মাহমুদুল হকের অনুর পাঠশালা

খঞ্জনা পাখির কাব্য

অদিতি ফাল্গুনী | ২৩ জুলাই ২০০৮ ১০:০৩ পূর্বাহ্ন

ভাষার মগ্নতা, পেইন্টিংসের অবিশ্বাস্য সব রং আর কবিতার চিত্রকল্প নিয়ে গদ্যভাষাকে ভাঙা-গড়ার খেলাঘরে নিয়ে নিরন্তর ছাঁচ বদলের প্রচেষ্টা আমাদের এই বাংলায় যে গদ্যশিল্পী বিশেষভাবে করেছেন, সেই মাহমুদুল anur-pathshala.jpg…….
অনুর পাঠশালা / মাহমুদুল হক / রচনাকাল: জুলাই ১৯৬৭ / প্রকাশক: সাহিত্য প্রকাশ, মার্চ ১৯৯৯ (চতুর্থ সংস্করণ) / ৯১ পৃষ্ঠা / ৮০ টাকা
……..
হক গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। অনেক জল্পনা-কল্পনা হবে এখন। আহা, কেন তিনি লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন? কেন জীবনের শেষ দু/তিন দশক প্রকাশ্যে বের হননি ইত্যাদি ইত্যাদি! তাঁকে নিয়ে তাঁর সতীর্থদের অনেকেই হয়তো স্মৃতিচারণ করবেন। কিন্তু, শিল্পীদের ক্ষেত্রে যা হয়…দেহের খোলস ছেড়ে শেষপর্যন্ত নিজেদের রেখে যাওয়া সৃজনশীল কাজগুলোই তাদের চিনবার পক্ষে জরুরি স্মারক হয়ে ওঠে, এখন সময় এসেছে ‘বটু ভাই’য়ের চেয়ে মাহমুদুল হকের বইগুলোকে নিয়েই বেশি আলোচনা করার। নিরাপদ তন্দ্রা, জীবন আমার বোন, কালোবরফ, খেলাঘর, মাটির জাহাজ, প্রতিদিন একটি রুমাল, অশরীরী, পাতালপুরী (এখনো অপ্রকাশিত) এবং সর্বশেষে অনুর পাঠশালা…মোট ন’টি গ্রন্থের স্রষ্টা এই লেখক তাঁর কিছু আগের ও পরের অন্যান্য কথাশিল্পী যেমন রশীদ করিম, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা হাসান আজিজুল হকের মতো আর্থ-সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দলিল রচনার চেয়ে ভাষাশরীরে অ্যাবসার্ডিটি ও সুররিয়্যালিজম, ব্যক্তির মনোজগতের টানাপোড়েনের নিদাঘ সাইকো-অ্যানালিসিস, প্রতীকবাদ ও চেতনাপ্রবাহ রীতি দ্বারা বেশি আচ্ছন্ন ছিলেন। কিছুটা ফরাসী ঘরানার এই লিখনশৈলী তাঁর পরে আরো খানিকটা আমাদের এপারে চর্চা করেছেন সম্ভবতঃ জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।

তৃতীয় বিশ্বের কবি-লেখকদের নানা ধরনের ভাগ্য-বিড়ম্বনা থাকে। দেশের দারিদ্র্য, ঔপনিবেশিক শক্তির হাতে ভয়াবহ আর্থ-সামাজিক শোষণ প্রভৃতি প্রপঞ্চ প্রায়ই কবি-লেখকদের ‘সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য’ বা ‘দায়বদ্ধতার সাহিত্য’ রচনার দিকে ঠেলে দেয়। সুবিমল মিশ্র যে সাহিত্যকে বলেন ‘সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের অদ্বিতীয় বদ্ধ জলাশয়।’ ফলে, ‘আর্টস ফর আর্টস সেক’ ঘরানার বিশুদ্ধ শিল্পচর্চা প্রায়ই আমাদের মতো দেশে করা হয়ে ওঠে না। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকে সরে যান। যেমন, ১৯৯৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ হতে প্রকাশিত অনুষ্টুপ পূজা সংখ্যায় আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি অপ্রকাশিত গল্প ছাপা হয়েছিল যা সরলভাবে বললে ফরাসী প্রতীকবাদী ঘরানা ও ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পের ঢঙে লিখিত। কিন্তু, ইলিয়াস ইচ্ছা করেই তাঁর গদ্যভাষাকে পরে অনেক বেশি সরল ও একরৈখিক করে ফেলেন সম্ভবতঃ চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামার সুদীর্ঘ পরিসরের ক্যানভাসকে ধারণ করার ইচ্ছাতেই।

মাহমুদুল হক শিল্পের প্রশ্নে এতটুকু ছাড় দেননি। তাই তার উপন্যাস জীবন আমার বোন-এর নায়ক খোকা যেমন ১৯৭০ এর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা হতে নিজেকে সরিয়ে রাখে, মাহমুদুল হকও যেন সমসাময়িক অন্যান্য উচ্চাকাঙ্খী লেখকদের মতো দেশ-রাজনীতি-সমাজের প্রশ্নে উচ্চকিত না হয়ে (দেশ-রাজনীতি-সমাজ এসেছে; তবে অনুষঙ্গ হিসেবে, প্রধান চরিত্র হিসেবে নয়) ভাষার আপাতঃ নৈরাজ্য, যুক্তির বিশৃঙ্খলা, অধ্যাত্মবাদী রহস্যের মাধ্যমে মানব জীবনের দুরূহ পরমতার খোঁজ করেন। গতকাল সকাল সোয়া সাতটায় মোবাইলে ফোন করে অনুজ তরুণ আশফাক আমাকে প্রথম মাহমুদুল হকের মৃত্যুসংবাদ শোনায়, মাহমুদুল হকের জীবনের অন্তিম বছরগুলোয় আশফাকের সাথে লেখকের একটি যোগাযোগ বা পরিচিতি ছিল। সেই পরিচিতির সূত্র ধরেই আশফাক জানালো যে মাহমুদুল হক কমল কুমারের অন্তর্জলি যাত্রা মুখস্থ বহুবার ওকে আবৃত্তি করে শুনিয়েছেন, কমল কুমারের মৃত্যুর পর জীবনে একবারই প্রথম ও শেষ কোলকাতা গিয়েছিলেন, বাংলা সাহিত্যের সেরা কথাশিল্পী অবশ্য মনে করতেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে, এক হুজুরের মুরিদ ছিলেন আবার অনুরাগী ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মীয় দর্শনেরও। বিশ্বাস করতেন যে চল্লিশের পর লেখকের সৃজনী ক্ষমতা নষ্ট হতে থাকে এবং তাঁর শেষ লেখা লিখেছিলেন আটত্রিশ বা উনচল্লিশে।

আশফাকের কাছে লেখকের অন্তর্জলি যাত্রা মুখস্থ আবৃত্তির কথা শুনে চকিতে মনে পড়ে যায় বাংলা সাহিত্যের এক পুরোপুরি পেইন্টিংসকর্ম কমল কুমারের গোলাপ সুন্দরীর কথা। এবং এই নগণ্য পাঠকের পাঠ অভিজ্ঞতায় আমাদের এপার বাংলার সাহিত্যের আর একটি পেইন্টিংস অনুর পাঠশালার কথা! দু’টো বইয়ের ভেতর কোথাও কি কোনো অন্তর্নিহিত মিল আছে? আছে। কমল কুমার এবং মাহমুদুল হক দু’জনেই তাদের এই দুটো বইয়েই মাথা থেকে ছুঁড়ে ফেলেছেন সমাজ, দেশ, রাজনীতি, সংসার, অর্থনীতি….জাগতিক সমস্ত বাস্তবতার ক্ষীণতম দায়বদ্ধতা! ভাষা ও শব্দের এক বিকারগ্রস্থ পরমা রক্তস্রোত আর সূফী সাধকের ‘আনাল হক’ (আমিই সত্য) ভাবোন্মদনার দিব্য সমাধির নিরাকার সাধনা…নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও সুন্দরের এক ক্রম আবাহন ছাড়া এই দুই গ্রন্থেই লেখকদ্বয়ের অন্য কোনো অন্বিষ্ট নেই। ফলে, সমালোচকদের ¯ত্ততি এই দুই বইয়ের জন্য তুলনামূলক কম। অন্তর্জলি যাত্রায় যেমন সতীদাহ বা কালো বরফ-এ যেমন দেশভাগ বা জীবন আমার বোন-এ সমাজ-রাজনৈতিক সমস্যা কিছুটা হলেও আছে, গোলাপ সুন্দরী বা অনুর পাঠশালাতে শিল্পের জন্য শিল্পের আর্তি ছাড়া আর কিছুই নেই!
গোলাপসুন্দরী-তে যক্ষারোগীদের স্যানাটোরিয়াম থেকে নায়ক বিলাসকে স্বাস্থ্যের জন্য বায়ু পরিবর্তনে তার দিদি ও জামাইবাবু ছোট্ট এক শহরে নিয়ে আসে যেখানে বিলাসের জামাইবাবু কর্মরত। বিলাসের দিদির দুর্লভ সংগ্রহের গোলাপ বাগান আছে। এক বৃষ্টির রাতে গোলাপ বাগানে বিলাস এক অসম্ভব সুন্দরী মেয়েকে দেখতে পায়। বাগানে তুমুল বৃষ্টির ভেতর আকাশে বিদ্যুৎ চিড়তে থাকে। ডোমের দল আসে বিলাসের কাছে মড়া পোড়ানোয় সাহায্য চাইতে। গোলাপ সুন্দরী, বৃষ্টিতে বিলাসদের বাগানে আশ্রয় নেওয়া মেয়েটি, একসময় অদৃশ্য হয়। আকাশে বিদ্যুৎ ঝলকাতে থাকে আর বিলাসের হিমগ্রস্থ ফুসফুসে সারতে থাকা যক্ষার জীবাণু আবার উদগ্র হয়ে কাশির সাথে রক্তপাত ঘটায়। দূর থেকে ভেসে আসে ডোমদের দাহক্রিয়ার সঙ্গীত ও মাদলের বাজনা। বঙ্গানুবাদ না করা ফরাসী কবিতার উদ্ধৃতি, বিলাসের রক্তে ভাসতে ভাসতে মৃত্যুর না বলা ইঙ্গিত, গোলাপের রক্তবর্ণ পাঠককে এক অতিন্দ্রীয় ঘোরে নিয়ে যাবে! গোলাপসুন্দরী যদি বছর বারো আগে পড়ে থাকি, প্রথম অনুর পাঠশালা পড়েছিলাম বছর দশেক আগে। স্কুলজীবনে বড় ভাইকে লুকিয়ে জীবন আমার বোন পড়লেও তখন না বুঝেছি সেই উপন্যাস, না সেই উপন্যাসের লেখককে। মোটামুটি পরিণত বয়সেই অনুর পাঠশালা যেদিন প্রথম পড়ি, সেদিন গোলাপ সুন্দরী পড়ার মতোই এক ভয়ঙ্কর রঙের স্রোতে ভেসে যাবার দশা হয়েছিল!

অনুর পাঠশালা প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৭-এর জুলাইয়ে। প্রথম সংস্করণে এই উপন্যাসের নাম অবশ্য ছিল যেখানে খঞ্জনা পাখি। বাবাকে উৎসর্গীকৃত এই উপন্যাসের শুরুতেই উদ্ধৃত হয়েছে বিনয় মজুমদারের একটি কবিতার চারটি স্মরণযোগ্য পঙ্‌ক্তি:
‘স্বপ্নের আধার, তুমি ভেবে দ্যাখো, অধিকৃত দুজন যমজ
যদিও হুবহু এক, তবু বহুকাল ধরে সান্নিধ্যে থাকায়
তাদের পৃথকভাবে চেনা যায়, মানুষেরা চেনায় সক্ষম।
এই আবিষ্কারবোধ পৃথিবীতে আছে বলে আজ এ-সময়ে
তোমার নিকটে আসি, সমাদর নেই তবু সবিস্ময়ে আসি।’

এই উপন্যাসের নায়ক অনু বয়ঃসন্ধিক্ষণের কিশোর। বাবা হাইকোর্টের নামি উকিল। কোনো ভাইবোন নেই। মা আগে অনুকে খুব সময় দিতেন। এখন দেন না। দুপুর বেলায় এক অত্যন্ত সুদর্শন ইংরেজি শিক্ষক মাকে ইংরেজি পড়াতে আসেন। মা উপরতলার ঘরে সারা দুপুর শিক্ষকের কাছে পড়া মুখস্থ করেন যেন তিনি চাকরি পান। চাকরি পেয়ে অনুর ভয়ঙ্কর খারাপ বাবার কাছ থেকে অনুকে নিয়ে তিনি পালিয়ে যাবেন বলে অনুকে জানিয়েছেন। মা এখন অ্যাকোয়িরামের মাছের যত্ন, অনুর দেখভাল কিম্বা কাজে ফাঁকি দিলে কাজের লোকদের বকা-ঝকা কিছুই করেন না। সারাটা দুপুর শিক্ষকের সাথেই মার কেটে যায়। অনু বোঝে খুনে ও বদমাশ প্রকৃতির বাবার হাত থেকে তাকে বাঁচাতেই মা’র এত কষ্ট, পড়া মুখস্থ ও অনুর কাছ হতে দূরে সরে যাওয়া। এদিকে অনুর অনুমতি নেই পড়শি কোনো বালক-বালিকার সাথে মিশবার। কারণ, অনুদের বিশাল আবাসনের আশপাশে আর কোনো ‘ভদ্রঘর’ নেই। আর আছে বস্তির অন্ত্যজ কিশোর-কিশোরীরা। একা অনু ঘরের ভেতর ছটফটিয়ে মরে। প্রথম পাতাতেই লেখক জানিয়ে দিচ্ছেন:
‘দুপুরে অনু একা থাকতে পারে না, ভেবে পায় না কি করবে, কোথায় যাবে।

ঘরের সবগুলো দেয়ালের চেহারা ও হাবভাব আগেই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো; থমকানো এবং শাদা ভয়ের ছাপ মারা এমন সব অনড় আয়না যাতে কখনো কারো প্রতিবিম্ব ধরা না পড়ে। বাঞ্ছারামপুরের থানে মোড়া রানিফুফুর কথা মনে হয়; এক ফুৎকারে নিভে যাওয়া নির্বিকার মোমবাতি, ঘুমের ঘোরে খিলখিল করে হাসে।

গরম হাওয়ার হলকা চোখে ছোবল মারে বলে এই সময় জানালায় দাঁড়াতেও অনুর তেমন ভালো লাগে না। ঝিমিয়ে পড়া ওলবড়ি গাছ, ঝলসানো কাক, ঘুঘু ও অন্যান্য পাখির ডাক, তপ্ত হাহা হাওয়া, সব কিছু গনগনে উনুনে পোড়া রুটির মতো চিমসে গন্ধে ভরিয়ে রাখে।…দেখা যায় লামাদের বাগানের জলেশ্বর মালী আর মালীবৌকে। বাগানের দক্ষিণ কোণে তাদের বাঁশের একচালা ঘর। জানালায় দাঁড়ালে সময় সময় অনেক বিচিত্র ঘটনা চোখে পড়ে। সাধারণত ভরা হাঁ-হাঁ নির্জন দুপুরে আলগা বুকপিঠে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে দু’জন। কোনো কোনোদিন মালীবৌয়ের বুকে মুখ গুঁজে নিসাড় টান হয়ে পড়ে থাকে জলেশ্বর মালী। মালীবৌয়ের বুক শাদা ধবধবে। অনেকক্ষণ ধরে ঘুমোয়, যতক্ষণ পর্যন্ত বেলা পড়ে না আসে — হাতে পাওয়ার মতো গাছের নিচে পাউডার-পাফ কোমল সূর্য ঝুলতে থাকে।

…জানালার আকর্ষণ উত্তরোত্তর তীব্র থেকে তীব্রতর হয়, প্রবল প্রলোভন এড়াতে না পেরে সেখানে দাঁড়ায় সে; রৌদ্র পরাক্রান্ত এক শত্রু, ঝন্‌ঝনে পিতলের থালা।’

দেখুন কাণ্ড! শাদা দেয়াল কেমন ‘অনড় আয়না’ হয়ে ওঠে যেখানে কখনো কারো প্রতিবিম্ব ধরা পড়ে না, থানে মোড়া বিধবা ফুফু কিভাবে ‘নির্বিকার মোমবাতি’ বা রৌদ্র ‘পরাক্রান্ত এক শত্রু, ঝন্‌ঝনে পিতলের থালা’ লহমায় হয়ে ওঠে! এর পরের দু/তিন দুপুর অনু স্বপ্নে দ্যাখে মাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অনুকে নিয়ে মা’র গৃহশিক্ষক সন্ধানে বের হয়। ‘এক সময় বাড়ির পেছনের সারগাদায় মা’র মৃতদেহ দেখা গেল; এয়ারগান দিয়ে বহুদিন আগে সে যেসব চড়–ই পাখি মেরেছিলো তার পাশে মৃতদেহটা মুখ থুবড়ে পড়ে, নিসাড়। …হঠাৎ ছাদের ওপর থেকে তাতানো লোহার মতো লাল পা নিয়ে নীলচক্ষু আব্বা ক্রুর উল্লাসে লাফিয়ে পড়লেন, হারেরেরেরেরেরে — তাঁর হাতে ইয়া এক শাবল! প্রচণ্ড জোরে অমানুষিক হুঙ্কার ছেড়ে তিনি অনুর মাথায় শাবল বসিয়ে দিলেন। সে চিৎকার করে উঠলো —

যখন ঘুম ভাঙলো, দেখলো রক্তাক্ত ফরাশে তার মৃতদেহ পড়ে আছে। সেখানে অন্য কেউ নেই।’

এর পরেই বইয়ের তেইশ পাতায় এসে মাত্র নয় লাইনে লেখক জানান যে পরদিন দুপুরেও ছটফট করতে করতে অনু একসময় ঘুমিয়ে পড়ে। ‘স্বপ্ন দেখলো লামাদের বাগানে আমগাছের মগডালে পা ঝুলিয়ে বসে লালপেড়ে শাড়ি পরা মা। গলার ওপর থেকে কেটে বাদ দেওয়া, সেখানে একটা কাস্তে।

সে দাঁড়িয়েছিলো গাছের ঠিক নিচে। ওপর থেকে মা তার গায়ে থুতু করে থুতু দিলো। দাউদাউ করে শরীরে আগুন ধরে গেল। আমগাছের ডালে কাকের ছানাগুলো পিঁউ পিঁউ করছে।
দমকা হাওয়া।
হৈহল্লা হৈহল্লা হৈহল্লা — ’

ছাব্বিশ পাতায় এসে সারা পৃষ্ঠায় মাত্র তিনটি লাইন, ‘কোনো একদিন ঝন্‌ঝনে থালার মতো দুপুরে খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে একটা পাখি দারুণ চিৎকার করে উঠলো; কানে বাজলো, এসো অনু — এসো!’

সাতাশ পাতায়…সত্যিই অবাক করা…পুরো পৃষ্ঠায় মাত্র একটি লাইন, ‘পরদিন অনু দুপুরের উদ্দেশে নিজেকে অবাক করে নিরুদ্দেশ হলো।’

শিল্প বা সাহিত্যের ইতিহাস মূলতঃ তার আঙ্গিকগত নিরীক্ষারই ইতিহাস। এই সত্য গায়ের জোরে যে কাঠমোল্লারা অস্বীকার করে সুগোল রসগোল্লাকৃতি গল্পের ময়ান দাবি করে এবং নিরীক্ষাকে অস্বীকার করে, ১৯৬৭ সালে বসে এক পৃষ্ঠায় একটি মাত্র লাইন লিখে তেমনি নিরীক্ষা ও আঙ্গিকগত বিদ্রোহ করেছিলেন মাহমুদুল হক।

এরপর পরই স্বামী-সন্তান-সংসারে অমনোযোগী মা’কে লুকিয়ে শুরু হয় উচ্চ মধ্যবিত্ত কিশোর অনুর বস্তির কিশোর কিশোরীদের সাথে মেলামেশা। ওদের কারো নাম ফকিরা, কারো নাম টোকানি, গেনদু, লাটু, ফালানি, মিয়াচাঁন এবং আরো অনেকে। নিজের সংগ্রহের দামি মার্বেল বিলিয়ে দিয়ে অনু তাদের সাথে শ্রেণীগত অস্বস্তির ব্যবধান ঘোচাতে সক্ষম হয়। এই কিশোরদের সাথে অনুর শ্রেণীগত রুচির ব্যবধান লেখক বিন্যস্ত করেন নিম্নোক্ত কুশলতায়:

‘মিয়াচাঁন চিকন গলায় গান জুড়লো —
নাকে নোলক কানে ঝুমকা
মাইয়া একখান বডে
নদর গদর চলে মাইয়া
ফুশুর-ফাশুর রডে — ’

গেনদু বাধা দিয়ে বললে, ‘আব্বাসউদ্দিনের গীত গা না বে, রেকটের গীত ছাড়া অনু হালায় বুঝবার পারবো না। এই হালারে লয়া মুসিবত বাইধাই রইছে।’ কিম্বা, ‘চারপেয়ে ফ্রেমে আটকানো লোহার দাঁতাল চাকার অসময়ের শীর্ণ আখ মাড়াই হচ্ছিলো মসজিদের মুখে, গেনদু অনুর হাত চেপে ধরে অনুনয় করে বললে, ‘খিলাইবা নিহি বন্দু?’

‘সে সহজেই রাজি হয়।’ কিম্বা, ‘…বাড়ির সামনে শাদা ন্যাকড়ার মতো কি একটা পড়েছিলো, চোখ পড়লো তিনজনেরই। গেনদু ছুটে গিয়ে তুলে নিলো।

হিহি করে হাসতে হাসতে হাত বাড়িয়ে ধরে বললে, ‘এলায় ছেরিগ দুদে বান্দনের জামা! আয়না মিয়াচাঁন, তরে লাগায়া দেহি!’

প্রথমে তারা সেই বেঢপ বাড়িটা ছাড়িয়ে অনেকদূর এগিয়ে গেল, তারপর ঝুরিওলা এক বুড়ো বটের নিচে দাঁড়িয়ে বুকের দিকে পিঠে দিয়ে মিয়াচাঁনের গায়ে শক্ত করে ফিতেগুলো এঁটে দিল গেনদু। বললে, ‘নাচনা বে!’

মিয়াচাঁন দম দেওয়া পুতুলের মতো তখনকার তখনই হাতপা ঘুরিয়ে, মাজা দুলিয়ে আগু-পিছু করে, বসে, দাঁড়িয়ে, লাফিয়ে লাফিয়ে, চর্কিবাজির মতো ঘুরপাক খেয়ে, সুর ধরে। তারপর তার নিজের কায়দায় নাচন শুরু হয়। আর গেনদু দু’হাতে পেটের ওপর থাবড়া দিয়ে হেইহেই হেইহেই করে মালসাট মারতে থাকে:
ঘরমে আয়া বাবু শোনেকা বাস্তে —
শালীকো লেকে শো গয়া ঘরওলী সমঝকে
হায়হায় ঘরওলী সমঝকে!’

…হঠাৎ নাচ বন্ধ করে মিয়াচাঁন রুষ্টমুখে বললে, ‘পহা ছাড়না বে, হুদাহুদি দেহামু নিকি?
গেনদু রসিকতা করে বললে, ‘এউগা কিচ খায়ার পারি!’

মধ্যবিত্তের ভিক্টোরীয় শুচিতাবোধের আবহে বড় হওয়া কিশোর অনু এভাবেই তথাকথিত ‘অন্ত্যজ’ শ্রেণীর কিশোরদের সংস্পর্শে এসে মুখোমুখি হয় ‘অন্ত্যজ’ শ্রেণীর ভেতর প্রচলিত সহজাত খিস্তি-খেউড়, যৌনতা প্রসঙ্গে অবারিত মনোভাব এবং এমনকি কিশোর সমকামের। মায়ের পরকীয়া প্রেমের বিষয়টি সে তখনো বুঝে ওঠেনি। মালীবউয়ের শাদা বুকের মতো গোল আকাশ তার কিশোর চৈতন্যে যৌনতা বোধের জায়গায় ধাক্কা দিয়েও দিচ্ছে না। ধাক্কার আরো কিছু বাকি ছিল। চামার পাড়ার কিশোরী সরুদাসী মিয়াচাঁন ও গেনদুর এমন নৃত্য-গীতের সময় একটি পেয়ারা খেতে খেতে পাশ দিয়ে যাবার সময় ওরা দুইজন তার হাত থেকে পেয়ারা ছিনিয়ে দৌড়ে পালায়। সরুদাসী দুই কিশোরের দিকে ঢিল ছুঁড়ে কাঁদতে থাকলে অনু তাকে পেয়ারা কিনে দিতে চায়। এতে সরুদাসী খুশি হয়ে কান্না থামায় এবং বলে পেয়ারা না পেলে অনু তাকে অন্য কিছুও কিনে দিতে পারে। সরুদাসীর বাবা মুচি আর মা ধাইগিরি করে। যৌনতা বিষয়ে অনুর চেয়ে তার জ্ঞান হাজারগুণে বেশি। অবলীলায় অনেক অশ্লীল কথা বলে সে যা অনুর পক্ষে বোঝাও সম্ভব হয় না। অনু সরুদাসীকে মিছরি কিনে দিলে সরুদাসী বোঝে অনুকে এলাকার দোকানী রতিরঞ্জন পসারী বেছে বেছে খারাপ মিছরি দিয়েছে তার সরলতার কারণে। ক্ষুব্ধ সরুদাসী বলে, ‘…আশপাশের ধুমসী চাকরানী ছুঁড়িগুলোর মাথা ওই-ই তো খাচ্ছে। জামা তুলে গা দেখালে দুটো বাতাসা, গায়ে হাত দিতে দিলে তেল-সাবান, কম নচ্ছার ওটা! …আমাকে কি বলে জানিস? বলে তুই এখনো এক বাতাসা, দু বাতাসার যুগ্যি হস নি। পোক্ত হয়ে নে তারপর দেখবো তোকে। আমিও বলেছি, দেখিস, বাপের বেটা হলে দেখিস!’ সরুদাসী আশপাশের পাড়ার অনেকের গোপন খবর জানায়। ‘চারমানবাবুর ছোটো মেয়েটার না, বিয়ে না হতেই পেট হয়েছে!’ হেসে গড়িয়ে পড়ার উপক্রম করে মুখে হাত চাপা দিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ সরুদাসী, তারপর আবার বললে, ‘মাকে বলে কিনা পেট ফেলে দিতে পারলে পঁচিশ টাকা দেবে। যা তা ব্যাপার নাকি? মা পষ্টাপষ্টি বলে দিয়েছে, একশো টাকা না হলে ও কাজে হাত দেবে না, পাপ আর কি! ইশ, কী উঁচু নাকই না ছিলো ছুঁড়িটার!’

সরুদাসীর মুখে কোনো কথাই আটকায় না। তার চেহারা-পোশাকের বিবরণ মোটামুটি এরকম: ‘সরুদাসীর পরনে শাড়িছেঁড়া ফালি লুঙ্গির মতো জড়ানো। গায়ে ঘটির মতো ফোলাহাতা ছিটের ব্লাউস, যার একটাও বোতাম নেই, নাভির উপরে গিঁটমারা। কোমরে কড়িবাঁধা লাল ঘুনসি। ভিজে কাপড়ে ছুটতে গিয়ে পিছনের দিকে খানিকটা ফেঁসে গিয়েছিল। সরুদাসী ছেঁড়া জায়গায় হাত রেখে হঠাৎ মুখ কালো করে তিরষ্কারের সুরে বললে, ‘তুই কি অসভ্যরে, হাঁ করে আমার পাছা দেখছিলি বুঝি এতোক্ষণ?’

অনু লজ্জিত হয়ে বললে, ‘যাঃ, মিথ্যে কথা!’

চামার পাড়ার দুই খেলার সাথী বিশুয়া আর হরিয়ালালের গল্পও অনুকে শোনায় সরুদাসী। হরিয়ালাল বাগানে তার সাথে গুণ্ডামি করে ইত্যাদি। অনুর সাহেবী সৌন্দর্যে মুগ্ধতাও প্রকাশ করে সে। সরুদাসী বলে, ‘তোকে সব শিখিয়ে দেবো। বাবুদের বাগানে কাঁটামুদি আর ভাঁটঝোপের ভেতর আমার খেলাঘর পাতা আছে, সেখানে তোতে-আমাতে মাগ-ভাতার খেলা খেলবো। আমি মিছিমিছি চান সেরে ন্যাংটো হয়ে কাপড় বদলাবো, তুই চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকবি।…তুই মিথ্যে মিথ্যে রাগ করবি। বলবি, মেয়েটা কেঁদে কেঁদে সারা হলো সেদিকে খেয়াল আছে নচ্ছাড় মাগীর, মাই দিতে পারিস না, এইসব। পিচের কালো পুতুলটা বেশ আমাদের মেয়ে হবে। … খেয়ে-দেয়ে দু’জনে পাশাপাশি শোবো। তুই রাগ করে চলে যাবি। তারপর মিছিমিছি তাড়ি খেয়ে মাতলামি কত্তে কত্তে এসে আমাকে রানডি মাগী ছেনাল মাগী বলে যাচ্ছেতাই গাল পাড়বি। বেশ মজা হবে যাই বল, তাই না রে?’

অনু আমতা আমতা করে বললে, ‘আমি কিন্তু তোমাকে অতোসব বকাবকি করতে পারবো না!’

‘দূর বোকা! খিস্তি-বিখিস্তি না করলে, মেরে গতর চুরিয়ে না দিলে, তোর মাগী ঠিক থাকবে নাকি? ভাতারের কিল না খেলে মাগীরা যে নাঙ ধরে তা-ও জানিস না বুঝি?…’

অনু হাবার মতো হাঁ করে নীরবে শুনতে থাকে। ‘…অবাক হয় অনু। সরুদাসী নিজেই আশ্চর্য রূপময় এক জগৎ।’ অনুর হাতে ডেঁয়ো পিঁপড়ে কামড়ে চুলকালে সরুদাসী বলে সে বাবা ঘন্টাকন্নের কাছে প্রার্থনা করবে যেন অনুর অসুখ সেরে যায়। অনু হাসপাতালের কথা তুললে রেগে যায় মেয়েটি। বই পড়ার চেয়ে জুতা সেলাই করা যে ঢের বেশি কঠিন কাজ সে প্রসঙ্গে অনুর সাথে তর্কও করে। মুচি পাড়ার দক্ষ কারিগর শ্রীনাথ জ্যাঠার উদাহরণ টেনে জানায় যে শ্রীনাথ জ্যাঠা ফাঁকিবাজ ছোঁড়াদের বলে, ‘সব কাজই কঠিন, তাকে ভালবাসতে হয়, নিজের মাগী করতে হয়, মাগী করলি তো ধরা দিলো, তোর যে মাগী সে তোরই জানা।’ সরুদাসী যখন জিজ্ঞেস করে যে অনু তাকে বিয়ে করবে কিনা, অনু সে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে সে চটে যায়, ‘…আর পছন্দ হবেই বা কি করে, বুঝি সব, আমরা তো আর বাবুজাতের মেয়েদের মতো চোখ-কানের মাথা খেয়ে বেহায়াপনা কত্তে পারিনে! বুক উইঢিবির মতো উঁচ করে, পাছা দুলিয়ে, রঙ-চঙ মেখে, অন্যদের বোকা বানিয়ে মন ভাঙানো আমাদের ভেতর নেই বাপু।’

দুই অসম কিশোর-কিশোরীর তর্কাতর্কি আর দূরন্ত আকর্ষণের ভেতর দিয়ে সময় বইতে থাকে। এক পর্যায়ে সরুদাসী বৃষ্টির ভেতর এক পরিত্যক্ত দোকানঘরের চৌকিতে পাশাপাশি গলা জড়িয়ে শুয়ে থাকার প্রস্তাব দিলে অনু বলে, ‘আজ থাক আর একদিন হবে — ’

‘ভয় করছে বুঝি?’

‘না, তোমার গায়ে কেমন যেন আঁশটে গন্ধ। এত নোংরা থাকো কেন তুমি?’

সরুদাসী প্রায় তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললে, ‘মরার কথা শোনো। গন্ধ আবার কোথায়! তোর নাকে গন্ধ। আমরা তো আর বাবুজাতের লোক নই।…’

বেধে যায় ঝগড়া। এক পর্যায়ে বৃষ্টির ভেতর দু’জন দু’জনকে চেলাকাঠ নিয়ে তাড়া করে। বাড়ি ফিরে কদিন জ্বরের পর অনু আবার বস্তির বন্ধুদের সাথে মেশে। দেখে বস্তির অন্য কিশোর বন্ধুদের বাড়ির নির্মম দারিদ্র্য। টোকানি একদিন অনুকে বাসায় নিয়ে কিছু খাওয়াতে না পেরে মন খারাপ করে গরুর মতো চোখ করে কাঁদে। সরুদাসীকে মনে মনে খোঁজে অনু কিন্তু পায় না: ‘এখন সরুদাসী এক নির্জন কষ্টের নাম। …কোনোদিনই পৃথিবীতে সরুদাসীকে পাওয়া যায় না।’ নিজে থেকে মান ভাঙানোর জন্য চামার পাড়াতে যেতেও তার ভয় করে।

ঘটনাস্রোত এরপর খুব কম। একদিন অনুর বানী খালা ও তার ছেলেমেয়েরা অনুদের বাসায় বেড়াতে আসে। বানী খালা ও অনুর বাবার সহজ-স্বাভাবিক গল্পের ভেতর অনুর মা উষ্মা প্রকাশ করলে বানী খালা চলে যান। খালা চলে যাবার পর অনুর বাবা ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে তার বিধবা বোন বা অনুর রানি ফুফুকে তিনি ঢাকায় এনে রাখতে চান। অনুর মা একথায় আপত্তি করে বলে যে এতদিন যে বোন আসতে চায়নি আজ কেন সে আসবে। বাবা বোঝান যে আগে অল্প বয়সে মনের জোরে সে একাকিত্ব মেনে থাকতে পেরেছে যা এখন পারছে না। একথার উত্তরে কিশোর অনুর সামনে মা’র অশ্লীল মন্তব্য, ‘মনের জোর নয়, বলো রূপের বহর ছিলো, রূপের দেমাক ছিলো, বরং এখানে ওর অসুবিধেই হতো। এখন বোধ হয় ওসবে ভাটা পড়েছে — …আর ও নচ্ছার মাগীও কম যায় না, থেকে থেকে যেন চাগিয়ে উঠছে,’
আব্বা নিস্পৃহ কণ্ঠে বললেন, ‘দ্যাখো, ইডিওসিরও একটা সীমা থাকা দরকার, ছি ছি!’

[…]‘ তুমি বর্বর। তুমি ইতর। বাটপাড়। …হোর নিয়ে পড়ে থাকো, আমি সব বুঝি, লম্পটের সংসারে জ্বলে মরছি আমি।’

আব্বা দারুণভাবে হাঁপাতে লাগলেন।

…‘থামো!

‘ভয় করি নাকি তোমার চোখ রাঙানির? নিচ, ছোটলোক! ভালো মায়ের পেটে জন্ম হলে এমন হয় নাকি?’

‘খবরদার!’…

মা বললে, ‘…তুমি একটা কুকুর!’

আর তুমি একটা পাগলা কুকুর, তোমাকে গুলি করে মারা দরকার!’

‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন!’ অনু চিৎকার করে উঠলো ঘর ফাটিয়ে, ‘তুমি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন — ’

মায়ের ড্রেসিং টেবিল হতে ক্রিস্টলের একটা ভারি শিশি হাতে নিয়ে বাবার কপালে বিদ্যুৎগতিতে ছুঁড়ে মারলো। কপালে লাগলো এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটলো। ‘দুহাতে অনুকে আগলে রাখলো মা। আব্বা অনুকে দেখলেন, ক্রুদ্ধ কিংবা দুঃখিত, অনু তাকাতে পারলো না, কি ভয়াবহ!’ শীতার্ত কুকুরের মতো নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দিতে দিতে পিতার কণ্ঠে যে অহো শব্দ শোনা গেল, তাতে অনুর মনে হয় যুগ-যুগান্তরের পর তার বাবার ভেতর হতে ভয়ানক দুঃখ আর ভয়ানক যন্ত্রণা চিৎকার করে কেঁদে উঠেছে।

‘…অনুর মনে হয় তারপর একটা বরফযুগ চলে গিয়েছে। …ঝগড়ার সেই রাত্রেই তার জ্বর আসে। জ্বরের ঘোরে স্বপ্ন দেখেছে, পাগলের মতো সে পৃথিবীময় একজন বুড়ো আইনস্টাইনকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।

… এইমাত্র ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আইনস্টাইনকে — ঘোষণা করে দাও, বজ্রাঘাত হানো! এইমাত্র ফ্রাঙ্কেনস্টাইন আইনস্টাইনকে — ঘোষণা করে দাও, দাবানল জ্বালো! ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, ওগো দয়া করো, ওগো দয়া করো; এদের কোন ধর্ম দীর্ঘনিশ্বাস বলে আজো আমাকে ডাকলো না।

আর আমি, অনু বলে প্রত্যুত্তরে, কি যেন কি যেন বলে, ঝিনুকের ঝরনা দেখতে বেরিয়েছিলাম সেই সকালে, সেই সকালে উপনীত হলাম জল্লাদের জঠরাগ্নির মত্তহাহায়; মত্তহাহা মত্তহাহা- এ কি নিহত গরুড় মাটি কামড়ে পরে আছে যে ! !

…তারপর মা এখন তুমি শীর্ষে।

মা বললে, তাহলে তুমি —

মা বললে, তাহলে তুমি এখন —

মা বললে, তাহলে তুমি এখন শস্যের মতো শীর্ষে!

অনু বললে, …আমি চিৎকার করে বলবো আর তোমাকে রাত্রি পাড়তে দেবো না, আমি চিৎকার করে বলবো রাত্রির গায়ে উৎকট গন্ধ কি যে, আমি চিৎকার করে বলবো — হ্যাঁ চিইইইইইইইইইইইইইইইইিইৎকার করে বলবো রাত্রিকে রাত্রিকে রাত্রিকে আমার ঘৃণা, আমি চিৎকার করে বলবো পনেরোটা দিন সমানে খুবলে খুবলে চাঁদ খায়, কানাচোখে এমনভাবে তাকিয়ে থাকে —
তারপর, তারপর মা এক ফুৎকারে তার চিৎকারের প্রদীপটাকে, তার চিৎকারের লীলাচঞ্চল নীল শিখাকে নিস্তব্ধ করে দশ লক্ষ কালো চাদরে ঝিনুকের ঝরনা ঢেকে দিলো।’

পাঠক, কোনো মানে হয়? উন্মাদনার সভ্যতা, তাই না? কমল কুমার যেমন বলেছিলেন যে ‘ভাষা এত সরল যে জটিল হইয়া ওঠে!’ নির্জ্ঞান, অসুস্থতা, অবদমন, ঘোর, স্বপ্ন এবং ইন্দ্রজালই কেবল পারে সত্যিকারের কবিতা ও শুদ্ধতম মন্ত্রের প্রেরণা যোগাতে…

ফিরে আসি মূল আখ্যানে। সেরে ওঠার পর অনুর মনে হয় সরুদাসীকে যেমন করেই হোক তার খুঁজে বের করতেই হবে। ‘কতোদিন হয়ে গেল আমি সরুদাসীকে খুঁজি নি, কতোদিন যে হয়ে গেল আমার আকাশ নেই, শুধু গা পোড়া জ্বর!’
অনুদের বাসায় মা’র গৃহশিক্ষক আর আসে না। মাকে আর একফোঁটা বিশ্বাসও হয় না অনুর। আর মা’র সাথে নয়, অনু একা একাই বাড়ি ছেড়ে পালাবে। বহুদিন ধরে অনুর আব্বাও শয্যাগত। মা শিক্ষকের কাছে যাবার সময় তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘কোথায় যাচ্ছো?’

‘স্যারের কাছে!’

‘না ষাঁড়ের কাছে?”

‘সোয়াইন!’

চামারপাড়ায় সরুদাসীকে খুঁজতে যাবার আগে মার ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে অনু ‘তিলধরা একটা বড়ো কড়ি নিলো যা কানে চেপে ধরলে সমুদ্রের অবিশ্রান্ত শোঁ-শোঁ শব্দ শোনা যায়। একজোড়া শ্যাওলা আকিক নিলো, ঘষলে যার গায়ে অন্ধকারের এক একটা সুন্দর ইচ্ছের মতো ফুলঝুরি ঝরে। আর নিলো ফসফরাসে চোবানো একজোড়া আঙুরথোকা দুল, রাত্রিকালে যা এক একটা দুঃখের মতো জ্বলবে।’

মুচিপাড়ার সামনে এক সপ্রতিভ ছেলেকে অনু যখন জিজ্ঞেস করে যে, ‘সরুদাসীদের ঘর চেনো!’

‘খুব চিনি! কতোবার ওদের বাসায় গেছি। আমার মা চামারনী দিয়ে তেল মালিশ করাতো কিনা!’ এরপর সরুদাসীর পাড়ার বর্ণনা। মাহমুদুল হকের কবিতাশ্রয়ী মন্তাজ।

‘…কলরবহীন প্রশান্ত বাতাসে সুনীল পাতার রাশ আলগা করে কয়েকটা বিহ্বল বেলগাছ উদভ্রান্ত পাখির চিৎকার জ্বলজ্বল করে জ্বলছে।

খঞ্জনা ডাকছে।

খঞ্চনা আর খোকাহোক।

…গোবরগাদার কোলে ফুলের ভারে নুয়েপড়া ঝুমকোলতা বললে, অনু, আমার নাম মঞ্জুশ্রী, লটপটে বিনুনি দোলানো বিকেলের মতো আমিও আমিও আমিও তোমার হাত ধরে, তোমার সঙ্গে। তালশাঁসের হিম মাংসে আমাদের ছেলেমেয়েরা কি-না সুখী! বুকের আলুথালু আঁচলের চেয়েও আমাদের সব রাস্তা নিস্তব্ধ, ধ্বনিপুঞ্জ থেকে পা হড়কে পিছলে আসা;

…এসো, তোমার গলায় আকন্দফুলের মালা পরিয়ে দেবো, স্বর্ণলতিকার ভারে নুয়েপড়া রক্তজবার গাছ বললে — আমাকে তুমি ফুল্লরা বলেই ডেকো, আমি তোমার গলায় আকন্দফুলের মালা দেবো, আর একলক্ষ মৌমাছির বিবর্ণ দুঃখের চেয়েও বড় বড় নীল ঘাসফুল, যতো নিতে পারো, যত নিতে পারো।

রাঙারৌদ্র আমার ঠোঁট, বিকেল আমার বিনুনি, মঞ্জুশ্রী ফুল্লরা আমার বোন…আমাদের ঘাসের সবুজ জ্যোছনায় গঙ্গাফড়িং আর ঝিঁঝিপোকা তুমি, এখানে প্রজাপতির ঝাঁক নামে, এক দুই তিন চার গুনতে চেওনা, তা অসম্ভব, লক্ষ লক্ষ, প্রজাপতি প্রজাপতি প্রজাপতি প্রজাপতি, তুমি তো প্রজাপতি ভালবাসো। …এখানে খঞ্জনা পাখি, আসে তিতির, ঝুঁটিওলা সুখের পায়রা, এখানে খঞ্জনা পাখি, ঐ শোনো খঞ্জনা ডাকছে, — এসো, তুমি আমি ফুল্লরা সকলে হাত ধরাধরি করে সবুজ ঘাসবনে নেচে বেড়াই, ঘাসবন ঘেঁটুবন আসশ্যাওড়ার বন ঘৃতকুমারীর বন এসো দেখবে এসো, ঘোড়ানিমের ডালে নিমপাখির লুকোচুরি খেলা দেখছে আমাদের সব বিশুয়ালাল আর হরিয়া,…অনু এখানে খঞ্জনা পাখি এখানে খঞ্জনা পাখি — ’

মনোরম এই কবিতার পরই খটখটে গদ্যে সরুদাসীদের বাড়ি খুঁজে পাওয়ার কথা জানান লেখক।
‘ছেলেটা বললে, ‘এটাই সরুদাসীদের ঘর। ইশ্, যা নোংরা ওরা,’

…উঠানের একপাশে ইন্দারার খুব কাছাকাছি হাড্ডিচর্মসার এক বুড়ি ক্ষুদ কাঁড়িয়ে কাঁকর আলাদা করছে; শনের নুড়ির মতো চুল, একটাও দাঁত নেই, আর ঘরের বারান্দায় একজন শীর্ণকায় থুত্থুরে বুড়ো শাদা ধবধবে ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল নেড়ে বিভোর হয়ে একমনে পাখোয়াজ বাজাচ্ছে।

‘ছেলেটা বললে, এই তো সরুচামারনী!’

অনু বিভ্রান্তের মতো মাথা দুলিয়ে বললে, ‘না, না, এ সে সরুদাসী নয় — ’

ছেলেটা অবাক হয়ে বললে, ‘তাহলে সে আবার কে?’

‘সে আমাদের মতোই ছোটো!’ অনু ঘড়ঘড় করে বললে, ‘বাবুদের বাগানে সে হরিয়ার সঙ্গে রোজ খেলা করে বেড়ায়।’

‘কি আবোল-তাবোল বকছো তুমি!’ ছেলেটা মুখ বেঁকিয়ে বললে, ‘হরিয়াকে নিয়ে বুড়ি আবার কি খেলবে, ওর তো আর মাথা খারাপ নয়! হরিয়াই তো ওর স্বামী! ঐতো ট্যাগরা গাঁজাখোরটা বসে বসে বাজনা প্রাকটিস করছে!’

এরপর?

‘…খুব জোরে বাজাচ্ছে বুড়ো হরিয়া। …রণোন্মত্ত হস্তিযূথকে দাবড়ে দিচ্ছে সে। …অনুর মনে হলো বুড়ো হরিয়ার হাতের এই প্রলয়ঙ্কর পাখোয়াজ নিঃসৃত শব্দবাণে পৃথিবীর যাবতীয় সভ্যতা ভেঙ্গে চুরমার, খানখান হয়ে যাবে। রক্তবৃষ্টি! মাংসবৃষ্টি! অগ্নিবৃষ্টি!…

পেছনে কয়েক পা সরে এসে বিভ্রান্ত অনু বললে, ‘চলো এখান থেকে, এ তুমি কোথায় নিয়ে এলে! এখানে অন্য সরুদাসী! এখানে অন্য সরুদাসী!

উর্ধশ্বাসে ফিরে যাবার পথে বারবার অনুর মনে হলো, জারজ নিনাদে উন্নীত পাখোয়াজের উত্তরোত্তর দ্রুততর উত্তাল ফেনিল তরঙ্গমালা পিছন থেকে পরাক্রান্ত ঘাতকের মতো তেড়ে আসছে তার দিকে।’

আখ্যান এখানেই সমাপ্ত। কিশোরী সরুদাসীর সাথে আসলেই কি কখনো অনুর দেখা হয়েছিল? না সে ছিল অনুর কল্পপৃথিবীর নির্মিত কোন সত্তা? দ্বিতীয়বার লোলচর্ম বৃদ্ধা সরুদাসীর সাথে যখন ফিরে দেখা হলো অনুর, ততদিনে পেরিয়ে গেছে শত সহস্র অধিবর্ষ কি আলোকবর্ষ কাল? অথবা, সরুদাসী অনুর স্বপ্নের আধার, অধিকৃত দুজন যমজের একজন? যার কাছে সমাদর না পেলেও সবিস্ময়ে আসা যায়? এই আখ্যানের কোনো অর্থ নেই! অর্থহীনতাই এর অর্থ। এই আখ্যানের কোনো কার্যকারণ বা যুক্তি শৃঙ্খলা/পরম্পরা নেই। যুক্তিহীনতাই এর যুক্তি। বিশৃঙ্খলাই তার শৃঙ্খলা। মূলতঃ অনুর পাঠশালা-য় মাহমুদুল হক তার যাবতীয় রচনাকর্মের ভেতর সবচেয়ে বেশি যুক্তি ও বাস্তবতা বিরোধী। নৈরাজ্যের এক কল্পভুবন নির্মাণ করেছেন অবিশ্বাস্য দরদে। ভেঙে দিয়েছেন সময়ের একরৈখিকতা। বাবা মা’র অসুখী দাম্পত্য, মা’র পরকীয়া প্রেম, কৈশোরের উন্মেষকালীন যৌনতাবোধের আবছায়া সব কিছু হারিয়ে জেগে থাকে শুধু বিস্ময় আর রহস্যবোধ, এক পরম বুঝতে না পারা যা যে কোনো শিল্পের transcendence-এর জন্য অপরিহার্য শর্ত। সত্যজিৎ রায়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা সিনেমার কথা মনে পড়ে? দারিদ্র্য, দুর্ভিক্ষ কি নগরজীবনের সমস্যা কিছুই ছিল না এখানে। একটি উচ্চমধ্যবিত্ত ভারতীয় বাঙালী পরিবার ছুটিতে দার্জিলিং গেছে। বাড়ির উনিশ বছর বয়সের ছোট মেয়েকে বিদেশ প্রত্যাগত এক ধনী ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকেও দেখানো হয়। মেয়ের বাবা ব্রিটিশের আমলে ‘রায় বাহাদুর’ খেতাব প্রাপ্ত ছিলেন। এখানেই ধনী পরিবারের এক কালীন গৃহশিক্ষক ও তার বেকার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে পরিচয় হয় মেয়েটির। বেকার ছেলেটির বাবা আবার আন্দামানে মারা গেছিল বৃটিশ খেদাতে গিয়ে। এটা ষাটের দশকের কাহিনী। মধ্যবয়সী গৃহশিক্ষক রায় বাহাদুরকে অনুরোধ করে ভাইয়ের ছেলেকে চাকরি দেবার জন্য। উনিশ বছরের মনীষা এক বিকেলের পরিচয়েই আচ্ছন্ন বোধ করে বেকার অশোকের জন্য। বিদেশ প্রত্যাগত বয়সী প্রকৌশলী পাত্রকে অসহ লাগে তার। কিšত্ত, তার বড়বোন অনিমাকেও বাবার নির্দেশে প্রেমিককে ছেড়ে এক ধনাঢ্য যুবককে বিয়ে করতে হয়েছে। ফলাফল অসুখী দাম্পত্য ও লুকিয়ে পুরনো প্রেমিকের সাথে যোগাযোগ রাখা। দুই মেয়ের ভাই সারাদিন ক্লাবে মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট করে বেড়ায় যা দার্জিলিংয়েও চলতে থাকে। মনীষা একপর্যায়ে মনের সাথে লড়াই করে না পেরে বয়সী পাত্রকে পরোক্ষে ‘না’ করে দেয়। অশোককে রায়বাহাদুর চাকরি দিতে চাইলেও রায়বাহাদুরের বৃটিশ প্রেমে ত্যক্ত হয়ে সে চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। অশোকের সাথে মনীষার আবার দেখা হয়। তাদের কোলকাতা গিয়ে ফিরে দেখা হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। পুরোটাই এক বিকেলের কাহিনী। এক লেপচা (হিমালয়ের এক আদিবাসী গোত্র) বাচ্চাকে মনীষার হতাশ পাণিপ্রার্থী একটা চকলেট দিয়ে চলে যায়। রায়বাহাদুর আবিষ্কার করেন তার মেয়ে মনীষা বেকার অশোকের সাথে কথা বলে বিদায় নিচ্ছে। ক্রুদ্ধ রায়বাহাদুরকে চমকে দিয়ে হঠাৎই দেখা যায় লেপচা বাচ্চাটি তার নিজের ভাষায় প্রফুল্ল মনে গান গাইছে। সারাদিন ও ভিক্ষা খুঁজছিল। বাচ্চাটির অবোধ্য গানের অপরূপ সুরের সাথে কুয়াশা ভেদ করে জেগে ওঠে সোনালী রূপালী গোলাপি আভায় বিচ্ছুরিত অবিশ্বাস্য কাঞ্চনজঙ্ঘা। জীবনের সমস্ত তুচ্ছতা কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে ম্লান হয়ে যায়। শেষ এই তিন/চার মিনিটের দৃশ্য পেছনের দুই ঘণ্টার ছবির বাস্তবতাকে হঠাৎই এক ডানাঅলা অশ্বের পিঠে চাপিয়ে অতিক্রম করে দৈনন্দিনের যাবৎ ক্লিশে। না, একমাত্র এই ছবিটার জন্যই কোনো পুরস্কার পান নি সত্যজিৎ। যদিও ঋত্বিক ঘটক এই সিনেমাকে পথের পাঁচালীর পরে সত্যজিতের দ্বিতীয় মহৎ কাজ বলে মনে করেন। সিনেমা বা উপন্যাসের শেষ দৃশ্যের ‘উল্লম্ফন’ কিম্বা কখনো কখনো ‘juxtaposition’ হঠাৎই নিতান্ত সাধারণ এক কাহিনীকে আচ্ছাদন করতে পারে অতীন্দ্রিয় রহস্যের চাদরে। যে সত্য বা পরমতাবোধের সবটা আমরা ছুঁতে পারি না, রূপকথার যে ব্যঙ্গমা-ব্যঙ্গমী মানুষের ভাষায় কথা বলে আমাদের চমকে দেয়, যে সোনার কাঠি হাসি আর রুপার কাঠি অশ্রুজল হয়ে শতবর্ষের নিদ্রিতা রাজকন্যার সাথে রাজকুমারের মালাবদল সম্ভব করে…সেই রহস্যবোধই তো অমরতা যোগ্য শিল্পের প্রাণভোমরা!

মাহমুদুল হকের লিখনশৈলীকে অনেকেই প্রশংসা সত্ত্বেও ‘কাব্যাক্রান্ত’ বলেন এবং গদ্যের জন্য এমন ভাষা জরুরি কিনা তেমন প্রশ্ন তোলেন। ইলিয়াস কেন অনেক কেজো গদ্য বেছে নিয়েছিলেন কিম্বা তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় ইলিয়াস-হাসান জরুরি না মাহমুদুল-জ্যোতিপ্রকাশ জরুরি, সেসব তর্কে না গিয়েই বলা যায় হাসান আজিজুল হক যেমন ওপার বাংলার বিজ্ঞাপনপর্বের সাথে এক সাক্ষাৎকারে ‘সোশ্যাল রিপোর্টিং’কে তৃতীয় বিশ্বের কথাসাহিত্যের মাধ্যম হতে বলেছেন কিম্বা ইলিয়াস যেমন চিলেকোঠার সেপাইয়ে সমাজ বিচিছন্ন বা এলিয়েনেটড নায়ক ওসমানকে মিলিয়ে দিয়েছেন গণ অভ্যুত্থানের প্রবল স্রোতে যেহেতু হাড্ডি খিজির বারবার তাকে ডাক দিয়ে যায়…মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অজস্র তর্জনী উঠতে পারে…আরো দীর্ঘ, আরো মহাকাব্যিক কিছু লিখলেন না কেন তিনি? কেন রচনা করেননি আমাদের জাতির বৃহৎ উপন্যাস, ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ দলিল? উত্তর একটাই। সৈয়দ মুজতবা আলী যেমন তুর্গেনিভ ও দস্তয়েভস্কির প্রতিতুলনায় বলেছিলেন যে দস্তয়েভস্কির মতো পিটার্সবুর্গের প্রতিটি অলিগলি কি পাতাল কুঠুরিতে হাঁটেন নি তুর্গেনিভ। রাশিয়ার সব বেশ্যা, বিপ্লবী, চোর, খুনে ও সন্তর অন্তরের গতিপ্রকৃতি নথিবদ্ধ করেন নি তুর্গেনিভ দস্তয়েভস্কির মতো। তিনি নিতান্ত ‘ভদ্রলোক।’ ঘরের জানালা গলিয়ে শরতের আলো যতটুকু আসে, তিনি ততটুকুই দেখেন। প্রতিবেশীর বাগানে দুটো ছেলেমেয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে, সেটাই তার সনেটধর্মী রচনার জন্য যথেষ্ট। সেই মাধুর্যই বুঝি কিছু কম? প্রকৃতপক্ষে, মহাকাব্য যেমন সমুত্থত ও গম্ভীর, গীতিকবিতার শ্রাবণধারাও তো বেঁচে থাকার জন্য, সহজ নিঃশ্বাসের জন্য তেমনি অমল অনিবার্যতা। সেই অমল অনিবার্যতার সাধক মাহমুদুল হকের প্রয়াণে জানাই আন্তরিক প্রণাম।

২২ জুলাই ২০০৮। সময় সন্ধ্যা ৭:০০-১২:০০।

a_falgun@yahoo.com

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (8) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Hasan Afridi — জুলাই ২৩, ২০০৮ @ ৮:০৬ অপরাহ্ন

      অনুর পাঠশালা নিয়ে অদিতি ফাল্গুনীর লেখাটি মাহমুদুল হককে ধরতে পারেনি। অনু এতটাই প্রকাশিত এবং বিভাজিত একটি প্রতীক যে তাকে কেবল মাত্র সময় বা জায়গা দিয়ে পাঠ করা সম্ভব নয়। অদিতির অনেক ভালো লেখা, বিশেষত তার ইমানুয়েলের গৃহপ্রবেশ বেশ স্পষ্ট। কিন্তু অনুর পাঠশালা নিয়ে এই লেখাটি কি তিনি এক বসাতে লিখেছেন, কেবল মাত্র লেখার জন্য লেখা? এটা ঠিক নয়। তার মত গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের আরো চিন্তাভাবনা করা জরুরি।

      হাসান আফ্রিদী

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এহেছান লেনিন — জুলাই ২৪, ২০০৮ @ ৩:২২ অপরাহ্ন

      অদিতি ফাল্গুনীর অনুর পাঠশালা নিয়ে লেখাটি পড়ে সারকথা ধরতে পারলাম না। হাসান আফ্রিদীর মন্তব্য “লেখাটি মাহমুদুল হককে ধরতে পারেনি,” আমার কাছেও এমনই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে বেশ তাড়াহুড়া করে লিখেছেন। যাই হোক, লেখক অদিতি ফাল্গুনীকে ধন্যবাদ। আপনার লেখা আমরা আরো পেতে চাই।

      এহেছান লেনিন

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সুমন রহমান — জুলাই ২৫, ২০০৮ @ ২:৩৮ পূর্বাহ্ন

      “মাহমুদুল হক শিল্পের প্রশ্নে এতটুকু ছাড় দেন নি।” ছাড় দিয়েছেন ইলিয়াস, চিলেকোঠার সেপাই বা খোয়াবনামা-র সুদীর্ঘ ক্যানভাসকে ধারণ করবার ইচ্ছাতেই নাকি তিনি তাঁর গদ্যভাষাকে সরল ও একরৈখিক করে ফেলেন! অন্তত “খোয়াবনামা”র ভাষা খেয়াল করবার পর আমার মনে হয় নি ইলিয়াস তাঁর গদ্যভাষাকে “সরল ও একরৈখিক” করে ফেলেছেন (গণ্ডা গণ্ডা উদ্ধৃতি দেয়া যায় আমার বক্তব্যের সমর্থনে, খোয়াবনামা থেকে; কিন্তু ভিন্ন প্রসঙ্গ বলে আপাতত থামছি)। ইলিয়াস না করলেও, মাহমুদুল হককে নিয়ে আলোচনায় এই লেখাটি আসলেই তাঁর সাহিত্যের একটি “সরল ও একরৈখিক” চেহারা হাজির করেছে।

      অদিতি ফাল্গুনী একপাশে রাখলেন ইলিয়াস আর হাসান আজিজুল হককে, অন্যপাশে রাখলেন মাহমুদুল হক এবং জ্যোতিপ্রকাশ দত্তকে। প্রথম দলের কৃতিত্ব (বা অপরাধ) তাঁরা আর্থসামাজিক জীবনের দলিল রচনা করেছেন এবং সেটা করতে গিয়ে শিল্পবিবেচনায় কিছুটা ছাড় দিয়েছেন। অপরদিকে মাহমুদুল হকদের অপরাধ (বা কৃতিত্ব) হল তারা দেশ জাতি রাজনীতি নিয়ে উচ্চকিত হন নি, ভাষার “আপাত নৈরাজ্য”, “যুক্তির বিশৃঙ্খলা” এবং “অধ্যাত্মবাদী রহস্যের মাধ্যমে মানব জীবনের দুরূহ পরমতার” (তৃতীয় উদ্ধৃতিখানির অর্থ ঠিক বোঝা গেল না!) তালাশ করেছেন।

      বলাবাহুল্য, এই ব্যাখ্যাখানি সেই তথাকথিত “শিল্পের জন্য শিল্প” বনাম “জীবনের জন্য শিল্প” তর্কের নির্যাস থেকে অনুপ্রাণিত। লেখক দাবি করছেন, প্রথম দলটি “জীবনের জন্য শিল্প” করেছেন, অর্থাৎ শিল্পের প্রশ্নে ছাড় দিয়েছেন। দ্বিতীয় দলটি “শিল্পের জন্য শিল্প” করেছেন, ফলে দেশ রাজনীতি প্রশ্নে কম উচ্চকিত হয়েছেন।

      এই ধরনের বয়ান একদিকে যেমন খোয়াবনামা কিংবা ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এর শৈল্পিক উৎকর্ষকে খাটো করে, অন্যদিকে অনুর পাঠশালা বা জীবন আমার বোন-এর মধ্যে পাওয়া বৃহত্তর জীবনের ডকুমেন্টেশন/ ইন্টারপ্রিটেশনকেও পাশ কাটিয়ে যায়। (এই ধাঁচের ব্যাখ্যাকে অনেকেই মার্কসবাদী বলে জায়েজ করার ধান্দা করেন, কিন্তু গত শতকের তিরিশ দশকী খ্রিস্টফার কডওয়েল-মার্কা ব্যাখ্যা ছেড়ে খোদ মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব অনেক এগিয়েছে।)

      জীবন/রাজনীতি আর শিল্পের মধ্যে এই ধরনের শত্রুতামূলক সম্পর্ক আসলে এক্সিস্ট করে না। “বৃহত্তর জীবন” নিয়ে লিখেছেন বলেই ইলিয়াস বা হাসান বিশাল অভিজ্ঞতার কর্দমাক্ত প্রান্তর পাড়ি দিয়েছেন, আর মধ্যবিত্তের ঘরের বিবরণ লিখেছেন বলেই মাহমুদুল হক দখিনের জানালা দিয়ে (তুর্গেনেভ-স্টাইলে) যা কিছু দেখা যায় তাইই ফুরফুরে মেজাজে লিখে দিয়েছেন — এই ধরনের ভাষ্য নিতান্ত হাস্যকর।

      আরেকটা তর্কের উল্লেখ আছে অদিতি-র লেখায়: তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় হাসান-ইলিয়াস জরুরি, নাকি মাহমুদুল হক-জ্যোতিপ্রকাশ জরুরি? আমাদের সৌভাগ্য যে, সেই তর্ক টেনে আনেন নি তিনি এই আলোচনায়। তর্কের বিষয়বস্তু শুনেই যা ভয় লেগেছে! শেষে লিখেছেন,

      “আরো দীর্ঘ, আরো মহাকাব্যিক কিছু লিখলেন না কেন তিনি? কেন রচনা করেননি আমাদের জাতির বৃহৎ উপন্যাস, ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ দলিল?”

      আমার ধারণা, মাহমুদুল হক ভবিষ্যত-দ্রষ্টা ছিলেন।

      সুমন রহমান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন anwar shahadat — জুলাই ২৫, ২০০৮ @ ৭:২২ পূর্বাহ্ন

      অদিতি ফাল্গুনীর লেখাটিতে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের নামটি যেভাবে এসেছে সেভাবে আজকাল কেউ লেখে না, অথচ তাঁকে বাদ দিয়ে ওই সময়ের সাহিত্য, ছোটগল্পের বা কোনো লেখার মূল্যায়ন অসম্ভব। এ প্রসঙ্গে অনেক কথা আছে, সে সব থাক। সব কিছুর উর্ধ্বে থেকে জ্যোতির নাম নেয়ার মধ্যে লেখক অদিতির ফাল্গুনীর সততা স্পষ্ট। অদিতিকে ধন্যবাদ।

      বিনীত

      আনোয়ার শাহাদাত

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Arafat — জুলাই ২৭, ২০০৮ @ ১২:১৪ পূর্বাহ্ন

      মাহমুদুল হকের সাথে এখনো পরিচয় হয়ে ওঠেনি…। অদিতি ফাল্গুনীর লেখাটি পড়ে আমার খুব উপকার হল। অনুর পাঠশালার সাথে অন্যান্য অনেক বিষয়ের আলোচনা লেখাটিকে বলিষ্ঠ করেছে…। ধন্যবাদ অদিতি ফাল্গুনীকে।

      Arafat

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন sajid — আগস্ট ৮, ২০০৮ @ ১২:২২ পূর্বাহ্ন

      সদ্যপ্রয়াত বরেণ্য কথাশিল্পী মাহমুদুল হককে নিয়ে আর্টস পাতায় আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। তর্কের সূত্রপাত মূলতঃ অদিতি ফাল্গুনীর ‘অনুর পাঠশালা: খঞ্জনা পাখির কাব্য’ নাম্নী নিবন্ধটির উপর সুমন রহমানের একটি প্রতিক্রিয়া থেকে।

      অবাক লাগছে এই ভেবে যে যেখানে অদিতি মাহমুদুল হকের একটি মাত্র গ্রন্থ অনুর পাঠশালা নিয়ে তীব্র আবেগপূর্ণ লেখার শুরুই করেছেন এই অগ্রজ লেখকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার্ঘ্য দিয়ে (ভাষার মগ্নতা, পেইন্টিংসের অবিশ্বাস্য সব রং আর কবিতার চিত্রকল্প নিয়ে গদ্যভাষাকে ভাঙা-গড়ার খেলাঘরে নিয়ে নিরন্তর ছাঁচ বদলের প্রচেষ্টা আমাদের এই বাংলায় যে গদ্যশিল্পী বিশেষভাবে করেছেন, সেই মাহমুদুল হক গতকাল প্রয়াত হয়েছেন। – অদিতি ফাল্গুনী) তাকে কেন অযথা নাজেহাল করা হচ্ছে? যারা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন, তারা লেখাটি ঠিক মতো পড়েছেন তো?

      মাহমুদুল হক সম্পর্কে নিবন্ধের শুরুতেই অদিতি জানাচ্ছেন যে, …”রশীদ করিম, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা হাসান আজিজুল হকের মতো আর্থ-সমাজ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দলিল রচনার চেয়ে ভাষাশরীরে অ্যাবসার্ডিটি ও সুররিয়্যালিজম, ব্যক্তির মনোজগতের টানাপোড়েনের নিদাঘ সাইকো-অ্যানালিসিস, প্রতীকবাদ ও চেতনাপ্রবাহ রীতি দ্বারা বেশি আচ্ছন্ন ছিলেন। কিছুটা ফরাসী ঘরানার এই লিখনশৈলী তাঁর পরে আরো খানিকটা আমাদের এপারে চর্চা করেছেন সম্ভবতঃ জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত।”

      মাহমুদুল হককে এখানে খর্ব করার কোন চেষ্টাটা করলেন অদিতি, আমি তো ঠাহর করতে পারছি না।

      ওপার বাংলার কমল কুমারের গোলাপসুন্দরী ও এপারের মাহমুদুল হকের অনুর পাঠশালার সাদৃশ্য নির্দেশ করতে গিয়ে অদিতি জানাচ্ছেন: “কমল কুমার এবং মাহমুদুল হক দু’জনেই তাদের এই দুটো বইয়েই মাথা থেকে ছুঁড়ে ফেলেছেন সমাজ, দেশ, রাজনীতি, সংসার, অর্থনীতি….জাগতিক সমস্ত বাস্তবতার ক্ষীণতম দায়বদ্ধতা! ভাষা ও শব্দের এক বিকারগ্রস্থ পরমা রক্তস্রোত আর সূফী সাধকের ‘আনাল হক’ (আমিই সত্য) ভাবোন্মদনার দিব্য সমাধির নিরাকার সাধনা…নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলা ও সুন্দরের এক ক্রম আবাহন ছাড়া এই দুই গ্রন্থেই লেখকদ্বয়ের অন্য কোনো অন্বিষ্ট নেই। ফলে, সমালোচকদের স্তূতি এই দুই বইয়ের জন্য তুলনামূলক কম। অন্তর্জলি যাত্রায় যেমন সতীদাহ বা কালো বরফ-এ যেমন দেশভাগ বা জীবন আমার বোন-এ সমাজ-রাজনৈতিক সমস্যা কিছুটা হলেও আছে, গোলাপ সুন্দরী বা অনুর পাঠশালাতে শিল্পের জন্য শিল্পের আর্তি ছাড়া আর কিছুই নেই!”

      ভাষার নৈরাজ্যকে শিল্পের বড় গুণ বা শর্ত হিসেবেই অদিতি এখানে দেখছেন। মাহমুদুলের নিন্দা নয়, নান্দীপাঠ করতেই এমনটি লিখেছেন তিনি। আর, অদিতির এই স্তবক হতেই স্পষ্ট যে সুমন যে অভিযোগ তুলছেন অদিতির বিরুদ্ধে যে লেখক হিসেবে মাহমুদুল হকের সমাজ সচেতনতা অদিতি অস্বীকার করেছেন, [অপরদিকে মাহমুদুল হকদের অপরাধ (বা কৃতিত্ব) হল তারা দেশ জাতি রাজনীতি নিয়ে উচ্চকিত হন নি — সুমন রহমান] তা ধোঁপে টেঁকে না। ‘ অনুর পাঠশালা’য় মাহমুদুলের বিভিন্ন নিরীক্ষা যেমন এক পৃষ্ঠায় মাত্র একটি পঙ্‌ক্তি লেখার মুগ্ধবোধ বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন অদিতি। শেষদৃশ্যে অনুর সাথে বৃদ্ধা সরুদাসীর সাক্ষাতের মুহূর্তটিকে শিল্পের জরুরি শর্ত অতিক্রমণ বা transcendence-এর উদাহরণ হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র প্রসঙ্গও টেনেছেন তিনি। পাতার পর পাতা উদ্ধৃত করেছেন অনুর পাঠশালার বিরলসম্ভব যত কবিতা তাড়িত পঙ্‌ক্তি।

      অদিতির লেখাটিতে মাহমুদুলের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশের বা তাকে খর্ব করার কোনো প্রয়াসই তো চোখে পড়লো না। বরং মাহমুদুল সম্পর্কে সাধারণ ভাবে প্রচলিত কিছু ঢালাও সমালোচনাকে খণ্ডন করতে গিয়ে তিনি প্রবন্ধের একদম শেষে এসে লিখেছেন: “মাহমুদুল হকের লিখনশৈলীকে অনেকেই প্রশংসা সত্ত্বেও ‘কাব্যাক্রান্ত’ বলেন এবং গদ্যের জন্য এমন ভাষা জরুরি কিনা তেমন প্রশ্ন তোলেন। ইলিয়াস কেন অনেক কেজো গদ্য বেছে নিয়েছিলেন কিম্বা তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় ইলিয়াস-হাসান জরুরি না মাহমুদুল-জ্যোতিপ্রকাশ জরুরি, সেসব তর্কে না গিয়েই বলা যায় হাসান আজিজুল হক যেমন ওপার বাংলার ‘বিজ্ঞাপন পর্বে’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে ‘সোশ্যাল রিপোর্টিং’ কে তৃতীয় বিশ্বের কথাসাহিত্যের মাধ্যম হতে বলেছেন কিম্বা ইলিয়াস যেমন ‘চিলেকোঠার সেপাই’য়ে সমাজ বিচিছন্ন বা এলিয়েনেটড নায়ক ওসমানকে মিলিয়ে দিয়েছেন গণ অভ্যুত্থানের প্রবল স্রোতে যেহেতু হাড্ডি খিজির বারবার তাকে ডাক দিয়ে যায়…মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগের অজস্র তর্জনী উঠতে পারে…আরো দীর্ঘ, আরো মহাকাব্যিক কিছু লিখলেন না কেন তিনি? কেন রচনা করেননি আমাদের জাতির বৃহৎ উপন্যাস, ইতিহাসের তাৎপর্যপূর্ণ দলিল? উত্তর একটাই। সৈয়দ মুজতবা আলী যেমন তুর্গেনিভ ও দস্তয়েভস্কির প্রতিতুলনায় বলেছিলেন যে দস্তয়েভস্কির মতো পিটার্সবুর্গের প্রতিটি অলিগলি কি পাতাল কুঠুরিতে হাঁটেন নি তুর্গেনিভ। রাশিয়ার সব বেশ্যা, বিপ্লবী, চোর, খুনে ও সন্তর অন্তরের গতিপ্রকৃতি নথিবদ্ধ করেন নি তুর্গেনিভ দস্তয়েভস্কির মতো। তিনি নিতান্ত ‘ভদ্রলোক।’ ঘরের জানালা গলিয়ে শরতের আলো যতটুকু আসে, তিনি ততটুকুই দ্যাখেন। প্রতিবেশীর বাগানে দুটো ছেলেমেয়ে লুকিয়ে প্রেম করছে, সেটাই তার সনেটধর্মী রচনার জন্য যথেষ্ট। সেই মাধুর্যই বুঝি কিছু কম?”

      sajid

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Md: Jahidul Islam — december ১৫, ২০১২ @ ৯:১৮ পূর্বাহ্ন

      মো: জাহিদুল ইসলাম
      অন‌্যায়ের বিরুদ্ধে তারাই নিরব থাকে , যারা মানুঘ নামে পশু ।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com