লালাভ রোদের জিভ

ঝর্না রহমান | ১৫ জুন ২০১৮ ১১:১০ অপরাহ্ন


আমার ছায়াটা কোথায়? কোথায় উধাও হলো আমার ছায়াটা?
দারুণ ছায়াবাজি খেলতে খেলতে ফুটপাথ ধরে হাঁটছিলাম। পোষা পাখির মত ঝুপ ঝুপ নেমে আসছিল আমার ছায়া। হাত থেকে দানা খুঁটে খাচ্ছিল। আবার রোদের কারচুপিতে ঘুলঘুলিতে ফুড়ুৎ করে উড়ে যাচ্ছিল।
নতুন টাইলস বসানো ফুটপাথ। গোল গোল নকশা। ঘূর্ণিঝড়ের চোখের মতন ধারালো গোল। নকশা দেখতে সুন্দর। কিন্তু খানিকক্ষণ ঘূর্ণির চোখে চোখ রাখলে ধাঁধা লেগে যায়। ধাঁধার সমাধান করতে করতে আমি একবার ডান চোখ একবার বাঁ চোখ ছুঁয়ে যাই। আমার ভালো লাগে।
টাইলসের ওপর রোদ্দুরের ধাঁধা। গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা গোখুরের মত ফণা তুলে জ্বলতে থাকে রোদ। তার ওপর আমার ছায়া। আমার ঢেউ তোলা দেহের ছায়া। আমার পনিটেল করা চুল– চরকিবাজি টাট্টুর লেজ। আমি টাট্টু লেজ দুলিয়ে ছুটকি চালে হাঁটি। আমার ছায়াও ছুটকি চালে হাঁটে। ঘুমু ঘুমু হাঁটা ভালো লাগে না আমার। ছুটকি ছুটকি হাঁটা ভালো লাগছে। বিকেলের রোদ্দুর ভালো লাগছে। রোদ্দুরে ছায়াবাজিও। শীতঘুম ভেঙে বেরিয়ে আসা গোখরার লালচে আভা– দারুণ লাগে!
ফুটপাথের একপাশে খাঁজকাটা সিঁড়ি। আমার শরীরের ছায়াটা খাঁজের ভেতর নেমে পড়ে। ওয়ান্ডারফুল! দারুণ ইসথেটিক! ধাপে ধাপে ঢেউয়ের ছন্দে নামতে থাকে আমার ছায়া। ততক্ষণে রোদ্দুর ছায়ার জন্য কামাতুর হয়ে উঠছে! কামরাঙা রঙ লেগেছে রোদে। ওরে রোদ, দেখছিস না, আমার গাল লাল হয়ে উঠছে! আমি ছায়ার রেণু দিয়ে রোদ্দুরের নাম লিখে দিলাম– পার্থ!

আজ নতুন একটা টি শার্ট পরেছি। আরাম সুতোয় বোনা পাতলা। কবুতরিয়া সাদা। সিল্কি পালকে ঢাকা। সিলকের ভেতর থেকে আমার দুষ্টু মিষ্টি একজোড়া ঘুঘুসোনা ঘু-ঘু করে। আমি লাফিয়ে হাঁটলাম। ঘুঘুরাও ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো। সিল্ক এলোমলো করে রোদ্দুরে লাফ দিলো। আমি দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে দিয়ে আকাশের দিকে তাকাই। ঘন তরমুজের জুসের মত ক্রিমসন আকাশ। আগুনিয়া রঙের ভেতরে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে। আমার ঘুঘুরাও আরাম সুতোর ভেতর থেকে উড়াল দেয়। ঘুঘুদের লাফ-লাফ খেলা আমার ভালো লাগে। উড়ু উড়ু খেলা ভালো লাগে।

কালো লেগিনের ভেতর আমার জোড়-কলম পায়ে এক্কাদোক্কা। ভরতনাট্যম কোর্স করা আমার পা। টো-হিল-হিল-টো। রোদ্দুরের নূপুর রুমু ঝুমু রুনু রুনু। গোক্ষুর রোদ্দুরে মৌবতী ছায়ার নৃত্য। ছায়ার ভেতর পায়ের পাতা। ভরতনাট্যম বিভঙ্গে মাতাল। টো-হিল হিল-টো। নাট্য-বিভঙ্গ ভালো লাগে।

আমি ছায়া নিয়ে খেলছিলাম। ছায়া আমায় নিয়ে। একটা স্কুটার নেবো। বাসায় ফিরতে হবে। ইউনিভার্সিটি থেকে বাসা। বড় আপা চিজ কেক বানিয়েছে। মা বলেছে, আগে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত। তারপর অন্য খাবার। পদ্মার ইলিশ এনেছেন বাবা। বাবা বলেছেন, স্কুটার নিয়ে চলে আয় মা। সারাদিন খাসনি। পরীক্ষার সময় কেন যে এমন করিস খাওয়া নিয়ে! চিজ কেকের ঘ্রাণ নিয়ে আসে রোদপোড়া হাওয়া। সাঁতরাতে সাঁতরাতে পদ্মা পাড়ি দিয়ে আসে ইলিশ। রোদ্দুরে ভাসতে থাকে বাবার সোনালি কভারের মোবাইল ফোন। এই সব শব্দগন্ধস্পর্শ আমার ভালো লাগে।

চলন্ত রাস্তা, নানারকম যানবাহনের হর্ন। কয়েকটা স্কুটার চলেও গেল। ধেৎ, অকুপাইড!
আর একটা! প্রাইভেট কার! ওটা আমার জন্য আসবে না! আমরা মিডিওকার।
বাস! সিটিং সার্ভিস। এখানে থামবে না।
মাইক্রোবাস।….
হঠাৎ আমার ছায়াটা উধাও!
হঠাৎ রোদের মায়াটা উধাও।

কিন্তু রোদ্দুরে তো কামরাঙা রঙ লেগেছিল! আমার ছায়া আরও গাঢ় হবে! আরও রঙিন! তা হলে? দিনে দুপুরে আমি কি ভূত হয়ে গেলাম! ভূতের নাকি ছায়া থাকে না! আমি কি তবে বিদেহী হয়ে গেছি! ইনভিজিবল! এই তো আমার দেহ! এই আমার উনিশ বছরের বাহু! বাহুতে রঙমাতাল ক্রিস্টাল। এই তো উষ্ণ জোড়া খোপে কবুতরি বুক। নাচ-পেয়ালার মদে মাতাল। এই আমার টিন এজ স্কিন! মসৃণ সুগন্ধী গাল! বাসা থেকে বেরুবার আগে সানস্ক্রিন মেখেছি। আমার গালে তিন বেলা লাল গোলাপি পার্পল গোলাপ ফোটে। গোলাপ দেখে আমার আয়না হিংসায় চুরচুর করে ফাটে।
কিন্তু এখন আমার গালে কড়া স্পিরিটের গন্ধ। খসখসে খড়কুটো দিয়ে আমার গাল মাজা হচ্ছে। জ্বলে যাচ্ছে পার্পল গোলাপ। ঘসে তোলা হচ্ছে গোলাপি পেটাল।
আমার ঠোঁট। পার্থ তিনদিন আগে প্রথম চুমু খেয়েছে। এর পর থেকে কেমন টসটসে। ময়েশ্চারাইজড লিপস্টিক। মনে হচ্ছে মধুচুষির কলি। এখনই ফুটবে। এখন আমার ঠোঁটের লিপস্টিকে ঘিনঘিনে জোঁক চুমুক মারছে। গলার ভেতর ঢুকে গেছে পিচ্ছিল সাপালো জিভ। আমার জিভ পেঁচিয়ে উঠতে থাকে বমি।

আমার নিঃশ্বাস ধোঁয়াটে বেলুনের ভেতর কেবল ফুলতে থাকে। বুঝি বেলুন ফেটে যাবে এক্ষুনি। আমার মনিপুরি বাহু দুটি দুজনের বগলে আটকে পড়েছে। আমার বগল তলা দিয়ে শক্ত সাঁড়াশির মতো দুটি হাত। চারটি হাত। আটটি। ষোলটি হাত….। আমার জোড়া খোপ দুমড়ে যায়। ঘুঘুসোনারা চিৎকার করতে থাকে। ঘুঘু সোনাদের পিষে মেরে ফেলা হচ্ছে। আমার নাচুনে ছায়াটকে কারা পিষে ফেলছে। খামচে ধরছে। কামড়ে ধরছে। আমার ঢেউগুলোকে সমতল করছে।
আমার ভরতনাট্যম দলছে। দু পায়ের নাচগুলোকে দলছে। আমার নৃত্যময়ী ছায়া আগুনে জ্বলছে। ছায়ার ভেতর দেহ গলছে। আমার গলিত দেহ চেটে খাচ্ছে লালাভ রোদের জিভ। আমার দেহ। আমার উনিশ বছরের দেহ। কোথায় দেহ? ছায়াটা পড়ে আছে। একটা চটকানো স্থির ছায়া। আমার দেহটা কোথায়! আমার প্রিয় দেহ!

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গীতা দাস — জুন ১৭, ২০১৮ @ ১০:২৭ পূর্বাহ্ন

      ঘোর সৃষ্টি করে সমসাময়িক বাস্তবতার চিত্রায়ন। ভালো লেগেছে।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com