পুনর্মুদ্রণ, সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

admin | 17 Aug , 2008  

rahman-02.jpg
শামসুর রাহমান, সাক্ষাৎকার গ্রহণের ৯ বছর পরে। ছবি: হাসান বিপুল ২০০৫

[১৯৯৬ সালে আমরা যখন এই সাক্ষাৎকার নিতে যাই শামসুর রাহমানের বাসায় তখন তার কবিতা লেখালেখির ৫০ বছর হয়ে গেছে। বাংলা একাডেমীর সভাপতি তিনি। বাংলাদেশের প্রধান কবি হিসাবে অনেক গুরুত্বের ভার বহন করতে হয়। লাজুক, বিনম্র এই কবি পূর্বপরিচয়ের সূত্র ধরে সাক্ষাৎকারে যাতে চপলতা না থাকে সে অনুরোধ করেছিলেন। বলা প্রয়োজন, তা রক্ষা করা যায় নাই।

কবিদের ভেদ বা তারতম্য তিনি মান্য করতেন। তাকে নিয়ে ভক্তদের অতিরিক্ত ভাব বন্দনাকে তিনি পরিস্থিতির নিরিখে দেখতে চাইতেন। একবার তাকে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি অভিধায় ভূষিত করলে তিনি বলেছিলেন, “এগুলো তো বোগাস জিনিস। যে শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ, যে শতাব্দীতে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন, যে শতাব্দীতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সে শতাব্দীতে আমি কী করে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ গুরুত্ব পাই?” নিরহংকারী শামসুর রাহমান সকলের কবিতা পড়তে পছন্দ করতেন। মনে করতেন, “তৃতীয় বিশ্বে”র দেশের কবিদের একটি সমস্যা হলো তারা ঘরে থাকতে চাইলেও ঘরে থাকতে পারে না। চারপাশের ডাকে তাদের সাড়া দিতে হয়। এবং বাইরে গেলে লোকে তাকে বাইরের কবিই ধরে নেয়।

সাক্ষাৎকারটিতে শামসুর রাহমান এমন নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন যা সচরাচর তাঁর লেখালেখি বা বক্তব্যের মধ্যে দেখা যায় না। দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকায় সাহিত্য সাময়িকীতে ১৯৯৬ সালে এটি ছাপা হয়।

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট এই কবি মৃত্যুবরণ করেন। শামসুর রাহমানের মৃত্যুবার্ষিকীকে স্মরণে রেখে দুর্লভ এ সাক্ষাৎকারটি এখানে পুনর্মুদ্রণ করা হলো।
— বি. স.]

swakat-shamsur.jpg
শওকত ওসমানের সঙ্গে শামসুর রাহমান। ছবি: ফিরোজ চৌধুরী

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: রাজু আলাউদ্দিনব্রাত্য রাইসু

ব্রাত্য রাইসু: রাহমান ভাই কি এখন সিরিয়াস হইয়া গেছেন?

শামসুর রাহমান: আমি সিরিয়াস হয়ে গেছি মানে?
—————————————————————–
অ্যারিস্টটলের মতো, প্লেটোর মতো, শেক্সপীয়রের মতো, দান্তের মতো, সফোক্লিসের মতো, টলস্টয়ের মতো, দস্তয়েভস্কির মতো, বোদলেয়ারের মতো — এইসব লোক মরে গেলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। কলোশিয়াল ওয়েস্টেজ মনে হয় না? কোটি কোটি কোটি কোটি লোক। আমার জন্মের আগে হাজার হাজার বছর চলে গেছে, আমার মৃত্যুর পরেও হয়তো হাজার হাজার বছর যাবে, এটা ভাবলেই…
—————————————————————–
রাইসু: এই যে ফাজলামী করতে মানা করলেন।

রাহমান: করো তো, তুমি তো করো। ভাষা চেন্‌জ্ করে ফেললে তুমি। ওই ভাষায় কথা বলো?

রাইসু: হ্যাঁ, ওই ভাষায়ই তো বলি।

রাহমান: ওই ভাষায় এখন তো বলছো না।

রাইসু: লিখলেই দেখবেন ওই ভাষায় চইলা গেছি। এই যে গেলাম গিয়া। না, আমি ওই ভাষায়ই বলি তো।

রাহমান: তাই? সত্যি নাকি?

রাইসু: সত্যি, সত্যি।

রাহমান: সত্যি?

রাজু আলাউদ্দিন: না, ওর তো এরকমই। কেতাদুরস্ত ভাষায় তো কথা বলে না ও।

রাহমান: কেতাদুরস্ত ভাষায় আমরা কেউ বলি না, আমিও বলি না। তবুও একটা ইয়ে তো আছে। কেমন যেন লাগে।

রাইসু: আমি এই ভাষায় তো লিখিও।

রাহমান: তাই, শিওর? আমার খুব ক্লিয়ার না।

রাইসু: আমি এই ভাষায়ই বলি, এই গুরুচণ্ডালী ভাষা। আপনি আমার লেখালেখি দেখেন নাই বোধহয়।

রাহমান: লেখালেখি আমি কম দেখেছি, কবিতা পড়েছি।

রাইসু: কবিতা পারি না। গদ্যে তো আমি এই ভাষায়ই মোটামুটি…।

রাহমান: তাই?

রাইসু: হ্যাঁ, ভাষার মধ্যে একটু কলুষ কইরা দিলাম আর কি।

রাহমান: ইচ্ছে করে?

রাইসু: হ্যাঁ।

রাহমান: উত্তর-আধুনিকতা, না?

রাইসু: না না না, উত্তর-আধুনিকতারে আমি চিনি না। রাহমান ভাই, কবিতা কেমন লিখতেছেন এখন?

রাহমান: আগে যেরকম লিখতাম ওরকমই লিখি।

রাইসু: বেশি লেখেন?

রাহমান: বেশি কিংবা কম না। লিখছি আর কি। বরাবর যা লিখেছি। মাঝামাঝি আর কি। বেশিও লিখি না, কমও লিখি না।

রাইসু: আচ্ছা, রাহমান ভাই, মানুষ যে আপনার সমালোচনা করে এগুলি কি আপনার কানে আসে?

রাহমান: কখনো আসে কখনো আসে না। বেশির ভাগ নিন্দাই আসে।

রাইসু: নিন্দাটা নেন কীভাবে?

রাহমান: নিন্দা তো নিন্দাই। আমি নিন্দায় বিচলিত হই না, প্রশংসাতেও বিচলিত হই না। আমি মনে করি আমি যা পাচ্ছি সচেতনভাবেই পাচ্ছি। এবং যদি আমার মধ্যে কিছু সত্যিকার জিনিস থাকে এটা নিন্দা করলেও থাকবে, প্রশংসা করলেও থাকবে। আর যদি আমার মধ্যে কিছু না থাকে তাহলে আমাকে প্রশংসা করে সাত আসমানে তুলে দিলেও লাভ হবে না।

রাজু: মিডিয়া তো ইচ্ছা করলে একজন মাইনর কবিকেও খুব ফলাও করে প্রচার করতে পারে, এটাও তো হয়।

রাহমান: হ্যাঁ, তা করতে পারে। কিন্তু সেটা সাময়িক।

রাইসু: আমার মনে হয় কবিদের বড় ছোট নাই। এইটা মিডিয়ার অবদান।

রাহমান: বড় ছোট তো আছে। এই অর্থে, যেমন রবীন্দ্রনাথ আছেন। জীবনানন্দ দাশ আছেন। জীবনানন্দকে ছোট কবি বলবো না বড় কবি বলবো? কবি তো সবাই, কবি তো বন্দে আলী মিয়াও কবি। সবাই কবি। কিন্তু তার মধ্যেও তারতম্য আছে না? জীবনানন্দ দাশকে তো আমার সঙ্গে মেলালে চলবে না। জীবনানন্দ দাশ জীবনানন্দ দাশ, রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ। এবং আরো যারা আছেন তারা তারাই।

রাইসু: তারা কি আছেন?

রাহমান: এটা তো থাকেই। বড় ছোট থাকবেই। মাইনর পোয়েটস থাকেই। কিন্তু কখনো কখনো পাঠকদের কাছ কোনো কোনো মাইনর কবি ফেভারিট হয়ে দাঁড়ায়। তারা যে মেজর কবি বলে ফেভারিট হচ্ছেন তা না।

রাজু: আপনাদের সময়ে কি এই রকম হইছে যে মাইনর কবি ফেভারিট হয়ে গেছেন?

রাহমান: খুব ফেভারিট হয়েছেন। আশরাফ সিদ্দিকী ওয়াজ ভেরি ফেভারিট। আশরাফ সিদ্দিকী আমাদের সময়, আমরা যখন লিখি তখন হি ওয়াজ ডার্লিং অব দ্য ক্রাউড্স্। উনি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছেন। এক সময় তাঁর তালেব মাস্টার ও অন্যান্য খুব বিখ্যাত ছিলো।

—————————————————————–
আশরাফ সিদ্দিকী ওয়াজ ভেরি ফেভারিট। আশরাফ সিদ্দিকী আমাদের সময়, আমরা যখন লিখি তখন হি ওয়াজ ডার্লিং অব দ্য ক্রাউড্স্। উনি শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করেছেন। এক সময় তাঁর তালেব মাস্টার ও অন্যান্য খুব বিখ্যাত ছিলো।
—————————————————————–

রাজু: ওটা নাকি কার একটা কবিতা থেকে মেরে দেয়া?

রাহমান: এখন মেরে দেয়া বলা ঠিক না। কেননা… এটা বুদ্ধদেব বসুই বলেছেন যে, একটা কবিতা থেকে আরেকটা কবিতা জন্ম নিতে পারে। দেখতে হবে একেবারে নকল কিনা। লাইন বাই লাইন, ওয়ার্ড বাই ওয়ার্ড, কথা বাই কথা, সেমিকোলন বাই সেমিকোলন। এটা না।

রাইসু: মেজর কবি আমরা তাহলে বলতে পারি না কাউকে তেমন? এরশাদ যদি জেনারেল না হইয়া মেজর থাকতেন তাকে আমরা অন্তত মেজর কবি বলতে পারতাম।

রাজু: জেনারেল কবিই, এরশাদ তো খুব মেজর না।

রাইসু: আপনি কি মেজর কবি, রাহমান ভাই?

রাহমান: আমি জানি না। আমার মনে হয় আমার রুচিতে বাঁধবে এটা বলা।

রাইসু: কিন্তু আপনাকে যে শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ কবি হিসাবে পুরস্কার দিলো?

রাহমান: এগুলো তো বোগাস জিনিস। যে শতাব্দীতে রবীন্দ্রনাথ, যে শতাব্দীতে জীবনানন্দ দাশ ছিলেন, যে শতাব্দীতে সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন সে শতাব্দীতে আমি কী করে বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ গুরুত্ব পাই?

রাইসু: না, হইতেও পারে।

রাহমান: এটা খুবই হাস্যকর ব্যাপার।

রাইসু: একাধিক শ্রেষ্ঠ কবি যদি থাকেন, তাহলে তো আপনিও হতে পারে একজন।

রাহমান: শতাব্দীর সঙ্গে জড়িত না করাই বেটার।

রাইসু: বা শতাব্দীর মধ্যে আটকাইয়া দেওয়া উচিত না।

রাহমান: যাক, এগুলো হাস্যকর ব্যাপার।

রাইসু: আপনার কবিতায় হাসি কিংবা উইট-এর ব্যাপার কী রকম রাখেন?

রাহমান: আমার মনে হয় নাই। হাস্যরসের অভাব আছে আমার মধ্যে।

রাইসু: ব্যক্তিজীবনে তো হাস্যরসের অভাব নাই।

রাহমান: কবিতায় আছে বোধহয়। বোধহয় কেন, সত্যি অভাব আছে। আমি কিছু কিছু ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছি কিন্তু সেগুলো হাস্যরস না। শ্লেষ।

রাইসু: কবিতায় এটা আড়াল করেন কেন?

রাহমান: কবিতায় এটা আসে না। আসলে এটা আমার চরিত্রের মেইন ট্রেন্ড নয়।

রাইসু: কী, কবিতাটা আপনার জীবনের মেইন ট্রেন্ড না?

রাহমান: এই তো আবার… কবিতা আমার জীবনের একটা প্রধান জিনিস। খারাপ লিখি ভালো লিখি আমি কবিতা পড়তে ভালোবাসি, অন্যদের কবিতা পড়ি, যে কালকে লিখছে তারও কবিতা পড়ি, পেলে আর কি। কবিতাকে ভালোবাসি। এখন হাস্যরস ইনসিডেন্টালি আমার কথায় দু’একটা এসে পড়ে, কিন্তু আমার এটা মেইন জিনিস নয়। আর আমি আজকাল, কেউ কেউ বলতে পারে, খুব সভা-সমিতিতে যাই, এটা আমার চরিত্রবিরোধী কাজ। আমি আসলে যাকে বলে ভেতর-গোঁজা মানুষ। যাকে আমরা ইনট্রোভার্ট বলি।

—————————————————————–
আমি আজকাল, কেউ কেউ বলতে পারে, খুব সভা-সমিতিতে যাই, এটা আমার চরিত্রবিরোধী কাজ। আমি আসলে যাকে বলে ভেতর-গোঁজা মানুষ। যাকে আমরা ইনট্রোভার্ট বলি।
—————————————————————–

রাজু: কিন্তু মিডিয়া আপনাকে ঘরে থাকতে দেয় নাই।

রাহমান: যেহেতু আমাদের দেশ এই রকম। তৃতীয় বিশ্বের একটি দেশ। তৃতীয় বিশ্বের দেশের কবিদের একটা প্রবলেম আছে। প্রবলেমটা এই, যে তারা মগ্ন থাকতে চাইলেও থাকতে পারে না। তাকে টেনে রাজনীতি-দৈশিক পরিস্থিতি বাইরে নিয়ে যায়। সে বাইরে যায়। একবার বাইরে গেলেই মানুষ মনে করে সে বাইরেরই তো। তখন সে পছন্দ করুক আর না পছন্দ করুক তাকে সভা-সমিতিতে যেতে হয়। এবং সেজন্যে এক অর্থে আমি বলি জীবনানন্দ দাশ কিন্তু সিনেট হলে কবিতা পড়ার লোক ছিলেন না। কিন্তু অনুরোধের ঢেকি গিলতে হয়েছে তাঁকে। সিনেট হলে গিয়ে কবিতা পড়েছেন। এবং ভালোই পড়েছেন। তিনি যে এত লাজুক… আমি তাঁর সাথে কথা বলেছি।

রাজু: এটা কোন সময়?

রাহমান: এটা ফিফটি থ্রির দিকে।

রাজু: ফিফটি থ্রির দিকে, মানে তাঁর মৃত্যুর এক বছর আগে।

রাইসু: আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি মারা গেলেন?

রাজু: দেখলেন যে আরেকজন প্রধান কবি এসে গেছেন। ফলে তাঁর আর থাকার দরকার কী।

রাহমান: ছিঃ ছিঃ ছিঃ, ছিঃ ছিঃ ছিঃ!

রাজু: এটা আমিই বলছি। কী কী আলাপ হলো? দেখা হলো কোথায়?

রাহমান: তাঁর বাসায়। নরেশ গুহ’র সঙ্গে আমি আর কায়সুল হক গিয়েছিলাম। কায়সুল হক লিখেছে, আমিও লিখেছি কোনো এক বইতে। তাঁর বাসা ল্যান্সডাউন স্ট্রীট। রোড বলতেন উনি। যাই হোক গিয়েছিলাম। সকাল দশটার দিকে। গেলাম, নক করলাম। দেখি তিনি নিজেই দরজা খুললেন। বেশ লম্বা বারান্দা, ঝকঝকে তকতকে।

রাজু: ওনার বর্ণনা দিলেন না, বারান্দার বর্ণনা দিলেন, তাই না?

রাহমান: পরে দেবো। তো উনি আমাদের দেখে খুব অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। কী করবেন কোথায় বসাবেন।

রাজু: ও, আগে থেকে বলে যান নি?

রাহমান: কীভাবে বলে যাবো, তখন তো টেলিফোন নেই।

রাজু: চিঠিপত্র?

রাহমান: চিঠিপত্রে বলার তো কোনো সময় ছিলো না। আর আমি কে যে তাঁকে চিঠি লিখবো — আমি আসছি। নরেশ গুহ’র আগ্রহেই আমরা… বলেছেন, চলেন যাই, আপনারা তো ভক্ত জীবনানন্দ দাশের। চলেন যাই। উনি উদযোগ নিয়েছিলেন। দেখতে চেয়েছি, ওনার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছি। তো আমরা করলাম কী, বারান্দায় বসলাম। আমরা বারান্দায় বসার পর একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তিনিও বসে পড়লেন। হয়তো যথেষ্ট চেয়ারও নেই। আলাপ তো… উনি কথাই বলেন না।

—————————————————————–
[জীবনানন্দ দাশ] দুয়েকটা কথা বললেন। যে, আমার অনেক কবিতা ট্রাংকে বরিশালে রয়ে গেছে। আমি বললাম, ওগুলো নিশ্চয়ই এখন ধূসরতর পাণ্ডুলিপি হয়ে গেছে। উনি হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। হাসিটাও অদ্ভুত। আমার কাছে মনে হলো সময়ের সঙ্গে হাসির যেন কোনো মিল নেই। একটা সময়হীনতার মধ্যে যেন এটা হচ্ছে। এটা আমি ব্যাখ্যা দিতে পারবো না।
—————————————————————–

রাজু: খুব কম?

রাহমান: একদম কথাই প্রায় বলেননি। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে খুব কম কথা বলতেন। দুয়েকটা কথা বললেন। যে, আমার অনেক কবিতা ট্রাংকে বরিশালে রয়ে গেছে। আমি বললাম, ওগুলো নিশ্চয়ই এখন ধূসরতর পাণ্ডুলিপি হয়ে গেছে। উনি হোঃ হোঃ করে হেসে উঠলেন। হাসিটাও অদ্ভুত। আমার কাছে মনে হলো সময়ের সঙ্গে হাসির যেন কোনো মিল নেই। একটা সময়হীনতার মধ্যে যেন এটা হচ্ছে। এটা আমি ব্যাখ্যা দিতে পারবো না। আমার কাছে তখন মনে হয়েছিলো। রিমার্কেবল ছিলো তাঁর চোখ দুটো। চেহারা তো অকবিসুলভ চেহারা। দেখতে বেশ স্থূল। চোখটার মধ্যে কী যেন… মমতাভরা চোখ। এই মনে হলো। কথাতে একদমই পটু নন।

রাজু: বেশিক্ষণ ছিলেন না?

রাহমান: না, বেশি ডিসটার্ব করা উচিৎ বোধ করি নি। আরেক দিন দেখলাম রাস্তায়। আমি আর নরেশ গুহ গেলাম চারুচন্দ্র কলেজে। পড়াতেন নরেশ গুহ। বেরিয়ে আমরা দেখলাম জীবনানন্দ দাশ একটা ছাতামাথায় হেঁটে যাচ্ছেন। তো, নরেশ গুহ বললেন যাবেন নাকি। আমি বললাম থাক। ওঁকে বিব্রত করে লাভ নাই।

রাইসু: আপনার সমকালীন যাঁরা তাদের ব্যাপারে কী বলেন। আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক বা শহীদ কাদরী।

রাহমান: তুমি যে তিনটি নাম করলে তিনজনই ভালো কবি। আমার মতে। শহীদ কাদরী না লিখলেও হি ইজ এ ভেরি গুড পোয়েট। হি ইজ এ রিমার্কেবল পোয়েট।

রাইসু: ‘রিমার্কেবল’ বলবেন?

রাহমান: হ্যাঁ, বলবো না কেন। তোমরা কি ভিন্নমত পোষণ করো?

রাইসু: না না, আমি কোনো মতই পোষণ করি না। তিনি কবিতার ব্যাপারে এত দীর্ঘদিন দূরে আছেন, তাঁর ব্যাপারে মত পোষণ করার আমি কে।

রাহমান: না, লিখছেন হয়তো, আমরা জানি না।

রাইসু: আল মাহমুদের সঙ্গে বোধহয় আপনার আর দেখা হয় নাই?

রাহমান: না, আল মাহমুদের সঙ্গে আমার দেখা হয় না, কিন্তু আল মাহমুদের লেখা বের হলে আমি পড়ি। এবং ওনার কবিতা আমার ভালো লাগে। যদিও তাঁর মতের সঙ্গে আমি…

রাইসু: আপনি তো অনেকের মতের সঙ্গেই একমত না।

রাহমান: সেটায় আমার বাধা হচ্ছে না। ওঁকে ভালো কবি বলতে আমার বাধা হচ্ছে না। ব্যাপার হলো, কিছু জিনিস আছে মানুষকে খুব ইয়ে করে। যেমন আমার সম্পর্কে এমন কিছু উক্তি করেছেন, আমি শুনেছি, এগুলোর সত্যিমিথ্যা আমি যাচাই করতে যাবো না। আমার কানে এসেছে। সেগুলো শোনার পর কবি হিসেবে তাঁর সম্পর্কে ধারণা আমার চেন্‌জ্‌ হবে না। আমার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাব্যধারণাকে প্রভাবিত করে না।

রাজু: না, রাহমান ভাই, আপনি তো অন্যের মুখে শুনলেন, এমনও তো হতে পারে উনি একথাগুলো বলেনই নাই।

রাহমান: খামাখা একটা কথা তো হয় না। তাল হলেও তিল এর মধ্যে আছে। এবং তাঁদের যে মেন্টাল মেকআপ তাঁরা ওসব কথা বলতে পারেন। আল মাহমুদ এবং আরো আছেন কেউ কেউ এতই প্রখর তাঁদের কল্পনা যে তাঁরা অনেক কিছু কল্পনা করে নিতে পারেন।

রাইসু: কী ছিলো ব্যাপারটা?

রাহমান: এটা নট ফর প্রিন্ট।

রাইসু: ফর প্রিন্ট। বলেন না, অসুবিধা কী? প্রিন্ট হইলে অসুবিধা কোথায়?

রাহমান: যেমন বলেছে যে আমি নাকি ওঁদের বাড়িতে গুণ্ডা পাঠিয়েছি মারার জন্য, এরশাদের পতনের পর। আক্রমণ করার জন্য। সৈয়দ আলী আহসানের বাসায়, ফজল শাহাবুদ্দীনের বাসায়, আল মাহমুদের বাসায়। আমি নাকি গুণ্ডা পাঠিয়েছি! ব্যাপার হলো আমাকে যারা বিন্দুমাত্র চেনে — ওঁরা তো আমাকে বেশ কয়েক বছর ধরেই জানে — তো আমার পক্ষে কি এই কাজ করা সম্ভব? এ ম্যান হু রাইটস এ পোয়েট্রি, সে যত খারাপই লিখুক সে কি এই কাজটি করতে পারে? আমি যখন শুনলাম আই ওয়াজ ভেরি মাচ অ্যাংরি, এন্ড আই ওয়াজ ভেরি মাচ শক্ড্। একজন কী করে আমার সম্পর্কে এই ধরনের একটা কল্পনা করতে পারে।

—————————————————————–
আমি নাকি ওঁদের বাড়িতে গুণ্ডা পাঠিয়েছি মারার জন্য, এরশাদের পতনের পর। আক্রমণ করার জন্য। সৈয়দ আলী আহসানের বাসায়, ফজল শাহাবুদ্দীনের বাসায়, আল মাহমুদের বাসায়। আমি নাকি গুণ্ডা পাঠিয়েছি! ব্যাপার হলো আমাকে যারা বিন্দুমাত্র চেনে — ওঁরা তো আমাকে বেশ কয়েক বছর ধরেই জানে — তো আমার পক্ষে কি এই কাজ করা সম্ভব?
—————————————————————–

রাইসু: আপনারা একসঙ্গে ছিলেন না দীর্ঘদিন?

রাহমান: ছিলাম।

রাজু: তখন তো মনে হয় নাই যে এরকম একটা…

রাহমান: তখন মনে হয় নাই এরকম। তবে আল মাহমুদের চেয়ে বেশি ইয়ে ছিলো ফজল শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে। এক সঙ্গে কাজও করেছি অফিসে।

রাইসু: আর হক সাহেব, সৈয়দ শামসুল হক?

রাহমান: কবি হিসেবে ভালো। সৈয়দ শামসুল হক কিন্তু কোনো কিছুই খারাপ লিখেন না। আমার মতে আর কি। বেশ ভালো কয়েকটা ছোটগল্প লিখেছেন। তারপর কবিতা খুব ভালো লিখেছেন। ক্রমশই ভালো লিখছেন।

রাজু: আপনাকে নিয়ে একটা কবিতা আছে হক ভাইয়ের। মনে আছে? আপনার জন্মদিন উপলক্ষে তিনি লন্ডন থেকে তাঁর দীর্ঘবাহু বাড়িয়ে দিলেন।

রাহমান: ওঁকে ওই জন্য ভালো বলছি না।

রাজু: না, এই কবিতাটা আমার ভালো লাগে এই জন্যে উল্লেখ করলাম। পড়ে খুব ভালো লেগেছে। এই যে কল্পনা করতে পারছেন যে তাঁর হাতটা এত লম্বা করে বাড়িয়ে দিচ্ছেন আপনার জন্মদিনে —

রাইসু: সরীসৃপ হাত।

রাহমান: উপন্যাস তিনি ভালো লিখেছেন, কাব্যনাট্য ভালো লিখেছেন। ওঁর শক্তি আছে। অনুবাদ ভালো করেছেন। যাকে বলে বেশ অলরাউন্ডার। ওঁর ভাষার একটা সৌকর্য আছে। হি ইজ এ ভেরি গুড কম্পানি, এতে কোনো সন্দেহ নেই।

রাইসু: আপনাদের বন্ধুত্ব আছে এখনও?

রাহমান: হ্যাঁ।

রাইসু: এটা কি রক্ষা করেন আপনারা, নাকি আছে?

রাহমান: রক্ষা করার তো কিছু নেই। হয় থাকে কিংবা থাকে না। ইউ কান্ট লিভ উইথ এ ডেডবডি। ক্যান ইউ?

রাইসু: আমি পারবো না, কিন্তু মর্গে তো অনেকে আছেন।

রাজু: মুর্দাফরাশ, যাদের কথা আপনি বলেন।

রাইসু: কালকে রাজু বেশ ভালো একটা শব্দ আবিষ্কার করলো, দেহরক্ষা করা। যে মনের কবল থেকে দেহকে রক্ষা করা। মানুষ মরার মধ্যদিয়ে তার মনের কবল থেকে দেহকে রক্ষা করে। তো আপনার লেখার মধ্যে একটা সুর থাকে কিন্তু মৃত্যুর।

রাহমান: হ্যাঁ, তা ঠিক, বেশ কিছু লেখাতেই আছে। একসময় তো আমি খুবই চিন্তা করতাম। প্রায় প্রতিদিন। অসহ্য চিন্তা।

রাজু: মানে মরে যাবেন এটা ভাবতে খারাপ লাগতো?

রাহমান: মৃত্যু জিনিসটাই খারাপ লাগতো।

রাইসু: কিন্তু মারা গেলে তো আপনি বুঝবেন না যে মারা গেছেন।

রাহমান: মরে যাওয়ার সময় তো টের পাবো, নাকি? মৃত্যুর পরে হয়তো কিছু টের পাবো না। কিন্তু যখন মরবো?

রাইসু: আমার মনে হয় মৃত্যুযন্ত্রণার চেয়ে পাইলস অপারেশনের যন্ত্রণা অনেক বেশি।

রাহমান: সেটা আমার হয়েছে। তোমার কি পাইলসের অপারেশন হয়েছে?

রাইসু: না আমার হয় নাই, আমার এক বন্ধু মাসরুর আরেফিন, ওর হইছিলো।

রাজু: ওইটার অভিজ্ঞতা থেকে বললেন?

রাইসু: অভিজ্ঞতাই নিশ্চয়ই। পাইলস অপারেশন কারো হলে আশেপাশের লোকদের সেটা অভিজ্ঞতাই হবে। মৃত্যুর যন্ত্রণাটা অতো বড় না।

রাহমান: মৃত্যুর যে চিন্তাটা, মৃত্যুর যে ভাবনাটা — ‘আমি থাকবো না’ তো আছেই, আমি যাদের ভালোবাসছি তাদের সঙ্গে আমার আর কোনোদিন দেখা হবে না। ধরো এখন একজনের সঙ্গে দেখা করার জন্যে আমি ব্যাকুল হয়ে যাই। তাকে একদিন না দেখলে আমি ছটফট করি।

রাইসু: এটা কি আপনি নির্দিষ্ট কারো কথা বলছেন?

রাহমান: ধরো বিশেষ কোনো ব্যক্তিকে।

রাইসু: ব্যক্তি না ব্যক্তিনী?

রাহমান: মহিলাই হবে।

রাইসু: সুবিধা হয়?

রাহমান: না, সুবিধার জন্য না। আমি অস্থির হয়ে যাই। আমার কিছু ভাল্লাগে না। তো তার সঙ্গে আমার আর জীবনে কোনোদিন দেখা হবে না। এ চিন্তাটা এবং যার জন্য আমার এতটা চিন্তা একদিন সেও থাকবে না। ধরো অ্যারিস্টটলের মতো, প্লেটোর মতো, শেক্সপীয়রের মতো, দান্তের মতো, সফোক্লিসের মতো, টলস্টয়ের মতো, দস্তয়েভস্কির মতো, বোদলেয়ারের মতো — এইসব লোক মরে গেলো। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলো। কলোশিয়াল ওয়েস্টেজ মনে হয় না? কোটি কোটি কোটি কোটি লোক। আমার জন্মের আগে হাজার হাজার বছর চলে গেছে, আমার মৃত্যুর পরেও হয়তো হাজার হাজার বছর যাবে, এটা ভাবলেই… আর একদিন হিমালয় গুড়িয়ে যাবে, একদিন পৃথিবীর কিছুই থাকবে না। গ্যালাক্সি ফেটে চৌচির হয়ে যাবে। আমরা তো কেউ থাকছি না, আমরা কেউ থাকছি না। যতক্ষণ জীবিত আছি ততক্ষণ হরিবল থট। তোমরা যেহেতু এখনও যুবক —

রাইসু: না, আমরাও বৃদ্ধই মোটামুটি।

রাহমান: যাই হোক, জ্ঞানবৃদ্ধ হয়তো। বয়োবৃদ্ধ নও। এখন তোমাদের অতটা লাগবে না। কিন্তু আমার কিন্তু এই চিন্তা তোমাদের বয়সেও হয়েছে। এগুলো খুব কষ্ট দেয়। যদিও এগুলো মিনিংলেস, আমি জানি।

রাইসু: মিনিং একটু দেয়ার চেষ্টা করি, ধরেন যদি এমন একটা সময় আসে মানুষ যখন আর মরবে না। সাইন্স যদি সে জায়গায় পৌঁছায়।

রাহমান: আরো বেশি কষ্টের। এরকম একটা সম্ভাবনা, আমি থাকবো না, এটাতে আরো খারাপ লাগবে।

রাইসু: যদি এরকম হয় যে চিরজীবন মানুষ খালি মারা যেতেই থাকবে তাহলে কিন্তু দুঃখটা অনেক কইমা আসে।

রাহমান: না, তবু কমে আসে না।

রাইসু: আপনার কবিতাকে কি মৃত্যুচিন্তা খুব প্রভাবিত করেছে?

রাজু: আমার মনে হয় না। রাহমান ভাইয়ের কবিতায় ঠিক মৃত্যুচেতনা যেইটা বলে ওইটা কিন্তু খুব ডমিনেটিং ফ্যাক্টর না। যেটা জীবনানন্দ দাশের মধ্যেও আছে।

রাহমান: এগুলা আমি ডিসক্রাইব করি নাই, কিন্তু মৃত্যুচিন্তা তো আছে। আছে, কিছু কিছু কবিতা আছে তো। এখন অত তাৎপর্যপূর্ণভাবে হয়তো নেই, কিন্তু আছে।

রাজু: আপনার প্রথম দিককার কবিতা বেশি ভালো লাগে। এটা আমার সীমাবদ্ধতা কিনা আমি জানি না। পরের দিকে রাহমান ভাইকে অনেক বেশি এলায়িত মনে হয়।

রাহমান: কথা হলো, একজন কবি তো চেন্জ্ করবেই। জীবনানন্দ দাশ ঝরাপালক-এ আটকে থাকেনি। ঝরাপালক-এর পর তিনি ধূসর পাণ্ডুলিপি লিখলেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি, ঝরাপালক-এর চেয়ে মাইলস এওয়ে। আবার বনলতা সেন অন্য একদিকে। তারপরে হলো মহাপৃথিবীমহাপৃথিবীর কবিতা লেখার পর থেকে বুদ্ধদেব বসু যিনি চ্যাম্পিয়ন অফ জীবনানন্দ দাশ, তিনি বলতে শুরু করলেন জীবনানন্দ দাশ অতটা ভালো আর লিখছেন না। তাঁর কবিতায়ও সে ঘাস শিশির আর নেই। এখন ব্যাপার হলো, আমার একজন কবির কাছ থেকে একটা জিনিস প্রত্যাশা করি যে এটাই লিখবে। ওর থেকে ডেভিয়েট করলেই আমরা বলি যে, কী লিখছে! আমার মনে হয় এই বোধ থেকে এক ধরনের বিরূপতারও সৃষ্টি হয়। আগের মতো না লিখলে। ইট ইজ নট পসিবল টু রাইট। দ্যান হি উইল বি ডেড অ্যাজ এ পোয়েট। তাহলে লেখার দরকার তো নেই। সে আগের মতোই যদি লিখতে থাকে, লেখার দরকার নাই তো আর।

রাইসু: আপনার এখনকার কবিতা আপনার নিজের কাছে ভালো লাগে কিনা?

রাহমান: কিছু কিছু কবিতা লাগে ভালো।

রাজু: এখন কি আপনার নিজের কবিতা বেশি ভালো লাগে, নাকি অন্যদের ভালো কবিতাগুলি বেশি ভালো লাগে?

রাহমান: ভালো কবিতা যাই হোক, আমারই হোক… আর এটা তো… জীবনানন্দ দাশের কবিতা আমার কবিতার চেয়ে ভালো লাগবেই। এবং সব কবিতাই তাঁর ভালো লাগবে তাও তো না। তারপর আরো নতুন যুগের কবিরা আসবে যখন আমি তাদের কবিতা অতটা বুঝতেও পারবো না। তবুও, তাদের কবিতা আমার ভালো লাগতেও পারে।

রাইসু: আপনি যে মাঝে মাঝে পরবর্তী কবিদের সম্পর্কে বলেন, লোকজন বলে আপনি সার্টিফিকেট দিচ্ছেন।

রাহমান: এখন মুশকিল হলো এই, না বললে বলবে যে এ কৃপণ, বলতে চায় না। আর বললে বলবে সার্টিফিকেট দিচ্ছে — এটা অন্যায়। আমার যা মনে হয় বলি। আমার বিচার যে একেবারে ঠিক তা তো না। এখন একটা ইন্টারভিউতে জিজ্ঞেস করলে, অনেক সময় হয়তো যে সত্যিকার ভালো লেখে তার নাম ভুলেই গেলাম। যেমন রঙধনু অনুষ্ঠানে আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তারা দু’জনই মৃত, তাদের নাম উচ্চারণ করতে ভুলে গেছি। পরে রাতে আমার ঘুম হয়নি।

রাজু: এখন বইলা ফালান।

রাহমান: যেমন ধরো একজন হলেন হামিদুর রাহমান, আরেকজন হলেন — তোমরা চিনবা না বোধহয়, এবিসি — আবুল বারেক চৌধুরী। কবিতা লিখতেন না, কিন্তু কবিতা বুঝতেন — ওঁদের নাম বলতে ভুলে গেলাম। আরো নাম বললাম। যেগুলো বললাম ওখান থেকে দু’তিনটা নাম বাদ গেলেও কোনো ক্ষতি ছিল না। এঁদের আমার জীবনে একটা রোল ছিলো তো। যেমন আমি হয়তো কোনো পত্রিকায় কবিতা পাঠাতামই না কয়েক বছর, যদি হামিদুর রহমান আমাকে না বোঝাতো। আমাকে বলে যে তুমি এটা পাঠাও না কেন, কাগজে পাঠাও। আমি বলতাম আমার কবিতা কে ছাপবে। ‘না তুমি পাঠিয়ে দেখো না’ — আমার কবিতা ছাপা যেতে পারে এরকম একটি ধারণা স্থাপন করেছিলো সে। এটা সামথিং। এবং আমার মনে আছে যেদিন আমার কবিতা প্রথম ছাপা হলো — সোনার বাংলা বলে একটি পত্রিকা ছিলো, নলীনী কিশোর গুহ, তিনি এটার সম্পাদক ছিলেন — আমার চেয়ে বেশি আনন্দিত সে হয়েছিলো। হামিদুর রাহমান তো — শহীদ মিনার যাঁর জিজাইন।

রাজু: এবং ইয়ে, নভেরা…

রাহমান: হ্যাঁ, নভেরার সঙ্গে তাঁর প্রণয় ছিলো।

রাইসু: বইটা পড়ছেন নভেরা, হাসনাত আবুল হাইয়ের? ভাল্লাগছে আপনার?

রাহমান: পড়েছি, মোটামুটি।

রাজু: আপনি নিজেও অবশ্য ক্যারেক্টার, ফলে —

রাহমান: আমি তো মাইনর ক্যারেক্টর।

রাজু: মাইনর বলা যাবে?

রাইসু: নভেরার সঙ্গে তো রাহমান ভাইয়ের প্রণয় ছিলো না, সেই অর্থে মাইনর।

রাহমান: তবে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। কথাবার্তা হয়েছে। একদিন গিয়ে দেখি — সকালবেলা আর কি — গেছি, নভেরা যে বাসায় থাকতো, একই পাড়ায়, আমাদের একই পাড়ায় থাকতো।

রাজু: পুরান ঢাকায়?

রাহমান: হ্যাঁ হামিদুর রাহমানের বাড়িরই একটা ইয়েতে। হামিদুর রাহমান অন্য বাড়িতে থাকতেন। এক মহিলা এলেন, আমি তখন চমকে উঠলাম, এ কে! নভেরার সঙ্গে মিলই নেই মনে হয়। মানে উইদাউট মেকআপ আর কি। মেকআপ ছিলো না। মেকআপ ছাড়া আমি কেমন যেন ধাক্কা খেলাম।

রাইসু: মেকআপ ছাড়া দেখতে ভালো ছিলেন না?

রাহমান: মেকআপ ছাড়া আমার কাছে আকর্ষণীয় মনে হয়নি। এগুলো লিখো না কিন্তু তোমরা।

রাইসু: না, এগুলিই লেখা হবে রাহমান ভাই। কিছু করার নাই।

রাজু: এটার ইঙ্গিত তো বইয়ের মধ্যেও আছে।

রাহমান: আমার এটা অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। সে তো এমনিতে খুব ভালো ছিলো। কথাবার্তায়, মেধা ছিলো তাঁর। শার্প ছিলো।

রাহমান: এবং এটা, তখন তো বয়স কম ছিলো, আমার কাছে বেশ ইয়েই লেগেছে।

রাজু: আকর্ষণের বিপরীতে ধাক্কা লেগে গেল?

রাহমান: না, আমার তাঁর প্রতি কোনো আকর্ষণ ছিলো না।

রাইসু: সুন্দরী মেয়ে না হলে আপনি প্রেমে পড়েন না এমন তো না।

রাহমান: না সে কথা না। প্রেম তো আর শুধু সুন্দর দেখে হয় না। তো, নভেরাকে দেখে আমার প্রেম নিবেদন করার কোনো ইচ্ছা জাগ্রত হয়নি।

রাইসু: কেন, আপনি ভয় পাইছিলেন?

রাহমান: ভয় টয় কিছু না।

রাজু: আচ্ছা, রাহমান ভাই, কার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী প্রেম হলো আপনার?

রাহমান: এগুলা থাক।

রাইসু: রাহমান ভাইয়ের কোনো প্রেম তো দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

রাজু: বলা যায় না, আমরা কতটুকু জানি। বিপুলা এ রাহমান ভাইয়ের কতটুকু জানি।

রাহমান: থাক, এটা খুবই পারসোনাল ব্যাপার।

রাজু: না আপনি শুধু স্থায়িত্বের কথা বলবেন। নাম না বললেন।

রাহমান: থাক।

রাজু: এমন না যে এগুলো আপনার জন্যে খুব ড্যামিজিং। কারণ এগুলো আপনি এর আগেও বলেছেন। পরকীয়া প্রেমের আপনি যে সাহসের সাথে ঘোষণা দিতে পারছেন এটা তো আর কেউ বলতে পারে নাই।

রাইসু: যেমন আপনার অর্ধেক বয়সের মেয়ের সঙ্গে প্রেমের কথাও আপনি বলছেন।

রাজু: ফলে আপনার ভয় পাওয়ার কিছু নাই।

রাহমান: না, ভয়ের জন্য না। ব্যাপার হলো, আমি এখন যাকে ভালোবাসি সেটাই আমার মনে হয় দীর্ঘস্থায়ী।

রাজু: এখন ভালোবাসেন মানে, অনেক আগে থেকে এখনও ভালোবাসেন?

রাহমান: অনেক আগে থেকে না।

রাইসু: বছর দুয়েক?

রাহমান: না, বছর দুয়েক-এর চেয়ে একটু বেশি।

রাজু: বয়সের ব্যবধান নিশ্চয়ই আপনার কোয়ার্টার?

রাহমান: না, কোয়ার্টার না। আমার চেয়ে অনেক কম, কিন্তু কোয়ার্টার না।

রাজু: টু ফিফথ?

রাহমান: আমি তো অংকে আরো কাঁচা।

রাইসু: অংকে না যাওয়াই ভালো হবে। ভদ্রমহিলা রাহমান ভাইয়ের চেয়ে অনেক কম বয়সের, প্রেমটা দীর্ঘস্থায়ী এবং আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে আশা করে আমরা অন্য আলাপে যাই।

রাজু: আচ্ছা রাহমান ভাই, তসলিমার সঙ্গে তো আপনার খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো।

রাইসু: না, প্রেমের সম্পর্ক ছিলো না বোধহয়।

রাহমান: না মোটেই না। এটা যারা বলে ভুল বলে।

রাজু: জৈবিক সম্পর্কও বোধহয় ছিলো না?

রাহমান: কিচ্ছু না। কোনো সম্পর্কই না। আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিলো একজন লেখক হিসাবে। ও আমাকে মান্য করতো গুরুজন হিসাবে। আর ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমন এক সময় যখন সে নির্যাতিত। মানে মৌলবাদীদের দ্বারা আক্রান্ত।

রাজু: আক্রান্ত হয়ে আপনার আশ্রয়টা নিলো?

রাহমান: আমার আশ্রয় নেয়নি। আমার আশ্রয় নেবে কী করতে? তখন তার সঙ্গে আমার পরিচয় হলো আর কি। এটা সত্যিই কিন্তু খুব ভুল ধারণা, যারাই বলে। আমি তো লুকানোর লোক না।

রাজু: অনেকে বলে আপনার সঙ্গে নাকি তার শারীরিক মাখামাখি হইছিলো।

রাহমান: এটা অ্যাবসার্ড। এটা বলে আমাদের দু’জনের প্রতিই অবিচার করা হচ্ছে।

রাইসু: এইটা হইলেও খারাপ কিছু ছিলো না। কিন্তু এইটা হয় নাই।

রাহমান: ভালো-খারাপের ব্যাপার না। ইট ইজ নট ফ্যাক্ট। কিন্তু কথা হলো এটা তো আমি ক্রেডিট নেয়ার জন্য বলতে পারতাম যে আমার সঙ্গে প্রণয় ছিলো এবং আমার সঙ্গে শারীরিক…

রাইসু: এ রকম ক্রেডিট কেউ নেয় আমাদের এখানে?

রাহমান: আমি বলছি যে এরকম একজন বিখ্যাত মহিলার সঙ্গে আমার এ রকম… এটা তো একটা ক্রেডিটের ব্যাপার। কিন্তু আমি সে ক্রেডিট নিতে রাজি না। এটা মিথ্যা তো এবং এটা যদি আমি বলিও এটা অবিচার করা হবে তার প্রতি। এবং আমার নিজের প্রতি। সত্য হলে আমি বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতাম না বলতে।

রাইসু: দাউদের সঙ্গে তার বিবাহ হইছে এইটাও শোনা গেল হঠাৎ কইরা, এবং দাউদের প্রতিও অবিচার করা হইলো এই নিউজের মাধ্যমে।

রাহমান: হ্যাঁ, যদি মিথ্যা হয় তাহলে অবশ্যই।

রাইসু: তবে দাউদের ব্যাপার তো, কিছু বলা যায় না রাহমান ভাই।

রাহমান: তবুও, এটা মনে হয় না।

রাইসু: আমার মনে হয় দাউদ বোধহয় তসলিমাকে বিয়ে করেন নাই। কারো পঞ্চম স্বামী হওয়ার মধ্যে গৌরবের বিষয় নাই আসলে।

রাহমান: সেই।

রাজু: আপনি এক সময় ওঁর সমর্থক ছিলেন, কিন্তু পরে আবার উষ্মা প্রকাশ করেছেন তসলিমার বিরুদ্ধে।

রাহমান: উষ্মা প্রকাশ করেছে সে। যে, আমার পাশে কেউ নেই। কয়েকজন শিল্পী ছাড়া।

রাজু: অথচ আপনি তাকে —

রাহমান: আমার কথা বাদ দাও। আরো লোক ছিলো। কে. এম. সোবহান ছিলেন। আমি জানি যে ড. মোরশেদ তাকে মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছেন। কোনো কোনো প্রেস কি তার পক্ষে লেখেনি? সেইজন্যে আমার কাছে জিনিসটা খারাপ লেগেছে, শি শ্যুড নট বি আনগ্রেটফুল। আমি তাকে বলেছিলাম, আমাকে টেলিফোন করেছিলো।

রাইসু: সুইডেন থেকে?

রাহমান: সুইডেন থেকে। দুইবার টেলিফোন করেছিলো।

রাইসু: তো আপনি কী বললেন?

রাহমান: বলেছি, তুমি এটা ফ্লাটলি বলে দিলে! বলে, না এটা মিথ্যা কথা লিখেছে। আমি তো এটা বলিনি। তো আমি আর কিছু বলিনি। কারণ ওকে বলার তো কোনো মানে হয় না।

রাইসু: তাইলে আপনি যেটা চাইছিলেন তসলিমার মুখে ফুলচন্দন পড়–ক, সেই ফুলচন্দনটা পড়ে নাই?

রাহমান: ওটা তোমার একটা লাইনের জন্য মনে হয়েছে। এটা তসলিমা ছাড়া তোমরা ভাবো না কেন।

রাইসু: আপনি ওই লাইন থেকে তসলিমার নাম মুছে দিতে চাচ্ছেন?

রাহমান: না মুছে দিতে না। তসলিমা এখানে একটা উপলক্ষ মাত্র। এটা একটা স্পিসিস। এক ধরনের লেখক সম্পর্কে বলা।

রাইসু: নতুন প্রজাতির লেখকবর্গ।

রাহমান: সেই তো। যারা নির্যাতিত হয়, এক-সময় এসে লোক বরণ করে তাদের। এভাবেই দেখো না কেন।

রাজু: তসলিমাকে যে ছফা ভাই রিফিউট করলেন, ওনার লেখাগুলো দেখেছেন কি?

রাহমান: আমি পড়িনি।

রাজু: ছফা ভাইয়ের কোনো লেখাই পড়েন না, না?

রাহমান: পড়বো না কেন, পড়েছি। তার ওংকার পড়েছি। ভালো লেগেছে আমার।

রাইসু: ছফা ভাই আপনার ব্যাপারে তো একটা নিন্দাসভা করতে চাইছিলেন, জানেন নাকি?

রাহমান: নাহ্।

রাইসু: আর্ট কলেজের লিচুতলায় টিকিট ছেড়ে আপনার ব্যাপারে নিন্দা করা হতো।

রাহমান: ওইসবই করবে সে। ওইসব করবে আর এনজিও করবে, এই তো।

রাজু: আমার মনে হয় আপনাকে আরো পপুলার করার একটা উদ্যোগ ছফা ভাই নিতে চাচ্ছিলেন।

রাইসু: আপনার প্রতি ভালবাসা প্রকাশের জন্য।

রাহমান: আরে রাখো। এইসব লোক। ধান্ধাবাজি সব। ভীষণ ধান্ধাবাজ।

রাইসু: কে, ছফা ভাই?

রাহমান: আচ্ছা ভালো কথা, তোমরা কেউ অসীম সাহার টেলিফোন নাম্বার জানো?

রাইসু: হ্যাঁ আছে। তার মানে ব্যাপারটা বোঝা গেল, অসীম সাহার কাছ থেকে জানতে পেরেছেন রাহমান ভাই যে ছফা ভাই ধান্ধাবাজ।

রাজু: অসীম সাহার কাছ থেকে জানছেন?

রাহমান: না না না, অসীম সাহার সঙ্গে আমার কাজ আছে।

রাইসু: অসীম সাহা আর ছফা ভাই তো এক এনজিওতেই।

রাহমান: আমার কাজ আছে অসীম সাহার সাথে।

রাজু: ছফা ভাইয়ের কাছে আপনার কোনো কাজ নাই?

রাহমান: কোনো দিন হবেও না।

রাইসু: তো, লেখালেখি কি আরো চালাবেন রাহমান ভাই?

রাহমান: যতদিন বেঁচে আছি।

শ্যামলী, ঢাকা ২২/১০/১৯৯৬

free counters

বন্ধুদের কাছে লেখাটি ইমেইল করতে নিচের tell a friend বাটন ক্লিক করুন:


23 Responses

  1. কামরুজ্জামান says:

    একটা গুলতানিমার্কা, উস্কানি দেয়া বিস্ফোরক কিছু কথা আদায় করার চেষ্টায় ভরা একটি সাক্ষাৎকার। দুর্লভই বটে!

    – কামরুজ্জামান

  2. Arafat says:

    ভাল…অনেক ডাটা পেলাম…
    তবে সাক্ষাৎকারে এলেবেলে কিছু প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেই ভাল হত…

    -Arafat

  3. Asif says:

    কী দরকার ছিলো মানুষটাকে এত জ্বালাতন করার? অযথা।

    -Asif

  4. হাসান বিপুল says:

    পুনর্মুদ্রণ নয়, অনলাইনে সাক্ষাৎকারটি পুনঃপ্রকাশ হলো।

    – হাসান বিপুল

  5. কানন আহসান says:

    সাক্ষাৎকার তো নয় যেন ইন্টারোগেশন। শামসুর রাহমান আসলেই নিপাট ভদ্রলোক ছিলেন, না হলে ইন্টারভিউর নামে এই ধরনের ইতরপনা সহ্য করার কথা নয়।

    -কানন আহসান

  6. Shehab says:

    বোরিং।

    -Shehab

  7. মাহাবুবুর রাহমান says:

    দুর্লভ নাকি দুর্ভল (দুর্বল) সাক্ষাৎকার? সাক্ষাৎকারগ্রহীতাগণ কি শামসুর রাহমানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে পেরেছেন, কিংবা মানেন?

    – মাহাবুবুর রাহমান

  8. আরজু says:

    মজাদার আলাপচারিতা।

    আচ্ছা! ভয়েস রেকর্ড আছে নাকি এটার?

    -আরজু

  9. রাজু আলাউদ্দিন says:

    প্রায় এক যুগ পর রাইসু এবং আমার নেয়া এই সাক্ষাৎকাটি পুনঃপ্রকাশের সূত্রে অনেকেই পক্ষে-বিপক্ষে মন্তব্য করেছেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের একজন হিসেবে এই মন্তব্যগুলো সম্পর্কে আমার নিজের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে আমি আর্টস সম্পাদকের কাছে কৃতকজ্ঞতা জানাই।

    কামরুজ্জামান,
    সাক্ষাৎকারটিকে আপনি ‘গুলতানিমার্কা, উস্কানি দেয়া বিস্ফোরক কিছু কথা আদায় করার চেষ্টায় ভরা’ বলে মন্তব্য করেছেন। আপনার মনে আছে কিনা জানি না, বহু বছর আগে হুমায়ুন আজাদ শামসুর রাহমানের একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেই সাক্ষাৎকার নেয়া প্রসঙ্গে পরবর্তীকালে হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, হাতুড়ির মতো পিটিয়ে পিটিয়ে তাঁর কাছ থেকে কথা বের করতে হয়েছিলো। হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যটা মোটামুটি এরকমই ছিলো সাক্ষাৎকারদানকারী শামসুর রাহমান সম্পর্কে। তারপরও ওই হাতুড়ি (হুমায়ুন আজাদ) রাহমান ভাইয়ের কাছ থেকে যা আদায় করতে পেরেছিলেন তা সাহিত্য-বিচারে তেমন গভীর বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিলো না। এটা আমরা জানতাম বলেই ভিন্ন পথে তাঁর মুখোমুখি হয়েছিলাম। কবিতার শামসুর রাহমান যতটা আকর্ষণীয়, কথাবার্তায় ততটা নয়। সাক্ষাৎকারটিকে আকর্ষণীয় করার লক্ষ্যেই আমরা ইচ্ছে করেই গুলতানি এবং চপলতাকে, প্রশ্রয় দিয়েছি। আমার ধারণা তাতে করে সাক্ষাৎকারটি আকর্ষণীয়ই হয়েছে। সেই অর্থে রাহমান ভাইয়ের দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্যে এটা দুর্লভ। আপনার মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ।

    আরাফাত,
    জানি না কী ডাটা (Data) পেয়েছেন। তবে নতুন কিছু নিশ্চয়ই নয়। এই ধরনের সাক্ষাৎকারের চরিত্রই হচ্ছে ‘এলেবেলে’ ভঙ্গির ছদ্মবেশে গুরুত্বপূর্ণ কোনো উপলব্ধিকে আবিষ্কার করা। তাই নয় কি ?

    কানন আহসান,
    আপনার মতো আরেকজন ‘নিপাট ভদ্রলোকের’ সাক্ষাৎ পেয়ে আমি আনন্দিত। আপনার ইতরোচিৎ মন্তব্যের ভিত্তি কী — তা আমি জানি না। আড্ডায় রস সঞ্চার করাই হলো মূল কথা। সাক্ষাৎকারে আমরা সেটাই করার চেষ্টা করেছিলাম। ইতর প্রাণীদের মধ্যে রস সঞ্চার করার কোনো বালাই নেই। সেই কারণেই কি আপনি ক্ষুব্ধ? মাফ করবেন ভদ্র মহোদয়।

    শেহাব,
    বোরিং। সবটুকু পড়েই কি বোরিং বললেন? শেষে কিন্তু আর বোরিং ছিলো না।

    মাহাবুবুর রাহমান,
    শামসুর রাহমানের ঐতিহাসিক তাৎপর্য পুরোপুরি বুঝতে পেরেই আমরা তাঁর হালকা রসের একটি সাক্ষাৎকার নেয়ার উদ্যোগ নেই। তাঁর দেয়া সাক্ষাৎকারগুলোর মধ্যে এটি ‘দুর্বল’ নয়, ‘দুর্লভ’ হিসেবেই ঐতিহাসিক মর্যাদা পাবে।

    আরজু,
    ধন্যবাদ আপনাকে সহৃদয় মন্তব্য করার জন্য। আপনার প্রশ্ন এটার কোনো ভয়েস রেকর্ড আছে কিনা। আমার কাছে নেই। জানি না রাইসুর কাছে এখনও আছে কিনা। তবে না-থাকলেও সন্দেহ করার কিছু নেই। সাক্ষাৎকারটি ভয়েস রের্কডার-এ নেয়া হয়েছিলো। এটি মুদ্রিত হওয়ার পর সাক্ষাৎকারদানকারী এর যথাযথতা সম্পর্কে যেহেতু কোনো ভিন্নমত প্রকাশ করেন নি — তাতেই প্রমাণিত হয় এর যথাযথতা।

    – রাজু আলাউদ্দিন
    তিহুয়ানা, মেক্সিকো
    razualauddin@hotmail.com

  10. অনির্বান says:

    মজাদার আলাপচারিতা ভাল লেগেছে। ধন্যবাদ আপনাদেরকে।

    – অনির্বান

  11. সাক্ষাৎকারটা প্রথম প্রকাশের মুহূর্তেই পড়েছিলাম। এখন আবার পড়ে ভালো লাগল। মজাদার এবং সিরিয়াস যুগপৎ। রাজু-রাইসুকে ধন্যবাদ।

    – তপন বাগচী

  12. Sharat says:

    খুবই আকর্ষণীয় সাক্ষাৎকার। যারা শামসুর রাহমানের প্রতি অনাবশ্যক অন্তরঙ্গতা বোধ করেছেন সেইটা শিশুসুলভ মনে হইল। এই অন্তরঙ্গতারে আমার রেটোরিকের চাইতে বেশি কিছু মনে হয় না। রাইসু এবং রাজুর তীক্ষ্ণ যোগাযোগ প্রচেষ্টা বেশ মজার। শামসুর রাহমান আরো ভালো কইরা উত্তর করতে পারতেন। যাই হোক তিনি নাই তাঁর জন্য অন্য ভালোবাসা রইল। আর মজার সাক্ষাৎকার নেওনের জন্য রাজু-রাইসুকে ধন্যবাদ।

    – Sharat

  13. অরিন্দম says:

    রিয়েলি বোরিং।

    ব্রাত্য রাইসুর সাক্ষাৎকারের অবশ্য এটাই বৈশিষ্ট্য। সৈয়দ হকের বেলায়ও একই কায়দা ফলো করা।

    – অরিন্দম

  14. অবশেষে সাক্ষাৎকারগ্রহীতাদের একজন — রাজু আলাউদ্দিনের কিছু মন্তব্য পাওয়া গেল। তিনি আমার ‍‍বুঝতে পেরেছেন’ শব্দটির উপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু সেটা ছিল একটা কথার কথা মাত্র। আমার মূল জিজ্ঞাসা ছিল তাঁরা কি শামসুর রাহমানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব মানেন। আমি যতটুকু কম জানি — রাজু আলাউদ্দিন এবং ব্রাত্য রাইসুর শামসুর রাহমানের গুরুত্ব বুঝতে না পারার কথা না। কিন্তু আমার সন্দেহ ছিল — তাঁরা তা মানেন কিনা। কেননা ‘৭০ পরবর্তী প্রজন্মের ভিতর এটা কমবেশি দেখা যায় যে তাদের কাছে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের চেয়ে পশ্চিমবঙ্গের কবিরা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন। তাঁদেরও গুরুত্ব আছে, কিন্তু সেটা রাহমানদের মতো নয়।

    – মাহাবুবুর রাহমান

  15. অস্ট্রিক আর্যু says:

    সাক্ষাৎকারটি পইড়া তৃপ্ত হইলাম। প্রিন্ট মিডিয়া থেইকা রাইসু চইলা যাইবার পর এরকমটা আর চোখে পড়ে না। রাজু তো ইতনা দূর; ও রকম ভাবে এখন আর কাউকে সাক্ষাৎকার নিতে দেখি না। আর্টসবিডি-এর জন্য এরকম সাক্ষাৎকার নেয়া যেতে পারে।

    – অস্ট্রিক আর্যু

  16. কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর says:

    আবারও এটি পাঠ করলাম। খুবই আকষর্ণীয় একটা সাক্ষাৎকার। আমরা বেশির ভাগ সাক্ষাৎকারে দেখি, জগতের সব মুগ্ধতা এখানে ভর করে। মুখস্থ কিছু কথা বলেই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী সাক্ষাৎ প্রদানকারীর বাণীর আশায় হা করে থাকেন। আমরা তারপর একখান বাণীবহুল জিনিস পাই। এভাবে পাঠককে তৈরিও করেছেন অনেকে। যারফলে প্রচলিত রুচির বাইরে গেলেই পাবলিক হায় হায় করতে শুরু করেন। রাইসু আর রাজু আমাদেরকে হা হয়ে শুধু কথা শোনার যন্ত্রণা থেকে বাঁচিয়েছেন। তাদের দুজনের প্রতি রইল শুভ কামনা।

  17. শামীম সিদ্দিকী says:

    উপভোগ্য…

  18. Yousuf reza says:

    এই রকম দুইটা লোক। কবিকে আরো কত কিছুই না জিগাইতে পারত। লেখাটা পইড়া মন ভরল না।
    yusuf_reza@hotmail.com

  19. evergreenman says:

    এক পশলা মল উগরে দিয়েছেন, এটা কী সাক্ষাতকার!

  20. শুভরাজ বিশ্বাস says:

    ব্রাত্য রাইসু যে প্রতিভাহীন লোক তা আরেকবার প্রমাণ করলেন তার হাবলুমার্কা প্রশ্ন দিয়ে আর রাজু আলাউদ্দিন তো এখানে তার বয়স পনেরই পার করেননি।

    বাঙলা বিভাগ
    চ.বি.

  21. Lohan says:

    i love arts.bdnews24.com guys!!
    Lindsay Lohan teeth

  22. arts.bdnews24.com is coolest site in the world

    hepatitis b test

  23. ashraf says:

    the style of dialogue is similar to socratic dialectical method. but you two follow some maked principle to attract reader which can be easily avoided. best of luck

    ashraf_law_cu

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.