ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি

সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি… (কিস্তি ৫)

chanchal | 4 Aug , 2008  

কিস্তি:

humayun-azad-july.jpg
নিজের বইয়ের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ

একটা ব্যাপারে আমি তখন বেশ বিব্রত বোধ করতাম। সেটি হল, পরিচিতদের অনেকেই আমাকে জুনিয়র হুমায়ুন আজাদ বলে ঠাট্টা করতেন। কেউ কেউ আমাকে বলতেন ছোটদের হুমায়ুন আজাদ বা দ্বিতীয় হুমায়ুন আজাদ। হয়তো হেঁটে যাচ্ছি হাকিম ভাইয়ের চা-দোকানের পাশ দিয়ে, আমাকে শুনিয়ে কেউ বলে উঠল কাউকে, ‘দ্যাখ দ্যাখ হুমায়ুন আজাদের humayun-azad-july-2.jpg…….
৫০ তম জন্মদিনে স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদ
……..
শিষ্য।’ অনেক সময় এটা ঠাট্টার পর্যায়ে থাকত না, ব্যাপারটা এমন হয়ে যেত যেন আমাকে রাগানোর জন্যে তাদের কাছে এর চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর নেই। আমি রেগে গেলেও তা প্রকাশ করতাম না, বরং এক সময় দেখা যেত, তাদের সঙ্গে আমার আড্ডা ও সখ্য বেড়ে গেছে। এ-নিয়ে ব্রাত্য রাইসুর একটা কথা আমার মনে ধরেছিল খুব: কারও কথায় আপনার যদি রাগ হয়, সেইটা তার সামনে প্রকাশ করবেন না। করলে সে ভাববে যে সে যা বলছে তা-ই ঠিক।

১৯৯৪ সালের এক রাতে, আমি জিগাতলা (তখন আজকের কাগজে কাজ করতাম) থেকে আজিজ মার্কেট হয়ে বাসায় ফিরছি। শাহবাগ মোড়ের দিকে যাচ্ছি, রাইসু ডাক দিলে আমি রিকশা থেকে নামলাম। তিনি রিকশাঅলাকে ছেড়ে দিতে বললেন। ছেড়ে দিয়ে, ফুটপাতে উঠে দেখি, সাজ্জাদ শরিফ আর রাজু আলাউদ্দিন লোহার পাঁচিলে (এখন সেটি নেই; সেখানে পিজির বহির্বিভাগের টিনশেড ভবনের দেয়াল) ঠেস দিয়ে বসে সিগারেট ফুঁকছেন। প্রথমে রাজু আলাউদ্দিনই হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে আমার মিল ও সম্পর্কের প্রসঙ্গটি তুললেন। সেই সূত্র ধরে সাজ্জাদ ভাই বললেন, ‘প্রথমত আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র।’

বললাম, ‘এই বিভাগে তো অনেকেই পড়ে। আর এখন আমি সেখানকার ছাত্র না, অনার্স ক’রে মাস্টার্সে ভর্তি হই নাই।’

‘আপনি কবিতা লেখেন।’

‘অনেকেই লেখেন।’

‘প্রবন্ধ লেখেন।’

রাজু বললেন, ‘হুমায়ুন আজাদের মত ইদানিং আবার ভাষাতত্ত্ব নিয়া লেখা শুরু করে দিছেন।’

আমাকে নিরুত্তর দেখে রাইসু বললেন, ‘ঠেকাইতেছেন না ক্যান, শাহবাগে ত বহুত রাজা-উজির মারেন, এখন কি পোতায়্যা গেলেন?’

সাজ্জাদ ভাই বললেন, ‘হুমায়ুন আজাদের মত আপনি সবাইকে বাতিল করে বেড়ান।’

আমার খালি মনে হতে লাগল, ‘রিকশা থেকে নামাটা ঠিক হয় নি। আর মনে পড়ল উচ্চ মাধ্যমিকে-পড়া ইন্ডাক্টিভ লজিকের কথা। গরুর চারটি পা আছে; ছাগলের চারটি পা আছে; গরু দুধ দেয়; ছাগলও দেয়; অতএব, গরু হল ছাগল। বললাম, ‘তাড়া আছে। যাই।’

রাইসু বললেন, ‘না। এখন গেলে আমরা মনে করব, আপনি এই ধরনের পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারেন না। আপনার মধ্যে পলায়নপর মনোবৃত্তি আছে।’

সাজ্জাদ ভাই আমার দিকে সিগারেট বাড়িয়ে বললেন, ‘নেন, সিগারেট খান। চা খাবেন?’

আমি ‘চা খাব না’ বলে সিগারেটটি নিলাম এবং ধরিয়ে টানতে লাগলাম।

রাজু বললেন, ‘আপনি জিন্স পরেন। প্যান্টের ভিতরে শার্ট ঢোকান না।’ শুনে সাজ্জাদ ভাই হাসতে লাগলেন।

বললাম, ‘পৃথিবীতে বহু লোক জিন্স পরে, প্যান্টের ভিতরে শার্ট ঢোকায় না।’

‘কিন্তু তারা ত হুমায়ুন আজাদ আর আপনার মত চশমা পরে না।’ রাইসু কথাটা বললেন আর সঙ্গে সঙ্গে বাকি দু’জন হাঃ হাঃ হোঃ হোঃ শব্দে হাসতে লাগলেন। ফাঁকা হয়ে-আসা রাস্তায় সেই হাসি প্রতিধ্বনিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছিল কি-না জানি না, কেননা তখন আমার খুব রাগ হচ্ছিল। রাজু আলাউদ্দিন বললেন, ‘তা হলে এখন কী সিদ্ধান্ত?’ রাইসু বললেন, ‘সিদ্ধান্তটা হইল, চঞ্চল আশরাফকে খাইয়া ফালাইছে ওর গুরু হুমায়ুন আজাদ।’ আবার হাসি। তিন রকমের, একই সময়ে।

‘যাই।’ বলে, তিন জনের সঙ্গে হাত মেলালাম।

২.
১৯৯৩ সালে, ডিসেম্বরের শেষ সপ্তায় আমি দৈনিক আজকের কাগজে যোগ দিই। কিন্তু আমি পত্রিকাটির স্টাফ হই ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি থেকে। হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতাম সম্পাদকীয় বিভাগের কর্মী হিসেবে, কাজ করতাম সাপ্তাহিক খবরের কাগজে। মাঝেমধ্যে আবীর ভাই (আবীর হাসান; তখন আজকের কাগজের সহকারী সম্পাদক) টুকটাক অনুবাদের কাজ দিলে, করতাম। যা-ই হোক, সে-সময় চার-পাঁচবার হুমায়ুন আজাদ জিগাতলার সেই অফিসটায় এসেছিলেন। উদ্দেশ্য, আজকের কাগজ সাময়িকীতে প্রকাশিত ধারাবাহিক উপন্যাস ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইল-এর সম্মানী নেয়া। ’৯৩-এ, সম্ভবত অক্টোবরে ধারাবাহিকটি শেষ হয়েছিল; কিন্তু সম্মানী পেতে পরের বছর পর্যন্ত লেগে যায়। এ-নিয়ে হুমায়ুন আজাদ বিরক্ত ছিলেন। শুনেছি, ৪০ কিস্তিতে উপন্যাসটির বিল দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার টাকা।

দুই দফায় তা দেয়া হয়। শেষ দফায় তাঁকে ৯ হাজার টাকার চেক নিতে আমি দেখেছি। তখন ঢাকা নিউমার্কেটে বিদ্যাসাগর থেকে নিউ দিল্লির পিকক বুকস সংস্করণে জেমস জয়েসের অ্যা পোর্ট্রটে অব দ্য আর্টিস্ট অ্যাজ অ্যা ইয়াং ম্যান কিনতে ৫০ টাকার বেশি লাগত না। জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে সাকুরায় যেতে রিকশাঅলাকে তখন ৫ টাকা দিলে সে খুশিই হত। যা-ই হোক, ‘এত টাকা দিয়ে কী করবেন স্যার?’ শুনে বললেন, ‘সপ্তম শ্রেণীর বালকের মত প্রশ্ন করো না।’

লক্ষ করলাম, সম্মানীর জন্যে তাঁর মধ্যে যে একটা অপ্রীতিকর অভিব্যক্তি দেখা যেত এখানে এলে, তা একেবারেই নেই; বরং চেহারায় এক ধরনের তৃপ্তি ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, লেখার সম্মানী না-পেলে, তিনি ক্ষোভটা আড়াল করতে পারতেন না। ১৯৯৬ সালে শুভব্রত ও তার সম্পর্কিত সুসমাচার উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে আজকের কাগজ সাময়িকীতে ৯ কিস্তি প্রকাশের পর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে রীতিমতো ঘোষণা ছেপে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরের বছর, আমার খুব মনে পড়ে, কলাভবনের পশ্চিম গেট দিয়ে বাসার দিকে যেতে যেতে তিনি বললেন, ‘আজকের কাগজ আমার উপন্যাসটি ছেপে শেষ হওয়ার বেশ আগেই বন্ধ করে দিয়েছে; তাতে উপন্যাসটির কোনও সমস্যা হয় নি। সেটা বই হয়ে বেরিয়েছে, কিন্তু ওরা আমাকে কোনও টাকাই দেয় নি। ছ’মাস ধরে ওরা শুধু প্রতিশ্রুতিটাই দিতে পেরেছে।’

গেটটি পার হয়ে দক্ষিণের পথ ধরে সামান্য হেঁটে তিনি থামলেন এবং সিগারেট ধরালেন। তাঁকে জানালাম যে, আজকের কাগজের কাজ আমি ছেড়েছি দুই বছর আগে, আমিও অনেক দিন আমার লেখার টাকা পত্রিকাটি থেকে পাচ্ছি না। বললাম, ‘রফিক আজাদ সেদিনও বলছিলেন, এরা কি লেখার টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে?’ হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘কোনও লেখককেই যদি না-দেয়, বিষয়টা অন্যভাবে দেখা যেত। কিন্তু আমি জানি, কোনও কোনও লেখককে এরা টাকা দেয়, বেশ ভালো করেই দেয়। মাঝখানে কী-যেন দুটো পাতা আছে, ওইখানে লিখলে দেয়। সেদিন দেখলাম, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদের লেখা ছাপা হয়েছে। ওর লেখা প্রকাশযোগ্য হয়?’ আবার আমাদের হাঁটা শুরু হল। বাতাস বইছিল। বললাম, ‘তাঁর লেখা প্রকাশের উপযুক্ত করে দেয় সালাম সালেহ উদদীন।’ ‘তা হলে তো ওর খুব পরিশ্রম হয়।’ কথা বলতে বলতে আমরা রাস্তা পার হয়ে হাঁটতে থাকি। হুমায়ুন আজাদের হাতে সিগারেটটি নেই, লক্ষ করি। একটু সামনে গেলে একরকম ছায়াময়তা আর ঠাণ্ডা হাওয়া পাওয়া গেল। সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁকে বলি, ‘এইভাবে উপন্যাসটির ধাবাবাহিক ছাপা বন্ধ করা ঠিক হয় নাই স্যার।’ বললেন, ‘পত্রিকাটির কোনও দোষ নেই। মূর্খদের একটি অতিরিক্ত ইন্দ্রিয় থেকেই সমস্যাটি হয়েছে। সেটি ধর্মেন্দ্রিয়। এই ইন্দ্রিয় এত প্রবল যে, পত্রিকাটি ভয় পেয়েছে।’ বলে তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন এবং ‘ঠিক আছে, পরে কথা হবে’ বলে হাঁটা দিলেন বাসার দিকে।

আজও জানি না, হুমায়ুন আজাদের প্রাপ্য সেই টাকা আজকের কাগজ শেষ পর্যন্ত দিয়েছিল কি-না।

৩.
১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমার সঙ্গে পরিচয় হয় কবি ও প্রাবন্ধিক আজফার হোসেনের। পরিচয়ের আগেই ভোরের কাগজে হুমায়ুন আজাদের সঙ্গে তাঁর সেই বিতণ্ডাটি উপভোগ করেছিলাম। বোধ করি ওই বিতণ্ডা সমকালীন সাহিত্যিক ও মননশীল সমাজে আজফার হোসেনকে বেশ পরিচিতি এনে দেয়। তাঁর সঙ্গে অল্প ক’দিনের মধ্যেই সখ্য গড়ে ওঠে আমার। আজকের কাগজের সামনে একটা চা-দোকান ছিল, সেখানে রাস্তা-লাগোয়া বেঞ্চিতে বসে আমরা আড্ডা দিতাম। তিনি একটার পর একটা সিগারেট টানতে পছন্দ করতেন। ভাষাতত্ত্ব, মার্কসবাদ, উত্তর-আধুনিকতা, মৌলবাদ, দেরিদা, হুমায়ুন আজাদ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আমরা কথা বলতাম। অফিস থেকে বের হয়ে কোনও-কোনও সন্ধ্যায় কথা বলতে বলতে কখন-যে শাহবাগে পৌঁছে যেতাম, টেরই পেতাম না। যা-ই হোক, তখন সবে হুমায়ুন আজাদের প্রথম উপন্যাস ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল বেরিয়েছে। ওই বছরের, সম্ভবত মার্চের কোনও একদিন আজফার ভাই সাপ্তাহিক খবরের কাগজে প্রকাশের জন্যে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে তাঁর কথোপকথনের একটা স্ক্রিপ্ট নিয়ে এলেন। কম্পোজ হল, প্রুফ আজফার ভাই-ই দেখলেন। ট্রেসিং হওয়ার আগে বকর ভাই (আবু বকর চৌধুরী; তখন সাপ্তাহিক খবরের কাগজের সহযোগী সম্পাদক) আমাকে কপিটি দেখতে বললেন। দেখলাম, তাতে ছাপ্পানো হাজার বর্গমাইলও প্রাসঙ্গিক হয়েছে। যত দূর মনে আনতে পারি, তিনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে বলছেন যে, শরৎচন্দ্রের রচনায় স্খলনকে সাব্লিমেশন দেওয়া হয়, স্খলিতের জন্যে মধ্যবিত্ত পাঠকের করুণা ও সহানুভূতি আদায় করা হয় — তা-ই দেখা যায় উপন্যাসটিতে। শরৎচন্দ্রের ভাবালুতাঘন উপন্যাসের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে, শহীদ মিনারের সামনে কেন্দ্রীয় চরিত্র রাশেদের যে করুণা-উদ্রেককর অভিব্যক্তি, আজফার ভাই তা উল্লেখ করেছেন। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একমত হয়েছেন তাঁর সঙ্গে, তিনিও বলছেন যে, শরৎচন্দ্রসুলভ মধ্যবিত্ত-ভাবালুতায় উপন্যাসটির যে-ক্ষতি হয়েছে, সমকালীন কথাসাহিত্যে তেমন দেখা যায় না।

পড়তে গিয়ে, আমার দুটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। একটি হুমায়ুন আজাদের বাসায় সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময়কার, অন্যটি ইস্কাটনে তাঁর কবিতা সম্পর্কে প্রবন্ধ না-লিখে জয় গোস্বামীর ওপর লেখার কারণে যা ঘটেছিল। বকর ভাইকে বিষয়টি জানালাম। তিনি পড়ে বললেন, ‘ঠিকই তো আছে। গ্যাঞ্জাম লাগলে লাগুক। ধর্ম নিয়া তো কিছু নাই।’ সে-বছরই সেপ্টেম্বরের কোনও একদিন সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে হুমায়ুন আজাদ আমাকে দেখে ডেকে বললেন, ‘এ্যাই তুমি এখনও ওই গো-শালায় কাজ করো?’

বললাম, ‘বুঝলাম না স্যার।’

‘পত্রিকাটিতে ওসব কী ছাপা হয়? আজফার নামের ওই ছোকরাটি এখন আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সঙ্গে ভিড়েছে? ইলিয়াস কী লেখে? আমি তো তার লেখায় কুকুরের সঙ্গম আর নির্বোধের হস্তমৈথুন ছাড়া কিছুই দেখি না।’ কোনওরকম বিরতি না-দিয়ে বললেন এবং লাইব্রেরির দরজায় ধাক্কা দিয়ে ভেতরে চলে গেলেন। আশপাশে তাকালাম। দেখি, লাইব্রেরির সামনে বসা ও দাঁড়ানো ছেলেমেয়েদের কয়েকজন আমার দিকে ‘কী-হল-চোখে’ তাকিয়ে আছে।

১৯৯৫ সালে আততায়ীদের সঙ্গে কথোপকথন নামে একটি বই বেরোয় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাৎকার নিয়ে। বইমেলায় আগামী প্রকাশনীর স্টলে গিয়ে সূচিতে দেখি, আমার নেয়া সাক্ষাৎকারটি বইটায় নেই। সেই আশা আমি কি করেছিলাম? নইলে, মন খারাপ হল কেন? ডিসপ্লে-টেবিলের ওপারে তখন হুমায়ুন আজাদ বসে আছেন; দেখে আমার ভেতরে কী-যে ঘটল, বললাম, ‘আমাকে যে আপনার আততায়ী মনে হয় নাই এতে আমি খুশি হইছি স্যার। কারণ, কয়েকটা সাক্ষাৎকার পড়ে মনে হয়, কথোপথনের সময় বাটার অয়েলের যথেষ্ট ব্যবহার হইছে।’ হাতেই ছিল বইটি। তিনি বললেন, ‘পড়াশোনায় তো গোল্লায় গেছ, কথা বলতেও তো শেখো নি ঠিকমতো। আর তোমার নেয়া ওই সাক্ষাৎকারটি বইয়ে রাখার উপযুক্ত নয়।’ টেবিলে বইটি রেখে বললাম, ‘কারণ, আমি আপনার কাছে বাটার অয়েলের টিন নিয়ে যেতে পারি নাই।’ তখনই এক মহিলা এসে সব কিছু ভেঙে পড়ে উপন্যাসটির একটি কপি নিয়ে তাঁর দিকে বাড়িয়ে বলল, ‘স্যার, অটোগ্রাফ দ্যান।’ বইটির মলাট তুলে হুমায়ুন আজাদ কলমের ঢাকনা খোলামাত্র আমি সেখান থেকে সরে গেলাম।

সে-বছরের জুলাইয়ে আজকের কাগজ থেকে অব্যাহতি নিয়ে বাংলা একাডেমীর তরুণ লেখক প্রকল্পে যোগ দিই। সম্ভবত পরের মাসেই রিসোর্স পার্সন হিসেবে প্রকল্পে বক্তৃতা দিতে আসেন তিনি। প্রকল্প পরিচালক মুহম্মদ নূরুল হুদা আমাদেরকে প্রস্তুত হতে বলেন এই মর্মে যে, হুমায়ুন আজাদ এমন কিছু বলতে পারেন — অনেকের কাছে তা অস্বস্তির কারণ হতে পারে। তার কোনও কথায় কেউ যদি বিচলিত বা বিব্রত বোধ করে, তা নিয়ে পরে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে; কিন্তু তাঁর বক্তৃতার সময় এমন কোনও কথা বা আচরণ করা যাবে না, যাতে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।

সকালে হুমায়ুন আজাদ এলেন। বাংলা একাডেমীর অডিটোরিয়ামে আমাদের সামনে বসেছেন। তাঁর এক পাশে প্রশিক্ষক রফিক আজাদ অন্য পাশে মুহম্মদ নূরুল হুদা। তিনি বক্তৃতা দিলেন ভাষা নিয়ে; তারপর সাহিত্য ও আধুনিকতা প্রসঙ্গে বললেন। অসামান্য বক্তৃতা, সবাই চুপ হয়ে শুনলাম। দেড় ঘণ্টার বক্তৃতা শেষে আধ ঘণ্টার একটা প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকে। এ-সময় চল্লিশ জনের মধ্যে আমি আর অল্প কয়েকজনই সরব থাকতাম বলে অনেকেই আমাকেও প্রশ্ন করার জন্যে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। না, আমি কোনও কথাই বললাম না। কারণ, তাঁর সঙ্গে এত দিনে আমার এত বেশি কথা হয়ে গেছে যে অর্থনীতিতে-পড়া ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক উপযোগ বিধির মতোই, তাঁর মুখোমুখি হওয়ার তৃষ্ণা শুরুতে যত তীব্র ছিল, ততটাই মৃদু, বলতে গেলে শূন্য হয়ে এসেছে তখন। কিন্তু প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রশ্ন হবে না, এমনটি তো কাম্য হতে পারে না। বদরুজ্জামান আলমগীর (নাট্যকার, এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী) প্রশ্ন করলেন, ‘স্যার বিদেশি সাহিত্যের প্রতি আপনার উচ্ছ্বাস সব সময় লক্ষ করি আমরা। কিন্তু দেশের সাহিত্য নিয়ে আপনি সব সময় নেতিবাচক কথা বলেন। এর কারণ কী?’

তিনি বললেন, ‘দেশের সাহিত্য কাকে বলে?’

আলমগীর বললেন, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য।’

‘বাংলাদেশের সাহিত্য বলে কিছু নেই। আছে বাংলা ভাষার সাহিত্য; পৃথিবীর যে-কোনও দেশে এটি রচিত হতে পারে।’

শোয়াইব জিবরান প্রশ্ন করল, ‘পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য তা হলে এখানকার পাঠ্যসূচিতে থাকে না কেন?’

তিনি বললেন, ‘আবারও ভুল করছ। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য বলে কিছু নেই।’

জিবরান বোঝাতে চাইল, যদি তা না থাকে, তা হলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কমলকুমার মজুমদার বা শক্তি চট্টোপাধ্যায় পড়ানো হয় না কেন?

হুমায়ুন আজাদ বললেন, ‘এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা। যে-সব বই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে রাখা হয়, সেগুলোর ক’টি পাঠযোগ্য, বলতে পারবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আধুনিক সাহিত্য পড়ানো হয়। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দ্যাখো, ওরা রবীন্দ্রনাথও ঠিকমতো পড়ায় না। আর তোমাদেরকে, কী যেন বললে, কমলকুমার, হ্যাঁ, কমলকুমার পড়তে তো বিশ্ববিদ্যালয় নিষেধ করে নি।’
—————————————————————–
যে-সব বই বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে রাখা হয়, সেগুলোর ক’টি পাঠযোগ্য, বলতে পারবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তো আধুনিক সাহিত্য পড়ানো হয়। কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দ্যাখো, ওরা রবীন্দ্রনাথও ঠিকমতো পড়ায় না।
—————————————————————–

জিবরান বলল, ‘উৎসাহিতও করে নাই স্যার।’

তিনি বললেন, ‘সাহিত্য পাড়ার প্রীতি ফুটবল ম্যাচ নয় যে উৎসাহিত করতে হবে।’

আলমগীর বললেন, ‘দেশের সাহিত্য, মানে বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে, স্যার, আপনার নেতিবাচক ধারণার কারণ আমরা কি জানতে পারি?’

‘বাংলা সাহিত্য ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ বা স্পেনিশ সাহিত্যের কাছাকাছি মানেরও নয়। এখন যা লেখা হচ্ছে বাংলা ভাষায়, তা আসলে শ্বশুরবাড়ির সাহিত্য। জামাই লিখছে, সুতরাং খুব ভালো সাহিত্য হচ্ছে।’
—————————————————————–
বাংলা সাহিত্য ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান, রুশ বা স্পেনিশ সাহিত্যের কাছাকাছি মানেরও নয়। এখন যা লেখা হচ্ছে বাংলা ভাষায়, তা আসলে শ্বশুরবাড়ির সাহিত্য। জামাই লিখছে, সুতরাং খুব ভালো সাহিত্য হচ্ছে।
—————————————————————–
৪.
১৯৯৫ সালের নভেম্বরে তাঁর নারী বইটি নিষিদ্ধ হয়। খবরটি আমি শুনি শাহবাগে, আজিজ মার্কেটের দোতলার ’প্রকাশক’ নামের কক্ষটিতে, যেখানে প্রায়ই আমরা আড্ডা দিতাম। উল্লেখ্য, প্রকাশক ছিল ব্রাত্য রাইসু, লীসা অতন্দ্রিলা, শাহ্‌রীয়ার রাসেল ও শহীদুল ইসলাম টিটুর যৌথ মালিকানার বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান! যদিও এটি বিজ্ঞাপনের ব্যবসার কোনো কাজেই আসেনি। শেষ পর্যন্ত কক্ষটি আড্ডাস্থল হিসাবে আমাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। পরে জানতে পারি, ভাড়ার টাকা পরিশোধ না করতে করতে দেড় দুই বছরে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাঁড়ায় ছফা ভাই তা মিটিয়ে দিয়ে আসবাবপত্র সহ সেই কক্ষে বসতে শুরু করেন। এর আগে তিনি পাশের আরেকটি কক্ষে মাদুরের উপরে টেবিল এবং মুখোমুখি দুটি চেয়ার নিয়ে বসতেন। টেবিলের উপরে সব সময়ে একটি অ্যাসট্রে থাকত।

প্রকাশক-এ প্রায়ই সাজ্জাদ ভাই, রাইসু, রাজু আলাউদ্দিনসহ অনেকের সঙ্গে আড্ডা হতো, কথা হতো। সেখানে কারও সঙ্গে দেখা না-হলে পাশের ছফা ভাইয়ের সেই রুমটিতে উঁকি দিতাম। দেখে ছফা ভাই ডাকতেন। কোনও-কোনও সন্ধ্যায় দেখতাম, সেই রুমে তাঁর মুখোমুখি বা টেবিলের পাশের চেয়ারটায় বসে আছেন সমুদ্র গুপ্ত, নয়তো জাহিদ হায়দার। তো, কার কাছ থেকে নারী নিষিদ্ধ হওয়ার খবরটা শুনি, আমার মনে নেই। তা না-থাকলেও, ছফা ভাইয়ের রুমে উঁকি দিয়ে দেখি, তাঁর টেবিল ঘিরে চার-পাঁচজন লোক, তিনি বেশ উত্তেজিত; ‘এখানে বই যারা বিক্রি করে সবাইকে আমার সাথে দেখা করতে বলো। যাও।’ কাকে যে বলছেন তা বুঝতে পারছিলাম না। দেখতে পাচ্ছিলাম, তিনি দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন, ‘লুৎফর (লুৎফর রহমান: বইয়ের দোকান ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সন্দেশ-এর স্বত্বাধিকারী) কোথায়, ওকে আমার এখানে নিয়া স।’ পেছন ফিরে দেখলাম খাটো, গোঁফঅলা, সাদার উপর কালো চেক শার্ট-পরা একটা ছেলে; শোনামাত্র সে দ্রুত স্থানত্যাগ করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছ’সাতজন লোক সেখানে হাজির। তবে আগে এলেন লুৎফর। তাঁকে ছফা ভাই বললেন, ‘নারী বিক্রি বন্ধ করবে না।’ তিনি বললেন, ‘পুলিশে ধইরা নিয়া গ্যালে আমারে কি আপনি ছুটাইয়া আনতে পারবেন?’ ছফা ভাই অন্যদেরকেও নারী বিক্রি চালিয়ে যেতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু লুৎফরের কথার সূত্র ধরে কেউ রাজি হলেন না। ছফা ভাই রেগে গেলেন। বললেন, ‘তোমরা আমার কথা বুঝতেই পার নাই। এইটা একটা প্রতিবাদ। বই ব্যাচাটাই বুজলা। যাও, সব বই আমার এখানে পাঠাইয়া দাও। আমি আহমদ ছফা আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে প্রকাশ্যে নারী বেচব। প্রতিবাদ আমি করবই। কারণ, এই নিষিদ্ধ আমি মানি না।’
—————————————————————–
ছফা ভাই বললেন, ‘নারী বিক্রি বন্ধ করবে না।’…আমি আহমদ ছফা আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে প্রকাশ্যে নারী বেচব। প্রতিবাদ আমি করবই। কারণ, এই নিষিদ্ধ আমি মানি না।’
—————————————————————–
তারা সেখান থেকে বের হলেন; কিন্তু বইটির একটা কপিও এল না। ততক্ষণে রুমটায় ২০-২৫ জন লোক, ছোটখাটো একটা সমাবেশ। মাদুরে বসেছেন সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যে আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গণিকে সঙ্গে নিয়ে হুমায়ুন আজাদ এলেন। কেডস খুলে তিনিও বসলেন। এর সামান্য আগে এক জার্মান ভদ্রলোক এসে ছফা ভাইয়ের পাশে বসেছেন। হুমায়ুন আজাদ জানালেন, তিনি ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলামের সঙ্গে এ-নিয়ে কথা বলেছেন। বললেন, ‘বিএনপি-জামাত সরকার বেশি দিন বইটিকে নিষিদ্ধ রাখতে পারবে না।’ ছফা ভাই জার্মান ভদ্রলোকের সঙ্গে হুমায়ুন আজাদকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর বই যে সরকার নিষিদ্ধ করেছে, তা তাঁকে জানালেন। হুমায়ুন আজাদ ইংরেজিতে তাঁকে বললেন যে, বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত সরকার আছে, কিন্তু গণতন্ত্র নেই। কারণ এখানে বাকস্বাধীনতা নেই। ছফা ভাই এর সমর্থনে উদাহরণ দিতে গিয়ে তসলিমা নাসরিনের কথা বললেন। শুনে হুমায়ুন আজাদ বিরক্তি নিয়ে তাকালেন তাঁর দিকে। বললেন, ‘তসলিমার নাম উচ্চারণ করতে হবে, এমন কিছু এখানে আমি দেখছি না।’

রাত ন’টার দিকে হুমায়ুন আজাদ চলে গেলে ছফা ভাই বললেন, ‘দেখছ, ও এতগুলা লোকের সামনে কী করল! বাইরের লোকের সামনে তসলিমারে নিয়া এইটা বলা ঠিক হইছে? ভদ্রলোক বাংলা জানলে ইজ্জত বলে কিছু থাকতো?’ আরও বললেন, ‘ওর এখনও বুদ্ধিসুদ্ধি হল না। আরে, এত সোজা, জামাত-বিএনপির হাত থেকে মুক্তি এত সহজ! উন্মাদ! বোকা লেখক! ওর আরও বিপদ আছে।’

কিস্তি ৬

মনিপুরী পাড়া, ঢাকা ২৬/৭/০৮

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: চঞ্চল আশরাফ
ইমেইল: chanchalashraf1969@yahoo.com


ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters


16 Responses

  1. লীনা says:

    “আরে, এত সোজা, জামাত-বিএনপির হাত থেকে মুক্তি এত সহজ! উন্মাদ! বোকা লেখক! ওর আরও বিপদ আছে।”
    সেই বিপদটাই কি চূড়ান্ত সহযাত্রী হয়েছিল হুমায়ুন আজাদের জীবনে…? এই কিস্তিটা জোশ লাগলো।

    লীনা

  2. Bithee says:

    ভাল লেগেছে প্রতিটি কিস্তি। তবে (লেখকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি) লেখাগুলো পড়ে হুমায়ুন আজাদকে একজন আত্ম-অহঙ্কারী মানুষ বলে মনে হয়েছে। চঞ্চল আশরাফকে বলছি — মনে হয়েছে আপনি তার খুব কাছের মানুষ ছিলেন, তাই হুমায়ুন আজাদের ভাল বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে লিখলে খুশি হব।

    Bithee

  3. naim says:

    চঞ্চল আশরাফ বড্ড অকপট। এত সরাসরি লিখেন যে খুব মর্মাহত হই। উনি কি জানেন না, এত সরাসরি কিছু লিখতে নেই। পাঠকেরও তো একটা মন আছে, মেজাজ আছে। হুমায়ুন আজাদকে আমরা খুবই শ্রদ্ধা করি। তাঁর সম্পর্কে এত স্ট্রেইট কথা শুনতে আমাদের মর্মস্থলে আঘাতের মতো লাগে। আসলে চঞ্চল আশরাফ মনে মনে তাঁকে হিংসা করতেন। কারণ, যে জায়গাটায় হুমায়ুন আজাদ দাঁড়িয়েছিলেন, সেখানে দাঁড়াবার শখ তাঁরও ছিল। কিন্তু কপালদোষে তিনি আজ খালি চঞ্চল আশরাফ। ডক্টরেট নাই।
    রায়হান
    কলাতলী, কক্সবাজার

  4. মাহাবুবুর রাহমান says:

    আগের কিস্তিগুলার চাইতে এই কিস্তিটা বেশি ভালো লাগল। শিক্ষক হিসাবে হুমায়ুন আজাদ আমার খুব শ্রদ্ধাভাজন। এপর্বে সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের কিছু বৈশিষ্ট্য (নেতিবাচক)উঠে এসে–যা আমরা কমবেশি অনেকেই জানি। তবে আহমদ ছফার অংশটুকুই আমাকে বেশি আকর্ষণ করেছে।

    মাহাবুবুর রাহমান

  5. গোলাম সারোয়ার says:

    লেখাটি কিন্তু তার উদ্দেশ্য থেকে প্রায়শই সরে যাচ্ছে… শিক্ষক হুমায়ুন আজাদকে কমই পাওয়া গেছে। সব কটা কিস্তি জুড়ে বরং মানুষ হিসেবে কতটা দাম্ভিক-উন্নাসিক ছিলেন তাই বলা… তার কি খুব দরকার আছে? এটা কি বেশিরভাগ মানুষ (যারা তার পাঠক) জানেন না? তবে চঞ্চল আশরাফের গদ্য আমার ভালো লেগেছে। যদিও হুমায়ুন আজাদের গদ্য আরো তীক্ষ্ণ… ধারালো… উদ্দীপক। ধন্যবাদ।

    – গোলাম সারোয়ার

  6. “আমি আহমদ ছফা আজিজ মার্কেটের সামনের ফুটপাতে প্রকাশ্যে নারী বেচব। প্রতিবাদ আমি করবই। কারণ, এই নিষিদ্ধ আমি মানি না।”

    স্বাক্ষর শতাব্দ

  7. লীনা says:

    মি. রায়হান, কলাতলী, কক্সবাজার একটা মন্তব্য করেছেন যার প্রেক্ষিতে কিছু বলা উচিত।

    রায়হান লিখেছেন, “কিন্তু কপালদোষে তিনি আজ খালি চঞ্চল আশরাফ। ডক্টরেট নাই।” এটা কতটা হাস্যকর কথা তা আমরা যারা চঞ্চল আশরাফকে চিনি, জানি তারা সবাই বু্ঝতে পারছি, বু্ঝতে পারছেন না মি. রায়হান। দু একটা ডক্টরেট ডিগ্রি চঞ্চল আশরাফ নিজের নামের সাথে জুড়ে দিতে পারেন যদি তিনি চান। চঞ্চল আশরাফ খুবই মেধাবী এবং সৃজনশীল একজন কবি। ডক্টরেট একটা প্রথাগত ডিগ্রি আর হুমায়ুন আজাদ আজন্ম প্রথাবিরোধী একজন মানুষ ছিলেন। তাই মি. রায়হান যেমন ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে খুব উৎফুল্ল চঞ্চল আশরাফ তেমন নন, হুমায়ুন আজাদও বোধকরি মি. রায়হান-এর উৎফুল্লতা দেখলে বিরক্তই হতেন। লেখক-এর মত প্রকাশের স্বাধীনতা আছে। কেউ যদি তার বিরোধিতা করেন তা সুস্থ্য ভাষায় করা উচিত।

    লীনা

  8. সুব্রত নন্দী says:

    ami mone kori chanchal asraf prokito ekjon Humayun Azad-k tule dhorsen.Emon Ohongkar Humayun Azad’er manay.Chonchal -k dhannobad emon ekti lekhar jonno.
    -Subrata Nandy
    Toronto,Canada

    আমি মনে করি চঞ্চল আশরাফ প্রকৃত একজন হুমায়ুন আজাদকে তুলে ধরছেন। এমন অহংকার হুমায়ুন আজাদের মানায়। চঞ্চল আশরাফকে ধন্যবাদ এমন একটি লেখার জন্য।

    সুব্রত নন্দী
    টরন্টো, কানাডা

  9. ফেরদৌস খান says:

    চঞ্চল আশরাফের ‘সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদ, যখন আমি’ লেখার এক থেকে পাঁচ কিস্তি পড়লাম — লেখাটি নিতান্তই স্মৃতিচারণ মাত্র। আর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চঞ্চল অধিকাংশ স্মৃতি উচ্চারকের মতোই আত্মকিত্তনেই সময় নিয়েছেন বেশি। এই লেখার শুরুটাই এমন — ‘একটা ব্যাপারে আমি তখন বেশ বিব্রত বোধ করতাম। সেটি হলো, পরিচিতদের অনেকেই আমাকে জুনিয়র হুমায়ুন আজাদ বলে ঠাট্টা করতেন। কেউ আমাকে বলতেন ছোটদের হুমাযুন আজাদ বা দ্বিতীয় হুমায়ুন আজাদ। ’ সন্দেহ নেই চঞ্চলের এই বোধ এবং অন্যকে যাচ্ছেতাই ভাববার প্রবণতা বড় লেখক হওয়ার একক অন্তরায় অন্যথায় তাঁর লেখা খুবই সাহিত্যমানপূর্ণ সুপাঠ্য। আসলে কাউকে নগ্নভাবে হামলা না করা মানে তোষামোদী (চঞ্চলের ভাষায় বাটারঅয়েল দেয়া) করা নয়।

    আর একজন লেখককে আরেকজনের মতো হতে হবে এমনতো কোনও কথা নেই — আমি মনে করি প্রত্যেককে হতে হবে প্রত্যেকের মতো। লেখকের বোধ, লেখকের উচ্চারণ কোনও টাইপে আটকে যাওয়া উচিত না।

    গোটা লেখায় হুমায়ুন আজাদের যে রূপ উঠে এসেছে তা হলো — ১. হুমায়ুন আজাদ কেমন পোশাক পরতেন; ২. লেখক সম্মানীর টাকা পেতে দেরিতে/না পাওয়ায় বিরক্তি; ৩. ধর্মান্ধদের অচরণের প্রতি বিরক্তি; ৪. তাঁর লেখার সমালোচনাকারী এবং প্রকাশক পত্রিকার প্রতি ক্ষিপ্ততা; ৫. দেশীয় সাহিত্য প্রসঙ্গে নীচু ধারণা; এবং আমাদের বিদ্যায়তনগুলোর পাঠ্যসূচীর সমালোচনা; ৬. আহমদ ছফার সঙ্গে তাঁর সখ্য ও তসলিমা নাসরিনের প্রতি অসম্ভব বিরক্তি।

    আমার মনে হয় হুমায়ুন আজাদের লেখা আর ব্যক্তিজীবনের বহু রূপ উঠে আসতে পারে চঞ্চল আশরাফের লেখার মাধ্যমে। তাই পাঠকদের সেই স্বাদ থেকে বঞ্চিত করবেন না প্রিয় চঞ্চল আশরাফ।

    – ফেরদৌস খান

  10. কামরুজ্জামান says:

    হুমায়ুন আজাদ তাঁর সমসময় নিয়ে সত্যিই অসাধারণ কিছু মন্তব্য করে গেছেন, সন্দেহ নেই। কিন্তু বেচারা নিজের সম্পর্কে সামান্য একটু সত্য কথাও হজম করতে পারতেন না। আর আমরা এমন একটা লোককে প্রথাবিরোধী বলে ঠাওরাই!

    প্যান্টের নিচে শার্ট গুঁজতেন না যে লোক কিংবা টাই পরতে যার অনীহা ছিল, তিনিই আবার নিজের জন্মদিনের কেক কাটতে কাটতে আকর্ণ হাসেন… স্ববিরোধিতা কাকে বলে! একেবারে খাঁটি বাঙালি!

    আজাদ ভাবতেন বাংলা ভাষায় কোনো উৎকৃষ্ট সাহিত্য হয়নি, অথচ সেই ভাষার লেখক হয়ে নিজেই নিজের লেখাকে উৎকৃষ্ট ভাবতেন… শোচনীয় আত্মরতিতে আচ্ছন্ন এক ব্যক্তির (শব্দটি আজাদ তার লেখায় বেশ ব্যবহার করতেন) উৎকৃষ্ট এক উদাহরণ।

    ‘খুব পণ্ডিত হয়েছ তা হলে?’… যে লোক এই জাতির জ্ঞানহীনতা নিয়ে আক্ষেপ করতেন, কেউ একটু ‘পণ্ডিত’ হয়ে উঠছে দেখলেই সহ্য করতে পারতেন না। কী মর্মান্তিক!

    চঞ্চল আশরাফের বরাতে জানা যাচ্ছে যে আজাদ একদা বলেছিলন, “আমি মনে করি, কবিদের মাইক আর মঞ্চ বর্জন করা উচিত। কারণ, এই দু’টি জিনিস কবিতার ক্ষতি করেছে সবচেয়ে বেশি।” আর আমার মনে হয়, বাংলায় তুখোড় ঢঙের নিজস্ব এক গদ্যভাষার অধিকারী আজাদ নিজের ক্ষতি করেছেন স্বয়ং আজাদই, পরচর্চা করে।

    কিন্তু, চঞ্চল আশরাফের এই লেখার বিষয় ‘সাহিত্যিক’ হুমায়ুন আজাদকে নিয়ে হলেও, লেখাটির পঁাক কিস্তির বেশি অংশ জুড়েই হুমায়ুন আজাদের অসাহিত্যিক অপলাপ অনেক বেশি স্থান পাচ্ছে। তাতে এটি ক্রমশই ঝুলে যাচ্ছে বলে পাঠক হিসেবে আমার কাছে মনে হচ্ছে। আজাদের লেখা সম্পর্কে যাঁরা খানিকটা হলেও ওয়াকিফ, তাঁরা তাঁর সুললিত ভাষায় পরাক্রমণাত্মক মন্তব্য সম্পর্কে কমবেশি জানেন বলে আমার মনে হয় (আমার এ ধারণা ভুলও হতে পারে)।

    তাই আমার আশা হয় লেখাটির মেদ ঝরিয়ে চঞ্চল একটি ঝরঝরে স্মতিকথা পাঠকদের কাছে পেশ করতে পারেন।

    – কামরুজ্জামান

  11. হুমায়ুন স্যারের স্মৃতিচারণ বিষয়ক এ লেখাটিতে চঞ্চল আশরাফ খুবই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। স্যারের ভেতরের ক্ষোভগুলো এই লেখায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বর্তমান সমাজের যে অবয়ব আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই, তার বিরুদ্ধাচরণ সবসময়ই করেছেন হুমায়ুন স্যার। চঞ্চল আশরাফ স্যারের প্রতিটি কথা নিজের ভাষায় সাবলীল ভাবে তুলে ধরেছেন, যা আমাকে মোহিত করেছে। তবে হুমায়ুন স্যারের কাব্য নিয়ে কিছু লিখলে খুবই খুশী হবো। চঞ্চল আশরাফ কেন এখনও সে বিষয় নিয়ে লিখছেন না, বুঝতে পারছি না।

    গিয়াছ
    পাইকপাড়া

  12. ফেরদৌস খানের সঙ্গে আমি একমত পোষণ করছি। কারণ, এ লেখাটি আমার কাছে নেহাতই স্মৃতিচারণ বলে মনে হচ্ছে। তবে ভাষাশৈলী চমৎকার, যে কারণে লেখাটি আকর্ষণীয় হয়ে গেছে। তবে হুমায়ুন আজাদের আরো কিছু বর্ণাঢ্য ঘটনা যদি এতে ঠাঁই পেতো, তাহলে পাঠকরা আনন্দ পেতেন। কিন্তু চঞ্চল আশরাফ শুধুমাত্র কিছু নিজস্ব ঘটনা লিখেই পার পেয়ে গেছেন। যেখানে হুমায়ুন আজাদকে অলংকৃত করার কথা, সেখানে কিছু কিছু জায়গায় তাঁকে ছোট করা হয়েছে। এটা কী কারণে করা হলো, সেটা বুঝতে পারিনি। তবে চঞ্চল আশরাফ লেখেন ভালো। তবে লেখার কয়েকটি জায়গায় আমি ভারতীয় লেখকদের স্মৃতিচারণমূলক কিছু বইয়ের হুবহু কপি খুঁজে পেয়েছি। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, দেবেশ সেনের স্মৃতিচারণমূলক বই, নীরেন্দ্রনাথ ও আমি নামক বইটির একটি অংশের পুরো মিল পাওয়া যাচ্ছে এই লেখার চতুর্থ কিস্তির সঙ্গে। চঞ্চল কী বলবেন, আমি জানি না। তবে নীরেন্দ্রনাথ ও আমি বইটি যদি কেউ কিনে এর ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ পড়েন তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

    তরিকুল
    শহীদুল্লাহ হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  13. চঞ্চল আশরাফকে ধন্যবাদ, হুমায়ুন আজাদ-এর ব্যাপারে অনেক কিছুই জানতে পারছি।

    – শান্তনু আদিব

  14. ‘বিএনপি-জামাত সরকার বেশি দিন বইটিকে নিষিদ্ধ রাখতে পারবে না।’

    লেখকের কাছে আমার প্রশ্ন, ঐ সময়টাতে বিএনপি’ র সাথে কি জামাতও ক্ষমতার অংশীদার ছিলো? না থাকলে এই জায়গাটা সংশোধন করে দিলে–জাতি আর একটা ইতিহাস বিকৃতির হাত থেকে বাঁচতো।

    **লেখককে ধন্যবাদ এইরকম স্মৃতিচারণমূলক এবং সুখপাঠ্য একটা লেখার জন্যে**

  15. emni says:

    আজাদ-এর চুরি বিষয়ে কোন কিছু লেখা হবে? তিনি যে অন্যদের কাজ মেরে দিয়েছিলেন সেসব বিষয়ে?

  16. লিমন says:

    ১৯৯৫ সালে আপনি বিএনপির সাথে জামাতকে পেলেন কিভাবে? দয়া করে জানাবেন। এটা কি স্মৃতিচারণ নাকি রুপকথা লিখে যাচ্ছেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.