আরেকটা কপি কিনতে পারি।

কীসের জন্যে?

কারণ আমার কপিটাতে কিছু লেখা হয়েছে, মানে আপনি আমার জন্যে বইটাতে সই করে দিয়েছেন।

এর সাথে তার সম্পর্ক কী?

আমি তাকে বলি দেখেন আমি তো ক্যাফেতেই পড়ি, আমার ভয় হয় এমন কিছু হয়তো ঘটেও যেতে পারে যদি বইটা আমার সঙ্গে রাখি! আমি বলি আসলে বইটা আমি একটা স্যূভেনির হিসেবে রেখেছি।

তিনি আমার কাছে এসে দ্য প্লেগ বইটা কেঁড়ে নিয়ে তার প্রথম পাতাটা ছিঁড়ে ফেলেন।

এমনটা আমার বইটাতে যেয়ে করো। যে পাতাটাতে উৎকীর্ণ লেখা অছে সেই পাতাটা এইভাবে ছিঁড়ে ফেলো। নাটকটা পড়ো এবং পরে পাতাটা লাগিয়ে নিয়ো। এটা নিশ্চিত সিগনেচার হারানোর ভয়ে শেলফে বই ফেলে রাখার থেকে বইটা পড়া মেলা ভাল।

এতে আমার হাসি পায়। আমরা বইয়ের দাম নিয়ে কথা বলি, এবং আমি অভিযোগ করি বইটার দাম খুবই চড়া।

এভাবে আমি আরও বেশি টাকা বানাতে পারি।

কিন্তু তারা কেন আপনার বইয়ের একটা সস্তা সংস্করণ বের করে না যেমন ধরেন Le Livre de Poche

আমি জানি না।

কিন্তু আপনি তো জানেন বেশির ভাগ ছাত্রই আপনার বই কেনার ক্ষমতা রাখে না।

জনে বলেন, এটা আমার দোষ না।

আমি আর কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নেই।

গতবার যখন আপনি তানজিয়ারে তখন আপনি বলেছিলেন সার্ত্রের সাথে আপনার দু’বছর ধরে দেখাশোনা নেই।

সত্যি। আমার আজ অব্দি তার সাথে দেখা হয় নি। গত বছরের কোনো একদিন তিনি সর্বোন বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচার দিচ্ছিলেন আমি চেষ্টা করি সেখানে যেতে এবং কী বলছিলেন শুনতে, কিন্তু দরজার সামনে দাঁড়ানো এক মেয়ে এসে আমাকে জানায় হলের ভেতরে কোনো জায়গা নেই। আরও অনেকই চেষ্টা করছিল ভেতরে যাবার, কিন্তু সেটা ছিল অসম্ভব।

মেয়েটা নিশ্চয়ই আপনাকে চিনতে পেরেছিল?

মেয়েটা ছাত্র। আমি জোরাজুরি করতে চাই নি।

পরে আমরা যখন বুলেভার্ডের ঘাসের পাশ দিয়ে হাঁটছিলাম, জনে আমার কাছে জানতে চায় গ্যালিমার্ড এর লোকাল এজেন্সির বইয়ের দোকানে আমরা যেতে পারবো কি-না। সাথে করে যে পরিমাণ টাকাপয়সা তিনি এনেছিলেন তার সবই খরচ করে ফেলেছেন। আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না লাইব্রেরি কলোনেসে যাওয়াটা ঠিক না বেঠিক হবে, যদিও আমরা সেটার কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। দোকানটার দিকে নিদের্শ করে তাকে বলি উনি হয়তো এই দোকানটার কথাই বলছেন। আমরা লাইব্রেরি কলোনেসে চলে আসি।

যে দু’জন মহিলা বইয়ের দোকানটি চালাচ্ছিলেন, মাদাম এবং মাদমোয়াজেল জিরোফি, দু’জনেই বেশ গদগদ হয়ে স্বাগতম জানালো। জনে মাদাম জিরোফির কাছে জানতে চান তিনি অল্প সময়ের জন্যে আলাদা ভাবে উনার সাথে কথা বলতে পারেন কি-না। তাদের দুজনকেই বেলকনিতে বসে কথা বলতে দেখি। দেখি মাদাম জিরোফি টাইপরাইটারে টাইপ করতে শুরু করেছেন। ব্রায়ন জিসিন বলেন জনে কখনও ব্যাংকে যান না। গ্যালিমার্ড তার হয়ে ব্যাংকের কাজ করে, প্যারিসে গ্যালিমার্ডের প্রধান অফিস থেকে শুরু করে গ্যালিমার্ডের এজেন্সি হিসেবে কাজ করে এমন যে কোনো বইয়ের দোকান। প্যারিসে যদি তার টাকার দরকার পড়ে, তিনি গ্যালিমার্ডে যেয়ে নিয়ে আসেন। টাকাগুলো ছোট্ট একটা থলেতে বহন করেন আর লুকিয়ে রাখেন ওভারকোটের তলে এবং চারিদিকে এমন চোরাচোরা ভাবে তাকান যেন তিনি এইমাত্র টাকাগুলো তিনি চুরি করে এনেছেন।

বাইরে বেরিয়ে আবার রাস্তায় আসতেই জনে বলেন, ভদ্রমহিলার জামাই হয়তো পাসপোর্টের ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারেন। কিছুক্ষণ পরে আমি তার সাথে দেখা করবো। চলো আমরা এখানে বসে অপেক্ষা করি। ভদ্রমহিলা তার জামাইকে ফোনে তলব করেছেন এই তো এখনই চলে আসবেন।

আমরা ক্লারিজে আসি। কবিতা নিয়ে আলাপ শুরু করি পুনরায় । বোদলের, ভের্লেন, র‌্যাবো হয়ে শেষে আমরা মার্লামের মন্দিরে এসে পৌঁছলে জনে আলাপের সূত্রপাত করেন।

আশা করি এখানে ব্রিজে মেরিনটা রয়েছে — আমার তোমাকে পড়ে শোনাতে ইচ্ছে করছে।

আমি বলি আমি যেয়ে মাদাম জিরোফিকে জিজ্ঞেস করি। তিনি বলেন আইডিয়াটা ভাল।

বইয়ের দোকানে মাদাম জিরোফিকে যেয়ে দেখি তিনি হিসাবপত্র নিয়ে ব্যস্ত। আমি বলি মঁসিয়ে বইটা দেখতে চান। ভদ্রমহিলা মার্লামের বইটি আমার হাতে দেন। বলেন, মঁসিয়ে জনে কে যেয়ে বলবেন আমার স্বামী এখনই পৌঁছাবে।

ক্লারিজে আমি আবার দৌঁড়ে ফিরে আসি এবং ওয়াকরিমকে দেখতে পাই এবং সে আমাদেরকে খুঁজছে বলে জানায়। তারপর টেবিলে বসে জনেকে বলে, সে মনে করে পাসপোর্ট পাবার এখনও কিছুটা হলেও আশা আছে। জনে ওয়াকরিমের কাছে জানতে চান মঁসিয়ে জিরোফি কোনো কাজে আসতে পারে বলে সে বিশ্বাস করে কি-না। ওয়াকরিম বলেন সম্ভবও হতে পারে, যেহেতু একজন আর্কিটেক্ট হিসেবে তার সরকারী অফিসে অনেক বন্ধুবান্ধব থাকতে পারে।

মঁসিয়ে জিরোফি আসেন বেলা পাঁচটায়। তিনি আগামী কাল সকালে নির্দিষ্ট কিছু সরকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা করবেন বলে জানান। ওয়াকরিমও বলেন তারও আগামীকাল কিছু লোকের সাথে দেখা করার কথা যারা হয়তো কোন কাজে লাগতে পারে।

আমরা মঁসিয়ে জিরোফির গাড়িতে চেপে বসি। তখনও মার্লামের ধার করা বইটা জনের হাতে। জনে অবাক হয়ে যান মরোক্কোতে একটা সাধারণ পাসপোর্ট পেতে কত ধরনের ঝক্কি পোহাতে হয়। মঁসিয় জিরোফি মাঝে মাঝে মাথা নাড়ান আর থেকে থেকে বলেন, এখানকার নিয়মটাই যে এরকম!

আমরা আমালাতে পৌঁছি। আমরা যখন গাড়িতে অপেক্ষা করি ওয়াকরিম একাই চলে যান। জনে মালার্মের বইয়ের পাতা উল্টোতে শুরু করেন।

আপনারা যদি আমাকে একটু মেহেরবানি করেন তাহলে আমি আমার এই বন্ধুটাকে একটা মার্লামের কবিতা পড়ে শুনাতে চাই — জনে মঁসিয়ে জিরোফিকে বলেন।

অবশ্যই, এটা আবার বলতে হবে, মঁসিয়ে জিরোফি উত্তরে বলেন।

জনে ব্রিজে মেরিন কবিতাটা তার উদাত্ত কিন্তু মিহি কণ্ঠে পড়তে শুরু করেন। যখন তিনি শেষ করেন তখন বলেন: একটা মিরাকলের মত না, এই কবিতাটা?

কবিতাটা যে একটা এক্সট্রাঅর্ডিনারি আমরা সবাই সমর্থন করি। তারপর তিনি বিশেষ করে একটা লাইন বের করেন যা তাকে সবচে বেশি আনন্দ দেয় বলে জানান: Et la jeune femme allaitant son enfant. ( তরুণী ভার্যা না দেয় শিশুরে দুধের বোটা)। ওয়াকরিম ফিরে আসেন এবং জানান যে লোকের সাথে তার অ্যাপোয়েন্টমেন্ট ছিল তাকে তিনি খুঁজে পাচ্ছেন না। আমি লক্ষ্য করি পাসপোর্ট পাওয়া নিয়ে জনে ক্রমাগত বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, এবং তাকে অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশ সংকল্পবদ্ধও মনে হয়।

১৯/১০/৬৯

সকাল এগারটার দিকে আমি তার সাথে দেখা করি। আমরা এভেন্যু দি স্পেনা পর্যন্ত হেঁটে যাই এবং পিউরেটা দি সোল এ যেয়ে বসি। এমন সময়ে জনের বন্ধু যর্জ লাপাসেদ আসেন। তাঁকে বেশ উত্তেজিত দেখাচ্ছিল এবং কথাও বলছিলেন নার্ভাস ভাবে। আমি তার পারসোনালিটি কোনো সময়ই পছন্দ করি না।

দুপুরে তাদের দুজনের সাথেই আবার দ্য ফ্র্যান্স বারে মিলিত হই। মাদাম জিরোফি আমাদের চায়ের দাওয়াত করেছেন বলে জনে জানান। তুমিও আমন্ত্রিত।

আমি তাকে বুঝিয়েটুঝিয়ে দাওয়াতটা নিতে চাচ্ছিলাম না কারণ একটাই, লাপাসেদের আশেপাশে না থাকা, সত্যিকার অর্থে যার সাথে কোনোভাবেই একমত হওয়া যায় না। কিন্তু সে সময় মঁসিয়ে জিরোফি চলে আসেন এবং আমরা সবাই তাঁর গাড়িতে চড়ে বসি। তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে যেয়ে আমরা এমিলিও সানজ্কে পাই। এডোয়ার্ড রেটিটির ওখানে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। এই আরেকটা চিজ্ যাকে আমার অসহ্য লাগে — এ হচ্ছে সেরকমের পাবলিক যে কথা বলার আগে বাতাসে ফুল নাড়েন, তারপর সেটা শুঁকে প্রশ্নের উত্তর দিতে শুরু করেন কিংবা নিজের দেয়া মতামতকে সাঙ্ঘাতিক একটা কিছু জ্ঞান করেন।

রুমের পরিবেশটা গা এলিয়ে দেয়ার মত এবং আমি ক্লান্তও ছিলাম। আমি মাদাম জিরোফিকে জিজ্ঞেস করি, চায়ের বদলে এক গ্লাস হুইস্কি পেতে পারি কি-না। আলাপ চলতে চলতে একপর্যায়ে তিনি এমন একজনের প্রসঙ্গ চলে আসেন যিনি শিল্প এবং পত্রসাহিত্যে কীর্তিমান এবং তানজিয়েরেই থাকেন। মাদাম জিরোফি টেনেসি উইলিয়ামসের কথা বলেন — যিনি এখানে প্রায়ই আসতেন, কিšত্ত ১৯৬৪-র পর থেকে তাঁকে এখানে আসতে দেখেন না বলে জানান। হুইস্কিটা আমাকে ঝিমুতে সাহায্য করেছিল। ধীরে ধীরে পান করছিলাম। আমি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম যখন শুনতে পাই জনে ক্রোধের সাথে বলছেন: আমি সাহিত্যের গোরস্থানে পৌঁছে গেছি!

তাঁরা থিয়েটার নিয়ে বলছিলেন। জনে বলেন থিয়েটার এখন আর টিকে থাকার মত তেমন কোনো আর্ট ফর্ম না। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি তাহলে কোন আর্ট আজকের দিনে টিকে থাকার মতো।

তেমন কিছুর আজ আর অস্তিত্ব নেই। যতগুলো ফর্ম আজঅব্দি ব্যবহার করা হয়েছে তার সবগুলোই ব্যবহারের ফলে টুটাফাটা হয়ে গেছে।

বটে! যার সাহিত্যকর্মের পুরো সমগ্র প্রকাশিত হয়ে গেছে তিনি এটা বলতে পারেন, আমি ভাবতে থাকি। কিন্তু উনি যদি পেছনের চল্লিশের কথা ভাবতেন, তাহলে তার পক্ষে আর কোনো বই লেখা হতো না এবং তখন একটাই মাত্র জনে থাকতেন যিনি হচ্ছেন মিসকিন জনে এবং চোর জনে, জনেকে সারা জীবনের জন্যে কয়েদ খাটতে হতো।

আমরা সবাই উঠতে যাবো এমন সময় এমিলি সানজ্ বইশেলফ্ থেকে একটা বই উঠিয়ে জনের হাতে দেন একটা অটোগ্রাফ দেবার জন্যে। জনে আমার দিকে তাকান, চোখেচোখে প্রশ্ন করেন। আমি হালকা শ্রাগ করি যেন এমন: এটা আপনার ব্যাপার। আপনি জানেন এ জাতীয় মানুষদের আপনি কেমন ভাবেন।

জনে তাকে বলেন, আমি দুঃখিত। আমি খুব একটা ভাল বোধ করছি না। আজকে আমি কোনো বইটই সই করতে পারবো না।

ব্রাভো, আমি ভাবি — কেমন ইনটুইশন!

এলিভেটর দিয়ে নামতে নামতে জনে জিজ্ঞেস করেন, লোকটা কে, অই মচুয়া স্পেনীয়টা।

এক ব্যাংকারের পোলা।

তিনি বলেন, আমার মোটেই ভাল লাগে নি তাকে।

আমিও তাকে পছন্দ করি না।

২০/১০/৬৯

দ্য ফ্র্যান্সে বারে আমি আর ব্রায়ন। জনে প্রায় সাড়ে ছ’টার দিকে মোহাম্মেদ যেরার্ড সহ আসেন। ব্রায়ন কিছুবাদে চলে যায়। আমার ঘণ্টা দুই কথা বলি। মোহাম্মদ যেরার্ডও চলে যায়। আমি জনের সাথে যর্জ লাপাসেদ-এর খোঁজে জাকো সিকোতে আসি। ক্যাফে সেন্ট্রালে কিছু মরক্কীয় যুবকদের সাথে লাপাসেদকে পাই। আমরা মারিয়া রেস্টুরেন্ট আসি এবং এক বোতল মদের অর্ডার দেই। জনে এক গ্লাস নেন কিšত্ত ডিনার খেতে রাজি হন না। যর্জ এবং আমি একসাথে যেয়ে জনেকে হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে আসি, তারপর আমি লাপাসেদকে ব্রায়নের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই। আমি তাদের সাথে আধাঘণ্টা কথা চালাই, যখন তারা তানজিয়েরের পুরানো দিনগুলো নিয়ে কথা বলতে থাকে তখন আমি ঘুমিয়ে পড়ি। আর ভোর দুটোয় জাগনা পেয়ে দেখি তারা তখনও কথা চালিয়ে যাচ্ছে। লাপাসেদকে ব্রায়নের মরক্কোর ডিসকোর্স শোনার জন্য রেখে আমি চলে যাই।

২১/১০/৬৯

জনে, লাপাসেদ, ব্রায়ন জিসিন এবং আমি একসাথে জোকো সিকোর পেছনের গলি দিয়ে হাঁটতে থাকি। বেনচার্কির কোয়ার্টারগুলোতে ঢুকে পড়ি। সেখানে আমরা মানোলোসের বাড়িটা খুঁজে পাই। দরজার কাছেই আলর্বেতো দি ইটালিয়ান বসে আছেন, দেখছেন কে ভেতরে ঢুকছে। সে আমাদের বসার জন্যে কয়েকটি প্রাচীন চেয়ার নিয়ে আসেন, যাতে বসতেই ক্যাচ ক্যাচ শব্দ হয়। পার্লারটা (দ্য সালা ) দেখতে অনেকটা আইস বক্সের মত। দেয়ালে শ্যাওলা পড়েছে। সবকিছুই পুরোনো, স্যাঁতস্যাঁতে এবং ময়লায় ভরা। ব্রায়ন এই জায়গাটা নিয়ে কথা বলতে শুরু করে যখন এটা ছিল ইন্টারন্যাশনাল জোনের মধ্যে।

এই শহরটা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। লাপাসেদ বলে, এর আর কী-ই বা বাকি আছে?

আমি স্মরণ করি এসবের কিছুটা কারণে জনে তার দ্য থিফ জর্নালে লিখেছিলেন, যখন তিনি দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তখন তার মনের চোখে ভাসতে থাকে তানজিয়ের — দালাল আর ক্রিমিন্যালদের লুকোনোর জায়গা। বুড়ো ইটালিয়ান আমাদেরকে তার মদের বোতলের তলানিতে পড়ে থাকা মদ দিয়ে আপ্যায়ন করেন। আমরা তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠতে শুরু করলে তিনি বলেন তোমরা নিজেরাই তো দেখতে পারছো এখানে আর কিছু নেই। বছর বিশেক আগে কি এমনটা মরে পড়ে থাকতো এই জায়গাটা? সেসময়ে প্রতিদিনই পাঁচ ছ’জন খদ্দের ঢোকার জন্যে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতো। এখন যদি সাড়া দিনে অন্তত তিনজন খদ্দের মেলে তাহলে বলতে হবে আমাদের নসিব ভাল। কোনো কোনো সময় খাড়া চব্বিশ ঘণ্টায়ও কেউ আসে না।

আমরা একমত হই যে অতীত সবসময়েই বর্তমানের চেয়ে উত্তম এবং অতীতের মত আর কিছুর কোনো দিনেই দেখা মিলবে না।

সাড়ে পাঁচটা নাগাদ আমরা আমালাতে এসে হাজির হই। জনে, ওয়াকরিম এবং আমি। ওয়াকরিম গভর্নরের প্রাইভেট সেক্রেটারির সাথে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করে রেখেছিল, যিনি আমাদেরকে আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান। আমালাতে যতবারই জনে এসেছেন এই প্রথমবারের মত তার মুখে একটা প্রশান্তির ভাব দেখা যায়। ভদ্রলোক জানতে চান যেরার্ড প্যারিসে যেয়ে কী ধরনের কাজ করবে, জনে উত্তর দেন সে তাকে মালি হিসেবে রাখবে। আমি মনে মনে হাসি কারণ জনের তখনও না ছিল বাগান আর না ছিল বাড়ি।

তার মানে সে চাকরের ক্যাটাগরিতে পড়বে, সেক্রেটারি বলেন।

জনে মুহূর্তের জন্যে ভেবে বলেন, ‘আমাকে ক্ষমা করবেন;’ তারপর বলেন আমি কাউকেই কখনও চাকর হিসেবে ভাবতে পারি না। সে কেবল মাত্র বাগানে কাজ করবে। সে রকম দেখলে আমি কাউকে জোগার করে নেব যে তাকে ফ্রেঞ্চ ভাষাতে কাজটা বুঝিয়ে দিতে পারবে।

ভদ্রলোক হাসেন। আপাতদৃষ্টিতে জনের মনোভাবটা তিনি ধরতে পারেন যে কি-না কাউকেই চাকর হিসেবে পরিচিতি দিতে চান না। তিনি জানান জনের কাছ থেকে এই মর্মে একটা চিঠি লাগবে যেখানে উল্লেখ থাকবে যেরার্ড যতদিন মরক্কোতে থাকবে না ততদিন তার আর্থিক দায়িত্ব তিনি নেবেন। সেই চিঠিটা আমালাতে গ্যারান্টি হিসেবে থাকবে। জনে আগামীকাল তাঁকে চিঠি দিয়ে যাবেন বলে রাজি হন। এবং ভদ্রলোক আশ্বাস দেন তিনি তার ক্ষমতায় যতটুকু করা যায় তার সবটাই করবেন যাতে এক বা দুই দিনের মধ্যেই ডকুমেন্ট তৈরি হয়ে যায়। রাস্তায় নেমে আমরা খুবই ভাল বোধ করি। জনে কিছু যেন ভাবছেন এমন মনে হয়। তারপর বলেন, ভদ্রলোককে তার কাছে বেশ সভ্যই মনে হয়েছে।

(কিস্তি ৪)

hossain_mofazzal@ymail.com


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.