টি. এস. এলিয়ট: শবদেহের সৎকার

আবদুস সেলিম | ১২ জুন ২০১৮ ৪:৪৯ অপরাহ্ন

মুল: টি. এস. এলিয়ট
অনুবাদ: আবদুস সেলিম

টমাস স্টার্ন এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫), আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম প্রধান পুরুষ, তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যকর্ম দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর অধিকাংশ কবিতা রচনা করেছিলেন ১৯২১ সালে যা মুদ্রিত হয়েছিল ১৯২২-এ। পাঁচ ভাগে বিভক্ত দীর্ঘ ধারাবাহিক কবিতাগুলো হল: The Burial of the Dead; A Game of Chess; The Fire Sermon; Death by Water; এবং What the Thunder Said. কবিতাগুলো রচনার পেছনে, এলিয়ট-এর নিজ স্বীকারোক্তি মতে, মার্কিন কবি এজরা পাউন্ড-এর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা পেয়েছিলেন। যে দু’টি ক্ষেত্রে তিনি এলিয়টকে পরামর্শ দিয়েছিলেন সে দু’টি হলো: কবিতাগুলো থেকে দীর্ঘ অংশগুলো বাদ দিয়ে ঘণবিন্যাসে সাজানো, এবং ছন্দ-বিন্যাসকে ভেঙ্গে ফেলা। কবিতাগুলো তিনি এজরা পাউন্ডকেই উৎসর্গ করেছেন। ভিভিয়েন—এলিয়ট-এর স্ত্রী—তাঁর কাছ থেকেও তিনি অনেক পরামর্শ নিয়েছিলেন কবিতাগুলোর প্রকাশনার চূড়ান্ত পর্যায়ে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত য়ূরোপে আধুনিক সংস্কৃতির নামে যে অবক্ষয় নেমেছিল তার‍ই প্রতিচ্ছবি এই কবিতাগুলো, যদিও এলিয়ট তাঁর কবিতার মূল বাহন হিশেবে গ্রহণ করেছিলেন আবেগের চেয়ে বুদ্ধীদীপ্তি, বা বলা যায় বুদ্ধীদীপ্ত আবেগ। দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এ যে হতাশা আশ্রিত কবিতা তিনি রচনা করেছেন তাঁর উৎসমূল খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীর প্রান্তভাগে রচিত লাতিন উপন্যাসিক গাইউস পেত্রনিতাস রচিত স্যাটিরিকন উপন্যাসের ট্রাইম্যালচিও চরিত্রের মুখে শোনা সিবিল নামে এক মহিলার উক্তি: আমি মরতে চাই। এই কালদর্শী মহিলা তাঁর ভবিষ্যতের ভয়াবহতার কথা বুঝতে পেরে ঐ উক্তি করেছিল। শুধু তাই নয়, এলিয়ট আরও দু’টি গ্রন্থ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন: জেসি ওয়েস্টন-এর From Ritual to Romance, (যার স্বীকারোক্তি মেলে তাঁর Notes on The Waste Land-এ), এবং জেমস জর্জ ফ্রেইজার-এর The Golden Bough. বর্তমান চিন্তাচেতনা এবং ধর্ম আচরণেও যে সেই পুরনো fertility ritual বা উর্বরতার ধর্মাচারের ধারাবাহিকতা উপস্থিত সে বিষয়টিই বিধৃত হয়েছে এই দুই গ্রন্থে। এলিয়ট এই দুই গ্রন্থে উল্লেখিত ফিশার কিং-কে প্রতীকী হিশেবে ব্যবহার করেছেন তাঁর কবিতাগুচ্ছে।

আগেই বলেছে এলিয়ট-এর কবিতা রচনার বাহন বুদ্ধিদীপ্ত আবেগ। ধার্মিকভাবে রক্ষণীল এই কবি তাঁর সকল কবিতায় allusion বা পরোক্ষ-প্রসঙ্গ অতি মাত্রায় ব্যবহার করেছেন, ফলে পাঠককে অর্থউদ্ধারের জন্য academic বা পাণ্ডিত্বপূর্ণ অনুশীলনে নামতে হয়। এ বিষয়টা বিবেচনা করেই সম্ভবত এলিয়ট তাঁর দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড কবিতাগুচ্ছের সাথে একটি টীকাপত্র সংযোজন করেছিলেন। তবে যতই দুর্বোধ্য হোক, এলিয়ট সত্যঅর্থে আধুনিক কবিতার একজন অন্যতম পুরোধা অভিযাত্রী ছিলেন, যিনি কাব্যজগতের পুরনো রক্ষণশীশ ধারণাগুলোকে ভেঙে কবিতাকে এক নতুন পদ্ধতিতে এবং শব্দশৈলীতে ঢেলে সাজিয়েছেন। আমি আমার অনুবাদে যদিও এলিয়ট ব্যবহৃত ছন্দ রক্ষা করিনি কিন্তু একটি কাব্যিক আবহ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। উল্লেখ্য দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর প্রথম কবিতা The Burial of the Dead-এর অনুবাদ পরিক্ষামূলক ভাবে করেছি আমি। পাঠকরা এ সম্পর্কে তাঁদের মতামত জানালে বাধিত হব।

শবদেহের সৎকার

এপ্রিল, নিষ্ঠুরতম মাস, ফলায়
লাইল্যাক নিষ্ফলা এ জমিতে, একাকার করে
স্মৃতি আর কামের বাসনা, প্রাণ জাগায়
শুকনো শেকড়গুলোয় বসন্ত-বৃষ্টির পরশে।
আমরা ছিলাম শীতের ওমের ভেতর, ঢাকা ছিলাম
ধরণীর বিস্মৃতিময় তুষারে, গভীর শীতনিদ্রায়
মজে থাকা অঙ্কুরের সঞ্জীবনী সুধার সিঞ্চণে।
স্টার্নবার্গাসি সরোবরে এলে গ্রীষ্ম আমাদের চমক লাগায়
হঠাৎ বৃষ্টির দমকে আমরা আশ্রয় নেই স্তম্ভচাতালের নীচে,
তারপর পেরিয়ে যাই রৌদ্রকরোজ্জল পথ
পৌঁছে যাই হফগার্টেনে, পান করি কফি, আড্ডা দিই ঘণ্টা খানেক।
আমি রুশ নই, আমি লিথুনিও, খাঁটি জর্মন এক।
ছেলেবেলায় থাকতাম প্রধান-ডিউক-প্রাসাদে, আমার
জ্যাঠাতো ভায়ের সাথে। ও আমাকে স্লেজগাড়িতে চড়িয়েছিল,
ভয়ে বসেছিলাম জবুথবু, সাহস জুগিয়ে ও বলে, ম্যারি,
ম্যারি, ভয় নেই, শক্ত করে বোসো। তারপর আমরা অনেক দূর চলে গেলাম।
সেই দিগন্তপার পাহাড়ের ভেতর, যেখানে নিজেকে মনে হয় মুক্তবিহঙ্গ।
আমি রাত কাটাই বই পড়ে, শীতে পারি দিই কোন এক দখিনা দেশে।

এ কোন আঁকড়ি বৃক্ষমূল, এই বন্ধ্যা জগদ্দল থেকে
কোন শাখামূলেরই বা জন্ম হবে? মানবপুত্র,
তুমি তো বাকরুদ্ধ, সবই তোমার ধারণাতীত, কারণ তোমার
অনুভবে আছে শুধু অপার দৃশ্যাবলীর স্তুপ, যেখানে সূর্য বড়ই দুঃসাহসী
শুষ্ক বৃক্ষ দেয় না কোন ছায়াশ্রয়, ঝিঁঝিঁ পোকারা দেয় না স্বস্তি,
কিম্বা কঠিন শিলাতে শোনা যায় না কোন জলস্রোতের শব্দ। শুধু
এই লোহিত শিলাখন্ডের নিচেই মেলে ছায়াছন্ন আশ্রয়,
(স্বাগতম এই লোহিত শিলাখন্ডের নিবিড় আশ্রয়ে),
আমি তো দেখাতে চাই ব্যাতিক্রমি কিছু, দেখবে হয়তো
প্রভাতে তোমার প্রচ্ছায়া তোমার পশ্চাদগামী,
কিম্বা দিবাবসানে সেই প্রচ্ছায়া উঠে এসে তোমাকেই করে অভিবাদন;
দেখাব তোমাকে এক মুঠো ধুলোরাশির ভেতর জমে থাকা আতঙ্করাজি।
মাতৃভূমির সুবাতাস
সদা বহমান,
কোন দেশে চলে গেলে তুমি
ও আমার আইরিশ আত্মজ?
‘এক বছর আগে প্রথম দিন দিয়েছিলে আমাকে হাইআসিন্থ ফুল;
‘তাই নাম পেয়েছিলাম হাইআসিন্থ মেয়ে।’
–তবুও অনেক পরে আমরা যখন ফিরে এলাম হাইআসিন্থ ফুলবাগান থেকে,
তোমার হাতভরা ফুল, ভেজা চুল, আমি
বাকহীন, প্রায়-দৃষ্টিহীন, না ছিলাম
জীবিত, না মৃত, এবং সম্পূর্ণ বোধশক্তিহীন অবশ,
অন্তরের গহীন আলোতে অনেক খুঁজেছি আমি, কিন্ত নিঃশব্দই ছিল সব।
সাগরের অতল-গভীর নৈঃশব্দ এক।

মাদাম সসস্ট্রিস, সুবিদিত অলোকদ্রষ্টা,
নিদারুণ সর্দিতে ছিলেন নাজুক, তবুও
ইউরোপে বুদ্ধিমত্তায় সব মহিলার শ্রেষ্ঠ,
হাতে ধরা এক প্যাকেট তাস। এই হলো, বলেছিলেন তিনি,
আপনার ভাগ্য-গণন-তাস, ডুবে মরেছে ফনিসিও নাবিক,
(চোখগুলো ওর কেমন মুক্তো হয়ে গেছে। দেখুন!)
এখানে বসে সুদর্শনা বেলাডোনা, সেই সে কঠিন ভদ্রমহিলা,
সর্বমৌসুমী রমণী এক।
এই এখানে ছেঁড়াখোঁড়া হতভাগা পুরুষ, আর ওখানে দৈবচক্র,
আর ঠিক ওইখানে একচোখো কারবারি এক, আর এই তাস,
লেখা নেই ভাগ্য তাতে, ঘাড়ে নিয়ে বয়ে বেড়ায় অজানা কপাল তার,
আমার তো দেখা মানা সেসব। খুঁজে পাইনা তো
ফাঁস দিয়ে মরা সেই লোকটাকে। সলিল সমাধির শঙ্কা তাড়া করে ফেরে।
দেখি মানুষের ভিড়, ঘুরছে সবাই বৃত্তের ভেতর।
ধন্যবাদ। প্রিয় মিস একুইটনের সাথে দেখা হলে বলবেন
আমি নিজেই তো আমার কুণ্ডলী সাথে নিয়ে ঘুরি:
আজকাল তো সবারই সতর্ক হয়ে চলা উচিৎ।
অলীক শহর,
শীতভোরে ধুসর কুয়াশাঢাকা এই শহর,
লন্ডন ব্রিজের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া জনস্রোত, অগুনতি,
ভাবিনি কখনও মৃত্যু এতো মানুষকে আগলছাড়া করেছে।
দীর্ঘশ্বাস, আচমকা বিরল, পড়ছে চারদিকে,
আর প্রতিটি মানুষই তাকিয়ে তার নিজ পদতলে।
পাহাড় পেরিয়ে, কিং উইলিয়ম সড়ক দিয়ে নেমে,
সেইন্ট ম্যারি উলনথের সেই সময়গণা মন্দিরে
যেখানে নটা বাজার নিষ্প্রাণ ঘন্টার চূড়ান্ত শব্দ,
ঠিক সেখানে দেখা আমার এক চেনা মানুষের সাথে,
আমি তাকে চেঁচিয়ে ডাকি, ‘স্টেটসন!
‘তুমি না আমার সাথে সেই মাইলাইতে জাহাজে ছিলে
‘এক বছর আগে সেই যে শবদেহটা বুনেছিলে তোমার বাগানে,
‘তা থেকে কি কিছু গজাতে শুরু করেছে? এ বছর ফলবে কিছু?
‘নাকি এই হঠাৎ হিম নষ্ট করেছে ফুলের কেয়ারি?
‘সাবধান, কুকুরকে কাছে ঘেঁষতে দিও না যেন, মানুষের বড় বন্ধু ও,
‘নখের আঁচড়ে আবার খুঁড়ে টেনে বের করে দেবে শবদেহ!
‘তুমি! কপট পাঠক!—আমার সহজীবী!—আমারই সহোদর!’

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com