চৈত্র সংক্রান্তির লোকনৃত্য

হিরণ্ময় হিমাংশু | ১৪ এপ্রিল ২০১৮ ১:২৮ অপরাহ্ন

চিরায়ত বাংলার জল, মাটি, আবহাওয়া ও মানুষের জীবিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এখানকার লোকসংস্কৃতি। লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন অনুসঙ্গের মধ্যে লোকনৃত্য অন্যতম। ‘কোন ব্যাকরণিক মুদ্রা ছাড়াই লোক মানুষের অংশগ্রহণে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নাকে কেন্দ্র করে সমাজে যে নৃত্য পরিবেশিত হয় তাই লোকনৃত্য। লোকসংস্কৃতির বেশি মাত্রায় শৈল্পিক বোধ ও অভিব্যক্তিময় অংশের প্রকাশ ঘটে লোকনৃত্যের মাধ্যমে।’ সময়ের সঙ্গে লোকনৃত্যের আঙ্গিক পরিমার্জিত হয়ে সমাজ জীবনে তা কখনো উৎসব আবার কখনো ধর্মাচরণের অঙ্গ হয়ে উঠেছে। চৈত্র সংক্রান্তি তথা বর্ষবরণ উৎসবের মধ্যদিয়ে লোকনৃত্যের বিভিন্ন ধারার স্বতস্ফুর্ত প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। এলাকা ভেদে ঐতিহ্যবাহী লোকজ ধারায় বর্ষবরণের মাধ্যমে ফুটে উঠে বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক রুচি বোধের। ভৌগলিক অবস্থান ভেদে বর্ষ বিদায়-বরণের সন্ধিকাল চৈত্র সংক্রান্তিতে যেমন বৈচিত্র্যময় লোকজ ধারার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, তেমনি ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিহিত করে। উত্তরাঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তিকে বলে বিষুয়া, চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিউ বা বিহু, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে সংগ্রাইন বা মাস পইলা পূজা, ময়মনসিংহ অঞ্চলে সাক্রাইন বা হাক্রাইন, ফরিদপুরে চত্তির পূজা আর খুলনায় দেউল বা দেল। বিভিন্ন অঞ্চলে বর্ষবরণ উৎসবের অনুসঙ্গ হিসেবে যে সকল লোকনৃত্য আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো উত্তরাঞ্চলের গোমিরা নাচ, খুলনা, যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ দেল বা দেউলের নাচ, গাজন নাচ ও অষ্টক নাচ, বরগুনায় নীলের নাচ, পুরান ঢাকায় শিব-গৌরীর নাচ উল্লেখযোগ্য। লোকনৃত্যগুলোকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে লোকগান বা পাঁচালী, মন্ত্র, বাজনা ও অভিনয় সহকারে দলবদ্ধভাবে পরিবেশিত হয়। কোন লোকনৃত্য আবার শুধু বাজনা বা হাত তালির মধ্যদিয়েও পরিবেশিত হয়।

উত্তরাঞ্চলের ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নিলফামারী ও দিনাজপুরের বিষুয়ায় যেমন লোকসংস্কৃতির একাধিক অনুসঙ্গের সমাবেশ ঘটে, তেমনি মিথস্ক্রীয়া ঘটে একাধীক লোকাচারের। আর এর মধ্যদিয়েই এখানকার লোকজসংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়। একাধিক অনুসঙ্গের মধ্যে অন্যতম হল লোকনৃত্য ‘গোমিরা নাচ’।

বাংলার লোকসংস্কৃতিতে গোমিরা নাচ উত্তর জনপদের একটি অসাম্প্রদায়িক লোকনৃত্য, অন্য এলাকার লোকনৃত্যের সঙ্গে সামান্য কিছু মিল থাকলেও গোমিরা নাচের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বর্ষ বিদায়-বরণের উৎসব চৈত্র সংক্রান্তি, শিব-কালী পূজা থেকে, বারলিয়া, বুড়ী বা বুড়ীচণ্ডী, শীতলাদেবী, রক্ষাকালী বিভিন্ন লোক দেব-দেবীর পূজায় এবং দেবতার কাছে মানত [বর প্রার্থনা] উপলক্ষে গোমিরা নাচে পরিবেশিত হয়। এলাকাভিত্তিক লোকমানুষের অংশগ্রহণে একটি দলের মাধ্যমে পরিবেশিত হয় গোমিরা নাচ। বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় ঢাক, ঢোল, কাঁশি, সানাই আর শঙ (শঙ্খ)। এই নাচে বিশেষভাবে কাঠের তৈরি মুখা (মুখোশ) ব্যবহার করা হয় বলে এর আরেকটি নাম মুখা নাচ। আবার পৌরাণিক দেবী চামুণ্ডা কালীর বিশেষ প্রভাবের জন্য চামুণ্ডা নাচও বলে থাকে। নাচে অংশগ্রহণকারী চরিত্রগুলো হলো শিব, কালী, দশানণ রাবণ, হনুমান, বুড়ীকালী, চামুণ্ডাকালী। তবে পূজা ও এলাকাভেদে এসব চরিত্র কমবেশি হয়ে থাকে। পোশাক হিসেবে প্রায় সবার পরনে থাকে ঘাগর করে পরা লাল শাড়ি আর পায়ে ঘুঙুড়া। হনুমান ও বারামদের পরনে থাকে মার্কিন কাপড়ের শালুক রঙের ছোট প্যান্ট। মাথা পর্যন্ত শরীর থাকে অনাবৃত্ত, কপালে, হাতের পেশি আর বুকের মধ্যে তেল-সিদুঁর লাগানো থাকে। বারামের হাতে থাকে লোহার তৈরি বিশেষ ধরনের বড় হাতিয়ার। যিনি পুরো পূজা ও নাচের তত্ত্বাবধায়ক তিনি হলেন মাড়েয়া, আর যিনি নাচের সময় পুরোহিতের ভূমিকা পালন করেন. তিনি হলেন মাহান বা মাহাত। তন্ত্রে-মন্ত্রে যিনি বিশেষ পারদর্শী তিনি হলেন মাহাত। এলাকাভিত্তিক বাড়ি বাড়ি চাঁদা তুলে পূজা ও নাচের খরচ জোগাড় করা হয়। গোমিরা নাচের বিশেষ বৈশিষ্ঠ্য হলো নাচের উল্ল্যেখিত চরিত্রের সঙ্গে একটি পীরের চরিত্র থাকে। এই পীরের চরিত্রটি একজন মুসলমান করে থাকে। তার পোশাক হিসেবে লুঙ্গি মালকোচা করে পরা থাকে আর শরীরের উপরের অংশ থাকে উলঙ্গ। এসব অঞ্চলে ঠাকুরের থানের পাশাপাশি একটু দূরে একটি পীরের থানও দেখা যায়। এভাবেই গোমিরা নাচ ধমীর্য় পরিম-লের ঊর্ধ্বে ধর্ম-বর্ণ নিবিশেষে লোকমানুষের উৎসবে পরিণত হয়। তাই দেখা যায়, নাচে অংশগ্রহণকারী চরিত্রগুলোর কাছে হিন্দু-মুসলমান সব মানুষ তাদের মনের আশা-নিরাশা, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার কথা দেবতার কল্পনায় তাদের কাছে নিবেদন করেন। শুধু এইটুকুই আবেদন করে তারা নিশ্চিত হন না, সেই সঙ্গে খরা, বন্যা, ভূমিকম্প, ঝড়, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিপর্যয়; রাজনৈতিক, সামাজিক নানান অঘটন থেকে রক্ষা পেতেও মনে মনে তাদের কাছে মানত করেন। এই নৃত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো চরিত্রগুলো অধিকাংশ পৌরাণিক হলেও মাহাত কিন্তু ব্রাহ্মণ নয়। সমাজের যে কোনো অন্ত্যজ শ্রেণির মানুষ এমনকি কোনো অঞ্চলে মুসলমান সমাজের মানুষও মাহাত হতে পারেন। মাহাতের হাতের পাতিল (মাটির হাঁড়ি) মধ্যে থাকে ফুল, আতপ চাল, বেলপাতা, তুলসীপাতা, দুধ-জলের মিশ্রণ (মন্ত্রপূত জল/জলপড়া) মুখাগুলোর ওপর ছিনিয়ে দেন। জলপড়া পেয়ে মুখোশটি জাগ্রত হয়, অতঃএব সেটি ভক্তের মুখে পরিয়ে দেওয়া হয়।

গোমিরা নাচ প্রধানত দুইটি পর্বে অনুষ্ঠিত হয়। হাট খ্যাঁচা ও পাড়া খ্যাঁচা। গোমিরা নাচের প্রথম পর্ব হলো হাট খ্যাঁচা, যা মহড়া নাচ হিসেবে অনুষ্ঠিত হয়। অনেকে একে শাঞ্জেলা (মশাল) জ্বালানো বলে, যা পাড়া খ্যাঁচার সাত থেকে তিন দিন আগে শনিবার অথবা মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। হাট খ্যাঁচা পর্ব তিনটি অংশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মূল ঠাকুর থানের পার্শ্ববতী কোনো হাটের কাছাকাছি এই নাম্ভান অনুষ্ঠিত হয়। পুরো দলটি বাজনার তালে আপন বৈশিষ্ট্যানুযায়ী নাচতে নাচতে হাটের মধ্যে প্রবেশ করে। পুরো হাট নাচতে নাচতে ঘুরে বেড়ায় বলে এই পর্বটিকে হাট খ্যাঁচা বলে। হাট খ্যাঁচার পর দলটি মূল ঠাকুর থানে ফিরলে শুরু হয় পাটে দেওয়ার কাজ। দেবতাকে স্বর্গ থেকে মর্তে নাম্ভান দিয়ে হাট খ্যাঁচা হলে ক্লান্ত দেবতাকে বিশ্রাম দেওয়ার জন্য মূল থানে নিয়ে এসে পাটে দেওয়া। গোমিরা নাচের মূল পর্ব হলো পাড়া খ্যাঁচা, যা হাট খ্যাঁচার সাত বা তিন দিন পর অনুষ্ঠিত হয়। পাড়া খ্যাঁচা, হাট খ্যাঁচা পর্বের মতো তিনটি অংশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। হাট খ্যাঁচার নাম্ভান অনুষ্ঠিত হয় কোনো হাটের পাশাপাশি আর পাড়া খ্যাঁচার নাম্ভান অনুষ্ঠিত হয় মূল ঠাকুর থানে। ব্যতিক্রম হলো পাড়া খ্যাঁচা যা গোমিরা নাচের প্রধান আকর্ষণ। নাম্ভান মূল থানে শুরু হলে পুরো দল নাচতে নাচতে পাড়ার প্রতিটি বাড়ি ঘুরে ঘুরে নাচে। গোমিরা নাচে যেমন থাকে না ব্রাহ্মণের পৌরোহিত্য, তেমনি থাকে না কোনো ধমীয় গোঁড়ামি। এর পূজা পদ্ধতি, মন্ত্র কোনো শাস্ত্রীয় বিধি মোতাবেক নয় বরং আমরা দেখি লোকমানুষের জীবনের দৈনন্দিন গৃহস্থালি উপকরণ তেল. সিদুর, পান, সুপারি, দই দুধসহ বিভিন্ন রকমের ফল ও শস্য দিয়ে তার ভোগের নৈবেদ্য আর মন্ত্রের ভাষাও কৃষিজীবী মানুষের ব্যবহৃত মুখের ভাষা। নাচেরও থাকে না কোনো ব্যাকরণিক মুদ্রা। তাই গোমিরা নাচ ধমীয় পরিম-লের বাইরে এসে সর্বজনীন বিশুদ্ধ লোক-উৎসবে পরিণত হয়।

চৈত্র সংক্রান্তিতে দেশের উত্তরাঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায় পাতা নাচ, কালী কাচের নাচ ও পরী নাচ দেখা যায়। পাতা নাচ দেখা যায়। পাতা নাচকে স্থানভেদে বারাম বা ঘোড়া নাচও বলা হয়। পাতা নামায় বর বা মানত করলে তা পূরণ হয়- এই লোক বিশ্বাস থেকে পাতা নাচ অনুষ্ঠিত হয়। অধিকাংশ সময় শ্মশানে পাতা নাচ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শুধু নির্দিষ্ঠ সংখ্যক ভক্তই যেতে পারে। চৈত্র সংক্রান্তির শেষ রাতে একটি দল শ্মশানে গিয়ে চামুণ্ডার নৃত্যসহ নানা ধরনের পাতা নাচ পরিবেশন করে। নাচে বিভিন্ন পৌরাণিক চরিত্রের মধ্যে কালি, চামুণ্ডা, হনুমান, প্রেত, দুর্গা প্রভৃতির মুখোশ ব্যবহৃত হয়। পাতা নৃত্যে ভক্তরা প্রেতিনী বা ডাকিনীর রূপসজ্জা গ্রহণ করে। পরনে থাকে রঙ্গীন বস্ত্র, নানাবিধ গহনা, ফুলের মালা। ঢাকের বাদ্যর তালে তালে পাতা নাচ চলতে থাকে।

চৈত্র সংক্রান্তির শেষ রাতে পরী নাচ পরিবেশিত হয়ে থাকে। একজন ভক্ত মুখোশ আর শাড়ি পরে আগুনের থালা হাতে নাচতে থাকে। ঢাকের বাজনার তালে তালে পরী সাজের ভক্ত লাফিয়ে নাচতে থাকে এবং কয়েকজন ভক্ত তাকে ঘিরে পাহারা দেন। বাজনার তালে ক্রমাগত পরী নাচের উন্মাদনা বাড়তে থাকেন। এক সময় জ্ঞান হারিয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাটিতে পড়তে যায়।

কালী কাচের নাচে অন্ধকার থেকে কালির মুখোশ পরা দুটি জীবন্ত কালিরূপী অভিনেতার আবির্ভাব ঘটে মন্দিরে। কালি সাজে ভক্তদের পরনে থাকে শাড়ি। তাদের এক হাতে লোহার তরবারি অন্য হাতে মাটির বড় ঢাকনী পাত্র। বাজনার তালের সাথে তাদের যুদ্ধ চলতে থাকে। যুদ্ধের চারদিকে মশাল জ্বেলে পাহারা বসায় ভক্তরা। এই যুদ্ধের কালীরূপী দুইজন ভক্তই এক সময় কাঁপতে কাঁপতে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পরে যায়।

দক্ষিণাঞ্চল তথা খুলনা, যশোর, মাগুরা, নড়াইল, ঝিনাইদহ, ফরিদপুরে দেল বা দেউলের নাচ, গাজন নাচ, খেজুরভাঙ্গা নাচ ও অষ্টক নাচ দেখা যায়।

খুলনা, ফরিরদপুরে চৈত্র সংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে দেল বা দেউলপূজা হয়। ‘দেল’ হলো মহাদেবের অর্ধশায়িত ভঙ্গির মূর্তি। যোগীরা শিবপূজায় শিবের পাঁচালি পাঠ করে। পাঁচালি পাঠ করা হতো গানের মতো সুরে সুরে। পাঁচালি গায়কদের পায়ে নূপুর থাকত, নূপুর পায়ে তারা নেচে নেচে শিবের গান করত। পাঁচালি গায়কদের বলা হতো ‘বালা’ এবং সে গানকে বলা হতো ‘বালাকি গান’।

চৈত্র সংক্রান্তিতে নড়াইল, যশোর ও খুলনার কোনো কোনো এলাকায় শিবের গাজন প্রচলিত আছে। গাজন হলো, গা অর্থ গ্রাম আর জন অর্থ মানুষ। গাজন অর্থ গ্রামের মানুষের উৎসব। সন্ন্যাসীরা চৈত্র মাস ধরে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গাজনের দল নিয়ে গাজন নাচ পরিবেশন করে। এসময় শিব পূজা বা চড়ক উপলক্ষে চতুর্থাশ্রম বা সন্ন্যাসীরা ঢাক ও কাঁসর বাজিয়ে তা-ব নৃত্যসহ সম্মিলিত কণ্ঠে শিবের গাজন পরিবেশন করে। গাজনের দলের একজনকে জটাধারী শিব আবার কোন কোন দলে গৌরী বা পার্বতীও সাজিয়ে নিয়ে বেড়ায়। দলের অন্যদেরও থাকে বিচিত্র ঢঙের সাজ এবং বহুরূপী নাচও পরিবেশন করে। লোকনাট্যের আঙ্গিকে সে গান চৈত্রের দিনগুলোতে লোকমানুষের মাঝে বিনোদনের খরাক মিটায়।

বৃহত্তর খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চলে জনপ্রিয় অষ্টক গানের সাথে নাচও হয়। নীলের গাজন উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী বিভিন্ন ধরনের গান গাওয়া হয়। সে গানেরই একটি শাখা হলো অষ্টক গান। শিবকে নিয়ে যেমন গাজন গান আর অষ্টক গানে শিবের সাথে রাধাকৃষ্ণের লীলাও থাকে। দশ থেকে বার জনের একটি দল ঢোল, মৃদঙ্গ, হারমোনিয়াম, মন্দিরা বাজিয়ে অষ্টক গান পরিবেশন করে। গানের সাথে সাথে দুটি দলে ভাগ হয়ে তারা নাচ পরিবেশন করে।

চড়কের অবিচ্ছেদ্য অংশ দেল পূজা, অষ্টক, নীল পূজা বা শিবের গাজন হলেও স্থানভেদে এগুলোর লোকাচার আর নাচের রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ঠ্য।

বৃহত্তর খুলনার উল্লেখযোগ্য লোকাচার হলো খেজুরভাঙা। এসময় খেজুরভাঙ্গার নাচ পরিবেশিত হয়। চার জন যুবকের একটি দল খালি পায়ে একটি খেজুর গাছের চূড়ায় ওঠে। যুবকরা যখন দলবেঁধে খেজুর ভাঙার উদ্দেশ্যে গাছের মাথায় উঠার চেষ্টা শুরু করেন তখন গাছটির তলায় একটি দল নাচ গান করতে থাকে। যুবকরা মন্ত্র জপ করতে করতে দু’পায়ে দুমড়ে মুষড়ে একাকার করে দেয় খেজুর গাছের সব পাতা। এসময় কেউ কোন শব্দ উচ্চারণ করে না। এই গাছের খেজুরকে পুণ্যের প্রতীক মনে করা হয়। মাঠের মধ্যে কাদামাটি দিয়ে কুমির ও হনুমানের মূর্তি বানিয়ে সেসব খেজু গেঁথে দেওয়া হয় তার শরিরে।

বরগুনা, পিরোজপুরসহ বরিশাল অঞ্চলে নীল পূজা বা নীলের গাজন দেখা যায়। শিব আরেক নাম হলো নীলকণ্ঠ। নীলকণ্ঠের পূজা হলো নীল পূজা বা নীলোৎসব। কেউ কেউ বলেন নীলের গাজন। এসব উৎসব উপলক্ষে সংক্রান্তি বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই ভক্তরা দেল, চড়ক নিয়ে, শিব-গৌরী সেজে বাড়িতে বাড়িতে নেচে গেয়ে বেড়ায়।

চৈত্র সংক্রান্তির প্রধান উৎসব চড়ক পূজা। চড়ক গাজন উৎসবের একটি প্রধান অঙ্গ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় চড়কপূজায় গ্রামের এক শিবের থান থেকে শোভাযাত্রা করে অন্য শিবের থানে যাওয়া হয়। একজন শিব ও একজন গৌরী সেজে নৃত্য করে এবং অন্য ভক্তরা নন্দি, ভৃঙ্গী, ভূত প্রেত, দৈত্যদানব প্রভৃতি সেজে শিব-গৌরীর সঙ্গে নেচে চলে। এই নাচকে চড়কের নাচ বা শিব-গৌরীর নাচ বলা হয়।

শিব-গৌরীর নাচ আরও দেখা যায় পুরান ঢাকার হিন্দুপ্রধান এলাকায়। চৈত্র সংক্রান্তির রাতে শিব-গৌরীর নাচ ও লোকাচার সহ পূজা-অর্চনা করা হয় এই এলাকার বাড়িতে বাড়িতে।

ঢাকা, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুমিল্লা, দিনাজপুরসহ দেশের অধিকাংশ এলাকায় চৈত্রসংক্রান্তিতে কালী নাচ দেখা যায়। কালীর মুখোশ বা রং কালিতে কালী সেজে দুহাতে দুটি তরবারি নিয়ে ঢাকের বাজনার তালে তালে বিচিত্র তা-ব রসের এই নাচ পরিবেশন করে। নাচের শেষ পর্যায়ে শিবের বুকে পা দিয়ে জিহ্বা বের করে। এই নাচের সাথে কালির সাথে ভূত, প্রেত, শিব, গৌরী চরিত্রও দেখা যায়।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তিতে বা তার পরেও বালি নাচ দেখা যায়। বালি খেলা বা কুস্তির লড়াইতে দুজন প্রতিযোগী বাজনার তালে তালে পায়তারা করে। এই পায়তারাটুকু অর্ধ চন্দ্রাকারে একে অপরের মুখোমুখো বিপরীত গতিতে তাদের বলিষ্ঠ পদক্ষেপ, তালুটুকা, হুঙ্কার, হাতের কসরত ও চোখের ক্রুব্ধ চাহনি প্রদর্শন করে। কুস্তির পূর্বে পায়তারার অংশটুকু প্রকৃতপক্ষে নাচের অংশ। চট্টগ্রাম অঞ্চলে এটাই বালি নাচ।

মানুষ বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসবের সন্ধিকাল চৈত্রসংক্রান্তি পালন করে আসছে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। বিগত বছরের গ্লানি মুছে দিয়ে, নতুন সম্ভাবনাময় বছরের প্রত্যাশায় পালন করে আসছে এসব লোকাচার। এসব লোকাচারের বিভিন্ন অনুসঙ্গের মত লোকনৃত্যগুলো দীর্ঘ পরিভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণের মধ্যদিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে পালিত হচ্ছে নাগরিক জীবনেও। লোকনৃত্যগুলো কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে উত্তরাঞ্চলের গোমিরা নাচ, চট্ট্রগ্রামের বালি নাচের মতই ধর্মীয় পরিম-লের বাইরে এসে সর্বজনীন বিশুদ্ধ লোক-উৎসবে পরিণত হয়।>/big>

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — এপ্রিল ১৫, ২০১৮ @ ১০:২২ অপরাহ্ন

      চৈত্র সংক্রান্তির লোকনৃত্যের উপর দারুন একটি পোষ্ট। এক কথায় অসাধারন!

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।