এড্রিয়েন রিচের কবিতা: “জেনিফার কাকির বাঘেরা” ও “শক্তি”

নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান | ১ জুলাই ২০১৮ ৩:২১ অপরাহ্ন

ভূমিকা ও অনুবাদ: নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান

মার্কিন নারীবাদী কবি ও প্রবন্ধকার এড্রিয়েন রিচকে (জন্ম-১৯২৯, মৃত্যু-২০১২) বলা হয়ে থাকে বিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের অন্যতম বহুলপঠিত কবি। সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন নারীবাদের দ্বিতীয় তরঙ্গ (১৯৬০-১৯৮০) এবং মার্কিন নাগরিক অধিকার আন্দোলনে (১৯৫৪-১৯৬৮)। তার শক্তিশালী লেখনীতে ফুটিয়ে তুলেছেন নারীজীবনের নানান বেদনা, সঙ্কট আর অধিকার আদায়ের নানান চড়াই-উৎরাই। প্রবন্ধের পাশাপাশি কাব্যের মাধ্যমেও নারীর কথা পৌঁছে দিয়েছেন পাঠকের কাছে। নারী ও সমকামীদের অধিকারের বিষয়ে সোচ্চার এই লেখিকা নিজে যেমন আলোচিত হয়েছেন, তেমনই আলোড়িত করেছেন বিশ্ববাসীকেও। ১৯৫১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আ চেইঞ্জ অফ ওয়ার্ল্ড পড়ে প্রখ্যাত কবি ডব্লিউ. বি. ইয়েট্স তাকে মনোনীত করেন “ইয়েল সিরিজ ফর ইয়ং পোয়েট্স অ্যাওয়ার্ড”-এর জন্য। এরপর ধীরে ধীরে তার আরো অনেক প্রবন্ধ ও কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বহু পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন তিনি।

“অ্যান্ট জেনিফার্স টাইগার্স” কবিতাটি এড্রিয়েন রিচের প্রথম কাব্যগ্রন্থ আ চেইঞ্জ অফ ওয়ার্ল্ড (১৯৫১)-এ প্রকাশিত হয়। একজন প্রবীণ নারীর জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও প্রাপ্তি এ কবিতার মূল বিষয়বস্তু। হয়তো বিষয়ের সাথে মিল রেখেই কবিতাটির গঠনশৈলী কিছুটা সেকেলে ধাঁচের- অনেকটা প্রথাগত পদ্যের মতো নিয়মতান্ত্রিক। এখানে এমন এক নারীর কথা উঠে এসেছে যে সারা জীবন তার প্রয়োজন ও স্বপ্নকে অবদমিত রেখে প্রচলিত রীতি-নীতির ছাঁচে নিজেকে চালিত করতে বাধ্য হয়। ঠিক যেন কলুর বলদের মতো জীবন। গৎবাঁধা পথের বাইরে যাবার কোন অনুমতি নেই তার। সমাজের বিধি-নিষেধের ঠুলি ভেদ করে বাইরের পৃথিবী দেখারও সুযোগ পায়না সে। নিজের একান্ত ভাবনাগুলো প্রকাশ করার স্বাধীনতাটুকু নেই। তবু এই নারী সঙ্গোপনে তার আজন্ম লালিত স্বপ্নের স্বাক্ষর রেখে যায় তার সূচিকর্মের মাঝে। তার নিজস্ব সৃষ্টি এই শিল্পকর্মই যেন তার স্বাধীন ভাষা। এভাবেই সে তার অদম্য স্বপ্নকে সময়ের গন্ডি পেড়িয়ে ছড়িয়ে দিতে চায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

“পাওয়ার” কবিতাটি এড্রিয়েন রিচের দ্য ড্রিম অফ আ কমন ল্যাঙ্গুয়েজ: পোয়েম্স ১৯৭৪-১৯৭৭ নামক কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা। বইটি ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয়। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী মাদাম মেরি ক্যুরির (জন্ম-১৮৬৭, মৃত্যু-১৯৩৪) প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতাটি লিখেছেন তিনি। যে যুগে সমগ্র পৃথিবীতেই নারীশিক্ষা ছিল দুর্লভ, মেরি ক্যুরি সেই অন্ধকার সময়ে নিজেকে প্রজ্জ্বলিত করেছেন নারী ইতিহাসের এক উজ্জ্বল মশাল হিসাবে। মশালের মতোই নিজেকে জ্বালিয়ে আলো ছড়িয়ে গেছেন। সর্বশক্তি দিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার ঠেলতে ঠেলতে নিজে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। তবু সহ্য করে গেছেন নিরবে। বিশ্ববাসী তার সাফল্যের কথা যতটা জেনেছে, তার যন্ত্রণার ব্যাপারে তাদের জানার পরিধি ততটাই কম। তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে গবেষণা করতে করতে বিকিরণজনিত বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। শারীরিক কষ্ট উপেক্ষা করে তার গবেষণা চালিয়ে গেছেন। মাদাম ক্যুরি তার ক্রমবর্ধমান অসুস্থতার বিষয়টি সম্পর্কে যথেষ্ট উদাসীন ছিলেন। কে জানে, হয়তো নিজের কষ্টের কথা স্বীকার করে তাকে দেখে অনুপ্রাণিতদের হতোদ্যম করতে চাননি; অথবা হয়তো কারো সহানুভূতি কুড়াতে চাননি এই নিভৃতচারী বৈজ্ঞানিক।
মুক্ত ছন্দে রচিত “পাওয়ার” কবিতাটি মোট চারটি স্তবকে বিভক্ত। কবিতার গঠনশৈলিতে যথেষ্ট অভিনবত্ব চোখে পড়ে। কবিতায় কিছু কিছু শব্দের পর স্বাভাবিকের তুলনায় দীর্ঘ যতি ব্যবহৃত হয়েছে। কবি যেন থেমে থেমে, খানিকটা বিরাম নিয়ে কোন কঠিন সত্য উচ্চারণ করছেন যা স্বাভাবিক গতিতে বলে গেলে তার জন্য বলতে এবং পাঠকদের জন্য গ্রহণ করতে কষ্টকর হবে। অথবা হয়তো একটানা পড়ে গেলে পাঠকের পক্ষে কবির বক্তব্যের গভীরতা উপলব্ধি করা দুরূহ হবে। কারো কারো মতে, এই দীর্ঘ যতি বা নিরবতার মাধ্যমে কবিতায় কিছু শব্দ উহ্য বা অনুচ্চারিত রাখা হয়েছে। হয়তো এখানে এমন কিছু শব্দ ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল যা কবি নিজে উচ্চারণ করতে চাননি। রেখে দিয়েছেন পাঠকদের ভাবনার খোরাক হিসাবে। যেন মৌনতাও এখানে এক ধরনের অন্তর্নিহিত শক্তির ইঙ্গিত করে। রবি ঠাকুরের ভাষায় বলা যায়, “অনেক কথা যাও যে ব’লে কোনো কথা না বলি…” আবার কারো অভিমত এই যে, যতির এহেন ব্যবহার কবিতার মাঝের গ্রন্থিগুলোকে কিছুটা আলগা করেছে। যেন বাক্যের আঁটসাট বন্ধন থেকে কাব্যকে খানিকটা মুক্তির নিঃশ্বাস পাইয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রথাগত নিয়ম থেকে আলাদা এই শব্দবিন্যাস কবিতায় নিঃসন্দেহে এক আধুনিক মাত্রা যোগ করেছে। এ ব্যাপারে কবির বক্তব্য জানা গেলে অনুবাদকের পক্ষে এর সঠিক কারণ বুঝতে সুবিধা হতো। তবে উপরোক্ত সম্ভাব্য কারণগুলো বিবেচনায় রেখে এবং কবিতার মূল গঠনশৈলির প্রতি সম্মান জানিয়ে অনূদিত কবিতায়ও কিছু কিছু জায়গায় দীর্ঘ যতি ব্যবহার করা হয়েছে।
কবিতা দু’টি যেন নারীর প্রতি নারীর সমবেদনা ও শ্রদ্ধাঞ্জলী। পক্ষান্তরে এই সহমর্মিতা একজন নারীর কাছে তার নিজস্ব শক্তিরই একান্ত উপলব্ধি। কবিতাগুলো দৈর্ঘে সীমিত হলেও বক্তব্যে অপরিসীম। পাঠককে বারংবার ভাবায়। সজোরে কড়া নাড়ে বিবেকের দরজায়। দু’টি কবিতাই যেন মনে করিয়ে দেয় যে নারীর নিরবতা মানে তার দুর্বলতা নয়। শক্তি, সৌন্দর্য, রহস্য আর ঐশ্বর্যে নারী অতল সমুদ্রের চেয়ে কম কিছু নয়।
এড্রিয়েন রিচের “অ্যান্ট জেনিফার্স টাইগার্স” আর “পাওয়ার” কবিতা দু’টি যথাক্রমে “জেনিফার কাকির বাঘেরা” আর “শক্তি” শিরোনামে অনূদিত হল।

জেনিফার কাকির বাঘেরা

জেনিফার কাকির বাঘেরা সব দাপিয়ে চলে পর্দাজুড়ে;
সবুজ বনের হলুদ বরণ জাতকেরা বেড়ায় ঘুরে।
গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোকে পায় না তো ভয়;
বীরের মত হয় আগুয়ান দৃপ্ত পায়ে অকুতোভয়।

কাকির হাতের আঙুলগুলো রঙিন সুতায় স্বপ্ন বোনে;
আঙুলে অস্বস্তি, তবু বোনেন কাকি আপনমনে।
কাকার দেয়া বিয়ের স্মারক চেপে বসা আঙুলে তাঁর;
আংটি তো নয়, বেড়ি যেন- জগদ্দল এক প্রস্তরভার।

মরণ এসে টানলে বিরাম, হাত দু’টো তাঁর হবে নিথর;
বিদায়বেলায় সঙ্গী তবু, নিয়মনীতির কঠিন নিগড়।
সুতায় বোনা বাঘগুলো তাঁর অনন্তকাল চিত্রপটে
এমনি করে দুঃসাহসে, গর্বভরে চলবে ছুটে।

শক্তি

মূল কবিতার অনুসারে শব্দবিন্যাসের ক্ষেত্রে এই সাইটটিতে সীমাবদ্ধতার কারণে কবিতায় ব্যবহৃত দীর্ঘ যতিগুলো এই চিহ্ন […] দিয়ে বোঝানো হয়েছে।

আমাদের ইতিহাসের […] পাতালে […] তার অবস্থান।

আজ এক খননযন্ত্র […] ক্ষয়িষ্ণু ধরণীর পাঁজর খুঁড়ে […] উন্মুক্ত করেছে
এক বোতল […] মৌ-রঙা মহৌষধ,
শতবর্ষের জ্বর […] কিংবা জরার […] অব্যর্থ নিরাময়
পৃথিবীর এ প্রান্তের নিরুত্তাপ জলবায়ু আর প্রবল শৈত্যে […] বাঁচার জন্য
সঞ্জীবনী সুধার খনি।

আজ পড়ছিলাম মেরি ক্যুরির কথা:
তিনি যে বিকিরণ বিষের শিকার, […] নিশ্চয়ই নিজেও জেনেছিলেন তা।
নিজেরই শোধিত পদার্থের তেজে […] বহু বছর ধরে
শরীর হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত
একটু একটু করে।
যেন শেষ পর্যন্ত অস্বীকার করে গেছেন
দু’চোখের ছানির উৎস আর
আঙুলের […] দগদগে, ফাটা […] ডগাগুলোর ব্যথা
যতক্ষণ হাতে ছিল […] পেন্সিল বা টেস্টটিউব ধরার ক্ষমতা।

প্রয়াণকালে […] খ্যাতির শীর্ষে, তবু […] আমৃত্যু অগ্রাহ্য করে গেছেন
নিজের সমস্ত ক্ষত;
অস্বীকার করে গেছেন যে
তাঁর শক্তি […] এবং ক্ষত […] আসলে একই উৎসজাত।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Tiba — জুলাই ১, ২০১৮ @ ৭:১১ অপরাহ্ন

      May ALLAH bless you. Wonderful writing. Lots of best wishes.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Noor-E-Fatima Mosharraf Jahan — জুলাই ১, ২০১৮ @ ৯:৩৯ অপরাহ্ন

      Thank you for appreciating my work, Tiba.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — জুলাই ২, ২০১৮ @ ১:৫৪ অপরাহ্ন

      সুতায় বোনা বাঘগুলো তাঁর অনন্তকাল চিত্রপটে
      এমনি করে দুঃসাহসে, গর্বভরে চলবে ছুটে।

      চমৎকার সিম্বলিক একটি কবিতা “জেনিফার কাকির বাঘেরা” আর অনুবাদ হয়েছে যথেষ্ট চমৎকার। অনুবাদ ভালো লেগেছে বিশেষত প্রথমটি। আন্ট জে মৃত্যুবরন করেছেন কিন্তু ট্যাপেস্ট্রিতে বাঘগুলো চমৎকার সজীবতা নিয়ে বেঁচে রয়েছে, আর্টের মজাটি ঠিক এখানেই।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান — জুলাই ২, ২০১৮ @ ৪:৫৪ অপরাহ্ন

      @ আশরাফুল কবীর
      আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। সত্যিই শিল্পের আবেদন চিরকালের।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com