হেলেনীয়বোধ, গ্রিক কবিতা ও কাভাফি

কুমার চক্রবর্তী | ৩ মে ২০১৮ ২:১৫ অপরাহ্ন

মহামতি আলেকজান্দারের সময় থেকেই আমরা আমাদের হেলেনিসমকে সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছি। সারা বিশ্বজুড়ে আমরা এর বীজ বপন করেছি: কাভাফির ভাষায়, ছড়িয়ে দিয়েছি দূরবর্তী ব্যাকট্রিয়া অঞ্চলে, দূরবর্তী ভারতীয়দের মধ্যে। আর এই ব্যাপক ছড়িয়ে-পড়া এক তাৎপর্য বহন করে এনেছিল। সংস্কার ও পুনরুজ্জীবনের ভেতর দিয়ে এই হেলেনিসম কাজ করেছিল রেনেসাঁসের সময় পর্যন্ত কতিপয় ব্যক্তির দ্বারা যারা ছিলেন কখনও গ্রিক কখনও-বা অ-গ্রিক। এই সময়ের পর থেকে, যা গ্রিক জাতির দাসত্বের কাল হিসেবে চিহ্নিত, বিশেষ ব্যক্তিত্বদের দ্বারা গ্রিসের বাইরে পুনর্গঠিত হয়েছিল তা, এই ব্যক্তিত্বরা মোটেই ছিলেন না গ্রিক। আর আমাদের মনে রাখতে হবে, এটা ঘটেছিল সেই সময়ে যখন সম্পন্ন হয়েছিল বিশাল কাজগুলো যা সেই সভ্যতাকে স্ফটিকায়িত করেছিল যাকে এখন আমরা জানি ইউরোপীয় সভ্যতা বলে।
এই সভ্যতা, যা আসলে হেলেনীয় সভ্যতার মূল্যবোধের সন্তান, আমাদের প্রজন্ম বা আমাদের নিকটবর্তী পূর্বসূরিদের দ্বারা সৃষ্ট হয়নি। আমাদের নিকট পূর্বসূরিরা অতীতের এই রত্নকে সংরক্ষণ করেছিল, আর বাইজানটিয়ামের পতনের পর তারা তা ত্যাগ করে বসল, যেমনটা বলেছিলেন পালামাস এভাবে যে, তারা ধরে রেখেছিল পূর্বসূরিদের ভস্মভরতি বিশাল কলসগুলো, আর এজন্যই হেলেনিসমের বীজ এসে পড়ল ইউরোপের মাটিতে, উপযুক্ত ও মুক্ত স্থান পেয়ে তার ঘটল সমৃদ্ধি।

[কবিতাবিষয়ক সংলাপ: হেলেনিসম-এর মানে কী?, অন দ্য গ্রিক স্টাইল, জর্জ সেফেরিস]

“ইতিহাসে গ্রিক সভ্যতার আবির্ভাবের মতো আশ্চর্যজনক বা চমকপ্রদ ঘটনা আর কিছুই পরিলক্ষিত হয় না”―বারট্রান্ড রাসেল তাঁর পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস শুরুই করেছেন এই বাক্য দিয়ে। তিনি এ কথার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলছেন, সভ্যতার অনেকানেক উপাদানই বিরাজমান ছিল মিশর ও মেসোপটেমিয়ায় অনেক বছর ধরে, কিন্তু তবু যে গ্রিসে সভ্যতা দেখা দিল তার কারণ ছিল―শিল্প ও সাহিত্যে তাঁদের সাফল্য আর বিশুদ্ধ বৌদ্ধিক এলাকায় তাঁদের কীর্তি; এবং গণিত, বিজ্ঞান ও দর্শনের আবিষ্কার, সার্থক ইতিহাস রচনা আর মুক্তচিন্তাজারিত দূরকল্পন। রাসেল আরও বলছেন, এসব বিষয়ই গ্রিক সভ্যতাকে দিয়েছিল অনন্য মাত্রা যা আজকের মানুষ অবাক হয়ে পর্যবেক্ষণ করে। আমরা জানি, পুথাগোরাস, হেরাক্লিতস, হেরোদোতুস, আনাক্সাগোরস, পরমাণুবাদীগোষ্ঠী, প্রতাগোরস, সোক্রাতেস, প্লাতন, আরিস্তোতলেস হয়ে এই সভ্যতা হেলেনীয়যোগে এসে হাজির হয় যার সূচনা করেছিলেন ফিলিপ ও আলেকজান্দ্রোস (আলেকজান্দার)। কিন্তু কেন একে বলা হয় হেলেনীয়? হেলাস বা হেলেনেস শব্দটি দ্বারা বোঝানো হতো আবহমান গ্রিসকে, এই নামের ব্যুৎপত্তি ঘটে পৌরাণিক যুগের এক মানবী হেলেন থেকে; হেলাস বোঝাত হেলেন বা তার উত্তপুরুষদের অধিকৃত এলাকাকে। যা-ই হোক, এই সময়ে ঘটে বিজ্ঞান ও গণিতের ক্ষেত্রে সেরা কাজগুলো। মহামতি আলেকজান্দার খ্রিস্টপূর্ব ৩৩৪-৩২৪ সময়ে এশিয়া মাইনর, সিরিয়া, মিশর, ব্যাবিলনিয়া, পারস্য, সমরখন্দ, ব্যাকট্রিয়া ও ভারতের পাঞ্জাব জয় করেন, এর ফলে ব্যাপ্তি ঘটে হেলেনীয় সভ্যতার উপাদানগুলোর। অন্যদিকে হেলেনীয় সভ্যতায় অনুপ্রবিষ্ট হয় ব্যাবিলনীয় জ্ঞান, জরাথুস্ট্রীয় দ্বৈতবাদ, ভারতীয় বৌদ্ধ চিন্তা। হয়তো প্রথমবারের মতো ঘটে বিশ্বায়ন। গ্রিসের বাইরে প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রিক প্রভাব আর গ্রিসে প্রভাব ফেলে গ্রিকবহির্ভূত চিন্তা। হেলেনীয়যুগের দর্শন তার আগের সময়ের দর্শন অপেক্ষা কিছুটা দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও চারটি দার্শনিক মতবাদ আবির্ভূত হয়েছিল সে-যুগে যাদের মধ্যে দুটো, এপিকুরীয় ও স্টোয়িক, ছিল শক্তিশালী। হেলেনীয়যুগে বিজ্ঞান, অঙ্ক ও ইতিহাস রচনায় বিপ্লব ও ব্যাপ্তির পাশাপাশি ঘটেছিল সাহিত্যিক উৎকর্ষও, তার প্রমাণ হোমার। রাসেল বলেছেন, হেলেনীয় সভ্যতার প্রথম উল্লেখযোগ্য অবদান হলো হোমার, যদিও ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, হোমার একজন নয়, অনেক কবিই হোমার হিসেবে পরিচিত ছিলেন, আর ইলিয়দঅদিসি সমাপ্ত হতে লেগেছিল দুইশ বছর।

হোমার, যার গ্রিক নাম ওমেরস, সাহিত্যে এখন পর্যন্ত একক কিংবদন্তিসম ব্যক্তিত্ব। আর তাঁর রচিত ইলিয়াদঅদিসি সমগ্র বিশ্বকে যতটা প্রভাবিত করেছে, তা অপ্রতিম। এই রচনাদ্বয় পরিণত হয়েছে কীর্তিতে যার প্রভাব চলিষ্ণু। আলেকজান্দার যুদ্ধযাত্রায় সাথে রাখতেন হোমারের পাণ্ডুলিপি, পড়তেন তাঁবুতে বসে। এ পর্যন্ত শুধু ইংরেজি ভাষায়ই ইলিয়াদ-এর অনুবাদ হয়েছে ৩১৫টি, প্রথম অনুবাদটি হয় ১৫৯৮ সালে জর্জ চ্যাপম্যান কর্তৃক। মানুষের নিয়তি ও করুণপরিণতি বারে বারে বেজে ওঠে ইলিয়াদ-এ: ‘নশ্বর মানুষগুলো কত না করুণাপ্রার্থী, অল্প সময়ের জন্য বৃক্ষের পাতার মতোই হয়ে ওঠে সবুজ-সতেজ, উর্বর খেতের ফল খেয়ে পুষ্ট হয় তারা, হয় জীবনের প্রবৃদ্ধি, আর একটু পরেই ক্লিশ আর কৃশ হতে হতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় চিরতরে।’ হোমার প্রভাবিত করেছেন অনেককে, যুগে যুগে: ভার্জিল, দান্তে, মিলটন, এমনকি সরাসরি আধুনিক যুগের কবি ডেরেক ওয়ালকটকেও; ফলে সৃষ্টি হয়েছে ইনিদ, লা দিভিনা কম্মেদিয়া,প্যারাডাইস লস্ট, ওমেরস; বিখ্যাত আধুনিক গ্রিক কবি-লেখক কাজান্তজাকিস রচনা করলেন অদিসি: এক আধুনিক অনুবৃত্তি যেখানে হোমারের অদিসির আঙ্গিককে ব্যবহার করে ৩৩৩৩৩ পংক্তির আধুনিক মহাকাব্য রচিত হলো । আর পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হওয়ার ঘটনা বলা যায় অসংখ্য―যেমন লেভ তলস্তয় বলেছেন, সময়ের বিবেচনায় হোমার দূরের হলেও কিছুমাত্র কষ্ট না করেও তাঁর বর্ণিত জগতে নিজেদের নিয়ে যাওয়া যায়।

পৃথিবীর সব কবিতাই হয় ইলিয়াদ নয় অদিসি, এ বাক্যের দ্বারা কবিতার আদি মাহাত্ম্যকে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। কবিতার ইতিহাস কোনো না কোনোভাবে প্রত্নরূপে এ দুটো মহাকাব্যে নিহিত আছে। কিন্তু এখানে তো মাত্র শুরু; গ্রিক নাটক, কাব্যতত্ত্ব, এমনকি দর্শন, সবকিছুই তো কবিতারই এক অপর অভিজ্ঞান রচনা করেছে যদিও আমরা কবিতা সম্পর্কে প্লাতনের উক্তিকে ভুলে যাইনি। প্লাতোন সারাজীবন আপ্লুত ও অভিভূত ছিলেন কবিতায়, লিখেছেনও কবিতা, কিন্তু তিনিই বলে বসলেন কিনা কাব্য সত্য থেকে দূরে থাকে। তবে তিনি কবিতাকে গ্রহণ করতেও রাজি হয়েছিলেন যদি প্রমাণ হয় যে কবিতা মানুষের মঙ্গল করে। তিনি তাঁর নগরনীতিতে বলেছিলেন, জন্ম থেকেই তিনি ভালোবাসেন হোমারকে, কারণ হোমার ট্র্যাজেডি-সৌন্দর্যের প্রথম স্রষ্টা। যা-ই হোক, আধুনিক গ্রিস এবং বিশেষত আধুনিক গ্রিক ভাষা ও সাহিত্য, দুটোই আকর্ষণীয় এবং অনুপম। এর কারণ, হয়তো আর-কোনো ভাষা বা সাহিত্যেরই এত দীর্ঘ ইতিহাস নেই যা এক অনন্য সভ্যতার পরিচয়বাহী ও ধ্বজাধারী হয়ে আছে। এখনকার একজন গ্রিক লেখক যেসব শব্দ বা শব্দবন্ধ প্রয়োগ করেন তা অবলীলায় শেকড়সন্ধানী হয় প্রাচীন গ্রিক ভাষার শব্দ বা বাকসৌন্দর্যের সাথে, এবং এটা আশ্চর্যের যে, এই সমস্ত শব্দাবলি কোনো না কোনোভাবে সমগ্র পৃথিবীর শব্দকোষকেও প্রভাবিত করছে। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এবং পীড়ন সত্ত্বেও পুরোনো ও নতুন ধারাপাত এখনও প্রবাহিত গ্রিক ঐতিহ্যে। বিপুল পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েও তাই গ্রিক ভাষা ও সাহিত্য ধর্মচ্যুত হয়নি আত্মপরিচিতির উদ্ভাসনে।

এই নবগঠিত হেলেনীয়বোধের উত্তরাধিকারই আধুনিক গ্রিক কবিতা। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রিক কবিতার ক্ষেত্রে অবিস্মরণীয় যে নামটি এসে যায় তিনি কনস্তানতিন পেটার কাভাফি, যিনি ১৮৬৩ সালের ২৯ এপ্রিল আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। কর্মসূত্রে তিনি ছিলেন সরকারি চাকুরে, ১৮৯২ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে তিনি যে পদ পান এবং সে-পদেই অবসর নেওয়া পর্যন্ত তিনি কর্মরত ছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের লেখালেখিতে গ্রিক ইতিহাস, পুরাণ, ধ্রুপদি ও হেলেনীয়, বাইজানটীয় বিষয়বস্তুর প্রাধান্য ছিল। তিনি তাঁর মা হারিক্লেইয়া-র সাথে রাতের খাবার খেতেন, তারপর অধিকাংশ সময়ে পালিয়ে শহরের সমকামী পল্লিতে চলে যেতেন। এই বিষয়টি তাঁর লেখাকেও ঋদ্ধ করেছে। মানবকামের গূঢ়ৈষা তাঁর অভীপ্সিত ছিল। আজীবন ধুমপায়ী কাভাফি ফুসফুসের ক্যান্সারে ১৯৩২ সালে মারা যান। তাঁর সম্পর্কে ই. এম. ফরস্টার বলেছিলেন: ‘খড়ের টুপি মাথায় একবারে স্থাণুবৎ জগতের দিকে ঈষৎ বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক গ্রিক ভদ্রলোক।’ কাভাফি ছিলেন অনবদ্য এক আধুনিক। প্রাচীন ভাষা ‘কাথেরউঔসা’কে আধুনিক জনভাষা ‘দেমোতিকে’র সাথে নিজের ইচ্ছামতো বিমিশ্রিত করেছেন তিনি। পুরোদস্তুর অভিজাত এবং শহুরে হওয়া সত্ত্বেও আধুনিক জীবনের প্রতি তাঁর এক গোপন ঘৃণা ছিল, ধ্রুপদি অতীতের প্রতি ছিল তাঁর এক মোহ আর স্মৃতিআর্তি। প্রাচীন বিশুদ্ধ ভাষা আর জনভাষাকে তিনি অতি শৈল্পিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন তাঁর লেখায়। যেহেতু তাঁর স্বপ্নের জগৎ ছিল অতীতের জগৎ, তাই প্রাচীন ভাষার ব্যবহার তাঁর কবিতায় লক্ষণীয় কিন্তু তা বোধগম্য এবং উপযোগীভাবে হয়েছে ব্যবহৃত। গোপনীয়তায় লেখালেখি করে গেছেন তিনি, চল্লিশ বছর বয়স হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর প্রতিভার আঁচ টের পাওয়া যায়নি। একান্ত ব্যক্তিগত সীমারেখায় তিনি কবিতা লিখে যেতেন। ফরস্টার ও অল্পসংখ্যক তাঁর কবিতার গুণগ্রাহী ছিলেন। ১৯৩৫ সালের আগে তাঁর কবিতা প্রকাশ্যে বেরও হয়নি তেমন। ফরস্টার ১৯২২ সালে তাঁর গাইড টু আলেকজান্দ্রিয়া বইয়ের মাধ্যমে তাঁকে সারাবিশ্বে পরিচয় করিয়ে দেন যেখানে তাঁর কিছু কবিতার অনুবাদও ছিল। পেগানিজম এবং খ্রিস্টানত্বের সম্মিলন কাভাফির লেখায় পরিলক্ষিত। তাঁর প্রসিদ্ধ কাজগুলো হলো: ইথাকা, ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস, দ্য গড অ্যাবানডনস অ্যান্টনি। ‘শিল্পে এনেছি আমি’ কবিতায় তিনি বলেন:
বসে বসে ভাবি। শিল্পে এনেছি আমি
অনুভূতি আর কাঙ্ক্ষাবোধ―আবছা আভাসিত কিছু
অবয়ব বা রেখা; অপূর্ণ প্রেমের কিছু অনিশ্চিত স্মৃতিচিহ্ন।
একে আমি দিয়ে দিয়ে যাই।
তা জানে আকার নিতে মাধুর্যের রূপ;
প্রায় অগোচরে জীবন হয়েছে উথলিত,
একসাথে বিদ্ধ করে অভিব্যক্তি, বিদ্ধ করে দিনরাশি একত্রে আবার।

শতাব্দীপ্রাচীন এক কবির বিষন্নতার ভেতর থেকে তিনি লেখেন যিনি তাঁর যুগ এবং ধূসর সৌন্দর্যের সাথে একাত্ম হতে পারেন না: “হে কাব্যশিল্প, আমি তোমার কাছে ফিরে আসি/ যেহেতু তোমার আছে নিদানের একধরনের জ্ঞান:/ ভাষা আর কল্পনার সুনিশ্চিত নিদ্রাবটিকা।”
কাভাফি নিজেকে মনে করতেন একজন ‘ঐতিহাসিক কবি’। তিনি বলেছেন, ‘আমি কখনোই একটি উপন্যাস বা নাটক লিখে উঠতে পারতাম না; কিন্তু আমি আমার ভেতরে শুনতে পাই একশ পঁচিশটি কণ্ঠস্বর যা আমাকে বলে যে আমি ইতিহাস লিখতে পারতাম।’ এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তাঁরই গুণমুগ্ধ কবি জর্জ সেফেরিস ‘কাভাফি ও এলিঅট: একটি তুলনা’ নামক প্রবন্ধে বলেন, ঐতিহাসিক কবি মানে নয় এমন একজন কবি যিনি হবেন একজন ইতিহাসবিদ; কবি শব্দটির যদি মোটের উপর থাকে কোনো অর্থ, তা হলে তা অবশ্যই বোঝায় এমন একজন মানুষ যার রয়েছে ইতিহাসের জন্য এ ধরনের অনুভূতি, ইতিহাসবোধ। এর সমর্থনে সেফেরিস উল্লেখ করেছেন এলিঅটকে, ‘ঐতিহ্য ও ব্যক্তি প্রতিভা’ নামক বিখ্যাত প্রবন্ধে এলিঅট যা বলেন, সেফেরিসও তার উদ্ধৃতি দেন: ‘ইতিহাসবোধ এক ইন্দ্রিয়চেতনা, তা নয় কেবল অতীতের অতীতময়তা, বরং অতীতের বর্তমানময়তাও।’ কাভাফি ছিলেন কবিতাপ্রাণ, যেন কবিতা লেখার জন্যই তাঁর জীবন, বস্তুত কবিতা ছাড়া তেমন কিছু লেখেনওনি; মৃত্যুর কয়েকমাস আগে, তিনি যখন আথেন্সে কর্কটরোগে ধরাশায়ী, তাঁকে বলতে শোনা গেছে যে, ‘আরও আমার পঁচিশটি কবিতা লেখা বাকি রয়ে গেল।’
কবি জর্জ সেফেরিস কাভাফির লেখনরীতিতে প্রভাবিত ছিলেন । জর্জ সেফেরিস তাঁর নোবেল বক্তৃতায় কাভাফির কথা উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: ‘পালামাসের অন্যদিকে তাঁর অবস্থান। মিশরের বিখ্যাত হেলেনীয় কৃষ্টির অংশ ছিলেন তিনি।…ইতিহাসচেতনা আর একে অস্বীকারের সংস্কৃতিতে তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম।… কাভাফিকে আমি আলেকজান্দ্রিয়ার উপকূলে সমুদ্র দেবতা প্রোতেউসের সঙ্গে তুলনা করি।…পালামাস এবং সলোমোসের মতো জনপ্রিয় শিল্পধারার ঐতিহ্যকে তিনি গ্রহণ করেননি। তিনি ছিলেন বৈদগ্ধ্যমণ্ডিত।’

একঘেয়েমি

একঘেয়ে একটি দিনের পর আসে আরেকটি একঘেয়ে দিন,
অসার দিনকাল ধায় পিছুপিছু। একই জিনিসের পুনরাবৃত্তি, পুনঃপুন―
একই সময় খুঁজে ফিরে আমাদের, তারপর যায় চলে, যায় নিজ পথ ধরে।

মাস যায় মাস আসে।
তারপর যে কী তা সহজেই অনুমেয়:
গত হওয়া সময়ের অবসাদ।
আর ভবিষ্যৎ দেখা দেয় সেভাবেই যেন-বা নেই আর ভবিষ্যৎ কোনো।

প্রাচীর
কোনোরকম দয়ামায়া,বিবেচনা, ও লাজলজ্জার বালাই ছাড়াই
আমার চারপাশে তারা তুলে দিল এক প্রকাণ্ড সুউচ্চ প্রাচীর।

এখন ক্রমবর্ধমান হতাশায় বসে থাকি আমি এখানে।
ভাগ্যের পরিহাসে ভারাক্রান্ত আমার মন, কিছুই পারছি না ভাবতে:

কারণ এখান থেকে পালানোর অনেক পথই ছিল আমার।
হায় যখন তারা গড়ছিল এই প্রাচীর তখন কেন আমি হুঁশিয়ার হলাম না?

কিন্তু কোনো হইচই বা আওয়াজ শুনিনি আমি নির্মাতার কাছ থেকে।
আমার বোঝার আগেই তারা আটকে ফেলল আমাকে, জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে।

জানালা
বিষ্ন্ন দিন পার করা এইসব আলোঅন্ধকারময় কক্ষগুলোতে
ইতস্তত আমি পায়চারি করতাম একটি জানালা খুঁজে পাবার জন্য―
কারণ একটি খোলা জানালা হতে পারত আমার জন্য স্বস্তিকর―
কিন্তু ওখানে ছিল না কোনো জানালা, বা অন্তত আমি পাইনি খুঁজে। আর
ভালোই হলো যে পাইনি।
সম্ভবত জানালা দিয়ে আসা আলো হবে এক নতুন অত্যাচার।
কে জানে, কী নতুন জিনিস আবার দেখব তা দিয়ে।

ফিরে এসো
ফিরে এসো প্রায়শই, আর অধিকার করে নাও আমায়,
প্রিয় প্রেমানুভূতি ফিরে এসো আর অধিকার করে নাও আমায়―
যখন পুনর্জাগরিত হয় দেহস্মৃতি,
আর আদিম আকাঙ্ক্ষা আবারও প্রবাহিত হয় রক্তে;
যখন ঠোঁট আর ত্বক হয় স্মৃতিতাড়িত,
আর হাত অনুভব করে যেন তা স্পর্শ করছে আরও একবার।

[ অনূদিত কবিতাগুলো ড্যানিয়েল মেন্ডেলসনের ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা করা।]

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com