মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার

আহমাদ মোস্তফা কামাল | ৩১ জুলাই ২০০৮ ৩:০২ অপরাহ্ন

mahmudul-haq-5.jpg
মাহমুদুল হক। ছবি: ওয়াসে আনসারী

দিনক্ষণ ঠিক করে, মিনি রেকর্ডার আর কাগজ-কলম নিয়ে কেতাদুরস্ত ভঙ্গিতে যেসব সাক্ষাৎকার নেয়া হয়, এটি সে ধরনের কোনো সাক্ষাৎকার নয়। মাহমুদুল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে ২০০৪ সালের মার্চ মাসে। তার ২/৩ বছর আগেই তাঁর গল্প ও উপন্যাসের ওপর লেখা আমার দুটো প্রবন্ধ পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত আমার তৃতীয় গল্পগ্রন্থ অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না বলে আমি তাঁকে উৎসর্গ করি এই বলে “আমাদের সাহিত্যভুবন থেকে এই অসামান্য প্রতিভাবান মানুষটির স্বেচ্ছানির্বাসন আমাকে বিমর্ষ করে তোলে”। বইটি তাঁর কাছে নিজ হাতে তুলে দেবার জন্যই আমি প্রথম তাঁর জিগাতলার বাসায় যাই। তবে, এই যাওয়াটুকুও সম্ভব হতো না, যদি আমার অনুজপ্রতিম আরেফিন হাসানের নিরন্তর তাগাদা না থাকতো। এই তরুণটি গত প্রায় ১১ বছর ধরে একটানা মাহমুদুল হকের সঙ্গে কাটিয়েছেন। এই সুযোগে তার কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। যাহোক, প্রথম দেখা হওয়ার পর থেকেই আমাদের আড্ডা শুরু হয়। এই আড্ডা চলে বহুদিন পর্যন্ত। ঠিক দিন-তারিখের হিসাব রাখা সম্ভব হয়নি সঙ্গত কারণেই। সেইসব আড্ডার একটি সংক্ষিপ্ত লিখিত রূপ প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে, প্রথম আলো সাময়িকীতে। আরেকটি অংশ প্রকাশিত হয় ২০০৭ সালের ডিসেম্বরে ছোট কাগজ লোক-এ। এটি শেষোক্ত সাক্ষাৎকারের পুনর্মুদ্রণ। যেমনটি ছিলো তেমনটিই রাখা হলো, কোনো পরিবর্তন করা হলো না। — আ. মো. কা

●●●


“শিল্পীদের লোভ থাকতে নেই”

— মাহমুদুল হক

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: আহমাদ মোস্তফা কামাল

[মাহমুদুল হকের সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছে আমার দীর্ঘদিনের, কিন্তু কাজটি সহজ ছিলো না। দীর্ঘদিন ধরে তিনি এক রহস্যময় নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন। কিছু লেখেন না তো বটেই, এ সম্বন্ধে কোনো কথাবার্তাও বলেন না কারো সঙ্গে। সাক্ষাৎকার দেয়ার ব্যাপারে, পত্রপত্রিকার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে তার অনীহার কথা এখন সর্বজনবিদিত। এই নীরবতার দেয়াল ভেদ করে তাঁকে পাঠকের সামনে হাজির করতে হবে — এমন কোনো পরিকল্পনা থেকে অবশ্য সাক্ষাৎকার নেয়ার কথা ভাবি নি। তিনি আমাদের প্রধান লেখকদের একজন, তাঁর সঙ্গে কথা বলার একটা ইচ্ছে তো হতেই পারে, কিন্তু তারচেয়ে বড় ব্যাপার — তিনি এমন একজন লেখক, আমাদের লেখালেখির জগতে যাঁর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব। প্রধানত এই কারণেই কথা বলার আগ্রহ। এবং তিনি বলেনও প্রচুর — তবে শর্তসাপেক্ষে — এইসব কথাবার্তা ছাপা যাবে না। তাঁর সঙ্গে আমার বহুদিন কথা হয়েছে। জীবন ও জগতের বহু বহু প্রসঙ্গে তিনি অবিরাম কথা বলে গেছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার একটি মজার দিক হলো — তিনি শুধু মতামত দিয়েই ক্ষান্ত হন না, নানা বিষয়ে প্রশ্নকর্তার মতামত-ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও জানতে চান এবং প্রয়োজনে দীর্ঘসময় ধরে মনোযোগ দিয়ে সেই ব্যাখ্যা শোনেন। তাঁর কাছে গেলে ৫/৬ ঘণ্টার আগে উঠে আসা যাবে না — এমনই তাঁর গল্পের স্রোত। এককালের তুখোড় আড্ডাবাজ ‘বটু ভাই’ এখনও আড্ডার আমেজটি সমানতালে ধরে রাখতে পারেন — সেই আগের মতো — শুরু হলে শেষ হওয়ার নাম নেই। কতো বিষয় নিয়ে যে কথা হয় তার সঙ্গে! বিশেষ করে তিনি যখন তাঁর লেখক জীবনের স্মৃতিচারণ করেন, তখন যেন ৫০/৬০/৭০ দশকের ঢাকা শহর, এর সাহিত্যিক পরিমণ্ডল আর সাহিত্যের মানুষগুলো একেবারে জীবন্ত হয়ে ওঠে। এখানে যে লেখাটি পত্রস্থ হলো তাতে সেসব কথাবার্তা প্রায় নেই বলতে গেলে — সেগুলো লিখতে গেলে একটা বিরাট উপন্যাস হয়ে যাবে! এখানে কেবল তাঁর লেখালেখি এবং জীবন দর্শন সম্বন্ধে একটি সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হয়েছে। এর সব কথা একদিনে হয়নি, তাই কোনো তারিখ দেয়া হলো না।

জীবন আমার বোন, কালো বরফ, নিরাপদ তন্দ্রা, খেলাঘর, অনুর পাঠশালা, মাটির জাহাজ প্রভৃতি উপন্যাস আর ‘কালো মাফলার’, ‘প্রতিদিনি একটি রুমাল’, ‘হৈরব ও ভৈরব’ প্রভৃতি গল্পের অমর স্রষ্টা আমাদের বটু ভাই এখন বেশ খানিকটা বুড়িয়ে গেছেন বলে মনে হয়। শারীরিকভাবেও বেশ খানিকটা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। নিঃসঙ্গ একজন মানুষ — প্রায় সারাদিনরাত ঘরেই বসে থাকেন, কোথাও যান না, কারো সঙ্গে মেশেন না, একটি লাইনও লেখেননি বহু বছর। তবে কেউ তাঁর বাসায় গেলে আড্ডায় মেতে উঠতে পছন্দ করেন — যদি সুস্থ থাকেন। এখন তাঁর সময় কাটে বই পড়ে বা ব্যালকনিতে বসে রাস্তায় মানুষের স্রোত দেখতে দেখতে। আসুন প্রিয় পাঠক, তাঁর সঙ্গে আড্ডা শুরু করা যাক।]

আহমাদ মোস্তফা কামাল: আপনার লেখালেখির শুরু হলো কীভাবে?

মাহমুদুল হক: সেটা বলা বেশ মুশকিল। ছোটবেলায় দু-চারটে গল্প লিখলেও আমি ঠিক কখন থেকে পরিকল্পনামাফিক লিখতে শুরু করেছিলাম সেটা আর মনে পড়ে না। আমার মধ্যে সম্ভবত লেখক হওয়ার একটা আকাক্সক্ষা ছিল — কীভাবে যে সেটার জন্ম হয়েছিলো তা বলতে পারবো না। মনে পড়ে, ছোটবেলায় বাবার তাগিদে ঈদের জামাতে নামাজ পড়তে গেলে আমি নিয়মিতভাবে একটা প্রার্থনাই করতাম — হে আল্লাহ, আমাকে তুমি শরৎচন্দ্রের মতো লেখক বানিয়ে দাও। মানুষ তো আল্লাহর কাছে কত কিছুই চায়, কত কিছুই তো চাওয়ার আছে, আমি কেন যে লেখক হতে চাইতাম সেটা নিজেই ব্যাখ্যা করতে পারি না, আমি এমনিতে যে খুব আল্লাহভক্ত ছিলাম তা নয়, কিন্তু লেখক হওয়ার জন্য যখন প্রার্থনা করতাম তখন খুব মন-প্রাণ দিয়েই করতাম।

কামাল: কিন্তু আর সবাইকে বাদ দিয়ে শরৎচন্দ্রের মতো লেখক হতে চাওয়ার কারণ কী ছিল?

মাহমুদুল হক: কারণ তো বলা কঠিন, বোঝোই তো ওই বয়সের চাওয়া-পাওয়া, মন-মানসিকতা এই বয়সে এসে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে একটা কারণ হয়তো এই যে, ওই সময় শুধুমাত্র শরৎচন্দ্রকেই প্রায় পুরোটা পড়ে ফেলতে পেরেছিলাম, লেখক শব্দটার সঙ্গে যেন তাঁর একটা ওতপ্রোত যোগসূত্র ছিলো।

কামাল: সে যা হোক, কথা বলছিলেন লেখক হয়ে ওঠা নিয়ে…

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ। আমি যখন ক্লাশ এইটে পড়ি তখন পশ্চিম বাংলা থেকে ঢাকায় চলে আসি। বাবা অবশ্য তার ৩/৪ বছর আগেই এসেছিলেন। তিনি সরকারী চাকরি করতেন, ভারত ভাগের সময় সরকারী কর্মচারিদের অপশন দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো, অর্থাৎ কে কোন দেশে থাকতে চায় সেটা সে নিজেই অপশন দিয়ে ঠিক করে নিতে পারতো। তো তিনি অপশন দিয়ে পাকিস্তান চলে এসেছিলেন। আমরা থাকতাম আজিমপুর কলোনিতে। আমাদের পাশের বাসায়ই থাকতেন কবি মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ। তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর আমি বলতে গেলে তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠি। তাঁর প্রতিটি কাজ আমি খুব মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য করতাম, তাঁর কথা শুনতে ভালো লাগতো, তাঁর সঙ্গে ঘুরতে ভালো লাগতো, কবিতা লিখতেন তো…

কামাল: তিনি কবিতা লিখতেন, এই ব্যাপারটিই কি আপনাকে তার ব্যাপারে এমন আগ্রহী করে তুলেছিলো?

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, তাই। তো, তিনি একবার বললেন, তোমাদের স্কুলে শহীদ সাবের নামে একজন শিক্ষক এসেছেন, খবরদার উনার ধারে কাছে যাবে না। কেন? উনি কমিউনিস্ট! কমিউনিস্ট ব্যাপারটি ঠিক কী, তখন তা না বুঝলেও উনার হাবভাবে মনে হচ্ছিলো ওটা একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার এবং নিষিদ্ধ, অতএব পরিত্যাজ্য। কিন্তু বোঝোই তো, নিষিদ্ধ সবকিছুর প্রতি মানুষের একটা দুর্মর আকর্ষণ থাকে। শহীদ সাবেরের প্রতি আমার তেমন একটা আকর্ষণ জন্মালো। কিন্তু হলে কী হবে, তার সঙ্গে পরিচয় আর হয়ে ওঠে না। একে তো তিনি শিক্ষক, চাইলেই তো একজন ছাত্র একজন শিক্ষকের সঙ্গে যেচে গিয়ে আলাপ করতে পারে না। তিনি আমাদের ক্লাসও নিতেন না, যে, ক্লাসে একটু মনোযোগ আকর্ষণ করার সুযোগ পাবো। তো, একদিন তিনি ক্লাসে এলেন, নির্ধারিত শিক্ষক অনুপস্থিত ছিলেন বলে তিনি সেই ক্লাসটি নিতে এসেছিলেন এবং এসে বললেন আমি তো তোমাদের নিয়মিত ক্লাস নেব না, চলো আজকে ভিন্ন ধরনের কিছু করা যাক। কী করা যায়? তিনি বললেন, দেখা যাক কে কেমন রিডিং পড়তে পারো। তো, ওই পড়তে গিয়েই আমি তাঁর চোখে পড়ে গেলাম। ক্লাসের পরে তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে বললেন। আমি গেলাম। তিনি অনেক কথাই জিজ্ঞেস করলেন, দেয়াল পত্রিকা বের করার কথা বললেন ইত্যাদি। অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে আমার একটা যোগাযোগ স্থাপিত হলো। তিনিও আমাদের পাশের বাসায় থাকতেন — একপাশে মাহফুজ উল্লাহ, অন্য পাশে শহীদ সাবের। তো আমরা থাকতাম তিন তলায়, তিনি থাকতেন পাশের বাসার দোতলায়, এবং আমাদের বাসার জানালায় দাঁড়ালে তাঁর বাসার প্রায় পুরোটাই দেখা যেত। আমি এবার মাহফুজউল্লাহকে বাদ দিয়ে সাবেরকে নিয়ে পড়লাম। সব সময়ই তাঁকে লক্ষ্য করি, তাঁর সঙ্গেই মেলামেশা করি, আর মাহফুজউল্লাহকে এড়িয়ে চলি। তো একসময় সাবের আমাকে তাঁর লেখাগুলো কপি করে দিতে বললেন। তিনি জেলে থাকতে ওখানে বসেই অসাধারণ কিছু অনুবাদ করেছিলেন, কিন্তু যেসব কাগজে সেগুলো লেখা ছিলো তার কোনো আগামাথা ছিলো না। কোনোটা চিরকূটের মতো, কোনোটা চারকোনা ছোট কাগজ, সিগারেটের প্যাকেটের উল্টোপিঠে। মানে বুঝেছ তো, কোনো ঠিকঠিকানা নেই। আবার কাগজগুলোর কোনো সিরিয়াল নম্বর বা পৃষ্ঠা নম্বরও দেয়া ছিলো না। পৃষ্ঠাই নেই তার আবার নম্বর কী, হাঃ হাঃ হাঃ, ফলে একটি অংশের সঙ্গে আরেকটি অংশ মেলাতে গিয়ে আমাকে পুরোটাই পড়তে হতো। কাজটা রীতিমতো আমার নেশায় পরিণত হয়েছিলো। তো এইভাবে তাঁর লেখা কপি করতে করতে তাঁর সিনট্যাক্সটা আমার হাতে চলে এলো।

কামাল: কিন্তু তিনি আপনাকে এরকম আকৃষ্ট করেছিলেন কেন? মাহফুজউল্লাহ না হয় কবিতা লিখতেন…

মাহমুদুল হক: তাঁর ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। তাঁর ছিলো প্রখর ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, এবং সহজাত প্রতিভা। তাঁর মতো প্রতিভাবান এবং ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ আমি খুব কমই দেখেছি। শুধু আমিই নই, আমাদের সময়ের প্রায় সবাই তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ ছিলাম। আহসান হাবিব তো তাঁর ছেলের নামই রাখলেন শহীদ সাবেরের প্রতি মুগ্ধতা থেকে!

কামাল: যাই হোক, তাঁর গদ্য কি আপনার ওপর কোনো প্রভাব ফেলেছে?

মাহমুদুল হক: না, তাঁর গদ্য খুব অদ্ভুত আর অন্যরকম।

কামাল: আপনার গদ্যও তো অদ্ভুত আর অন্যরকম।

মাহমুদুল হক: না, আমার গদ্য তাঁর গদ্যের মতো নয়। তাঁর গদ্য খুবই নির্মেদ, নির্ভার। আমার গদ্য বেশ খানিকটা কাব্যাক্রান্ত। তোমার কী মনে হয়?

কামাল: কোন অর্থে কাব্যাক্রান্ত বলছেন?

মাহমুদুল হক: কোন অর্থে মানে?

কামাল: এই দেশে তো কাব্যাক্রান্ত গদ্যকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হয়…

মাহমুদুল হক: নেতিবাচক না ইতিবাচক সেটা আমি জানতে চাচ্ছি না, আমি তোমার মতামত জানতে চাচ্ছিলাম।

কামাল: আমি আপনার গদ্যকে ঠিক কাব্যাক্রান্ত বলবো না, আমি বলবো, আপনার গদ্য কবিতা পাঠের আনন্দ দেয়। কিন্তু এর কারণ কী?

মাহমুদুল হক: সম্ভবত কবিতার প্রতি প্রেমই এর কারণ, আমি খুব বেশি কবিতা পড়তাম।

কামাল: আচ্ছা। শহীদ সাবেরের কথা বলছিলেন…

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, তাঁর গদ্যের প্রভাব আমার ওপর পড়ে নি, তবে আমাকে বেশ বিপদে ফেলে দিয়েছিলো। স্কুল পড়ুয়া একজন কিশোরের কাছে যদি আদর্শ হন শহীদ সাবেরের মতো একজন অত্যন্ত শক্তিশালী গদ্যশিল্পী, এবং সে যদি তাঁর মতো গদ্য লিখতে চায় তাহলে কী বিপত্তি ঘটে বোঝো না! তার তো আর কখনো লেখকই হতে পারার কথা নয়। আমার ক্ষেত্রেও সেই সংকটটি হয়েছিলো।

তাঁর [শহীদ সাবেরের] গদ্যের প্রভাব আমার ওপর পড়ে নি, তবে আমাকে বেশ বিপদে ফেলে দিয়েছিলো। স্কুল পড়ুয়া একজন কিশোরের কাছে যদি আদর্শ হন শহীদ সাবেরের মতো একজন অত্যন্ত শক্তিশালী গদ্যশিল্পী, এবং সে যদি তাঁর মতো গদ্য লিখতে চায় তাহলে কী বিপত্তি ঘটে বোঝো না! তার তো আর কখনো লেখকই হতে পারার কথা নয়। আমার ক্ষেত্রেও সেই সংকটটি হয়েছিলো।

কামাল: সংকটটা কাটালেন কীভাবে?

মাহমুদুল হক: ভিন্ন ধরনের একটি গদ্য তৈরির জেদ জন্ম নিয়েছিলো আমার ভেতরে। আমি অন্তত তাঁর মতো করে লিখবো না, এই-ই ছিলো আমার জেদ। হয়তো আমার গদ্যে কবিতার প্রভাবও এই কারণেই পড়ে থাকতে পারে। যেহেতু তিনি নির্ভার, নির্মেদ গদ্য লিখতেন তাই আমি ওই ভাষাটি বেছে নিয়েছিলাম।

কামাল: কিন্তু প্রথম জীবনে সব লেখকের ওপরই তো কোনো না কোনো লেখকের প্রভাব পড়ে, আপনার ওপরে কি কারো প্রভাব পড়ে নি?

মাহমুদুল হক: আমার তো মনে হয় না। অবশ্য মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় আর মনোজ বসু আমার আদর্শ লেখক ছিলেন, কিন্তু তাঁদের প্রভাব কি আমার লেখায় পড়েছে বলে তোমার মনে হয়?

কামাল: না, তা মনে হয় না। বরং মনে হয় উল্টোটাই। আপনার গদ্য — বিশেষ করে জীবন আমার বোন-এর গদ্য সমগ্র বাংলা সাহিত্যের গদ্য থেকে টোটালি ডিফারেন্ট। এই ভাষা আপনি পেলেন কোথায়?

মাহমুদুল হক: আমার বর্ণনাভঙ্গির সঙ্গে সম্ভবত আমার মায়ের কথনভঙ্গির মিল আছে। আমার মা খুব সুন্দর করে কথা বলতেন, চমৎকার করে গল্প করতে পারতেন। আমি আমার অনেক বন্ধুকে মা’র কাছে নিয়ে যেতাম, তিনি ওদেরকে গল্প শুনিয়ে এমন মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলতেন যে, একবার গেলে কেউ সহজে ফিরতে চাইতো না। তাঁর গল্প বলার একটা নিজস্ব স্টাইল ছিলো। গল্পের তো একটা নিজস্ব কালক্রম থাকে। অর্থাৎ তুমি যদি একটি গল্পের কোনো একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে দাঁড়াও তাহলে দেখতে পাবে ওই বিন্দুর ঘটনাগুলো ঘটমান অর্থাৎ বর্তমানে ঘটছে, কিছু ঘটনা পেছনে ফেলে এসেছো অর্থাৎ সেগুলো অতীত, আর কিছু ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটবে। কথ্য-গল্পেরও কিন্তু এরকম কালক্রম থাকে। আমার মা সেই কালক্রমকে ভেঙে ফেলতেন। অর্থাৎ যেসব ঘটনা ভবিষ্যতে ঘটার কথা সেগুলো অবলীলায় অতীত কালের ফর্মে বলতেন, অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে স্থাপন করতেন ভবিষ্যতে। এইরকম আর কী! তাছাড়া তাঁর সিক্সথ সেন্স বা ইনটিউশন ছিলো প্রবল। বহু বিষয়ে তিনি যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেগুলো হুবহু মিলে গেছে। এটা বেশ রহস্যময় লাগে আমার কাছে। তো এসব বিষয় হয়তো আমার ওপর কোনো না কোনোভাবে প্রভাব ফেলেছে।

কামাল: কিন্তু আপনার বিভিন্ন উপন্যাসের ভাষাভঙ্গিতে বেশ খানিকটা পার্থক্য চোখে পড়ে। এর ব্যাখ্যা কী?

মাহমুদুল হক: আমি সবসময় নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চেয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি পরপর দুটো লেখার প্রকাশভঙ্গি বা ভাষা একইরকম হওয়া উচিত নয় বলেই মনে করি। আমি তাই প্রত্যেকটি লেখা ভিন্ন ভিন্ন গদ্যে লিখতে চেষ্টা করেছি। এই যে অনেকদিন ধরে আমি লিখছি না তার একটি কারণ হয়তো এই যে, শেষের দিকের লেখাগুলোতে আমি একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম — নতুন প্রকাশভঙ্গি বা ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

কামাল: শেষের দিকের লেখা মানে, কোনগুলোর কথা বলছেন?

মাহমুদুল হক: যেমন খেলাঘর বা মাটির জাহাজ

কামাল: আমি অবশ্য আপনার সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। ওগুলোর ভাষাও আগেরগুলোর চেয়ে আলাদা। যাই হোক, লেখা থামিয়ে দেয়ার নিশ্চয়ই এটাই একমাত্র কারণ নয়!

মাহমুদুল হক: না তা নয়, আরো অনেক কারণ আছে।

কামাল: কী কারণ?

মাহমুদুল হক: দ্যাখো, সাহিত্যের জগৎটিকে আমি যেভাবে আবিষ্কার করেছি সেটা আমার জন্য খুব একটা সুখকর অভিজ্ঞতা হয় নি। এ জগতের অধিকাংশ লোককে আমি যেভাবে চিনেছি সেটা আমার একেবারেই ভালো লাগে নি…

কামাল: কী রকম?

মাহমুদুল হক: সেসব বলা ঠিক হবে না। তবে এটা জেনে রেখো, আমি এই জগৎটির সঙ্গে এত গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলাম যে, বহু লেখকের হাঁড়ির খবর আমার জানা হয়ে গিয়েছিলো। মানুষ হিসেবে যে এঁরা কতটা অসৎ, ভণ্ড, বদমাশ হতে পারে তা আমি দেখেছি।

কামাল: তাই বলে আপনি লেখা থামিয়ে দেবেন? পৃথিবীর কোথায় অসৎ, ভণ্ড, বদমাশ মানুষ নেই? সেজন্য কি আপনি সিদ্ধান্ত নেবেন যে পৃথিবীতেই থাকবেন না?

মাহমুদুল হক: ব্যাপারটা সেরকম নয়। ভালো-মন্দ সব জায়গাতেই আছে, সাহিত্য জগতেও যে ভালো মানুষ পাই নি তা-তো নয়। কিন্তু তোমার কি মনে হয় না যে, একজন লেখক অসম্ভব স্পর্শকাতর মানুষ? লেখালেখি বিষয়টাই তো সাংঘাতিক স্পর্শকাতর — লেখক এবং লেখা উভয়েই সামান্য কারণে আহত হয়!

কামাল: হ্যাঁ, এটা আমারও মনে হয়। মনে হয়, একজন প্রেমিক যেমন তার প্রেমিকার কাছে সবচেয়ে কোমল, ইনোসেন্ট, স্পর্শকাতর আর সমর্পিত, একজন প্রকৃত লেখকও তাঁর লেখার সময় তাই। খুব সামান্য আঘাতেই তাঁর কোমল-সূক্ষ অনুভূতিগুলো আহত হয়।

মাহমুদুল হক: খুব ভালো বলেছ। এটা আসলে পৃথিবীতে যে কোনোভাবে টিকে থাকার মতো বিষয় নয়! লেখালেখি বিষয়টি একজন লেখকের কাছে সবচেয়ে কোমল আর সূক্ষ্ম অনুভূতি দাবি করে, সবচেয়ে গভীর মনোযোগ দাবি করে, আমার তো এ-ও মনে হয় যে, ধ্যান-মগ্নতা ছাড়া একজনের পক্ষে লেখকই হওয়া সম্ভব নয়। তো সতীর্থদের নোংরামি দেখে, ভণ্ডামি দেখে, বদমায়েশি দেখে কি একজন প্রকৃত লেখকের আহত হওয়ার কথা নয়?

কামাল: আপনার এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে আমার কোনো দ্বিমত নেই। তবু লেখালেখি থামিয়ে দেয়াটাকে আমি মেনে নিতে পারি না। একজন লেখকই তো ক্লেদের মধ্যে কুসুম ফোটাতে পারেন, সেটা তিনি করেনও। শুধু লেখকরাই নন, সব শিল্পীই তো সেই কাজটিই করেন, নইলে পৃথিবীটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তো অনেক আগেই।

মাহমুদুল হক: তোমার কথা শুনে ভালো লাগছে। আমি তো সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি, শিল্পীদের লোভ থাকতে নেই। লোভ থাকলে শিল্প হয় না, যেমন হয় না অসৎ মানুষদেরও। শিল্পীর সততা থাকাটা খুব জরুরী, আমি বলবো অপরিহার্য। যাই হোক, আমি শুধুমাত্র সাহিত্য জগতের ভণ্ডামি দেখে লেখালেখি থেকে দূরে সরে এসেছি, সেটা বলা ঠিক হবে না। এটা একটা কারণ ছিলো বটে, তবে আরও কারণ নিশ্চয়ই আছে। আগেই তো তোমাকে বলেছি, আমি শেষের দিকে এসে একঘেঁয়েমিতে ভুগছিলাম। আর তাছাড়া একটা সময় এসব কিছুকেই ভীষণ অর্থহীন মনে হচ্ছিলো আমার কাছে। কী করছি, কেন করছি, এসবের ফলাফল কী, আদৌ এসব করার কোনো অর্থ হয় কী না — এই সব আর কি! সব মিলিয়ে লেখালেখিটা আর ভালো লাগে নি। অবশ্য একবারে পরিকল্পনা করে, সিদ্ধান্ত নিয়ে লেখালেখি বন্ধ করেছিলাম তা নয়। এরকম তো সব লেখকেরই হয় যে, মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে, মাঝে মাঝে বন্ধ্যাত্বও দেখা দেয়। আমার সেটাই হয়েছিলো। কিন্তু সব লেখকই সেই সময়টি পেরিয়ে আবার লেখালেখিতে ফিরে আসেন। আমার আর ফিরে আসা সম্ভব হয় নি। আর এখন তো শারীরিক কারণেই অনেক কিছু করা সম্ভব হয় না। যে উদ্দাম জীবন আমি যাপন করেছি সেটা শুনলে তোমরা অবাক হয়ে যাবে, আর এখন তো দিনের পর দিন ঘরে বন্দি হয়ে থাকি, বেরুতেই পারি না…

কামাল: আপনার লেখালেখি নিয়ে আরও কিছু কথা বলা যাক, তারপর না হয় ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসবো।

মাহমুদুল হক: বলো।

কামাল: আপনার প্রথম উপন্যাস তো অনুর পাঠশালা?

মাহমুদুল হক: প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ওটা, প্রথম রচিত উপন্যাস কখনো আলোর মুখ দেখে নি।

কামাল: তাই নাকি? এটা জানতাম না তো! কী নাম ছিলো ওটার? আলোর মুখই বা দেখলো না কেন?

মাহমুদুল হক: নাম ছিলো দ্রৌপদীর আকাশে পাখি। কেন প্রকাশিত হলো না, সে অনেক লম্বা কাহিনী।

কামাল: সেটাই শোনা যাক।

মাহমুদুল হক: আমি তখন কলেজে পড়ি। রূপছায়া নামে একটা সিনেমা পত্রিকা বেরুলো। সম্পাদক মীজানুর রহমান। বেশ রুচিশীল পত্রিকা। সেখানে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম — প্রতি সংখ্যায় একটা করে উপন্যাস ছাপা হবে। বিজ্ঞাপনটি দেখেই আমি উপন্যাসটি লিখে ফেলি। এর আগে দু-চারটা গল্প লিখলেও ওটাই আমার প্রথম উপন্যাস। তো, লিখে নিয়ে গেলাম রূপছায়া অফিসে। সম্পাদককে না পেয়ে একটা চিরকূট লিখে উপন্যাসটা রেখে এলাম। কয়েকদিন পর আবার গেলাম রূপছায়া অফিসে এবং সম্পাদককে দেখে আমি রীতিমতো অবাক। হতাশও। ভেবেছিলাম সম্পাদক হবেন একজন টগবগে তরুণ, তা দেখি মাথাভর্তি পাকা চুল নিয়ে এক বুড়ো বসে আছেন! বুঝেছো তো মীজানুর রহমানের সব চুল তখন থেকেই পাকা ছিলো, আমি তো সেটা বুঝিনি, মনে করেছিলাম এক বুড়ো…হাঃ হাঃ হাঃ…। তো উনি আমাকে বেশ সমাদর করলেন, সারাদিন বসে বসে গল্পটল্প করলাম ওখানেই, বিকেলে উনি উনার বাসায় নিয়ে সবার সঙ্গে পরিচয়ও করিয়ে দিলেন। মানে, প্রথম দিনেই আমি তাঁর পরিবারের একজন হয়ে গেলাম। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। রূপছায়ায় উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে লাগলো। তখন মীজান সাহেব তাঁর পত্রিকায় যে উপন্যাস ছাপাতেন সেটাই আবার বই আকারে প্রকাশ করতেন। সৈয়দ শামসুল হকের এক মহিলার ছবি ওভাবেই বেরিয়েছিলো। তো আমার উপন্যাসও একইভাবে পত্রিকায় প্রকাশের পাশাপাশি বই আকারেও বের করার প্রস্তুতি চলছিলো। কিন্তু দুটো কিস্তি ছাপা হওয়ার পর তৃতীয় কিস্তি আর ছাপা হলো না, সেই যে বন্ধ হলো তো হলোই…

কামাল: মানে রূপছায়া বন্ধ হয়ে গেলো?

মাহমুদুল হক: না, আমার উপন্যাস ছাপা বন্ধ হয়ে গেলো।

কামাল: কেন?

মাহমুদুল হক: আমিও তখন জানতাম না, কেন! মীজান সাহেবের সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ছিলো এতো ঘনিষ্ঠ যে, তিনি নিজে থেকে না বললে আমার পক্ষে জিজ্ঞেস করা সম্ভবই ছিলো না। তবে কারণটা আমি তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারি, অনেক পরে, অনুর পাঠশালা বেরুনোর পর।

কামাল: কারণটা কী?

মাহমুদুল হক: অনুর পাঠশালা বেরুনোর কয়েকদিন পরেই মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ বিচিত্রায় এর একটি সমালোচনা লেখেন ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’ শিরোনামে, খুবই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখা সমালোচনা। ওটা আমার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ, আর ওটাই ওই বইয়ের ওপর প্রথম সমালোচনা। আমি তাঁর কাছ থেকে এমন তাৎক্ষণিক, স্বতঃস্ফূর্ত, ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া আশা করি নি। কারণ শহীদ সাবেরকে নিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিলো, সেটা তখনও ছিলো, আমি তারপর থেকে কোনোদিন তাঁর কাছে যাইই নি। তো, সমালোচনাটা আমাকে এনে দিলেন মীজানুর রহমান সাহেবই। বললেন, ‘পড়ে দেখুন।’ পড়ার পর মীজান সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বুঝলেন?’

‘বেশ প্রশংসা ট্রশংসা করেছেন।’

‘না, উনিই যে প্রথম আপনার বই নিয়ে আলোচনা করলেন এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?’

‘এ ব্যাপারে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

‘না এটা তো বেশ সিগনিফিকেন্ট ব্যাপার।’

‘কেন?’

মীজান সাহেব তখন ঘটনা খুলে বললেন। রূপছায়ায় আমার উপন্যাসটি যখন বেরুচ্ছিলো তখন একই সঙ্গে সেটা বই হিসেবেও ছাপা হচ্ছিলো। মাহফুজউল্লাহ সাহেবই মীজান সাহেবকে এটা বন্ধ করতে বলেন এই বলে যে, এত অল্প বয়সে বই বেরুলে ছেলেটার মাথা নষ্ট হয়ে যাবে, বই বেরুনো উচিত পরিণত বয়সে। উনার যুক্তিতে মীজান সাহেব তাৎক্ষনিকভাবে কনভিন্সড হয়ে ওটার ছাপা বন্ধ করে দিলেও তাঁর মনে খুঁতখুঁতে ভাব ছিলো যে, মাহফুজউল্লাহ সাহেব হয়তো আমার ভালো চান না। কিন্তু এই সমালোচনা ছাপার পর তাঁর খুঁতখুঁতানি দূর হয়েছে। ঘটনা শুনে আমিও কনভিন্সড হলাম যে, মাহফুজউল্লাহ সাহেব আমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়ে দ্রৌপদীর আকাশে পাখি ছাপা বন্ধ করতে বলেন নি।

রূপছায়ায় আমার উপন্যাসটি যখন বেরুচ্ছিলো তখন…মাহফুজউল্লাহ সাহেবই মীজান সাহেবকে এটা বন্ধ করতে বলেন এই বলে যে, এত অল্প বয়সে বই বেরুলে ছেলেটার মাথা নষ্ট হয়ে যাবে…উনার যুক্তিতে মীজান সাহেব তাৎক্ষনিকভাবে কনভিন্সড হয়ে ওটার ছাপা বন্ধ করে দিলেও তাঁর মনে খুঁতখুঁতে ভাব ছিলো যে, মাহফুজউল্লাহ সাহেব হয়তো আমার ভালো চান না।…ঘটনা শুনে আমিও কনভিন্সড হলাম যে, মাহফুজউল্লাহ সাহেব আমার কোনো ক্ষতি করার উদ্দেশ্য নিয়ে দ্রৌপদীর আকাশে পাখি ছাপা বন্ধ করতে বলেন নি।

কামাল: ছাপা না হয় বন্ধ হলো, কিন্তু পাণ্ডুলিপিটা?

মাহমুদুল হক: সে কথা আমি মীজান সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। উনি বললেন ইতিমধ্যে তিনি ৩/৪ বার বাসা বদল করেছেন, পাণ্ডুলিপিটা খুঁজে পাচ্ছেন না।

কামাল: এসব ব্যাপারে আপনি বোধহয় বেশ খানিকটা উদাসীনও। বহুদিন ধরে সাহিত্য প্রকাশের ক্যাটালগে আপনার দুটো উপন্যাস প্রকাশের ঘোষণা থাকে, অবশেষে একটা বেরুলো গত বছরে।

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, প্রায় পাঁচ বছর ধরে আমি ফাইনাল প্র“ফ দুটো ফেলে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম কিছু কিছু অংশ নতুন করে লিখবো, তা আর হয়ে ওঠে নি। তাছাড়া ও দুটো লিখে আমি খুব একটা সন্তুষ্টও হতে পারি নি।

কামাল: আপনার একটা গল্পের বইও তো বেরুনোর কথা ছিলো!

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, সেজন্য আমাকে অগ্রিম টাকাও দিয়েছিলো, প্র“ফ দেখতে দিয়েছিলো, কিন্তু সেটা হারিয়ে ফেলেছি।

কামাল: পাণ্ডুলিপিটা?

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ।

কামাল: গল্পগুলো আপনার কাছে নেই?

মাহমুদুল হক: না। আমি প্রায় শ’ খানেক গল্প লিখেছি, কিন্তু বইয়ের গল্পগুলো ছাড়া আর কিছুই আমার কাছে নেই। সেগুলো জোগাড় করার মতো উদ্যমও নেই।

কামাল: যাহোক, আপনার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস তো অনুর পাঠশালা!

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ। ওটা বেরিয়েছিলো ১৯৭৩ সালে, তারপর ’৭৪-এ নিরাপদ তন্দ্রা, ’৭৬-এ জীবন আমার বোন

কামাল: তারপর বেশ দীর্ঘ বিরতি দিয়ে ৮৮ তে খেলাঘর!

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ।

কামাল: এত দীর্ঘ বিরতির কারণ কী?

মাহমুদুল হক: না, লেখালেখিতে এতটা বিরতি পড়ে নি, তবে বই প্রকাশের ব্যাপারে আমি চিরকালই অলস, খুঁতখুঁতে, ওইসব কারণে দেরি হয়ে গেছে। আমার সব লেখাই ’৮২-এর মধ্যে লেখা। এর পরে আমি আর কিছুই লিখি নি, একটি মাত্র গল্প ছাড়া। লেখালেখি ছেড়ে দেয়ার আগে আমার ওই তিনটি বই ছাড়া একটা কিশোর উপন্যাস বেরিয়েছিলো — চিক্কোর কাবুক, বাকিগুলো পরে…।

কামাল: মানে খেলাঘর, কালো বরফ, মাটির জাহাজ, অশরীরী বা প্রতিদিন একটি রুমাল-এর গল্পগুলো আগের লেখা?

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ।

কামাল: এর মধ্যে আপনার বিবেচনায় সেরা লেখা কোনটি, কিংবা প্রিয়?

মাহমুদুল হক: এটা বলা তো কঠিন। নিজের কোনো লেখাকে সেরা বলা যায় নাকি? তবে প্রিয় লেখার কথা বলতে গেলে কালো বরফ-এর কথাই বলবো।

কামাল: কারণ কী?

মাহমুদুল হক: এটা লিখে একটু তৃপ্তি পেয়েছিলাম। মনে হয়েছিলো বাহুল্যহীন, মেদহীন ঝরঝরে একটা উপন্যাস লিখতে পারলাম। মানে এই একটি উপন্যাসই আমার কাছে বেশ কমপ্যাক্ট মনে হয়। আর উপন্যাস-গল্প এগুলো একটু কমপ্যাক্ট হওয়াই ভালো। লেখার সময় তো যা-ই আসে তাকেই শ্রেষ্ঠ মনে হয়। অনন্য মনে হয়! আসলে তো তা নয়। লেখাটা চূড়ান্ত করার সময় লেখককে এসব বিষয়ে সচেতন হতে হয়, নির্মম হতে হয়। আমি তো মাটির জাহাজ-এর মূল পাণ্ডুলিপি থেকে ৩৩ পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে দিয়েছি — এত নির্মম কেউ হয় বলো? তো সেই দিক থেকে দেখতে গেলে কালো বরফকে বেশ কমপ্যাক্ট আর গোছানো লেখা বলা যায়।

কামাল: শুধু এই একটি কারণেই এই উপন্যাসটি প্রিয়?

মাহমুদুল হক: কেন, একটা উপন্যাস লিখে তৃপ্তি পেয়েছি, এটা কি একটা বড় ব্যাপার নয়?

কামাল: না, আমি সেটা বলছি না। আমারও ধারণা ছিলো, আপনার নিজের কাছে কালো বরফই প্রিয় হবে, কিন্তু সেটা অন্য কারণে।

মাহমুদুল হক: অন্য কারণটা কী? মানে তুমি কী ভেবেছিলে?

কামাল: আমি ভেবেছিলাম বিষয়ের কারণেই এই উপন্যাসটি আপনার প্রিয় হবে…

মাহমুদুল হক: কালো বরফের বিষয় তো এমন আহামরি কিছু নয়…

কামাল: আহামরি বিষয় আবার কী জিনিস বটু ভাই?

মাহমুদুল হক: না, আমি বলছি পাঠককে আকর্ষণ করার মতো এমন কী আছে ওটার বিষয়ের মধ্যে?

কামাল: কী আছে সেটা আপনার প্রশ্ন, পাঠকরা এর উত্তর দিতে পারবে। অবশ্য নাও দিতে পারে, সব ভালো লাগার কারণ কী ব্যাখ্যা করা যায়? কিন্তু আপনার পাঠকরা সম্ভবত ওই উপন্যাসটিকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে।

মাহমুদুল হক: কারণটা কী বলে তোমার মনে হয়?

কামাল: পাঠকের কথায় পরে আসি। আমি আপনার কথা বলছিলাম যে, আমার ধারণা ছিলো বিষয়ের কারণেই উপন্যাসটা আপনার সবচেয়ে প্রিয় হবে।

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, তোমার কথাটা শোনা হয়নি, বলো।

কামাল: ওই উপন্যাসটি, আমার মনে হয়েছে, অনেকটাই আত্মজৈবনিক। বিশেষ করে আপনার শৈশবের দেখা মেলে ওই উপন্যাসে। আর আত্মজৈবনিক উপন্যাস তো লেখকদের কাছে একটু বেশি আদরণীয় হয়ই।

মাহমুদুল হক: কিন্তু ওটা আমার জীবন নিয়ে লেখা নয়, ওখানে আমি নেই।

কামাল: পুরোপুরিই আপনি আছেন তা তো বলি নি। কিন্তু ওই উপন্যাসে আবদুল খালেকের যে শৈশব-প্রেম সেটা তো আপনারই! আপনার বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে শৈশব-প্রেম বেশ প্রবলভাবে আসে, এটাতে তার তীব্র প্রকাশ ঘটেছে।

মাহমুদুল হক: কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয় শৈশবের প্রতি কোনো আমার কোনো প্রেম নেই। আমার শৈশব খুব দ্বন্দ্বসংকুল, দেশভাগের যন্ত্রণায় ভরা, বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ার বেদনায় ভরা।

কামাল: এই উপন্যাসেও সেটাই এসেছে, আবদুল খালেকের শৈশব তো বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ার যন্ত্রণা ও বেদনায় ভরাই।

মাহমুদুল হক: শোনো, দেশভাগের সময় আমার বাবা এখানে চলে এসেছিলেন ঠিকই, কিন্তু আমরা আসতে চাইনি। মা তো আসার ব্যাপারে একেবারেই আগ্রহী ছিলেন না। এখানে আসার আগে তিনি দুবার ঢাকায় এসেছিলেন বাবার সঙ্গে, এবং ফিরে গিয়ে বলেছিলেন ওটা বর্বরদের দেশ। কারণ কী জানো? যে দুবার তিনি এসেছিলেন কোনোবারই রাস্তাঘাটে কোনো মেয়েকে চলাফেরা করতে দেখেন নি। তখন তো ঢাকা শহরে মেয়েরা বাইরে বেরুতোই না, দু-একজন বেরুলেও রিকশা পর্দা দিয়ে ঘিরে বেরুতো। তো এইসব দেখে মা’র নাকি মনে হয়েছিলো, যে দেশে মেয়েরা বাইরে বেরুতে পারে না সেটা একটা বর্বর দেশ। তিনি ব্যাপারটা এতোই সিরিয়াসলি নিয়েছিলেন যে, ফিরেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন — কিছুতেই তিনি পাকিস্তান যাবেন না। এমনকি ওখানে বাস করার জন্য নতুন বাড়ি পর্যন্ত বানানো শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা থাকতে পারি নি। আব্বা এখানে চলে আসার পর ওখানকার অবস্থা নাজুক হয়ে পড়ে, সবাই আমাদেরকে দেখতে থাকে সন্দেহের চোখে, এমনকি আমাদের সঙ্গে মেলামেশাও প্রায় বন্ধ করে দেয়। সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি একসময় এমন এক অবস্থায় পৌঁছায় যে আমরা চলে আসতে বাধ্য হই। এখন বলো, যে জন্মভূমি তার সন্তানদের দেশত্যাগে বাধ্য করে সেই জন্মভূমির প্রতি কোনো প্রেম থাকে?

[তাঁর কণ্ঠে তীব্র ক্ষোভ বেদনা অভিমান ও যন্ত্রণা ঝরে পড়ে। অনেকক্ষণ আমি কোনো কথা বলতে পারি না। বাধ্য হয়ে দেশত্যাগের যন্ত্রণার সঙ্গে তো আমার কোনো পরিচয় নেই, কী বলবো আমি? তিনিও অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন। আমি নিঃশব্দে তাঁর গম্ভীর-বিষণ্ন হয়ে যাওয়া মুখ দেখি, ভিজে ওঠা চোখ দেখি। একসময় নিজেই আবার কথা শুরু করেন তিনি।]

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, কী যেন বলছিলে তুমি?

কামাল: এই বিষয়টা না হয় থাক বটু ভাই।

মাহমুদুল হক: না, থাকবে কেন? তোমার মতামতটা শোনা যাক।

কামাল: কালো বরফ নিয়ে কথা হচ্ছিলো।

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, তুমি আমার শৈশব প্রেমের কথা বলছিলে!

কামাল: হ্যাঁ।

মাহমুদুল হক: কিন্তু ওটা তো আমার শৈশব নয়।

কামাল: ওই উপন্যাসের চরিত্রগুলো কি আপনার পরিচিত নয়?

মাহমুদুল হক: না, ওটা তো বানিয়ে লেখা। আচ্ছা তুমি তো লেখ, লেখার জন্য যে সব চরিত্রের সঙ্গে পরিচয় থাকার দরকার হয় না, সেটা তো বোঝো!

কামাল: তা বুঝি। কিন্তু লিখি বলেই এটাও বুঝি যে, মাধুর মতো কোনো রক্তমাংসের মানুষের সঙ্গে পরিচয় না হলে, ওরকম কোনো চরিত্রও সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।

মাহমুদুল হক: মাধুর মতো একজন ছিলো অবশ্য, ছোটবেলায় ওরকম একজনকে দেখেছি আমি, মনে আছে।

কামাল: আর মণি ভাই?

মাহমুদুল হক: না, ওরকম কেউ নেই। মণি ভাইয়ের চরিত্রটা ঠিক উল্টে দিলে যাকে পাওয়া যাবে, সে আমার বড় ভাই।

কামাল: মা?

মাহমুদুল হক: মা? হ্যাঁ, কালো বরফ-এর মায়ের সঙ্গে আমার মায়ের বেশ খানিকটা মিল আছে বটে। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা বলি শোনো। এই উপন্যাসটা বই হয়ে বেরুনোর অনেকদিন পর আমি কুমিল্লা অভয়াশ্রম থেকে একটা চিঠি পেলাম। চিঠিটা এসেছিলো প্রকাশকের ঠিকানায়। তো খুবই কাঁচা হাতের লেখা চিঠিটাতে একটা বাক্য ছিলো — আপনার কালো বরফ পড়িয়া আমার মাতৃদর্শন ঘটিয়াছে। চিঠিটা পড়ে আমি অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম, কেঁদেছিলামও। এ-তো আমারও মাতৃদর্শন। আমার লেখক জীবনে যা কিছু বড় প্রাপ্তি তার মধ্যে এই চিঠি একটি।

কামাল: মা’র প্রসঙ্গটি আপনি বেশ স্পর্শকাতরভাবে উপস্থাপন করেন আপনার লেখায়।

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, মা’র ব্যাপারে আমি নিজেই খুব স্পর্শকাতর। মা চলে যাওয়ার পর আমার সবই শেষ হয়ে গেছে। আমার জীবনে মা’র ভূমিকা সাংঘাতিক। আমার খুব সাধ ছিলো তাঁকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখবো।

কামাল: লিখলেন না কেন?

মাহমুদুল হক: হলো না আর কি! লেখালেখিটা ছেড়ে না দিলে হয়তো লিখতাম। আমার কী মনে হয় জানো? পৃথিবীতে এ পর্যন্ত মা নিয়ে যতোগুলো লেখা হয়েছে, আমি প্রায় সবই পড়েছি, এর মধ্যে মানিকের জননীই সেরা। সবার থেকে একদম আলাদা। আমার মনে হয় আমি মাকে নিয়ে উপন্যাসটা লিখতে পারলে সেটা মানিকেরটার চেয়েও ভালো হতো।

কামাল: আপনার আর কোনো লেখায় কি আপনার মাকে পাওয়া যাবে?

মাহমুদুল হক: না, ঠিক সেভাবে… খেলাঘর উপন্যাসটার ভাষা আমার মায়ের মুখের ভাষা থেকে নেয়া। সংলাপগুলো খেয়াল করে দেখো, ওই ভাষায় আমি বা আমার চারপাশের কেউ-ই কথা বলে না। মা ওই ভাষায় কথা বলতেন।

কামাল: খেলাঘর ছাড়াও আপনার বহু লেখায় মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটা ঘুরেফিরে এসেছে। কেন? বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ কি আপনার খুব প্রিয়?

মাহমুদুল হক: একটা জাতির জীবনে এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেলো, আমি সেই জাতির একজন লেখক হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখবো না? এটা কি লেখক হিসেবে আমার একটা দায়িত্বও নয়?

কামাল: কিন্তু আপনার লেখাগুলোতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা নেই। এ জাতি তো যুদ্ধ করেই দেশটা স্বাধীন করেছিলো! অথচ আপনার প্রায় সব লেখাই যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া অসহায় জনগোষ্ঠীর মনোজগতের গল্প, যুদ্ধের কথা সেখানে নেই বলতে গেলে। যেমন খেলাঘরে ইয়াকুব আর রেহানাকে দেখে মনেই হয় না যে, তাদের চারপাশে একটা যুদ্ধ চলছে, তাদের পাশের সাধারণ কৃষকটিও লাঙল ফেলে বন্দুক তুলে নিচ্ছে। তারা ব্যস্ত আছে নিজেদেরকে নিয়ে, নিজেদের সংকট আর অসহায়ত্ব নিয়ে।

মাহমুদুল হক: আমি যেভাবে দেখেছি সেভাবেই তো লিখবো। আমি নিজে তো যুদ্ধ করি নি। যুদ্ধের সময় আমিও তো অবরুদ্ধ ঢাকা শহরে আটকে পড়া এক অসহায় মানুষ ছিলাম।

কামাল: জীবন আমার বোন তো যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থা নিয়ে লেখা। সেখানে তাহলে খোকাকে এত নিস্পৃহ নিষ্ক্রীয় নিরাসক্ত অংশগ্রহণবিহীন দেখালেন কেন? জীবন আমার বোন-এর একটা অংশ মনে পড়ছে, বলি?

মাহমুদুল হক: বলো।

কামাল: সময়টি ঠিক যুদ্ধ শুরু হবার কয়েকদিন আগে। চারপাশে কোলাহল; সারাটি দেশ হয়ে উঠেছে বিস্ফোরোন্মুখ, মেতে উঠেছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের উত্তেজনা, আয়োজন ও উন্মাদনায় — মিটিং মিছিল বিক্ষোভ বিদ্রোহ — প্রতিটি মানুষ কোনো না কোনো ভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়ছে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে। রাজপথে যারা নেই,তারাও চায়ের কাপে তুলছে ঝড় — টেবিল ভেঙে ফেলছে থাপ্পর মেরে। এমনই এক উন্মাতাল সময়ের ভেতর খোকা বন্ধুদের সঙ্গে কোলাহলমুখর রমনা রেস্তোরায় আড্ডা দিতে দিতে কী ভাবছে সেই বর্ণনা আপনি দিয়েছেন এইভাবে — খোকা কোনো কথা বললো না। চুপচাপ তাকিয়ে রইলো ঘনায়মান অন্ধকারের দিকে। … পানির উপরে হাওয়ার নাচন শুরু হয়েছে। বাংলা কবিতার একটি বিড়াল অন্ধকারকে ছোট ছোট বলের মতো থাবা দিয়ে লুকিয়ে আনছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর ‘চল নামি আষাঢ় আসিয়াছে’ ধরনের ঝাঁপ দিয়ে উদ্যানের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছোটাছুটি করে নৃত্যরত জিপসী তা কুড়িয়ে নিচ্ছে, যেন শিলকুড়–নি শৈশব। শৈশব জীবনে বারবার আসে না কেন? আসলে জীবন মানেই শৈশব; জীবনভর মানুষ এই একটা ঐশ্বর্যই ভাঙিয়ে খায়, আর কোনো পুঁজিপাট্টা নেই তার। এই এক অদ্ভুত জীব, ধাপে ধাপে এরা নিজেদেরকে ছোট করে তোলে, রক্তে মিশে আছে এদের নিজেদের পতন। — এরকম একটা মুহূর্তে ও পরিবেশে খোকার এইরকম চিন্তাভাবনা কি মানায়?

মাহমুদুল হক: এরকম দেখাবার কারণ আছে। খোকাকে বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত দেখাবার জন্যই ওরকমটি করতে হয়েছে। খোকার ওখানে ভালো লাগে নি। খোকা যে ওখানকার অন্য সবার চেয়ে আলাদা সেটা দেখাবার জন্য আমি আর কীই-বা করতে পারতাম?

কামাল: প্রশ্ন তো সেটা নয়, প্রশ্নটা হলো খোকাকে বিচ্ছিন্ন বা বিযুক্ত বা আলাদা দেখাবার প্রয়োজনটা কী ছিলো? সে-ও তো ঘটনাপ্রবাহে অংশগ্রহণ করতে পারতো!

মাহমুদুল হক: না পারতো না, আমি খোকাকে সেভাবেই তৈরি করেছি। সে সব জায়গায় মানানসই নয়, সব ক্ষেত্রে সে অংশগ্রহণ করতে পারে না। যদি জানতে চাও আমি খোকাকে ওভাবে তৈরি করলাম কেন সেটা আরেক প্রশ্ন।

কামাল: আমার প্রশ্ন আসলে সেটাই। খোকাকে ওইভাবে তৈরি করার মানে কী?

মাহমুদুল হক: এটা পরিষ্কারভাবেই বোদলেয়ারের প্রভাব। আমরা, যারা ষাটের দশকে বেড়ে উঠেছি, কবি বা গদ্যকার, সবার ওপরেই কমবেশি বোদলেয়ারের প্রভাব পড়েছে। এমনকি ইলিয়াসের ওপরও।

কামাল: ইলিয়াস ভাইয়ের ওপরও?

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ নিশ্চয়ই।

কামাল: কীভাবে?

মাহমুদুল হক: কেন, ওর রঞ্জু চরিত্রটা দেখে কী মনে হয়? সে কি বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত নয়? সে অংশগ্রহণ করতে চায় বটে, পারে না তো!

কামাল: আমি অবশ্য এভাবে ভেবে দেখি নি। তবে আমার মনে হয়েছে ইলিয়াস ভাই সব সময় সমান্তরাল চরিত্র নির্মাণ করেন। একটি সমাজ-সময়-রাজনীতি সচেতন এবং সক্রিয়ভাবেই সবকিছুতেই অংশগ্রহণ করে, আরেকটি ঘোরগ্রস্থ এবং নিস্পৃহ নিষ্ক্রীয় নিরাসক্ত।

মাহমুদুল হক: যেমন?

কামাল: যেমন খোয়াবনামার তমিজ সক্রিয়, আর তার বাপ নিষ্ক্রীয়, আমার তো মনে হয় এই চরিত্র দুটো আসলে একটি চরিত্রেরই দুটো দিক।

মাহমুদুল হক: খোয়াবনামা আমি পড়ি নি, বুঝতে পারছি না…

কামাল: চিলেকোঠার আনোয়ার সক্রিয়, রঞ্জু নিষ্ক্রীয়…

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, তুমি কি ইলিয়াসকে বোঝার জন্য শুধু আনোয়ারের বা তমিজের কথাই বলবে, রঞ্জু বা তমিজের বাপের কথা বলবে না?

কামাল: নিশ্চয়ই বলবো।

মাহমুদুল হক: ওই যে চরিত্রগুলো — নিষ্ক্রীয় এবং উদাসীন এগুলো বোদলেয়ারের প্রভাবেই কারণেই…

কামাল: আপনারা সবাই মিলে বোদলেয়ারের কবলে পড়লেন কীভাবে?

মাহমুদুল হক: বোদলেয়ার তো তেমন কবিই। তাছাড়া ওইসময় আমরা কেবল তাঁকে পেয়েছি, মনে হচ্ছে যেন স্বর্গ হাতে পেয়েছি… খোকাকে ওভাবে তৈরি করার পেছনে অবশ্য আরও একটা যুক্তি আছে। সবকালেই সবদেশে ওরকম কিছু মানুষ থাকে যারা প্রবল কোলাহলেও একা, যারা জনতার সঙ্গে মিলে যেতে পারে না। এদেরকে তুমি যদি অসুস্থ বল তবে তাই, কিন্তু এদের অস্তিত্ব আছে সেটা অস্বীকার করা যায় না। খোকা তাদের প্রতিনিধি। আমি এরকম একজন মানুষের চোখে যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থাকে রিপ্রেজেন্ট করতে চেয়েছি। তার মানে কিন্তু এই নয় যে, আমি অন্য সবকিছু অস্বীকার করেছি। অর্থাৎ জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনা, জনতার কোলাহল বা জেগে ওঠা সবই তো দেখিয়েছি, আর দেখিয়েছি বলেই খোকার ওই নিরাসক্তি এমন তীব্রভাবে চোখে পড়ে।

কামাল: কিন্তু নিরাপদ তন্দ্রায় কামরান রসুলকে ওরকম একটি বস্তির মধ্যে এনে ফেলার মানে কী? ওই বস্তিতে কামরান রসুলই একমাত্র বেমানান, খুব উৎকটভাবে তাকে চোখে পড়ে। আলাদাভাবে একজন ব্যক্তিকে চেনাবার জন্যই কি আপনি বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি তৈরি করেন?

মাহমুদুল হক: নিরাপদ তন্দ্রায় কামরান রসুল আদৌ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয়। আমি তো ওখানে ওই মেয়েটির গল্প বলতে চেয়েছি, কিন্তু গল্পটা কার কাছে বলবে সবাই, কেই-বা আবার সুন্দর করে প্রেজেন্ট করবে এসব ভেবে কামরান রসুলকে ওখানে নিয়ে গেছি। কিন্তু নানা লোকের মুখে মেয়েটির গল্প শোনা ছাড়া তার তো তেমন কোনো ভূমিকা নেই ওই উপন্যাসে, তাকে দিয়ে আমি ব্যক্তিচরিত্রের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে চাইনি।

কামাল: কিন্তু আপনার প্রায় সব লেখা পড়েই আমার মনে হয়েছে কোনো না কোনো চরিত্রের মাধ্যমে একটি ব্যক্তি-চরিত্রের প্রতিষ্ঠা বা ব্যক্তিচরিত্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন।

মাহমুদুল হক: যে সমাজে ব্যক্তিই গড়ে ওঠে নি সেই সমাজের মানুষ নিয়ে আমি যখন লিখি তখন কীভাবে তাদের দিয়ে ব্যক্তিচরিত্রের মডেল প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?

কামাল: হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে — এই ইঙ্গিত আপনি আপনার লেখাগুলোতেই দিয়েছেন।

মাহমুদুল হক: কোন ইঙ্গিত?

কামাল: এই যে বললেন, এ সমাজে ব্যক্তিই গড়ে ওঠে নি। এবং এজন্যই আপনার ব্যক্তিচরিত্রগুলো একেকজন অসম্পূর্ণ মানুষের প্রতিকৃতি। এরা বিচ্ছিন্ন, বিযুক্ত, এরা নিঃসঙ্গ, অসুস্থ, পীড়িত, রুগ্ন — কারণ আপনি সম্ভবত বলতে চান, এ সমাজই এমন রুগ্ন এবং অসুস্থ যে, একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্ম কিংবা বিকাশ সম্ভব নয়।

মাহমুদুল হক: এরকম একটা ব্যাখ্যা সম্ভবত তুমি তোমার একটি লেখায় দিয়েছিলে।

কামাল: হ্যাঁ।

মাহমুদুল হক: তোমার এই ব্যাখ্যাটি সঠিক, কিন্তু আমার কাছে মনে হয় — লেখার সময় আমি এসব নিয়ে এত সচেতন ছিলাম না। লেখালেখির ক্ষেত্রে আমি স্বতঃস্ফূর্ততায় বিশ্বাসী, স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা এসেছে লিখে গেছি — পরে কাটাছেঁড়াও করেছি অবশ্য কিন্তু যোগ করেছি সামান্যই, কেটেছি বেশি। আমার প্রায় সব উপন্যাস একটানে লেখা। এক বসায় সাত-আটদিন লিখে আমি একেকটা উপন্যাস আমি শেষ করেছি। এত ভাবাভাবির সময় ছিলো না তো!

mahmudul-haq-4.jpg…..
মাহমুদুল হক। ছবি: ওয়াসে আনসারী
……
[এভাবে দিনের পর দিন আমাদের আলোচনা চলে। লেখালেখি ছাড়াও আসে তাঁর নানা ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ — তাঁর জীবনযাপন, তাঁর অতীত ও বর্তমান, তাঁর উদ্দাম-উচ্ছ্বল-মুখর যৌবনের দিনগুলোর কথা বলতে বলতে তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন। চলে সমসাময়িক এবং পূর্বপ্রজন্মের লেখকদের সম্বন্ধে তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে পর্যালোচনা — কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে আবার শর্ত জুড়ে দেন — এসব কোথাও প্রকাশ করা যাবে না, অন্তত তাঁর মৃত্যুর আগে তো নয়ই। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাঁর মুগ্ধতার কথা বারবার ঘুরেফিরে আসে, বলেন — ‘তাঁর লেখায় তুমি মানবজীবনের রহস্যের সন্ধান পাবে। মানিকের মতো পাওয়ারফুল লেখক পৃথিবীতে খুব কমই এসেছেন। আমার ধারণা, আমরা তাঁকে ঠিকভাবে বুঝতে পারি নি, তাঁর পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নও আজ পর্যন্ত হয় নি। তাঁকে তাঁর সমগ্র দিয়েই বোঝা দরকার, অর্থাৎ লেখকসত্তা এবং ব্যক্তিসত্তা দুটোই একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা দরকার। তাঁর ডায়রিগুলো পড়লেই তুমি এক ভিন্ন মানিকের দেখা পাবে…।’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্বন্ধে বলেন — ‘তিনিই আমাদের একমাত্র লেখক যাঁকে মনোযোগ দিয়ে পাঠ করতে হয়। যে লেখক লেখেন — এ দেশে শস্যের চেয়ে টুপি বেশি — তাঁর ক্ষমতা অপরিসীম।’ সৈয়দের প্রবাসজীবন সম্বন্ধে ক্ষোভ এবং বেদনা প্রকাশ করে বলেন — ‘বিদেশে বসে সাহিত্য হয় না। তাঁরও লেখালেখি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, খুব সামান্যই লিখতে পেরেছেন। যেটুকু হয়েছে, সেটি তাঁর অসামান্য সৃজনশীলতার কারণে হয়েছে। তাঁর মতো একজন লেখক কেন যে বিদেশে বসবাসের সিদ্ধান্ত নিলেন, বুঝি না। দেশে থাকলে এই সময়ের মধ্যে তিনি আরো অনেকদূর এগিয়ে যেতেন বলে আমার ধারণা।’ শহীদ কাদরীর সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্বের কথা তীব্র আবেগের সঙ্গে বর্ণনা করেন। বলেন, তুমি যদি আমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটির নাম বলতে বলো, আমি বলবো শহীদ কাদরী। আর যদি পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষটির নাম বলতে বলো, আমি বলবো শহীদ কাদরী! ও হলো একশতভাগে ভালোমানুষ এবং একশতভাগ খারাপ মানুষ! আর ওর কবিতা! ও-ই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী কবি। ও চলে যাওয়াতে বাংলাদেশের কবিতা অর্ধমৃত হয়ে গেছে।’ কিন্তু এতসব আলোচনার মাঝখানে আমার ভেতরে উন্মুখ হয়ে থাকে তাঁর লেখালেখি বন্ধ করার বিষয়টি। কেন তিনি আর লেখেন না — এ বিষয়ে কি সত্যিই তিনি কোনোদিন কিছু বলবেন না? তারপর একদিন তিনি তাঁর ক্লান্তির কথা বললেন, বললেন ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশনের কথাও।]

মাহমুদুল হক: ডাক্তার নন্দী নামে এক ভদ্রলোক আমার মায়ের চিকিৎসা করতেন। খুব অদ্ভুত মানুষ ছিলেন তিনি। পশুপাখির সঙ্গে কথা বলতেন, মনে হতো তিনি ওদের ভাষা বোঝেন, অন্তত তাঁর কথা বলার ধরনটা ওইরকমই ছিলো। তাঁর পোষা কুকুর ছিলো, সেগুলোকে তিনি সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। আমি তখন টিয়েপাখি পুষতাম, তিনি আমাদের বাসায় এসেই আগে টিয়েকে আদর করতেন, কথাবার্তা বলতেন। তো ওই ভদ্রলোক আমার কাছ থেকে বই নিয়ে যেতেন পড়ার জন্য। একদিন তিনি বললেন, ‘আমার কি মনে হয় জানো? মনে হয় আমরা সময় কাটাবার জন্য, ক্লান্তি দূর করার জন্য এসব বইটই পড়ি, অথচ এসব যারা লেখেন তাঁদেরও একসময় আর এগুলো ভালো লাগে না। বুঝলে, ক্লান্ত লাগে ক্লান্ত লাগে।’ তাঁর এই কথাটা আজকাল আমার খুব মনে পড়ে। আমারও এখন ক্লান্ত লাগে ক্লান্ত লাগে। জীবনটাকে ভীষণ অর্থহীন মনে হয়। আর তাছাড়া, লিখে কী হয়? লেখালেখি করে কি কাউকে কমিউনিকেট করা যায়? মিউজিক বরং অনেক বেশি কমিউনিকেটেবল ল্যাংগুয়েজ। লেখালেখিতে যা কিছু বলতে চাই তা বলা হয়ে ওঠে না, আমি অন্তত বলতে পারি নি। যেটুকু বলেছি তা-ও যে বোঝাতে পেরেছি বলে মনে হয় না। যাকে বলে ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশন সেটা আমাদের প্রায় সবার জীবনে ঘটে, আমার জীবনেও ঘটেছে।

কামাল: তবুও তো আমরা কথা বলি, লিখি, ছবি আঁকি, গান বাঁধি, সুর তুলি, গান গাই, কমিউনিকেট করার সবরকম চেষ্টা করে যাই।

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ যেমন করে জীবন অর্থহীন জেনেও আমরা জীবন যাপন করে যাই। মৃত্যুই চূড়ান্ত সত্য, জন্মালে মরতে হবেই, আর আমি মারা গেলে আমার এত কীর্তি কোথায় যাবে? এত কীর্তি দিয়ে আমার হবেটাই বা কী? সেই দিক থেকে দেখতে গেলে জীবন এবং জীবনের যাবতীয় কার্যকলাপ সবই খুব অর্থহীন, খুবই অর্থহীন। কিন্তু আমরা এগুলো ভুলে থাকি। কীভাবে থাকি? এত অনিবার্য বাস্তবতার কথা আমরা কী করে ভুলে থাকি? আমার তো মনে হয় প্রকৃতিই আমাদের ভুলিয়ে রাখে, নইলে মানুষের পক্ষে কিছু করা সম্ভব হতো না। কিন্তু মরবার আগে একজন মানুষ ঠিকই টের পেয়ে যায়, মৃত্যুর কথা তার বারবার মনে পড়ে, বারবার মৃত্যুর প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলে সে। কেন মনে পড়ে? ওই প্রকৃতিই মনে করিয়ে দেয় যেন সে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

কামাল: জীবন যে অর্থহীন একটা ব্যাপার, আমরা শুধু অর্থ আরোপ করার চেষ্টা করি, আর মৃত্যুই যে চূড়ান্ত সত্য সেকথা আমিও বিশ্বাস করি। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না বটু ভাই।

মাহমুদুল হক: কী প্রশ্ন?

কামাল: মানুষের জন্মটা তো কোনো অ্যাক্সিডেন্ট নয়, বরং আমার মনে হয়, অনেক পরিকল্পনা করে একজন মানুষের জন্ম দেয়া হয়। আমার প্রশ্নটা সেখানেই। যে জীবন এত অর্থহীন তাকে জন্ম দেবার জন্য প্রকৃতির এত আয়োজন কেন? প্রশ্নটা উল্টোভাবেও করা যায়, এত আয়োজন করে যে জীবনের জন্ম সেই জীবন অর্থহীন হবে কেন?

মাহমুদুল হক: এটা খুব বড় একটা প্রশ্ন। খুব সত্যি কথা বলেছ তুমি, প্রতিটি মানুষের জীবন একটা বিরাট পরিকল্পনার অংশ। কিন্তু কেন এত আয়োজন সেই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই। আমি বিশ্বাস করি যে, সব প্রশ্নের উত্তর আছে তবে চাওয়া মাত্র সেটা পাওয়া যায় না। সময় একটা বড় ফ্যাক্টর। সব বয়সে সব উত্তর না পাওয়াই ভালো, সেটা সহ্য না-ও হতে পারে। প্রকৃতিই সবকিছু সিদ্ধান্ত নেয়। সে-ই যথার্থ সময় মতো তোমাকে উত্তরটা জানিয়ে দেবে। কিন্তু আমার এ-ও মনে হয়, মানুষ যখন কোনো বড় সত্যের দেখা পায় বা বড় প্রশ্নের উত্তর পায় তখন তার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। বিদ্যাসাগর শেষ জীবনে সভ্য সমাজ ছেড়ে আদিবাসীদের সঙ্গে গিয়ে ছিলেন, জগদীশ চন্দ্র বসু শেষ জীবনে কারো সঙ্গে কথা বলতেন না, চুপ করে থাকতেন, নজরুলও তো চুপ করেই গেলেন। জানো, সবাই বলেন যে, নজরুল অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তিনি নাকি কথা বলতে পারতেন না, কিন্তু আমার তা মনে হয় না। শেষ জীবনে আমি তাঁকে দেখেছি, মনে হয়েছে তিনি সবই বুঝতে পারেন। আমার মনে হয় এরা সবাই খুব বড় কোনো সত্যের দেখা পেয়েছিলেন, বড় কোনো প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিলেন, সৃষ্টির নিগূঢ়তম রহস্যের একটা কূলকিনারা করতে পেরেছিলেন। একবার সেটা করতে পারলে আর কী-ই বা করার বা বলার থাকে বলো?

কামাল: আরেকটা প্রশ্ন বটু ভাই। পৃথিবীতে এত মানুষ জন্মায়, কিন্তু অল্প কিছু মানুষ শিল্পীর সেনসেটিভিটি নিয়ে জন্মায় কেন? গৌতম বুদ্ধর কথা ধরুন। তিনি জগতের সকলের দুঃখ নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে বললেন — জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। কেন তিনিই সবার দুঃখ নিজের কাঁধে তুলে নেবার মতো এমন সেনসিটিভিটি নিয়ে জন্মালেন? আমার তো শিল্পীদেরকেও তেমনই মনে হয়। তারাও আরও অনেকের দুঃখ নিজের কাঁধে তুলে নেন। শুধু নিজের কথা না ভেবে আরো অনেকের কথা ভাবেন। প্রকৃতি কেন সিলেক্টেড কিছু মানুষের হাতে কলম তুলে দেয়, বা রঙ-তুলি তুলে দেয়, বা কারো গলায় সুর তুলে দেয়? প্রকৃতি কেন এঁদেরকে এইসব কাজের জন্য বেছে নেয়?

মাহমুদুল হক: এ প্রশ্নের হয়তো একটিই উত্তর — সবই তার ইচ্ছে।

কামাল: কার?

মাহমুদুল হক: এই যে তুমি যাকে প্রকৃতি বলছো। কেউ তাকে চাইলে আল্লাহ, ঈশ্বর বা ভগবান বলেও ডাকতে পারে। কিন্তু এ প্রশ্নের চূড়ান্ত কোনো উত্তর আছে বলে আমার মনে হয় না। একেকসময় এ প্রশ্নের উত্তর একেক রকম হবে। খেয়াল করে দেখো, এমন অনেক কিছুই আমাদের লেখার মধ্যে থাকে যা আমরা সচেতনভাবে ভাবিনি। পরে পড়লে অবাক লাগে, মনে হয়, এ কি আমারই লেখা? মনে হয় — লেখার সময় আমরা অন্য কারো করতলে ছিলাম, থাকি।

কামাল: কার করতলে?

মাহমুদুল হক: তাতো জানি না। হয়তো প্রকৃতির।

কামাল: সে কি আমাদেরকে দিয়ে তার ইচ্ছেমতো লিখিয়ে নেয়?

মাহমুদুল হক: হতে পারে।

কামাল: তাহলে কি বলবো লেখকরা বা শিল্পীরা প্রকৃতির বিশেষ সন্তান?

মাহমুদুল হক: বিশেষ সন্তান তো বটেই।

কামাল: এবং শিল্পীর কাজের মধ্যে দিয়ে সে নিজের রূপায়ন দেখতে চায়!

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ, ব্যাপারটা ওরকমই।

কামাল: তাহলে আর ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশনের কথা বলছেন কেন? আমরা প্রকৃতির সন্তান, বিশেষ সন্তান, আর প্রকৃতিই এমনটি চাইছে…

মাহমুদুল হক: সেটা বলছি আমি নিজে কমিউনিকেট করতে পারছি না বলে, যা বলতে চাইছি তা বলতে পারছি না বলে, যা বোঝাতে চাইছি তা বোঝাতে পারছি না বলে …

কামাল: তাতে তো প্রকৃতির কিছু যায় আসে না। আপনি যা বলতে চাইছেন তা হয়তো বলতে পারলেন না, যা বোঝাতে চাইছেন তা হয়তো বোঝাতে পারলেন না, কিন্তু আপনার লেখা থেকে কেউ হয়তো অন্য কোনোভাবে অন্য কিছু বুঝে নিলো এবং এই বোঝার ফলে তার জীবনটাই হয়তো পাল্টে গেলো! যে ব্রেকডাউন অব কমিউনিকেশনের কথা আপনি বলছেন সেটা কমবেশি সব লেখকের জীবনেই কি ঘটে নি? এমনকি যে রবীন্দ্রনাথ এত বিপুল সৃষ্টিকর্ম রেখে গেছেন তিনিই বা কতোটুকু কমিউনিকেট করতে পেরেছেন, যা বোঝাতে চেয়েছেন তার কতোটুকু বোঝাতে পেরেছেন?

মাহমুদুল হক: কম, খুবই কম। আমরা রবীন্দ্রনাথের কতোটুকুই বা বুঝেছি?

কামাল: তবু কি রবীন্দ্রনাথ তাঁর পাঠকদের জীবন অনেকখানিই বদলে দেন নি?

মাহমুদুল হক: হ্যাঁ তাতো দিয়েছেনই।

কামাল: প্রকৃতি তাকে দিয়ে সেটাই করিয়ে নিতে চেয়েছে এমনও তো হতে পারে।

মাহমুদুল হক: হতে পারে। প্রকৃতি না হয় আমাকে দিয়েও সেটা করিয়ে নিলো। নিক, আমার তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু আমার সংকটের দিকটা তুমি ভেবে দেখবে না? আমি প্রকৃতির সন্তান বটে, কিন্তু আমাকে তো স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে, আমি যে কমিউনিকেট করতে চাইছি, সেটা করতে না পেরে কষ্ট পাচ্ছি এটার কোনো গুরুত্বই তুমি দেবে না?

কামাল: হ্যাঁ নিশ্চয়ই দেবো। ওই সংকটই তো অস্তিত্বের সংকট। যেখানেই অস্তিত্ব সেখানেই যন্ত্রণা, এ আর নতুন কথা কি? আমরা যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য জন্মাই এবং আজীবন যন্ত্রণা ভোগ করি…

মাহমুদুল হক: খুব একটা মিথ্যে বলো নি। আর এই যন্ত্রণা শিল্পীদের ভাগে একটু বেশিই পড়ে। কারণ তারা স্পর্শকাতর, কোমল, অনুভূতিপ্রবণ — খুব অল্পতেই তারা বেদনাহত হন। প্রকৃতির নির্বাচিত মানুষ তারা, বিশেষ সন্তান — হয়তো সেটিও যন্ত্রণাভোগের একটি কারণ। ‘নির্বাচিত’ আর ‘বিশেষ’দের যন্ত্রণাও তো বেশিই হয়! আর এজন্যই আমি বিশ্বাস করি — এমন বিশেষভাবে নির্বাচিত মানুষদের লোভ থাকতে নেই; ভণ্ডামি আর অসততা থেকে দূরে থাকাই তাদের দ্বায়িত্ব।

কামাল: এই যে একটু আগে আপনি বললেন ‘লেখার সময় আমরা অন্য কারো করতলে থাকি’ — তাকে আবার সরাসরি ঈশ্বর বলে স্বীকার করলেন না। এই ব্যাপারটি কি একটু ব্যাখ্যা করবেন?

মাহমুদুল হক: এটা ব্যাখ্যা করা কঠিন। আমি যেভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করি, সেভাবে হয়তো ব্যাখ্যা করতে পারবোও না। আসলে ঈশ্বরের সর্বজনস্বীকৃত কোনো ইন্টারপ্রিটেশন তো আজও তৈরি হয় নি, মানুষ তাকে কল্পনা করে নেয়। সবার কল্পনা যেহেতু একরকম নয়, একেকজনের ঈশ্বরও তাই একেকরকম। এজন্য ঈশ্বর সম্বন্ধে কোনো ধারণার কথা বলা বিপদজনক। ধর্মগ্রন্থে ঈশ্বরের ধারণা খুব পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায় না, যেটা পাওয়া যায় সেটা বেশ বিভ্রান্তিপূর্ণ। ঈশ্বর যে তাঁর সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত আমি এ কথা বিশ্বাস করি, কারণ তাঁর কোনো রূপ নেই, তাঁর কোনো বাসস্থানও নেই। ঈশ্বর আকাশে বাস করেন এ কথা নিশ্চয়ই কেউ বলবে না! সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তিনি যেমন প্রকাশ করেন নিজেকে, তেমনি বসবাসও করেন সৃষ্টির মধ্যেই। তাই যদি হয়, তাহলে, মানুষের মধ্যে দিয়েও তিনি প্রকাশিত এবং বলা যেতে পারে মানুষের মধ্যে দিয়েই তিনি সর্বোত্তমরূপে প্রকাশ করেন নিজেকে এবং বাস করেন মানুষের মধ্যেই। এবং সেক্ষেত্রে তাঁকে মানুষের সমস্ত যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়, হয়েছে। মানুষের রোগ-শোক-দুঃখ-কষ্ট-হাসি-কান্না-সুখ-যন্ত্রণা এমনকি মৃত্যুর স্বাদও তাকে গ্রহণ করতে হয়েছে। যে মানুষের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেছেন, সেই মানুষের মৃত্যুতে কি তাঁরও মৃত্যু ঘটে যায় নি? এভাবে বহুবার তাঁকে জন্ম এবং মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হয়েছে। আমার কাছে ঈশ্বরের ধারণাটি এমনই — তাকেও সমস্ত মানবিক অনুভূতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়!

তথ্যসূত্র

১. মাহমুদুল হকের গল্প ও উপন্যাস নিয়ে আমার প্রবন্ধের লিংক:
ক. মাহমুদুল হক : দিব্যকান্তি সম্পর্কের কথক
খ. মাহমুদুল হকের গল্প: অনন্য অবলোকন

amkamal_bd@yahoo.com

—-

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (3) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পুতুল — আগস্ট ২, ২০০৮ @ ৮:২৭ পূর্বাহ্ন

      আমার কাছে লেখাটি খুব দীর্ঘ মনে হল না! বরং কেমন যেন একটু সংক্ষেপিত লাগল। সামহোয়ারইনব্লগে ঘটনাক্রমে লিংকটি না দেখলে এমন একটা লেখা থেকে বঞ্চিত থাকতাম!
      ধন্যবাদ আপনাকে।

      ভবে মানুষ রতন
      কর তারে যতন!

      পুতুল

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Bithee — আগস্ট ১৩, ২০০৮ @ ১:২৮ পূর্বাহ্ন

      সাক্ষাৎকারটি পড়ে এত ভালো যে কী বলব — আমার পক্ষে বোঝানো সম্ভব নয়। এমন একজন লেখকের একটি বইও আজ পর্যন্ত পড়িনি বলে খুবই লজ্জিত বোধ করছি। দেশে ফিরে মাহমুদুল হকের বই অবশ্যই পড়ব ঠিক করেছি।

      – Bithee

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com