গল্প

নাহার মনিকার গল্প: রূপান্তর

nahar_monica | 15 Jun , 2018  


মতামতে এই লেখাটা আপলোড হয়েছে। হোমপেজে দিয়ে দিন।অলংকরণ: ফাহমিদা জামান ফ্লোরা।

ডিসকভারি চ্যানেলে একঝাঁক পাখি উড়ে যাওয়ার শব্দ চিড়ে মুহতারিমার স্বভাব-মৃদু কন্ঠ তীক্ষ্ণ হয়ে শোবার ঘরের বাতাস ফালা ফালা করে ভেসে আসছে- ‘আমি তো আগেই বলছি তোমার আম্মা আমাকে দেখতে পারে না, এখন বুঝছো?’
একটু পরে ইমন বেরিয়ে এসে থমথমে মুখ করে সোফায় বসে।
হামিদা বেগম টেলিভিশন দেখার চেষ্টা করছেন। মনের ভেতরের ঘূর্ণিঝড় বাইরে প্রকাশ না করার দক্ষতা আছে তার। শান্ত মুখে ছেলেকে বলেন- ‘ চলো তাহলে, আমাদেরকে বাসষ্ট্যান্ডে নামায় দিয়া আসো’।
-’আম্মা, ইতিকে নিয়া যাওয়া কি এতই জরুরী?’
এমন অনুনয় আসবে, জানতেন। জবাব না দিয়ে ইতিকে ডাক দেন হামিদা- ‘ ব্যাগগুলা উঠা, চল’।

এপ্রিল মাসের সকাল দ্রুত তেতে ওঠে! হামিদা বাসের জানালার পর্দ্দা টেনে দেন, ঢাকা-দিনাজপুর দূরপাল্লার এসি বাসগুলো এখন আরামদায়ক। ছেলে আর বৌমাকে খুশী রেখে ফিরছেন না, এটা কাঁটার মত বিঁধছে, কিন্তু ওরা যা করেছে তা মানা যায় না।

মাস দুই আগে ভোরের কুয়াশা ছিন্ন করে ইমন ফোন করেছিল। সকালবেলা ওদের ব্যস্ততার কথা জানেন হামিদা, কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ নিয়ে ফোন ধরেছিলেন।
‘আম্মা, একজনও পাওয়া গেল না?’- মীমকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে ইমন। সোয়াদকে নিয়ে মুহতারিমা অফিস কামাই দিচ্ছে। একদিন ইমন অফিস বাদ দেয় তো আরেকদিন বউমা। প্রায় মাসখানেক তাদের কাজের বুয়া বাড়ি গিয়ে আর ফিরছে না। খোঁজ তো হামিদা করছেনই, কতজনকে বলে রেখেছেন। ভালো বেতন, থাকা খাওয়া সব। কিন্তু কেউ রাজী হয় না।
হামিদার স্বভাব জেনেও ইমন বায়না করে-‘ আম্মা, তুমি চলে আসো। কি এমন রাজ্যপাট তোমার ঐখানে, এখানে নাতি নাতনীর সঙ্গে সময় কাটবে’।

কিন্তু ঢাকায় গেলে হামিদার গলায় মাছের কাটা আটকে থাকার দশা হয়। বাড়ির খোলা ছাদ, হাঁটাচলার জায়গা এসব ছেড়ে ঢাকায় গিয়ে দু’দিনের বেশী টেকা অসম্ভব।
তবু ছেলের কথা মনে করে, নাতি নাতনীর সঙ্গ পাওয়ার আকর্ষণে হিসেব করতে বসেন।
গেলে লাভ কি? ক্ষতি কি?
আটষট্টি বছর বয়সে এসে হামিদা বেগমের মনে হয় যে জাগতিক লাভ ক্ষতির হিসাব করাও দরকার। জীবনের যে কটা দিন বাকী আছে, তা নিজের মত কাটানোর অধিকার থাকা উচিত বলে মনে হয় তার।
মুশকিল হলো- মীম সোয়াদ এর সঙ্গ অপার্থিব আনন্দের, ওরা যখন দিদা দিদা বলে দু’পাশে বাকুম বাকুম করে, জীবনের ষোলকলা পূর্ণ মনে হয়। আবার, বিকেল ফুরানো আলোয় নিজের বাড়ির ছাদে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে শুনতে নিজস্ব গাছ-গাছালী, পাখ-পাখালী পরিবৃত্ত পায়চারীতে যে পারমার্থিক অনুভব, তখন মনে হয় যে জীবনের পরিপূর্ণতা এখানেই।
“তরঙ্গ মিলায়ে যায় তরঙ্গ উঠে, কুসুম ঝরিয়া পড়ে কুসুম ফুটে।
নাহি ক্ষয়, নাহি শেষ, নাহি নাহি দৈন্যলেশ-সেই পূর্ণতার পায়ে মন স্থানমাগে” এই গানটা যে কতবার শোনেন! গান শেখার ইচ্ছের কথা মনে এলে লজ্জা পান হামিদা। নাহ, হৃদয়ঙ্গম করতে পারছেন এই-ই সৌভাগ্য।

খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গে হামিদার। অজু করে নামাজ পড়ে ছাদে উঠে যান।
বাড়িটা দোতলার ফাউণ্ডেশন করে বানানো হলো যখন, ইচ্ছে ছিল নিজেরা দোতলায় আর নীচতলা ভাড়া। তা দোতলা হবার আগেই আজিজুল হক সুদুর নীহারিকা হয়ে পরপারে চলে গেলেন। ইমন কি কোনদিন ঢাকা ছেড়ে এখানে ফিরবে? কার জন্য দোতলা? তবে চিলেকোঠার ঘরটা গুছিয়ে দিনমান কাটানোর বন্দোবস্ত করে নিয়েছেন হামিদা। খাবার টেবিল, বইয়ের র‍্যাক, গানের সিডি আর একটা সিঙ্গেল খাট। দুপুরের ভাত ঘুমটুম দিতে চাইলে আর নিচে নামতে হয় না।
প্রতিদিন ভোর যখন আকু পাকু করে অন্ধকার সরিয়ে নিজের জায়গা করে নেয়-তখন ছাদে চলে যান হামিদা। বাড়ির শুপারী গাছগুলো লম্বা হয়ে রেলিং ছাড়িয়ে যাওয়াতে ছাদের একপাশে ছায়া। অন্যপাশে এলাচী, তেজপাতা গাছ বড় টবে। গৌরাঙ্গের মা’কে ইটের বেদী বানিয়ে তুলসী গাছ দিয়েছেন। প্রতি সন্ধ্যায় সে জল ঢেলে তর্পণ করে, দেখতে ভালো লাগে হামিদার। তাছাড়া-তুলসীর ভেষজ গুণ। ঠান্ডায় তুলসীর পাতা সেদ্ধ গরম পানি মধু দিয়ে খেয়ে সর্দিকাশি দূরে রেখেছেন হামিদা।
সকালে একটা আলগা চুলায় ছাদের কোনায় গৌরাঙ্গের মা রুটি বেলতে আটা সেদ্ধ করে। বয়স যে দাঁতকে আগে নিশানা করে তা হামিদা টের পাচ্ছেন, শক্ত রুটি খেতে পারেন না। রান্নার সরঞ্জামাদি আনতে ইতিকে ঘন ঘন নিচের রান্নাঘরে যেতে হয়। মেয়েটাও তেমন, কোন কিছুতে উৎসাহের কমতি নেই। বাসায় ডিম নেই, ইতি সঙ্গে সঙ্গে বলবে-‘এখনি নিয়া আসি’। তারপর লাফাতে লাফাতে মোড়ের দোকানে যাবে আর আসবে।

গৌরাঙ্গ মরে যাওয়ার পর ইতির মা যখন ঢাকায় গার্মেন্টস এ কাজ করতে গিয়েছিল, মেয়েটা তখন শুককীটের মত। দুর্ঘটনায় বিল্ডিং চাপা পড়ে মরে গেলে বস্তির পরিচিত একজন তাকে নিয়ে এসে গৌরাঙ্গের মা’র কাছে রেখে যাওয়ার দিনটা মনে আছে হামিদার। সাত আট বছরের বোবা বনে যাওয়া উস্কখুস্ক চেহারায় ভাসা ভাসা চোখ। কথা বলতো খুব কম। গত বছরটা লেগেছে মেয়েটা স্বাভাবিক হতে। স্কুলে ভর্তির কথা ভাবলেও ওর শিশু মনে চাপ দিতে চাননি হামিদা। বরং বাসায় কবুতরের সঙ্গে, গাছপালার সঙ্গে হেসে খেলে আরেকটু স্বাভাবিক হোক। রোজ নাস্তার পর পড়তে বসান।
নিজে এত বছর হেড মিষ্ট্রেস থাকলেন, এখন বাসায় একটা বাচ্চা মেয়ে পেয়েছেন আর তাকে পড়াবেন না তা কি হয়? বেঁচে থাকার লড়াইতে টিকতে হলে পড়ালেখা এই মেয়েটির একমাত্র অস্ত্র। হেডমিষ্ট্রেস হিসেবে দেয়া বক্তৃতায় যে কথাগুলো বিশ্বাস করে বলেছেন তা নিজের বেলায় কার্যকর করতে গড়িমসি করা ঠিক হবে না।
মেয়েটির দিকে তার বাৎসল্যবোধ পুকুরে ঢিল ছোড়া তরঙ্গের মত বেড়ে যেতে দিচ্ছেন হামিদা।
নিজের নাতি নাতনীদের সঙ্গে ফোনে, ইন্টারনেটে আর কতটুকু মমতা প্রকাশের সুযোগ হয়!
ইতি আরেকটু ভালো করে পড়াটা শিখলে স্কুলে গিয়ে কথা বলবেন। ক্লাস ওয়ানের জন্য বয়সটা বেশী, সে ক্ষেত্রে পরীক্ষা নিয়ে যদি ক্লাস টু বা থ্রি’তে ভর্তি করা যায়!

তারপরই তো ইমনের ফোন এলো। কাজের লোক নাই।
-‘আম্মা, তোমার তো গৌরাঙ্গের মা আছে। আমার চাকরীটা টিকাতে হবে, বুঝতে পারতেছো? মুহতারিমা নামাজ কালাম ঠিকমত পড়তে পারতেছে না। বুঝোইতো, ছোট ছোট বাচ্চা। ঐ ইতি মেয়েটাকে ঢাকায় পাঠায়া দেও’।
চোয়াল শক্ত করার কারণ নাই তারপরও কপালের দু’পাশে শক্ত কিছুর অনুভব টের পান হামিদা। ভেবেছিলেন একমাত্র ছেলের বৌ এর সঙ্গে তার সখ্য হবে। শীতের দিনে রোদে পিঠ দিয়ে বসে গল্প করবেন। কোলের ওপর গীতবিতান থাকবে, কে কত বেশী গান শুনেছে তার একটা খেলা জমাবেন। কি আর করা, সব সাধ তো পূর্ণ হওয়ার না।
প্রস্রবনের মত মায়া বুকের ভেতর নিয়েও সন্তানের সঙ্গে কি সুতোছেঁড়া হয়ে যাচ্ছেন হামিদা!

তখন ইমন বুয়েটের শেষ বর্ষে। একদিন সারারাত বাসজার্নি করে বাড়ি এসেই হামিদাকে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে খোপ খুলে খুলে তার কবুতরগুলোকে উড়িয়ে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বললো- ‘আম্মা, না করবা না, ক্লাসমেট একজনকে পছন্দ হইছে’। ছবি দেখে সামান্য থমকে গেলেও সত্যি খুশী হয়েছিলেন হামিদা। ছেলের সুখেই তার সুখ।
তবে আশংকা অমূলক হয়নি। মুহতারিমা শশুর বাড়ি বেশী আসতে চায় না। কী, না, হামিদার কাজের লোকজন, গানশোনা, কবুতর পালা ভালো লাগে না। সরাসরি বলেনি, কিন্তু ইমন যখন ইনিয়ে বিনিয়ে বলে- ‘আম্মা, গৌরাঙ্গ’র মা’কে নিচে আলাদা রুমে থাকতে দিছো তুমি?
গৌরাঙ্গ’র মা কোথায় যাবে! হামিদা হতবাক হয়ে যান। যমুনার ভাঙ্গনে ঘরবাড়ি হারিয়ে ছেলের হাত ধরে সেই কবে এসেছিল। চাকরী সামলে ইমনকে এত যত্ন করে কি হামিদা বড় করতে পারতেন ওর সাহায্য ছাড়া? আজিজুল যখন মারা যান, ইমন তখন অফিসের ট্রেনিংএ কলম্বোতে। গৌরাঙ্গ’র মা ই চামচে করে শেষ পানিটুক দিয়েছিল। ইমন তো সেসব জানে। গৌরাঙ্গ বেঁচে থাকলেও না হয় কথা ছিল। ডেঙ্গু হয়ে জোয়ান মানুষ যে তের দিনের মাথায় মরে যায় তা না দেখলে হামিদাও বিশ্বাস করতেন না। গৌরাঙ্গ’র মার এখন গিটে বাতের শরীর, শীর্ণ আঙ্গুল, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণকায়। এখন সে কোথায় যাবে? ইতি থাকায় হামিদার দেখভালের যে সুবিধা হচ্ছে সে কথা কি তার ছেলের মাথায় আসে না?
-‘আম্মা, তোমার কিছু হবে না। নব্বইয়ের আগে নড়তেছো না তুমি কোথাও’! হাসে ইমন।

হামিদা দেয়ালে ঝোলানো নিজের দাম্পত্য ছবিতে ফিরে যান। সুচিত্রা সেন এর অনুকরণে খোঁপা, হাত কাটা ব্লাউজ। স্বামীর স্যুটের কাট উত্তম কুমারের মত, তখন খুব ফ্যাশন হয়েছিল। ফটোষ্টুডিও’র মেঝেতে চৌখুপী নকশা। তার স্বামীর তো এমন সংকীর্ণ মন ছিল না! হামিদার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী কুন্তী কতবার এ বাড়িতে রাত্রিযাপন করেছে। আজিজুল কী যে খুশী হতেন তাকে দেখলে! খাওয়া দাওয়া শেষ হলেই বলতেন- ‘কুন্তী দিদি এইবার গান হোক’।
তখন কি চাঁদ অন্যরকম করে উঠতো? হিম কুয়াশার রাতের গায়ে ঢলে পড়া জ্যোৎস্নায় বিশ্বচরাচর ভেসে যেতো। হামিদা শোবার ঘরে ষ্টোভ জ্বালিয়ে আদা চা বানাতেন। কুন্তী লেপ দিয়ে পা ঢেকে নীনা হামিদের গান অবিকল গাইতো- সোনার ময়না পাখি ইই, কোন দ্যাশে তে গেলা উইড়ারে…।
গায়ের রং আর বাবার গরীব অবস্থা কুন্তীর বিয়ে বার বার ভেঙ্গে দিচ্ছিল। বি এ পাশ করেও চাকরী পাচ্ছিল না। একদিন দুপুরবেলা কুন্তী হাজির, তেল ল্যাপ্টানো চুল কপালে, চোখের তলায় কালি। কুন্তী বললো- ‘এইখানে তো কিছু হইতেছে না। জ্যাঠা ওইপারে সম্মন্ধ পাইছে। যাওয়া ঠিক হইছে’। বিদায়ের সময় হামিদা যখন এগিয়ে দিতে গেলেন, সে বললো-‘ যাই রে’।
হামিদা সেদিন বলতে পারেন নি- ‘যাই বলিস না, বল আসি’।
তাদের সময় এখনকার মত বান্ধবীদের জড়িয়ে ধরার অভ্যাস ছিল না। কিন্তু কুন্তী সেদিন রিক্সায় ওঠার আগে হামিদাকে জড়িয়ে ধরেছিল, খুব শক্ত করে, যেন ছাড়লে অনেক কিছু হারিয়ে যাবে।
বুকের ভেতরটা হু হু করে হামিদার।
তার পেটের ছেলে এমন স্বার্থপরের মত কথাবার্তা কেমন করে বলছে?

সপ্তাখানেক পরে ইমনের বসে যাওয়া কণ্ঠস্বর শুনে ঘাবড়ে যান হামিদা। সোয়াদ এর শরীর খারাপ, জ্বর কাশি ।
-‘আম্মা¸ইতিকে পাঠানোর বন্দোবস্ত কর’।
-‘ইতিকে পাঠাবো? তুই বউমা’র সঙ্গে কথা বলছিস’?
-আম্মা, ওকে সবকিছু বলার কি দরকার। ইতিকে কি ওর মনে আছে?
হামিদা বেগমের ব্যক্তিত্বে এবারে গার্লস হাইস্কুলের হেডমিষ্ট্রেস ফিরে আসেন।
-’ইমন, তুমি জানো আমি লুকোচুরি পছন্দ করি না। মুহতারিমার সঙ্গে পরিস্কার আলাপ করো, যদি ওর আপত্তি না থাকে, তাহলেই আমি ইতিকে তোমাদের ওখানে পাঠাবো, যতদিন না তোমাদের আরেকজন মানুষ যোগাড় হয়’।
পরের দিন ইমনের বিপর্যস্ত কণ্ঠস্বর। বাসায় চারজনেরই জ্বর ফ্লু । হামিদা যেন জরুরী ভিত্তিতে কারো সঙ্গে ইতিকে পাঠায়।
তার তিন বছরের গুল্লু গুল্লু নাতিটা, আহারে। ওর জ্বর শুনে হামিদা বেগমের মনও অস্থির হয়।
পরিচিত একজনের সঙ্গে ইতিকে বাসে তুলে দিয়ে গৌরাঙ্গের মা’কে নিয়ে রিক্সা করে ফিরতি পথে ইতিকে নিয়েই গল্প জমে দু’জনের।

হামিদা বেগম দিন যাপনে নিজের সাচ্ছন্দ্যের বন্দোবস্ত করে নিতে জানেন, তারপরও ইতি’র অনুপস্থিতি অনুভব করেন।
গৌরাঙ্গ’র মাও তাগাদা দেয়,- ইতিকে একটা মোবাইল করেন।
হামিদা করেছেনও। ইমন বলেছে যে ইতি মেয়েটা খুব কাজের। সবাইকে দেখেশুনে রাখে। মীমতো এখন প্রায় এগারো। সমবয়েসী একটা মেয়ে আরেকটা মেয়েকে কি দেখে রাখবে?
-‘আম্মা, দুইজন বাসায় থাকলে সাহস থাকে। মানে আমরা যতক্ষণ থাকি না আর কি। এই ধরো, স্কুল থেকে ফিরে কোচিং এ যাওয়ার আগ পর্যন্ত মীম ঘণ্টাখানেক একলা থাকে, সোয়াদ পুরা বিকালটা।
বাকী সারাদিন ইতি একা থাকে?
ইতিকে ফোনে চাইলে সে হয় নিচে ওদের ফোনে ফেক্সিলোড করতে গেছে, না হলে কাপড় ইস্ত্রি করিয়ে আনতে গেছে, না হয় মুহতারিমা তাকে পড়তে বসিয়েছে।
বাহ, সত্যি! হামিদা খুশী হয়ে যান। বৌমার বিবেচনাবোধ আছে তাহলে। জানে শাশুড়ি কি পছন্দ করবেন। গৌরাঙ্গ’র মা কাপে চা ঢেলে ছাদে নিয়ে এলে দু’জনে মোড়ায় বসে চা খেতে খেতে খবরটা দেন হামিদা। ইতিকে ফিরে এলেই স্কুলে ভর্তি করতে হবে।

একদিন ইতিকে পাওয়া গেল ফোনে।
হামিদা উৎসাহিত হন- ‘ প্রত্যেকদিন পড়তে বসিস তো ইতি? ফিরে আসার পর কিন্তু স্কুলে যাইতে হবে’।
– আমি অনেক কিছু শিখি গেছি দিদা’, ইতির কণ্ঠস্বর ভাঙ্গা ভাঙ্গা।
– তাই না কি? কি কি শিখলি?
– কলেমা শাহাদাত, দু’য়া কুনুত। আর আলিফ বা তা সা। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যায় পড়ি।
– কে পড়ায় তোকে?
– ক্যান, ভাবী পড়ায়!
হামিদা কী বলবেন ভেবে পান না! ওরা মেয়েটাকে আরবী শেখাচ্ছে!

ঢাকাগামী বাসের টিকেট কাউন্টারে বসে ছেলেকে ফোনে জানিয়ে দেন যে সে যেন কাউকে পাঠায় তাকে নিয়ে যেতে। অজুহাত হিসেবে সোয়াদ -মীম এর জন্য প্রাণ আইঢাই করছে এই মিথ্যা জায়েজ, কেননা এই মিথ্যার পেছনে সত্যও আছে। সোয়াদ মিম কে দেখলে তার নিজের ধমনীতে প্রবাহিত রক্ত দেখতে পান। এরা এই পৃথিবীতে থাকা মানে হলো হামিদা বেগম আর আজিজুল হকের চিহ্ন বিরাজমান থাকা।
ঘরে ঢুকে নাতি নাতনীকে জড়িয়ে ধরে যাত্রার ধকল কাটিয়ে ওঠেন হামিদা। ইতির দিকে তাকিয়ে প্রথমে চিনতে পারেননি। ফ্রক পরা ছোটমেয়েটিকে সালোয়ার কামিজে এই একমাসে অন্যরকম দেখাচ্ছে কেন? মুহূর্তেই পরিবর্তনটা বুঝে গেলেন হামিদা, ইতির মাথায় একটা হিজাব পরানো। সোয়াদের মুখের ঘাম মুছিয়ে দিচ্ছে টিস্যু দিয়ে। হামিদা নিজের ফুটফুটে নাতিকে দেখছেন না। ইতির দিক থেকে চোখ সরাতে পারছেন না।
মুহতারিমা শাশুড়িকে কদমবুছি করে শরবত নিয়ে এলো। ওর মাথায় ঘোমটা।
ইতি এর মধ্যে হিজাব খুলে ফেলেছিল। তাকে রান্নাঘরে সাহায্য করতে হবে। কিন্তু সে হামিদার কাছে ঘুরঘুর করছে।

মুহতারিমা’র রান্নাঘরে কিছু লাগবে, ইতিকে নিচের রাস্তার মুদি দোকানে যেতে হবে।
মুহতারিমা তাকে নির্দেশ করে- ‘ এই ইতি, হিজাব লাগায় যা’।
ইতি ঝটপট বেগুনি রঙ্গের কাপড়টা টেনে মাথায় বেঁধে নেয়।

শরবত গিলতে কষ্ট হয় হামিদা বেগমের। তার চোখ ইমনকে খোঁজে।
ছেলে নাতিকে নিয়ে কম্পিউটরে গেম খেলছে।
-‘ইমন, তুমি না বলছিলা যে বৌমা ইতির কথা জানে’!
-‘জানে তো আম্মা।
-‘তাহলে’?
-‘কি তাহলে’!
-‘একে সুরা কলেমা শেখাচ্ছে, মাথায় হিজাব পরাচ্ছে, এসবের মানে কি? তোমরা কি করতেছো জানো? অন্যায় করতেছো’।
-আম্মা, তুমি তো জানো মুহতারিমার একটু এসব আছে…’ আমতা আমতা করে ইমন।

হামিদা পরদিনই ফিরবেন বললে ইমন এবার রীতিমত রাগ করে। তাদের মা কোনদিন তাদের কথা ভাবে না। তিন বছরের নাতিটা যে অযত্নে থাকবে তার কথা একবারও ভাবছে না!

কন্ঠ না উচিয়ে কথা বলতে জানেন হামিদা। সারাজীবন দেড় দু’হাজার স্কুলের ছাত্রছাত্রী সামাল দিয়েছেন কণ্ঠস্বর উঁচু না করে।
-‘আজকাল একটু বেতন দিলে তুমি এজেন্সীর মাধ্যমে ভালো আয়া পাবে’।
-‘আম্মা, এজেন্সীর মাধ্যমে? ওদের কোন ঠিক আছে? বিশ্বাস করা যায়’?
-‘কাউকে না কাউকে তো তোমাদের বিশ্বাস করতে হবে ইমন। না হলে মানুষ কেন তোমাদেরকে বিশ্বাস করবে? বিশ্বাসে মিলায় বস্তু… জানো তো’।

বাড়ি ফিরে গৌরাঙ্গের মা’র বানানো চা নিয়ে ছাদে বসতে পেরেছেন, পশ্চিম দিকে সূর্য তখন নিস্তেজ প্রায়। ইতিও খেয়ে দেয়ে গল্প করতে এসেছে।
-‘ দিদা, কত সুরা শিখি ফালাইলাম সেগুলা কি করা?
– ‘মনে রাখবি। শেখায় কোন ক্ষতি নাই, যত শিখবি তত তোর শক্তি বাড়বে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বান্ধবী কুন্তী কত সুরা মুখস্থ করে রাখছিল! তুইও রাখ, বলা তো যায় না কখন, কোথায় কোন পরীক্ষায় পড়বি’।

পরদিন ইতির হাত ধরে হামিদা স্কুলের পথ ধরেন। হঠাৎ মনে হয় যেন চাকরী থেকে অবসর হয়নি। আগের মত শাড়ির আঁচল টেনে, ছাতা মাথায় হাঁটছেন। এখন শুধু কিশোরী মেয়েটি তার সঙ্গে।
-‘স্কুলে তো তোর নাম জানতে চাইবে, পুরা নাম বল দেখি’?
-‘ইতিকা রানি কর্মকার’
-‘পিতার নাম?’
-‘গৌরাঙ্গ কর্মকার’
হামিদা বেগমের পাশে চলতে চলতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ইতির উৎসুক, কৌতুহলী বিস্ময়াকুল চোখ দুটি আরো প্রশ্নের অপেক্ষা করে।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.