কবিতা

মুহম্মদ নূরুল হুদা: লুলা আন্ধা আল্লাহর বান্দা

মুহম্মদ নূরুল হুদা | 4 Jun , 2018  

আমি সেই লুলা আন্ধা
আমি সেই আল্লাহর বান্দা
আমি সেই ত্রিভঙ্গ ফকির।
আমারও জানা আছে
জগতের তাবৎ ধান্ধা আর ফিক্কির।
শিবনৃত্যে জুড়েছি বটে অনঙ্গ জিকির।

বটে আমি প্রেমিক, বটে আমি ধার্মিক।
বটে আমি রাজনীতিক, বটে আমি তার্কিক।
বটে আমি কবি, বটে আমি নই নবী।
বটে আমি গেরুয়া বসনে নদী সন্ত,
বটে আমি বহমান অনাদি অনন্ত।

বটে আমি মহাবিদ্রোহী রণক্লান্ত।
বটে আমি প্রয়োজনে সারেন্ডার জানি দুর্দান্ত।
বটে আমি সারাবেলা,
বটে আমি বোবা নজরুলের পাগলা চেলা;
আমার হাতে আণবিক বোমার চেয়ে
শক্তিশালী বৈদিক যুগের মাটির ঢেলা।
আমি বসে থাকি পদ্মাসনে।
আমি পটু বটে ত্রিভুবনে গমনাগমনে।

আমি বসে থাকতে থাকতে
চলতে শুরু করি।
আমি চলতে চলতে বসে পড়ি।
আমি নিজের সঙ্গে ‍নিজেই করি
নিজের দরাদরি।

আমি পাতাল ফুঁড়ে বের হই
জলআগুনের বিপরীত মেরু;
আমার ভিতরে ঘুরে ফেরে
মানুষপ্রজাতির সরীসৃপ সরু।
আমি আকাশ ফুঁড়ে খুঁজে ফিরি
অমরাবতীর অমরপ্রান্তর।
আমি মুনিঋষির ঘরকে
করি বাহির, বাহিরকে ঘর।

মুসার লাঠি হাতে আমি তিস্তাকে করি শায়েস্তা,
আমি দিদির সাথে খিস্তিখেউড় করি দিস্তা দিস্তা।
দশদিকে দশ হাত মেলে আমি উড়তে থাকি সাতআসমান।
আমি অসুরদমনে মা দুর্গার লুলা আন্ধার বয়ান।
পদ্মার চরে সাঁতার কেটে আমি স্বয়ং পদ্মা নদী।
আমি শক্তিমন্ত, দুর্মদ, দুরন্ত, মহা-আমোদী।
আমি এই উপমহাদেশ জুড়ে সখ্য
পক্ষাপক্ষহীন নিরপেক্ষ।
আমি শ্বশুর-ভজনে মহা দক্ষ।
আমার জন্যে পাগলাগারদে বরাদ্দ শ্রী-কক্ষ।

তবে আমি কুচপরোয়া।
বিশ্বভুবনে আমাকে নাই কোনো ধরোয়া।
আমার হাত যদি ডানা, পাগুলো বটে দাঁড়।
আমি না মাঝি না বৈঠা, না মই;
আমি চলন্ত নায়ের ধাবমান গলুই।
আমাকে দেখলেই সকলেই ত্রস্ত।
আমি আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র।
আমি দেখেছি কোরিয়া মার্কিন চিন।
আমি দেখেছি দেশহীন ভুমিহীন ফিলিস্তিন।
আমি তবু মুখ বাড়িয়ে কেবল আমাকে খুঁজি।
আমি তবু মুখ বাড়িয়ে কেবল তোমাকে খুঁজি।
আমি তোমাকেই চাই সোজাসুজি।
তুমিই আমার রবীন্দ্র-উর্বশী,
তুমিই আমার পূর্ণিমাচাঁদের সুকান্ত রুটিরুজি।

চরাচরে সফেন তরঙ্গভঙ্গে তোমার চিৎসাঁতার
দেখলেই আমি জাটকা জাল বসাই। আর
নিক্ষেপ করি দুরন্ত ঝাঁকি জাল আমার।
আমি শ্রমিক মজুর তাঁতী-চাষী আর জেলের সন্তান।
আমি সহজেই চিনি ধান-ইলিশের ঘ্রাণ।
আমি তোমাকে খুঁজি না। খুঁজতে থাকি প্রিয়
তোমার কাছে গচ্ছিত আমার হারিয়ে যাওয়া অঙ্গুরীয়।

মূর্ত আমি চির-অন্ধ। আমার সামনে নূরের দুয়ার বন্ধ।
বিমূর্ত আমি সর্বলোকে শুঁকতে থাকি মৃগনাভির সুগন্ধ।
শুঁকতে শুঁকতে যুগল ঝর্নার জলে সাঁতার কাটে আমার বৈভব।
তুমিহীন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড আমার কাছে রৌরব।
দেখা দাও
দেখা দাও
দেখা।
একা আমি
একা তুমি
একা।

দেখা দিলে না, তবে অনন্ত শাদার কথা বললে।
বলতে বলতে তুমি তোমার পথেই চললে।
আমিও জন্মাবধি খুঁজে চলেছি সেই অন্তহীন শাদা।
কারো বাধা মানি না, গ্রাহ্য করি না কারো গলাসাধা।
আমি নিজে নিজের ছিপখান তিনদাঁড় তিনজন মাল্লা।
আমাকে আমার কেবলা দেখাবেন আমার মাওলা।
মাওলা গো, আমি চলবো তবে কেমনে?
আমি শুধু লুলা পায়ে পাহাড় ডিঙাবো তোমারই পেছনে পেছনে?

আমি যখন উঠে দাঁড়ালাম, তুমি ঠিকই ভিন্ন দিকে চললে।
এই তো আমাদের বৈপরীত্য। এই তো আমাদের সত্য।
ভয় নেই, এই লুলা সফরে আমি সঙ্গে নিয়েছি আমার পথ্য।

আমি মনুসংহিতার সদাচার, কনফুসিয়সের লী।
আমি কারো ঘাড় মটকাই না। আমি আমার পথেই চলি।
আমি রুমীর সুফিশুক্তি, হুইটম্যানের ব্যক্তিমুক্তি।
আমি দ্বৈতাদ্বৈতের অভেদসুন্দর উক্তি।

না, আমি নই অবাধ নির্বাচনে জয়ী মহামতি পেরিক্লিস।
না, আমি নই হেমলকপায়ী সক্রিটিসের শান্তিযাত্রী গ্রিস।
না, আমি নই একবিংশ শতকের তৃতীয় বিশ্বে নির্বাচনহীন গণতন্ত্র।
না, আমি নই কামরূপ-কামাখ্যার ব্যাখ্যাতীত ক্ষমতামন্ত্র।
আমি এই বঙপ্রজাতির বেদে বংশেরও এক সামান্য ওঝা।
তোমাদের এই ডিজিটাল পৃথিবীটাই
আমার কাছে এক সুবিশাল বোঝা।

আমি বাঁশি বাজাবো দশমুখে দশদিগন্তে।
নাগিন নাগিন আমার এই মুখ
ফুলে উঠবে রাজভোগের আপেলের মতো।
যারা গিরিদরীবন সমতল পাহাড় পর্বতে
নির্বিকার বসে আছেন নিজ নিজ তখতে,
তারা আবার জেগে উঠছেন গোপালভাঁড়ের গল্পে।
তাঁরা তোষামুদ শুনে খুশি হন বড় অল্পে।
তারা আমার বাঁশির সুরে সুরে মাথা সামলায়।
তারা আমার চলার পথে সাথী হতে চায়।
স্বাগতম স্বাগতম
দম মারো দম মারো
দম হরদম!

১০

আয় আয় আয়,
গ্রহাণুর সঙ্গে মাতাধরনী টক্কর খেয়ে যায়।
আর আন্ধার মতো অটল থেকো না হে আলস্যে বুঁদ।
ওদেরকে জোগাড় করতে বলো তাবৎ সাক্ষীসাবুদ।
না গো রাজপিতা না গো রানীমাতা;
চিরদিন কারো আসন অটল থাকে না, ইয়া মাবুদ।

অন্তত সদ্যোজাত শিশুর জন্যে মজুদ রাখো একবাটি দুধ।
০৪.০৬.২০১৮
Flag Counter


5 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    খুবই সুখপাঠ্য, তবে বারবার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহীর কথা মনে পড়ে গেলো।

  2. Sharif Ahmed says:

    Simply MAJESTIC!

  3. Is the LULAs are free man ????
    so far as we know they are the business goods of some miscreants. They have been sold for monthly basis, but in the month of ramada, they have been sold in high rate.
    The money which the earn or public donates, after few hours the owner come to take all the money or by a little children.
    How funny the matter is !!!!!

  4. গীতা দাস says:

    পড়লাম। বিষয় তো আছেই সাথে আঞ্চলিক শব্দের চমৎকার ব্যবহার।

  5. Ajit Das says:

    কবিতাটি পড়লাম । ভাল হয়েছে । তবে কিছু শব্দ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের সামিল । এটা পরিহার করা উচিৎ ছিল বলে আমার কাছে মনে হয়েছে ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.