কবিতা

তারিক সুজাতের কবিতা: বসন্তের বাতাসটুকুর মতো

তারিক সুজাত | 10 Apr , 2018  

১.
যে বাতাসে সুরের রঙ
সে সুরে অনাবিল
আনন্দের স্রোত …

২.
যাওয়া-আসার মাঝে
যেটুকু স্নিগ্ধ রূপ
সেই অপরূপে
ছুঁয়েছি আঙুল
বেঁধেছি বীণা
জীবনের মন্ত্রে বাঁধি
সুদূরের সুর …

৩.
কে বলে তুমি নেই
সুরের অক্ষরে তুমি আঁকা
তোমাকে বেঁধেছি শব্দ-বন্ধনে
সুরের আকাশে
দলছুট মেঘগুলো দিশেহারা
আদি-অন্ত তোমাতেই প্রকাশিত …

৪.
যেখানেই থাকো
যে সুরেই বাঁধো
অক্ষরগুলো
কোমল তোমার স্পর্শে
পাতা হয়ে ঝরি
হৃদয়ে– ঘাসে ঘাসে,
যত দূরেই থাকি
ঝরাপাতাদের মতো
‘আমি তোমারই দলে’

৫.
যে আছে অন্তরে
তাকে কোথায় খোঁজো?
সুরে সুরে
বেঁধেছি যে ঘর
আলোর অক্ষরে আঁকি
ঝিলমিল জানালা,
আঁখিপল্লবে আনন্দাশ্রু মুছে
আকাশে আকাশে
ডানা মেলে ওড়ো– সারাবেলা!

৬.
মনে মনে আনমনে
তোমাকে লিখি,
সুরে সুরে পড়ি তোমার আকাশ
তুমি আকাশের নীলে আলোর আল্পনা
ধু ধু বালুকাবেলায় তৃষ্ণার জল
যত গভীরেই যাই মুক্ত হই,
সুরের লহরী শূন্যতাকে বুনে
স্বপ্নলোকের নকশি পাখায় …
তোমাকে লিখি
সুরের অক্ষরে
তুমিই আমার শিল্পের শিলালিপি!

৭.
বসন্ত-বাতাস হয়ে এসেছিলে
একটি অক্ষর–
রৌদ্রের সুবাস থেকে
তোমার ঠিকানা পেলো,
কোন বনে গুন গুন সুরে
ঘুরে বেড়াও;
এসেছো সবুজে–
আমার ডাকঘর তুমি
যখন খুশি
তোমাকে লিখি …

৮.
কেন যে ভাসালে
সুরের-সাম্পানে
থই থই পাহাড়ি নদী
সুরে সুরে ঘুরে ঘুরে
আঁচলের মতো বয়ে যায় …
বিরহীর-বিহ্বলতা
শিল্পের শিখায় পুড়ে
সোনাঝরা দিনে নাকফুল গড়ে;
তুমি ডাকঘর, তুমিই বনমালী
জন্মে জন্মে দিনমান
তোমাকে সাজাবো
আলোর অক্ষরে …

৯.
হৃদয়ে হৃদয় গাঁথি
সুরের আলোয় ওড়ে
রঙধনু,
বর্ণে বর্ণে সুরে সুরে
সিঁথির সিঁদুর ওড়ে
জীবনের রেণু
খুলে দেয় নবজীবনের পথ,
এসো পথিক
শিল্পের নির্জনে
একসাথে হাঁটি …

১০.
সুর থেকে জন্ম নিয়ে
সুরেই মিলাই
এই অক্ষরগুলো
এই ছন্দের নদী
সুরের সাগরে মিশে,
যেন জন্ম জন্ম চিনি
তার চিবুকের কাছে
চিক চিক রোদে
আনখ সমর্পণ …
মাঝি নেই পারাপার নেই
যা কিছু সঞ্চয় ছিলো
সবটুকু নিয়ে এসেছি
— সুরের সমুদ্র!

১১.
সুর–
তুমি স্বপ্নলোকের চাবি,
চাইলেই তুমি খুলে দিতে পারো
অমল অক্ষরে আঁকা
তোমারই ছন্দ-নদী!

১২.
ভয় পেয়ো না!
ঝড় হয়ে আসবো না
পেছনে আমার ঝড়
সম্মুখে তৃণলতা,
তারার ভাষা এনেছে এই বাণী
স্বর্গ-মর্ত্যে প্রিয় সেই মুখখানি;
তোমার ঠিকানা
বসন্তের বাতাসটুকুর মতো
হৃদয়-গভীরে তোলে
সুরের প্রতিধ্বনি …

১৩.
আমি যখন দাঁড়িয়ে ছিলাম
সিঁথির মতো আলটি আমার পায়ে
বাড়িয়ে দিলো পথ …
মাঠের মাঝে
একজনই ছিলো জানি
হৃদয়ে যে বেঁধেছিলো সুর …

১৪.
যে জীবন পূর্ণ আলোয়
আঁধারের অধরে
গাঢ় শূন্যতায়
নক্ষত্রের দীপ্ত শিখাসম
দুঃখের তিমিরে জ্বলে থাকে
অক্ষয়-অক্ষরে ধরাময়
জীবনের জয়গান …
পূর্ণ হই তোমার আলোয়
তোমার অন্ধকারেও
নির্ভয়ে আমি পথ হাঁটি …

১৫.
তোমার মুক্তি
সু রে
আমি প্রকাশিত
অ ক্ষ রে
একে অপরকে চিনি
নির্জনে নিরবতায়
বসন্ত-বাতাসের হাত ধরে
কোন্ বনে বনে ঘুরে
খুঁজবো তোমার ঠিকানা?

১৬.
তুমি প্রকাশিত হও
এই অক্ষরের হাত ধরো,
সুরের সাহসে জাগি
অক্ষরে অক্ষর ঘষে
হৃদয়ে আগুন জ্বালি …
আদিম পৃথিবী
হেঁটেছে অনেক পথ
এসো আগামীর পথে
আমরা দু’জনে হাঁটি …

১৭.
ক্লান্ত পান্থ শোনো
আমি বুঝি সেই,
যাকে ইশারায় ডাকে
খুঁজেছো নিরবে এতোকাল!

আমার অনলে
ঢেলেছো সুরের নদী
আমি ভুল করে
ভেঙেছি তোমার ঘুম
হে পবিত্র, হে পরাহত
তোমার কাছে
বারবার পরাজিত হই …

১৮.
তুমি জানালে না
তোমার ঠিকানা
তারপরও এসে গেছি
তোমার দুয়ারে …
সুরের অক্ষরে
তবু এঁকে রেখো
আলোর আল্পনা

১৯.
ফিরেছি পথের টানে
আমার সঙ্গে
ফিরেছে নবীন মেঘ
তার ছায়াতেই
সুরের আসন পাতি।
আমার কণ্ঠে;
লগ্ন তোমার বাহু
আকাশের ঘন নীলে …
বাতাসে বাতাসে
বেঁধেছি তোমার গ্রীবা!

২০.
সে এসেছে,
এসেছে ফুলে ফুলে
অথৈ আলোয়
আগুন রঙ ফাগুনের পথ
খুলেছে দুয়ার
সুরে সুরে
সাজানো এ-ঘর
হৃদয়-অক্ষরে আঁকা
আঁকি সুর, সুরের অক্ষর
সুরের সুবাসে জড়িয়ে থাকি
এসো সুর
তোমার জন্য বনে বনে
লিখেছি ফাল্গুন!

২১.
যে অজানাতে
এসেছি,
থেমে গেছে নদী
পথের প্রভাতে;
পথেরও প্রহর থাকে
প্রহরান্তে পাশ ফেরে রোদ,
তুমি আমি নিরবধি
আমাদের পদধ্বনি
কালের যাত্রায় স্রোতের অক্ষরে লেখা …
নদীর নামতা শিখি
সাত বাও মেলে
তবু যে নদী পথেই শেষ
তার দেখা মেলে না …
আমার সঙ্গে এনেছি একটি নদী
সুরের মোহনায় গ্রহণ করো যদি!

২২.
সুর
মানে কি?
এমন অরূপ ধ্বনি
যার বুকে নেই কোনো
অক্ষর

২৩.
একটি জীবন
ঘুমিয়ে কাটে
মায়ের কণ্ঠে
সুরে-স্রোতে …
আরও যদি
জীবন থাকে
যেন এই
মায়েরই
সুরে জাগি

২৪.
এই ছিলো নিবেদন
একটি সবুজ পাতা
চোখ খুলে দেখেছিলো
আলো থই থই সুরের আকাশ
খোলা প্রান্তরে
বৃক্ষের অন্তরে
মাটির গভীর থেকে
প্রাণের স্পন্দন নিয়ে জাগি
শিল্পের শিকড়ে
এসো ডানা মেলে উড়ি…

২৫.
চিরদিনের একদিন,
একদিন চিরদিনের…
স্বর্গের সিঁড়ির
শেষ ধাপে
বন্দি-আলিঙ্গণে!
ডাকঘর–
তোমার প্রসন্ন বুকে
আমি বিলি না হওয়া
আহত একটি চিঠি,
অনুচ্চারিত আমার কথা
অক্ষরের হাহাকারগুলো
পড়ো তুমি!

২৬.
আমার জন্য
তৈরী ছিলো পথÑ
আসবে আকাশ নদী
ছোট্ট পাখি
রঙিন একটি মাছ
এরাও আমার সাথী…

তুমি দুয়ার খুলে রেখো!

২৭.
যাওয়া নেই
বার বার ফিরে ফিরে
আসি,
স্মৃতি থেকে ফিরি
স্বপ্নের সবুজে বৃষ্টি বুনি
মেঘে মেঘে ভেসে থাকে
আমার আসার চিহ্ন…
সে কোন অতীত থেকে এসে
মিশে যাই আগামীতে;
আমি
ভবিষ্যত থেকে ফিরি
সুরের শৈশবে
আমাকে গ্রহণ করো
প্রস্থানে, আগমনে…
চৈত্রের ঠোঁটে ঠোঁট রেখে
জেগে থাকি,
মহাকালের স্রোতে
সুর-অক্ষরের ভেলা ভাসে…

২৮.
খুলেছি কপাট
রোদ ঝলমল উদার আকাশ
পাখির ডানার ছন্দে
এঁকেছি অচিন পথ
মেঘেদের বাড়ি;
এ নীল নির্জনে
সুরে সুরে আনো সরবতা…

Flag Counter


3 Responses

  1. Asad Mannan says:

    কবি তারিক সুজাতের” বসন্তের বাতাসটুকুর মতো” দীর্ঘ কবিতাটি পড়ার সুয়োগ হলো। ধন্যবাদ কবিকে এবং বিডিনিউজ২৪. কমকে। কবিতাটি কবির কণ্ঠে প্রথম শোনার পর মনে হয়েছিল, আরে এ দেখছি অন্য এক রাবিন্দ্রিক উচ্চারণ। এখন পাঠ করে মনে হলো আমার প্রথম শ্রুতি প্রতিক্রিয়া অমূলক নয়। ভাব ও ভাবনাকে নির্ভার করে হাওয়ায় উড়িয়ে দেয়ার এ অসামান্য কৌশল সব কবির জানা নেই। এর জন্য মেধা ও শ্রম এবং সহজাত কবি প্রতিভার প্রয়োজন। তারিক তার প্রমাণ রেখেছেন। পুরাতনকে নবায়নের মধ্যে এক ধরনের আধুনিকতা রয়েছে, যা চিরকালীন। বার বার পড়েও এ কবিতার স্বাদ ও রস শেষ করা যাবে না। অভিনন্দন প্রিয় কবি তারিক সুজাত।

  2. লিয়াকত খান নিমু says:

    কবি তারিক সুজাত-কে ধন্যবাদ। চমতকার কবিতাখন্ডগুলো আমার মনে আলোড়ন তুলেছে বসন্তের বাতাসটুকুর মতই।… ছুঁয়ে গেল, নুয়ে গেল, ফুল ফুটিয়ে গেল শত শত…মনটা কবিতায় নিমগ্ন হয়েছিল বেশ।

  3. hassan says:

    kobita dik buji na.. porte valo lagle pori…. he is very much successful …23 and 27 is simply brilliant. best wishes.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.