কবিতা

অনেক অনেক চুমু ও ভালোবাসা নিও

মাজহার সরকার | 22 Apr , 2018  

১.
আজও আমি লাল বাস, দুপুর ও যুথীকে ভালোবাসি
হাত ফসকে উড়ে যায় পাখি পাখি
পাখি উড়ে যায়
এই ভয়ে চোখ বুজে রাখি।
আজও আমি যাই মহাখালী, বিদ্যুৎবিকীর্ণ হাতে
ভালোবাসা শুইয়ে রাখি
শুধু টুকরো রুমাল নাড়ি, ক্ষতের চারপাশে ওড়ে রক্তলিপ্সু মাছি।
আজও টুপটুপ টুপটুপ মাংস ঝরে যায়
বাগানগুলো বধ্যভূমি হয়ে ওঠে, পুড়ে যায় অমল খামার
বাড়ি,
আজও পৃথিবী শেকড় বাকড় অবিরল আগাছা কেবল
চড়া বাল্ব মাছের বাজারে ভাঙা বরফ বাঁশের ঝুড়ি
মহাখালী মহাখালী, চারদিকে ইতস্তত শসার খোসা
মাথা নিচু করে হাঁটি, মাথা নিচু করে হাঁটি।

২.

আলমারিতে পাওয়া গেলো একটা পুরনো প্যান্ট
বছর দশেক আগে পরা বন্ধ করেছি যাকে
দেহের দুঃখকে সুতীব্র চুম্বনে
দুই ঊরুর মাঝে রক্তাক্ত যৌবনে
ব্যর্থতা ঢেকে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যেতাম
আজ তাকে জানালার পাশে হ্যাঙারে টানিয়ে রেখেছি।
সে প্যান্টের দরজা আছে, জানালা আছে
পকেট দুটোতে ছত্রাক পড়ে গেছে প্রায়
যেখানে পাওয়া গেলো শুকনো গোলাপ পাপড়ি
যেখানে এককালে আমি হৃৎপিণ্ডটা তুলে রাখতাম
টিএসসি কিংবা কার্জন হলে সে টকটকে কালো প্যান্টের প্রশংসায়
এতদিন কি ভীষণ একাকী কেটেছে তার
একদিন যে পায়ে এসে পড়ে থাকতো প্রেমিকার হাত
শরীরে বোধের তরুণ বালুর আবরণে নিচে ত্বক গরম হয়ে উঠতো
আমার তখন জ্বলে উঠবার কথা প্রত্যয়ী প্রেমিকের মতো
শিশ্নে শিল্পের সাহস গভীর রক্তাক্ত
প্রজ্জ্বলনের অস্ত্র হয়ে আজ এই
প্যান্টের দিকে তাকিয়ে বেদনার্ত হই
এই দুটি পায়ের দিকে তাকিয়ে আমি এসেছি জেনে
প্রেমিকা উদ্বেলিত হতো দূর থেকে, অথচ
আজ সে এই নির্বাসিত নদীর ঠিকানা জানে না।

৩.

প্রত্যেক গ্রামে কিছু শিশু আছে
চাঁদহীন বাঁশবনের পাশ দিয়ে যেতে
প্রথম রাতে তাদের কাঁদতে শোনা যাবে
যতক্ষণ না কিশোরীরা তাদের কোলে নিয়ে উঠোনে
দরজায় দাঁড়িয়ে চুম্বন করে, দোল খাওয়ায়।
প্রত্যেক গ্রামের নিজস্ব গন্ধ আছে
পাতা পচা, নোয়ানো মুরতা, ছেঁচা ঘাসের ঘ্রাণ
প্রেম আর প্রাচীন কেউ
টর্চ মেরে ফিরে আসে পরিচিত মাতৃনদীতে
গরু ডাকে কুকুর ডাকে
ভ্রান্ত দেহ নিয়ে আসে জোঁকের শরীরে
ভিজে
মুখের বসন্ত নীল
তিল দেখে মুছে দেবে ভেবে
গ্রাম তার শেষরাতে আম রঙের পোশাক নাড়ে।
প্রত্যেক গ্রামে অভিভূত এক শ্বেতপ্রভা
জ্বলে যায় জড়মৃত্তিকার খুলে যাওয়া গিঁট
গহ্বরে
সব জলের ইচ্ছের তলে উঁচু হয়ে দেখি
একটা হরিণ পাহাড় থেকে ঝরণার হেঁটে যাওয়া
দেখছে
প্রত্যেক গ্রামে এখন শিশুরা ঘুমিয়ে গেছে
ধীরে গোলাপ ফোটার শব্দে
অতি যত্মে কিশোরীর বাজুতে মেঘের নিকটে
আমাদের নিকট প্রতিবেশী।

৪.

জীবনে এতো প্রেম করেছি এখন বুঝিনা কোনটা স্মৃতি, কোনটা মৌলিক কুণ্ঠার দাঁড়ানো সাপ। আসলে কালভ্রান্ত প্রেমিকের রাতে ফিরে আসার মতো একটা প্রেমিকাও আজ ঘরে নেই, যাকে মনে করে এই রাতে বীর্যপাত করা যায়। যার গন্ধটা ফিরিয়ে এনে এখন বালিশের উড়ে যাওয়া চোখে রুমাল চেপে কান্না থামাতে পারি। আমি কি ব্যর্থ ভালোবেসে বোকা হয়ে গেছি! দশ বছরে একটুও বড় হয়নি শিশ্ন, তবে বুকচেপে গঞ্জনার চাদরে কি নাম রেখেছি তার এবার শোন, জানাবো একাগ্র কোনদিন ধীর দশজন থেকে বেছে একজনের বিজয়ী পিঠ। বাকি নয়জন হলো মেধা নয় স্বপ্নশায়িত চাপ চাপ ত্যাগ। মনে পড়ে, হ্যাঁ, সিঁড়ি যার মনোযোগী আঙুলে তুলি না তলোয়ার অগণন মানবী ও জন জলের আয়তে ভাসলো সিঁথিতে। একবার দেখে আরেকবার জরায়ুর শীতে ক্রমাগত খুলতে থাকা অনিবার্য তাপ।

এতো প্রেম করেছি এখন জানি না কোনটা নকল, আসল স্বভাবে দেখি তেতে আছে নিখিল বগল। বিভক্ত এই তাঁত রেখে কোন কাপড়ে স্থাপিত শরীর ভেবে হয়ে উঠি রহস্যে দ্বৈত। সব প্রেমিকাকেই কিছু না কিছু ভালোবেসেছি, মাটি আর সহজ ইচ্ছার মতো মৃদু ভেবে স্তনের চারপাশে নত ঠোঁটে টেনেছি দূরত্ব। কে সেরা, আজ এই প্রশ্ন করে শোনো উড়ন্ত, প্রত্যেকে আমাকে দিয়েছিল আলাদা শৈশব, ভোর হলেই অনিবার্য স্নান। আজ এই রাতে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলতে চাই, আমি লম্পট নই প্রেমিক।

আজ যত বস্তুর ব্যথা, পরাজিত ত্বক, প্রেম হারিয়ে গেলে তা-ই হয় শিক্ষা। এমন স্কুল কই তোমাদের নগরে, দেখো এই বুকে কতো সংখ্যার প্রতিভা, কত নারীকে ধরে রেখে চিরদিন বুঝি নিধি ও কৃষক দোষে জেগে ওঠে অগাধ শুদ্ধ অভ্যাসে ভালোবেসে ভালোবেসে ছড়ায় তুমুল তৃষ্ণা। কাকে যেন ভালোবাসতাম মনে করে এই আঠারো সালে এসে ফুল ঝরার দাহ নিয়ে পেটে লুক্কায়িত সুর জ্বালা স্মরণ বীণে ভেসে আসে তার গন্ধ আজ আমার ঘরে। শহরের শবে ছড়িয়ে পড়ার পর এখন পাবো কাকে গ্রীবামুখ চেয়ে দেখে ঘোষিত সরবে উলঙ্গ আনন হেসে, কী করে বলি বারবার তোমার কাছে আসতে ইচ্ছে করে, একটা চুমু আর একটা আলিঙ্গনের লোভে।

৫.

পৃথিবীটা বড় বেশি সুন্দর আর নিষ্পাপ। একাকী মানুষ আমি সয়ে উঠতে পারি না। সুন্দরই দুঃখ ও ক্লান্তিকর, যেন ক্রুদ্ধ সারস শুনালো তার ডাকে জীবনের ক্ষুদ্রতম ব্যথা। নীরবতা, সূর্যপোড়া পাথরের নিচে মুখ রেখে বুক অব্দি জানালায় কোমরের নিচে অগ্নিময় মাছের ঝাঁকে আলোয় মায়াবী গাভী তুলছে তার দুই বাহু। হয়তো ছোঁবে সে প্রলম্বিত ইচ্ছায় পৃথিবীর বৃত্ত আঁকা প্রাণে, প্রেমের উজ্জ্বল তালুতে চেপে ধরবে আঘাত। আমার গলায় ছিল চুমুর দাগ, যেখান থেকে ঘষে ঘষে মুছে গেছে প্রেমিকার ঠোঁটের ছায়া, আজ কোথায় সেই ত্রিভুজ, টেনে তুলবে নতুন আলিঙ্গন এক পাখির দেহের ভেতর! তার নীল চোখের রচনায় একাকী মানুষ আমি তাকিয়ে থাকতে পারি না, দীর্ঘ চাঁদ ঊষার উদ্ভাস কিংবা বেশিক্ষণ নারীর দিকেও চেয়ে থাকতে পারি না। পৃথিবীটা চলমান মুখ থেকে অনেক চোখ অনেক বিমুগ্ধ আকাশ, সবই মুছে যায়। সবই ক্ষয় হয় দারুণ আঘাত।

৬.

আমার পড়ার ঘরটা মূলত একটা কবর। এখানে শয়ে শয়ে মৃত মানুষের বই, তাদের অতীত। আমি হলাম কবররক্ষী, আমার স্ত্রী যখন ঘুমিয়ে পড়ে গভীর রাতে তার ঘরের বাতি নিভিয়ে এখানে এসে ঢুকি। চাঁদের বুকভরে মেঘ বয়ে যায় ছাদবারান্দার ফুল ঝরে যায় হেডফোনে গান শোনা শেষ, এখন আমি একা মৃত্যু ছাড়া আর কোন বন্ধু নেই। পুরনো হতে হতে সাদা থেকে বাদামি হয়ে যাওয়া পৃষ্ঠা উল্টাই চৈত্রের প্রশ্বাসে গড়া জীবনের পুষ্পিত গুঞ্জনে। মনে হয় কবরে গজানো নতুন দুটা ঘাসফুড়ে আমাকে সান্ত্বনা দিতে শুধু একটা আঙুল উঠে আসে। আজ এই মরণোত্তর রাতে, একটা জরুরি লেখা খুঁজতে খুঁজতে এই বই ওই বই, শালা মৃতের দল, জীবন মানুষের কোন অঙ্গে? কোথায় সে থাকে? তার প্রেত ছাড়ে না আমাকে, মৃত কারও কাছ থেকে কখনো কে শিখেছে কিছু!

৭.

বৃষ্টি এলে অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের অগ্নিতে বাজে স্মরণের বীণ, জানালা খুলে প্রসারিত হাতে বেদনার বিন্দুগুলো জ্বেলে নিতে দীপে, কে আর মনে করে কেবল ফুল খেয়ে চলে গেলো দিন। কেরানী বউ যে হপ্তাভরে জানালায় বসে সেও আজ সব বন্ধ করে স্নায়ুর বাঁধন শ্লথ ঘুমে, ফিরে গেছে নিভৃত কোলায়। নিশ্চিতে তারা অবিবাহিত যারা গতির চিৎকারে থেমে দেয়ালে পাঁজর রেখে ক্রান্ত বছরের স্বর্ণাচল ধরে গড়িয়ে এগোয় চোখে। সশব্দে কয়েকটা ছটা কাচে লেগে মেঝে ভিজিয়ে দিলো, এখন কি জানালা বন্ধ করে দেবো? চাদর সরিয়ে বিছানা ছেড়ে বারান্দার কাপড়গুলো ঘরে তুলে নেবো পাকা শস্যের অভিধায় বাহিরে ওই কাতর গর্জনে। বৃষ্টি এলে আমাকে দেখেছে কি কেউ অসহায়, কার্নিসের উচ্চকোণে স্থির বসে থাকা অলস বেড়ালের মোছে একটি আলোর দানা সমস্ত হয়ে ছুটে যায় একটি জলের ফোঁটায় জ্বালিয়ে নিতে একমাত্র দেশলাই! বৃষ্টি এলে রেস্তোরাঁ থেকে নিয়ে আসা গরুর মগজ আর কয়েক পেগ টেবিলে রেখে ক্রমে ক্রমে তিনটা চাকু দেই বুকে সেঁদিয়ে, আজ মরবো না তো অস্থির কুসুমে কুমিরের ডিম দেবো ছেড়ে। অঙ্গহীন ধোঁয়াশূন্য দেহ মোড়ে আঁচড়ে তুলে দেখবো কোথায় তার রক্তরাগ। না, আমি যখন শহর ছেড়ে বস্তিতে এসে গেছি বাসাভাড়া বাঁচাতে, রক্তফুল আর্তকণ্ঠে লাফিয়ে উঠলো ফের হাওয়া। জানালাটা বন্ধ করবে কে? অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকের ঘরে চাপ চাপ বৃষ্টির রেখা হয়েছে জমা, দিশারী তারার মতো গঞ্জের চেরাগ অন্ধরাত্রী আমি গিলে চলেছি বিষাক্ত প্রগাঢ় লালফুল।

৮.

পৃথিবীর সমান বয়স হয়েছে আমার, যেন পেশাদার অলস বেকার রাখাল কোন কাজ নেই আর। রাতের নাভিতে মেরুদণ্ড ঠেকিয়ে এই অরূপ সোনা ভোরের আগে এক চিরআয়ু নীল ফুল বারান্দায় একা সিগ্রেট খাই। হে প্রিয়, একদিন সৌন্দর্য দিয়েছিল, কাঁধে হাত রেখে বন্ধুতা দিয়েছিল, আজ এই ঋণ হাড়ের ভেতর পুরে পুরনো দেহ বদলে যাবো নিঃসঙ্গ সব ফুলে। অনেক অনেক চুমু ও ভালোবাসা নিও।
Flag Counter


5 Responses

  1. ইকবাল করিম হাসনু says:

    নতুন সম্ভাবনার আঁচ পেলাম।শক্তিমত্তার আবির্ভাবে কবিতাগুলোর স্বাদ সত্যিই অনবদ্য।

  2. prokash says:

    এ কে রে,,, এরকম নতুন ভাষায় কবিতা লেখে,,,,,

  3. আশরাফুল কবীর says:

    অত্যন্ত শক্তিশালী কবিতা; আটকে থাকতে বাধ্য, খুবই ভালো লেগেছে প্রত্যেকটি কবিতা। শুভেচ্ছা আপনাকে কবি।

  4. সানাউল্লাহ সাগর says:

    এক নতুন ভাষার সাথে পরিচিত হলাম। খুব ভালো লাগলো। ভালোবাসা কবি।

  5. Shirin Osman says:

    অনেক ভালবাসার কবিতা, মাজহার। মুগ্ধতায় মন ভরে গেছে। শুভ কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.