অনুবাদ, রোজনামচা

মোহামেদ চউক্‌রির ডায়েরি

তানজিয়েরে জঁ জনে (কিস্তি ২)

hossain_m | 9 Aug , 2008  

কিস্তি ১

central-mosque.jpg
তানজিয়েরের কেন্দ্রীয় মসজিদের মিনার

কিস্তি ২

অনুবাদ: হোসেন মোফাজ্জল

(গত কিস্তির পর)

২৯/০৯/৬৯ – পি. এম

হোটেলে ঢোকার মুখে জনেকে পেয়ে যাই। যেতে যেতে তাঁকে বলি, জানেন গেল বছর এরা আমাকে এখানে ঢুকতে দেয়নি। এমন কি এখানে উঠেছিল এমন এক ইংরেজ বন্ধুর নিমন্ত্রণের কথা বলাতেও না।

jg-mc.jpg
জঁ জনে ও মোহামেদ চউক্‌রি

কেন? জানতে চান জনে।

হয়তো আমি তেমন ভাল কাপড়চোপরে ছিলাম না।

আমিও তাই ভেবেছিলাম। এর বদলে তুমি কি অন্য কোথাও যেতে চাও?

না, বরং বলতে পারেন আমার ভালো লাগবে, আপনার সাথে আমি এমন এক জায়গায় এসেছি যেখানে আমাকে এরা এক সময় ঢুকতে বাঁধা দিয়েছিল।

আমরা গার্ডেন বারে বসি এবং দুটো হুইস্কির অর্ডার করি। এত শীত উপেক্ষা করেও এক যুবক সুইমিং পুলে সাঁতার কাটছিল।

কোনো কিছু না বলেই জনে আমাদের মাথার উপরে, চেয়ারের নিচে আর তার আশাপাশের জায়গাগুলিতে বেশ অস্স্বস্তির সঙ্গে তাকাচ্ছিলেন। মনে হয় তিনি নিশ্চিত হতে চাইছিলেন কোথাও কোনো মাইক্রোফোন লুকানো আছে কিনা। যে কোনো কিছুই সম্ভব, বিশেষ করে অনন্ত জনের বেলায়।

বেশ, এবার আলাপ চালানো যাক তোমার লেখা এবং প্রকাশনার সমস্যাগুলো নিয়ে — জনে বলেন। আমি তোমাকে কোনো উপদেশ দেব না, কারণ তোমার ভবিষ্যৎ ঠিক করাতে সুবিধা হয় এমন কোনো উপদেশই আমি তোমাকে দিতে পারবো না। আমি তোমাকে বলবো সেটা তুমি পছন্দ করবে। তুমি যেমন আছো এখানে তেমনিই থাকতে পারো, বা অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে শুরু করতে পারো এবং এখানে তুমি যা লিখতে পারছো না সেখানে সেটা তুমি লিখতে পারবে। আমার ধারণায় মুসলমানরা কোরআন-এর ঐতিহ্য এবং জীবন বিধান থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে। তা সত্ত্বেও কোরআন এখনও একটা মহান পুস্তক, একজন মুসলমান বা মুসলমান নয় এমন যেই পড়ুক না কেন তা একই রকম ভাবে মহান। তুমি এখনো বোদলের, মার্লামে বা র‌্যাঁবো বড় রকমের প্রশস্তি নিয়ে পড়তে পারো। কেন? কারণ তাদের স্টাইল ঠিক এখনও সমান রকমের বিস্ময়কর।

এর কিছু পরে তিনি মন্তব্য করেন: এখানকার অবস্থা খুব অস্থির। সবকিছুই গরীব আর দুর্দশায় ভরা। একমাত্র বিদেশীরাই এখানে মানুষের মত বাস করে।

৩০/০৯/৬৯

ক্যাফে প্যারিসের চত্বরে আমার বসেছিলাম। আমার সাথে কাম্যুর প্লেগ বইটা।

এই উপন্যাসটা কি তোমার ভাল লাগে? জনে জিজ্ঞেস করে।

হ্যাঁ। এটা আমি দ্বিতীয়বারের মত পড়ছি।

তুমি কি খুবই কাম্যু পছন্দ করো?

হ্যাঁ। আমি তাঁর মেলা বই পড়েছি।

তারপর একটু বিরতি নিয়ে কাম্যুর ব্যাপারে তাঁর কী অভিমত জানতে চাই।

সে অনেকটা বলদের মতো লিখেছে।

আমি হাসি।

তিনি বলে চলেন, আমি কখনই সে কী লিখেছে পছন্দ করিনি। এমনকি তার ব্যক্তিত্বও না। আমি কোনো কালেই তাকে ধরতে পারিনি।

তারপর আপনি সার্ত্রের পক্ষ নিলেন সেই বিখ্যাত বিরোধের পরে।

স্বাভাবিক ভাবেই। কাম্যু যা ভাবে তারচে’ বেশি বোঝাতে চেষ্টা করে।

এসময় একজন হিপি আমাদের সামনে এসে জনেকে ইংরেজিতে বলে, আমি আপনার কাজের বড়ই তারিফ করি। আপনার সাথে দেখা হওয়ায় খুবই খুশি হলাম।

জনে আমার দিকে তাকালে যুবকটি যা বলেছে তা ভাষান্তর করে শোনাই। দুজনে হাত মেলায় এবং হিপিটি হাত নেড়ে মাথা নুয়ে চলে যেতে থাকে, আর জনে হাসতে থাকেন। আমার দিকে ফিরে বলেন, আমেরিকান হিপিগুলি সুন্দর তাই না, কিন্তু ওদের বাপগুলি অসমর্থনযোগ্য।

প্যারাসুটিস্ট আবদেসসালেম আসে। এবার একটা সূত্র ধরে সে জনের পাশে গিয়ে বসে এবং মাগরিবি ভাষায় আলাপ জুড়ে দেয়। জনে হ্যাঁ-না জাতের উত্তর দিতে থাকে। আবদেসসালেম আমার দিকে ফিরে বলে, তুমি ওনাকে বলো তাঁর আঙুলগুলি সুন্দর!

সুন্দর আঙুল! আঁতকে প্রতিউত্তর করি।

হ্যাঁ। আঙুল! তাকে বলো তাঁর হাতও সুন্দর।

যদি তুমি সত্যিই বলতে চাও তাহলে তুমি নিজেই বলো। আস্তে আস্তে বললে সে বুঝবে।

জনে কিছু বাদে আমার কাছে জানতে চায় সে কী বাতলানোর চেষ্টা করছে।

সে বলেছে আপনার আঙুলগুলি সুন্দর!

অবাক হয়ে জনে তাঁর হাতের দিকে তাকায়। তারপর তিনি আবদেসসালেমের দিকে তাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়েন। আবদেসসালেম জনের কাছে গিয়ে হাতটি তার নিজের আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে। তারপর জনেকে বলে, বড়ই সুন্দর হাত। জনে আমার দিকে তাকিয়ে বলে ওকে জিজ্ঞেস করো আমার টাক মাথাটা কেমন লাগে।

আর ওটা দেখতে কেমন লাগে?

আবদেসসালেম আমাকে বলে, ওনাকে বলো ওনার মাথাও দেখতে সুন্দর।

আমি অনুবাদ করে জনেকে জানাই। জনে উত্তর দেন, ওকে বলো ও একটা আস্ত উন্মাদ। আমার মাথা দেখতে বাঁদরের পোঁদের মতো।

১/১০/৬৯

ক্যাফে প্যারিসের চত্বরে বসে আছি।

আপনাকে বেশ বিষণ্ন দেখাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি উত্তর দেন, আমি সবসময়নই বিষণ্ন এবং আমি জানি তা কীসের জন্যে।

আমি তাঁর বিষণ্নতাকে মেনে নিয়ে আর কোনো চাপাচাপি করি না। আমার নিজেরও তো রয়েছে একান্ত বিষণ্নতা।

৩/১০/৬৯

ক্যাফে যাগোরা।

আমি প্রশ্ন করি, প্রথম উপন্যাস লেখার সময় আপনার ঝামেলা গিয়েছিলো?

না তেমন কিছু না। আমি জেলে বসে Notre Dame des fleurs-এর প্রথম পঞ্চাশ পাতা লিখে ফেলি। যখন আমাকে আরেকটা জেলে নিয়ে যাওয়া হয়, যে কারণে হোক লেখাগুলি ওখানেই ফেলে আসি। ওসব ফেরত পাবার জন্যে যা যা করার দরকার সবকিছুই আমি করেছিলাম, কিন্তু কোনো কাজ হয় নাই। তারপর করি কী, আমি কম্বল মুড়ি দিয়ে সোজা পঞ্চাশ পাতা আবার লিখে ফেলি।

আমি জানি আপনি ত্রিশের আগে লিখতে শুরু করেন নি, বত্রিশ বা তেত্রিশ বছর বয়েসে হবে।

ঠিক ধরেছো।

তার আগে আপনি কখনো লেখার চিন্তা করেন নি?

আমি সব সময়ই লিখেছি। এমন কি কিছু লেখার চেষ্টা করার অনেক আগে থেকেই আমি লিখতে শুরু করি। লেখকের ক্যারিয়ার আসলে যখন থেকে সে লিখতে শুরু করে তখন থেকেই শুরু হয় না। ক্যারিয়ার এবং লেখা হয়তো আগে পিছে কোনো এক জায়গায় এসে মিলে যায়।

মেলা বছর গেল আপনি তেমন কিছু আর লিখছেন না। তাই না? আপনি কি মনে করেন আপনার সাহিত্যিক নিরবতা এবং আপনার রাজনৈতিক অবস্থান আরেক ধরনের সৃষ্টিকর্ম, আপনার লেখারই একটা অংশ?

বাস্তবে তাই, আমি যা বলতে চেয়েছি আসলে বলে ফেলেছি। এমনকি এর চেয়েও যদি আরও বেশি কিছু যোগ করা যেত সেটা আমার ভিতরে রেখে দিয়েছি। যখন আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, আমাকে জেলে পুরে রাখার মতো অনেক কারণ বিচারকদের হাতে ছিল, তা সত্ত্বেও তারা আমাকে ছেড়ে দেয়। যে কারণেই হোক আমাকে এর চেয়ে বেশি জেলে রাখতে হয়তো ভয় পাচ্ছিলো তারা বা যে কোনো কারণেই হোক তাদের নিজেদের গরজেই আমাকে ছেড়ে দিয়েছে, আমি জানি না। যে কারণেই হোক, আমকে ছেড়ে দেবার সময় হয়ে এসেছিল। কিন্তু আমি হয়তো এখন পর্যন্ত আপসে জেলের ঘানি টানতে পারতাম।

আপনি বোঝাতে চাচ্ছেন কোনো কোনো সময় কপালের জোরে আইনকেও জয় করা যায়।

হ্যাঁ। সম্ভব হতেও পারে। অ্যাবসলুট না বা অ্যাবসলুট হ্যাঁ বলে তো কিছু নেই। আমি তোমার সাথে এখানে এখন বসে আছি, খুব সহজে নাও থাকতে পারতাম।

তারপর তিনি একজন ফরাসী পেইন্টারের গল্প বলেন, যে কিনা একটা রেস্তরাঁয় খেতে বসেছে। রেস্তরাঁর মালিক পেইন্টারের কাছে এসে জানতে চায় সে একটা ফুলের ড্রয়িং করে দিতে পারবে কি-না, যা সে তার রেস্তরাঁর দেয়ালে টাঙিয়ে রাখবে। পেইন্টার ফুল এঁকে রেস্তরাঁর মালিকের কাছে দাম হাকে। মালিক গাইগাই করে উঠে, বলো কী? তোমার তো কম সাহস না এর জন্য এত দাম হাকাচ্ছো, যেটা আঁকতে তোমার পাঁচ মিনিটও সময় লাগে নি।

পেইন্টার বলে, পাঁচ মিনিট না মশায়, এটা আঁকতে আমার চল্লিশ বছর সময় লেগেছে, তুমি এই ড্রয়িংটা চাও না কি চাও না? রেস্তরাঁর মালিক জানাল, অন্তত এত দামে না। পেইন্টার ড্রয়িংটা ছিঁড়ে ফেলে খাওয়া চালিয়ে যায়।

lighthouse-tangier.jpg
লাইটহাউজ তানজিয়ের, মরক্কো

১০/১০/৬৯

বেলা পাঁচটায় আমরা ক্যাফে যাগোরেতে মিলিত হই। তিনি জানতে চান আমার মন কী বলছে: আমার বন্ধু মোহামেদ জেরাডকে তারা কি পাসপোর্ট দেবে, যাতে সে জনের সাথে প্যারিসে যেতে পারে?

আমি তাঁকে বোঝাতে চেষ্টা করি, একজন মরক্কীয় যুবকের পাসপোর্ট পেতে ঘুষই হচ্ছে সবচে কাজের পথ, কেননা সে কোনো সরকারী চাকুরে না আবার তার বিদেশে গিয়ে কাজ করারও কোনো চুক্তি নেই।

অন্য কোনো দেশে এরকমের কোনো পরিস্থিতি নেই, যদি না সে ক্রিমিন্যাল বা ফেরারী বা স্পাই না হয়। লন্ডনে আমার পাসপোর্ট তিনঘণ্টার মধ্যে নবায়ন করে দিয়েছে আমি কী করি তার কোনো রেফারেন্স না চেয়েই।

তেমনটা এখানে ঘটবে না, আমি তাঁকে বলি, এখন পর্যন্ত না।

সোয়া পাঁচটায় আমারা একটা ট্যাক্সি করে একসাথে আমালতের উদ্দেশ্যে রওনা হই। হতদরিদ্র পোশাক পরে আর বেজার মুখে লম্বা লাইনে দাঁড়ানো মনুষজন। শুকনো মত একটা লোক মহা উত্তেজনায় অফিসের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে। তার স্বর নার্ভাস এবং কঠিন। জনে আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, এই লোকটাই আমাকে পাঁচটায় আসতে বলেছিল।

অফিস তো ছয়টায় বন্ধ হয়ে যাবে।

পাসপোর্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকটি তখন বেরিয়ে আসে এবং যারা অপেক্ষা করছিল তাদের ধাক্কা দেয়। তারপর সে মুখভরে লোকজনকে অভিশাপ দিয়ে আবার ভিতরে চলে যায়। জনের মেজাজ চড়ে যায়। তিনি করিডোরের দিকে কয়েক পা এগোন, তারপর থামেন, আর গজর গজর করেন: ওই ব্যাটা একটা পশু, ও কী ভেবেছে, ওভাবে মানুষকে কেউ ধাক্কা দেয় আর অপমান করে? ওই ব্যাটা একটা জানোয়ার!

আমরা পাসপোর্ট অফিসের লোক ছাড়া যতক্ষণে না আর সবাই চলে যায় ততক্ষণ অপেক্ষা করি। সেই শুকনো মত লোকটা অপেক্ষমান লোকদের উদ্দেশে খিস্তিখিউরির চালিয়ে যায়। জনে আমার কাছে জানতে চান লোকটা লাইনের সামনে পিছে গিয়ে কী নিয়ে চিৎকার করছে। মাঝে মাঝে লোকটা এমনভাবে কথা বলে যেন লোকগুলোর জান তার হাতে। এরপর সে একজনকে বিশেষ ক্রোধের সাথে ধাক্কা দিয়ে জোরে চেঁচিয়ে উঠে। জনে আবার ভাষান্তর করতে বলেন।

সে বলেছে এই পাসপোর্ট অফিসে যতদিন সে আছে ততদিনে তার কোনো পাসপোর্ট হবে না।

হবে না কেন?

সম্ভবত মালের পরিমাণ বড় না। আর কোনো সময় যদি কেউ তার সাথে তর্ক জুড়ে দেয় তবে সে তাকে তালা দিয়ে রাখে। তারপর লোকটাকে যতদিনে কোর্টে চালান দেয়া হবে ততদিনে সে লোকের হাতের নখ আর দাড়ি ইয়া বড় হয়ে যাবে।

জনেকে বলি, তিনি বরং গভর্নরের সাথে নিজে গিয়ে দেখা করার চেষ্টা করুন, যদিও এমনও হতে পারে গর্ভনর হয়তো এ বিষয় নিয়ে কোনো আলাপেই যাবে না। — আমি এসব বড় আমলাদের ঘেন্না করি।

অফিস বন্ধের শেষ মুহূর্তে সেই শুকনো মতো লোকটি জনের সাথে কথা বলে এবং জানায় যদি সে মরক্কোর কাগজপত্রাদি সাজিয়ে নিয়ে আসে তাহলে সে তাড়াতাড়ি পাসপোর্ট পেতে তাকে সহায়তা করবে।

জনে বলে, ভরা বাদলের শেষে এরকমটাই করবে, এই লোকটা যা চায় তা হলো মুঠিভরা ব্যাংকনোট, তাই না?

আমি বললাম যথার্থ, যা বলেছেন তাই।

ক্যাফে প্যারিসে বসে আমরা দুটো হুইস্কির অর্ডার করি। জনে প্যানটিরা সিগেরেটে টান মারেন। আমি হোটেল মিনজাহতে তাঁর সাথে ডিনারে যাবার দাওয়াত গ্রহণ করি।

ডাইনিং রুমটা পুরোটাই ভরে আছে আমেরিকান ট্যুরিস্ট দিয়ে। মরক্কীয় ওয়েটার জনেকে মহানন্দে পরিবেশন করতে থাকে, হোটেলের গেস্ট হিসেবে না, অনেকটা বন্ধুমানুষের মত ব্যবহার করে। ধীরে ধীরে বলা আরবীতে সে তাদের সাথে মস্করা করতে ছাড়ে না। আমেরিকান ট্যুরিস্টরা অবিরাম খেয়ে চলে আর বিরামহীন বকবক করে।

এক্সকিউজ…ফর এ মোমেন্টস, জনে বলেন: তুমি কি তাদের কথা শুনতে পারছো? যেন তারা প্নেনের মোটরের উপর বসে চিবুচ্ছে, হয়ত ভিয়েতনাম কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে।

হোটেলের পিয়ানোবাদক একপালা শেষ করে আরেকটি বাজনা ধরলে জনে জানান, আমি আমার জন্মেও এরকম বাজে পিয়ানোবাদক দেখিনি। যে ভাবে ওরা খাবারগুলো গিলছে আর কথা বলে যাচ্ছে তেমনভাবেই সে বাজালো।

জনেকে বেশ ফুরফুরা দেখাচ্ছিল। যদিও তিনি সামান্যই খেয়েছেন। তাঁর ক্ষুধা অ্যালকোহল আর নেমব্যুটাল টেবলেটের জন্যে — তিনি যেমনটি বলেন।

আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি, এখন কী পড়ছেন আপনি?

যদি বই অর্থে বলো তবে আমি কিছুই পড়ছি না। আমি যখন ট্রাভেল করি তখন আমার সঙ্গে কয়েকটা কাপড়চোপর আর ট্রাভেল ডকুমেন্ট থাকে।

আপনি দেখি হোটেলটা খুবই পছন্দ করেন।

আমি ম্যানেজারকে চিনি। সে আমার বই পড়েছে। মাঝেমাঝে সে এ নিয়ে কিছু কথাও বলে, লেখার পেছনে কোন ভাবনা কাজ করছে তা নিয়েও বলাবলি করে। বলতে পারো এই জায়গাটাকে আমি বাড়ির মত মনে করি। অন্যদের মত নিজেকে কেবল মাত্র খদ্দের জ্ঞান করি না।

মিনজাহতে কাজ করে আমার এমন এক মরক্কীয় বন্ধু হোটেলে জনে কী ধরনের আচরণ করে থাকেন তার কিছুটা আমায় জানিয়েছে। কখনো কখনো জনে হয়তো খালি পায়, পাজামা পড়েই ডাইনিং রুমে চলে আসেন — ওয়েটারের কাছে হয়তো একটা দেশলাই চাইতে এসেছেন। জনে হয়তো উপরে চলে গেলেন আবার নিচে নেমে এলেন কোনো কিছু চাইতে। বেডের পাশে রাখা টেলিফোনটা জনে যে ব্যবহার করবেন না বোঝাই যায়।

ডিনারের পর আমরা বুলেভার্ড ধরে আধা ঘণ্টা পায়চারি করি। তিনি কিছু নিউজ পেপার আর ম্যাগাজিন কিনে হোটেলে ফিরে যান।

১২/১০/৬৯

সকাল সাড়ে এগারটায় ক্যাফে প্যারিসে আমি তার সাথে দেখা করি। মোহাম্মেদ জেরার্ড তার সঙ্গে। জনে আমাদের দুজনকেই আল মিরাদোর-এ তার সাথে দুপুরের খাবার খেতে বলেন। তিনি তখন কিডনির পীড়ায় ভুগছিলেন, আমাকে বলেন, আজ সকালে তিন তিন জন ডাক্তার ডেকেছি। তারা সবাই এসে আমাকে একটা করে ইঞ্জেকশন দিয়ে চলে গেছে।

আমরা তাঁকে বেলা চারটার দিকে গুডবাই জানাই। পুরো সময়টাই তিনি বেশ আনন্দেই ছিলেন। তারপর তিনি চলে যান তার সিয়েস্তা নিতে।

১৩/১০/৬৯

জনেকে তাঁর হোটেল থেকে সন্ধে ছয়টায় তুলে নিয়ে ব্রেইজি দ্য ফ্র্যান্স চলে আসি। তখনও তিনি ব্যথায় কোকাচ্ছিলেন এবং খুব ধীরে ধীরে হাঁটছিলেন।

১৪/১০/৬৯

হোটেলে তাঁর সাথে দেখা করি। তার শরীরের উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি আমাকে ফরাসী ভাষায় এক কপি কোরআন দেন এবং বলেন তিনি পুরোটা বুঝে উঠতে পারেন নি।

এর বেশির ভাগ ভাষ্য বুঝতে হলে একজনকে অবশ্যই আরবের ইতিহাস পড়ে আসতে বলে জনে জানান। তুমি অবশ্যই কোরআন পাঠ আরবীতে করো? খুবই চমৎকার হবে হয়তো।

আমি তাকে বলি, আরবীতে এটাই একমাত্র বড় কাজ।

মালার্মে নিয়ে তিনি কথা বলতে শুরু করেন, জনে যাকে সীমাহীন শ্রদ্ধা করেন বলে আমি জানি। যতগুলো লাইন তিনি আমাকে শোনান তার মধ্যে বিশেষ করে একটা লাইন আমার পছন্দ হয়, আমি তাঁকে সেই লাইনটা আমার জন্যে লিখে দিতে বলি। হাতের কাছে কোনো কাগজ না থাকায় তিনি কোরআন-এর ভেতর থেকে একটা খালি পাতা বের করে সেখানে লিখেন: Et le vide papier que sa blancheur defend… কোটেশনটি নিয়ে তিনি পুরোমাত্রায় নিশ্চিত ছিলেন না তাই এর শেষে একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন আঁকেন। (পরে আমি যখন লাইনটি সঠিক কিনা মিলাতে গিয়ে দেখি তিনি যেখানে et লিখেছেন যেখানে আসলে তাঁর লেখা উচিত ছিল sur এবং sa এর পরিবর্তে লেখা উচিত ছিল la।)

আমি তাঁর কাছে জানতে চাই ফরাসীতে মালার্মের কোনো বিশেষ মানে আছে কিনা। জনে দাঁত কেলাতে থাকেন। বলেন তার নাম ইঙ্গিত করে — পুরুষত্বহীন: mal arme, n’est-ce pas? অতি খারাপ ভাবে যৌনতাসজ্জিত, যার জন্যে মাথাটা এমন বানিয়েছে।

তারপর আমি জানতে চাই শিকাগোতে ১৯৬৮ ডেমোক্রেটিক কনভেনশনের উপর তাঁর রিপোর্টটা কি Esquire-এ পুরোপুরি ছাপানো হয়েছিল কিনা। তিনি জানান, তারা মাত্র অর্ধেকটা প্রকাশ করেছিল কিন্তু বাকি অর্ধেকটা আমি অন্য ম্যাগাজিনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলাম। তিনি বলতে থাকেন, আমি জানি একমাত্র যে কারণে তারা আমার লেখাটা কিনে তা হচ্ছে সেখানে আমার সিগনেচারটা থাকে, তার মানে এই না যে আমি যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র নিয়ে কী বলতে চাই তারা সে সব শুনতে চায়।

১৫/১০/৬৯

মোহামেদ জেরার্ড গিয়েছে তেতুয়ার কাছে কোনো এক পাড়া গাঁ শহরে। যেখানে সে জন্মেছে। সেখান থেকে পাসপোর্ট বানানোর জন্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রাদি তুলতে।

জনে কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন। তোমার কি মনে হয় সেই পাহাড়ে তারা কি আসলেই তাকে কাগজগুলো দেবে? নাকি এখানকার মত সেই একই কাহিনী যখন তুমি কোনো কিছু কর্মকর্তাদের থেকে পেতে চাইবে সেই রকম।

কিন্তু আমি তো আপনাকে বলেইছি, সবকিছুই নির্ভর করছে সেই কর্মকর্তার সাথে তার কী রকমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে তার উপর কিম্বা যার কাছে তার কাজটা পড়েছে তার উপর। যদি সে কাউকেই না চেনে তাহলে একমাত্র টাকাপয়সা দিয়েই সবকিছুর আসান হবে।

হাসান ওয়াকরিম আসেন। আমাদের সাথে ক্যাফেতে বসেন। আমার মনে হয় তিনি হয়তো কোনো সাহায্য করতে পারবেন। আমালতের অনেক লোকজনের সাথে তার ওঠাবসা আছে, এবং যখনই তার দরকার পড়েছে সরকারী কাগজপত্রাদি পেতে তেমন ঝামেলা হয় নাই। (দ্য ট্রুপ ইনোজিস্ নামে একটা লোকাল ড্যান্স গ্রুপ তিনি চালান।) আমি তাকে বন্ধুমানুষ হিসেবে পরিচয় করে দেই যে হয়ত আমাদের কোনো কাজে আসতে পারে। ওয়াকরিম জনেকে তার যতটুকু করার ক্ষমতা আছে সে পরিমাণ করার কথা জানালে জনের মুখে আগ্রহের ছাপ পড়ে, জনে আরও আগ্রহী হন যখন তিনি জানতে পারে ওয়াকরিম একটা ড্যান্স গ্রুপ চালান। তারপর ওয়াকরিম কিছুক্ষণ ধরে গান, নাচ এবং থিয়েটার সম্বলিত প্রজেক্ট চালাতে কী ধরনের ধকল সামলাতে হয় সে সব বিষয়ে বলেন। জনে তাঁকে সাবধান করে দেন শিল্পীদের অবশ্যই সজাগ থাকতে হবে বাইরের সকল ধরনের প্রভাব থেকে। তা না হলে তার বিষয়গুলো ক্রমাগত আপটুডেট রাখতে হবে, এখানে মরক্কোতে যার মানে আরও ইউরোপীয় হওয়া। ওয়াকরিমকে তিনি বলেন, আপনি অবশ্যই আপনার গান আর নাচগুলো অক্ষুণ্ন রাখবেন।

১৬/১০/৬৯

ব্রেইজি দ্য ফ্র্যান্সে। প্রয়োজনীয় কাগজপাতি সঙ্গে নিয়ে মোহামেদ জেরার্ড তার সফর থেকে ফিরে এসেছে। সে জানায় এত তাড়াতাড়ি জোগার করতে পারার একমাত্র কারণ হচ্ছে এরজন্যে তাকে মোটা অঙ্কের মাল গুনতে হয়েছে। আমরা তাকে তার সাফল্যের জন্যে বাহবা জানাই। আমরা ওয়াকরিমের জন্যে অপেক্ষা করতে থাকি, তিনি এলেই আমালতের দিকে রওনা দেয়া যাবে।

তোমার কি মনে হয় সে কোনো কাজে আসবে? জনে জিজ্ঞেস করেন।

আমার তো মনে হয় সে পারবে। তার ড্যান্স গ্রুপের কারণেই হয়তো ওখানে যারা কাজ করে তাদের কিছু লোকজনকে সে চেনে।

তাই বলো। কিন্তু সে কি বিশ্বাসযোগ্য? আমি বোঝাতে চাইছি মানে তার সামনে মরক্কোর পলিটিকস্ নিয়ে আলোচনা করা যায় কিনা।

আমার মনে হয় না সে আমাদের কোনো ক্ষতি করবে। যদ্দুর আমি জানি সে সবসময়ই তার গ্রুপ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সে যা চায় তা হলো বিদেশে পাড়ি দিতে এবং তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতে।

ওয়াকরিম এলে কেবল মাত্র জেরার্ডকে সঙ্গে নিয়ে আমালতে যায়। কালো ওয়েটারটা এসে আমার কাছ ঘেষে দাঁড়ায়। আমি শুনেছি উনি খুবই বিখ্যাত লেখক, সে আমার কাছে এসে ফিসফিস করে।

তারা তো তাই বলে, আমি বলি।

সে জানায় — ইনি খাটি ভদ্রলোক।

জনে তাকে একটা বন্ধুসুলভ হাসি দেয়। ওয়েটারটি তার দিকে এগিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। দারিজাতে (ভাষায়) বলে: আপনি হচ্ছেন চমৎকার মানুষ!

আপনিও ভাল মানুষ, জনেও দারিজাতেই উত্তর দেয়। এসময় কেউ হয়ত ওয়েটারটাকে ডাকলে সে টেবিল ত্যাগ করে।

আপনি কি ফ্রেঞ্চ কনস্যুলেটের কাছে সাহায্য চাইবেনই না যদি না স্বাভাবিক উপায়ে পাসপোর্ট পাওয়া যায়।

কখনোই না — জনে বলেন। ওই একটা জিনিস আমি কোনো কালেই করবো না। ফ্রেঞ্চ কনস্যুলেটের কাছে কোনো কিছু চাওয়ার বদলে আমি যে কোনো পরিমাণের পয়সা খরচ করতে রাজি আছি।

(কিস্তি ৩)

hossain_mofazzal@ymail.com


2 Responses

  1. হোসেন মোফাজ্জলের অনুবাদ আগে পড়িনি। ঝরঝরে অনুবাদ। আগামী কিস্তির জন্য অপেক্ষায় থাকবো। এটা কয় কিস্তি হবে? সম্পূর্ণ পড়ে মন্তব্য করার ইচ্ছা রাখি।

    মারুফ রায়হান

  2. সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ says:

    অনুবাদ ভালো হইতাছে। তবে ফরাসি শব্দগুলার ইংরেজির মতো প্রতিবর্ণীকরণে একটু (সামান্য অবশ্য) ক্লেশ হইতাছে। বই করবেন যহন ঠিক কইরা লইয়েন।

    – সুব্রত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.