ব্যক্ত ও অব্যক্ত মাহমুদুল হক

মফিদুল হক | ২৭ জুলাই ২০০৮ ১:৩৩ অপরাহ্ন

এখন, মাহমুদুল হক চলে যাওয়ার পর, হঠাৎ সচকিত সমাজে তাঁকে নিয়ে নানা আলোচনার ঢল নামছে পত্র-পত্রিকায়। প্রতিষ্ঠিত পত্রিকা ও প্রতিষ্ঠিত আলোচকরা এক্ষেত্রে কিছুটা যেন অপ্রস্তুতিতে m-haque.jpg রয়েছেন, কেননা মাহমুদুল হক যে তাদের লেখক ছিলেন না সেটা তারা ঠিক বোঝেন, সে-কথাটা না-বলে তাঁর স্মৃতিতর্পণ কীভাবে করা যাবে সেটা তাদের জন্য জটিল প্রশ্ন। কিন্তু সেইসব বহুল কাঙ্ক্ষিত প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির কোনো পরোয়া মাহমুদুল হক কখনো করেন নি, আর তাই এটাও আমরা লক্ষ্য করি এবং দেখে প্রাণিত হই যে, মাহমুদুল হককে পুনর্বিচারের যে তাগিদ কিছুটা হলেও এখন আবার জেগে উঠছে সেখানে তাৎপর্যময় মূল্যায়ন সম্ভব হচ্ছে তাদের দ্বারা যারা তরুণ লেখক, সাহিত্যচর্চাকে জীবনের ব্রত হিসেবে মান্য করেন এবং কঠিন পথ বেয়ে চলার রক্তাক্ত সাধনায় যারা পিছ-পা নন। এইসব তরুণেরা তাদের সাহিত্যরুচি ও শিল্পদৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে মাহমুদুল হকের সহায়তা পেয়েছেন, তাঁর লেখার মধ্যে শিল্পপথের নিশানা দেখতে পেয়েছেন এবং এখন সবটুকু আন্তরিকতা ও আবেগ মিলিয়ে এই মহান কথাশিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনে এগিয়ে এসেছেন। তাদের লেখালেখিতে মাহমুদুল হকের সজীব প্রাণময় উপস্থিতি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল আজকের এই প্রজন্মের, সাহিত্যব্রতী এই তরুণ কথাশিল্পীদের, বড় দুর্ভাগ্য তাদের গড়ে-ওঠার সময়টিতে মাহমুদুল হক সবার মধ্যে থেকেও ছিলেন সবার থেকে দূরে। তাই অনেক চেষ্টা করেও খোলস ভেঙে মাহমুদুল হকের কাছে পৌঁছে সত্তার উত্তাপটুকু পরিপূর্ণভাবে তারা গ্রহণ করতে পারেন নি, আমাদের মতো অপ্রতিভাবানদের জন্য যে-উত্তাপ ও আনুকূল্য ছিল যেন প্রকৃতির আশীর্বাদ এবং তাঁর সান্নিধ্যে জীবনের পাঠ গ্রহণ করে নিজেদের যেভাবে সমৃদ্ধ করতে পেরেছি, বিপুল আগ্রহ সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজন্মের তরুণেরা সেভাবে তাঁকে দেখা, জানা ও পাওয়া থেকে বঞ্চিত রইলো। নবীন লেখকদের মধ্যে কেউ কেউ আকুল হয়ে ছুটে গেছেন মাহমুদুল হকের কাছে, তাদের মধ্যে কোনো কোনো ভাগ্যবান তরুণ মাহমুদুল হকের দেখা পেয়েছেন, তাঁর আড্ডার মেজাজ, তাঁর অসাধারণ কথকতার আমেজ কিছুটা অনুভব করতে পেরেছেন এবং যেটুকু তারা জানতে পেরেছেন মাহমুদুল হককে তাতে বিস্ময় ও মুগ্ধতার সীমা ছিল না। তাদের শ্রদ্ধা তর্পণে মাহমুদুল হকের ছবি ফুটে ওঠে বটে, কিন্তু সেটা তো চাঁদের আরেক পিঠ, অন্য যে পিঠটি ইতোমধ্যে চলে গিয়েছিল আড়ালে, সেই মাহমুদুল হকের পরিচয় কে দেবে! যাঁরা দিতে পারতেন তাঁদের অনেকে বিদায় নিয়েছেন আগেই, আহসান হাবীব সস্নেহে বরণ করেছিলেন তাঁকে, শামসুর রাহমান ছিলেন অনেক দীর্ঘদিনের সাথী, মীজানুর রহমান জড়িয়ে ছিলেন লতায়-পাতায়, প্রিয়সখা নিজামউদ্দিন ইউসুফও আর নেই, পশ্চিমবাংলার হৃদয়ের বান্ধব হয়ে উঠেছিলেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, যতো মাখামাখিই হউক সুনীলের সঙ্গে তিনি মাহমুদুল হককে পুরোপুরি বুঝে-ওঠার পাত্র ছিলেন না। এমনি তালিকার দিকে যখন তাকাই তখন মনে হয় আমরা যারা তাঁর অযাচিত স্নেহ-ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছি তাদের দিক থেকে প্রতিকৃতি রচনার চেষ্টা নেয়া উচিত, তা সে-প্রয়াস যতো অক্ষমই হোক না কেন। সেটা আরো বেশি দরকার এজন্য যে, অধুনা তরুণ সাহিত্যব্রতীরা যে মাহমুদুল হককে সামান্যভাবে হলেও দেখেছেন ও পেয়েছেন তারা মাহমুদুল হকের পূর্বতন রূপের সঙ্গে সেই পরিচয়টুকু অন্তত মিলিয়ে নিতে পারবেন। আর এই পূর্বাপর মিলিয়েই তো আমরা পেতে পারি কিছুটা পূর্ণাঙ্গ মাহমুদুল হককে। বর্তমান নিবন্ধ তাই মাহমুদুল হকের কোনো সম্পূর্ণ প্রতিকৃতি দাঁড় করাবার প্রয়াস নয়, এ-কেবল কিছু তথ্যের যোগান দেয়ার চেষ্টা, সাম্প্রতিক মাহমুদুল হকের বিপরীতে সাবেক মাহমুদুল হককে দাঁড় করাবার অভিপ্রায়ে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে লেখক হিসেবে মাহমুদুল হকের রাজসিক আবির্ভাব ঘটে, দুটি বই তাঁর ললাটে সাহিত্যিকের জয়তিলক এঁকে দেয়, যেখানে খঞ্জনা পাখী এবং নিরাপদ তন্দ্রা। বই দুটো অনেকটা ব্যক্তিগতভাবে বন্ধুমহলের উদ্যোগে প্রকাশিত হয়, লেখকেরও ছিল এতে সম্পৃক্তি। যেখানে খঞ্জনা পাখী, এই বানানই অনুসৃত হয়েছিল, গ্রন্থের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন, লেখকের ইচ্ছায়, স্থপতি-বন্ধু রবিউল হুসাইন। প্রচ্ছদে সুষমার সঙ্গে যান্ত্রিকতার এক ধরনের সমন্বয় বা সমন্বয়হীনতার ছাপ ছিল, লেখকেরও ছিল এমনি অভিপ্রায়। নিরাপদ তন্দ্রা বইয়ের প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন পূর্ণেন্দু পত্রী, ভাবী হোসনে আরা মাহমুদ কলকাতা গিয়ে শিল্পীকে দিয়ে কাজটি করিয়ে এনেছিলেন, এবং ছোট্ট যে গ্রন্থ-পরিচিতি লিখে দিয়েছিলেন লেখক সেটার ভিত্তিতে অসাধারণ এক প্রচ্ছদ সৃজিত হয়েছিল পূর্ণেন্দু পত্রীর তুলিতে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবাংলার প্রকাশনায় পূর্ণেন্দু পত্রী তখন নতুন ঘরানা তৈরি করছেন, ভারবির বিভিন্ন প্রকাশনায়, ষাটের শেষাশেষি, পূর্ণেন্দু পত্রী যে অসাধারণ কুশলতা ও ভিন্নতার ছাপ রাখেন সেটাই হয়তো লেখককে আকৃষ্ট করে থাকবে প্রচ্ছদের জন্য এই শিল্পীর শরণ নেয়ার। এরপর বিচিত্রা ঈদ সংখ্যায় জীবন আমার বোন প্রকাশিত হয়ে বিপুল সাড়া জাগায় এবং প্রকাশনার দায়িত্ব বর্তায় আমার ওপর। এক্ষেত্রে সুবিধার দিক ছিল প্রকাশনার সঙ্গে বটু ভাইয়ের নিবিড় সম্পৃক্তি এবং এটা আমার জন্য বিশেষ শঙ্কারও কারণ ছিল, কারণ তাঁর প্রখর রুচিবোধ সম্পর্কে আমি জানতাম। বই কম্পোজ হয়েছিল ১৪ পয়েন্ট পাইকা হরফে, তখন ঝকঝকে মনোটাইপ ছিল আধুনিকতার প্রতীক, যারা আরো কিছু অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্য রাখেন তাদের জন্য ছিল লাইনো টাইপ। অবশ্য লাইনো টাইপে কাজ করার সুযোগ ঢাকায় বিশেষ ছিল না, সদ্য-প্রতিষ্ঠিত বাংলা একাডেমী প্রেস এবং নবাবপুরের আলেকজান্দ্রিয়া প্রেস ছিল লাইনোর জন্য সবেধন নীলমণি দুই প্রতিষ্ঠান। তবে বটু ভাইয়ের পছন্দ ছিল ঐতিহ্যবাহী পাইকা হরফ, মনো কিংবা লাইনো টাইপে যুক্তাক্ষর যে অভিনব আকার নেয়, টাইপের সেই ধাতব কাঠিন্য বটু ভাইয়ের পছন্দ ছিল না, তাঁর মনঃপুত পাইকার সারল্য, চোখের জন্যও যা খুব আরামপ্রদ। প্রচ্ছদের জন্য তিনি নবীন কোনো শিল্পীর ওপর নির্ভর করতে চাইছিলেন, উঠতি শিল্পীদের একজন, বন্ধুবর কাজী হাসান হাবিবকে বেছে নেয়া হলো এবং হাবিবের সাহিত্যরুচিও বটু ভাইয়ের পছন্দের কারণ হয়েছিল। প্রচ্ছদে কোন্ ব্যঞ্জনা তিনি দেখতে চান সে-বিষয়ে হাবিবকে নানাভাবে আলোকিত করলেন তিনি, খসড়া অনেক নকশা করেন হাবিব, কোনোটাই বটু ভাইয়ের পছন্দ হয় না। শেষে তাঁরই পরামর্শে উপন্যাসের প্রচ্ছদে নারী বা পুরুষের মুখ পরিহার করে নিছক লেটারিং-এর ওপর দুই-রঙা প্রচ্ছদ করে দিলেন হাবিব, নানা হিজিবিজি রেখার মধ্য দিয়ে জীবনের জটিলতার ভাব ফুটিয়ে তুলেছিলেন শিল্পী। পেছনের প্রচ্ছদে লেখকের ছবি যাবে, ধবধবে পাঞ্জাবি পরা লেখকের নানা-ভঙ্গির ছবিও তোলা হলো; কিন্তু ছবি খুব প্রকাশ্য করে তুলতে আগ্রহী নন মাহমুদুল হক। অবশেষে শিল্পী আবদুল মুকতাদির-এর পরামর্শে ব্লিচ করা একটা ছবি পেছনের প্রচ্ছদের প্রায় সবটুকু জুড়ে ছাপা হলো। ছবির নিচে অল্প যেটুকু পরিসর ছিল সেখানে ছাপার জন্য সংক্ষেপে গ্রন্থ-পরিচিতি লিখে দিলেন কবি শামসুর রাহমান। এসব কথা বলা হলো এটুকু বোঝাতে যে, প্রখর রুচিবোধের অধিকারী ছিলেন মাহমুদুল হক, ছিলেন খুঁতখুঁতে এবং বই প্রকাশের সবকটি ধাপ সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত কেবল নন, সেখানে রুচি ও বৈদগ্ধের পরিচয় ফুটিয়ে তুলতেও সমর্থ এবং প্রকাশনার সঙ্গে থাকেন নিবিড়ভাবে যুক্ত।

প্রবলভাবে জীবনবাদী মানুষটির আগ্রহ ও উৎসাহের ক্ষেত্র ছিল বিচিত্র, জীবনাভিজ্ঞতাও বিপুল, তাঁর পঠন-পাঠনের অবলম্বনও ছিল নানান বিষয়। ভ্রমণকথা যেমন ছিল তাঁর প্রিয়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে এ-ক্ষেত্রে তাঁর মিল অনেক, চাঁদের পাহাড় ছিল আরেক প্রিয় বই, তাঁর ঘরে থরে থরে সাজানো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক একই আগ্রহের পরিচয় বহন করে। সেই সাথে তিনি ছিলেন ব্ল্যাক ম্যাজিকে আগ্রহী, যে-আগ্রহ ক্রমে অতীন্দ্রীয়বাদে সমর্পণের দিকে তাঁকে ঠেলে নিয়ে যায় এবং তিনি, এমন কি, জন্মান্তরবাদেও আস্থাশীল হয়ে ওঠেন। ফেমি ফ্যাটালে নারীদের রূপ বর্ণনা করতেন যখন তিনি শ্রোতার জন্য সে-ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। মাহমুদুল হক পোকা-মাকড় কীট-পতঙ্গের জীবন বিষয়েও ছিলেন সমভাবে আগ্রহী, পিপীলিকার জীবনযাপন বিষয়ে বই আমি তাঁর কাছেই প্রথম দেখি, মৌমাছিদের সামাজিক জীবন সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা তাঁর ছিল। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ছিল মানব ও জীবন সম্পর্কে তাঁর অপার আগ্রহ ও নিরন্তর অনুসন্ধিৎসা।

যে মাহমুদুল হকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তিনি খাপ-খোলা তরবারির মতো ঝকঝকে পুরুষ, গায়ের রঙ উজ্জ্বল গৌর, ভরাট চোখে কৌতুকময়তা নিয়ে যখন চোখে চোখ রাখেন নিজেকে মনে হয় সৌভাগ্যবান, আর যখন আলাপচারিতায় মগ্ন হন, তাঁর শব্দচয়ন, তাঁর বাচনভঙ্গি, তার পরিশীলিত কথন সব মিলিয়ে জাদুর মায়াজালে বাঁধা পড়তে হয়, সময় যে তখন কোথা দিয়ে উবে যায় কিছু বোঝা যায় না। সবচেয়ে তাৎপর্যময় যে দিকটি তখন আমরা কিছুই বুঝি নি, এখন ফিরে তাকিয়ে ভালোই বুঝতে পারছি, আড্ডা-গল্পে, এমন কি সাহিত্যালোচনাতেও, তিনি নিজেকে মেলে ধরেছেন ঠিকই; কিন্তু কখনোই বুঝতে দেন নি অনেক গভীর থেকে উচ্চারিত হচ্ছে তাঁর কথাগুলো। কমলকুমার মজুমদারের একান্ত অনুরক্ত ছিলেন তিনি, টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্ন বাক্য বা বর্ণনা বিশ্লেষণ করে কমলকুমারের মাহাত্ম্য মেলে ধরছেন, কিন্তু সে-একান্তই রসের বিচার এবং রসময়তায় আমরা ভাসতে থাকি, বুঝতে পারি না এ-এক গভীরতর সাহিত্যবিচারও বটে। এভাবেই বটু ভাই আমাদের সাহিত্যবোধ প্রসারিত করেছেন, শিল্পের গভীরে প্রবেশের নানা অবলম্বন যুগিয়েছেন; কিন্তু কখনো বুঝতে পারিনি তাঁর কাছ থেকে নিচ্ছি নন্দনশাস্ত্রের পাঠ।

নিজের লেখালেখি নিয়েও চলেছে একই খেলা। সবকিছুকে হাসি-ঠাট্টার মোড়কে ঢেকে ফেলছেন, বুঝতেই দিতে চান না তাঁর গভীর চিন্তা-প্রসূত শিল্পমাত্রা। যখন একসঙ্গে ঘুরছি, গিয়েছি ঢাকার বাইরে নানা জায়গায়, হাসি-গল্পে সবাইকে মাতিয়ে রাখছেন, নিজে যে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন চারপাশ, মানুষের মুখের ভাষার উন্মুখ শ্রোতা হয়ে আছেন তা একেবারেই টের পেতে দিতেন না। এমন কি পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজ বের করে মাঝে-মধ্যে চুপিসারে নোট নিতেন, জিজ্ঞাসা করলে প্রবল হাসিতে ফেটে পড়তেন, বুঝলেন না, লেখক হওয়ার কৌশল, ঝাড়ন্তিফাই করে দেয়ার মশলা জোগাড় করছি। সেই হাসিতে আমরাও সংক্রমিত হতাম, ভাষা নিয়ে তাঁর সর্বসময়ের সর্বব্যাপী সাধনার কিছুই চোখে দেখতে পেতাম না।

দেখতে যে পেতাম না তার আরেক কারণ বটু ভাইয়ের রুচি ও আভিজাত্যে মোড়ানো জীবনের অসাধারণ বর্ণচ্ছটা। তিনি কাজ করেন পারিবারিক ব্যবসার অংশীদার হিসেবে বায়তুল মোকাররমের ‘তাসমেন জুয়েলার্স’-এ। ঝলমলে দোকানে উজ্জ্বলতর উপস্থিতি তাঁর, সবসময়ে পরেন একেবারে ধোপদুরস্ত সাদা পাঞ্জাবি ও পাজামা। পায়ে কখনো বিদ্যাসাগরী চটি, কখনো-বা অন্য কোনো বাহারি চপ্পল। শীতকালে কাঁধে আলতোভাবে ফেলে রাখেন কারুকার্যময় আলোয়ান, সে-সবেরও নানা বাহার, হাতে ফাইভ ফাইভের প্যাকেট, ঢাকায় তখনও এমন সার্বজনীন হয়ে ওঠে নি বিদেশী সিগারেট। দোকানে ঢুকে আমরা ডেকে আনি বটু ভাইকে, কখনো-বা দেখি পেছনের ছোট ঘরে বসে চোখে ম্যাগনিফাইয়িং গ্লাসের ঠুলি আটকে তিনি পাথরের ভালো-মন্দ পরখ করছেন। ইশারায় আমাদের অপেক্ষা করতে বলে কিছুক্ষণ পর নিজেই বেরিয়ে আসেন। তারপর সময় কোথা দিয়ে পার হয়ে যায় কে জানে।

আর যখন যাই বটু ভাইয়ের বাসায় স্বামী-স্ত্রী মিলে যে আপ্যায়ন চলে তাঁর তুলনীয় আর কিছু ঢাকা শহরে ছিল না। ভাবী জানেন রন্ধনের বিচিত্র বিদ্যা এবং বটু ভাইয়ের পরিবেশনায় আভিজাত্যের পরম সৌন্দর্য, কোন্ পাত্রে কোন খাবার কীভাবে পরিবেশিত হবে তার মধ্যেও ছিল আহারের সংস্কৃতির পরিচয় ও রুচিবোধ, কাপড়ের ন্যাপকিনে সুতোর কারুকাজ, তার ভাঁজের মধ্যেও যত্নের ছাপ, অতিথিকে তুষ্ট করতে সবরকম আয়োজনে এই দম্পতির অশেষ তৃপ্তি। যাকে বলে গ্যাস্ট্রোনম, রন্ধনের বিচিত্র বিদ্যা, তাতেও বটু ভাই ছিলেন কুশলী। তাঁর বাড়িতে আরো আছে আদরের পোষা কুকুর, আছে গুচ্ছের বিড়াল এবং কয়েকটি খরগোশ। সবচেয়ে অবাক কাণ্ড বিশাল বন্ধুবৃত্তকে সবসময়ে সাদরে আপ্যায়ন করে চলেছেন বটু ভাই ও ভাবী। পানের আসরের বন্ধুরাই যে সব তা নয়, এই গৃহে সবার সমান প্রবেশাধিকার। আছেন নানান ধরনের ঘনিষ্ঠজন। সুলতান যখন ঢাকায় আসেন বটু ভাইয়ের বাসা হয়ে ওঠে তুলকালাম কাণ্ডের কেন্দ্র। ওয়াহিদুল ভাই হয়তো চট্টগ্রামের আবুল মোমেন ও শীলা মোমেনসহ তাঁর অনুগতবাহিনী নিয়ে যাবেন কোথাও সফরে, তার আগে আহার সেরে নিতে সদলে হাজির হন বটুগৃহে, জানেন এই এক ঘর আছে ঢাকায় যেখানে কাউকে বিমুখ হতে হয় না। কবি গং-এর আড্ডা হবে, অংশীর সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলে, বন্ধুর বন্ধুর বন্ধুও অনায়াসে এসে হাজির হয় সেই ঘরে।

এই মানুষটি ভেতরে ভেতরে ক্রমেই কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠছিলেন, ছোট হয়ে আসছিল তাঁর ভালো লাগার বৃত্ত, লেখালেখিতে পূর্বের মতো উৎসাহ পান না, যে বটু ভাই ছিলেন শামসুর রাহমানের পঞ্চাশতম জন্মোৎসব পালনের উদ্যোক্তাদের অন্যতম, পদাবলীর কবিতা পাঠ আয়োজনের সোৎসাহী সংগঠক, তিনি যৌথ কাজে আর কোনো সার্থকতা খুঁজে পান না, ব্যবসায়ে তাঁর যে কেন্দ্রিক ভূমিকা সেখানে যেতেও কেমন যেন অনীহা, একদিন যান তো চারদিন লা-পাত্তা, ঠিক লাপাত্তাও নয়, হয়তো ঘরেই বসে আছেন, টুকটাক নানা কাজে ব্যস্ত থাকছেন, কিন্তু পেশার কাজে তাঁর কোনো মন নেই। এসবের মধ্যেও যখনই বসে আড্ডা, পুরনো সেই মানুষটিকে আমরা ফিরে পাই, চারপাশের জীবন ও জগৎ সম্পর্কে প্রখরভাবে সচেতন, দেশ-দুনিয়ার হালফিল সব খবর তাঁর নখদর্পণে, যদিও তাল ও সুর কোথায় যেন কেটে গেছে।

এরকমই কোনো এক সময়ে, আশির দশকের শেষাশেষি কোনো সন্ধ্যায়, বটু ভাই আমাকে প্রচণ্ড গালমন্দ করেছিলেন। তাঁর স্বভাববিরুদ্ধভাবে তিনি তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে আমাকে বলেছিলেন রোবট, চাবি দিয়ে যেভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে সেই পথের বাইরে আমি ভাবতে, চলতে, ফিরতে পারি না। বলা বাহুল্য, মনে প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম, প্রথমে মৃদুভাবে প্রতিবাদ জানাবার চেষ্টা নিয়েছিলাম, তাতে কাজ হয় নি দেখে নিশ্চুপ হয়ে ভাবতে চাইছিলাম বটু ভাই আমাকে এমন কথা বলছেন কেন। কেন বলেছিলেন সেটা বুঝেছিলাম আরো কিছু পরে, নিজেকে সেই অনুযায়ী সংশোধনও করে নিয়েছিলাম এবং বিষয়টি নিয়ে আমরা পরস্পর আর কোনো কথা না বললেও একে অপরকে বুঝে নিয়েছিলাম ঠিকই।

আমার জীবন দিয়ে আমি বুঝেছি মাহমুদুল হক কথার জাদুকর বটে, তবে শব্দ ও কথা দিয়ে তাঁকে বোঝা কিংবা তাঁর সঙ্গে ভাববিনিময় হওয়ার নয়, এর জন্য আমাদের যেতে হবে শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে, কথার অতীত কথাহীনতার মধ্যে, তবেই হয়তো হদিশ করতে পারবো কী করে তিনি হয়ে উঠতে পারলেন অমন মানুষ, অমন কথাশিল্পী। তাঁর লেখালেখি বন্ধ হয়ে যাওয়া, নীরবতা অবলম্বন, তাঁর অন্তরালবর্তী জীবনসাধনা, অনেক কথা বলছে আমাদের। নাতালি সারোৎ-এর উপন্যাসের নাম ধার করে বলতে হয়, ‘শুনতে কি পাও’।

ঢাকা, ২৭/৭/৮

mofidul_hoque@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহেছান লেনিন — জুলাই ২৭, ২০০৮ @ ৩:৪৫ অপরাহ্ন

      `…তাদের লেখালেখিতে মাহমুদুল হকের সজীব প্রাণময় উপস্থিতি দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল আজকের এই প্রজন্মের, সাহিত্যব্রতী এই তরুণ কথাশিল্পীদের, বড় দুর্ভাগ্য তাদের গড়ে-ওঠার সময়টিতে মাহমুদুল হক সবার মধ্যে থেকেও ছিলেন সবার থেকে দূরে।’

      লেখক মফিদুল হক সত্যই বলেছেন — সত্যিই আমরা বঞ্চিত।

      `আমার জীবন দিয়ে আমি বুঝেছি মাহমুদুল হক কথার জাদুকর বটে, তবে শব্দ ও কথা দিয়ে তাঁকে বোঝা কিংবা তাঁর সঙ্গে ভাববিনিময় হওয়ার নয়, এর জন্য আমাদের যেতে হবে শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে, কথার অতীত কথাহীনতার মধ্যে, তবেই হয়তো হদিশ করতে পারবো কী করে তিনি হয়ে উঠতে পারলেন অমন মানুষ, অমন কথাশিল্পী। তাঁর লেখালেখি বন্ধ হয়ে যাওয়া, নীরবতা অবলম্বন, তাঁর অন্তরালবর্তী জীবনসাধনা, অনেক কথা বলছে আমাদের। নাতালি সারোৎ-এর উপন্যাসের নাম ধার করে বলতে হয়, ‘শুনতে কি পাও’।’

      মাহমুদুল হককে নিয়ে এর আগেও আর্টস পাতায় লেখা হয়েছে। তবে এই লেখাটি পড়ে তাঁর জীবনদর্শন, রুচিশীলতার পরিচয়ও পেলাম।

      লেখককে ধন্যবাদ।

      এহেছান লেনিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইমতিয়ার — জুলাই ২৭, ২০০৮ @ ৩:৫২ অপরাহ্ন

      ধন্যবাদ মফিদুল হক (মফিদুল ভাই), এই গুরুত্বপূর্ণ উপসংহার টানবার জন্যে :
      ”আমার জীবন দিয়ে আমি বুঝেছি মাহমুদুল হক কথার জাদুকর বটে, তবে শব্দ ও কথা দিয়ে তাঁকে বোঝা কিংবা তাঁর সঙ্গে ভাববিনিময় হওয়ার নয়, এর জন্য আমাদের যেতে হবে শব্দের সীমানা ছাড়িয়ে, কথার অতীত কথাহীনতার মধ্যে, তবেই হয়তো হদিশ করতে পারবো কী করে তিনি হয়ে উঠতে পারলেন অমন মানুষ, অমন কথাশিল্পী। তাঁর লেখালেখি বন্ধ হয়ে যাওয়া, নীরবতা অবলম্বন, তাঁর অন্তরালবর্তী জীবনসাধনা, অনেক কথা বলছে আমাদের। নাতালি সারোৎ-এর উপন্যাসের নাম ধার করে বলতে হয়, ‘শুনতে কি পাও’।”

      ইমতিয়ার

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন kamal raahman — জুলাই ২৭, ২০০৮ @ ৪:৪৭ অপরাহ্ন

      অনেক ধন্যবাদ, মফিদুল হক, অনেক দূরে থেকেও আমরা শুনতে পাই, পেয়েছি।

      কামাল রাহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফৌজিয়া খান — জুলাই ২৮, ২০০৮ @ ১০:১৪ পূর্বাহ্ন

      গত শুক্রবার প্রথম আলোর সাময়িকী পাতায় নাসির আলী মামুন-এর নেয়া সাক্ষাতকারটি পড়ার পর থেকেই মাথার মধ্যে তীব্রভাবে ঘুরছে কেন মাহমুদুল হক নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন? কেন? কেন?

      আপনাদের সাথে তো যোগাযোগ ছিল — জানতেন নিশ্চয়ই। তবে মাহমুদুল হক নিজেই যেহেতু নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন, এবং বেঁচে থাকাকালে মানুষকে কখোনো জানাননি কেন তিনি সবকিছু থেকে নিজেকে উইথড্র করেছিলেন — সেহেতু আমার এই কেন-র উত্তর খোঁজা বাতুলতা — আধুনিক সভ্যতার সংজ্ঞায় হয়তো অশালীন। তবুও কোন সে অদ্ভুত আঁধার ঘিরেছিল তাঁর মন-প্রাণ — বড় জানতে ইচ্ছে করে।

      ফৌজিয়া খান
      ২৮ জুলাই, ঢাকা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জিয়া হাশান — জুলাই ২৮, ২০০৮ @ ১০:২৫ পূর্বাহ্ন

      হৃদয় ছোঁয়ানো লেখা। আমাদের সত্যিই ‘বড় দুর্ভাগ্য আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টিতে মাহমুদুল হক সবার মধ্যে থেকেও ছিলেন সবার থেকে দূরে।’ ধন্যবাদ মফিদুল হক।

      জিয়া হাশান

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com