খেলাঘর: যুদ্ধকালের ভালবাসার গল্প

ফাহমিদুল হক | ২৮ আগস্ট ২০০৮ ৬:২৫ অপরাহ্ন

যেকোনো যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শিকার হয় নারী, তার শরীর হয় হানাদারের সহজ লক্ষ্যস্থল, সেই নারীর মনোবিকলন হয়ে দাঁড়ায় অন্যতম ফলাফল। মাহমুদুল হকের খেলাঘর উপন্যাসটির কাহিনী তেমন একজন নারীর। তবে khelaghor.jpg…….
খেলাঘর / মাহমুদুল হক / রচনাকাল: ১৪-২০ আগস্ট ১৯৭৮ / প্রকাশক: সাহিত্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ২০০৪, দ্বিতীয় সংস্করণ (প্রথম সংস্করণ: এপ্রিল ১৯৮৮) / ৮০ পৃষ্ঠা / ৭৫ টাকা
………
উপন্যাসটিতে তার আক্রান্ত হবার কথা নেই (একেবারে শেষে তা জানা যায়), আক্রমণ-উদ্ভূত মনোবিকলনেরও সচেষ্ট বর্ণনা নেই, রয়েছে বিকলন-পরবর্তী তার স্বপ্নময় কয়েকটি দিন, এক যুবার সঙ্গে তার গড়ে তোলা খেলাঘর — এবং যেকোনো খেলাঘরের ক্ষেত্রে যা ঘটে — তার ভাঙনের বর্ণনা।

যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে একটি দেশের মানুষকে অন্তঃত তিনটি শ্রেণীতে চিহ্নিত করা যায় — একদল আক্রমণের শিকার হয়, আরেকদল প্রতিরোধ গড়ে আর তৃতীয় দলটি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লিখিত খেলাঘর উপন্যাসটি তিনটি চরিত্রের মধ্যে রেহানা আক্রান্ত, স্কুলমাস্টার মুকুল প্রতিরোধ গড়ছে আর তারই বন্ধু কলেজ-শিক্ষক ইয়াকুব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। একারণে মুকুল চরিত্রটি খুব স্পষ্ট — তার চোখ ভরা স্বপ্ন, বুক ভরা সাহস — দেশ স্বাধীন হবেই, গেরিলারা পাক-সেনাদের পরাজিত করবেই। ইয়াকুব চরিত্রটি শুধু দ্বিধাগ্রস্তই নয় অস্পষ্টও — তার দেশপ্রেম আছে অথচ মনে করে “এই পরিস্থিতি চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কীইবা করার আছে।” এক পর্যায়ে তাকে বেশ দার্শনিকের মতো কথা বলতে শোনা যায়; খেলাঘরের অকুস্থল, পরিত্যাক্ত এক বাড়ি, আদিনাথের ভিটাকে নির্দেশ করে সে বলে, কেন যে মানুষ জায়গা-জমি করে, এখন এখানে বাতি জ্বালাবার কেউ নেই, ক’দিনরই বা সব ইত্যাদি। আর পুরো উপন্যাসজুড়ে রেহানা চরিত্রটি দুর্বোধ্য, তার আচরণ দেখে ইয়াকুবের পাশাপাশি পাঠকও বুঝে উঠতে পারে না, সে মাঝে মাঝেই অযৌক্তিক আচরণ কেন করে। অবশ্য উপন্যাসের একেবারে শেষের দিকে তার কার্যকারণসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

উপন্যাসের কাহিনী সংক্ষেপে এই: ঢাকায় উচ্চশিক্ষা নিলেও ইয়াকুব এখন গ্রামের একটি কলেজে শিক্ষকতার চাকরি নিয়েছে। এখানে আছে তার বাল্যবন্ধু স্কুলশিক্ষক মুকুল। স্কুল-কলেজ বন্ধ, মুকুল গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করে আর দ্বিধাগ্রস্ত ইয়াকুব প্রকৃতি দেখে, শুয়ে-বসে সময় পার করে। এরই মধ্যে ঢাকা থেকে বন্ধু টুনুর একটি চিঠি আসে, চিঠির সঙ্গে টুনুর কাজিন রেহানাও আসে, ঢাকা থেকে পালিয়ে আসা একটি দলের সঙ্গে সে এখানে এসেছে। যুদ্ধের ডামাডোলে তাকে ঢাকা থেকে সরিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, ইয়াকুবের দায়িত্ব তাকে কয়েকটা দিন আশ্রয় দেয়া। মুকুল বাস করে মাতবর পিয়ার মোহাম্মদের দখলে থাকা চারশ বছর আগের পরিত্যক্ত এক বাড়িতে, আদিনাথের ভিটায়। সেখানেই রেহানার থাকার জায়গা হয়, রেহানার আব্দার অনুসারে ইয়াকুবও সেখানে থাকে। তারা দু’জন সেখানে চুলা ধরিয়ে রান্না করে, পুকুরে গোসল করে, ফুল কুড়ায়, বাঁশি বাজায় — একটা অস্থায়ী সংসার গড়ে তোলে — যাকে ঔপন্যাসিক বলছেন খেলাঘর। এক পর্যায়ে, তৃতীয় দিনে, তাদের মধ্যে প্রেম হয়। পরদিন সকালে টুনু আসে, টুনুর কাছ থেকে ইয়াকুব জানতে পারে পঁচিশে মার্চ রাতে রেহানাকে রোকেয়া হল থেকে মিলিটারিরা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়, দশদিন আটকে রেখে নির্যাতন করে, এরপর থেকেই রেহানার মনোবৈকল্য দেখা দেয়। পাঠক ও ইয়াকুব একসঙ্গে বুঝতে পারে রেহানার হঠাৎ-অযৌক্তিক আচরণের কারণ — কেন সে হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে উঠতো, কেনইবা চোখের জল শুকানোর আগেই হেসে ফেলতো। ইয়াকুব এসব কাহিনী জানার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে, আর রেহানা ফিরে যায় টুনুর সঙ্গে। ইয়াকুব রেহানাকে অনুরোধ করে থাকতে, কিন্তু টুনু সবকিছু বলে দেবার পরে, সে আর ইয়াকুবের সঙ্গে থাকতে রাজি হয় না। শেষ অধ্যায়ে মুকুলের সঙ্গে একদল মুক্তিযোদ্ধা আদিনাথের ভিটায় এসে আসন গাড়ে।

উপন্যাস পাঠের পর যুদ্ধের ডামাডোলে ইয়াকুবের অতি-নিস্পৃহতা দেখে পাঠকের মনে প্রশ্নের জন্ম দেবেই। এমনকি মুকুলের মুখ থেকে শোনা গেরিলাদের নানা সাফল্যকে সে ‘অতি-উৎসাহ’ বলে খাটো করতে চায়। উপন্যাসের শেষে যখন মুকুল জ্বলজ্যান্ত সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হাজির করে, সেই শেষ কয়েকটি বাক্য বর্ণিত হয়েছে এভাবে:

“মুকুল আমার পিঠে একটা থাপ্পড় কষিয়ে বললে, ‘কই নাই তরে, মেজিক দেহামু, কই নাই? অহনে কী দেখতাছস ক, কী দেখতাছস?’

দেখছি সবকিছুই।”

কথক বা ন্যারেটর ইয়াকুবের এই অতি-নিস্পৃহতা চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামের সহ্য হয়নি, তিনি খেলাঘর (২০০৬) ছবির শেষে দেখাচ্ছেন ইয়াকুব মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে।
—————————————————————–
কথক বা ন্যারেটর ইয়াকুবের এই অতি-নিস্পৃহতা চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামের সহ্য হয়নি, তিনি খেলাঘর (২০০৬) ছবির শেষে দেখাচ্ছেন ইয়াকুব মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিচ্ছে।
—————————————————————–

মাহমুদুল হকের একাধিক উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত, কিন্তু কোনো উপন্যাসেই মুক্তিযুদ্ধ প্রধান অনুষঙ্গ নয়, কাহিনীতে মুক্তিযুদ্ধ প্রত্যক্ষভাবে হাজির নেই। এই না-থাকা আরও প্রকটতর হয় যখন দেখা যায় উপন্যাসের মূল চরিত্রের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে নিরাবেগ, নিস্পৃহ অবস্থান। জীবন আমার বোন উপন্যাসের খোকা, খেলাঘর উপন্যাসের ইয়াকুব মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে চরমভাবে নিস্পৃহ। এমনকি নবলব্ধ প্রেমের সাথী রেহানার নির্দয় প্রস্থান তাকে এরকমভাবে বিচলিত করে না যে, এই যুদ্ধই রেহানার ‘মিসহ্যাপ’-এর জন্য দায়ী, এরকম আরও কত রেহানার জীবন নষ্ট হচ্ছে পাকিস্তানি সামরিক আক্রমণের কারণে, সর্বোপরি আশপাশের সব মানুষ এই আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে, অতএব তারও যোগ দেয়া উচিত। মুকুল যখন উপন্যাসের শেষে প্রশ্ন করে “কী দেখতাছস”, তখন ইয়াকুবের স্বগতোক্তি হলো “দেখছি সবকিছুই”। ইয়াকুব ‘দেখছে’, ‘অংশ নিচ্ছে না’।

বৃহত্তর রাজনৈতিক ঘটনাবলীর মধ্যে এরকম অসহ্য নিস্পৃহতার একটা ব্যাখ্যা মাহমুদুল হকের আছে। আহমাদ মোস্তফা কামালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (http://arts.bdnews24.com/?p=1772) তিনি এইসব নিরাসক্তি-নিস্পৃহতার পেছনে বোদলেয়ারের প্রভাব আছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলছেন, “সবকালেই সবদেশে ওরকম কিছু মানুষ থাকে যারা প্রবল কোলাহলেও একা, যারা জনতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে না। এদেরকে তুমি যদি অসুস্থ বল তবে তাই, কিন্তু এদের অস্তিত্ব আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না।” সাক্ষাৎকারে তিনি এও বলেছেন যে, “আমি যেভাবে দেখেছি সেভাবেই তো লিখবো। আমি নিজে তো যুদ্ধ করি নি। যুদ্ধের সময় আমিও তো অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে আটকে পড়া এক অসহায় মানুষ ছিলাম।”

মাহমুদুল হক সম্পর্কে এটা বলা হয় যে তার ভাষাভঙ্গি বিশেষায়িত, অন্য লেখকদের থেকে আলাদা। এমনকি এক উপন্যাস থেকে অন্য উপন্যাসের back-c-2.jpg
……..
খেলাঘর -এর দ্বিতীয় সংস্করণের ব্যাক কভারে বই সম্পর্কে প্রকাশকের বিজ্ঞাপন
……..
ভাষাভঙ্গিতেও পার্থক্য লক্ষণীয়। স্বভাবতই খেলাঘর উপন্যাসের ভাষা তার অন্য উপন্যাসগুলো থেকে আলাদা। উপন্যাসের সংলাপ, বিশেষত রেহানার সংলাপগুলো তার চরিত্রের মতোই অবাস্তব, অচেনা। একাত্তরের সময়ে এই ভূখণ্ডের কোনো চরিত্রই — তা উপন্যাসে হোক বা চলচ্চিত্রে হোক — এভাবে কথা বলতো, তার নিদর্শন দেখা যায় না। রেহানার ব্যবহার করা উপমা-তুলনা-শ্লেষবাক্য শুনলে মনে হয় সূদূর অতীতের, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দির কেউ কথা বলছে। আর তা পূর্ববঙ্গীয় বলে মনে হয় না। যেমন, ইয়াকুব নামটি রেহানার কাছে ‘পালোয়ানচাটা’ নাম। নামটি শুনে আরও মনে হয় একজন ‘কদমছাঁটে হেঁড়েমাথা’র নাম সেটা। ছোটবেলার সখী পাতার দুঃখের কথা বলতে গিয়ে রেহানা জানায়, তার বাবা-মা ছিলো না, চাচীর সঙ্গে থাকতো। চাচীটি ‘গালে পানের ঢিবলে গুঁজে’ পাতাকে দিয়ে সব কাজ করিয়ে নিতো। কিংবা ‘ছ্যা ছ্যা’ শব্দের ব্যবহার — এসবের মধ্যে মজা থাকলেও স্বাভাবিক মনে হয় না। আবার রেহানার জীবনে হঠাৎ-ঘটে-যাওয়া দুর্ঘটনায় সে অ্যাবনরমাল হয়ে পড়েছে বলে, তার সংলাপও অ্যাবনরমাল হবে এমন যুক্তি উঠলে মেনে নেয়া যাবে না। রেহানার পাশাপাশি ইয়াকুবের মধ্যেও এধরনের সংলাপের সংক্রমণ ঘটেছে। যেমন রেহানা ইয়াকুবের নাম অপু দিলে সে বলে, ‘একদম গাল-টেপা নাম, ওগরানো দুধের গন্ধ তাতে।’ কিংবা ইয়াকুবের একটি নড়ড়শরংয সংলাপ, ‘কোঁচড় পেতে পেয়ারাগুলো কে নিয়েছিলো?’ এখানে ‘কোঁচড়’ শব্দটিও অপূর্ববঙ্গীয়। শিশুচরিত্রের সংলাপের মধ্যেও এই বুকিশ ভাব রয়ে গেছে। আহমাদ মোস্তফা কামালের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মাহমুদুল হক বলছেন, “খেলাঘর উপন্যাসটার ভাষা আমার মায়ের মুখের ভাষা থেকে নেয়া। সংলাপগুলো খেয়াল করে দেখো, ওই ভাষায় আমি বা আমার চারপাশের কেউ-ই কথা বলে না। মা ওই ভাষায় কথা বলতেন।” মাহমুদুল হকের এই বক্তব্যে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে কেন খেলাঘর উপন্যাসের সংলাপ অ-পূর্ববঙ্গীয় ঠেকে। প্রাসঙ্গিক এই তথ্যটি অনেকেরই জানা যে মাহমুদুল হকের পরিবার দেশবিভাগের কারণে পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পূর্ববঙ্গে এসেছিল।
—————————————————————–
উপন্যাসের আরেকটি দিক লক্ষ করার মতো। প্রধান চরিত্রগুলোর সবগুলোই পারিবারিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তাবঞ্চিত; দূরাত্মীয়ের সঙ্গে অসহায় তাদের বেড়ে ওঠা।
—————————————————————–

উপন্যাসের আরেকটি দিক লক্ষ করার মতো। প্রধান চরিত্রগুলোর সবগুলোই পারিবারিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তাবঞ্চিত; দূরাত্মীয়ের সঙ্গে অসহায় তাদের বেড়ে ওঠা। যুদ্ধের শিকার রেহানার বেড়ে ওঠাও বড়োই নির্মম। তার মা অন্য একজনের সঙ্গে পালিয়ে যায়, বাবা এজন্য আত্মহত্যা করে, এজন্য দাদা-দাদীর অভিভাবকত্বে সে বেড়ে ওঠে। ঘটনামুহূর্তে তার অভিভাবক বলতে কাজিন টুনু। ইয়াকুবের বাবা-মাও নেই, ঢাকায় এক বোনের বাসায় থেকে পড়াশুনা করেছে। মুকল চন্দ্রের আত্মীয়স্বজনেরও হদিস নেই, মাতব্বর পিয়ার মোহাম্মদের দয়ায় পরিত্যাক্ত আদিনাথের ভিটেয় কোনোরকমে থাকে, বিনিময়ে ঐ ঘরেই মাতব্বরের ‘মৌজ’-এর নিরুপায় সাক্ষী হয়ে। জানা যায় ঢাকায় পড়াশুনা করলেও তেমন কোনো বন্ধু সেখানে নাই ইয়াকুবের, এই গ্রামে স্কুলসহপাঠী মুকুলকে পেয়ে তার বন্ধুভাগ্য কোনোক্রমে উৎরে যায়। এমনকি রেহানা যে সারাক্ষণ শৈশবের কথা বলে — সেই শৈশবের প্রিয় বান্ধবী পাতা মারা যায় পানিতে ডুবে আর বন্ধু বাবু মরে লরির নিচে চাপা পড়ে। এহেন আত্মীয় ও বান্ধববিবর্জিত প্রধানচরিত্রের সমাহার বাংলাসাহিত্যে পাওয়া দুর্লভ। এই একাকী মানুষগুলোর ওপরে আবার পড়েছে নির্মম যুদ্ধের ঘা, যদিও যুদ্ধের উপস্থিতি এখানে পরোক্ষ। কিন্তু রেহানা-ইয়াকুবের খেলাঘর তো যুদ্ধের কারণেই গড়ে ওঠে, আবার ভাঙে যুদ্ধের কারণেই। এই কারুণ্যের উৎসব উপন্যাসে কেন, তা বোঝা মুশকিল। প্রত্যক্ষ যুদ্ধের বাইরেও যে জীবন বহমান ছিল, প্রেম-ভালোবাসার জন্ম নিয়েছে আবার ভেঙেছে, জাতির জন্মলগ্নে যে কোনো কোনো মানুষ চরম নিরাসক্ত থাকতে পারে — এই বিষয়গুলোর ব্যাখ্যা মেলে। কিন্তু চরিত্রগুলোর এই স্বজনহীনতার কিংবা করুণ সমাপ্তির কারণ কী তা উদ্ধার করা দুরূহ।
—————————————————————–
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশিরভাগ গল্প-উপন্যাসের মধ্যে যেক্ষেত্রে প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিষয়গুলো — যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, রাজাকারদের তৎপরতা ইত্যাদি — বড়ো হয়ে ওঠে, মাহমুদুল হক সেক্ষেত্রে মূল ঘটনাস্রোতের বাইরে অন্য যে-জীবন বয়ে চলে, তার চিত্র আঁকেন।
—————————————————————–

মাহমুদুল হকের খেলাঘর উপন্যাসটি সবমিলিয়ে আশ্চর্য একটি উপন্যাস। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেশিরভাগ গল্প-উপন্যাসের মধ্যে যেক্ষেত্রে প্রবল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষ বিষয়গুলো — যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, রাজাকারদের তৎপরতা ইত্যাদি — বড়ো হয়ে ওঠে, মাহমুদুল হক সেক্ষেত্রে মূল ঘটনাস্রোতের বাইরে অন্য যে-জীবন বয়ে চলে, তার চিত্র আঁকেন। এভাবে তিনি অনন্য অথবা পৃথক হয়ে ওঠেন।

পেনাং, মালয়েশিয়া, আগস্ট ২০০৮
—–

আর্টস-এ প্রকাশিত আরো লেখা
ডিজিটাল সিনেমা নিয়ে তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার
তারেক মাসুদ: বন্দি পাখিটা কি মুক্তি পেল
অস্বস্তির সঙ্গে বসবাস (গল্প)
ডিজিটাল এইজে মানুষকে আরও বড়ো মাপের মানুষ হতে হবে — তারেক মাসুদ

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ফাহমিদুল হক
ইমেইল: fahmidul.haq@gmail.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ১, ২০০৮ @ ১:১৫ পূর্বাহ্ন

      খেলাঘর চলচ্চিত্র দেখি নি। তবে ‘নিঃস্পৃহ’ ইয়াকুবকে মোরশেদুল ইসলাম যেভাবে ঘাড়ে ধরে যুদ্ধে নামালেন শুনে মজাই লাগল। এটাই বোধয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নন্দনতত্ত্বের সমস্যা। এ কারণেই বহুবছর জাতি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি ‘মহত্তম’ উপন্যাসের আশায় দিন গুনছে!

      আরেকটা বিষয়: মাহমুদুল হকের প্রায় প্রতিটি উপন্যাসের কেন্দ্রেই একটা করে ‘নিঃস্পৃহ’ চরিত্র দেখা যায়। তাকে জাস্টিফাই করতে গিয়ে মাহমুদুল হক বোদলেয়ারের সাফাই গাইলেও আমার মনে হয় এটি তাঁর নিজের চরিত্রেরই রিলোকেশন। অসম্ভব মমতায় তিনি ঐসব ‘নিঃস্পৃহ’ চরিত্রগুলোকে তৈরি করেন। খেয়াল করে দেখুন, খেলাঘর-এর ইয়াকুব কিংবা জীবন আমার বোন-এর খোকা এদের প্রত্যেকের জীবনেই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার রীতিমত অবজেক্টিভ কন্ডিশন তৈরি হলেও এরা যুদ্ধে যোগ দেয় না। আবার ইলিয়াসে চিলেকোঠাবাসী রঞ্জু কিন্তু রাস্তায় নামে! আমার মনে হয় মাহমুদুল হকের কাছে আমাদের প্রত্যাশা আমরা এখনো স্থির করে উঠতে পারি নি।

      ফাহমিদুল হকের আলোচনা ভালো লেগেছে। ধন্যবাদ।

      – সুমন রহমান
      ০১.০৯.০৮

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহাবুবুর রাহমান — সেপ্টেম্বর ২, ২০০৮ @ ৩:১৭ অপরাহ্ন

      একে আলোচনা না বলে এক রকম পরিচিতিমূলক লেখা বলাই সঙ্গত। আলোচনাকে আমরা সমালোচনা অর্থে গ্রহণ করতেই আগ্রহী। অর্থাৎ আলোচনা হবে টেক্সটের অনুপূঙ্খ বিশ্লেষণ। মাহমুদুল হক আধুনিকতাবাদী লেখক। আধুনিকতাবাদীদের জীবনচেতনা এবং শিল্পকৌশল তাঁর মধ্যে পুরাপুরি উপস্থিত। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে — আমার ধারণা — আমরা আধুনিকতাবাদীদের কাছ থেকে শুধু শিল্পকৌশটাই নিতে পারতাম — জীবনচেতনা নয়। পৃথিবীতে অনেক ধরনের, অনেক চরিত্রের লোক আছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বেলায়ও তার ব্যত্যয় ঘটে নাই। মাহমুদুল হক সমস্ত বাঙালি বা বাংলাদেশীকে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী (কিংবা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তি!) হিসাবে দেখান নাই — এখানেই তাঁর কাণ্ডজ্ঞানের প্রমাণ মেলে। কিন্তু একজন লেখক তার লেখায় কোন ধরনের চরিত্রকে প্রাধান্য দিবেন সেখানেই তার দৃষ্টিভঙ্গি তথা জীবনচেতনা ধরা পড়বে। এ জায়গাটাতে ইলিয়াসের সাথে মাহমুদুল হকের দূরত্ব অনেক। আর মোরশেদুল ইসলাম খেলাঘর ছবিতে যা করেছেন সেটাও নিশ্চয় বাড়াবাড়ি।

      – মাহাবুবুর রাহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — সেপ্টেম্বর ৩, ২০০৮ @ ৫:৩৬ অপরাহ্ন

      খেলাঘর উপন্যাস অবলম্বনে মোরশেদুল ইসলাম যে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, শুনেছি লেখকের জীবদ্দশাতেই সেটি মুক্তি পেয়েছে। লেখক দেখিছিলেন কি না, বা দেখে থাকলে কী প্রতিক্রিয়া করেছিলেন তা জানি না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এমনটি করা যায় কি না, নৈতিক বা নন্দনতাত্ত্বিক যেকোনো বিবেচনায়? ফাহমিদুল হক তাঁর পুরো আলোচনায় প্রসঙ্গটি এনেছেন খুবই আকস্মিকভাবে, এবং এ নিয়ে আর কথা বাড়াননি। তবে তাঁর প্রকাশভঙ্গি থেকে বোঝা যায় তিনি মোরশেদুল ইসলামের আচরণ (‘ঘাড় ধরে’ ইয়াকুবকে যুদ্ধে পাঠানো) পছন্দ করেননি। পছন্দ করেননি সুমন রহমানও। কিন্তু এ নিয়ে বেশি কথা তিনিও বলেননি। মুক্তিযুদ্ধ বলে নয়, যেকোনো কাহিনীকে অন্যান্য মাধ্যমে পুনর্নিমাণ করার সময় সে কাহিনীর কোনো চরিত্রকে দিয়ে এমন কিছু করানো যায় কি না যা মূল কাহিনীতে সেই চরিত্রের মূল প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?

      – মশিউল আলম

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — সেপ্টেম্বর ৪, ২০০৮ @ ১১:৩৭ অপরাহ্ন

      “মুক্তিযুদ্ধ বলে নয়, যেকোনো কাহিনীকে অন্যান্য মাধ্যমে পুনর্নিমাণ করার সময় সে কাহিনীর কোনো চরিত্রকে দিয়ে এমন কিছু করানো যায় কি না যা মূল কাহিনীতে সেই চরিত্রের মূল প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়?”
      …………

      বিষয়টি নিয়ে আমি বিস্তারিত আলাপ পাড়ি নি, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক নন্দনতত্ত্বের সমস্যা হিসেবেই একে দেখেছি। কিন্তু প্রসঙ্গটি মুক্তিযুদ্ধ না হয়ে অন্য কিছু হলে কী হত? গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন মশিউল আলম।

      মাহমুদুল হকের যে কোনো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসে, সে খেলাঘর হোক, কিংবা জীবন আমার বোন বা অশরীরীই হোক, একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র আমাদের প্রত্যাশার বিপরীতে বিকশিত হয় দেখি। নিঃস্পৃহ ইয়াকুব বা খোকা গল্পের শেষে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়বেন, এমত অপেক্ষা আমরা অজান্তেই করতে থাকি। কিন্তু এই ফর্মুলার বাইরে থাকেন মাহমুদুল হক। আমাদের প্রত্যাশাকে তৃপ্ত হতে দেন না। তুলনায় মোরশেদুল ইসলাম যখন নিঃস্পৃহ ইয়াকুবকে যুদ্ধে নামান, তখন সেটি আমাদের প্রত্যাশার অনুকূলে থাকে। আমাদের ইগো তৃপ্ত হয়। এবং শেষমেশ একটি ফর্মুলাস্টোরি হয়ে ওঠে।

      এখন মশিউলের প্রশ্নে আসি। আমার মনে হয়, যে কোনো শিল্পের পুনরুৎপাদনের কালে পুনরুৎপাদনকারী অনেকদূর স্বাধীনতা নিতে পারেন, এবং নিজের ব্যক্তিত্ব ও চিন্তা তিনি পুরনো কাহিনীতে প্রবেশ করাবেন এটাই স্বাভাবিক। তবে সেটা নিশ্চয়ই নতুন নন্দনতত্ত্বের স্বার্থে। নতুন অর্থ কিংবা নতুন ব্যঞ্জনা দেবার দায় তার থাকবে। কিন্তু খেলাঘর উপন্যাসের ইয়াকুব মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়ার ফলে যে অর্থটি তৈরি হয়, সেটি হয়ত মহৎ, কিন্তু সেটি কতটা মাত্রাযোগকারী (ইয়াকুবের চরিত্রের গতিপ্রকৃতিসাপেক্ষে) তাকে নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তবে প্রশ্নটি ফাহমিদুল হক হয়ত অনেক জোরালোভাবে তুলতে পারবেন যেহেতু চলচ্চিত্রটি তিনি দেখেছেন, এবং তা নিয়ে লিখেছেন।

      – সুমন রহমান
      ৪/৯/৮

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফাহমিদুল হক — সেপ্টেম্বর ৭, ২০০৮ @ ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

      যারা মন্তব্য করেছেন তাদের ধন্যবাদ জানাই।

      তবে লক্ষ করা গেল মন্তব্যগুলো মোরশেদুল ইসলামের এডাপ্টেশনকেন্দ্রিক, মূলত। এবিষয়ে, সুমন রহমান যেমন বলেছেন, আমার হয়তো বাড়তি কিছু বলার সুযোগ আছে। কারণ আমি প্রথমে চলচ্চিত্র খেলাঘর নিয়ে লিখেছিলাম কালের খেয়ায়, পরে উপন্যাসটি নিয়ে লিখলাম এবং সত্যি বলতে আমার পিএইচডি গবেষণায় চলচ্চিত্রটি অন্তর্ভুক্ত হবার কারণে আরও বিস্তারিতভাবে খুব সম্প্রতি খেলাঘর চলচ্চিত্রটি নিয়ে পুনরায়, ইংরেজি ভাষায় লিখতে হলো। এই গবেষণার প্রয়োজনে চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলামের সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছে এবং খেলাঘর নিয়ে কথাও বলতে হয়েছে।

      আমি বইয়ের আলোচনায় চলচ্চিত্রের প্রসঙ্গটি এনেছি শুধু এটুকু বোঝাতে যে মাহমুদুল হকের মূল চরিত্রগুলোর নিস্পৃহতা পাঠককে এমন অস্বস্তিতে ফেলে যে পারলে পাঠক হয়তো উপন্যাসে ঢুকে সব ঠিকঠাকমতো নিজের মতো সাজিয়ে নিতো। মোরশেদুল ইসলামের সেই সুযোগ হয়েছিল এবং তিনি তার চলচ্চিত্রের শেষ দৃশ্যে দেখিয়েছেন যে মুক্তিবাহিনীর দলনেতার কাছে ইয়াকুব যুদ্ধে যোগ দেবার ইচ্ছে প্রকাশ করছে।

      এখন প্রশ্ন উঠেছে যে এই পরিবর্তন কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়েছে? বা মাহমুদুল হক নিজে চলচ্চিত্রটিকে কীভাবে গ্রহণ করেছেন?

      আমি মোরশেদুল ইসলামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সিনেমার এডাপ্টেশন নিয়ে ঔপন্যাসিকের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? তিনি আমাকে বলেন যে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তিনি। কিছু বিষয় পছন্দ করেছেন, আর কিছু করেননি। আর বলেছেন যে আমি আমার মতো লিখেছি, মোরশেদ ওর মতো করে করেছে। তাও সেই প্রতিক্রিয়া তিনি নিজে শোনেননি, ছবির নির্বাহী প্রযোজক ও তার স্ত্রী মুনিরা মোরশেদের কাছে মাহমুদুল হক ফোনে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। আর ছবির লোকেশন তিনি পছন্দ করেছিলেন। সত্যি বলতে ঐ লোকেশন (সোনার গাঁওয়ের পানাম নগর) সবারই পছন্দ হবার কথা। অপু এল রোজারিওর সিনেমাটোগ্রাফিতে তা চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে।

      উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণের ক্ষেত্রে এই প্রশ্ন বরাবরই ওঠে যে পরিবর্তন কতটুকু পর্যন্ত সহ্য করা হবে। সের্গেই আইজেনস্টাইন বলেছেন উপন্যাসকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে গেলে তিনভাবে কাজটি করা যায়: ১. সম্পূর্ণ গ্রহণ ২. আংশিক গ্রহণ ৩. পয়সার জন্য করে যাওয়া। মোরশেদুল ইসলাম ‘সম্পূর্ণ গ্রহণ’ করেছেন শেষের ঐ পরিবর্তন ছাড়া। তিনি আমাকে বলেন, “অ্যাডাপটেশনের ক্ষেত্রে উপন্যাসের মূল সুর থেকে আমি সরে যাবার চেষ্টা করিনি। … উপন্যাসের শেষটা কিছুটা পরিবর্তন করেছি। উপন্যাসে আছে সে সবকিছু দেখছে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে এতকিছু ঘটে যাবার পরে তার একটা পজিটিভ চেঞ্জ আসা উচিত। আমি দেখিয়েছি সেও যুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।”

      এখানে যারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, যেমন মশিউল আলম, বলছেন যে এই পরিবর্তনটা ইয়াকুব চরিত্রটির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ অথচ এই পরিবর্তন ঘটানো যায় কিনা? তিনি সম্ভবত এর ঔচিত্যবোধ নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, অনুমান করি, অ্যাডাপ্টেশনের সময় একেবারে পরিবর্তনবিরোধী নন তিনি।

      আমার পর্যবেক্ষণ চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ কর্মীদের একজন যারা সেকুলার, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বাঙালি জাতীয়তাবাদী ধারায় বিশ্বাসী। এই বুদ্ধিবৃত্তিক খোপে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত এইসব ইমেজই কেবল খাপ খায়: বীর মুক্তিযোদ্ধা, হত্যা-ধর্ষণ-লুণ্ঠণকারী পাক হানাদার বাহিনী, ইসলামের ধ্বজধারী রাজাকার। এর বাইরের যেকোনো ইমেজ বা চরিত্র তাদের কাছে অগ্রহণীয়। মোরশেদুল ইসলামের প্রথম ছবি আগামী, মাঝের ছবি শরৎ ৭১ বা সর্বশেষ ছবি খেলাঘর বিশ্লেষণ করলে তাই পাওয়া যাবে। কারণ এইসব ইমেজ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য ইমেজ বা চরিত্র, যেমন নারী মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী মুক্তিযোদ্ধা, বিহারী-হত্যাকারী মুক্তিযোদ্ধা ইত্যাদি, তার মতো অনেক চলচ্চিত্রকারের ছবিতেই পাওয়া যায় না। মোরশেদুল ইসলামের হাতে ইয়াকুবের এই পরিবর্তন একারণেই ঘটেছে।

      – ফাহমিদুল হক

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মশিউল আলম — সেপ্টেম্বর ৯, ২০০৮ @ ৬:৩১ অপরাহ্ন

      ১. মোরশেদুল ইসলাম যে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি নির্লিপ্ত বা স্বভাবগতভাবেই একজন নিস্পৃহ, নির্লিপ্ত মানুষকে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেখাতে পারেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এর ব্যাখ্যারও প্রয়োজন নেই। আমি জিজ্ঞাসাটি তুলেছিলাম সাধারণভাবে। গল্পে বা উপন্যাসে কোনো চরিত্র বিশ্বাসযোগ্য হয় তার পূর্বাপর আচরণের সঙ্গতি-সামঞ্জস্য থেকে। আমি যেহেতু খেলাঘর চলচ্চিত্রটি দেখিনি তাই আমার পক্ষে বিচার করা সম্ভব নয় ইয়াকুবের যুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তে পৌছানো তার মূল স্বভাব থেকে অবিশ্বাস্যরকমে ব্যতিক্রমী মনে হয় কি না। পরিচালক কী প্রক্রিয়ায় সেটা দেখিয়েছেন, এমন কোনো ঘটনা যুক্ত করেছেন কি না যাতে ইয়াকুবের নির্লিপ্ততা দূর হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ চরিত্রটি ইয়াকুবই থেকে যাচ্ছে, নাকি পরিচালকের মনোবাসনা পূর্ণ করতে অন্য একটি চরিত্র মুক্তিযোদ্ধা হয়ে অসাঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঢুকে পড়েছে ইয়াকুবের মধ্যে। ফাহমিদুল হক ঠিকই বুঝেছেন, আমি পুনর্নির্মাণের বিরোধী নই; যুক্তি ও পরম্পরাসমেত পরিবর্তনে আমার সায়, এমনকি ঔৎসুক্য আছে, কারণ তাতে ভিন্ন মাত্রায় একটি চরিত্রের মানবিক সম্ভাবনাগুলো এবং তার পুনর্নির্মতার সৃজনকল্পনাপ্রতিভার দেখা মিলতে পারে।

      ২. মাহমুদুল হকের উপন্যাসগুলোতে একজন নিস্পৃহ স্বভাবের মানুষের দেখা পাওয়া যায়, তাদের দেখে যদি পাঠকের এই ভেবে অস্বস্তি বোধ হয় যে চরিত্রটি কেন আমার মনের মতো করে আচরণ করছে না, তাহলে সেই পাঠককে নিয়ে বড়্ই সমস্যা। এমন লেখককে নিয়েও সমস্যা যাঁরা এই ভেবে কাহিনী ও চরিত্র সাজান যেখানে কোনো চরিত্রের কোনো বৈশিষ্ট্য পাঠকের মনে ফাহমিদুল হক বর্ণিত ‘অস্বস্তি’ সৃষ্টি না করে। আন্না কারেনিনা আত্মহত্যা করেছে বলে পৃথিবী জুড়ে লাখ লাখ, নাকি কোটি কোটি পাঠক পাঠক-পাঠিকার আপত্তি। কেউ একজন খোদ তলস্তয়কে জিগ্যেস করেছিল, আপনি আন্নাকে মারলেন কেন? তলস্তয় নাকি হেসে উত্তরে বলেছিলেন, আমি তো মারি নাই; সে নিজেকে মারলে আমি তার কী করতে পারি?

      মাহমুদুল হকের ইয়াকুব আগাগোড়াই মাহমুদুল হকের রয়ে গেছে। মোরশেদুল ইসলাম তাকে নিয়ে যা করেছেন, তাতে তার ওই মোরশেদীয় অংশটুকুকে ভেজাল মনে হয় কি না প্রশ্ন সেটাই। ফাহমিদুল হক এ বিচারটা করতে পারবেন।

      – মশিউল আলম

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।