ভ্রমণ

মোঁপাসার ফেকায়

ikhtiar_chowdhury | 15 Jun , 2018  

লুক্সেমবুর্গ বাগানের পাশেই ‘আন্তর্জাতিক লোক প্রশাসন ইনস্টিটিউট’। আটলান্টিক সাগর পাড়ের ফেকা যাত্রা সেখান থেকেই। ওই প্রতিষ্ঠানে আমরা জড়ো হয়েছি ৩৩টি দেশ হতে। তরুণ কুটনীতিবিদ আর প্রশাসকদের জন্যে এক বছর মেয়াদী কোর্সে আপাতত সবাই ছাত্র। প্যারিসে যতগুলো সুন্দর জার্দা বা বাগান আছে তার মধ্যে লুক্সেমবুর্গ একটি। পাশেই সিনেট ভবন। বাগানে নিসর্গ প্রেমীদের জন্যে চমৎকার বৃক্ষের সারি, ছাটা ঘাস, দীঘি, নানা রকম পাখি ও কবুতরের ঝাঁক সেই সাথে বসার জন্যে ছড়ানো চেয়ার।
১৯৯২ সাল। ইউরোপে এখন গ্রীষ্ম। ভোর ছটায় আমাদের লুক্সেমবুর্গ পৌঁছুতে বলা হয়েছে। তাতে খুব একটা অসুবিধে নেই। তাপমাত্রা গড়ে ১৬-১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া এত চমৎকার যে আমেরিকা আর কন্টিনেন্টের নানা প্রান্ত থেকে শানানো তরুণী আর তুখোড় যুবকেরা ছুটে আসছে প্যারিসে। গরমের কয়েকটি দিন প্রাণ খুলে র‌্যালা করতে। কিন্তু তারপরেও কথা থেকে যায়। প্রায় প্রতি সকালেই কুয়াশা জমে। ঠাণ্ডা। সূর্য আমার ঘুম ভাঙ্গাক এই আশায় প্রতিদিন আমি আমার চারতলার কাচের জানালার পর্দা সরিয়ে রাখি। কিন্তু তিনি ওঠেন দেরিতে। ততক্ষণে বেলা প্রায় আটটা। বিদেশি ছাত্রছাত্রিদের জন্যে আবাসিক এলাকা সিতে ইউনিভারসিতেয়ারে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডের ছেলে মেয়েদের হল ‘কলেজ ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিক’-এ পাকভারত উপমহাদেশ থেকে থাকছি চারজন। আমি ছাড়া মিয়ানমারের চো টিন্ট আর পাকিস্তানের নাসির আজহার ও শেরওয়ানী। তিনজনেই স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে ভাস্বর। ভেতরে ভেতরে বাঙালিদের প্রতি চো’র রয়েছে প্রচণ্ড নিচু ধারণা ও উন্মাষিকতা। সে এত লাজুক ও ভীত যে তা বাইরে প্রকাশের সাহস নেই। শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা নাসির যে পরিমাণ সরল, শেরওয়ানী সেই পরিমাণ ধূর্ত। যে কারণে তার সঠিক পেশা আমরা আজও উদ্ধার করতে পারিনি। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আমার সহপাঠী আর ইউরোপীয় শিক্ষকদের সামনে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৭১-এ পাকিস্তানিরা ত্রিশ লক্ষ মানুষ হত্যা, দুলক্ষ নারী ধর্ষণ এবং প্রায় এক কোটি বাঙালিকে ভারতে বিতাড়নের মধ্য দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ করেছে তা বলার পরও নাসির আর শেরওয়ানী সম্পর্ক বজায় রাখতে কুণ্ঠিত নয় দেখে আমিও ওদের সাথে মিশছি অন্যান্যদের মতোই।

তো সেই তাদের একজন নাসিরকে বলে রাখলাম রাত সাড়ে চারটায় আমাকে জাগিয়ে দিতে। চল্লিশ পেরুনো বউ ছেড়ে যাওয়া নাসির এত বিনয়ী ও প্রতিক্রিয়াহীন যে আমরা নির্বিবাদে তাকে আক্রমণ করে আসর গুলজার করি। তাকে নিয়ে প্রতিনিয়ত আমাদের মাঝে কাহিনির জন্ম হয়। যেমন প্যারিসে আসার আগে ভিশিতে আমরা এক বছর ফরাসি ভাষা শিখেছি। শেষের দিকে ক্লাসে যোগ দিল কলম্বিয়ার মেয়ে মার্শেলা। সে নিও মার্ক্সিস্ট, আচার-আচরণে উদার আর একটি বিশেষ ব্যাপারে বেপরোয়া। নাসিরের সাথে বেশ বন্ধুত্ব। ভিশিতে একটি টার্ম পেপার তারা যৌথভাবে করেছে। প্যারিসে ফিরে ক্লাসবিহীন পনের দিনে তাদের ঘনিষ্ঠতা আরও নিবিড় হয়েছে বলে রটনা হতে থাকে। একটি ক্ষুদ্র কাহিনির জন্ম হয় তখন। এক বিকেলে নাসির টাই আর কোটের বগলে সুগন্ধি মেরে মার্শেলার দরজায় টোকা দেয়। এলোমেলো পোশাকে তাকে ভেতরে বসায় মেয়েটি। আড়ষ্ট নাসির বসে আবিষ্কার করে বিছানায় শুয়ে আছে ভিশিতে মার্শেলার নাচ সঙ্গী ফিলিপ। গল্প এ পর্যন্তই। নাসির আমাদের সাথে সমান তালে এসব উপভোগ করে। পরবর্তীতে এর চে কড়া গুজবেও তাকে টলানো যায়নি। প্রায় দুবছর সাহচর্যকালীন সময়ে সে আমাদের কাছে নিরেট আনন্দ পিণ্ড হয়ে আছে।
সিতে ইউনিভারসিতেয়ার থেকে লুক্সেমবুর্গের দূরত্ব মেট্রোতে মাত্র তিন মিনিটের পথ। মাঝে মাত্র দুটি স্টেশন। আমেরিকায় যেমন সাবওয়ে, লন্ডনে যেমন টিউব তেমনি প্যারিসের পাতাল রেল হচ্ছে মেট্রো। চো যেমন লাজুক আবার একান্ত পরিবেশে দারুণ রসিক। মাঝে মধ্যে ওর রসিকতা নির্দয়তার পর্যায়ে পড়ে। নাসিরের পরিবর্তে সে আমাকে ভোর সাড়ে চারটার বদলে এক ঘণ্টা আগে জাগিয়ে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিল। ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিকের সামনের রাস্তা পেরুলেই মেট্রো স্টেশন সিতে। সেখানে পাঁচটায় পৌঁছুলাম নাসির, চো আর আমি। একে একে এল মেক্সিকোর ক্যারোলিনা আর সানজেস, বলিভিয়ার বিয়াট্রিস, মার্শেলা, লিথুনিয়ার চঞ্চল মেয়ে রুতা। জ্যাকেট, ওভারকোটে কান ঢেকে হল্লা শুরু করলাম আমরা। তখনও নেপালি সুবেদী এবং স্বদেশী সৌমিত্রের দেখা নেই। সুবেদী নিজ থেকেই সৌমিত্রকে ফোনে জাগানোর কাজটি নিয়েছিল। এখন দুজনেই লাপাত্তা। মেট্রোর সামনে রাস্তার ধারে তিনটে টেলিফোন কেবিন। সেখানে আটটি টেলিফোন সেট। খানিকবাদে সুবেদী এসে সেখান থেকে সৌমিত্রকে ডাকতে গেল। রুম থেকেও চেষ্টা করেছে সে, পায়নি। সহসা সৌমিত্র আবিষ্কৃত হলো অদূরে। কোমরে ওভারকোটের ফিতে বাঁধতে বাঁধতে দ্রুত হাঁটছে। আবহাওয়া সংবাদে বলা হয়েছে আজ আকাশ মেঘলা থাকবে। আকাশ এখুনি যথেষ্ট অস্বচ্ছ, জোর হাওয়া ছুটছে। তাতে বেড়ে যাচ্ছে শীতের তীব্রতা। সৌমিত্রকে ঘরে পাওয়া যায়নি কারণ সে ভোর রাতে জর্জিয়ার জোহরাবকে দুবার ওঠানোর চেষ্টা করেছে। জোহরাব মুসলিম। ওর নামের উচ্চারণ আমাদের দেশে সোহরাব। গায়ে তখনও বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ধ। সদ্য যোগ দিয়েছে পররাষ্ট্র সার্ভিসে। কিছুদিন আগে আমরা যখন সারাদিনের বেড়ানোয় প্যারিস থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে বুর্জে গেলাম তখন জোহরাব পাঁচমিনিট দেরি করায় মার্শেলার সঙ্গী হতে পারেনি। আমি আমাদের না বলে মার্শেলার বলছি এজন্যে যে সম্প্রতি ওদের বন্ধুত্ব খুব গাঢ় হয়েছে। সিতে ইউনিভার্সিতেয়ারে বিদেশি ছাত্র গবেষকদের জন্যে বিভিন্ন দেশের নামে প্রায় চল্লিশটি হল রয়েছে। যেমন ভারতীয়দের জন্যে মেজো দ্য ল্যান্দ, ডাচদের জন্যে কলেজ নেয়ারল্যান্দেজ। তবে নামকরণ অনুযায়ী সেখানে যে শুধু সেই দেশের লোকজন থাকবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মেজো দ্য ল্যান্দের ভিত্তি প্রস্তর ভারতের প্রয়াত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জনাব হূমায়ন কবীরের হাতে স্থাপিত হয়েছিল। সিতেতে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের নামে কোনো কলেজ বা হল নেই। ওইসব হলের আশপাশের লনে কিংবা পেছনের পার্কে গভীর রাতে ইদানীং জোহরাব মার্শেলাকে আঙুল জড়িয়ে পায়চারী করতে দেখা যায়।
জোহরাব খুব শান্ত ও মজার তরুণ। সেন্ট পিটার্সবুর্গের মেয়ে ওলগার মতো ওরও সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ায় কোনো দুঃখ নেই। ওলগা আমার প্রতিবেশী। ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিকে আমরা মুখোমুখি ঘরে থাকি। এক কিচেনে রান্না করি। পিটার্সবুর্গের মেয়র সোভিয়েত ভাঙায় বরিস ইয়েলৎসিনের ডান হাত ছিল। সেই নগরের ওলগার ধারণা ম্যাক্সিম গোর্কির বিশ্ব বিখ্যাত উপন্যাস ‘মাদার’ বলশেভিক প্ররোচনা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা, চিনের বিরোধিতার বিপরীতে সোভিয়েতের সমর্থনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও প্রশংসা জানিয়ে সোভিয়েত জনগণের নিজস্ব সংগ্রামের ইতিহাস ধারণকারী মাদার গ্রন্থটি সম্পর্কে ওর ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে বলি। ওলগা প্রশংসাটুকু গ্রহণ করে কিন্তু ধারণাটুকু পালটায় না।
সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতান্ত্রিক সমাজ ভেঙে যাবার প্রায় সাথে সাথেই সেখানে জন্ম নিয়েছে পনেরোটি স্বাধীন রাষ্ট্র। প্রাক্তন সোভিয়েত সম্পর্কে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী মানুষদের ধারণা বিদ্রপাত্মক। সে কাহিনির বয়ান আমরা জোহরাবের মুখেই শুনেছি।
প্যারিসের পতিতা পাড়া পিগাল, সেন্ট ডেনিস রীতিমতো বনেদী। পিগাল সম্পর্কে ফরাসিদের শ্রদ্ধাবোধ আজও অক্ষুন্ন। কারণ ফরাসি বিপ্লবের প্রেরণাদানকারি অনেক বুদ্ধিজীবীই এখানে সমবেত হতেন। তাঁদের অনেক রচনাই এখান থেকে সৃষ্ট। তো সেই পিগালে এক রাতে আমাদের জোহরাব হানা দিল। সে এক মায়াবী রাত, ডাকিনী নিশি। খদ্দেরের জন্যে কী নেই পিগালে। সিডা আমরা যাকে বলি এইডস, ভিডিও শো, নগ্ন নৃত্য, জীবন্ত নীল ছবি ছাড়াও রয়েছে রূপোপজীবিনীদের জমকালো আলিঙ্গন। শো-কেসে চমৎকার উপস্থাপনায় সাজানো নকল শিশ্ন, প্রমাণ সাইজ রবার তরুণী, যৌন উত্তেজক সিডি, গর্ভ ও সংক্রামক রোগ নিরোধক সামগ্রী। কৌতুহল প্রিয় দলবদ্ধ তরুণীদের ভিড় শো-কেসগুলোর সামনে। জোহরাব আন্তর্জাতিক খদ্দের। তার চাহিদা ভালো। কিন্তু সে দেহপসারিনীদের খপ্পর এড়িয়ে নগ্ন নৃত্য দেখতে ঢুকল। টিকেট মাত্র ৩০ ফ্রাঙ্ক। প্যারিসে গরিবী করে চিনে রেস্তোরাঁয় একবেলা খেতে যেখানে ন্যূনতম ৫০ ফ্রাঙ্কের (টাকা ৩৫০) দরকার সে তুলনায় এই অঙ্ক কিছুই নয়। তার পকেট স্ফিত না হলেও ১০০ ফ্রাঙ্কের একটি নোটতো রয়েছে। আসন নিলে বিয়ার এল। স্বল্প বসনা তরুণীরা গা ঘেঁষে তার ভাগও নিতে চাইল। জোহরাব ততক্ষণে চুমুক ও সম্মুখে নৃত্যরতার পরিচ্ছেদ খসে পড়ার দৃশ্যে আমোদিত। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে বিল এলে বব্বর বনে গেল সে। আ দেমি (হাফ লিটার) বিয়ার চারশ পঞ্চাশ ফ্রাঙ্ক। বাইরে বার রেস্তোরাঁ বিশেষে যার দাম ১৫ থেকে ২০। জোহরাব বুঝে ফেলে এ হচ্ছে প্রবেশ মূল্য ৩০ ফ্রাঙ্কের ফাঁদ। কিন্তু তার তো কিছু করার নেই। ব্যাটারা বস্ত্রহীন করে তাকে গলা ধাক্কা দিলেও ১০০ ফ্রাঙ্কের একটি নোট পাঁচটি হবে না। তুমুল বচসা চলল। জোহরাবের চামড়া সাদা। সহজে গায়ে হাত উঠবে না তা সে জানে। কিন্তু এই খচ্চরগুলোর আখড়া থেকে পিছলানোর পথ তার অজানা। বাক বিতন্ডায় যখন বেরিয়ে এল জোহরাব সোভিয়েতের নাগরিক তখন বিদ্রুপ করে উঠল লোকগুলো, বেরোও এখান থেকে, শালা রুশ, পয়সা নেই আগে বলবি না।
বর্তমানে সোভিয়েত অর্থনীতির অবস্থা আসলেই খুব নাজুক। মাংস, খাদ্যশস্য ছাড়াও সামান্য পেস্ট, ব্রাশ সাহায্যও তাদেরকে নিতে হচ্ছে ইউরোপীয় সম্প্রদায় থেকে।
শেষ পর্যন্ত আমরা জোহরাবকে ছাড়াই মেট্রোতে চাপলাম। তার অনাগমনে এটাই প্রমাণিত হলো বিলম্বের ক্ষেত্রে সে তার ঐতিহ্য ভাঙতে রাজি নয়। পতিতা পল্লী সেন্ট ডেনিস আর পিগালে কোলাহল খুব কম। ঢাকার রেড লাইট এলাকার মতো এ জায়গাগুলো অত উপেক্ষিত নয়। পাড়া দুটোর মাঝ দিয়ে প্রশস্থ রাস্তা। সেখানে লোক চলাচল নারী পুরুষ নির্বিশেষে স্বাভাবিক। রাস্তার দুপাশে ফ্লাট বাড়িগুলোর দরজায় অপেক্ষমান জনপদবধূদের দাঁড়ানোতে আভিজাত্য। তাদের অধিকাংশই স্বল্প বসনা। কিন্তু বেশভূষার বাহার এমন যেন সবাই বনেদী পরিবারের মেয়ে। রাস্তায় চলাচলরতদের তারা যুগপৎ ঔদাসীন্য ও আগ্রহে দেখে। কেউ কেউ ইঙ্গিতের আশ্রয় নিলেও নিতে পারে। তবে আদিখ্যেতা নেই। কারণ ভাগ্যানবেষী যে আফ্রিকান তরুণীটি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে সেন্ট ডেনিসের ডেরায়, তার শব্দহীন সটান দাঁড়িয়ে থাকা দেখে মনে হবে সেও শিষ্টাচারের প্রতি অনুগত। তবে আমস্টার্ডামের দেহপসারিনীরা আরও জমকালো। সেন্ট্রাল রেল স্টেশনের অদূরেই আবাস তাদের। স্বল্প দৈর্ঘের একটি রাস্তা। সামনে লেক। অবশ্য সমগ্র আমস্টার্ডামই লেকের উপর ভাসছে। শুধু লেক দিয়ে সেখানে জায়গা চেনা একেবারেই অসম্ভব। তো সেই লেকের ধারে কোনো কোনো বাড়ির নিচতলায় কাচঘেরা ছোট্ট কুঠরীতে বারবণিতারা সাজ পোশাকে পণ্য হয়ে থাকে। বিকেলের মরা আলোয় কিংবা রাতের বৈদ্যুতিক ধাঁধায় সে পরিবেশ কেমন তা শুধু পৃথিবীর ভোগী পুরুষেরাই শোনাতে পারবে।
যাত্রাস্থলের প্রধান ফটকে পশ্চিম বঙ্গের কীর্তিদাকে পেলাম। তিনি খুব সজ্জন ব্যক্তি। অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতো ভ্রমণের ব্যাপারেও প্রথম সারিতে। আমাদের অনেক আগে এসেছেন। টানা বাতাস বইছে। তাতে ঠাণ্ডা হয়ে উঠছে অল্পবিস্তর প্রবল কিন্তু ওর জাদুকরী ওভার কোটটি পরনে নেই। উনিশ শ চুয়ান্নতে কীর্তিদার শ্বশুর ডেনমার্ক যাবার সময় কিনেছিলেন ওটি। বহুযুগ পরে কীর্তিদার প্যারিস আসার সুবাদে কোটটি ওয়াড্রোবের বাইরে আসার সুযোগ পেয়েছে। পারমিতা বৌদি বলেন, ‘তোমার দাদা সিম্পল লিভিং হাই থিংকিং-এ বিশ্বাসী।’ বৌদি শান্তিনিকেতনে ইংরেজি সাহিত্য পড়েছেন। ইংরেজি বলেন চমৎকার। কীর্তিদা আর বৌদির মেয়ে ন’দশের উবিনিশা বাংলা, ইংরেজি, হিন্দিতে স্বচ্ছন্দে কথা বলে। ফরাসি শিখছে এখন। উচ্চারণ আমাদের মতো বড়দের চেয়ে অনেক ভালো। বৌদি উবিনিশাকে নিয়ে দিল্লি পাড়ি জমিয়েছেন দুমাস। সুতরাং অতলান্তিক উপকূলের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ঘোরতর যুদ্ধক্ষেত্র নরমান্ডির যাত্রী কীর্তিদা একাই। মিত্রশক্তি আমেরিকা, বৃটেন, কানাডার হাতে নরমান্ডিতে জার্মান বাহিনীর পরাজয়ে লড়াইয়ের বাঁক ঘুরে যায়। বড় ভয়ঙ্কর ও প্রাণ সংহারী ছিল সে সংঘর্ষ। খাবারের অভাবে মিত্র সেনারা জুতো আর বেল্ট পর্যন্ত খেয়ে ফেলে।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি বাসে চাপলাম আমরা। প্যারিস হতে উত্তর পশ্চিমে নরমান্ডি ঘণ্টা চারেকের পথ। কিলোমিটারে দূরত্ব কতটুকু জানা নেই। এ দেশে সব সময়ের হিসেবে হয়। ব্যাপারটা আমাদের মতো নয় যে দূরত্ব যাই হোক সময়ের বিষয়টি অনিশ্চিত। ফ্রান্সে অভ্যন্তরীন রুটে দূর পাল্লার বাস সার্ভিস নেই। আমি কয়েকবার ট্রেনে প্যারিস-ভিশি করেছি। গন্তব্যে পৌঁছুতে বিলম্ব ঘটেনি কখনও। আমাদের ভাড়াকরা বাসটি আরামদায়ক। ভেতরটা বেশ উষ্ণ। দরজার কাছে চা ও কফি ডিস্ট্রিবিউটর। কিন্তু কোনো টয়লেট নেই। তার অবশ্য খুব প্রয়োজনও পড়বে না। হাইওয়েতে মাঝে মাঝেই এর ব্যবস্থা আছে। এ ছাড়া রয়েছে হাইওয়ে ঘেঁষা রেস্তোরাঁ। ফ্রান্সে প্রত্যেকটি রেস্তোরাঁয় দুটি জিনিস থাকবেই। টয়লেট এবং টেলিফোন। কোনো কোনো টয়লেটে গর্ভ এবং সিডা প্রতিরোধের জন্য কনডম। বাসে সবার গলা ছাপিয়ে উঠছে কুতসিয়ানজার স্বর। জায়ারের অধিবাসী তরুণ প্রশাসকটি ভয়ানক কালো এবং তার চেহারায় ওড়াং ওটাং-এর সাদৃশ্য। গড়ে সব আফ্রিকানের চেহারাই অসুন্দর। আমার ধারণা ওদের মুখাবয়ব সুগঠিত হতে আরও একটি শতাব্দী পেরিয়ে যাবে। আফ্রিকা থেকে আসা আমাদের মাঝে সুন্দর নারী হচ্ছে মডেস্টা। কুতসিয়ানজা মাত্র তিরিশ-বত্রিশের টগবগে তরুণ। ফরাসি বলায় রয়েছে সাবলীল গতি। এটি অনেকটা ওদের মাতৃভাষার মতো। বাসে আমরা প্রায় পঞ্চাশ জন। পেছনের দিকে বসে হেভি গল্প করছে সুবেদী আর সে। কুতসিয়ানজা অনবরত কথা ওগরাচ্ছে। মনে হচ্ছে ভালো লাগার সোনালি দোলনায় এধার ওধার করছে। আসরে ভক্ত পরিবেষ্টিত বাবাকে সিদ্ধি সেবনের পর কখনও কখনও এ রকম গুলজার করতে দেখা যায়। তবে কুতসিয়ানজার বিষয়ে আমরা নিশ্চিত সে শুকনো ও ভেজা কোনোটাই স্পর্শ করে না।
আমার সামনের আসনে শাহীনাজ ওর বড় বোনকে নিয়ে। শাহীনাজের মতো ওর বোনও কূটনৈতিক সার্ভিসে। কায়রো থেকে বেড়াতে তার প্যারিস আসা। কীর্তিদা তাকে জিগ্যেস করলেন,
আপনি কি কোনো ডিপ্লোম্যাটিক এ্যাসাইনমেন্টে ছিলেন?
না, তবে তাড়াতাড়িই যাচ্ছি।
কোথায়?
এ প্রশ্নের উত্তর দিল শাহীনাজ।
দুবলা।
সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। শাহীনাজ আর ওর বোনকে ঘিরে আট-দশ জন। কিন্তু কেউই দুবলা জায়গাটি, যা হবে কোনো দেশের রাজধানী কিংবা কোনো উল্লেখযোগ্য শহর, চিনতে পারছি না। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা দৃশ্যত মেধাবী মানুষদের জন্যে এক অস্বস্তিকর মুহূর্ত। দুবলাকে না চিনতে পারার যাতনায় কুতসিয়ানজা এবং সুবেদী যারা হুল্লোর করছে বেশি তারা আরও বেশি বিব্রত। আমি নিতান্তই সাধারণ মানুষ, মাথা এমনিতেই খোলে না এখন আরও বন্ধ হয়ে আসছে আর কেবলি আমাদের গ্রামের বিল ‘দুবলাই’কে মনে পড়ছে। শেষে কীর্তিদাই আড়ষ্টতা ভাঙলেন
দুবলা।
চোখে তাঁর প্রশ্ন।
আমাদের কথা হচ্ছিল ফরাসিতে। শাহীনাজ এবার ইংরেজিতে বলল
ডাবলিন।
কুতসিয়ানজা গাল দুটো ফুলিয়ে মুখ দিয়ে বাতাস ছেড়ে দিল। এশীয়রা না হয় না বুঝল কিন্তু সেও ধরতে পারল না শাহীনাজের ফরাসি উচ্চারণ। একটু ম্রিয়মান হয়ে গেল সে।
শাহীনাজের বোনের পরনে জিন্স। কোমরে বেল্টের পরিবর্তে চেন। শাহীনাজ পরেছে শরীর কামড়ে ধরা থ্রি কোয়ার্টার টাইটস। মিনি স্কার্টও তার প্রিয় পোশাক। এতে ওর উরুর বেশির ভাগ অনাবৃত থাকে বলে খালেদ ডেজুনে নাজের সাথে খুব কম কথা বলে। এ সম্পর্কে খালেদ ডেজুনের বক্তব্য, অশালীন পোশাকে ‘ও’ মিসরীয় মেয়েদের পাশ্চাত্যে ভুলভাবে উপস্থাপিত করছে। খালেদ নামে দুজন মিসরীয় আমাদের সহপাঠী। ওদের পার্থক্য বোঝাতে একজনের নামের সাথে সুবেদী ‘ডেজুনে’ জুড়ে দিল একদিন। এর পেছনে একটি কাহিনি থাকায় সবাই তা লুফে নেওয়ায় নামটি দাঁড়িয়ে গেছে। ফরাসিতে ডেজুনে বলতে বোঝায় মধাহ্নভোজ। আমরা সবাই যেখানে মধ্যাহ্নে রেস্তোরাঁ কিংবা ফাস্টফুড শপে লাঞ্চ করি, খালেদ সেখানে পলিথিন জড়িয়ে একটি ছোট্ট বাটিতে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে এবং খোলা ওয়েটিং স্পেসে প্রকাশ্যে খায়। ডেজুনে একাউন্টস সার্ভিসের একজন কর্মকর্তা। প্রচণ্ড হিউমার ওর ভেতরে। বন্ধুত্বপরায়ণ এই মানুষটির আস্থা মৌলবাদে। মিসরে গামাল আব্দুল নাসেরের সময়কাল থেকে শুরু করে তার এক মৌলবাদী চাচা প্রায় এক দশক জেল খেটেছেন। খালেদের সুক্ষ রসবোধ এবং আলাপচারিতা থেকে আমার ধারণা ওয়েটিং স্পেসে ওর মধ্যাহ্ন ভোজ উদ্দেশ্যমূলক। পাশ্চাত্যের তথাকথিত সভ্যতাকে ‘বিলা’ করার জন্যে সে এসব আচরণ করে যাচ্ছে। তবে শাহীনাজের পোশাক সম্পর্কে ওর মন্তব্য আমার নিরপেক্ষ মনে হয়নি। প্রায় এক মাস আগে কায়রোতে দুমাস অবস্থানকালে দেখেছি মিসরীয় মেয়েরা শাহীনাজের মতো স্কার্ট কিংবা প্যান্ট, শার্ট পরছে। বোরখাপরা মহিলাও দেখেছি পাশাপাশি। কায়রোর জনসংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারীদের পোশাক সম্পর্কে আমার অবশ্য ধারণা নেই। ধারণা নেই মৌলবাদীদের বিচরণক্ষেত্র আপার ঈজিপ্টের মেয়েদের বেশভূষা সম্পর্কেও।
বাস চলছে দ্রুত। পেরিয়ে যাচ্ছে শস্যক্ষেত্র, বনভূমি। যথেষ্ট শীত। কফি আর চা হয়ে গেল এক কিস্তি। কিন্তু ধূমপায়ীদের চায়ের মজায় ঘাটতি থেকে গেল। নাজের ‘মিষ্টি হৃদয়’ তারেক চায়ের পর শেষ সারিতে বসে সিগারেটে আগুন দিলে বাসচালক লাউড স্পিকারে ধূমপান বারণ ঘোষণা করলেন।
আমাদের প্রচলিত ধারণা বাংলাদেশের মাটি খুবই উর্বর। নিসর্গ ঘন সবুজ। এখন চোখের সামনে দ্রুত অপসৃয়মান ফ্রান্সের শস্যভূমি আর গাছপালা দেখে মনে হচ্ছে এখানকার মৃত্তিকাও চাষাবাদ পদ্ধতি অথবা যেকোনো কারণেই হোক খুবই উর্বর। ফ্রান্স বিশ্বে শিল্পোন্নত সাতটি দেশের একটি হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে কৃষি অন্যতম প্রধান খাত। শুনেছি বনাঞ্চলে তারা আদমশুমারির মতো বৃক্ষশুমারি করছে। সেসব তথ্য এখন কম্পিউটারে। ভারসাম্য বজায়ে প্রতি বছর হিসেব করে কাঠ সংগ্রহ এবং বৃক্ষরোপন চলে। চমৎকার আঙুর ফলায় ফরাসি চাষিরা। কোত দ্য রেন, বোর্দো, শ্যাম্পেন অঞ্চলে। শ্যাম্পেন এলাকার আঙুরে প্রস্তুত শতকরা বারো-তেরো ভাগ মদ্যযুক্ত পানীয় ‘শ্যাম্পেন’ পৃথিবীর কোটি কোটি মদ্যপায়ীর স্বপ্ন । প্রতিবেশী দেশ ইতালিতেও ভাল আঙুর জন্মে। লাল আর সাদা মদের বিশ্ব বাজার দখলে দুদেশের তাই চিরকালীন প্রতিযোগিতা। কীর্তিদাকে বললাম, এদের যা প্রাকৃতিক অবস্থা, শীতে তাপমাত্রা যেখানে গড়ে শূন্যের ২০-২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে আর আঙুরের যা উৎপাদন তাতে রুদ্র প্রকৃতি আর অপচয় রুখতে পান না করে উপায়ও নেই।
কীর্তিদা সাত্বিক মানুষ। ভিশিতে পরিচয়ের কিছুদিন পরে সুবেদী তাঁকে প্রস্তাব করে, দাদাকে নিয়ে একদিন বসতে হয়।
দাদা কিছু বলেন না। শুধু মৃদু হাসেন। সে হাসিতে না নাকচ, না প্রশ্রয়। পরের সপ্তাহেই আমরা হানা দেই তার তিনতলার ফ্লাটে। সুবেদী উদার ব্রাহ্মণ। ওর রসিকতা, ‘বাঙালি হিন্দু মদ ছোঁবে না এ যে শাস্ত্র বিরুদ্ধ কাজ।’ আমরা জানতামই না কীর্তিদা ভিশিতেও সংসার করছেন। ওর স্ত্রী পারমিতা আর কন্যা উবিনিশা সশরীরে বিদ্যমান। কীর্তিদা পান করেন না।
আমরা ন্যুডলস্ আর কাজু বাদাম চিবুতে চিবুতে ওর ভায়োলীন শুনলাম। আমার মন্তব্যে কীর্তিদা জবাব দেন, প্রাকৃতিক ব্যাপার একটু থাকলেও থাকতে পারে তবে আসল কথা হচ্ছে যারা খাবার তারা খাবেই।
শুধু তা হবে কেন। অনেক সময় পরিবেশ পরিস্থিতির কারণেও খেতে হয়। আমাদের কথা এগোয় না। বাসে অনুষ্ঠানরত সঙ্গীত উৎসবের মাতমে উৎসাহীরা চালকের পাশের আসনটি নিয়ে স্পিকারে দেশীয় গান শুনিয়ে যাচ্ছে একে একে। তরুণ আমলারা ফিরে গেছে কৈশোর আর প্রথম যৌবনে। এদের মিলিত কলতান আমি শত শত কিলোমিটার ট্রেন ও বাস ভ্রমণে অথবা তুষার প্লাবিত রাতের আলপসে বহুবার শুনেছি তাই কান দেই না। কিন্তু ক্যারোলিনা, মার্শেলা, বিয়াট্টিস ও অগাস্টিন যখন গেয়ে ওঠে একটি লাতিনো কোরাস তখন আমরা মনোযোগী না হয়ে পারি না। ওরা বিভিন্ন দেশের হলেও সবার ভাষা স্প্যানিস। সমবেত গলায় গানটি তাই জমে ওঠে। গানটি ভালো লাগার আরও একটি বড় কারণ লাতিনো লোকজ সুর খুবই মাদকতাময়। দেশীয় একটি বাদ্যযন্ত্রে (ছোটো-বড়ো কয়েকটি বাঁশির সমাহার) লাতিনোরা যখন প্যারিসের সনথ পঁপিদু, মেট্রো স্টেশন সাতলে লেজাল, শ্যাম মিশেল, গার দ্য লিও কিংবা সনজাঁলিজে, লা দিফস, গার দ্যু নর্দে এই সুরে গায় তখন ভিড় জমে যায়। এভাবে অনেক বোহেমিয়ান লাতিন আমেরিকান গেয়ে এবং তাদের গানের ক্যাসেট বেচে উর্বসী প্যারিসে জীবন ছুঁয়ে দেখছে। আমার ধারণা এই লাতিনোদের উপার্জন ভালো এবং তাদের জীবন অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ।
আমাদের গন্তব্য নরমান্ডির ফেকা। ফেকাতে ১৮৫০ সালে জন্মেছিলেন ফরাসি ছোট গল্পের প্রবাদ পুরুষ মোঁপাসা। যিনি মাত্র বিয়াল্লিশ বছর বয়সে দেহান্তরিত হন। পথে আধ ঘণ্টার যাত্রা বিরতি ছাড়া একটানা চলার পর অতলান্তিক পাড়ের ফেকায় উপস্থিত হলাম আমরা। আকাশ মেঘলা। বাসটি দাঁড়াল মহাসাগরের গা ঘেঁষা অনুচ্চ পাহাড়ের সমতলে। সমুদ্রের নীল জল ধোঁয়াটে, স্থির এবং আদিগন্ত বিস্তৃত। সাগরের সান্নিধ্য আমাকে প্রচণ্ড টানে। পৃথিবীর নানা স্থানে যতবারই তার বিশালতার সামনে দাঁড়িয়েছি তা ততবারই আমায় মুগ্ধ বালকে পরিণত করেছে। অথৈ জলের বিস্তারে চোখ রেখে নিজেকে মনে হয়েছে খুব সামান্য। এখানে আমাদের বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান নেই। আটলান্টিক সাগর পাড়ে সি ফুডসে মধ্যাহ্নভোজ এবং ম্যারাথন আড্ডাই প্রধান আকর্ষণ। আর একটি ছোটোখাট পরিদর্শন আছে বিখ্যাত সুরা বেনিডিকশন প্রস্তুতকারী কারখানায়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে টিকে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি উৎপাদনের শতকরা নব্বই ভাগই রপ্তানী করে। কিন্তু আমার মেজাজ চটে গেল আমাদেরকে চার্চে নেওয়া হচ্ছে বলে। বেড়ানোর জন্যে আয়োজিত এ ধরনের প্রোগ্রামে র্চাচ দেখে দেখে আমরা ক্লান্ত। যেখানেই যাচ্ছি প্রায় সবখানেই এ রকম পরিদর্শন থাকছেই। সাথে ভাষণ, ‘এটির নির্মাণ শৈলী রোমান গথিক কিংবা চার্চ করতে একশ বছরের বেশি সময় লেগেছে ইত্যাদি।’ প্রথম দিকে বেশ আগ্রহ অনুভব করেছি। এখন আর পুনরাবৃত্তি শুনতে ইচ্ছে করে না। মসজিদে ঢোকার মতো চার্চে প্রবেশ করতে তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। সবাই অবলীলায় জুতো পায়ে ঢুকে যাচ্ছে। পুরোহিতের মঞ্চের সামনে চেয়ারের সারি। সেখানে বসে প্রার্থনায় যোগ দিতে মুসলিমদের মতো বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবার প্রয়োজন পড়ে না।
ফ্রান্সের দ্বিতীয় বড়ো শহর লিওতে, চার্চের মধ্যযুগীয় একটি ঘড়ি আমাকে মুগ্ধ করেছিল। ঘড়িটি মিনার আকৃতির। গায়ে দরজা। দশ-বারো হাত উঁচু। শত শত বছর পরেও ঘড়িটি সচল। তখন অপরাহ্ন। তিনটের মতো। আমাদের বলা হলো অপেক্ষা করতে। তিনটেয় ঘড়িটির শীর্ষে দণ্ডায়মান ধাতব মোরগটি পাখা ঝাপটিয়ে ডেকে উঠল। বিশেষ ভঙ্গীমায় ভিন্ন পথে ঘড়িটির মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো দুটো নারী মূর্তি ও একটি পুরুষ। পুরুষটি ঘণ্টা বাজালো। ঢং ঢং ঢং। বেলা তিনটে বাজার সময় সংকেত। মানব মানবীর মূর্তিগুলিও ধাতব কলকব্জায় করা। ঘণ্টা ধ্বনির পর তারা ঢুকে গেল ভেতরে।
ইউরোপে একেকটি চার্চ অথবা দূর্গ নির্মাণের সময়কাল জানার পর আগ্রার তাজমহল বিশ হাজার লোকের বাইশ বছরে তৈরির বিষয়টি আর বিস্ময় জাগায় না। প্রকৌশল বিদ্যা আর অর্থের অভাবে দেশ পাত্র নির্বিশেষে মধ্যযুগে বিশাল ইমারত নির্মাণ সময় সাপেক্ষ ছিল এটিই আসল রহস্য যতটুকু না ভবনটির বিশালতা ও অভিনবত্ব।
এখানকার মানুষ যথেষ্ট ধর্ম ভীরু। রক্ষণশীলও বটে। সুযোগ পেলেই তারা বিদেশিদের প্রাচীন সভ্যতা, ইতিহাসের চিহ্ন হিসেবে যেসব নির্মাণ কাজ দেখায় তার শতকরা নব্বই ভাগই ধর্মশালা। মসজিদের শহর ঢাকার মতো চার্চের শহর যে খ্রিস্টান ভূখণ্ডে পাওয়া যাবে না তা বলা সংগত নয়। ফ্রাঙ্কো-ব্রিটানিকে আমাদের চিঠির বাক্সগুলোতে মাঝে মধ্যেই ক্যাথলিক, প্রটেস্টান বিভিন্ন ধর্মগোষ্ঠীর আমন্ত্রণ লিপি পাই। তাতে স্থান ও সময় জানিয়ে বাইবেল পাঠ কিংবা যিশুকে নিয়ে আলোচনার আহ্বান। সুতরাং পাশ্চাত্যের ভোগবাদী সমাজ নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশায় ঈশ্বরকে বিতাড়ণ করছে সে আশঙ্কা সর্বাংশে যেন সবার না থাকে। চার্চ এবং শুঁড়ি কারখানা দেখে আমরা এলাম আটলান্টিক পাড়ে। চার্চের চেয়ে শুঁড়িখানা সবার বেশি মনোযোগ কেড়েছে। কারণ অধিকাংশেরই এ ধরনের জায়গায় প্রথম পদার্পন। কারখানায় সুরা উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়াটি প্রত্যক্ষ করলাম আমরা। এ ধরনের স্থাপনা বিশাল কিছু নয়। প্রবেশ মুখে বেনিডিকশনের উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত নানা ধরনের শুকনো গাছগাছালি, পত্র, পুষ্প কাঠের খোপ খোপ ঘরে এমন বিন্যাসে উপস্থাপিত যে সেগুলোকে এক করে দেখলে মনে হয় একটি ফুলের ডালি। ভেতরের একটি কক্ষে কাচের বিশাল পিরামিডের মধ্যে পৃথিবীর নানা ধরনের পানীয়ের বোতল। সেগুলোর কোনটা ভাগ্যবানে খালি করেছে। কোনটা এখনও পূর্ণ। প্রায় শতবর্ষের পুরনো দুএকটি বোতল কক্ষের অন্যত্র বিশেষভাবে সাজিয়ে রাখা। আমরা একটু আশ্চর্য হলাম দুটো বিশ্বযুদ্ধ এবং এতকাল পরেও এগুলো অক্ষত আছে দেখে। আমার সবচে ভালো লাগল ভূগর্ভস্থ কাঠের আধারগুলো। পনেরো, বিশ হাজার লিটার মদের একেকটি পেট মোটা পিঁপে আকণ্ঠ ধারণ করে সেই শতবর্ষ থেকে নেশায় চূড় হয়ে আছে। পরিদর্শনের শেষ ধাপে প্রস্থান পথের দুপাশে বার ও বিক্রয় কেন্দ্র। ঢোকার সময় সবাইকে একটি করে টোকেন দেওয়া হয়েছিল। এখন সেটির বিপরীতে এক পেগ করে বেনিডিকশন মিলছে। বিক্রয় কেন্দ্রে হরেক রকম বোতলে বেনিডিকশন, সুদৃশ্য মোড়কে মদের মিশেলে নানা ধরনের চকলেট। ফরাসিরা যাকে বলে শোকোলা।
বারের সামনে বাঁধানো চত্বরে একটি টেবিলে কীর্তিদাকে নিয়ে বসলাম। তিনি তাঁর টোকেনটি টেবিলে ঘোরাচ্ছেন। পানীয় তিনি ছোঁন না কিন্তু টোকেনটি যথাযথভাবে ব্যবহৃত হোক সেটা ওর ইচ্ছে। মজা করে তাকে আশ্বস্ত করলাম, আটলান্টিক উপকূলে আপনার যে মতিভ্রম হয়েছিল, কথা দিচ্ছি, বৌদি কোনোদিন জানবেন না। যান, টোকেনটি দেখিয়ে পেগটি নিয়ে আসুন।
কীর্তিদা যথারীতি উঠলেন এবং বস্তুটি নিয়ে এসে আমার দিকে ঠেলে দিলেন। তাতে দুটুকরো বরফ সবে গলছে। খানিকবাদে এল মাদাম ফ্লেভ। ইনস্টিটিউটে আমাদের সাংস্কৃতিক এবং বিনোদন কর্মকাণ্ড আয়োজনের ভার এই মহিলার। খুব সহযোগী এবং বন্ধুত্বপরায়ণ। ও নিজের টোকেনটি নাকি আমার জন্যে খুব যত্নে রেখেছেন। তাদের বললাম, মেয়েদের প্ররোচনায় নিষিদ্ধ গন্দম খেয়ে মানব জাতির প্রথম পুরুষ হযরত আদম স্বর্গ ছেড়েছিলেন। আমার বেলায় দেখছি আরেক মেয়ের অনুরোধে চুমুক দিয়ে স্বর্গ গমন ঘটবে। অতএব বেনিডিকশন জিন্দাবাদ। জিন্দাবাদ বললাম বটে তবে ফ্লেভের টোকেন আর কীর্তিদার পেগটি টেবিলেই পড়ে থাকল। আটলান্টিক পাড়ের নির্বাচিত স্থানটি মারাত্মক সুন্দর কিছু নয়। বিচটি খুবই ছোটো। পর্যটকদের জন্যে সমুদ্রগামী বিশ-পঁচিশটি নৌকো জোয়ারের জল নেমে যাওয়ায় এখন ডাঙায়। দুটো রেস্তোরাঁ। একটির দেয়াল স্বচ্ছ কাচের। সেখানে আমরা সাদা মদে সাগরের মাছ খাব। বিফ যেহেতু থাকছে লাল মদও থাকবে। আমরা পান করব আর সমুদ্রের ঢেউ দেখব। দেখব জোয়ারের আগমন।
মেঘ কেটে বেরিয়ে এল সূর্য। তার আলোয় ঝলমল করে উঠল সাগরের বুক। ঝকমক করছে বিচও। এ দেশে সূর্যালোকের বড় আকাল। গড়ে মাত্র একশ আশি দিন রোদের দেখা মেলে। যদিও গ্রীষ্ম তবুও আটলান্টিকের এই স্থানটিতে এখনও পর্যটকদের যথেষ্ট সমাগম ঘটেনি। সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়ে উঠতে এখনও কয়েক সপ্তাহ। আমাদের কেউ তাস ধরল না, ঝাঁপ দিল না সমুদ্র স্নানে। নিদেনপক্ষে বিচে ফুটবল, গোল্লাছুট তাও হলো না। সূর্যের আলোয় সাদা চুমকি দানার মতো চকমক করছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঢেউ তরঙ্গ। জলে হাত ডুবিয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বেলা একটার পর রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম আমরা। প্রতি টেবিলে আটজন। সুবেদী, চো, মার্শেলা, কীর্তি, ক্যারোলিনা, সৌমিত্র, বিয়াট্টিস ও আমি এক টেবিলে। সমুদ্রের কলরোল শুনতে শুনতে আমাদের পানাহার চলে। পানাহার চলে সাগরের ঢেউ দেখতে দেখতে। পৃথিবীর গহীনতম মহাসাগর আমাদের মুগ্ধ দৃষ্টির সামনে তার চিরকালীন বিস্ময় নিয়ে শুয়ে থাকে।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.