কবিতা

আমাদের প্রচুর ভালোবাসতে হবে

মাজহার সরকার | 8 Jul , 2018  


অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরার চিত্রকর্ম

জিজ্ঞাসা

একদিন আমি মাটি খুঁড়ছিলাম, দীর্ণ ব্যথায় কাতর বিষধর পৃথিবীর রুদ্ধ কপাট খোলে না আর। চারপাশে মানুষ জড়ো হয়ে গেছে, করছোটা কী মাজহার? জল তোল জল! তেষ্টা পেয়েছি বুঝি আহারে বন্ধুর মতো। দুই হাতে খালি কাদা উজ্জ্বল সড়কের চেটোয় হামা দিয়ে মাথা গুঁজে এইখানে হ্যাঁ এইখানেই তো রেখেছিলাম, কোথায় গেলো শহরের শবের ছোট্ট লাশের মতো ব্যাগটা, সোনা নাকি? না। মুক্তোর মালা? না না, উৎসবের দর্পনে লম্বমান আর তারার ঝুলির ভেতর কোনোখানে নেই তেমন হৃদয়, দিয়েছে কর্মের ত্রাণহীন ব্যর্থসম সঞ্চয়। গর্তটা আমার আহত স্বরূপখানা কিছুই পড়ে না চোখে, ওটা কী! লুক্কায়িত বেদনার দানা, ঝরা দিনের দাহ, যাকে ফুল মনে করে হাতে নিয়েছিলাম। আজ কাদায় ডোবানো কব্জিতে আরও খুঁড়ে যেতে হবে, কতটুকু যেতে হবে ধমনীর লুকানো গহ্বরে নেমে পাশের ক্ষুদ্র নদীটাকে দেখে উবুড় হয়ে মহিষের মতো জল টেনেছি মুখে মাঠে মাঠে বেড়াতে। পেয়েছি পেয়েছি, বিশ্বব্যাপী অস্তির স্বর্ণরঙ ফলে হারিয়ে কি সে আত্মলোপী বীজ। মাটির গভীরে পুঁতে আরও মাটি চাপা দিয়ে জীবনের শব যেন হেঁটে এসেছি এইখানে। আজ গর্তটা খুঁড়ে দেখি ন্যূনতম ত্রুটির মোহে নিজের একক দেহ টেনে মানবজীবন কাকে বলে, এগিয়ে এসে কেউ আমাকে করেনি জিজ্ঞাসা।

আমাদের প্রচুর ভালোবাসতে হবে

ওরা আমাকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে চায়
কিন্তু জানে না আমি হলাম বারোমাসি বীজ
যে কোনো স্থানে কালে রক্ত উত্থিত সংক্ষুব্দ স্বভাব
আজ লাশ ডিঙিয়ে যদি ভালোবাসতে যাই চোখটা কেটে যাবে
যদি রক্ত ভুলে ঘুমে যাই তাহলে স্বপ্নে পা পিছলে যাবে
আজ এক মুঠো ভাতের জন্য কেনো এতো বঞ্চনা
কেনো আমার বাজারের ব্যাগটা শীর্ণ?
আমি কি পলকহীন দৃষ্টিতে শুধু চেয়েই থাকবো
রুগ্ন হাতে জড়িয়ে ধরবো একেক পথচারীর পা!
কিন্তু আমি হলাম জিহ্বায় তালুতে ওষ্ঠে
প্রচণ্ড বেদনায় আর্তনাদ করা বিক্ষুব্ধ নীল
যে দৃষ্টি জাতীয় মুক্তির তরঙ্গে দোলে
যে ওষ্ঠে শত কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ওঠে
আর ঘৃণা করোনা ভালোবাসো, নয়তো পরাজিত হবে
হাত থেকে সোনার সমর্থন কেড়ে নিয়ে বিমুখ মানুষ উজ্জ্বল
জীবনের থেকে অন্ধকারে
ছুঁড়ে দেবো জননী ও সন্তানের নরম ভেজা অশ্রু
কারা তরুণ প্রতিভাকে মেরে গড়তে চায় দলদাস!
মুঠোবন্দী শিশু-প্রজাপতি যেমন স্বেচ্ছাচারের পতাকায় শোকের
লাল সূর্যের দিকে
দু’চোখের পাখি উড়বে কোথায় আজ?
আজ এই হত্যার কাছে পরাজিত মুখের তিলোত্তমা
এমন কোনো নেতার বুকে ভালোবাসা জাগাতে পারেনি
এমনকি একটি ব্যর্থ প্রজন্মও ঠেকাতে পারেনি
সমগ্র মন এখন বিষ্ঠামগ্ন কুকুরের খাবার
যেন ব্যক্তিগত উন্নতির জন্যই পৃথিবীতে জন্ম নিয়েছে সবাই
চায় দুঃখিত দরিদ্র হাতে আমিও স্পর্শ করে থাকি নেতার চেয়ার
কিন্তু আমাকে তো তোমরা চেনো
খুনির মগজ খুঁড়ে তুলে নিতে জানি হত্যার পরিকল্পনা
বিষধরের গলা চেপে বোতলে জমাতে পারি তীব্র তিক্ত বিষ
হাত পিষে কেড়ে নিতে পারি গতজন্মের উজ্জ্বল সমর্থন।
হত্যা থামাও আর প্রচুর ভালোবাসো
বিনাশ নয়, প্রেমিকের-যুবতীর-শাসকের হৃদয়ের পরিবর্তন চাই
আমাদের প্রচুর ভালোবাসতে হবে।

স্বীকৃতি

একা হয়ে যাওয়া এতো সোজা না। বহু কষ্টে আমি একা হয়েছি। নিজেকে নিজে পরাজিত করা একটা শক্তি। পৃথিবী অন্য সব মানুষ থেকে যা গোপন করে, একাকীত্ব তাই খোলাসা করে। একাকীত্বই সৎ, সঙ্গবদ্ধতা মানে সন্ত্রাস। আমি একা। পৃথিবীর সব প্রেমের গল্পে এটাই হয়ে এসেছে। যেদিন চুল আঁচড়াই না সেদিনও মানুষ বলে ‘আপনি কি সুন্দর!’ অথচ কেউ আমার একাকীত্বের প্রশংসা করে না। মানুষ আমার প্রকৃত সুন্দর ব্যাপারটিকে স্বীকৃতি দিতে চায় না।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.