arts.bdnews24.com » জেমস জয়েসের গল্প: বোর্ডিং হাউজ

জেমস জয়েসের গল্প: বোর্ডিং হাউজ

নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান | ১৯ এপ্রিল ২০১৮ ৮:২২ অপরাহ্ন

জেমস জয়েস (২ ফেব্রুয়ারি, ১৮৮২- ১৩ জানুয়ারি, ১৯৪১)। পুরো নাম জেমস অগাস্টিন অ্যালয়েশাস জয়েস। জন্ম আয়ারল্যান্ডের ডাবলিন শহরে। আইরিশ এই ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার ও কবিকে বিংশ শতকের অন্যতম প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ লেখক হিসাবে গণ্য করা হয়। ডাবলিনার্স (১৯১৪), আ পোর্ট্রেট অফ দি আর্টিস্ট অ্যাজ আ ইয়াং ম্যান (১৯১৬), ইউলিসিস্ (১৯২২) এবং ফিনেগান্স ওয়েক (১৯৩৯) তাঁর বিখ্যাত ও উল্লেখযোগ্য কিছু সাহিত্যকর্ম । তাঁর গল্পে ব্যবহৃত ভিন্নমাত্রার ভাষাশৈলী ও বিষয়বস্তু তাঁর সমসাময়িক সাহিত্য-জগতে ব্যাপক আলোড়ন তোলে এবং পরবর্তীতে সাহিত্যে এক নতুন ধারার সূচনা করে। “বোর্ডিং হাউজ” গল্পটি তাঁর ডাবলিনার্স গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত হয় ১৯১৪ সালে। মোট ১৫টি গল্প নিয়ে সাজানো এই বইয়ের পাতায় পাতায় ফুটে উঠেছে বিংশ শতকের প্রথম দিকের ডাবলিন শহরের মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিচ্ছবি। গল্পটি অনুবাদ করেছেন নূর-ই-ফাতিমা মোশাররফ জাহান। বি.স. ।

মিসেস মুনি কসাইয়ের মেয়ে। মুখ দেখে তার মনের ভাব বোঝার উপায় নেই। বেশ শক্ত ধাতের মহিলা। বাবার কর্মচারীকে বিয়ে করে ‘স্প্রিং গার্ডেন্স’ এলাকায় একটা মাংসের দোকান খুলেছিল দু’জনে মিলে। কিন্তু শ্বশুর মারা যেতেই মি. মুুনি উচ্ছন্নে যেতে শুরু করল। মদ খেত, ক্যাশবাক্স তছনছ করত আর সারা বছর গলা পর্যন্ত দেনায় ডুবে থাকত । তাকে দিয়ে মদ ছাড়ানোর শপথ করিয়েও কোন লাভ হত না। ক’দিন গেলেই আবার যেই কে সেই। খদ্দেরের সামনেই বউয়ের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করে আর দোকানের জন্য বাজে মাংস কিনে ব্যবসার বারটা বাজিয়ে ছেড়েছিল সে। এক রাতে বউকে চাপাতি নিয়ে এমন ধাওয়া করল যে বেচারিকে বাধ্য হয়ে পাশের বাড়িতে বাকি রাতটুকু কাটাতে হয়েছিল।

এরপর থেকে তারা আলাদা থাকতে শুরু করে। মিসেস মুনি পাদ্রীর কাছ থেকে পৃথকবাসের অনুমতি চেয়ে নেয়, আর সেই সাথে আদায় করে ছেলেমেয়ের অভিভাবকত্ব। তারপর স্বামীকে টাকা-পয়সা বা খাবার-দাবার তো দূরের কথা, বাড়িতে থাকার জায়গা পর্যন্ত দেয়নি। মি. মুুনি তাই বাধ্য হয়ে পৌরসভার বেকারের খাতায় নাম লেখায়। কুঁজো, বেঁটে-খাটো এই মাতাল লোকটা দেখতে বেশ জীর্ণ-শীর্ণ । তার ফ্যাকাশে চেহারায় ধবধবে সাদা একজোড়া গোঁফ। ছোট ছোট লালচে চোখের ওপর সাদা ভ্রু দু’টো ঠিক যেন তুলি দিয়ে আঁকা। দিনভর পৌরসভার অফিসঘরে বসে থাকে একটা কাজের আশায়। মাংসের ব্যবসার যা কিছু অবশিষ্ট ছিল তাই দিয়ে দশাসই চেহারার জাঁদরেল মিসেস মুনি হার্ডউইক স্ট্রিটে একটা বোর্ডিং হাউজ খোলে। তার এই মেস-বাড়ির দু’চার দিনের অতিথিদের বেশিরভাগই ‘লিভারপুল’ আর ‘আইল অভ ম্যান’ থেকে বেড়াতে আসা পর্যটক। মাঝেমাঝে অবশ্য গানের দলের শিল্পীরাও এসে থাকে এখানে। এখানকার মাসকাবারি ভাড়াটেরা সবাই শহরে কেরানিগিরি করে। মহিলা সুচারু কৌশলে অত্যন্ত দাপটের সাথে তার এই বোর্ডিং হাউজ চালায়। সে খুব ভাল করেই বোঝে কাকে কখন বিশ্বাস করে বাকিতে ঘর ভাড়া দেয়া যায়। কখন কোমল হতে হয় আবার কখন কঠিন রূপ ধারণ করতে হয় তাও খুব ভালো জানা আছে তার। ভাড়াটে ছেলেরা তাকে ‘বাড়িওয়ালি মাসি’ বলে ডাকে।

মিসেস মুনির ভাড়াটেরা থাকা খাওয়া বাবদ সপ্তাহে পনের শিলিং করে জমা দেয়। (তবে খাওয়া-দাওয়ার পর পানীয় খেতে চাইলে সে হিসাব আলাদা।) সবার পেশা আর রুচি একই ধরনের হওয়ায় নিজেদের মধ্যে বেশ খাতির। রেসের ঘোড়ার হারজিৎ নিয়ে প্রায়ই আড্ডা জমে ওঠে তাদের। বাড়িওয়ালির ছেলে জ্যাক মুনি ‘ফ্লিট স্ট্রিট’-এর এক ঠিকাদারি দালালের অফিসে কেরানির কাজ করে। সে যে খুব একটা সুবিধার লোক নয়, তা মোটামুটি সবাই জানে। প্রায়ই রাত করে বাড়ি ফেরে। সেপাইদের মুখের অশ্রাব্য খিস্তির প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা। ইয়ার-দোস্তদের সাথে দেখা হলে এ ধরণের দু’চারটা কথা তার ঠোঁটের আগায় তৈরিই থাকে। কোন না কোন নজরকাড়া জিনিসের ওপর সবসময়ই তার একটু ‘বিশেষ নেকনজর’ থাকে- এই যেমন রেসের তাগড়া ঘোড়া বা গানের দলের শিল্পী। মারপিটে যেমন ওস্তাদ, তেমনি আবার কৌতুক-গানও গায়। প্রায় প্রতি রবিবারেই সন্ধ্যার পর মিসেস মুনির বসার ঘরে সবাই মিলে জড়ো হয়। গানের দলের শিল্পীরাও বাকি সবার সাথে সঙ্গৎ করে। শেরিডান সুর তোলে ওয়াল্ট্জ্, পোল্কা আর ভ্যাম্প ঘরাণার সঙ্গীতের। বাড়িওয়ালির মেয়ে পলি মুনিও গান ধরে। সে গায়:
আমি এক দুষ্টু মেয়ে,
ছল করো না গো,
আমি কেমন, জানোই তো।

পলির বয়স ঊনিশ। ছিপছিপে গড়ন। মসৃণ সোনালী চুল। ছোট, ভরাট ঠোঁট। চোখের ধূসর মণিতে সবুজের আভা। কথা বলার সময় বারবার ওপরের দিকে তাকানো তার মুদ্রাদোষ। এ কারণেই দেখলে মনে হয় সে যেন মাদার মেরি-র এক স্বৈরিণী সংস্করণ। প্রথম দিকে মিসেস মুনি মেয়েকে এক ভুট্টার আড়তদারের অফিসে টাইপিস্টের কাজে পাঠিয়েছিল। কিন্তু দু’চার দিন পরপরই কোন এক বজ্জাত বেকার বুড়ো সেখানে গিয়ে একটি বারের জন্য নিজের মেয়ের সাথে দেখা করার অনুমতি চাইত। এ কারণেই মিসেস মুনি মেয়েকে ঐ চাকরি থেকে ছাড়িয়ে এনে ঘরের কাজে লাগিয়ে দেয়। পলি বেশ হাসিখুশি, চটপটে মেয়ে। তাই ভাড়াটে ছেলেদের জন্য টোপ হিসেবে তাকে ব্যবহার করাই মিসেস মুনির আসল উদ্দেশ্য। সত্যি বলতে কি, জোয়ান পুরুষমানুষও ধারে কাছে একটা কমবয়সী মেয়ে দেখলে বেশ খুশি হয়। পলি মুনি পুরো দমেই তার ছলা-কলার নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে থাকে। কিন্তু মিসেস মুনির চুলগুলো তো আর এমনি এমনি পাকেনি। সে খুব ভাল করেই জানে এসব ছেলে-ছোকড়ার স্বভাব। এরা দু’-চার দিন ফষ্টিনষ্টি করলেও আসল কাজের বেলায় ঘন্টা। এভাবেই কেটে যায় বেশ কিছুদিন। শেষমেষ মিসেস মুনি যখন মেয়েকে আবারো টাইপিস্টের চাকরিতে পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই তার নজরে পড়ে ব্যাপারটা। পলির সাথে বোর্ডিং হাউজের এক ভাড়াটের কিছু একটা চলছে। মহিলা গোপনে তাদের ওপর নজর রাখতে থাকলেও মুখে কিছু বলে না।
পলি নিজেও জানে মায়ের এই নজরদারির কথা। সবকিছু দেখার পরেও মায়ের নিরবতার মানে সে খুব সহজেই বুঝে নেয়। মেয়ের কীর্তিকলাপে মায়ের অবশ্য সরাসরি কোন যোগসাজশ নেই। তবু বাড়িসুদ্ধ সবাই যখন বিষয়টা নিয়ে কানাঘুষা শুরু করে দিয়েছে, তখনও মিসেস মুনি মুখে কুলুপ এঁটে রাখে। পলির চালচলনে বদল আসতে থাকে। তার সাথে পাল্লা দিয়ে সেই যুবকের মাঝেও অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অবশেষে যখন মিসেস মুনির মনে হয় যে এবার সঠিক সময় এসেছে, তখনই সে মুখ খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ন্যায় অন্যায়ের প্রশ্নে তার বিচার কসাইয়ের ছুরির মতই নির্মম। আর, মেয়ের এই বিষয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছে।

গ্রীষ্মের প্রথম দিকের এক রবিবারের কথা। ঝলমলে সকাল। মনে হচ্ছে এবার ভালই গরম পড়বে। চনমনে হাওয়া বইছে। বোর্ডিং হাউজের সব জানালা খোলা। হাওয়ার তোড়ে জানালার লেস-লাগানো পর্দাগুলো বাইরের রাস্তার দিকে ফুলে ফেঁপে দুলতে থাকে। গীর্জার ঘন্টার বারংবার আহ¦ানে ভক্তেরা কেউ একা, আবার কেউ দল বেঁধে গীর্জার আঙিনায় জড়ো হতে থাকে। তাদের ভাবগম্ভীর আচরণ আর দস্তানা-মোড়া হাতে প্রার্থনা-পুস্তক দেখে সহজেই বোঝা যায় তাদের গীর্জায় আসার কারণ। বোর্ডিং হাউজের সকালের নাস্তার পালা চুকে গেছে। খাবার ঘরের টেবিলের ওপর ছড়ানো এঁটো বাসনগুলোতে ডিমের কুসুম আর বেকনের কণা লেগে আছে। কাজের মেয়ে মেরি টেবিলের ওপর থেকে নাস্তার জিনিসপত্র সব উঠিয়ে নিচ্ছে। মিসেস মুনি একটা বেতের হাতলওয়ালা চেয়ারে বসে মেরির কাজের তদারকি করছে। নাস্তার পর বেঁচে যাওয়া পাউরুটির ভাঙাচোরা টুকরাগুলো মেরিকে দিয়ে তুলিয়ে রাখে সে। সামনের মঙ্গলবারে পাউরুটির পুডিং বানানোর সময় এগুলো কাজে লাগানো যাবে। টেবিল পরিষ্কার আর পাউরুটির টুকরা ওঠানো হয়ে গেলে মিসেস মুনি মাখন-চিনি সব তালাবন্ধ করে রাখে। এরপর গতরাতে মেয়ের সাথে হয়ে যাওয়া কথাগুলো নতুন করে ভাবতে বসে সে। তার সন্দেহই ঠিক। রাতে কোনরকম রাখঢাক ছাড়াই মেয়েকে সরাসরি প্রশ্ন করেছে। মেয়েও মায়ের সমস্ত প্রশ্নের খোলাখুলি জবাব দিয়েছে। যদিও এই প্রশ্নোত্তর পর্ব মা-মেয়ে দু’জনের জন্যই বেশ অস্বস্তিকর ছিল। মা অস্বস্তিতে ছিল কারণ সে চায়নি তার জেরা করার ধরণটা কোন নোংরা কৌতুহল বা গোপন আস্কারার মতো শোনাক। এদিকে পলিরও এসব ব্যাপারে সবসময়ই কেমন একটা অস্বস্তি হয়। তাছাড়া সে যে নিজের সরল বুদ্ধির জোরে মায়ের নিরবতার আসল উদ্দেশ্যটা আগেই আন্দাজ করতে পেরেছিল, মাকে তা বুঝতে দিতে চায়নি মোটেও।

এসব নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে থাকার এক পর্যায়ে হঠাৎ মিসেস মুনির খেয়াল হয় যে গীর্জার ঘন্টার আওয়াজটা থেমে গেছে। সবসময়ের অভ্যাসবশত তার চোখ যায় তাকের ওপর রাখা ছোট সোনালী ঘড়িটার দিকে। ঘড়িতে তখন এগারটা বেজে সতের মিনিট। তার মানে মি. ডোরানের সাথে বোঝাপড়া সেরে বেলা বারটার মধ্যে মার্লবোরো স্ট্রিটের গীর্জায় পৌঁছানোর মতো যথেষ্ট সময় আছে তার হাতে । এক্ষেত্রে নিজের জয় সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। প্রথমত, সমাজের আর পাঁচজন তার পক্ষেই কথা বলবে। অন্যায়ের শিকার এক অসহায় মা সে। লোকটাকে ভদ্রলোক মনে করে বাড়িতে ঠাঁই দিয়েছিল। আর সে কি-না এভাবে তার ভালোমানুষির সুযোগ নিল! বয়স তো চৌত্রিশ-পঁয়ত্রিশের কম নয়। তাই ছেলেমানুষির অজুহাত দিয়ে কিছুতেই পার পাবে না। এই লোক রীতিমত মানুষ চড়িয়ে খায়। কিছু বোঝেনা বললেই কেউ সেটা মানবে নাকি? সে যে তার মেয়ের কচি বয়স আর কাঁচা বুদ্ধির সুযোগ নিয়েছে, তা তো দেখেই বোঝা যায়। লোকটা এখন কীভাবে এই ক্ষতি পুষিয়ে দেবে সেটাই বড় কথা।
এমন একটা ঘটনার ক্ষতিপূরণ তো দিতেই হবে। পুরুষমানুষের আর চিন্তা কী? সবকিছু ভুলে গিয়ে নতুন পথ খুঁজে নেবে। এদিকে ফূর্তি যা করার সে তো আগেই করে নিয়েছে। কলঙ্কের কালি সবসময় মেয়েমানুষের গায়ে এসেই লাগে। কোন কোন মায়েরা অবশ্য টাকার বিনিময়ে এসব ব্যাপার মিটমাট করে নেয়। এ ধরণের ঘটনা জীবনে কম দেখেনি মিসেস মুনি। কিন্তু মা হয়ে নিজের মেয়ের বেলায় কিছুতেই এমন করতে পারবে না সে। কারণ তার কাছে মেয়ের ইজ্জতহানির একটাই ক্ষতিপূরণ: বিয়ে।
মনে মনে পুরো হিসেবটা আবারো কষে নেয় মিসেস মুনি। তারপর মেরিকে দিয়ে মি. ডোরানের ঘরে বলে পাঠায় যে বাড়িওয়ালি ওনাকে সালাম জানিয়েছে। তার মন বলছে আজ সে-ই জিতবে। লোকটার চালচলন বেশ ভদ্র-সভ্য। অন্য ভাড়াটেদের মতো অসভ্য-ইতর নয়। এর বদলে মি. শেরিডান, মি. মিড অথবা বান্টাম লায়ন্স হলেই বরং বাগে আনতে অনেক বেগ পেতে হতো। মনে হয় না লোকটা কোনরকম কেলেঙ্কারি হতে দেবে। মেসের সব ভাড়াটেই এই ঘটনার ব্যাপারে কিছু না কিছু জানে। কেউ কেউ তো ঘটনার ওপর আরো খানিকটা রং চড়িয়ে বেশ রসাল গল্প ফেঁদেছে। তাছাড়া, মি. ডোরান গত তের বছর যাবৎ এক নামকরা মদ ব্যবসায়ীর অফিসে চাকরি করে। তার মালিক খুব ধার্মিক ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। এমন একটা বদনাম হলে নির্ঘাৎ তার চাকরি যাবে। তারচে’ বাছাধন যদি ভালোয় ভালোয় রাজি হয়ে যায়, তাহলে সব দিক থেকেই মঙ্গল। মিসেস মুনি আগেই বুঝেছিল যে মি. ডোরান বেশ কাজের লোক। আর দেখেশুনে তো মনে হয় জমানো মালকড়ি বেশ ভালই আছে। সাড়ে এগারটা বাজল বলে! মিসেস মুনি এবার উঠে দাঁড়ায়। ঘরের পিলারে টাঙানো বড় আয়নায় নিজেকে ভাল করে দেখে নেয় একবার। নিজের গোলগাল লালচে চেহারায় দৃঢ়তার ছাপ দেখে তার বেশ ভাল লাগে। তার মনে পড়ে পরিচিত কিছু মহিলার কথা যারা তাদের মেয়েদের কোন গতি করে উঠতে পারেনি।

রবিবারের এই সকালে মি. ডোরানের সত্যিই খুব দুশ্চিন্তা হতে থাকে। দু’বার দাড়ি কামানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু যেভাবে হাত কাঁপছে তাতে বাধ্য হয়েই থামিয়ে দিতে হয়েছে। গালজুড়ে তিন দিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি। দু’তিন মিনিট পরপর তার চশমার কাঁচ ঘোলা হতে থাকে। তাই বারবার চশমা খুলে পকেট থেকে রুমাল বের করে কাঁচ মুছতে হচ্ছে। গত রাতে সে গীর্জায় গিয়েছিল পাপ-স্বীকার করতে। সে কথা মনে হলেই বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে তার। পাপ-স্বীকারের সময় পাদ্রী মশায় খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পেটের সমস্ত কথা বের করে ছেড়েছেন। সব শোনার পর তিনি মি. ডোরানের সেই পাপকে এতটাই বড় করে দেখেছেন যে প্রায়শ্চিত্তের একটা উপায় আছে জেনে সে একেবারে বর্তে গেছে। যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন তার সামনে মাত্র দু’টো পথ খোলা আছে- হয় বিয়ে করা, না হয় গা-ঢাকা দেয়া। এ ছাড়া আর কী-বা করতে পারে সে? এমন বদনাম নিয়ে সে কিছুতেই সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। এই ঘটনা পাঁচ-কান হবেই, আর ঠিকই এক সময় তার মালিকের কানে গিয়ে পৌঁছাবে। ডাবলিনের মত ছোট শহরে সবাই সবার হাঁড়ির খবর রাখে। সে তার উ™£ান্ত কল্পনায় দেখতে পায় বৃদ্ধ মি. লিওনার্ড হেঁড়ে গলায় তাকে ডেকে পাঠাচ্ছেন, “মি. ডোরানকে একটু ডেকে দাও তো।” দৃশ্যটার কথা ভাবতেই তার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার যোগার হয়।

তার এত বছরের চাকরিটা এভাবে চলে যাবে! এতদিনের পরিশ্রম আর অধ্যবসায় শেষকালে এইভাবে মাঠে মারা যাবে! অবশ্য বয়সকালে সে যে আমোদফূর্তি করেনি তা নয়। একসময় নিজের মুক্তচিন্তা নিয়ে খুব বড়াই ছিল। সরাইখানায় বসে সঙ্গী-সাথীদের সামনে ঈশ্বরের অস্তিত্বকে বেমালুম অস্বীকার করেছে তখন। কিন্তু সেসব দিন এখন আর নেই…বললেই চলে। তবে এখনও প্রতি সপ্তাহে উদারপন্থী রেনল্ড্স পত্রিকা কেনা হয়। ওদিকে আবার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও নিয়মিত যাতায়াত করে। বছরের নব্বই ভাগ সময়ই সে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে থাকে । বিয়ে করে সংসার পাতার মতো যথেষ্ট টাকাও হাতে আছে। টাকা-পয়সা নিয়ে সে আপাতত ভাবছে না। কিন্তু তার বাড়ির লোকজন তো এই মেয়েকে দেখলেই নাক সিঁটকাবে। একে তো মেয়ের বাবা এমন কুখ্যাত, তার ওপর মেয়ের মায়ের বোর্ডিং হাউজের নামে ইদানিং নানারকম কথা শোনা যাচ্ছে। তার মন বলছে সে খুব বাজেভাবে ফেঁসে গেছে। কল্পনায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে বন্ধু-বান্ধবরা তার এই সম্পর্ক নিয়ে কানাঘুষা আর হাসাহাসি করছে। মেয়েটা আসলেই একটু গেঁয়ো ধরণের। কখনো বলে, “দ্যাক্সিলাম”, আবার কখনো বলে, “যুদি জানতাম…”। সত্যিই যদি মেয়েটাকে সে ভালবেসে থাকে, তাহলে ভাষায় কী আসে যায়? মেয়েটা যা করেছে তাতে তাকে ভাল বলবে নাকি খারাপ বলবে ভেবে পায় না। অবশ্য সে নিজেও সমান দোষী। তবু তার মন তাকে বারবার বলছে বিয়ে না করে একদম ঝাড়া হাত-পা হয়ে থাকতে। কথায় আছে, “বিয়ে করেছ কি মরেছ”।

মি. ডোরান অসহায়ভাবে খাটের একপাশে বসে আছে। এমন সময় দরজায় আলতো টোকা দিয়ে মেয়েটা ঘরে ঢোকে। তারপর তাকে সবকিছু খুলে বলে। সে যে তার মায়ের কাছে সমস্ত স্বীকার করেছে আর তার মা যে সকালেই মি. ডোরানকে ডেকে পাঠাবে সে কথাও বাদ দেয় না। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে তার গলা জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে, “বব্, ও বব্, এখন আমার কী হবে? এখন আমার কী গতি হবে?”
মেয়েটা নাকি নিজেকে শেষ করে দেবে।
আমতা আমতা করে তাকে সান্ত¦না দেয় মি. ডোরান। কাঁদতে নিষেধ করে। বলে, সব ঠিক হয়ে যাবে, ভয় কী? বলতে বলতে নিজের বুক-পকেটের ওপাশে মেয়েটার বুকের ধুক্পুকানি টের পায়।
যা হয়েছে, তার সব দোষ কিন্তু মি. ডোরানের একার নয়। ব্রতধারী চিরকুমারের স্মৃতিশক্তি বড় আশ্চর্য জিনিস। তার স্পষ্ট মনে আছে কবে প্রথম মেয়েটার পোষাক, নিঃশ্বাস আর আঙুলের আলতো ছোঁয়া তাকে স্পর্শ করেছিল। মনে আছে একদিন গভীর রাতে সে যখন জামাকাপড় ছেড়ে ঘুমের তোড়জোড় করছে, এমন সময় মেয়েটা তার দরজায় এসে ভয়ে ভয়ে টোকা দিয়েছিল। দমকা হাওয়ায় নিজের নিভে যাওয়া মোমবাতি নিয়ে এ ঘরে এসেছিল তার কাছে একটু আগুন চাইতে। মেয়েটা তখন ¯œান সেরে ফিরছিল। ফুলতোলা ফ্লানেলের একটা ঢিলেঢালা, খোলামেলা ¯œানের পোষাক তার পরণে। পশমী চটির আড়াল থেকে তার ধবধবে পায়ের পাতা যেন জ্বলজ্বল করছে। সুরভিত উষ্ণ ত্বকে রক্তিম আভা। সাবধানে মোমবাতিটা জ্বেলে নেয়ার সময় মেয়েটার হাত থেকে হালকা সুগন্ধ ভেসে আসছিল।
মি. ডোরানের বাড়ি ফিরতে বেশি রাত হলে মেয়েটাই তার খাবার-দাবার গরম করে দিত। গভীর রাতে যখন বাড়ির কোথাও কেউ জেগে নেই, তখন নির্জনে তার পাশে বসে খাওয়ার দিকে একদম মন দিতে পারত না। আর মেয়েটার সে কি আন্তরিকতা! রাতে ঝড়, বৃষ্টি বা ঠা-া পড়লে তার জন্য এক গ্লাস পানীয় অবশ্যই তৈরি রাখত। হয়ত একসাথে থাকলে তারা সুখীই হবে…
পা টিপে টিপে তারা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যেত। দু’জনের হাতে দু’টো মোমবাতি। সিঁড়ির মোড়ে পৌঁছে নিতান্ত অনিচ্ছাসত্বেও একে অপরকে বিদায় জানাত, চুমু খেত। তার পরিষ্কার মনে আছে মেয়েটার চাহনি, হাতের স্পর্শ আর নিজের উত্তেজনার কথা…
কিন্তু সেই উত্তেজনা একসময় কেটে যায়। মেয়েটার বলা কথা এখন নিজেকেই বলে ওঠে মি. ডোরান, “এখন আমার কী গতি হবে?” তার চিরকুমার সত্বা তাকে বলছে নিজেকে সামলে নিতে। কিন্তু এ যে পাপ। তার মর্যাদাবোধ তাকে বলছে যে এমন পাপের প্রায়শ্চিত্ত না করলেই নয়।

মেয়েটাকে নিয়ে সে যখন খাটের এক পাশে বসে, মেরি তখন দরজায় এসে জানায় যে বিবিসাহেব বসার ঘরে সেলাম জানিয়েছে। মি. ডোরান উঠে দাঁড়িয়ে কোট আর ওয়েস্ট কোট গায়ে চাপায়। এতটা অসহায় তার আগে কখনও লাগেনি। জামাকাপড় পরা হয়ে গেলে সে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যায় সান্ত¦না দিতে। সব ঠিক হয়ে যাবে, ভয় কী? মি. ডোরান ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার সময়ও সে খাটে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকে, “হে ঈশ্বর!”

সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় চশমার কাঁচ এতটাই ঘোলা হয় যে চশমা খুলে কাঁচ মুছে নিতে হয় তাকে। তার ইচ্ছে করে ছাদ ফুঁড়ে দূরে কোথাও উড়ে যায়। এমন কোন দেশে উড়ে যেতে মন চায় যেখানে গেলে আর কোন ঝামেলা থাকবে না। তবু কী এক শক্তি যেন তাকে ধাপে ধাপে নিচের দিকে নামিয়ে নিয়ে যেতে থাকে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার মালিক আর বাড়িওয়ালির হৃদয়হীন চেহারা। তারা যেন একদৃষ্টে তার এই নাকাল দশা দেখছে। সিঁড়ির একেবারে শেষ ধাপে এসে জ্যাক মুনির সাথে দেখা হয়। ছোকড়া ভাঁড়ারঘর থেকে দু’ বোতল চোলাই মদ বগলদাবা করে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। কোন রকমে আদাব জানায় একে অপরকে। প্রেমিকের চোখজোড়া কয়েক পলক দেখে নেয় এই গাট্টাগোট্টা মুশকো জোয়ানটাকে। সিঁড়ির গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে মি. ডোরান একবার পেছনে ফিরে তাকায়। দেখতে পায় সিঁড়ির ঘরের দরজা থেকে জ্যাক একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ মি. ডোরানের মনে পড়ে যায় এক সন্ধ্যার কথা। ছেলেটা একটা গানের দলের শিল্পী। বাড়ি লন্ডনে। ছোটখাট গড়ন, সোনালী চুল। পলিকে কী যেন একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছিল সেদিন। তারপর জ্যাকের হিং¯্র আচরণে সেদিনের জলসা প্রায় পন্ড হতে বসেছিল। উপস্থিত সবাই মিলে আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল জ্যাককে শান্ত করতে। ফ্যাকাশে চেহারার সেই শিল্পীর মুখটা তখন আরো ফ্যাকাশে দেখাচ্ছিল। শুকনো মুখে কোন রকমে হাসি টেনে বারবার বোঝাতে থাকে যে কোন খারাপ উদ্দেশ্যে কিছুই বলেনি সে। কিন্তু জ্যাক চিৎকার করে বলতে থাকে যদি কোন ব্যাটা তার বোনের দিকে নজর দেয় তবে সেই শালার ঠ্যাং ভেঙে একেবারে হাতে ধরিয়ে দেবে, ব্যাস।
পলি কাঁদতে কাঁদতে আরো কিছুক্ষণ বসে থাকে খাটের একপাশে। এরপর চোখ মুছে আয়নার দিকে এগিয়ে যায়। জগের ঠান্ডা পানিতে তোয়ালের কোণ ভিজিয়ে চোখ দু’টোকে সতেজ করে নেয়। আয়নায় নিজেকে একবার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কানের পাশে চুলের কাঁটা ঠিকঠাক করে নেয়। তারপর আবারো বিছানার পায়ের কাছে গিয়ে বসে পড়ে। অনেকক্ষণ ধরে বালিশগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। বালিশগুলো দেখে তার মনের গহীণে কিছু মধুর স্মৃতি ভেসে ওঠে। খাটের লোহার রেলিঙে ঘাড় ঠেকিয়ে দিবাস্বপ্নে বিভোর হয় সে। তার চোখে-মুখে অস্থিরতার লেশমাত্র থাকে না।
ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে থাকে পলি। মনে খুশির রেশ। চেহারায় ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই। ধীরে ধীরে তার মনের পুরোনো স্মৃতিগুলো সরে গিয়ে নতুন স্বপ্নের জন্য জায়গা করে দিতে থাকে। স্বপ্নের মায়াজাল বুনতে বুনতে চোখের সামনে থাকা সাদা বালিশগুলো আর দেখতে পায় না সে। সে যে কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে, সেকথাও আর মনে থাকে না তার।
অবশেষে মায়ের ডাক শুনতে পায় পলি। চট করে উঠে সিঁড়ির দিকে ছুটে যায় সে।
“পলি! পলি!”
“ডাকছ, মা?”
“একটু নিচে নেমে আয় তো, মা। মি. ডোরান তোকে কিছু বলতে চান।”
তখনই তার মনে পড়ে যায় সে আসলে কিসের অপেক্ষায় ছিল।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Afsan Chowdhury — এপ্রিল ১৯, ২০১৮ @ ৯:০৭ অপরাহ্ন

      Well done and certainly a brave attempt. “Dubliners’ remains one of the finest collection of English literary gatherings. Sean O’Casey had called the story “The Dead” from that the best short story written in English. Should try your hand at that. Thanks and cheers

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Mohammad Mamun Hussain — এপ্রিল ১৯, ২০১৮ @ ৯:৪৪ অপরাহ্ন

      Excellent work. Best of luck.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Noor-E_Fatima Mosharraf Jahan — এপ্রিল ২০, ২০১৮ @ ৬:২৩ অপরাহ্ন

      @ Afsan Chowdhury
      Thank you for your words of appreciation. I have tried my best to do justice to the complexities of James Joyce’s work. I have already started working on “The Dead”. Hope it turns out well.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Khaliquxzaman Elias — এপ্রিল ২৩, ২০১৮ @ ৭:৩৫ অপরাহ্ন

      Quite good, Fatima. Keep up your good work and make us proud of you.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Noor-E-Fatima Mosharraf Jahan — এপ্রিল ২৪, ২০১৮ @ ২:০১ পূর্বাহ্ন

      @KhaliquzzamanElias
      Thank you so much for your compliment. Works of great translators like you inspire me to explore and learn the art of re-creating literary arts.

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Saira S Kamal Tiba — এপ্রিল ২৪, ২০১৮ @ ৬:১৪ অপরাহ্ন

      Really very good. I enjoyed it so much…May ALLAH bless you

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Noor-E-Fatima Mosharraf Jahan — এপ্রিল ২৫, ২০১৮ @ ১:৫৫ পূর্বাহ্ন

      @Saira S Kamal Tiba
      Thank you so much for your kind compliment.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com