কবি শামসুর রাহমানকে মনে করে

আলতাফ হোসেন | ১৭ আগস্ট ২০০৮ ১২:৩০ অপরাহ্ন

rahman-01.jpg
শামসুর রাহমান (২৩/১০/১৯২৯ — ১৭/৮/২০০৬), ছবি: হাসান বিপুল, ২০০৫

দু’বছর আগে আজকের দিনে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন কবি শামসুর রাহমান। গতকাল কাগজে তাঁর ছবিসহ সে খবরটা দেখে তাকিয়ে থাকি সেদিকে অনেকক্ষণ। সবে এই দু-লাইন লিখেছি আমার ডায়েরিতে, নিজেরই জন্য লেখা, রাত সাড়ে দশটা যখন, তারিখ ১৬ আগস্ট, ০৮, আর্টস সম্পাদকের ফোন। দু’এক কথার পরেই বললেন, ‘শামসুর রাহমান সম্পর্কে একটা লেখা দিন, কাল সকালের মধ্যে।’ বললাম, ‘আমি তো এ ধরনের
—————————————————————–
ভাষার বদল হয়েছে, ছন্দের কুশলতা বেড়েছে, কবিতা হয়েছে মুখের ভাষার আরও কাছাকাছি, বিষয়ে এসেছে কতই না বৈচিত্র্য। এবং এসবই বিবর্তিত হয়েই চলেছে। আমাদের দেশে এ বিবর্তনের ছাপ কবিতায় যতটা পড়ার কথা ততটা কিন্তু পড়েনি। এ কথা মনে হলে আমাদের প্রধান কবিদের কথাই মনে পড়ে। তরুণ কবিরা তো অগ্রগামীদের দ্বারাই প্রভাবিত হন।
—————————————————————–
লেখা লিখতে পারি না। তা ছাড়া তাঁর সম্পর্কে লেখার উপযুক্ত লোক বোধহয় আমি নই। জানি খুব কম।’ ছাড়লেন না আমাকে। বললেন, ‘স্মৃতিচারণামূলক কিছু লিখুন, জার্নাল ধরনের কিছু।’ ‘জার্নাল’ শুনতেই দুর্বল হয়ে গেলাম। আর কিছু না পারি, জার্নাল পারি। মানে, আমি-আমি করে লেখা লিখতে পারি, যতই কেননা অপছন্দ করি এমন নির্লজ্জতা। গুরুগম্ভীর, অ্যাকাডেমিক/গবেষণাধর্মী লেখা যেমন পড়তে ইচ্ছা করে না, লিখতেও নয়। ষাটের একজন প্রধান লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ লিখছেন আজকাল স্মৃতিচর্যা-ধরনের লেখা। বেশ লাগছে পড়তে। যা হোক, জার্নালকেই তবে এগিয়ে নিয়ে যাই যতটা পারি।

তাঁর ছবি দেখতে পেলাম আবার অনেকদিন পর। আগে মাঝে মাঝেই দেখা হত, হয় তাঁকে নয়তো তাঁর ছবি। দেখলেই মন প্রসন্ন হয়ে যেত। সুদর্শন মুখ জুড়ে থাকত হাসি, পরার্থিতা। আর লাগত তাঁকে বাংলাদেশের লেখকদের, বিশেষত কবিদের অভিভাবকের মতো। কাগজে যেমন তাঁর কবিতা থাকত সকল কবিতার মাথার উপরে, বাস্তবেও ছিলেন তিনি ঊর্ধ্বেই সবার। সবচেয়ে জনপ্রিয়, সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও প্রশংসিত কবি বলতে ছিলেন তিনিই। নিয়মিতই লিখে চলেছিলেন এবং সংখ্যায় সবার চেয়ে বেশি। এমন কবিতানিমগ্ন কাউকে দেখিনি আর। দেখে ভালো লাগত যেমন, ঈর্ষাও হত, নিজেও লেখার চেষ্টা যেকালে মাঝে মাঝে করি। এত কীভাবে লেখেন তিনি? কবিতা নিয়েই যেন আচ্ছন্ন হয়ে থাকছেন সর্বদা, কাগজ নিয়ে বসে গেলেন আর অমনি কবিতা লেখা হয়ে যেতে থাকল তরতরিয়ে! নিশ্চয় তেমনটাই হত। আমার অন্যতম প্রিয় কবি ছিলেন তিনি। তাঁর অনেক কবিতায়ই থাকত বিষাদের আবহ, আমাকে তা স্পর্শ করত, অনেক কবিতায় থাকত নিরর্থকতার আভাস যা আমাকে ঘিরে থাকত সকল সময়। প্রেমের কবিতা লিখেছেন অনেক, যার অধিকাংশকেই মনে হত আন্তরিক, অভিজ্ঞতাপ্রসূত। আর লিখতেন প্রতিবাদী, রাজনৈতিক কবিতা যা মনে হত আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে জরুরী। হায়, এই শেষোক্ত বিষয়ে লেখার মতো আমাদের বুঝি কবি নেই আর। এ শূন্যতা কখন ঘুচবে ভাবি আর আশঙ্কায় থাকি। আশঙ্কা, কেননা আমাদের দেশ এখনো স্থিরতা পায়নি। দেশি-বিদেশি নানা চক্রান্ত চলেছেই এ দেশকে ঘিরে। যথার্থ গণতন্ত্র না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের একটুও শান্তি পাওয়ার কথা নয়। যা বলতে চাই বলতে পারব না? যা লিখতে চাই লিখতে পারব না? এ বিষয়ে সাহসী কবিতা লেখার মতো কেউ কি আছেন আর?

সাধারণভাবে আমাদের কবিতা বিষয়ে একটি দুর্ভাবনা অবশ্য আমার ছিলই। যে, কবে আমরা আরও পরিণত কবিতা পাব আমাদের কবিদের কাছে। পৃথিবীর কবিতার কেমন বদল হচ্ছিল আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। পাশের দেশটির বাংলা কবিতার কেমন বদল হচ্ছিল আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম। আর সবকিছুর মতো কবিতারও আর আগের মতো থাকার কথা নয়। নয় কি? বাংলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথ যে ধারায় কবিতা লিখতেন সে ধারা থেকে দূরে চলে গেলেন তিরিশের কবিরা, কেউ কম কেউ বেশি, কিন্তু পরিবর্তন থেমে থাকল না। ভাষার বদল হয়েছে, ছন্দের কুশলতা বেড়েছে, কবিতা হয়েছে মুখের ভাষার আরও কাছাকাছি, বিষয়ে এসেছে কতই না বৈচিত্র্য। এবং এসবই বিবর্তিত হয়েই চলেছে। আমাদের দেশে এ বিবর্তনের ছাপ কবিতায় যতটা পড়ার কথা ততটা কিন্তু পড়েনি। এ কথা মনে হলে আমাদের প্রধান কবিদের কথাই মনে পড়ে। তরুণ কবিরা তো অগ্রগামীদের দ্বারাই প্রভাবিত হন। বহুবার কবিতা বিষয়ে বিজ্ঞজনেরা বলেছেন, তবু আবারও বলতে ইচ্ছা করে যে, সাধারণভাবে কবিতা এমন হবে যে তা এক পাঠে ফুরিয়ে যাবে না, ফিরে ফিরে পড়তে ইচ্ছা করবে কবিতাটি। অর্থাৎ, নিছক বিবরণধর্মী হবে না তা। কোনও কবিতাকে যেন বলতে না হয় আমি ভালোবাসি তোমাকে, গা থেকেই তা ফুটে বেরোবে। আবার দেশপ্রেমমূলক লেখায়, প্রতিবাদী কবিতায় বিবরণধর্মিতা থাকাটাই স্বভাবিক।

শামসুর রাহমান মূলত একজন কবি। শক্তিশালী কবি একজন। দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে তাঁর তুলনা হয় না, মহান এক বীরের ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতেই এ লেখা। তবু আজকের দিনের কবিতার কথা মনে করে উপরের পঙ্‌ক্তিগুলি।

এবার একেবারে ব্যক্তিগত কথা। বেশ অনেক বছর আগে একবার তাঁর বাসায় গেছি, ‘কেমন আছেন’ বলার পর ভেবে পাচ্ছিলাম না কী বলি, rahman-05.jpg.
……..
শামসুর রাহমান, ছবি: হাসান বিপুল, ২০০৫
……..
বললাম, ‘আপনার কবিতা পড়ে কেমন লাগল সে কথা জানানো হয় না, কারণ মনে করি আপনার ভক্তরা আপনাকে ঘিরে থাকছে আর ভালো লাগার কথা সবসময়ই জানাচ্ছে আপনাকে।’ লেখক রশীদ করীম ছিলেন সেখানে, বললেন, ‘ভুল ধারণা আপনার। কেউ আর আজকাল তাদের প্রতিক্রিয়া জানায় না। ভালো লাগার কথা জানায় না।’ আমি অবাক এ কথা শুনে। ভেবেছিলাম, এর পর থেকে আমি অন্তত জানাব। হয়নি, জানানো হয়নি। আজ ভাবলে খারাপ লাগে। ভালো লাগার কথা জানাবার ব্যাপারে তাঁর মতো উদার আর কাউকে দেখিনি, দেখার আশাও করি না। নিজের কথা বলতেই হচ্ছে এখানে। প্রথম কবিতার বই ‘সজল ভৈরবী’ দিতে তাঁর দৈনিক বাংলার সম্পাদকীয় কক্ষে গিয়েছিলাম ১৯৭২-এ। তাঁকে না পেয়ে টেবিলে রেখে এসেছিলাম। চিনতেন না তিনি এ নতুন লেখককে। কয়েকদিন পর দৈনিক বাংলামৈনাকের দিনলিপি-তে লিখলেন তিনি বইটি সম্পর্কে সপ্রশংস কয়েকটি লাইন। এ ব্যাপারটিকে তখন বিস্ময়কর মনে হয়েছিল। দারুণ উৎসাহ পেয়েছিলাম। সম্প্রতি-প্রকাশিত একান্ত ভাবনা নামের বইটিতে এ লেখাটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে ৩৫-সংখ্যক পৃষ্ঠায়।

আরও একটি স্মৃতির কথা লিখেছেন তিনি অন্য একটি দিনের কথা বলতে গিয়ে ওই দিনলিপিতেই। চাটগাঁয় বইমেলা হচ্ছিল। সেখানে দারুণ বিখ্যাত এই কবির সঙ্গে বড় বড় লেখকদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছিল। মাঝখানে আমার সঙ্গে মুহূর্তমাত্রের দেখা। আমাকে তাঁর চেনারই কথা নয়। মনে রাখা তো দূরের কথা। চিনেছিলেন, দিনলিপিতেও লিখে রাখতে ভোলেননি। (একান্ত ভাবনা, পৃষ্ঠা ১৩৮)। আরও কিছু লেখায়, সাক্ষাৎকারেও তিনি আলতাফের কথা উল্লেখ করেছেন।

আমাদের দেখা হত খুবই কম। বেশির ভাগ সময় দেখা হত কোনও অনুষ্ঠানে বা আড্ডায়। তখন হত কুশলাদি বিনিময়। ব্রীড়া সংক্রামক, একে-অপরের লজ্জা দেখে সংক্রামিত হতাম। একটি কলাম লিখতাম প্রথম আলোয় কয়েক বছর আগে। তার কোনও-কোনওটি পড়ে এমনভাবে প্রশংসা করতেন যে লজ্জায় কী যে বলব ভেবে পেতাম না। ফরাসি ভাষার নাট্যকার ও গদ্যলেখক ইউজিন ইয়েনেস্কো সম্পর্কে একবার লিখেছিলাম, পড়ে তিনি জানালেন ইয়েনেস্কো তাঁরও খুব প্রিয়। তাঁর কাছে নোটস্ কাউন্টার নোটস্ বইটি আছে, পড়া আছে কি না। লাফিয়ে উঠেছিলাম। বললাম, খুঁজছিলাম। বললেন, আপনাকে আমি উপহার দিতে চাই। বললাম, আপনার কি দুটো কপি আছে? বললেন, না, একটাই, সেটাই আপনাকে দিতে চাই। আমি বললাম, না, তা হলে ফটোকপি করে নেব। পরের দিনই গিয়ে তাঁর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলি এবং বইটি কপি করার জন্য নিই। তাঁর বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছিলাম। সত্যিই তিনি বিশ্বাস করতে পারতেন না অবৈজ্ঞানিক কোনওকিছুকে।

মিনিংলেসনেসের ব্যাপারটিও তাঁর মধ্যে ছিল। কষ্ট পেতেন সেজন্য? পেতেন, তবে কবিতাই তাঁর প্রধান আশ্রয় ছিল বলে কষ্টের অনেক লাঘব হত।

বলতেই হবে তাঁর মতো সহৃদয়, নরম মনের মানুষ খুবই কম দেখেছি। কবি হিসাবেও তাঁর উপস্থিতি আরও অনেক দিনের জন্য প্রয়োজন ছিল আমাদের। দূর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করি তাঁকে।

ঢাকা, ১৭/৮/২০০৮

altaf_khokon@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সেলিনা শিরীন শিকদার — আগস্ট ১৯, ২০০৮ @ ৫:৫৭ অপরাহ্ন

      ভাল লাগলো।

      – সেলিনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহাবুবুর রাহমান — আগস্ট ২৩, ২০০৮ @ ১২:০৪ অপরাহ্ন

      স্মৃতিচারণমূলক কিছু লেখার কথা থাকলেও লেখাটি আর শেষ পর্যন্ত নিপাট স্মৃতিচারণমূলক থাকে নাই। তা থাকার কথাও না — বিশেষত যখন একজন কবি আরেকজন কবির স্মৃতিচারণ করবেন তখন সাহিত্য(তত্ত্ব) প্রসঙ্গ আসার কথাই। লেখাটিতে অগ্রজদের প্রসঙ্গে, বাংলাদেশের কবিতা প্রসঙ্গে, কবি আলতাফ হোসেনের কিছু অনুযোগ আছে। আমার মূল দ্রষ্টব্য সেটাই। বোঝা গেছে তিনি পশ্চিমবঙ্গের কবিতার (বিশেষত ছন্দের, বাগ্বিধির) মুগ্ধ অনুরাগী — আমিও। কিন্তু কবিতা শুধু ছন্দ আর কলাকৌশলেরই বিষয় নয়। বাণীও (বক্তব্য) এতে গুরুত্বপূর্ণ। বক্তব্যে নতুনত্ব থাকলে বলার ধরনেও নতুনত্ব থাকবে — এটাই স্বাভাবিক। আর হ্যাঁ যে কোনো শিল্পস্রষ্টা, চিন্তানায়ককে ইতিহাস মনে রাখে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির, তাঁর বক্তব্যের কারণেই।

      যাই হোক এসব পরিষ্কার করতে গেলে ভিন্ন একটি লেখা ফাঁদতে হবে। আমার মনে হচ্ছে আলতাফ হোসেনের অনুযোগ সর্বাংশে সঠিক নয়। ‘৮০, ‘৯০-এর দুই বাংলার কবিতা পাশাপাশি রেখে পড়লে দেখা যাবে আমাদের কবিরা তাদের চেয়ে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশের কবিতা নিয়ে যখন অনুযোগ শোনা যায়, তখন আবার যখন সমরেশ মজুমদারদের মুখে শুনি যে, বাংলাদেশের কবিতার ধারেকাছেও পশ্চিমবঙ্গের কবিতা পৌঁছতে পারেনি — তখন ধন্দে পড়ে যাই। সমরেশ মজুমদারের বক্তব্য অনেকের কাছে অত্যুক্তি মনে হলেও তিনি একেবারেই বিবেচনাহীন কথা বলেননি। আর এই বিবেচনাটাই হইল সাহিত্যতত্ত্বের মামলা। আমার শেষ কথা, একই সাহিত্যতত্ত্ব (সাহিত্যবিচারের মাপকাঠি) দিয়া পশ্চিমবঙ্গের কবিতা আর বাংলাদেশের কবিতাকে পাঠ করলে হইব না। বাংলাদেশের — বিশেষত রাহমান, মাহমুদদের কবিতা পাঠের জন্য ভিন্ন সাহিত্যতত্ত্ব লাগব। তবেই আমাদের আত্ম ও পরজ্ঞান জন্মাইব, আত্মার দৈন্য ঘুচব।

      – মাহাবুবুর রাহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আলতাফ হোসেন — আগস্ট ২৫, ২০০৮ @ ৭:০৪ অপরাহ্ন

      সেলিনা শিরীন শিকদারকে ধন্যবাদ। ধন্যবাদ মাহাবুবুর রাহমানকে। কবিতার মান বিষয়ে মাহাবুবুর রাহমানের মন্তব্য এবং ঢাকায় প্রদত্ত সমরেশ মজুমদারের কথিত বক্তব্য বিষয়ে একমত হতে পারলে খুবই আনন্দিত হতাম এবং সমরেশ মজুমদার কলকাতায় এমন কথা (যদি মাহাবুবুর রাহমানের লেখামতো তিনি বলে থাকেন) বললে অধিকতর খুশি হতাম। আবারও বলি, একমত হতে পারলে।

      বক্তব্যে নতুনত্ব থাকবে, বলার ধরনেও নতুনত্ব থাকবে — বস্তুত কবিতার কাছে যে এমনটাই আমারও আশা, না যদি বোঝাতে পেরে থাকি, তবে আমার অক্ষমতা। তেমনটা হলেই তো এক পাঠে কবিতা ফুরিয়ে না যাওয়ার কথা।

      কবি বা লেখকের গুরুত্ব বিচার, তাঁদের বিশেষ লেখার গুরুত্ব বা মাহাত্ম্য বিচার স্থান, কাল ভেদে আলাদা হতে পারে, ‌কিন্তু “একই সাহিত্যবিচারের মাপকাঠি দিয়া পশ্চিমবঙ্গের কবিতা আর বাংলাদেশের কবিতা পাঠ করলে হইব না” যদি এবং তিনি যদি সাহিত্যবিচার বলতে সাহিত্যের মান বিচার বুঝিয়ে থাকেন, আর “‌বাংলাদেশের — বিশেষত রাহমান, মাহমুদদের কবিতা পাঠের জন্য ভিন্ন সাহিত্যতত্ত্ব লাগব” যদি, এবং তিনি যদি সাহিত্যতত্ত্ব বলতে এখানে সাহিত্যর মান বিচার বুঝিয়ে থাকেন, তবে আমি তো তাতে বিশ্বাস রাখতে নাচারই থাকব, তাতে আমার “আত্মার দৈন্য” নাও যদি ঘোচে, আমি তা নিয়ে কিছু ভাবব না।

      – আলতাফ হোসেন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মাহাবুবুর রাহমান — আগস্ট ২৬, ২০০৮ @ ৬:৪৮ অপরাহ্ন

      কবি আলতাফ হোসেনের মন্তব্যের শেষ বাক্যটি পড়ে মর্মাহত হলাম। আমার মনে হল তিনি আমার আগের মন্তব্যের শেষ লাইনকে ব্যাক্তিগত ভাবে নিয়েছেন। কিন্তু কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা আমাদের লক্ষ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য সাহিত্য নিয়া, কবিতা নিয়া সিরিয়াস বির্তক তোলা। কিন্তু শেষের দিকে কাব্য করতে গিয়া হয়ত একটু উল্টাসিধা কথা কইয়া ফালাইলাম। সেখানে যদি ব্যক্তিগতভাবে নেওয়ার মতো কোনো চিহ্ন কবি খুঁজে পান তবে আমি দুঃখিত।

      আগের মন্তব্যে আমি সহজ কথায় কইতে চাইছিলাম — ঠিকমত কইতে পারি নাই (হয়ত এখনও পারব না): কবিতা বিচারের তো একক কোনো মানদণ্ড নাই (না থাকাই ভালো), তো যেই মানদণ্ডে (ধরা যাক শব্দ বা বাক্যের অপরিচিতকরণ) আপনার আমার কাছে উৎপলকুমার বসুকে বড় কবি মনে হবে, সেই একই মানদণ্ডে রাহমানকে হয়তবা কোনো কবিই মনে হইব না। কিন্তু যখন কেউ খোদ দণ্ড নিয়াই প্রশ্ন তোলেন তখন তো মহা ঝামেলা।

      কেউ যদি কন ওই মিয়া কবি ও কবিতাকে তো আমি এত সংকীর্ণ সংজ্ঞায় সজ্ঞান করতে চাই না, কবির কাজ জাতির ভাষাকে পরিশীলিত করা। তখন আমাদের কাছে শামসুর রাহমানকে বড় কবি বলেই মনে হইব। এমনকি এই অর্থে ঔপন্যাসিক লিয়েফ তলস্তয়কেও কবি মনে হইব; এমনকি এককলম না-লেখা শ্রীচৈতন্যকেও কবি মনে হইব। কেননা ততক্ষণে আমরা বুঝে যাইব যে, ভাষা বলতে কেবল মুখ থেকে বের হওয়া (মানব-দানব, রোবট, কম্পিউটার, বুশ, লাদেন… যার মুখ থেকেই বের হউক না কেন) অর্থপূর্ণ (কিংবা অর্থহীন) শব্দকেই বোঝায় না। জীবনযাপনের হাজার ধরনের ভাষা আছে যা মুখ থেকে শব্দ আকারে নির্গত হয় না। ধরেন আমি ফুটপাতের ৪০টাকা দামের গেঞ্জি পইরা ক্যাম্পাসে যাই এইটাও একটা ভাষা — গরিবী ভাষা। তো কবিতা নিয়া প্রশ্ন তুলতে গেলে আগে ভাষার বিষয়টা কিঞ্চিৎ হইলেও মীমাংসায় আসতে হইব। ভাষার বিষয়ে আসলে অন্যান্য বিষয়ও চইলা আসব, কোনোমতেই আটকাইয়া রাখা যাইব না। আর এড়াইয়া গেলেও পার পাওয়া যাইব না। নতুন কবিতা আকাশ থেইকা টুপ কইরা পড়ব না। নয়া জমানার নয়া কবিরা এসব মোকাবেলা কইরাই নয়া কবিতা লেখবেন আর আপনারাই তাঁদের সম্মুখ থেইকা সাহস যোগাইবেন – এমন আশা করা অন্যায় হবে না। ধন্যবাদ কবি আলতাফ হোসেন।

      – মাহাবুবুর রাহমান

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com