সাক্ষাৎকার

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: নারীকে একজন পুরুষ অনেক বেশি ভালো বোঝে

রাজু আলাউদ্দিন | 10 Apr , 2019  


সাহিত্য, দর্শন, চিত্রকলা থেকে শুরু করে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও চলচ্চিত্র পর্যন্ত ব্যাপ্তি শঙ্করলাল ভট্টাচার্য’র। এই ব্যাপ্তি গভীর পাণ্ডিত্য ও বিশ্লেষণী মনের মাধুর্য মেশানো। শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের জন্ম ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭-এ মধ্যকলকাতায়। ওঁর পিতা বঙ্কিমচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন বিখ্যাত আইনবিদ, পণ্ডিত এবং দানী পুরুষ। বাড়ির পরিবেশ ছিলো রাজনীতি, বই ও গানে আচ্ছন্ন। মধ্যকলকাতার সেই পরিবেশই ধরা দেয় শঙ্করলালের গল্পে, উপন্যাসে যা স্বাদ, শৈলী ও স্বরে একেবারে এক ভিন্ন ঘরানার। ‘বাৎস্যায়ন ও বৃন্দাবনী’, ‘আথেন, হেলেন ও সেই ক্রন্দসী’, ‘প্রথম পুরুষ’ এবং ‘১০ নং মিন্টো লেন’ ওঁর উল্লেখ্য উপন্যাস। ওঁর সমাদৃত গল্পগ্রন্থের মধ্যে আছে ‘রাতের কাহিনীকার’ ‘অ্যাংলো চাঁদ’ এবং ‘কবির মৃত্যু’।
শঙ্করলালের প্রবন্ধে তীক্ষ্ণ মেধা, বিস্তৃত পাঠ এবং রসময় গদ্যের বিরল সম্মেলন। তাঁর প্রবন্ধের বইয়ের মধ্যে আছে ‘রবিশঙ্কর-বিলায়েৎ ও অন্যান্য বিষয়’, ‘উদয়ের পথে’, ‘সাহিত্যের স্বাদ’, ‘সত্যজিৎকে নিয়ে’ ও ‘দার্শনিকের মৃত্যু’।
রবিশঙ্করের ‘রাগ-অনুরাগ’, বিলায়েৎ খাঁর ‘কোমল গান্ধার’ ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ‘আমার গানের স্বরলিপি’ স্মৃতিকথার সহলেখক শঙ্করলাল।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের সঙ্গে রাজু আলাউদ্দিনের এই দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়েছিল ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা ক্লাবে। ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করা এই আলাপচারিতার শ্রুতিলিপি তৈরি করেছেন তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদ। বি.স

রাজু আলাউদ্দিন: শঙ্করদা, এর আগেও আপনি বাংলাদেশে এসেছেন। এবং আমরা জানি, বাংলাদেশ আপনার পিতৃভূমিও ছিল।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: এখনো আছে বলব। কারণ, সেই ইতিহাসটা তো আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, ইতিহাস আছে। আমরা রাজনৈতিক কারণে নানাভাবে বিভক্ত বা স্থানচূত হয়েছি। কিন্তু সাংস্কৃতিক বন্ধনগুলো তো আর হারিয়ে যায়নি। তো এবার বাংলাদেশে এসে আপনার কেমন লাগছে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: খুব ভালো লাগছে। আমি আসবার সময় বলছিলাম, আমাকে যারা নিতে এসছিলেন এয়ারপোর্টে, আমার কেন জানি না, ঢাকায় নামলেই, বাংলাদেশে নামলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। কত জায়গায় ঘুরি, দেশবিদেশে কত জায়গায় গিয়েছি, ভালো ভালো দেশে, সুন্দর সুন্দর দেশে গিয়েছি, কিন্তু এই যে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দ, এটা পিতৃভূমি বলে কি না জানি না, কিংবা এটা আমাদেরই বাংলাভূমির সম্প্রসারণ বলে কি না জানি না, অথবা একই ভাষা বলে কি না জানি না, কিংবা একই চেহারার মানুষ বলে কি না জানি না, একই জায়গার চেহারা বলে কি না জানি না; এবং এখন তো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে অনুভব করছি আরেকটা জিনিস। সেট হলো, জীবনানন্দ দাশ এখান থেকে চলে যাওয়ার পরে তিনি মাঝে মাঝে যখন আসতেন, তারপরে একটা সময় তো আর আসতেই পারলেন না, আটচল্লিশ সালের পরে; কিন্তু তার আগে, ভারত ভাগ হওয়ার আগে তিনি ওইদিকে কাজ করছেন, মাঝে মাঝে চলে আসতেন বরিশালে ওঁর বাড়িতে। এবং খুব সুন্দর করে বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন, ওনার ছোট্ট বাড়িটা, চারপাশে সবুজ গাছগাছালি। এবং উনি বলতেন, ওনার যে ঘরটা আছে, যেখানে উনি লিখতেন, তার ছবি আমি দেখেছি। বাড়িটা গিয়ে দেখা হয়নি। যদিও খুব ইচ্ছে ছিল। আমরা বরিশালে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই সময় এমন একটা কাজের মধ্যে আমরা ছিলাম, সময় বার করতে পারিনি। কিন্তু আমার মনে আছে, আমার ভেতরে কাজ করছিল, এই বরিশালে এলাম, একটু দূরে গেলে ওনার বাড়িটা দেখতে পাব। সব ভাবছিলাম। যেটা আমার ভেতরে খুব দাগ কেটেছিল, সেটা হলো, উনি ওখানে চাকরি করছেন, পড়াচ্ছেন, কবিতা লিখছেন, বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে ওনার কবিতা বেরোচ্ছে, নাম হচ্ছে, সবাই একডাকে ওনাকে চেনে অথচ উনি নির্জন মানুষ। একার মধ্যে থাকেন। খুব বড় বড় মিটিঙ ফিটিঙে যান না। কবিতার কোনো উৎসবে নেই। কিন্তু উনি সবচে’ বেশি তৃপ্ত হতেন যখন বরিশালের বাড়িতে আসতেন। এসে ওই ঘরটায় বসতেন। তার একটা সুন্দর বিবরণ আছে। পড়লে চোখে জল আসে।
রাজু আলাউদ্দিন: কেমন বিবরণ? মনে আছে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ মনে আছে। এই যে সবুজ গাছগাছালি, এই যে মাটি, এই যে একটা ছোট ঘর, এই ঘরে এসে বসে আলোটা যখন দেখি, আকাশটা যখন দেখি, এই আনন্দটার জন্য আমার এখানে আসা। উনি যে নির্জনতা ভালোবাসতেন সেই নির্জনতার একটা তৈরি চেহারা এখানে এসে তিনি পেতেন। তিনি মনে করতেন, এইটা আমার জায়গা। উনি বলতেন সেটা। যেমন টলস্টয় ইয়াসনায়াপোলিয়ানায় যখন থাকলেন, তিনি একটা অদ্ভুত কথা বলেছিলেন, সেটা ইতিহাস হয়ে গেছে। এটা সবাই অত জোর দিয়ে বলতে পারে না। কিন্তু উনি বলেছিলেন। এরকমন পা দিয়ে মাটিতে দাপিয়ে বলেছিলেন– দিস ইজ হয়ার আই বিলং। জীবনানন্দ বলতে পারতেন। উনি যখনই সুযোগ পেতেন, চলে আসতেন নিজের জায়গাটা উপভোগ করার জন্য। আর এর ভেতর থেকেই তার কবিতার উৎসার হতো। ওনার ভালো কবিতা, বস্তুত ওনার সমস্ত কবিতারই মূল সূত্রগুলো গাথা হয়ে গেছে ১৯৩১ থেকে ১৯৪২ এর মধ্যে। সবকিছু এইখানে বসে। কলকাতাতেও লিখেছেন কিন্তু এইখানেই মূল লেখাগুলো। এখন তো দেখা যাচ্ছে হাজার হাজার কবিতা উনার রয়ে গেছে, যেগুলো ছাপা হয়নি। হাজার হাজার কবিতা বলব না, কবিতা দু হাজার, তার মধ্যে মাত্র ২২৩ টা বেরিয়েছিল ওনার জীবৎকালে। তাহলে তো হাজারই বলতে হয়। হাজার হাজারও বলা যায়। আর চার হাজার পাতার ডায়রি বেরিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ফের্নান্দো পেসোয়ার মতো কিংবা সি পি কাভাফির মতো।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমি বলেছি পাসকালের মতো। পাসকালের সেরা কাজ বুকের মধ্যে নিয়ে চলে গেছিলেন কবরে। যাতে ওটা না বেরোয়। তারপরে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা যখন আবিষ্কার করল ওই লেখাটা নেই, ওই লেখাটা কি চলে গেলে ওনার সঙ্গে? ওরা গিয়ে কবর খুড়ে ওটা বার করে নিয়ে আসে। এবং ওঁর বন্ধুরা, ওঁর অনুরাগীরা দায়িত্ব নিয়ে এডিট করে ওটা যখন বেরোলো, ওটা সর্বকালের সেরা ফরাসি গদ্যের মধ্যে এসে পড়ল। এবং এখনো তাই। তো এখানে এলে আমার যেটা হয়, আমি তো আর পাসকাল বা জীবনানন্দ নই, আমি একটা অতি সাধারণ মানুষ। কিন্তু আমার যেটা হয় আর কি, নাড়ির টান তো কারো থেকে কম বা বেশি নয়, একই রকম। তো এখানে এলে সেটা বোধ করি। যদিও আমি খুলনার লোক। কিন্তু খুলনা যেহেতু এই দেশটার অঙ্গ, সেই জন্য এমন হয়। আমি খুলনাতে পরে এসেছি। সে একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা। রাত্রিবেলা নেমেছিলাম আমাদের সেই বাড়িটার কাছে। দাঁড়িয়ে দেখলাম যখন, চোখে জল আসছিল। অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা সেদিন হয়েছিল। তো এখন ঢাকায় এলে ওই অনভূতিটা আসে। আমি একে স্মৃতিকাতরতা বলব না। মানে এই স্মৃতিটাই হচ্ছে আমার বাস্তবতা। কাতরতা মানে হচ্ছে যে, যেটাকে আমি মিস করি বলে কষ্ট পাই। এটা আমি মিস করি না। আমি বুঝতে পারি এটা আমার কাছে আছে। আমি এলে সেই কানেক্টিভিটিটা আরো জোরালো হয়। চোখে দেখি আর বুঝতে পারি।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি উপন্যাস লিখেছেন প্রথম পুরুষ। এরপর সম্প্রতি একটা উপন্যাস ধারাবাহিক বেরোচ্ছে অমৃতা শেরগিলকে নিয়ে। এখনো তো শেষ হয়নি উপ্যাসটা। ধারাবাহিক চলছে। আপনার আরেকটা পরিচয় আমরা জানি। আপনার প্রাবন্ধিক পরিচয়। আরেকটা পরিচয় আপনার আছে, আপনার সঙ্গীত-মত্ততা। এবং এই মত্ততা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাাপারে আপনার এক অসামান্য ক্ষমতা, সেটাও আমরা জানি। সাহিত্যের নানান শাখায় আপনি আছেন। উপন্যাস দিয়ে আপনি শুরু করেছিলেন। মাঝখানে প্রবন্ধের মধ্যে লিপ্ত হয়েছিলেন। আবার উপন্যাসে ফিরে এলেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমি গল্প লিখেছি দু ধরনের। একেবারে কাল্পনিক গল্প। মানে মাথা থেকে এসেছে, ভেবেচিন্তে নানাভাবে লিখেছি। তারমধ্যে জাদুবাস্তবতার গল্প আছে, নানান ধরনের গল্প আছে। কল্পনা দিয়ে যে ধরনের গল্প বাঁধা হয় আর কি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার তো কল্পনাপ্রবণ ফেভারিট একজন লেখক হলো বোর্হেস।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ, বোর্হেস। আরেক ধরনের গল্প লিখেছি, একেবারে আমার পাড়ার অভিজ্ঞতা থেকে। যেসব মানুষগুলোকে আমি দেখেছি। এবং সেইসব মনুষগুলোকে বেছে নিয়েছি গল্পে, যাদের মধ্যে উদ্ভট কিছু পেয়েছি। আমি তো একটা অ্যাংলো ইন্ডিয়ান পাড়াতে ছিলাম, সেখানে অদ্ভুত অদ্ভুত অ্যাংলো ইন্ডিয়ান ক্যারেক্টরস ছিল। তাদের সঙ্গে আমার খুব যোগাযোগ ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: কোন এলাকা এটা?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: এলাকাটা ক্র্যাক রো। ক্র্যাক মানে হচ্ছে খাড়ি। আসলে এক সময় ওটা একটা নদী ছিল। যে নদী ওখান থেকে গঙ্গায় গেছে। উত্তর থেকে এসে গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। যার জন্য ওর নাম ক্রিক ছিল। ১৭৩৮ সালে সেখানে একটা জাহাজডুবী হয়েছিল। তাহলে কতবড় ক্র্যাক! তারপরে আস্তে আস্তে সেটা বন্ধ হয়ে যায়। এবং আমাদের যে বাড়িটা, সেই বাড়িটা হেস্টিংসের আমলের। এখনো বাড়িটা সেই অবস্থাই রয়েছে। আমরা সেখানে থাকি না। সেটা হাতবদল হয়ে গেছে। রাস্তা থেকে সেই বাড়িটার শুরু হচ্ছে গিয়ে, প্রথমে ফুটপাত, তারপরে তিনটে সিঁড়ি, তারপরে বড় একটা বাঁধানো জমিন, তার থেকে আবার দশটা সিঁড়ি। এই দশটা সিঁড়ি উঠে গিয়ে আমাদের একতলা। ওটা ছিল নদী। নদীর ঘাটের সিঁড়ি ওগুলো। ওখান থেকে নেমে হয়ত নৌকায় উঠতে হতো বা জাহাজে উঠতে হতো। তো এরকম কয়েকটা বাড়ি ওই পাড়াতে আছে। আমাদের বাড়িটা বাংলো টাইপের বাড়ি। সাহেবি আমালের বাড়ি। বাড়িতে তামার একটা প্লাগ ছিল, ল্যাটিনে লেখা। কাকা কাগজ থেকে খবর পেয়েছিলেন, ওটা হেস্টিংসের আমলে তৈরি হয়েছিল। মানে এইটিন সিক্সটি থেকে এইটিন এইট্টি ফোরের মধ্যে কোনো এক সময় হয়েছিল। কারণ, যে কোনো কারণে ওই সাহেবের নামটা ওখানে রয়েছে। আমাদের পেছনে ছিল প্রিশন রাহ। আমি একজনের কথা খুব লিখেছি। এবং বলেওছি, আমার ছাদের যে ঘর, যে ঘরে আমি পড়তাম, সেখান থেকে পেছনে তাকালে যে বাড়িটা দেখতে পেতাম, সেখানে থাকত লোরেন্স সুইংটন বলে একটা মেয়ে। পরবর্তীকালে লোরেন্স সুইংটন বিখ্যাত ক্যামেরা আর্টিস্ট হয়। তখন ওর নাম হয়েছিল লাশিয়াস লোলা। যাকে সারা ভারতবর্ষ চেনে। একবার ডম মোরেস কলকাতায় এসছিলেন। চ্যানেল ফোরের জন্য উনি একটা ডকুমেন্টারি করছিলেন। সিক্স পার্ট ডকুমেন্টারি অন দ্য রাজ। তাতে উনি কলকাতার উপরে কাজ করতে এসেছিলেন। তো আমাকে ডেকেছিলেন ওঁর হোটেলে। তার আগে ওঁর সাথে আমার কয়েকবার আলাপ হয়েছে। আমরা আড্ডা মেরেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার জন্ম তো ইন্ডিয়াতে।

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: ইন্ডিয়ারই তো। গোয়া’র। বেসিক্যালি বোম্বে…। ওঁর বাবা তো ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’র এডিটর ছিলেন। তো কথায় কথায় ডম জেনেছিলেন আমি অ্যাংলো পাড়ায় মানুষ, তো আমাকে হঠাৎ জিজ্ঞেস করল–আচ্ছা, তুমি তো অ্যাংলো পাড়ায় বড় হয়েছ, বাই এনি চান্স উড ইউ নো সাম দিস নেম সাম হাউ লাশিয়াস লোলা? আমার শিরদাড়া দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া নেমে গেল শুনে। কারণ, আমি তো ওকে দেখতাম ওখানে। তো ওঁকে পুরো ব্যাপারটা বললাম। বললাম, তুমি আমাকে যার কথা বললে, সে আমার বাড়ির পেছনে থাকত। তারপরে সে আমাকে বলল, সে কোথায় এখন? আমি বললাম, কেন বল তো? বলল যে, আমি যাদের কাজ দেখেছি ভারতবর্ষে ক্যামেরা আর্টিস্ট, আই থিংক শি ইজ দ্য বেস্ট। আমি তখন বললাম যে, আমি বলতে পারব না। কারণ আমি তাকে শেষ দেখেছি ১৯৬৫ সালে। তারপর ও দেশ ছেড়ে চলে গেছে। এবং আমিও তো ওই পাড়াতে আর নেই। শুনেছি মাঝে মাঝে ও ওই পাড়াতে আসে। আশপাশের লোকদেরকে গিফট টিফট দিয়ে যায়। ও এখন অস্ট্রেলিয়াতে থাকে। আমি ওকে নিয়ে অনেক গল্প লিখেছি। ওর ক্ষেত্রে খুব একটা বানাতে হয়নি। জীবনটাই ওইরকম ছিল। ইন্টারেস্টিং। খবু মজার একটা জীবন ছেলেবেলা থেকেই।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার সর্বশেষ কাজটা নিয়ে কথা বলতে চাই। অমৃতা শেরগিলের প্রতি আপনি আগ্রহী হলেন কেন? তাকে নিয়ে তো কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। আপনিই প্রথম লিখছেন। তার জীবনী হয়ত ছিল। তার সম্পর্কে প্রবন্ধের বই আছে। উপন্যাস লেখার আগ্রহ বোধ করলেন কেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: দুটো কারণে। আমি লিখতে গিয়ে দুটো জিনিস অনুভব করলাম। ওঁর জীবনী যেগুলো রয়েছে, তাতে ওঁর ছবির রস নেই। আলোচনা আছে। অমুক সালে এটা আঁকলেন। তমুক সালে এটা আঁকলেন। এটা করলেন। সেটা করলেন। এখানে গেলেন। ওখানে গেলেন। দু নম্বর হলো, যে কারণে আমাকে লিখতেই হলো, আমি তো ওঁর ভক্ত বরাবরই, কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছিল ওঁর জীবনের নানা রকম রহস্যমূলক ঘটনা যখন আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছিল, তখন মনে হলো, ওঁ একটা অদ্ভুত চরিত্র। এঁকে নিয়ে তো সত্যিই লেখা যায়। লোকে শুধু তার ছবি দেখে। যেটুকু পায়, সেটুকু আলোচনা করে। এই রং চাপানো হয়েছে, এটা এই ক্লাশের ছবি, ওটা ওই ক্লাশের ছবি, অমুক ঘরানা তমুক ঘরানা ইত্যাদি। কিন্তু ওঁর জীবনটা এমন একটা জীবন শিল্পীর ক্ষেত্রে, যেটা ইট ডিমান্ডস এ কাইন্ড অব ইমাজিনেটিভ রিক্রিয়েশন। যেমন আমি বলি, ভ্যান গঘ বা মাইকেল এ্যঞ্জেলোর অনেক বায়োগ্রাফি আছে। তাহলেও আমরা আরভিং স্টোন পড়ি কেন! তার কারণ হচ্ছে গিয়ে, তাতে এমন কতগুলো রসিক উপাদান যোগ হয়েছে কল্পনা দিয়ে…. আমি কিন্তু কোনো জায়গায় তার জীবনের কোনো ঘটনাকে বিচ্যূত করিনি। কোনো জায়গায় আমি এমন কিছু লিখিনি যা ওঁর জীবনে নেই। কিন্তু আমি যেটা করেছি, এমনভাবে দেখার চেষ্টা করেছি, যাতে জীবনের রসটা বেরিয়ে আসে।

রাজু আলাউদ্দিন: রিক্রিয়েশন। নতুন করে আবার সৃষ্টি করা। আমরা যখন ঐতিহাসিক উপন্যাস পড়ি….
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: রবার্ট গ্রেভসের আই ক্লোডিয়াস— এগুলো ইতিহাস পড়ার পরেও এত পড়তে ইচ্ছে করে কেন, এত ভালো লাগে কেন? উনি কিন্তু ইতিহাসের কোথাও ভাঙছেন না, চুরছেন না। কিন্তু এমনভাবে ইতিহাসটাকে গল্প করে বলছেন, তার একটা অন্য মাত্রা তৈরি হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি এরকম না, আমরা ঐতিহাসিকদের কাছ থেকে যে ইতিহাসটা পাই, সেই ইতিহাসের মধ্যে যে ফাঁকফোকর থেকে যায়, সেই ফাঁকফোকরগুলো পূরণ করেন কথাসাহিত্যিকরা?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: একজ্যাক্টলি। আমি যদি এখন মাইকেল এ্যাজ্ঞেলোকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখি, আমি কিন্তু আরভিং স্টোনকে কোড করব না। বা ভ্যান গঘকে নিয়ে লিখলে আরভিং স্টোনকে কোড করব না। তার কারণ হচ্ছে গিয়ে, তারা অনেক কল্পনা মিশিয়েছেন। আমার দায়িত্ব হবে, প্রবন্ধ করলে, তথ্য এবং তত্ত্ব এগুলোর মধ্যে ঘোরাফেরা করা। ইতিহাস ভূগোলের মধ্যে ঘোরাফেরা করা। কিন্তু আমি যদি উপন্যাস করতে যাই, উপন্যাস করতে গেলে দরকার হবে ইতিহাসটা একেবারে নির্মমভাবে তুলে আনা, কিন্তু বাকিটা আমায় তৈরি করতে হবে। আমি কতটা পারি বা আমার কতটা ক্ষমতা আছে, আমরা কল্পনা শক্তি কতটা প্রখর, আমি কতটা ঢুকতে পারি, সেটা আমার দায়িত্ব। তার উপর নির্ভর করবে ওটা ভালো হলো কি খারাপ হলো। কিন্তু আমার পড়তে খুব ভালো লাগে ঐতিহাসিক উপন্যাস। তার কারণ হচ্ছে গিয়ে, মারি রেনো বলে একজন আছেন, তিনি আলেকজান্ডারের উপর উপন্যাস লিখেছেন। আরো পেছনে গিয়ে মিথিক্যাল বিষয়ের উপর উপন্যাস লিখেছেন। এই রিক্রিয়েটিভ প্রসেসটা এত সাঙ্ঘাতিক, এটা আমার ভীষণ ভাল্লাগে। আমার সবচে’ ভালো লেগেছে ঐতিহাসিক উপন্যাস রবার্ট গিবস। আর ফরাসি একজন লেখিকা, নামটা মনে পড়ছে না, অসাধারণ লেখিকা, আমি ওটা ফরাসি এবং ইংরেজি দুই ভার্সনেই পড়লাম কানাডায় গিয়ে। উপন্যাসটা হচ্ছে হাদিরিয়ান। আমরা হেদরিয়ান বলি। ওয়ান অব দ্য লাস্ট রোমান এমপেররস। সে যে কী উপন্যাস ভাবা যায় না। কিন্তু তিনি কোথাও ইতিহাসকে ভাঙছেন না। ইতিহাসকে ধরে রয়েছেন। ইতিহাসকে এমনভাবে ধরে রেখেছেন, মনে হচ্ছে মানুষটা ওঁর হাতের মধ্যে চলাফেরা করছে। অপূর্ব! আমি একবার না, ওখান থেকে দু তিনবার এনে পড়েছি। প্রথমবার পড়েছিলাম আমেরিকাতে, আমার মেয়ের কাছে দেখা করতে গিয়েছিলাম। ও এথেন্সে পড়ত। সেখানকার একটা লাইব্রেরিতে পেলাম বইটা। পড়ে তো আমি অবাক হয়ে গেলাম। তারপর ও যখন বিয়ে থা করের চাকরি নিয়ে গেল টোরেন্টতে, ওর ওখানে গেলাম, পরপর দুবার বইটা আনিয়েছিলাম। আর এথেন্স থাকার সময় ফ্রেঞ্চ বইটা পড়েছিলাম। জাস্ট টু কমপেয়ার। অনুবাদটাও অসাধারণ।
রাজু আলাউদ্দিন: ফ্রেঞ্চ আপনি কোথায় শিখেছিলেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: প্রথমে শিখেছিলাম কলকাতায়। সে অনেকদিন আগে। আমি তখন বি.এ পড়ি। তারপরে ডিগ্রি করার পরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। আরেকটা ডিগ্রি করলে আমি ডিপ্লোমাটা পেতাম। কিন্তু সেই সময় নকশাল বাড়ির আন্দোলন চলছে। ক্লাশ করা মুশকিল হয়ে গেছিল। আর সন্ধ্যেবেলায় তারকনাথ সেনের ক্লাশ হতো। ফলে ওই সময়ের ক্লাশগুলো করতে পারিনি। আমি মাইনে দিয়েও ক্লাশ করতে পারছিলাম না। শেষকালে আর যাওয়া হলো না। এরপর আমি একটা স্কলারশিপ নিয়ে ফ্রান্সে পড়তে গিয়েছিলাম, জার্নালিজমে, ১৯৭৯ সালে। তখন ওখানে গিয়েও আবার আমাদের ফ্রেঞ্চ পড়তে হলো।

রাজু আলাউদ্দিন: যে উপন্যাস আপনি এখন লিখছেন, মডেল হিসেবে আগের কোনো উপন্যাসের কথা কি আপনি ভেবেছেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: না ভাবিনি। আমার মডেল হচ্ছে, সত্যি কথা বলতে, অমৃতা শেরগিলের ছবিগুলো। ওর মধ্যে এত রস আছে, এত মেজাজ আছে, অদ্ভুদ অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টাল নয়েজ আছে, ছবি তো মুখ, রঙে কথা বলে, কিন্তু তারমধ্যে কতগুলো আওয়াজ আমি পাই। যেমন ওঁ নিজেকে একটা ন্যুড স্টাডি করেছে, অ্যাজ এ তাহিতি। কেন! কারণ, ওঁর খুব ফেবারিট ছিল বিখ্যাত আর্টিস্ট গগা। তো গগার ছবি দেখে দেখে ওঁর এমন একটা নেশা হয়ে গেল, ও ভাবল যে, এই পবিত্রতা এবং এই নগ্নতা– এগুলোকে মিলিয়ে যদি কিছু বার করা যায়, অদ্ভুত একটা বিস্ফোরণের মতোন। সেটা করতে গিয়ে ওর বোনের, ওখানকার মডেলদের নিয়ে এঁকেছিলেন। কিন্তু যখন তাহিতির ওই ছবিটা ওঁর মাথার মধ্যে ঘুরছে, তখন ও নিজেকেই মডেল করল। সেল্ফপোর্টেট অ্যাজ এ তাহিতিয়ান। নিজেকে নগ্নিকা হিসেবে আঁকল। ওঁর অজস্র চিঠিপত্র পড়েছি। তাতে দেখেছি, শি ওয়াজ ইউজিং এ টেকনিক। এই টেকনিকটার মাধ্যমে উনি প্রথম ভারতীয় যিনি ইস্ট এবং ওয়েস্টকে মেলালেন। পাশ্চাত্যের শিক্ষা এবং প্রাচ্যের রস ও জীবন মিলিয়ে অদ্ভুত ছবি করেছেন। এই জিনিসটা করার মধ্যে যে টেকনিকের দরকার ছিল সেটা উনি বাইরে থেকে পেয়েছেন। কিন্তু ওয়েস্টার্ন সেই টেকনিকটাকে উনি সরাসরি ব্যবহার করেননি। উনি সেটাকে মোডিফাই করেছেন। কীভাবে রঙের উপর রঙ চাপিয়ে দেশজ ভাবটা আনা যায়। আমাদের চেহারাগুলো, আমাদের শরীরের বাঁধুনি অন্যরকম। আমাদের ফিগার অন্যরকম। একে আঁকতে গেলে যে নরম লাইন তৈরি করতে হয়, সেই ব্যাপারগুলো উনি আস্তে আস্তে আয়ত্ত করেন। যেমন উনি এক জায়গায় খুব সুন্দর বলেছেন। ইউরোপের সূর্যের আলো আর ভারতের সূর্যের আলো এক নয়। ওদের সূর্যের আলোর ভেতর নরম একটা ভাব আছে। যেহেতু ওটা উত্তরে। এবং মেঘলা পরিবেশ। মাঝে মাঝে সূর্য বেরোয়। আর এখানে খাড়াভাবে বেরোয়। তো উনি বলছেন যে, ওদের গায়ের রঙ শাদা। ধবধবে ফর্সা। কিন্তু আমাদের এখানে সোনালি আভা আছে শরীরের মধ্যে। তারপরে বলছেন যে, আমাদের এখানে চারিদিকে অনেক রঙ খেলা করে। আর ওখানে খুব গ্রে ট্রাবেল করে পুরো দৃশ্যের মধ্যে। এখানে সাতরঙের তাণ্ডব মিলেমিশে আরো লক্ষ রঙ বেরিয়ে আসে। এই মজাটা ধরতে গেলে কিন্তু ওই প্যালেট এবং ওই স্ট্রোকগুলো সব সময় ওইভাবে ব্যবহার করা যাবে না। তার জন্য নরম চিন্তা, নরম রেখা অঙ্কন, নরম রঙের আলাপ বা প্রলেপ তৈরি করতে হবে। তো সেটা উনি করতে শুরু করলেন। সত্যি বলতে পাঁচ সাত বছর উনি ভারতবর্ষকে আঁকতে পেরেছেন। এরপর তো উনি মারাই গেলেন। অল্পবয়সে। কিন্তু তার মধ্যে যে কাজগুলো উনি করে গেলেন, অসম্ভব ভালো। এবং উনার শেষ কাজ যেটা, ফরম দ্য টেরেসফুল, যেটা দিয়ে আমি আমার উপন্যাস শুরু করেছি, ওই ছবিটা দেখানো হবে উনার মেজর একজিবিশনে। উনি ৫ ডিসেম্বর মারা গেলেন। ২২ ডিসেম্বর একজিবিশন হওয়ার কথা। ৫ ডিসেম্বর মারা গেলেন। তো সেই ছবিটা তখনো তিনি শেষ করতে পারেননি। আনফিনিশড। কিন্তু ওটাতে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য হাত ধরাধরি করে, মেশামেশি করে দাঁড়িয়ে আছে। অপূর্ব! এই যে এক্সপেরিন্টাল কনফিগারেশন, এটার কোনো তুলনা হয় না। এটার জন্য আমি ভাবলাম যে, সেইভাবে এটা লিখতে হবে। তো আমি মেয়ের বাড়িতে কানাডায় লেখাটা শুরু করেছিলাম। প্রত্যেকদিন লেখা হয়ে গেলে আমি ওকে পড়াতাম। একটা করে চ্যাপ্টার লিখতাম আর ওকে পড়াতাম। প্রত্যেকদিনে তো চ্যাপ্টার হয় না। হয়ত ৪/৫ দিনে একটা চ্যাপ্টার হলো তখন ওকে পড়াতাম। ও পড়ে ওর রিঅ্যাকশানগুলো জানাত। তো আমি একটা জিনিস দেখলাম, আমরা যেমন বলি, আপনি একটা দৃশ্য দেখে ছবি আঁকেন। আবার একটা দৃশ্য দেখে সেটাকে বর্ণনাও করেন। মানে আপনি শব্দের উপর নির্ভর করেন। রঙতুলি ছাড়াও আপনি শব্দের উপর নির্ভর করেন। এখন এই শব্দের নির্ভরতা দৃশ্যের উপর– এটা কিভাবে হয়, কেন হয়– এই প্রশ্নগুলো আমার কাছে আসছিল। তার কারণ, উনি মৃত্যুর মুখে এই দৃশ্যগুলো দেখছেন। ওঁর এক বান্ধবী ওঁকে দেখতে এসেছে। ওঁর খুব প্রিয় রঙ ছিল ল্যাবেন্ডার। তো তখন বলছে, আমার মনটা খুব ভালো হয়ে গেল তোকে দেখে। কারণ, তুই আজকে ল্যাবেন্ডার পরে এসেছিস। তুই কি জানিস এই রঙটা আমার খুব প্রিয় রঙ! মানে রঙের মধ্যদিয়ে ও তখন আস্তে আস্তে অন্ধকারে চলে যাচ্ছে। সেই দৃশ্যটাকে আঁকতে গেলে কিভাবে শব্দ ব্যবহার করতে হয় আই হ্যাভ এক্সপেরিমেন্টেড উইথ মাইসেল্ফ।
রাজু আলাউদ্দিন: এখান থেকে একটা প্রশ্ন আমার বেরোচ্ছে, যেহতেু আপনি উপন্যাস লিখছেন, উপন্যাসে এই নারীটিই প্রধান চরিত্র। আপনি পুরুষ হয়ে লিখছেন একজন নারী সম্পর্কে। একজন নারীকে আপনি চিত্রায়ন করছেন। আপনি এটা বোধ করেন কি না, পুরুষ হিসেবে আপনি একজন পুরুষকে যতখানি বোঝেন, পুরুষের মনস্তত্ত্ব আপনি যতখানি বোঝেন, পুরুষ হয়ে একজন নারী চরিত্রকে কি ততখানি বোঝা সম্ভব?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: এই লেখাটার ক্ষেত্রে আমার জন্য ব্যাপারটা সহজ হয়ে গিয়েছিল, কারণ ওঁর মধ্যে সাঙ্ঘাতিক রকমের পুরুষত্ব ছিল। ভীষণ পুরষালি ব্যাপার। তার কারণ, ওঁর মধ্যে কোনো ন্যাকামি নেই। দু নম্বর হচ্ছে গিয়ে, ওঁ সাঙ্ঘাতিকভাবে সব রকম মেয়েলিপনা থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: তথাকথিত মেয়েলিপনা বলতে যেগুলো আমরা বুঝি আর কি।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ। যেগুলো আমরা বুঝি। নিজের চেহারা সম্পর্কে ধারণা, আমি দেখতে সুন্দর, এসবের কোনোকিছু না। সারাক্ষণ শি ইজ এক্সপেরিমেন্টিং ওভার ফিট। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়তি নিয়ে উনি খেলা করছেন। আর মজার ব্যাপার হলো, এটা আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, নারীকে একজন পুরুষ অনেক বেশি ভালো বোঝে।
রাজু আলাউদ্দিন: ডিফারেন্সটা বোঝে বলে সে ওটাকে আরো বেশি কমপ্লিটলি ফিল করে বা দেখতে পায়?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: শুধু তাই না। তার কারণ হচ্ছে, আপনি যখন একটা বড় চরিত্র নিয়ে কাজ করেন, ইউ একচুয়ালি ইনহ্যাবিট দ্য পারসোনালিটি। ইউ টেক স্পেস আউট অব হার অর হিম টু রিসাইন্ডেড হিম অর হার। মানে আপনি যদি ওই মানুষটা না হতে পারেন বা চান, তাহলে আপনি তাকে আঁকতে পারবে না। তো এরকম কটা লোক আছে পৃথিবীতে, যে তার এমন একটা বিষয় পাবে যাকে সে ইনহ্যাবিট করতে চাইবে! যেমন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে উপন্যাস লেখা খুব কঠিন। কারণ, মহত্বের দূরত্বটা তৈরি হয়ে যায় সারাক্ষণ। যে কয়টা উপন্যাস রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে হয়েছে, কোনোটাই কিছু হয়েছে বলে আমার মনে হয়নি। বা স্বামী বিবেকানান্দকে নিয়ে যেটা হয়েছে, আমার মনে হয়নি কিছু হয়েছে।

রাজু আলাউদ্দিন: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ওই উপন্যাসটির কথা ভেবেই কি বলছেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: না তা না। আমি বলি, কিছু কিছু হয়েছে এখন। উনি তো ঠিক ওঁকে ইনহ্যাবিট করার চেষ্টা করেননি। উনি সময়ের একটা প্রেক্ষপটে উনাকে দেখেছেন প্রথম আলোতে। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় সৌখিনভাবে কিছু কাজ করেছেন। কাদম্বরীর সঙ্গে ওঁঁর সম্পর্ক ইত্যাদি ইত্যাদি এইগুলো করেছেন। তারচে অনেক কঠিন ছিল আমার কাজ। তার কারণ, এই মানুষটা সম্পর্কে চলিত কথা এত রয়েছে, তাকে বিশুদ্ধভাবে পেতে গেলে তাকেই পেতে হবে। আপনি বাইরের লোক দিয়ে তাকে বিচার করতে পারবেন না। তার কারণ, তিনি সাধারণ চোখে উশৃঙ্খল। তিনি সাধারণ চোখে নিজের জীবন নিয়ে খেলা করছেন। কোনো কিছুতে তার বাধ্যবাধকতা নেই।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে কি বলব যে উনার চরিত্র আপনাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে? এক ধরনের সুবিধা দিচ্ছে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: নিশ্চয়। নিশ্চয়। তার কারণ, আমার কৌতূহল তো সারাক্ষণ সজাগ আছে। এমন একটা চরিত্র, যার সম্পর্কে আমার কৌতূহল শেষ হচ্ছে না। সমানে ভাবতে চাইছি, এরপর ওঁ কী করতে পারে! এরপর ওঁ কী করতে পারে! এবং ওঁর ডায়রির পাতা উল্টালে নতুন নতুন জিনিস আমি পাচ্ছি। নতুন নতুন প্রেক্ষিত পাচ্ছি। জীবনের কথা পাচ্ছি। যেগুলো আমি ব্যবহার করছি উপন্যাসে। ওঁ মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করছে। বাবার সঙ্গে ঝগড়া করছে। ওঁকে বিয়ে দেয়ার জন্য ছেলে যোগাড় করে নিয়ে আসা হলো, সে রাজপুত্র, কিছুদিন থাকল, তারপর বলল, ধুর, এর সাথে থাকা যাবে না। তারপর বিদায় করে দিচ্ছে। এইসব কাণ্ডগুলো করেই যাচ্ছে। তাতে মনে হয়, এই মানুষকে ট্র্যাক করে করে লেখা যায়। যে কারণে আমার উইলিয়াম জোন্স লিখতে ভালো লেগেছিল। ঠিক উল্টো কারণে। ব্যাপারটা হচ্ছে তিনি এমন একটা মানুষ, নিজের বইপত্র, চিন্তাভাবনা, দর্শন, জ্ঞানবিজ্ঞান, এবং কাজের মধ্যে ডুবে আছেন। এই মানুষটা, দূর থেকে দেখলে মনে হবে একটা পোর্ট্রেট বসে আছে। কিন্তু তাকে ছুঁয়ে আপনি তাকে জাগাতে পারবেন না। আনলিস্ট ইউ ওয়ান্ট টু বিলিভ এন্ড হোয়াট হি ইজ বিলিভ ইন। তো ওঁর কমপ্লিট ওয়ার্কস যেটা ছিল, আমি আনিয়েছিলাম, আমাকে দিয়েছিলেন আর. কে. দাশগুপ্ত। তো সেগুলো পড়তে শুরু করলাম। এইট ভলিউমস। পড়তে পড়তে দেখলাম, লোকটা জানে না এমন বিষয় নেই। লোকটা লেখেনি এমন বিষয় নেই। এমন অদ্ভুত একটা চরিত্র। জীবনটা শুধু জ্ঞানের পেছনে ব্যয় করেছেন। আর মারা গেছেন মাত্র উনচল্লিশ বছর বয়সে। আমার যখনই মনে হতো, আমি উল্টেপাল্টে ওই জায়গাগুলো খুঁজতাম। কোথায় খাওয়া নিয়ে কী বললেন। কোথায় হিন্দুশাস্ত্র নিয়ে কী বললেন। কোথায় হিন্দু সঙ্গীত নিয়ে কী বললেন। কোথায় ভারতবর্ষের আবহাওয়া নিয়ে কী বললেন। লোকটা আইন তৈরি করলেন। হিন্দু এন্ড মুসলমান ল’স তিনি তৈরি করে গেলেন। যার উপর এখন আমাদের আইন দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমরা যেটাকে বৃটিশ পিরিয়ড ল’স বলি, কম্পাইল্ড বাই দিস ম্যান। উনি এখানে এসে পণ্ডিত রেখে সংস্কৃত শিখলেন। তার আগে উনি ফার্সি জানতেন। গ্রামার অব দ্য পার্সিয়ান ল্যাঙ্গুয়েজ উনি আমাদের এখানে আসার আগেই লিখে ফেলেছেন। তার জীবনটা সে কী আশ্চর্য জীবন! সকালবেলা ঘুম থেকে উঠছে, হেঁটে হেঁটে উনি চলে আসছেন বেঙ্গল বেঞ্চে। বেঙ্গল বেঞ্চ তখন ফোর্ট উইলিয়ামে ছিল। কদিন আগেও আমরা ওঁর বাড়ির পাশ দিয়ে গেলাম। যেখানে পরে ওয়াজেদ আলী শাহ এসেছিলেন শেষ বয়সে। সকালবেলা তিনি পণ্ডিতদের কাছে সংস্কৃত শিখতেন। তারপর বেঙ্গল বেঞ্চে চলে যেতেন জজিয়াতি করতে। ছয় ঘণ্টা আট ঘণ্টা জজিয়াতি করতেন। তারপর উনি সন্ধ্যেবেলায় সাইন্টিফিক জার্নাল এডিট করতেন আরো তিন ঘণ্টা। রাত আটটার সময় উনি জুড়িগাড়ি করে বাড়ি ফিরতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে প্রতিদিনের বেশিরভাগ সময় তার কেটে যাচ্ছে বিভিন্ন রকম কাজে।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: তার ব্যাপারে ডক্টর জনসন বলেছিলেন, সূর্যের তলাতে এত আলোকপ্রাপ্ত মানুষ আর কেউ নেই। অসাধারণ পণ্ডিত।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের সৌভাগ্য যে তাকে আমরা পেয়েছি।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের কলকাতায় উনি থেকেছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে তার বাড়িটা আমরা দেখতে পাচ্ছি। তিনি যে সোসাইটি তৈরি করেছিলেন সেটা এখনো দাঁড়িয়ে আছে। সেটা অবশ্য তখনো হয়নি। পার্ক স্ট্রিটের বাড়িটা হয়েছিল ১৮০৪ সালে। যে বছর উনাকে নিয়ে দুই ভলিউমের জীবনী লিখলেন স্যার জন শ্যোর।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তো অনেক বড় বড় মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন। তাদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। কাজ করার সুযোগ হয়েছে। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। এরপর বরিশঙ্করের উপর আপনার বই রাগ অনুরাগ লিখে আপনি ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন। বেলায়েত খাঁ সাহেব। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। আমার গানের স্বরলিপি। বর্ণ, স্বর, রঙ– তিনটা জিনিসই আপনার মধ্যে আছে। বর্ণ বলতে ভাষা। তো রবিশঙ্কর সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই। যেগুলো বইয়ের বাইরে।

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: রবিশঙ্কর খুব মজার লোক। কী রকম সেটা বলি। এই জিনিস তো আপনি বাইরে পাবেন না। সেটা হলো, আমার খুব ছবির নেশা ছিল। ভয়ের এবং ডিটেক্টিভ ছবি। আমার বিয়ের পরে একটা বিখ্যাত ছবি এসেছিল ‘ওম্যান’। খুব ভয়ের ছবি। তাতে ভূত কুকুর-ডাক ডাকত। আমার বিয়ের পরে স্ত্রীর দাদুর বাড়ি গেলাম। আইজি ছিলেন। কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন। তো ওঁর বাড়ির ছাতে উনি বিরাট ফুলের বাগান তৈরি করেছিলেন। তিনিই দেখাশোনা করতেন। এত ভালো ফুল হতো, সেটা প্রত্যেক বছর পুরস্কার পেত। ছাতে একটা ঘর ছিল, সেই ঘরে আমরা থাকতাম। ওটা আমার স্ত্রীর গানের ঘর। ছোটবেলায় স্ত্রী ফুলবাগানে গান করত। তো হলো কি, বিয়ের পর ওম্যান দেখার পর রাত্রিবেলা রাস্তায় কুকুর ডাকলেও ওঁর ঘুম ভেঙে যেত। স্ত্রী ভীষণ ভয় পেত। এই কী হলো কী হলো! আমার স্ত্রী বলেছিল, আমি দেখব না। আমি জোর করে নিয়ে গেছিলাম। ফলে যেটা হলো, সারাদিন ও ভয় পাচ্ছে। তো আমরা যখন রাগ অনুরাগ এডিটিং করছি, সব লেখা হয়ে গেছে। রবিশঙ্কর বিদেশ থেকে এসেছেন। উনি বললেন, কলকাতায় বসে এডিটিং করা যাবে না। সারাদিন লোক আসছে আর ফোন আসছে। তখন আমাদের প্রকাশক আনন্দবাজারের অরূপবাবু বললেন, এখানে করা যাবে না। সাতদিনের মতো উনার হাতে সময় আছে। উনি আমাদেরকে পাঠিয়ে দিলেন দার্জিলিং। তখন আমাদের সবে বিয়ে হয়েছে। ওঁকে সাথে করে নিয়ে গেলাম। ওখানকার খুব নামকরা হোটেলের দুটো কটেজ পাশাপাশি, উনার তখনকার সঙ্গীনী কমলাদির সঙ্গে থাকেন। পাশের কটেজে আমি আর ও থাকি। রাত্তিরবেলা ডিনারের সময় খুব গল্প হয়। তো কথায় কথায় বলা হয়েছে ও খুব ভয় পায়। কুকুরের আওয়াজ পেলে ভয় পায়। উনি নানান মজার গল্প বলতেন। ভীষণ জোকস বলতেন, তুমি ভাবতে পারবে না। রাত্তিরবেলা শুয়েছি। হঠাৎ কুকুরের ডাক শুরু হয়েছে। কুকুরের ডাক চলছেই। আমার স্ত্রী তো ভয়ে সিঁটিয়ে গেছে। ঘেমে নেয়ে গেছে। বলছে, দ্যাখ, কুকুর ডাকছে। ও আমাকে বলল, যাও, কুকুর তাড়িয়ে এসো। নইলে আমি ঘুমাতে পারব না। তো আমি দরজাটা খুলে কোথায় কুকুর দেখতে গিয়ে দেখি রবিশঙ্কর দাঁড়িয়ে আছেন। উনি কুকুরের মতো ডাকছেন ভয় দেখানোর জন্য। এমন অনেক কিছু। ভীষণ মজার মানুষ। আমরা বাগডোর থেকে গাড়ি করে দার্জিলিং যাচ্ছি। আমার স্ত্রীকে বললেন, এই তুমি তো রবীন্দ্রসঙ্গীতের মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের গান করো তো! ও বলল, কী গান করব? বললেন, ‘বাণিজ্যতে যাবই আমি যাব’ বলে উনি গাইতে শুরু করে দিলেন। ও গাচ্ছে, উনিও গলায় জোর দিচ্ছেন। আমি সামনে বসে আছি। পাশে ড্রাইভার। পেছনে উনি, কমলাদি আর ওঁ বসে আছে। উনি গাইছেন আর তাল রাখছেন সিটের মাথায়। মাথা দিয়ে তবলা বাজাচ্ছেন। একটার পর একটা গান গাইতে গাইতে আমরা চলে গেলাম দার্জিলিং। কখন পৌঁছলাম বুঝতে পারলাম না। রাত্তিরবেলা বললেন, তোমাদের আমি গান শেখাব। আমার স্ত্রী আর কমলাদিকে নিয়ে বসলেন। বাইরে সে কী দৃশ্য! পর্দা সব সরিয়ে দেয়া হলো। শহরের আলো জোনাকির মতো ঝিকিমিকি জ্বলছে। আর বলে দেয়া হয়েছে, চা কফি সব ঘরে দিয়ে যাওয়ার জন্য। সব দেয়া হয়েছে। উনি বসে বসে সেতার বাজাচ্ছেন। আর গান শেখাচ্ছেন। সে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা।
রাজু আলাউদ্দিন: ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁকে আপনি কখনো দেখেছেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: না। আমি দেখিনি। আমি দেখিনি বলতে উনি শেষদিকে তো আর আসতেন না। মাইহারে থাকতেন। আমি আলী আকবর খাঁকে দেখেছি। উনার সঙ্গে আমার অনেক সময় কেটেছে। ওঁকে নিয়েও একটা বই করার কথা হচ্ছিল। উনারও খুব ইচ্ছে ছিল। কিন্তু হলো না। উনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি নিউইয়র্ক থেকে ফোন করলাম। উনি বললেন, তুমি কোথায়? আমি বললাম, নিউইয়র্ক। বললেন, এ পাড়ায় আসা হবে? বললাম, আপনি বললেই যাব। উনি বললেন, আমার তো এখন ডায়ালাইসিস হচ্ছে। তিনদিন করে করতে হয়। তো আমি এবারে যেতে পারব কি না জানি না। আমার যা কিছু কমিটসমেন্ট, সব মিটে যাবে জানুয়ারিতে। তুমি ফেব্রুয়ারিতে আসতে পারবে? আমি বললাম, হ্যাঁ। পারব। উনি বললেন, চলে এসো। সব ঠিক হলো। উনি ওই জানুয়ারিতেই মারা গেলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: বেলায়েত খাঁ সাহেবকে দেখেছেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ দেখেছি। তাকে নিয়ে তো বই-ই করেছি।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা কৌতূহল হচ্ছে, আমীর খাঁ সাহেবকে দেখেছেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ। আমি উনার অনেক ইন্টারভিউ নিয়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেগুলো কি বই আকারে বেরিয়েছে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: না। ওটা ইংরেজিতে করেছিলাম। তখন আমি হিন্দুস্তানস চ্যানেলে চাকরি করতাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আমরা মিথ আকারে শুনি, রবিশঙ্করের প্রথম স্ত্রী অসম্ভব ট্যালেন্টেড ছিলেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: এটা নিয়ে অনেক রকম গল্পগুজব রয়েছে। কেউ বলে, রবিশঙ্কর উনাকে বাজাতে দেননি ইত্যাদি ইত্যাদি।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি সত্যি?

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: রবিদার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে এটা নিয়ে। উনি বলেছেন, আমি কখনো ওকে বলিনি তুমি বাজাবে না। বরং আমি আর ও একসঙ্গে বাজাতাম। তারপরে হলো কি, আমি পুরুষ মানুষ, আমাকে তো বাজাতেই হবে। মানে বাজানোর জন্য দৌড়ে বেড়াতে হবে। এটা তো আর ও করবে না। তো ওকে আমি বলেছিলাম যে, তুমি যদি প্রফেশনালি করো তাহলে তোমাকে স্টেজে বাজাতেই হবে। কিন্তু ওর ইচ্ছে ছিল, ওর যখন ইচ্ছে হবে বাজাবে। না হলে বাজাবে না। রেগুলার উনি স্টেজে আসবেন না। আর দ্বিতীয়ত, উনি বলেছিলেন, আমি ওকে নিয়ে একবার ঠাকুরের কাছে প্রতিজ্ঞাও করেছিলাম। প্রতিজ্ঞা হচ্ছে, তুমি বলো যে, আমার জন্য কি তুমি স্যাক্রিফাইস করছ? উনি মূর্তিতে হাত দিয়ে বলেছিলেন– না। আমার নিজেরই মনে হচ্ছে, তুমি বাজাচ্ছ, বাজাও। দেশ-দুনিয়া ঘোরো। আমার যেটুকু বাজানোর দরকার বাজাব। দরকার হলে শেখাব। কিন্তু আমি যখন তখন স্টেজে যাব না। আমি আস্তে আস্তে গুটিয়ে নিতে শুরু করব। এরপর তো আমি বাইরে বাইরে ঘুরতে শুরু করলাম। তারপর কমলা চক্রবর্তীর সাথে সম্পর্ক তৈরি হলো।
রাজু আলাউদ্দিন: তো অন্নপূর্ণাকে কি আপনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন উনি গুটিয়ে নিলেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমি দেখা করতে গিয়েছিলাম। তখন উনি তিনটে ছেলেকে শেখাচ্ছিলেন। এবং উনি তো বাইরের লোকদের সাথে দেখা করতেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই প্রশ্নটা তাকে করেননি?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: প্রশ্নই কিছু করতে পারিনি। রবিশঙ্কর আমাকে বললেন, আমি বললে তো হবে না। তার সাথে আমার কথাবার্তারও সম্পর্ক নেই। যদিও ওর থাকা-খাওয়ার যাবতীয় খরচ উনি পাঠিয়ে দেন। উনি থাকেন তখন বোম্বেতে। শেষদিকে একটা সম্পর্ক হয়েছিল। ডিভোর্স হয়েছে অনেক পরে। রবিশঙ্কর যখন ডিসাইড করলেন, তিনি ওর কাছে ফিরে যাবেন…
রাজু আলাউদ্দিন: আর দ্বিতীয় স্ত্রী?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: দ্বিতীয় স্ত্রী তো নেই। কমলা অনলি এ কমপানিয়ন। তো উনি ফিরে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তাই নিয়ে একটা তোড়জোড়ও হচ্ছিল। এবং একজনকে উনি পাঠালেন কথাবার্তা বলতে। ঠিক সেই সময় অন্নপূর্ণা বললেন, এতদিন পরে আর এটা করা যাবে না। কারণ, অন্নপূর্ণা তখন এক ছাত্রকে বিয়ে করবেন বলে স্থির করে ফেলেছেন। এতদিন ধরে বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন। ফিফটি সিক্স থেকে তখন বোধহয় এইট্টি টু থ্রি কি ফোর হবে। এতকাল ধরে উনি একা থাকেন। তখন ওঁর এক ছাত্রকে বিয়ে করবার কথা উনি ভাবছেন। এবং বললেন যে, আমি উনার কাছে পারমিশন নেব। উনি যদি ডিভোর্সটা দেন তাহলে আমি বিয়ে করতে পারি। তারপর উনি ডিভোর্সটা দিয়ে দিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: পরে বিয়ে করেছিলেন?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ। অন্নপূর্ণা বিয়ে করেছিলেন। তো আমি যখন গেলাম, আমার সাথে আমার স্ত্রীও ছিল, তখন রবিশঙ্কর বললেন, আমি একটা কাজ করছি। তখন টাটা ফাউন্ডেশন ফর আকসের ডিরেক্টর ছিলেন নারায়ণ মেনান। নারায়ণ মেনানের কাছে তুমি যাও, আমি তাকে ফোন করে বলে দিচ্ছি। যেহেতু ওঁ ওখানে শেখায়। তো আমি ফোন করলাম। উনি বললেন, হ্যাঁ, আমাকে রবিজী বলেছেন। আপনি কবে দেখা করবেন? আমি বললাম, আপনি যেদিন ঠিক করে দেবেন। উনি বললেন, ওর দেয়া সময় নয়, বরং কাল বা পরশু যেদিন ওঁর ক্লাশ থাকবে আপনি চলে আসুন, আমি তাকে পাঠিয়ে দেব। তো আমি ওকে নিয়ে গেলাম। ওর ঘরে গেলাম। উনি চা টা খাওয়ালেন। উনি আর্দালিকে লিখে পাঠালেন– আমি একজনকে পাঠাচ্ছি, শেখাবার সময় যেন ভেতরে একটু এলাউ করা হয়। আমরা গেলাম। জুতা খুলে কার্পেটের উপর বসে ক্লাশ হয়। উনাকে দেখলাম। খুব সুন্দর লাগছে উনাকে। সবুজ শাড়ি, লাল পাড়। কপালে বড় টিপ। তিনটি ছেলেকে উনি শেখাচ্ছেন। আমি আর আমার স্ত্রী একটু দূরে বসলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার বাজনা শুনেছেন কখনো?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: শুনেছি। ক্যাসেটে। সিডিতে। আছেও আমার কাছে। অসাধারণ। ওঁর একটা ডুয়েট আছে। রবিশঙ্করের সঙ্গে। অপূর্ব! অপূর্ব!!
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কি পাওয়া যায়?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: কর্মাশিয়ালি পাবে না। এটা প্রাইভেট রেকর্ডিং আমাকে দিয়েছিলেন একজন।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাকে দেবেন কপি?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: নিশ্চয় দেব। তুমি কলকাতা এলে আমাকে মনে করিয়ে দিও। রেকর্ড করে তোমাকে দেব। আমি তোমাকে আরো জিনিস দেব। রবিশঙ্করের আনরেকর্ডেড মানে বাড়িতে করা কাজ দেব। আলী আকবরের রেকর্ড দেব। বেলায়েত খাঁ সাহেবের রেকর্ড দেব। আমীর খাঁ সাহেবের গান দেব। যেটা রেকর্ড হয়নি। যাহোক, তখন আমরা বসে আছি। উনি শেখাচ্ছেন। কী সুন্দর শেখাচ্ছেন ভাবা যায় না। লোভ হচ্ছিল আমি কেন সেতার বাজাইনি। আমি কেন শিখিনি।
রাজু আলাউদ্দিন: উনার যারা শাগরেদ, তারাও তো বড় বড় পণ্ডিত!
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আরে বাপরে বাপ! নিখিল বন্দোপাধ্যায়.. কে নয়! তো তারপর উনি বললেন যে, আপনারা কোথা থেকে আসছেন? আমি বললাম কলকাতা থেকে। উনি বাংলায় বললেন, কলকাতা থেকে.. তো এখানে? আমি আর বললাম না যে রবিশঙ্করের বায়োগ্রাফি লেখার জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি বললাম, এখানে এসছিলাম আপনার কর্তার সাথে দেখা করতে। কথায় কথায় আপনার কথা উঠল। তখন ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করে যাই। উনি বললেন, হ্যাঁ, উনি তো বড় শিল্পী। মস্তবড় আর্টিস্ট। ওঁর সাথে যখন দেখা করছেন, কথা বলছেন, তাহলে আমার কাছে আর কী পাবেন! সে তো অনেক বড় শিল্পী!
রাজু আলাউদ্দিন: বিনয় ছিল সম্ভবত।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: বিনয় না ভালোবাসা জানি না।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: ভালোবাসা ছিল। সাঙ্ঘাতিক ভালোবাসা ছিল।

শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: তো উনি বললেন, উনি তো বড় শিল্পী। ওর সাথে যখন কথা বলছেন আমার কাছে আর কী পাবেন! আমি বললাম, না, আপনার সাথে দেখা করাটাই তো অনেক বড় ব্যাপার।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: রবিদা এমন মানুষ ছিলেন, ওঁকে ভালো না বেসে পারা যায় না।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: অসাধারণ মানুষ আদারওয়াইস। আর এত জ্ঞানী লোক! সাঙ্ঘাতিক মেমোরি। ডিসিপ্লিনড। দেখতে সুন্দর। মাদকতাময় কণ্ঠস্বর। অপূর্ব গাইতেন। সবমিলিয়ে একটা অদ্ভুত ভালো মানুষ। এই একটা জিনিস। আর একটা জিনিস হলো, ওঁর সঙ্গে কাজ করে অনেক আনন্দ পেয়েছি। বই যা হয়েছে, হয়েছে। মানুষ ভালো খারাপ একটা কিছু বলবে, মানুষের বিচার। কিন্তু যে সময়গুলো ওঁর সঙ্গে কাটিয়েছি, দোস সাম অফ দ্য বেস্ট টাইম অফ মাই লাইফ।
রাজু আলাউদ্দিন: আমীর খাঁকে আপনি দেখেছেন বললেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমীর খাঁ তখন কলকাতায় আসতেন। আমি তার অন্ধভক্ত ছিলাম। যেখানেই ওঁর প্রোগ্রাম হতো, আমি যেতাম। তো একবার হলো কি, অফিস থেকে আমীর খাঁ সাহেবের একটা ইন্টারভিউ করতে বলল। আপনি আমীর খাঁ সাহেবের এত প্রোগ্রাম শোনেন, তার একটা ইন্টারভিউ করেন। আমি বললাম, দেখি কী করা যায়। সে সময় একটা উর্দু নিউজ পেপার বেরত কলকাতা থেকে। এখনো হয়ত বেরোয়। সেই মানুষটা মারা গেছেন। ইয়াং ছিলেন। অল্প বয়সে মারা গেছেন। তার বাড়িতে উনি উঠতেন। তাকে আমি চিনতাম। চিনতাম মানে গানের সূত্রেই চিনতাম। এবং আমীর খাঁ সাহেবের খুব কাছের লোক বলে চিনতাম। আমীর খাঁ সাহেবের একটা প্রোগ্রাম হয়েছিল সেখানে উনি গিয়েছিলেন। আমি তাকে আলাদা করে ডেকে বললাম, আমি আমীর খাঁ সাহেবের একটা ইন্টারভিউ নিতে চাই, আপনাকে ব্যবস্থা করতে হবে। উনি বললেন, কোনো অসুবিধা নেই। আপনি কি জানেন, পরশু দিন খাঁ সাহেবের জন্মদিন? আমি বললাম, তাই নাকি! বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু উনি বলতে বারণ করলেন। লোকেরা হইচই করবে। মিষ্টির প্যাকেট ফ্যাকেট, মালা ফালা নিয়ে যাবে। বরং আমীর খাঁ সাহেব বলেছেন, ওসব বরং কিচ্ছু হবে না। বাড়িতে যে কয়জন আসবে, তাদের জন্য তুমি রান্না করবে। বিরিয়ানি, চা, পরোটা ইত্যাদি ইত্যাদি। সবাইকে নিয়ে খাওয়ানো হবে। আর যদি পরিবেশ হয় আমি তাদেরকে গান গেয়ে শোনাব। আমার কপালটা এত খারাপ, আমি ইন্টারভিউটা পেলাম কিন্তু আমার নাইট ডিউটি ছিল, আমি তখন একটা নিউজ চ্যানেলে কাজ করি। আমার উপর রাত্তির বেলা অনেক কাজ থাকত। এডিট করা। এটা করা। সেটা করা। তবু আমি গেলাম। আমি সাড়ে ছটা থেকে সাড়ে আটটা, দু ঘণ্টা বসে বসে ইন্টারভিউ করলাম। উনি আমার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, বেটা, তুমি থাকবে না রাতে? আমি বললাম, আপনি কখন গাইবেন? বললেন, সে তো আমি জানি না। আগে লোকজন খাওয়া দাওয়া করুক। তারপরে। আমি বললাম, আমি তো পারব না। আমার অফিস আছে। উনি বললেন, বেটা তাহলে তুমি খেয়ে যাবে। সেই সময় উনি বললেন, আজকে আমার জন্ম দিবস। আমি কাউকে বলিনি। আমার কিছু বন্ধুবান্ধব, শাগরেদরা আসবে। তারা ভীষণ ভিড়ভাট্টা করে আমাকে ক্লান্ত করে দেয়। এই বলে তিনি যেটা করলেন, সেটা আরো আশ্চর্য ব্যাপার। খাবারগুলো সাজানো ছিল। লম্বা টেবিলে সাজানো ছিল। তিনি বললেন, তুমি কী খেতে ভালোবাসো? আমি তখন বিরিয়ানি খাব না। কারণ, বিরিয়ানি খেলে অফিসে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ব। আমি বললাম, রুটি পরোটা আর মাংস খাব। উনি আমাকে নিয়ে গিয়ে নিজে প্লেটে খাবার তুলে প্লেটটা সাজিয়ে আমাকে দিলেন। আমার সঙ্গে ছবি তুললেন অজিত নামে এক ক্যামেরাম্যান। সিনিয়র। চার পাঁচ বছরের মধ্যে রিটায়ার্ড করে গেলেন। ডেপুটি চিফ ছিলেন। উনি আমাকে বললেন, শঙ্করলাল, তোমাকে দেখে আমার খুব হিংসে হচ্ছে। উনি নিজেও খুব গানবাজনা ভালোবাসতেন। উনি নিজেই আমার সঙ্গে যাবেন বলেছিলেন। যাওয়ার কথা ছিল আরেকজনের। রকিববাবুর। উনি বলেছিলেন, না রকিবদা, তুমি যাবে না। আমি যাব। আমি আমীর খাঁ সাহেবের সঙ্গে দেখা করব। উনি গান শিখেওছিলেন। তো উনি বললেন, তোমাকে কী ভালোবাসছেন! আমার কী ভালো লাগছে! এটা কি ভাবা যায়! এরকম একটা লোক, মহাপুরুষ। আমি প্রণাম করলেও মনে হয় জীবন সার্থক। আর তিনি পিঠে হাত দিয়ে তোমাকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। তারপর আমীর খাঁ সাহেব উনাকে বললেন, আপনি খান। এতক্ষণ পরিশ্রম করছেন। আমি দেখলাম, বেচারা একটা না দুটো পরোটা নিয়েছে। দুটো মাংস নিয়েছে। কিন্তু মুখে কিছু নিচ্ছে না। ওঁ শুধু দেখেই যাচ্ছে খাঁ সাহেবকে।
রাজু আলাউদ্দিন: মুগ্ধতা।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: আমি খাচ্ছি, ওঁর সাথে গল্প করছি। উনি নানা রকম সব গল্প বলছেন। আমাকে বললেন, জানো, আমার একটা অসুবিধা হয়ে গেছে। আমি বললাম, কী? বললেন, সিনিয়র আর্টিস্ট হয়ে গেছি, তাই সব জলসায় আমাকে শেষেও গাইতে বলে। শুরুতেও গাই। সকালবেলা হয়ত ললিতা গাইছি, গুণকেলী গাইছি, ভৈরবী বা ভাটিয়ালী গাইছি; কিন্তু সন্ধ্যে লাগলে গাইতে পারছি না। সন্ধ্যের প্রোগ্রামে আমার মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। আরেকটা খুব মজার কথা বললেন। গান সবচে ভালো হয় কখন জানো তো? সন্ধ্যেবেলা। ওই সময় খিদেটা পেটে চাগান দেয়। খিদে পাচ্ছে কিন্তু তুমি খাচ্ছ না। পেটটা খালি আছে মানে শরীরটা ভালো আছে। আর একদম ভোরবেলা। তার কারণ, ঘুম থেকে যখন তুমি উঠলে, গলাটা পরিষ্কার থাকে। কিন্তু তোমাকে ঘুম থেকে উঠে গাইলে হবে না। তোমাকে ঘুমোতে ঘুমোতে গাইতে হবে। আবার গাইতে গাইতে জাগতে হবে। না হলে ললিত তুমি গাইতে পারবে না। এই কথার মানে তখন আমি বুঝিনি। যদিও এগুলো লিখেছিলাম। কিন্তু এখন আমি মানেগুলো বুঝতে পারি। মানে রাগ গাইবার জন্য তোমাকে রাত্রি থেকে পাঁয়তারা করলে হবে না। তোমাকে জীবনের অঙ্গ হিসেবে নিতে হবে। এগুলো আমি লিখেছিলাম। আরেকটা খুব ভালো কথা বলেছিলেন। উনি ফাইভ ফাইভ সিগারেট খেতেন। আর ড্রিঙ্ক করছিলেন। একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছেন আর আমার সাথে গল্প করছেন। গবগব করে খাচ্ছেন না। শেষ হচ্ছে আবার একটু নিচ্ছেন। এটা ওই দিনের জন্য কি না জানি না। ওঁর শাগরেদরা বলতে পারবে। আমি বললাম, আপনি এই বয়সে সিগারেট খাচ্ছেন। গলার অসুবিধা হয় না? উনি বললেন, গলার যা কিছু ক্ষতি, হয়ে গেছে। উনার ফ্যারেঞ্জাইটিস হয়েছিল। উনার আগে তিন সপ্তক গলা দৌড়ত। তুমি বইজু বাওরা ছবি দেখেছ? বইজু বাওরাতে তানসেনের গলায় গেয়েছিলেন আমীর খাঁ সাহেব। আর বইজু বাওরার গলায় গেয়েছিলেন ডি ভি পালুস্কার। ছবিটা বইজু বাওরাকে নিয়ে। ছবিতে দেখাতে হবে বইজু বাওরার সাথে গাইতে গাইতে তানসেন হেরে গেলেন। বইজু বাওরা জিতবেন। তো ওই সময় আলোচনা হয়েছিল তানসেনের গলায় আমীর খাঁ গেয়ে হেরে গেল। অত সুন্দর গেয়েও হেরে গেল! তাকে আরো খারাপ গাওয়াতে হতো। তা না হলে অত বড় শিল্পী নিয়েছে কেন! তো আমি যখন সিগারেটের কথা বললাম। উনি বললেন, ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে। আমার ফ্যারেঞ্জাইটিস হয়েছিল। উনি তিন সপ্তক গাইতেন। ফ্যারেঞ্জাইটিস হওয়াতে উপর থেকে কমিয়ে নিলেন আর তরা থেকে উঁচিয়ে নিলেন। প্রাক্টিক্যালি তরার অংশ নিয়ে উপরের অংশ নিয়ে দুটো সপ্তক গাইতেন। মানে উপরের সপ্তকের আধখানা, তরা সপ্তকের আধখানা আর মাঝের সপ্তকটা। উনি মধ্যম থেকে ধরতেন। মানে প্রথম যে আওয়াজটা লাগাতেন ওই ইয়েতে লাগাতেন। কারণ, গলাটা ওইখানে যেত। প্রথমেই একবারে নাদের আওয়াজ আসত না। চারটে আওয়াজ ধরার পরেই উনার গলাটা জমে যেত। খুলে যেত। তো উনি বললেন, আমার যা ক্ষতি হওয়ার হয়ে গেছে। কিন্তু আমি যখন কমিয়ে নিলাম এবং সাইজ করে নিলাম, তখন তোমাকে আর কী বলব ভাই, অতটুকুর মধ্যে আমি দেখলাম, তারও আমি তল পাচ্ছি না। মানে ওইটার মধ্যে যে কত রহস্য আছে…. শুধু গলাবাজি করে তো আর গান হয় না। স্বরের মধ্যে ঢুকতে হয়। তো উনি বললেন, আমি তো এর ভেতর থেকে বেরোতেই পারিনি। তাই আমার সিগারেট খাওয়া কী আর না খাওয়া কী! আমি তো গলাটাকে ওইভাবে রেখে দিয়েছি। ওখানেই ধরে রেখে দিয়েছি। সিগারেট খেলে আমার গলাটা বেশি গরম থাকে। ভালোই লাগে। আর এখন তো আমার বয়স হয়েছে। এখন শুধু গলা দিয়ে গাইলে হয় না। মগজ দিয়ে গাইতে হয়। সিগারেট খেয়ে মগজ গরম করতে হয়।

রাজু আলাউদ্দিন: ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সম্রাট বলা হয় আলাউদ্দীন খাঁকে। আপনার কি মনে হয় তিনি সঠিক মূল্যায়ন পাচ্ছেন? আমরা তো জাস্ট ওরাল ফর্মে বলি যে উনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সম্রাট।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: মূল্যায়ন করতে আরো একশ বছর লাগবে। সবচে’ ভালো মূল্যায়ন করেছেন আলী আকবর সাহেব। আর রবিশঙ্কর যা আলোচনা করেছেন ওঁকে নিয়ে, অপূর্ব! উনি তাকে দ্বিতীয় পিতা মনে করতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: বাবাই তো বলতেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: বাবাই বলতেন। উনি প্রথমে ঈশ্বরকে ডাকতেন। তারপর আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবকে ডাকতেন। তারপরে উদয়শঙ্করকে ডাকতেন। উনার জীবনী রাগ অনুরাগ ওইভাবেই তো শেষ হয়েছে। উনার একটা বই আছে স্মৃতি। ওটা সঙ্গে করে আনিনি। তোমাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করব। বইয়ে বেনীমাধবের ধ্বজা থেকে আইফেল টাওয়ার বলে একটা লেখা আছে। ওটা দিয়েই শুরু হয়েছে স্মৃতি। সেটা যদি তুমি পড়, তার ভেতরে আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের অপূর্ব নিটোল এক ছবি পাবে। আর আলী আকবর সাহেব ওঁর বাবাকে নিয়ে এত সুন্দর কাজ করেছেন, আলী আকবর সাহেব মারা যাওয়া পরে একটা অনুষ্ঠান হয়েছিল নন্দনে। আলী আকবর খাঁ সাহেব একটা ছবি করিয়েছিলেন, তাতে ওঁর বাবাকে নিয়ে যা বলেছেন! অপূর্ব একটা ব্যাপার।
রাজু আলাউদ্দিন: আলাউদ্দীন খাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র আছে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ আছে। খুব ভালো তথ্যচিত্র আছে। দারুণ! ওটা ইন্ডিয়ান গভমেন্ট করেছিল। ইনফরমেশন ডিপার্টেমেন্ট থেকে। তুমি ডাউনলোড করে দেখতে পারো। ইন্টারনেটে এসে গেছে। তুমি ইউটিউব খুললেই পেয়ে যাবে।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি কেন বললেন যে ১০০ বছর লাগবে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: রবিশঙ্কর উনার ব্যাপারে বলেছেন, উনি নিজে ভিখিরির মতো বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষা নিয়েছেন। যাকে ওস্তাদ মেনেছেন তার চাকরের কাজ করছেন। তার রাঁধুনীর কাজ করছেন। তার কাপড়চোপড় কেচে দিচ্ছেন। আমেদ আলী খাঁর কাছে তাই করেছেন। নুরু গোপালের কাছে তাই করেছেন। তারপর উনি চলে এলেন কলকাতায়। সেখানে স্বামীজীর খুড়তুতো ভাই হাবুদত্ত, তিনি নাটক করতেন, তার কাছে গিয়ে উনি বললেন, আমাররে একটা কাজ দেন। তো বললেন, ঠিক আছে, তুমি আমার এখানে লেগে যাও। হাবুদত্ত তাকে ছাড়তে চায় না। কিন্তু তিনি দেখলেন এখানে বসে থাকলে হবে না। নতুন করে অন্য কোথাও শিখতে হবে। এরিমধ্যে ওখানকার এক খৃস্টান ভদ্রলোক, তার ভায়োলিন শুনে অবাক হয়ে গেলেন। এত ভালো ভায়োলিন বাজায়! এটা তো শিখতে হবে। তার কাছে গিয়ে উনি ভায়োলিনের চর্চা করলেন। তার রেকর্ড আছে। সাঙ্ঘাতিক! অপূর্ব রেকর্ড! ভায়োলিন বাজাচ্ছেন, কিন্তু মাথার মধ্যে একটাই জিনিস আছে, সেটা হচ্ছে সরগম। কী করা যায়! তখন উনি গেলেন উজির খাঁর কাছে। সব জায়গা থেকেই নিজেকে ঝালাই করেন। আর কীভাবে যে শিখেছেন, তার একটা ইতিহাস তৈরি হয়েছে। উনার শিক্ষাটাই একটা ইতিহাস। যে যা বলছেন, শিখছেন। একটা কথা আছে। সেটা সত্যি কি মিথ্যা জানি না। এটা আমি শুনেছিলাম আমার এক মাসতুতো বোনের কাছে। সরগম যখন উনি শিখছেন, তখন গুরু বলেছিলেন, আমি তো আমার রক্তের বাইরে কাউকে শেখাই না। তুমি তো আমার বাড়ির জামাই নও। তোমার মুখ পড়ে আছে পূর্ববঙ্গে। আমি তোমাকে শেখাতে পারি, যদি তুমি বাঁহাতে বাজাও। তখনই উনি বাঁ হাতে বাজাতে শুরু করলেন। আমি জানি না এটা সত্য না মিথ্যা। কিন্তু এই গল্পটা আছে। তখন উনি বললেন, ঠিক আছে, আমি ডানহাতে প্লাক করব আর বাঁহাতে সুর করব। এইভাবে তিনি বহু জায়গা থেকে শিখেছেন। রবিশঙ্কর বলছেন, দেখ, উনি এত জায়গা থেকে শিখলেন, সুর শৃঙ্গার আলাপ শিখে এলেন, প্রতিষ্ঠানের মতো জায়গা থেকে, তাদের কাছ থেকে সরদের তালিম নিয়ে এলেন। তারমধ্যে গান শিখলেন। সেই নুরু গোপালের আমল থেকে। ভায়োলিন শিখেছেন। সব শাস্ত্রগুলো তোলপাড় করে চর্চা করেছেন। আমরা তো এত জায়গায় যাইনি। আমরা একটা লোকের ভেতর সব পেয়ে গেছি। একটা লোকের মধ্যে। তিনি আমাদের সুর শৃঙ্গার আলাপ শেখাচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: তিনি ভারতীয় সঙ্গীত শাস্ত্রের এক অসামান্য ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: সবদিকের গুরু। যার জন্য সুর শৃঙ্গার আলাপ যখন করেন রবিশঙ্কর, অপূর্ব! ধ্যান দিয়ে শিখতে পেরেছেন একটা লোকের কাছ থেকে। উনি তো জানতেন। নাড়িনক্ষত্র জানতেন। উনি তো নিজে পারফর্মার হওয়ার জন্য করেননি। উনি শেখাবার জন্য তৈরি হয়েছেন। উনি যদি পারফর্মার হওয়ার জন্য করতেন তাহলে উনি ছাত্র বানাতেন না। উনি বাজানোর ভেতরেই থাকতেন। এককালে খুব নামকরা বাজিয়ে ছিলেন। বড় বড় জায়গাতে বাজিয়েছেন। লোকেরা প্রশংসা করেছে, মাথায় তুলে নেচেছে। কিন্তু উনি ঠিক করলেন, না, আমি আশ্রম করে এখানে শেখাব।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার মনে হয় এটা ভালো হয়েছে। একেবারে ছড়িয়ে গেছে শিক্ষাটা।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: হ্যাঁ অবশ্যই। একজন গুরু তো হতে হবে। শিল্পী তো সবাই হতে চাই। শিক্ষক হতে কে চায়!
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু একশ বছর কেন লাগবে এটা কিন্তু আপনি বললেন না।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: তার কারণ শিল্পী কী করে হয় এই রুলস আমরা জানি না। একই লোকের কাছে শিখে, হয়ত আরো বেশি সময় ধরে শিখেও সবাই তো আর রবিশঙ্কর হচ্ছে না। আলী আকবরও হচ্ছে না। বা অন্নাপূর্ণাও হচ্ছে না। আবার এটাও সত্যি যে একই রকম সুযোগ সুবিধা পেয়ে, একই রকম পরিবেশ, একই রকম শিক্ষক, একই রকম গানবাজনা থেকেও তো এস পার ইওর ট্যালেন্ট। শিক্ষক হতে গেলে কী হতে হয়, এই রহস্যটা উনাকে চর্চা করে জানা যেতে পারে। একটা মানুষ, হু ওয়াজ বর্ন টু বি এ টিচার, এটা মারাত্মক ব্যাপার। আমি ছোট্ট একটা উদাহরণ দিই: আমার ফেবারিট দার্শনিক ভিটগেনস্টাইন। উনি যখন মারা গেলেন ৫১ বছর বয়সে, তখন উনার প্রকাশিত বই মাত্র দুটো। কিন্তু উনি মারা যাওয়ার পরে ওঁর ছাত্রছাত্রী, যারা কেমব্রিজে ওঁর ক্লাশ করেছে, তারা লং হ্যান্ডসে ওঁর নোটস নিত। আর উনি ওখানে চিন্তা করে করে বক্তৃতা করতেন। উনার অদ্ভুত ব্যাপার ছিল। উনি কোনো নোটস নিয়ে গিয়ে বা মুখস্ত করে বক্তৃতা করছেন তা কিন্তু না। উনি ওদের সামনে দর্শন চিন্তা করতেন। বলতেন। ওরা লং হ্যান্ডসে নোটস নিত। তা থেকে ব্রাউন বুক আর ব্লু বুক বলে মস্ত মস্ত দুখানা খণ্ড তৈরি হয়েছিল। এবং এখনো ফান্ডামেন্টাল অব ম্যাথম্যাটিকস, ফান্ডামেন্টাল অব ফিলোসফি, এথিক্স- ওঁর ছাত্ররা যত নোটস নিয়েছিল সেগুলোকে জড়ো করে, এনালাইসিস করে, এডিট করে দশ খণ্ড বই তৈরি হয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাই নাকি!
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: তো তার ছাত্ররাও পরবর্তীকালে বড় বড় দার্শনিক হয়েছে। এটা তো বর্ন শিক্ষক ছাড়া হতে পারে না। শুধু দার্শনিক হলে হবে না। উনি যেটা বলে যাচ্ছেন, সেটা তো শেখাবার জন্যই বলে যাচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আমি উনার এই পরিচয়টা জানতাম না।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: উনি কেমব্রিজে বলে যাচ্ছেন ছাত্ররা আপন মনে লিখে যাচ্ছে। এইটা ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ সাহেবের সাথে মিলে গেছে। উনি আপন মনে শিখিয়ে গেছেন। আর ওঁ বিশাল রহস্যময় লোক। ওঁর ওপরে ছোট্ট একটা বই লিখেছিলেন, ওঁকে ইন্টারভিউ করে, শুভময় ঘোষ ‘আমার কথা’। ওটার ভূমিকা রবিশঙ্কর লিখেছেন। সেটা লেখানোর জন্য আমি বইটা নিয়ে বম্বেতে গিয়েছিলাম ওঁর কাছে। সেখানে উনি লিখেছেন, কেউ ভুল করলে আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব ভীষণ রেগে যেতেন। একদিন এমন রেগে গিয়ে বললেন, যাও, চুড়ি পরে বসে থাকো। তোমায় বাজনা বাজাতে হবে না। আমার এত মন খারাপ হলো, চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। আমি সেদিনই ঠিক করলাম, আজই চলে যাব। বাকশো পেটরা গুছিয়ে হাঁটা দিলাম স্টেশনের দিকে। আলী ভাই এসে আমায় ধরল। একি করছ একি করছ! বাবা তো আমাকে মারধোর করে। তোমাকে তো কিছুই করেনি। মুখে বলেছে তাতেই এত রাগ করছ কেন! জোর করে ধরে নিয়ে গেল। উনি জানতেন, বড় বাড়ির ছেলে। নামকরা লোকের ছেলে। এরপর থেকে ওঁর উপর রাগ করলে উনি বাইরে গিয়ে কুকুরকে মারধোর করতেন। বা অন্য কাউকে, অন্য কোনো ছাত্র রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, কোনো দোষই করেনি, তাকে গিয়ে একটা চড় মেরে দিলেন। এসব করে রাগটাকে ঝরাতেন আর কি। যাতে ওঁকে মারতে না হয়। তো উনি বললেন, এই পারফেকশনিজম না থাকলে শিক্ষক হওয়া যায় না। এখনকার শিক্ষকরা তো কেয়ারই করে না। তুমি গাও। গাইলে তো পারলে না পারলে নাই। উনি একেবারে বসিয়ে দিতেন এই জিনিসটার মানে এই। আরেকটা হচ্ছে নলেজ। এত জ্ঞান, রাগ সঙ্গীতের এত প্রগাঢ় জ্ঞান, জ্ঞানের সাগর। তাকে রাতারাতি ব্যাখ্যা করা তো সম্ভব না। আমরা রবিশঙ্করের ভার্সনটা পেয়েছি। আমরা আলী আকবর খাঁ সাহেবের ভার্সনটা পেয়েছি। নিখিল বন্দোপাধ্যায়ের ভার্সনটা পেয়েছি। ওঁর মেয়েও নিশ্চয় কোথাও না কোথাও একটা ভার্সন রেখেছেন। এরপরে আরো অনেকেই তার সম্পর্কে বলবে। তখন সবগুলো এক জায়গায় জমা করে পূর্ণ মানুষটা সম্পর্কে জানা যাবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এই আশঙ্কা কি তৈরি হয় না যে সময় যত পার হবে অনেকেই মারা যাবেন। তখন এই মূল্যায়নগুলো তো হারিয়ে যাবে। সম্ভাব্য যে মূল্যায়ন, সেগুলো হারিয়ে যাবে না?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: থাকছে তো। কিছু কিছু তো থাকছে। তারপরে এরা যা বাজাচ্ছে, সেটা তো ওঁরই বাজনা বাজাচ্ছে। ওঁরই চিন্তার বাজনা বাজাচ্ছে। কাজেই সেগুলোও এনালাইস হবে।


রাজু আলাউদ্দিন: মানে ভবিষ্যতে যারা প্রত্যক্ষভাবে দেখেনি বা শোনেনি তারা মূল্যায়ন করতে পারবে?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: পারবে। কারণ, এদের ভার্সনসগুলো আছে, এদের বাজনা আছে। ইতিহাসটা তো রয়েছে।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: কেন, আমরা রবীন্দ্রনাথের মূল্যায়ন করছি না? আমর তো কেউ দেখিনি। এখন উনার মূল্যায়ন যা হচ্ছে, আরো বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। আরো বেশি করে মানুষ নিচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: লেখকের একটা সুবিধা হলো, ওটা রিটেন থেকে যায়। কিন্তু ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁর যেগুলো প্রকাশিত হয়নি, শুধু মানুষেরা শুনেছেন, সেগুলো তো হারিয়ে যাবে।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: নজরুল সাহেবও তো তাই। উনার গানের তো কোনো স্বরলিপি নেই। কিন্তু উনার লেখা তো অনেক। সেগুলো তো বাজারে আরো বেশি করে চর্চা হচ্ছে। সেগুলোকে রিসার্চ করে আরো বার করা হচ্ছে। সেগুলো নিয়ে মানুষ আরো বেশি আলোচনা করছে। ক্লাসিক্যাল মিউজিকের আলোচনার পরিধিটা ছোট। ক্লাসিক্যাল মিউজিক, যারা শিক্ষিত, যারা এই মিউজিক বোঝে, তারাই পড়ে। আর লাইট মিউজিক, যেগুলো শুনে শেখা যায়, সেগুলো নিয়ে চর্চা একটু বেশি হয়। কিন্তু তাই বলে ক্লাসিক্যাল মিউজিকও যে হবে না তা তো না। শুধু মিউজিক কেন, সবক্ষেত্রেই মনীষীদের নিয়ে চর্চা হয়। যত দিন যাবে তত বাড়বে এই চর্চা। লিজেন্ডদের কখনো মৃত্যু হয় না। তাদের কাজ বেঁচে থাকে।
রাজু আলাউদ্দিন: তাহলে কোনো আশঙ্কা নেই।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: না নেই। ইউ হ্যাভ টু গেট দ্য রাইট পারসন টু ডু ইট। যারা বুঝবে, ভাবনা চিন্তা করে বার করতে পারবে এমন লোক লাগবে।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: ক্লাসিক্যাল মিউজিক থাকলে আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব থাকবেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: উনি আমাদের যুগের তানসেন। আরেকটা জিনিস উনি করে গেছেন, খুবই মজার, উনি দেখিয়ে গেছেন, যেটা আর কখনো রিপিটেড হবে না; আশ্রমের শিক্ষা এই যুগেও সম্ভব। না হলে এই লোকটা কলকাতায় ছিলেন, দিল্লী বম্বে কোথাও না গিয়ে সব ছেড়েছুড়ে চলে গেলেন মাইহারে। সেখানে চুনো পাথরের জমি। চাষ হতো না। উনি নিজে কোদাল কুপিয়ে চুনো পাথরের মধ্যে ঘাস গজিয়েছেন। এবং চাষ করেছিলেন। আর অন্যদিকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে গানবাজনার চাষ করে গেছেন। ওটা এগ্রিকালচার এটা কালচার। দুটোই চাষ। এভাবেই একটা আশ্রম তৈরি করেছিলেন।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারটাও তাই খানিকটা। শান্তিনিকেতন। উনি তখনো রবীন্দ্রনাথ হননি, শান্তিনিকেতনকে তো কেউ জানতই না। বীরভূমের একটা রুক্ষ্ম গ্রামে গিয়ে উনি ফল ফলালেন। সেটা তো এখন তীর্থক্ষেত্র।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: উনি কোনো পয়সা নিতেন না। বৈদিক যুগের মতো। শাগরেদরা সারাদিন গুরুর কাছে থাকবে, শিখবে, এরপর শেখাবে।
শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের স্ত্রী: এর দ্বারা বোঝা যায় আশ্রমের শিক্ষাটাই আসল। বাকি সব ফ্যাশন। ব্যবসা।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার কেন জানি মনে হয় শঙ্করদা, অমৃতা শেরগিলকে নিয়ে আপনি উপন্যাস লিখছেন, আমার ধারণা, সঙ্গীতে আপনার যে পরিমাণ দখল, যতটা জানেন, সেদিক বিবেচনায় আপনি কি আলাউদ্দীন খাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না?
শঙ্করলাল ভট্টাচার্য: দুটো কারণে করি না। সেটা হলো, বেলায়েত খাঁ সাহেবের একটা কথা আমার মনে পড়ল। একদিন আমি উনার সাথে কাজ করছিলাম। সে সময় উনি কল্যাণের একটা অংশ গেয়ে শুনিয়ে বললেন, আমি যতই চেষ্টা করি, ফাইয়াজ খাঁ সাহেব কিভাবে এটা গেয়েছেন, এটা তোমাকে বলে বোঝাবার যতই চেষ্টা করি, গেয়ে শোনানোর ধারেকাছে পৌঁছবে না। বলে উনি গেয়ে শোনালেন। বললেন, এই যে আমি গেয়ে দিলাম। এটা একটা ছায়া মাত্র। কাজেই আমার যেটা মুখে বলার এবং লেখার চেষ্টা করি, সেটা একটা ধারণা মাত্র উনি আসলে মিউজিকের কী ছিলেন। আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব কী ছিলেন এটা উপন্যাস করে লেখা খুবই ডিফিকাল্ট। কারণ হচ্ছে, প্রথমত যাদের সাথে আমার কথা বলার দরকার ছিল সেই লোকগুলো তো নেই। আলী আকবর খাঁ সাহেব নেই। আলাউদ্দীন খাঁ সাহেব নেই। অন্নপূর্ণাদি হয়ত এখন আর কথাই বলবেন না। প্রচুর বয়স হয়েছে। নিখিলদা নেই। হরিপ্রসাদও বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। উনি অবশ্য তাকে নিয়ে একটা বই লিখেছেন। সেখানে যতটা পেরেছেন তাকে নিয়ে কিছু কথা বলেছেন। ঘটনা হচ্ছে যে, উপন্যাস লিখতে গেলে যে উপাদান দরকার, সেগুলো নেই। ওঁর গান নিয়ে চর্চা করা যাবে। কারণ, সেগুলো ডিরেক্টলি রয়েছে। কিন্তু ওই গান থেকে যে ছবি বা শব্দ বা বাক্য আসতে পারে তার জন্য যে উপাদান দরকার সেগুলো নেই। অমৃতা শেরগিলকে নিয়ে লিখতে সুবিধা হলো ও নিজে ব্যাপারগুলো সব লিখে গেছে। আর ছবিগুলো চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.