মুজতবা আলীর অগ্রন্থিত রচনা: উইন্টারনিৎসকৃত কবি রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ও পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন

সৈয়দ মুজতবা আলী | ৮ মে ২০১৮ ৯:২৭ পূর্বাহ্ন

রবীন্দ্রনাথের সাথে সৈয়দ মুজতবা আলীর সম্পর্ক যৌবনের শুরু থেকেই। ১৯২১ সালে সিলেট ছেড়ে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রতিষ্ঠিত শান্তিনিকেতন-এ ভর্তি হন। রবীন্দ্রনাথের সরাসারি ছাত্র হওয়া ছাড়াও মুজতবা আলী রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে সত্যিকার অর্থেই ছিলেন বিশেষজ্ঞ। তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের মতো তিনি গবেষণাধর্মী কোনো গ্রন্থ লেখেননি বটে, কিন্তু ছোট ছোট যে-সব লেখা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তিনি লিখেছেন তা বহুভাষী মুজতবা আলীর পাণ্ডিত্য ও তুল্যমূল্যের বিচারে অনন্য হয়ে উঠেছে। মুজতবা আলীর মৃত্যুর পর স্মৃতি আর মূল্যায়নধর্মী বেশ কিছু লেখার একটি সংকলন বেরিয়েছিল গুরুদেব ও শান্তিনিকেতন নামে। তবে এই বইটি ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ নিয়ে মুজতবা আলীর দুএকটি লেখা রয়েছে যা এখনও পর্যন্ত তার রচনাবলীর অন্তর্ভুক্ত হয়নি। এটি সেই অগ্রন্থিত লেখাগুলোর একটি। লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে দেশ পত্রিকায় বাংলা ১৩৬৯ সনে। বিডিআর্টসের পাঠকদের জন্য লেখাটি পত্রস্থ করা হলো।


আলোকচিত্র:১৯২৬ সালের অক্টোবরে প্রাগ শহরে রবীন্দ্রনাথের ডান পাশে মরিস উইন্টারনিৎস, বাদিকে ভারততত্তবিদ ভিনসেঙ্ক লেসনি।

…..সৈয়দ মুজতবা আলী…..


সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস যে সব ইয়োরোপীয়রা লিখেছেন তার মধ্যে প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক স্বর্গত মরিৎস্ উইন্টারনিৎসই সর্বাপেক্ষা সুপরিচিত। বস্তুত তাঁর রচিত ‘ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস’ (Geschichte der indischen Literatur) এখনো কী প্রাচ্যে কী প্রতীচ্যে সর্বোত্তম বলে স্বীকার করা হয়। জর্মান এনসাইক্লোপেডিয়া তাঁর সম্বন্ধে লেখেন:
“উইনটারনিৎস মরিৎস ভারতীয় জ্ঞানবিজ্ঞানের পন্ডিত। জন্ম হর্ন (নিম্ব-অস্ট্রিয়া) ২৩। ১২।১৮৬৩।
মৃত্যু-প্রাগ ৯।১।১৯৩৭। ১৯০২ খ্রি: থেকে প্রাগে জর্মান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।

প্রধান প্রধান প্রকাশ: ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস, তিন খণ্ডে (১৯০৯-২২; ইংরেজিতে দুই খন্ডে, কলকাতা ১৯২৭-৩২): আপস্তবীয় গৃহ্যসূত্র (১৮৮৭), প্রাচীন ভারতের বিবাহানুষ্ঠান (১৮৯২), মন্ত্রপাঠ (ইংরেজিতে) অক্সফর্ড (১৮৯৭), ভারতীয় ধর্মসমূহে স্ত্রীলোক (১৯২০)।
বিশ্বভারতীর উত্তর-বিভাগ (কলেজ) খোলার সঙ্গে সঙ্গেই শান্তিনিকেতন আসেন প্যারিসের অধ্যাপক সিলভাঁ লেভি। ইনি কয়েক মাস অধ্যাপনা করার পর আসেন উইন্টারনিৎস। লেভিসাহেব সব সময়ই একটু অতিরিক্ত ‘গ্রিক, গ্রিক’ করতেন বলে উইন্টারনিৎস আসার প্রাক্কালে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বভারতীর তদানীন্তন অধ্যক্ষ বিধুশেখর শাস্ত্রীকে বলেন, শাস্ত্রীমশায়, এবারে যিনি আসছেন, ইনি মুক্তমনা। পৃথিবীর সব ভালো ভালো জিনিসই যে গ্রিস থেকে এসেছে এ কথা বলেন না।”

খুব সম্ভব উইন্টারনিৎস বৎসরাধিককাল বিশ্বভারতীতে ছিলেন। ঐ সময় জর্মানে লিখিত তাঁর ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাস পুণাতে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হচ্ছিল এবং কিস্তিতে কিস্তিতে শান্তিনিকেতনে তাঁর কাছে আসত। এখানকার পন্ডিতদের ভিতর কেউই তখন জর্মান জানতেন না বলে সে বইয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ইংরেজি বইয়ের মারফতে, রেফারেন্স্ রূপে। উইন্টারনিৎস বিশ্বভারতীয় ছাত্র ও অধ্যাপকদের সম্মুখে তাঁর মূল জর্মান গ্রন্থের পরিপূর্ণ ইংরেজি অনুবাদ পড়ে শোনাতেন (Vorlesung) এবং পড়া শেষে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে ‘ক্ষিতিমোহন সেন’, ‘বিধুশেকর শাস্ত্রী’, ‘সন্তোষ মজুমদার’ প্রভুতি উইন্টারনিৎসের সঙ্গে আলোচনা করতেন। আমরা ছাত্ররা সাধারণত এ আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতুম না।
এ ছাড়া তিনি সুদ্ধমাত্র ছাত্রদের জন্য আলাদা ক্লাসে সংস্কৃত টেক্সট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়াতেন। ব্যাকরণ থেকে আরম্ভ করে অলংকারের কঠিন কঠিন বিষয় ঐ সব ক্লাসে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আলোচিত হত।
সংস্কৃত নাট্য তিনি কখনও দেখেননি বলে ক্ষোভ করাতে রবীন্দ্রনাথ স্বর্গত সংগীতজ্ঞ পন্ডিত ভীমরাও শাস্ত্রীকে একখানা সংস্তৃত নাটক অভিনয় করাতে আদেশ দেন। ফলে উত্তররামচরিত অভিনীত হয়।’ উইন্টারনিৎস পরম পরিতৃপ্তি লাভ করেন ও পরে বলেন, ‘আমার বারবার রোমহর্ষণ হচ্ছিল।’ যিনি জীবনের অধিকাংশ ভাগ সুদূর প্রাগে বসে সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চা করে কাটালেন তিনি যখন মঞ্চের উপর সংস্কৃত নাটক প্রথম দেখলেন তখন তার পক্ষে বিচলিত হওয়াই স্বাভাবিক।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিখরে আসীন এই প্রাচ্য বিদ্যামহাসিন্ধু তবু আমাদের স্কুলটিকে অবহেলা করতেন না। তখনকার দিনে পদ্ধতি ছিল, হেড ক্যাপটেন হুইসিল্ বাজিয়ে জানাত, পিরিয়ড শেষ হয়েছে। ঘণ্টাতলার আশপাশে যে তখন থাকত সে ঘন্টা বাজিয়ে দিয়ে আশ্রমময় খবরটা ব্যাপ্ত করত। উইন্টারনিৎস সাহেব এ তথ্যটি জানতেন না বলে আশ্রমের ভিতর দিয়ে যাবার সময় হুইসিল শুনে ধরেছেন খপ করে ক্যাপটেনের হাত। শান্ত মৃদু কণ্ঠে ছেলেটিকে বললেন, আশ্রমময় সবাই মনোযোগসহ লেখাপড়া করছে, আর তুমি তার মাঝখানে বাজাচ্ছ উইসিল। স্বয়ং গুরুদের যাঁর সঙ্গে অতিশয় সম্মানের সঙ্গে কথা বলেন, তিনি যদি খপ করে চোদ্দ বছরের ছেলের হাত পাকড়ে ধরেন তবে তার অবস্থাখানা কী হয়? তার মুখ দিয়ে কথা ফোটেনি, আর একটু হলে কেঁদে ফেলত। সায়েব তাকে হেডমাস্টার জগদানন্দবাবুর কাছে নিয়ে গিয়ে উত্তম সংস্কৃতে বুঝিয়ে দিলেন, ছেলেটা কী অপকর্ম করছিল। জগদানন্দবাবু সংস্কৃত যে জানতেন না তা নয়, কিন্তু কথা বলার মতো অতখানি না। জগদানন্দবাবু আঁকের বইয়ে মাথা গুঁজে ছেলেদের উদ্দেশ্যে বিড়বিড় করে বলে যেতে লাগলেন, নিয়ে যা না ওঁকে, নিয়ে যা না, হরিবাবুর কাছে। কী ফাঁপরে ফেললে রে, বাবা!’
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বিখ্যাত কোষ প্রণেতা, সংস্কৃতের মাস্টার ছিলেন।
মুশকিল আসান হওয়ার পর উইন্টারনিৎস সাহেবকে বিড়বিড় করে বলতে শোনা গেল, ‘আমি ভেবেছিলুম, এদেশের অধ্যাপকমাত্রই সংস্কৃত বলতে পারেন; আমরা যে রকম দরকার হলে ইয়োরোপে লাতিনটা বলে নিতে পারি।’
এখানে থাকাকালীন উইন্টারনিৎসকে বাঙলা বলতে শুনিনি। বাঙলা তিনি পড়তে পারতেন। উত্তমেরও উত্তম সংস্কৃত জানা থাকলে বাঙলা শেখাটা যে খুব কঠিন কর্ম নয় সেটা সহজেই অনুমেয়। তদুপরি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এই সব বিদেশি পণ্ডিতদের বাঙলা শিখতে সাহায্য করতেন। সিলভাঁ লেভিকে ‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবন খানি’ গানটি তাঁকে শব্দে শব্দে অনুবাদ সহ টীকা করে বোঝাতে আমরা শুনেছি। অর্থাৎ বাঙলায় রচা রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার সঙ্গে উইন্টারনিৎস পরিচিত ছিলেন।’
ব্যক্তিগতভাবে উইন্টারনিৎস মহাশয়ের যে পরিচয় আমি পেয়েছি সে পরিচয় তাঁর রচনাতেও সকলেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁর ভারতীয় সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, ষড়দর্শন ইত্যাদি সংস্কৃতের তাবৎ উৎকৃষ্ঠ গ্রন্থ তথা শংকর, রামানুজ ইত্যাদির দর্শনের চুম্বক ও তার পর তাঁর নিজস্ব টীকাটিপ্পনী দিয়েছেন। এই চুম্বক দেওয়ার সময় তিনি যে অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন সেটি একেবারে অদ্বিতীয় অতুলনীয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আজ স্বয়ং ব্যাস মুনি এসে উপস্থিত হলেও এ কথা বলতে পারবেন না, উইন্টারনিৎস তাঁর পুস্তকে মহাভারতের যে চুম্বক দিয়েছেন তাতে কোনো গুরু বক্তব্য বাদ পড়েছে।
তাই আমাদের মনে হয়, রবীন্দ্রনাথের ধর্ম ও জীবনদর্শনের নির্যাস পরিবেশন করা, তথা সে সম্বন্ধে অভিমত প্রকাশ করার শাস্ত্রাধিকার ছিল তাঁরই সবচেয়ে অধিক। পঞ্চাশোধিক বর্ষ ধরে যিনি ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান ঋষিদের জীবন নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন, তাদের ধর্ম তাঁদের দর্শন কখনও শব্দে শব্দে অনুবাদ করে, কখনও নির্যাস নির্মাণ করে পরিবেশন করেছেন, পূর্বসূরিদের কাছে তাঁরা কতখানি ঋণী,পরবর্তী যুগের ধর্ম ও দর্শন জগতের উপর তাঁরা কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন–নানা দৃষ্টিবিন্দু নানা দৃষ্টিকোণ থেকে যিনি এই সমুদয় হৃদয়ঙ্গম করে অতিশয় প্রাঞ্জল ভাষায় প্রকাশ করেছেন তিনিই পারেন রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন নিয়ে আলোচনা করতে। আমাদের পরম সৌভাগ্য যে এহেন পণ্ডিতের সঙ্গে কবিগুরুর যোগসূত্র স্থাপিত হয়েছিল। ফলে আমরা এই পুস্তিকাখানা লাভ করেছি।

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ যখন তাঁর পঁচাত্তর জন্মদিবসে উপনীত হন, তখন সুদূর প্রাগে বসে উইন্টারনিৎস ত্রয়োদশ বৎসর পশ্চাতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে–পূর্ব পরিচয় উভয়ের ছিল, কিন্তু ঐ সময়ে তিনি শান্তিনিকেতনে অধ্যাপকরূপে এসে প্রায় প্রত্যহ কবিগুরুর সঙ্গে প্রহরাধিক কাল সময় কাটাতে আরম্ভ করেন– এই পুস্তিকাখানি রচনা করে কবিগুরুকে উৎসর্গ করেন (Dem Dichter Zu Scinem 75. Geburtstag) নৈতিক উন্নতির ও উৎকর্ষের জন্য প্রাগে তখন যে জর্মান সংঘ ছিল তাঁরাই এই পুস্তিকাখানি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ করেন। এর এক বৎসর পরই তিনি ইহলোক পরিত্যাগ করেন। তাঁর অগণিত শিষ্য তখন শোকাতুর হয়েছিলেন, কিন্তু যখন ভাবি, এর পর এক বৎসর যেতে না যেতেই ইংরেজ ফরাসি নিরতিশয় নির্লজ্জতার সহিত ম্যুনিকের ‘চুক্তি’ দিয়ে চেকোশ্লোভাকিয়াকে হিটলারের মন পাওয়ার জন্য আপন দেশের সব ইহুদি শিক্ষকদের ডিসমিস করেছেন, এবং তৎসত্ত্বেও আরও তিন মাস যেতে না যেতেই হিটলার প্রাগ অধিকার করে হ্রাজিন রাজপ্রাসাদে রাত্রিযাপন করছেন, এবং তার কিছুদিন পরেই প্রথম হাইড্রিস এবং পরে আইসমান্ ইহুদি নিধন আরম্ভ করে দিয়েছে–ইতিহাসের এই নির্মম হৃদয়হীন পটপরিবর্তন যখন দেখি তখন মনে হয়, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে উইন্টারনিৎস ইহলোক ত্যাগ করে ভালোই করেছিলেন।

কারণ, তিনি ছিলেন খাঁটি ধর্মভীরু ইহুদি। আইনস্টাইনের মতো প্রাণ রক্ষার সুযোগ হয়তো তিনি পেতেন না।

১৯৩৬-৩৭ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রসাহিত্যপ্রচারকর্মের একনিষ্ঠ সাধক শ্রীযুত পুলিনবিহারী সেন এই পুস্তিকার একখণ্ড আমাকে দেন। দুর্ভাগ্যক্রমে সেখানা হারিয়ে যায়। পরে যখন প্রাগে অনুসন্ধান করি, তখন এটি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে (হয়তো রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে পুস্তিকাখানি পুনর্মুদ্রিত হয়েছে)। অধুনা শ্রীযুত শোভনলাল গঙ্গোপাধ্যায় রবীন্দ্রসদন থেকে বইখানা আমাকে দেন।
অবতরণিকায় অধ্যাপক উইন্টারনিৎসের মূল বক্তব্য এই:–
বক্ষ্যমাণ পুস্তিকার লেখক রবীন্দ্রনাথের সত্তরতম জন্মদিবস উপলক্ষে প্রাগের প্রাচ্যভবনে ১১ই ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে যে বক্তৃতা দেন এই পুস্তিকা ভারতীয় কবির চিন্তাজগতের উপর লেখা গুরুগম্ভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ রচনা নয়; এবং কবির কাব্যসৃষ্টি, বক্তৃতা ও অন্যান্য রচনার মাধ্যমে তাঁর যে ধর্ম ও ভূয়োদর্শন প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো ছিমছাম ফিটফাট করে তার থেকে কোনো বিশেষ মতবাদ বের করার চেষ্টাও এতে করা হবে না। এহেন প্রয়াস নিস্ফল। সৃষ্টিকর্তা, পৃথিবী ও মনুষ্য সম্বন্ধে কবির ধারণা কখনোই এক বিশেষ মতবাদে পরিবর্তিত করে তার গায়ে লেবেল সাঁটা যায় না। তবু বোধহয় আশা করলে অন্যায় হবে না যে, এই বত্তৃতা (পুস্তকের অন্তে তাঁর রচনা, বক্তৃতা ও চিঠিপত্র থেকে একটি চয়নিকাসহ) পূর্ব পশ্চিম চিন্তাধারার সফল প্রয়োগ, কবির সাধনাময় ব্যক্তিত্বের একটি পরিস্কার চিত্রাঙ্কণ করতে সমর্থ হবে।
পূর্ব ও পশ্চিমকে সম্মিলিত করা যাতে করে তারা একে অন্যকে ভালো করে বুঝতে পারে, এবং তারই প্রসাদে উভয়ের সাধনা ফলবর্তী হয় এই ছিল রবীন্দ্রনাথের আদর্শ এবং সে আদর্শ তিনি তাঁর জীবিতাবস্থায়ই রূপ দিতে সক্ষম হয়েছেন। সে রূপ আমি অবিস্মরণীয় ১৯২২-২৩ খ্রিস্টাব্দে স্বচক্ষে দেখবার সুযোগ লাভ করি। পূজনীয় কবির অতিথিরূপে আমি ঐ সময়ে তাঁর, তাঁর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ছাত্র, তথা প্রাচী প্রতীচী থেকে সম্মিলিত তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধুমন্ডলীর সঙ্গে ঐ আদর্শ রূপায়িত করার সহযোগিতার সৌভাগ্য লাভ করি।”

প্রাচী প্রতীচীকে সম্মিলিত করার যে প্রচেষ্টায় রবীন্দ্রনাথ সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন, তাঁর ৭৫ জন্মদিবসে তাঁকে উৎসর্গিত এই ক্ষুদ্র রচনাটি সেই প্রচেষ্টার সেবক হোক।

আজ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের জীবনাদর্শ, তাঁর ধর্ম, তাঁর সাধনা সম্বন্ধে আমি যে-সব পুস্তক পরেছি তার মধ্যে আমি পণ্ডিত, সাধক, দ্রষ্টা অধ্যাপক মরিৎস উইন্টারনিৎসের এই অতি ক্ষুদ্র পুস্তিকাখানিকে নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ আসন দিই।
এই পুস্তিকা সর্বপ্রকারের উচ্ছ্বাস ভাবালুতা বর্জিত। প্রত্যেকটি শব্দ প্রত্যেকটি বর্ণ স্বচ্ছ, সরল, সহজ। তথাকথিত ‘মিস্টিকতার’ আলো-ছায়ার আধা-বোঝা-আধা-না বোঝার কণামাত্র চিহ্ন এতে নেই। যে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক এই পুস্তিকাখানি অনায়াসে বুঝতে পারবেন।
এ পর্যন্ত আমি এই পুস্তিকার কোনো অনুবাদ বা এর থেকে উদ্ধৃতি কোথাও দেখিনি। বাঙলা কিংবা অন্য কোনো ভাষাতে।
এ্ পুস্তিকার (Rabindranath Tagore, Religion and Weltanschauung des Dichters) আশু অনুবাদ হওয়ার প্রয়োজন।
প্রতিবাদীদের কেউ কিংবা কোনো শাস্ত্রাধিকারী যদি পুস্তিকাখানি অনুবাদ করেন, তবে গৌড়জন উপকৃত হবে-এ বিষয়ে আমার মনে কণামাত্র সন্দেহ নেই।
আমার এক সহকর্মী এটির হিন্দি অনুবাদ করবেন।

উল্লেখপঞ্জী

১। আমার ঠিক স্মরণ নেই, তবে বোধহয় লেভিসাহেব সংস্কৃত নাটকের মূল উৎপত্তি গ্রিসে, এই মীমাংসা প্রকাশ করেছিলেন। গুণীজন সহজেই সত্যানুসন্ধান করে নিতে পারবেন।
২। সংগীতজ্ঞ শ্রীযুত অনাদি দস্তিদার সীতা সাজেন।
৩। এটি আশ্রমের প্রাক্তন ছাত্র কানাইলাল (ভজু-কানাই) সরকারের কাছ থেকে শোনা।
৪। উইন্টারনিৎসের মাতৃভাষা ছিল জর্মান। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন অধ্যাপক লেসনি। এর মাতৃভাষা চেক। ইনি প্রধানত বাঙলার দিকে মনোযোগ দেন ও পরবর্তীকালে চেক ভাষায় রবীন্দ্রনাথের একাধিক পুস্তক অনুবাদ করেন।
৫। হিটলার এই আদর্শের জাতশত্রু ছিলেন। হিটলার কর্তৃক এই আদর্শ পদদলিত–তা সে যত অল্পক্ষণের জন্যই হোক–হওয়ার পূর্বেই ইহলোক ত্যাগ করে অধ্যাপক উইন্টারনিৎস সে নিদারুণ অভিজ্ঞতা থেকে নিস্কৃতি পান–একথা পূর্বেই উল্লেখ করেছি।
৬। আমার অটোগ্রাফ খাতায় উইন্টারনিৎস লিখে দেন, গ্যেটে বলেছেন, “প্রাচী প্রতীচী ভবিষ্যতে আর পৃথক পৃথক হয়ে থাকতে পারবে না”। ইতিহাস আমাদের শেখায়, প্রাচী প্রতীচী কখনও পৃথক পৃথক ছিল না।”
৭। এটি বাঙলায় অনুবাদ করার ইচ্ছা একদা আমার ছিল। কিন্তু অধুনা ‘ধ্বনি’ (‘ধ্বনিতত্ত্ব’ বা ফনেটিকস নয়-নিছক ‘ধ্বনি’) প্রবন্ধ লিখে আমি চারদিক থেকে ম্যুনিক, বার্লিন, দিল্লি বিল্লি কোনো জায়গা বাদ যায়নি–এমনই কটুবাক্য শুনেছি যে আমার মনে হল আমি ‘ধ্বনি’ কেন জর্মান ভাষার সামান্যতম জ্ঞানও আমার নেই। অতএব সে বাসনা বর্জন করেছি।

(মরিস উইন্টারনিৎস-এর রচিত Geschichte der indischen Literatur বইটি যারা অনলাইনে জার্মান ভাষায়
পড়তে আগ্রহী তারা এই লিংকটিতে বইটি পাবেন:
Geschichte der indischen Literatur

বিডিআর্টস-এ প্রকাশিত সৈয়দ মুজতবা আলীর আরেকটি লেখা:
শোকগ্রস্ত রবীন্দ্রনাথ

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (0) »

এখনও কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com