মাহমুদ দারবিশের তিনটি কবিতা

‘নির্বাসন ছাড়া আমি কে?’, ‘পাসপোর্ট’, ‘রিতা আর রাইফেল’

অবনি অনার্য | ২৬ আগস্ট ২০০৮ ১১:৫৮ অপরাহ্ন

নির্বাসন ছাড়া আমি কে?

তীরবর্তী পথিক, নদীর মতোই… জল দিয়ে বাঁধা হলো তোমার নামের সাথে। আমার মুক্তদূরত্ব থেকে কোনো কিছুই আর ফিরিয়ে নিয়ে যাবে না আমার পাম গাছের কাছে — না শান্তি, না যুদ্ধ। কোনো কিছুই আর আমাকে টেস্টামেন্টের বইগুলোতে উৎকীর্ণ করবে না। কিছুই না, ভাটাপড়া তীর আলোকপ্রভ করবার মতো কিছুই আর নেই, টাইগ্রিস আর নিল নদীর মধ্য দিয়ে কিছুই আর প্রবাহিত হয় না। ফারাওদের সুপ্রাচীন রথ থেকে আমাকে আর কেউ নামিয়ে দেয় না। খানিক সময় দেবার মতো কেউ আর নেই, বিশ্বাসে অটল থাকবার অবকাশও কেউ দেয় না — না অঙ্গীকার, না নস্টালজিয়া। আমার এখন কী করা উচিত? নির্বাসনে যাওয়া ছাড়া আমার আর কী করবার আছে, সারারাত জলের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছাড়া কী করতে পারি আমি?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…
আমার স্বপ্নের প্রজাপতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে বর্তমানে নিয়ে আসবার মতো কিছু নেই — না মাটি না আগুন। সামারকান্দের গোলাপ ছাড়া আমি আর কী করতে পারি? চন্দ্রাকৃতির পাথর দিয়ে বংশী পলিশ করা স্কয়ারে আমি কী করতে পারি? আমরা উভয়েই কত ভারহীন হয়ে গেছি, যেমন দূরবর্তী বাতাসে আমাদের বাড়িগুলো হয়ে গেছে প্রায়-ভরহীন। মেঘেদের অদ্ভুৎসব সৃষ্টির সঙ্গে বন্ধুতা হয়ে গেছে আমাদের উভয়ের; আত্মপরিচয়ের ভূমির মাধ্যাকর্ষণ শক্তির নাগালের বাইরে। এখন আমরা কী করতে পারি… নির্বাসন ছাড়া আমাদের আর কী করার আছে, সুদীর্ঘ রাত জলের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া কী করতে পারি আমরা?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…
তোমার জন্য আছি কেবল আমি, আমার জন্য শুধু তুমি… প্রেমিকের ঊরুতে চুমু খায় এক অচেনা পথিক: শোনো হে পথিক! এই সুনসান নীরবতায় আমাদের জন্য যা রাখা আছে, তা দিয়ে কী করতে পারি আমরা, মধ্যদুপুরের যে-ঘুম এক কীংবদন্তী থেকে অন্য কোনো কীংবদন্তীকে বিচ্ছিন্ন করে, তাকে নিয়ে কী করার আছে আমাদের? আমাদেরকে নিয়ে যাবার মতো কেউ নেই — না পথ, না বাড়ি। শুরু থেকেই এই পথ একই আছে তো, নাকি পাহাড়ের উপর মোঙ্গলদের অর্শ্ববহরের মধ্যে ঘোটকীর সন্ধান পেয়ে গেছে আমাদের স্বপ্নগুলো, আর আমাদের বিকিয়ে দিয়েছে? তাহলে আমাদের কী আছে করার?
জল দিয়ে
বাঁধা হলো
তোমার নামের সাথে…

পাসপোর্ট

ওরা আমাকে চিনতে পারেনি অন্ধকারে
যা আমার পাসপোর্ট থেকে রঙ সব শুষে নিয়েছিলো
আর ওদের কাছে আমার ক্ষতগুলো ছিলো নিখাদ লোকদেখানো
একজন পর্যটকের যে কিনা ফোটোগ্রাফ সংগ্রহ করতে ভালোবাসে
ওরা আমাকে চিনতে পারেনি,
আহা রে… ছেড়ে যেও না
আমার হাতের তালু সূর্যবিহীন
কেননা বৃক্ষরা আমাকে চিনতে পেরেছিলো
বৃষ্টির সকল গান চিনতে পেরেছিলো আমাকে
চাঁদের মতোন ফিকে এ-আমাকে যেও না ফেলিয়া!

***

যেসব পাখির দল দেখেছিলো আমার হাতের তালু
থেকে দূরবর্তী বিমানবন্দরের দরজা
সকল গমের ক্ষেত
সকল কয়েদখানা
সমস্ত শ্বেতসমাধিপ্রস্তর
কাঁটাতারঘেরা সকল সীমানা
দুলতে থাকা সকল রুমাল
সকল দৃষ্টি
ছিলো এ-আমার সাথে,
অথচ আমার পাসপোর্ট থেকে এইসব কিছু তারা উধাও করে দিলো

***

আমার নাম-পরিচিতি মুছে দিতে চাও?
নিজহাতে যে-মাটির যত্ন নিয়েছি সেই মাটিতে?
আজ পরিস্থিতি আর্তনাদ করে উঠেছিলো
আকাশ কাঁপিয়ে:
আবার আমার নামে আর কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন কোরো না!
ওহে ভদ্রমহোদয়গণ, ওহে পয়গম্বরগণ,
বৃক্ষদেরকে তাদের নাম জিজ্ঞেস কোরো না
উপত্যকাদেরকে তাদের মায়েদের বিষয়ে জিজ্ঞেস কোরো না
আমার কপাল থেকে বিচ্ছুরিত হয় আলোর তরবারি
আর আমার হাত থেকে ঝরনাধারার মতো বহে নদীদের জল
মানুষের হৃদয়ে আছে আমার পরিচয়
অতএব নিয়ে যাও আমার পাসপোর্ট

রিতা আর রাইফেল

রিতা আর আমার চোখের মাঝখানে
একটি রাইফেল
আর রিতাকে যারাই চেনে
হাঁটুগেড়ে বসে খেলতে থাকে
শাশ্বতের দিকে মধু-রঙা ওই চোখে
আর আমি চুমু খেলাম রিতাকে
যখন সে টগবগে তরুণী
আমার মনে আছে কীভাবে সে এগিয়ে এলো
কীভাবে আমার বাহুতে ঢেকে গেলো সুন্দরতম খোঁপা তার
আর আমার মনে পড়ে যায় রিতাকে
যেমন চড়ুইপাখির মনে পড়ে যায় নিজস্ব আলোকধারা
আহ রিতা
আমাদের মাঝে হাজার-লক্ষ চড়ুই আর দৃশ্যকল্প
আর কত না মিলন-স্থান
রাইফেলে ছাই হয়ে গেলো

***

রিতা নামটি আমার মুখে ভোজনের স্বাদ হয়ে আসে
রিতার শরীর মানে রক্তে যেন বিবাহোৎসব
আর রিতার মধ্যে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম দু’দুটো বছর
আর সেই দু’বছর ও ঘুমিয়েছিলো আমার বাহুতে
আর আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম
সুন্দরতম পেয়ালার ’পরে
আর আমরা আমাদের ঠোঁট পুড়িয়ে ফেলেছিলাম সুরায়
আমাদের জন্ম হলো পুনঃ।

***

ওহ রিতা
তোমার উপর থেকে আমার চোখ সরিয়ে নেবার আগে এই রাইফেল কী করতে পারতো
এক-দুটো ভাতঘুম কিংবা মধু-রঙা মেঘদল ছাড়া?
একদিন
আহ, গোধূলির নৈঃশব্দ
আর সকালে আমার চাঁদ দেশান্তরী হলো কত কত দূরে
সেইসব মধু-রঙা চোখেদের দিকে
নগরীর ঝাড়–পেটা খেয়েছিলো সকল গায়ক
আর রিতা

***

রিতা আর আমার চোখের মধ্যখানে —
একখানা রাইফেল।

অনুবাদ: অবনি অনার্য

aunarjo@gmail.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (6) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৌম্য — আগস্ট ২৯, ২০০৮ @ ১২:২৯ পূর্বাহ্ন

      অনেক অনেক ভালো লাগলো।

      আমি কয়েকজন প্যালেস্টাইনি ছেলের সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে মিশছিলাম। তাদের একজন মেহের। বাংলাভাষায় গালি গালাজ সে যে কোনো বাঙালীর চেয়ে ভালো জানে। মেহের খুব ভালো একটা ফ্যামিলির ছেলে ছিল, বাবা-মা-আর সে একটা চমৎকার বাড়িতে থাকতো, একদিন হঠাৎ দেখলো ইজরায়েল আর্মির বিশাল আর্মার্ড ট্যাঙ্কগুলো ছাড়া তাদের এলাকায় সব ধুলোর সাথে মিশে গেছে…পিএলওর হয়ে রাস্তায় রাস্তায় পাথর ছুঁড়ে মারার জীবন শুরু হলো, কীভাবে যেন চলে এল বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে। দুই বছর শেষে নিজ দেশে যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় সবাই মারা পড়লো।

      – সৌম্য

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন amio — আগস্ট ২৯, ২০০৮ @ ১:১৬ পূর্বাহ্ন

      অনুবাদ ভাল হয়েছে। তবে একটা জায়গায় খটকা লেগেছে।
      “নির্বাসনে যাওয়া ছাড়া আমার আর কী করবার আছে, সারারাত জলের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছাড়া কী করতে পারি আমি?” “তাকিয়ে ছাড়া” এখানে কি কোনো শব্দচ্যুতি ঘটেছে। কেমন যেন হোঁচট খাচ্ছে।

      “সকালে আমার চাঁদ দেশান্তরী হলো কত কত দূরে”, “আমরা আমাদের ঠোঁট পুড়িয়ে ফেলেছিলাম সুরায়।” চমৎকার পঙ্‌ক্তি। চিত্ররূপময় নয় কি?
      অনুবাদে শব্দচয়নে অনুবাদককে সদা সচেতন হতে হয়। এ বিষয়টা চোখে পড়েছে। অন্য সবার অনুবাদ পড়েছি, এটাও পড়লাম। ভাষার কারুকার্যে ও গতিশীলতায় সব মিলে চমৎকার।

      – amio

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শফিক মনজু — আগস্ট ২৯, ২০০৮ @ ১২:১৯ অপরাহ্ন

      মাহমুদ দারউইশ, সামিহ আল কাসিম ও আদোনিছ; ফিলিস্তিনী এই তিন কবির কবিতার একটি সঙ্কলন বাঙলায়ন প্রকাশনা হতে বের হয়েছিল ২০০৬ সালে। নাম একটি মানচিত্রের কুরবানী। বইটি দ্বিভাষিক – বাঙলা এবং আরবি। মূল আরবি হতে বইটি অনূদিত হয়েছিল। আপনি দেখেছেন কি না জানি না। দারউইশের কবিতা অনুবাদের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। তাঁর আরও অনুবাদের জন্য অনুরোধ থাকল।

      – শফিক মনজু

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অবনি অনার্য — সেপ্টেম্বর ১, ২০০৮ @ ১২:০৩ অপরাহ্ন

      প্রিয় সৌম্য, আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু মেহেরের জন্য কষ্ট হচ্ছে খুব। পরে কি তাঁদের আর কোনো খবর পেয়েছেন?

      প্রিয় অমিয়, আপনার মন্তব্য খুবই সুন্দর, এবং পাঠক হিসাবে আপনি বেশ সচেতন। প্রকৃত পাঠক এবং সমালোচক (আলোচক বলা ভালো) হিসাবে ধন্যবাদ আপনার প্রাপ্য। আসলেই ওখানে “তাকিয়ে থাকা” হবে।

      প্রিয় শফিক মনজু, দুঃখিত, বইটি আমার দেখা হয়নি। দেখবো নিশ্চয়ই। দারবিশের আরো কবিতা অনুবাদের ইচ্ছা আছে। ভালো থাকবেন সবাই।

      – অবনি

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিধান রিবেরু — সেপ্টেম্বর ১২, ২০০৮ @ ১:৪৩ অপরাহ্ন

      কিছু মনে করবেন না অবনি, আপনার ভাষান্তর সত্যি ভালো হয়েছে তবে একটা জায়গা — ঐ নিল নদী, ওটা নিল নদ হবে। এতটুকুই। আপনাকে ধন্যবাদ — প্রাঞ্জল ভাষান্তরের জন্য।

      – বিধান রিবেরু

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Bidhan Rebeiro — সেপ্টেম্বর ১২, ২০০৮ @ ১:৫১ অপরাহ্ন

      কিছু মনে করবেন না অবনি, আপনার ভাষান্তর সত্যি ভালো হয়েছে তবে একটা জায়গা — প্রথম কবিতার ৪/৫ নম্বর লাইনে নিল নদী না হয়ে নিল নদ হবে। এতটুকুই। আপনাকে ধন্যবাদ — প্রাঞ্জল ভাষান্তরের জন্য।

      – বিধান রিবেরু

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com