বইয়ের আলোচনা

হারিয়ে ফেলা প্রেম ও বিপ্লবের উপাখ্যান

ফিরোজ এহতেশাম | 29 Jun , 2018  

আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের একজন সংবেদনশীল মানুষ, যে কবি হতে চেয়েছিল, চেয়েছিল সর্বগ্রাসী প্রেম ও উত্তুঙ্গ বিপ্লব। অথচ জীবনের বাঁকে বাঁকে যে হারিয়ে ফেলেছে তার স্বপ্ন, কবিতা। যার মাঝে এখন বোবা আর্তনাদের মতো এক উপলব্ধি বিরাজ করে-যে জীবনটা সে চেয়েছিল, এটা সে জীবন নয়। পরিকল্পনা নেই, স্বপ্ন নেই, কবিতা নেই, বিপ্লব নেই। নির্লিপ্ত দাম্পত্য জীবনে মাস শেষে বেতনটাই যার একমাত্র লক্ষ্য। পুরো বছর কেটে গেলেও নিজের কথা যার নিজেরই মনে পড়ে না। যে আসলে হারিয়ে ফেলেছে নিজেকেই।
মাহবুব মোর্শেদের উপন্যাস তোমারে চিনি না আমি পড়ে এমনই এক বিষাদে আচ্ছন্ন হতে হয়। বিষাদটা উপভোগ করি।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র রানা রহমান। মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে কৈশোরেই যার ‘অনিবার্য’ প্রণয় ঘটে কাজিনের সাথে। এখানে কাজিন তার খালাতো বোন।
কিছুটা এলোমেলো জীবনযাপনকারী, পরিবার-বিচ্ছিন্ন, বাস্তব ও স্বপ্নের মাঝামাঝি পথ ধরে হেঁটে যেতে থাকা রানার কত বিকাল খরচ হয়ে যায় উৎপ্রেক্ষার খোঁজে নদী তীরে ঘুরে ঘুরে। কলেজে থাকতে জড়িয়ে পড়ে বিকর্ত প্রতিযোগিতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আবৃত্তি সংগঠনে। আরও পরে রাজনৈতিক দলে।
নুরুননাহার, লুৎফুননাহার, মিলা, মিথিলা, পপি, রোজ- কৈশোর ও যৌবনের যাত্রাপথে এই ছয় নারী চরিত্রের সাথেই পর্যায়ক্রমে প্রেম হয় রানার। কোনাটা একপাক্ষিক, কোনোটা দ্বিপাক্ষিক। তবু শেষ পর্যন্ত মনে হয় যে প্রেম সে চেয়েছিল সেই আরাধ্য প্রেম তার জীবনে আসেনি। তাই চূড়ান্তভাবে এক শূন্যতা ও একাকীত্ব গ্রাস করে তাকে। শেষাবধি সব প্রেম এক ধুসর অতীতে পরিণত হয়।
আর আছে এক রহস্যময় চরিত্র সরদার। যে নিজের সম্পর্কে তেমন কিছুই জানায় না। তবে একসময় বোঝা যায় সে মার্ক্সেও আছে, লালনেও আছে। সে রানাকে পথ দেখায় কিভাবে একজন কবির জীবন গড়ে তুলতে হয়। রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের বিরোধী না হলেও সরদার সচেতনভাবে রানাকে এসব থেকে দূরে রাখতে চায়। এই পথপ্রদর্শক চরিত্রটি রানাকে শুধুই কবিতার প্রতি মনোনিবেশ করতে বলে। সরদার বলে, রানার জন্য সরাসরি বিপ্লবের পথ নয়, তার পথ কবিতার। কবিতার মধ্যেই আসবে বিপ্লবের ইঙ্গিত।

কিন্তু রানার রক্তে একই সঙ্গে খেলা করে প্রেম ও বিদ্রোহ, কবিতা ও বিপ্লব। বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে অংশ নেয় আন্দোলন-সংগ্রামে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে তাকে দেখা যায় মিছিলে। নেতা হয়ে ওঠে সে। কিন্তু সেই আন্দোলন এক অর্থে ব্যর্থ হয়। অন্য অর্থে সেটা সফল, কেননা তা সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে অধিকার ও সেই অধিকার আদায়ে সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার বোধ জাগ্রত করতে পেরেছিল- ভাবে রানা। একই সাথে চলে সংবাদপত্রের চাকরি। আর এসবের আগ্রাসনে কবিতা যেন তার কাছ থেকে ধীরে ধীরে ধূসর স্মৃতির মতো দূরে সরে যেতে থাকে।
এ উপন্যাসে প্রেম ও যৌনতা বেশ ভালোভাবেই, বড় অংশজুড়েই আছে। এর প্রকাশভঙ্গিটাও আড়ষ্টতাহীন, স্বাভাবিক। প্রেম ও যৌনতা নিয়ে চরিত্রগুলোর আছে নানা রকম ব্যাখ্যা। কেউ প্রেম ও যৌনতাকে পরিপূরক হিসেবে ভাবে, কেউ-বা যৌনতাকে প্রেমের হাত থেকে মুক্তি দিতে চায়।
মাহবুব মোর্শেদের গল্প বা উপন্যাসের ভাষার সাথে আমার ঘনিষ্ট পরিচয় আছে। এ উপন্যাসে তার ভাষাভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে বলেই আমার মনে হলো। এ উপন্যাসের ভাষা অনেক সহজ-সরল, সোজা-সাপ্টা, পাঠকের সাথে অনেক বেশি যোগাযোগ-সক্ষম। এই ‘সহজতা’ কিন্তু সহজে আসেনি। এর পিছনে যে পরিশ্রম তা লেখক এমনভাবে লুকিয়ে ফেলেছেন যা পাঠকের হয়ত কোনোদিন গোচরেই আসবে না। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে সাবলিল যাতায়াত ও এই কাল পরিক্রমার ভিতর দিয়ে জীবনের নানা উপাদানকে উপস্থাপনের জন্য যে বুননশৈলী নির্মাণ করা হয়েছে উপন্যাসটিতে, তা একে বিশিষ্টতা দান করেছে।
উপন্যাসটির কিছু জায়গা আপনাকে জাদু-বাস্তবতা বা স্বপ্ন-বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিবে কিংবা দিবে না। কেননা সেটা প্রকট নয়, এমনভাবে উপন্যাসের কাঠামোর সাথে খাপ খেয়ে গেছে যে সেটাকেই স্বাভাবিক বলে মনে হয়।
উপন্যাসটি পাঠকের স্মৃতিকে উসকে দেয়। কিছুটা সরলীকরণ হলেও এই উপন্যাসের যারা পাঠক তাদের বেশিরভাগই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন বা করছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। এটাও ধরে নিলে অতিরঞ্জন হবে না যে তারা শিল্প-সাহিত্যমনা ও রাজনীতি সেচতন। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এসব অভিজ্ঞতা সংশ্লিষ্ট বিষয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক নানান অনুষঙ্গ তাদের স্মৃতিকে যে উসকে দিবে সেটাই স্বাভাবিক।এতে করে উপন্যাসটিকে বেশ ‘আপন আপন ’ বলে মনে হবে। বইটি পড়ে এক ধরনের আত্ম-আবিষ্কার বা আত্মপোলব্ধির অনুভূতি জাগাটাও তাই অস্বাভাবিক হবে না।
এছাড়া চটি সাহিত্যের দিন, কিশোরের অতি হস্তমৈথুনজনিত হস্তরেখা মুছে যাওয়ার শঙ্কা, প্রথম গভীর স্পর্শের মুহূর্তে প্রেমিকার কণ্ঠনিসৃত ‘এখন না, পরে’, সেই ‘পরে’র জন্য প্রেমিকের অস্থির প্রতিক্ষার মতো নানা অনুষঙ্গ প্রত্যেকের জীবনেই কম-বেশি আছে। এসব ছোট ছোট পর্যবেক্ষণও উপন্যাসটিকে একটি সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য দান করে।
এ উপন্যাসটি শুধু আমাদের সমাজের মানুষগুলোর পরস্পরকে না চিনতে পারার, না চিনতে দেওয়ার আলেখ্যই নয়,নিজেকেও না চেনার মর্মান্তিক উপাখ্যান। বইটি পড়া শেষে ফ্ল্যাপের কথাগুলোকে যথার্থই মনে হয়- ‘… উত্তর বাংলার এক বিশ্ববিদ্যালয় শহরে শুরু হয়ে এ কাহিনি প্রদক্ষিণ করে এসেছে একটি প্রজন্মের মানসপট। একাধারে এ গল্প ব্যক্তিমানুষের এবং সময়ের নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস।’
উপন্যাসটি পাঠ করলে তা পাঠকচিত্তে দীর্ঘদিন ধরে অনুরণন তুলতে থাকবে বলেই আমার বিশ্বাস। এই সাহিত্যকর্মের জন্য মাহবুব মোর্শেদকে সাধুবাদ।

তোমারে চিনি না আমি
মাহবুব মোর্শেদ
প্রকাশক: আদর্শ
প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রচ্ছদ: আতিক দেওয়ান
পৃষ্ঠা: ২০৮
মূল্য:৩৮০ টাকা
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.