মার্কিন ঔপন্যাসিক জোসেফ হেলার: আমেরিকার রাজনীতি হাস্যকর

রেশমী নন্দী | ৮ এপ্রিল ২০১৮ ১১:২৭ অপরাহ্ন


মার্কিন লেখক জোসেফ হেলার রাজনীতির রঙ্গ আর রসিকতার গুরুত্বের সহাবস্থান ঘটিয়েছেন তাঁর কাজে। ছোট গল্প, নাটক, উপন্যাস সব কাজেই তিনি ‘এবসার্ডিটি’কে উপস্থাপন করেছেন অতুলনীয় ভঙ্গীতে। জীবদ্দশায় মোট সাতটি উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর লেখা সামথিং হ্যাপেন্ড আর গুড এজ গোল্ড বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে স্যাটায়ারধর্মী লেখার অনন্য উদাহরণ। আর ‘ক্যাচ ২২’ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদী সাহিত্যকর্ম বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। অনূদিত লেখাটি ১৯৮৮ সালে প্রচারিত এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকার। বিল মোয়েরসের সাথে জোসেফ হেলারের এই কথোপকথনটি জুড়েই রয়েছে ‘পলিটিক্যাল এবসার্ডিটি’ নিয়ে তাঁর কৌতুকজন কিন্তু চিন্তার খোরাক জোগানো মতামত।
হেলারের এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন বিখ্যাত সাংবাদিক বিল মোয়েরস। সাক্ষাৎকারটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন অনুবাদক রেশমী নন্দী।

বিল মোয়েরস: `গুড এজ গোল্ড’ বইটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়তে পড়তে একদিন রাত তিনটার সময় জোরে হেসে উঠেছিলাম-হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা যেখানটাতে বলছিলেন, ‘আমরা সত্যি কথা বলতে যাচ্ছি, এমনকি এর জন্য যদি আমাদের মিথ্যা বলতে হয়, তবুও।’ ; প্রেসিডেন্ট যিনি প্রথম বছরটা কোনো কাজ না করে কেবল একটি বই লিখছেন; অথবা সেই কর্মকর্তা যিনি বলছেন, ‘আমরা প্রশাসনে কোনো ইয়েস-ম্যান চাই না, আমরা চাই স্বাধীন সত্ত্বার একজন মানুষ যিনি আমরা যা ঠিক করবো সবটাতে সমর্থন দেবেন।’ রাজনীতি আপনার কাছে হাস্যকর লাগে কেন?

জোসেফ হেলার: রাজনীতি আমার কাছে হাস্যকর লাগে কারণ এটা হাস্যকর। আমরা কথা বলছি আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে। আপনি আমার বই থেকে তিনটা উদাহরণ দিলেন। আমার মনে হয়, গুড এজ গোল্ড-এর যে অংশগুলো পাঠকদের হাসায় সেগুলোর প্রায় সবই বাস্তব জীবনে অহরহ ঘটে। আমেরিকার রাজনীতি হাস্যকর। এর অনেক অনেক বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা যায়, খুব কম কিছুই আছে যেগুলো প্রশংসাযোগ্য। কিন্তু এর সম্পর্কে প্রশংসা বা সমালোচনা যে কোনভাবেই যে কথাটা বলা যায় তা হলো, এটা হাস্যকর রকমের মজার।

বিল মোয়েরস: আমরা রাজনীতিতে বিনোদন খুঁজছি। বিনোদন এখন রাজনীতির মঞ্চে আধিপত্য করছে।

এগুলো দেখতে মনে হয় মধুর ও সন্তোষজনক কিন্তু আদতে বিভ্রান্তিকর এবং কাল্পনিক। এর মধ্যে একটা হলো আদর্শ গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব বা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বলে কিছু হতে পারে। এ এক অন্যতম ভ্রান্তির জায়গা আমাদের। এ ভ্রান্তি আমাদের একধরনের স্বস্তিও দেয় যে ভোটের মাধ্যমে আমরা সরকার গঠনে অংশ নিচ্ছি। ভোট একধরনের শাস্ত্রাচার। ভোটের অধিকার পাওয়া আমাদের সন্তুষ্টির জন্য অপরিহার্য কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে বলতে হলে এটা একেবারেই অর্থহীন।

জোসেফ হেলার: আমার জন্য রাজনীতি হলো দর্শক মাতানো খেলা। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই আমার মনে হচ্ছে এতে বিনোদনের ঘাটতি হচ্ছে আর সে জন্যই আমি আগের মতো এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ পাচ্ছি না। গত ২০ থেকে ২৫ বছর আমি ভোট দেই নি। বরং আমার কেমন যেন বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে যে গণতন্ত্রের দর্শনে অনেক বিভ্রান্তি আছে। এগুলো দেখতে মনে হয় মধুর ও সন্তোষজনক কিন্তু আদতে বিভ্রান্তিকর এবং কাল্পনিক। এর মধ্যে একটা হলো আদর্শ গণতন্ত্র বাস্তবায়ন সম্ভব বা অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র বলে কিছু হতে পারে। এ এক অন্যতম ভ্রান্তির জায়গা আমাদের। এ ভ্রান্তি আমাদের একধরনের স্বস্তিও দেয় যে ভোটের মাধ্যমে আমরা সরকার গঠনে অংশ নিচ্ছি। ভোট একধরনের শাস্ত্রাচার। ভোটের অধিকার পাওয়া আমাদের সন্তুষ্টির জন্য অপরিহার্য কিন্তু প্রয়োগের ক্ষেত্রে বলতে হলে এটা একেবারেই অর্থহীন।

বিল মোয়েরস: গণতন্ত্রের ধারণার জন্য এই আনুষ্ঠানিকতা কি জরুরী নয়? যে সমাজে আমরা বাস করি, ভোট কি সেই সমাজের যুথবদ্ধতার ঘোষণা নয়?

জোসেফ হেলার: না, এখানেই তো বিভ্রান্তি- এই ভাবনা যে, ব্যক্তির ভোট আদতে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে তা না। বিজয়ী দল যাদের ভোটে বিজয়ী তাদের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সংবেদনশীল থাকবে, এ ধারণাও ঠিক নয়।

বিল মোয়েরস: রবার্ট বর্ক সুপ্রিম কোর্টের জন্য মনোনীত হয়েও হেরেছেন, এ তথ্য কি আপনার কাছে গুরুত্বপূর্ণ?
জোসেফ হেলার: নিশ্চয়। কিন্তু সেটা তো নির্বাচনের মাধ্যমে হয়নি।

বিল মোয়েরস: কিন্তু ওয়াল্টার মন্ডেল সম্ভবত কখনোই রবার্ট বর্কের নাম সিনেটে উত্থাপন করতেন না।

জোসেফ হেলার: আমি বলছি না যে প্রশাসনের মধ্যে রকমফের থাকতে পারে না। রকমফের আছে। কখনো কখনো খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য ভোট হয়ে থাকে, এমন বিষয় যাতে দুটো দল একে অপরের থেকে আলাদা হয়ে যায়। অবশ্য তেমনটা খুব কমই ঘটে। বেশিরভাগ ভোট ও দলের সদস্যপদ এমন কিছুর উপর নির্ভর করে যাকে বলা চলে সংকীর্ণ আনুগত্য। এ কারণেই জন কোনালির মতো মানুষ এত সহজে দলবদল করে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে রিপাবলিকানে যোগ দিতে পারে।

আমেরিকার রাজনীতিতে অর্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এইচ এল ম্যানকেন যেমন বলেছেন যে এটাই একমাত্র সমাজ যেখানে সদগুণের সমার্থক হল অর্থ এবং বড় রাষ্ট্রের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হলো একমাত্র রাষ্ট্র যা পুরোপুরি বাণিজ্যের দর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মানুষের কাছে প্রার্থীরা এমন সব ওয়াদা করে, যেগুলো তারা নিজেরাই জানেন পূরণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিশ্বাস করেন যে জনগন এসব প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করার মতো বোকা।

আমাদের কল্পনার একটা অংশ হলো, আমরা মনে করি আমরা প্রেসিডেন্ট ও অন্যান্যদের নির্বাচিত করি যারা আমাদের প্রতিনিধিত্ব করবে। বাস্তবে এমনটা হয় না। যা হয় তা হলো আমাদের সামনে দুজন প্রার্থী থাকেন এবং এদের মধ্যে থেকেই যে কোন একজনকে বেছে নিতে আমরা বাধ্য। আমরা তাদের সম্পর্কে কি ভাবি তাতে কিছু যায় আসে না। সাধারণত এসব প্রার্থী সমবিত্তবান ও সমান সামাজিক মর্যাদার মানুষদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়ে থাকেন। ডেমোক্রেট বা রিপাবলিকান হোক, অর্থের জোর তাদের থাকে। আমেরিকার রাজনীতিতে অর্থ খুব গুরুত্বপূর্ণ। এইচ এল ম্যানকেন যেমন বলেছেন যে এটাই একমাত্র সমাজ যেখানে সদগুণের সমার্থক হল অর্থ এবং বড় রাষ্ট্রের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই হলো একমাত্র রাষ্ট্র যা পুরোপুরি বাণিজ্যের দর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। নির্বাচনী প্রচারণার সময় মানুষের কাছে প্রার্থীরা এমন সব ওয়াদা করে, যেগুলো তারা নিজেরাই জানেন পূরণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু বিশ্বাস করেন যে জনগন এসব প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করার মতো বোকা। যেটা এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নির্বাচিত হওয়া। আমেরিকার রাজনীতিতে একজন প্রার্থীর সবচেয়ে জরুরী যোগ্যতা হলো নির্বাচিত হতে পারা। এছাড়া বাকি সবই গৌণ।

বিল মোয়েরস: কিন্তু, কর দেয়ার মতোই রাজনীতি কি সভ্যতার একধরনের মূল্য চুকানোর মতো একটা বিষয় নয়?
জোসেফ হেলার: আমরা রাজনীতি বাদ দিতে পারি না। এবং যারা গণতন্ত্র উপভোগ করেন, তারা সচেতনভাবে অন্য কোন ধরনের সরকারের জন্য ভোট দেবেন না। এটা বন্ধুত্বপূর্ণ, উপভোগ্যও। আপনার আমার মতো যারা এ দেশে ভালো খেতে পায়, থাকার ভালো জায়গা আছে এবং মোটামুটি নিশ্চিত থাকতে পারি যে আমরা রোজগার চালিয়ে যেতে পারবো ও যেভাবে আছি সেভাবে বাঁচতে পারবো, আমাদের জন্য গণতন্ত্রের কোন বিকল্প নেই। ভেবে দেখুন আমাদের হাতে বিকল্প কত কম?

বিল মোয়েরস: তা ঠিক। তবে আপনি যা বলছেন তার মধ্যেও দ্বৈততা আছে। যে রীতি মেনে আমরা আছি, আপনি বলছেন আমরা তা উপভোগ করছি। আবার বলছেন অনেকটা সেই মানুষের মতো যিনি বলেন, ট্রেনে চড়তে ভালোই লাগছে, কিন্তু আমি টিকেটের জন্য টাকা খরচ করবো না। যেমন ধরুন, জন কেনেডির নির্বাচনের কথা যেখানে এক এক এলাকার একটি করে ভোটের এদিক ওদিক হলেও রিচার্ড নিক্সন নির্বাচিত হয়ে যেতেন।
জোসেফ হেলার: ঐ প্রার্থীর ক্ষেত্রে প্রত্যেক এলাকায় একটি করে ভোটের বদল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ ছিল। আমি আপনার তুলনায় অনেক বেশি রূঢ়ভাষী। আপনি মনে হচ্ছে বিশ্বাস করেন যে রিচার্ড নিক্সন নির্বাচিত হলে অবস্থা আরো খারাপ হতো।

বিল মোয়েরস: অন্যরকম অনেক কিছু হতে পারতো। কে জানে কেনেডি মারা না গেলে কি হতে পারতো?
জোসেফ হেলার: আমরা আন্দাজ করতে পারি না। তবে আমার মনে হয় যে এটা অনেকটা দিবাস্বপ্নের মতো বিশ্বাস করা যে, কেনেডি নিহত না হলে অনেক কিছু অন্যরকম ঘটতো।

বিল মোয়েরস: এটা ঠিক রূঢ়তা না, এটা অদৃষ্টবাদিতা যেন আমাদের ভাগ্য পূর্বনির্ধারিত হয়ে আছে।
জোসেফ হেলার: আমার উপন্যাস পিকচার দিস লেখার জন্য ইতিহাস পড়ার পর আমি এই সিদ্ধান্তে এসেছি যে মানুষ ইতিহাস বানায় না, ইতিহাস ব্যক্তিত্ব তৈরি করে।

বিল মোয়েরস: কিন্তু ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে শর্তের যে গাঁথুনিতে আমাদের রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে আছে- ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ, ব্যক্তি আমলযোগ্য, আমাদের প্রকাশের সম্মিলিত স্বর শুনতে হবে- তার প্রতি আপনি আঘাত ছুঁড়ে দিয়েছেন।
জোসেফ হেলার: আমি বিশ্বাস করি ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সরকার একক ব্যক্তিকে আমলে নেয় না। সরকার সাধারণত যাদের উপর রাজত্ব চালায় তাদের ভালো হওয়া নিয়ে চিহ্নিত হয় না। এমনকি ইতিহাসও তাদের নিয়ে চিন্তিত না। ডাচ শিল্পী রেমব্রান্টের সময়কালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে আলু আনা হয় এবং ইউরোপে যুদ্ধকালিন তিরিশ বছর সময়ে সফলভাবে এ আলুর চাষ করা হয়। আলুর এই উৎপাদন অনেক লোকের কাছে রেমব্রান্টের আঁকা এরিস্ট‌েটল বা উইলিয়াম হার্ভেইর রক্ত চলাচল আবিষ্কারের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওই আলু হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। আপনি এর কথা কোথাও পড়বেন না।

বিল মোয়েরস: ভালো সরকার হলো সেই সরকার যে কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের অধিবাসীদের বেঁচে থাকা নিশ্চিত করবে না বরং প্রত্যেক ব্যক্তিকে সম্মান দেবে। এমনকি কেউ যদি সেই সরকারকে তোষামোদ না করে, তবুও।
জোসেফ হেলার: তেমনটা হলে তো ভালোই হতো। কিন্তু সেক্ষেত্রে এর উদ্দেশ্য কি হবে? জনসাধারণের জীবনমান উন্নত করা নাকি কেবল মাত্র মোট জাতীয় উৎপাদন বাড়ানো? আমরা মুনাফা দিয়ে উন্নতি বিচার করি। উন্নয়ন মাপার এও একটা উপায়, কিন্তু একমাত্র নয়। বিগত সময়ে কোন একক জাতির মধ্যে এত কোটিপতি ছিল না, আমাদের এখন যতজন আছে। একই সাথে আমাদের রয়েছে অসংখ্য গৃহহীন মানুষও। আমাদের অনেকগুলো সত্যিকারের সমস্যা আছে এবং আমরা এমনকি সেগুলো নিয়ে একমতও হতে পারছি না।

বিল মোয়েরস: আপনার সাম্প্রতিক উপন্যাসটি লেখার জন্য আপনি প্রাচীন গ্রীসে ফিরে গিয়েছিলেন কেন?
জোসেফ হেলার: প্রাচীন গ্রীসে গিয়েছিলাম কারণ আমি আমেরিকার জীবন ও পশ্চিমা সভ‌্যতা নিয়ে লিখতে চাইছিলাম। প্রাচীন গ্রীস লক্ষণীয়ভাবে -এবং ভয়ানকভাবে- এর সমান্তরাল।

বিল মোয়েরস: ভয়ানক?
জোসেফ হেলার: অত‌্যন্ত ভয়ানক। স্পার্টা ও এথেন্সের মধ্যে যে যুদ্ধ, সেই পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধে আমি এদেশ ও রাশিয়ার মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের আদিরূপ দেখতে পেয়েছি।

বিল মোয়েরস: গ্রীস সম্পর্কে আমাদের জনপ্রিয় ধারণা হলো, সেখানকার সমাজব্যবস্থা জ্ঞানসমৃদ্ধ, মানবিক ও যুক্তিপূর্ণ। আপনি কি এসব খুঁজে পেয়েছেন?
জোসেফ হেলার: না, এর কোনটাই আমি খুঁজে পাই নি। আদতে আমি যা খুঁজে পেয়েছি তা হলো সেখানে গণতন্ত্র যতই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাচ্ছিল, ততই এথেন্স ঝামেলাপূর্ণ, দুর্নীতিপ্রবণ আর যুদ্ধবাজ হয়ে উঠছিল। এথেন্সে গণতন্ত্র এসেছিল পেরিক্লিসের উত্থানের হাত ধরে যিনি গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন কেবল তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন বলে। কিন্তু ব্যবসাবাণিজ্য এথেন্সের জন্য গুরুত্বপূ্র্ণ ছিল, তাই ব্যবসায়ীরা একসময় রাজনীতির কলকব্জার নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করলো আর এথেন্স হয়ে উঠতে লাগলো আরো বেশি যুদ্ধপ্রবণ। পেলোপোনেসিয়ান যুদ্ধের জন্য কোন ইতিহাসবিদই এথেন্স ছাড়া আর অন্য কাউকে দায়ী করেন না। পেরিক্লিসের মৃত্যুর সাথে সাথে ব্যবসায়ীরা যখন এথেন্সের ক্ষমতা নিজেদের হাতে তুলে নিলো তখনকার পরিস্থিতি পুরোপুরি বিশৃঙ্খল হয়ে উঠেছিল। পিকচার দিস বইয়ের একটা অধ্যায়ের কিছু অংশ আমার খুব পছন্দ যেখানটাতে আমি এরিস্টোফেনিসের নাটক থেকে কিছু অংশ উল্লেখ করেছি। একটা নাটকে এরিস্টোফেন যুদ্ধ শুরু করার জন্য পেরিক্লিসকে দায়ী করেন আর এথেন্স ও ক্লেওনকে দায়ী করেন তা চালিয়ে যাওয়ার জন্য। ক্লেওন রাজদ্রোহের অভিযোগ তুলে এরিস্টোফেনিসকে আটকের চেষ্টা করেন কিন্তু ব্যর্থ হন। পরবর্তী বছরগুলোে তিনি আরো দুটি যুদ্ধবিরোধী নাটক লেখেন। জনতার রায়ে প্রত্যেকটিই প্রথম পুরষ্কার লাভ করে এবং প্রত্যেকবার এই জনগনই যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পক্ষে ভোট দেন।

বিল মোয়েরস:‘পিকচার দিস’ বইটিতে আমার প্রিয় অনুচ্ছেদটা বেশ ছোট: ‘এথেনিয়ান এসেম্বলিতে সিরিকাসের উপর আক্রমণের প্রস্তাব ছিল প্রবঞ্চনামূলক, দুর্নীতিগ্রস্থ, গাধামো, উৎকট দেশপ্রেম, বিরক্তিকর ও নিজেকে খুন করার সামিল। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সেটি পাশ হয়।’ এ অংশটুকু দিয়ে আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন?
জোসেফ হেলার: আমি বলতে চেয়েছি, গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষের আবেগ অন্যান্য সমাজব্যবস্থার তুলনায় কম বাস্তবসম্মত। তারা ব্যবহৃত হন। গণতন্ত্রে একজন নেতার কাজ হলো, যদি তিনি নেতা হতে চান, মানুষের ভাবনা ও আবেগকে ব্যবহার করা।

বিল মোয়েরস: ১৯৬৪ সালে কংগ্রেসে পাশ হওয়া গাল্ফ অব টনকিন রেজ্যুলেশনের কথা মনে করিয়ে দিলেন লিন্ডল জনসন যা ভিয়েতনামে যুদ্ধ শুরু করতে ব্যবহার করেছিলেন। কংগ্রেসের এমন উদ্দেশ্য ছিল না কিন্তু সেভাবেই জনসন একে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
জোসেফ হেলার: যখন আবেগ ব্যবহার করা ও সম্মতি নেয়ার কৌশলের কথা বলি আমি, তখন ঠিক এটাই বোঝাতে চাই। টনকিন উপকূলে কি হচ্ছিল তা কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন লিন্ডন আর তিনি যেটা ঘটেছে বলে জানিয়েছিলেন তা আসলে ঘটে নি। আমার মনে আছে পরে সিনেটর ফুলব্রাইট বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারি না যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আমাকে মিথ্যা বলবে।’

বিল মোয়েরস: ‘পিকচার দিস’ বইটাতে আপনি লিখেছেন, ‘এথেন্সে সবসময় বিভিন্ন দল একে অন্যের বিরুদ্ধে লেগে থাকতো এবং এসব ক্ষেত্রে এমন অনেকে থাকতেন যারা একইসাথে ন্যায়পরায়ণ ও শয়তান, স্বার্থপর ও উদার, বদমেজাজী ও শান্তিপ্রিয়।’ নতুন আর কি আছে?
জোসেফ হেলার: এ বিষয়ে আমি কিছু বলতাম না। আপনি এখন বইটির মূল বিষয়বস্তুর দিকে এগুচ্ছেন। আমি আমার উপন্যাস সম্পর্কে রিভিউ পড়ার আগ পর্যন্ত তেমন ভালো করে কিছু বলতে পারি না। তবে মোটামুটি আমি যা বলতে চেয়েছি, সেকথাই আপনি বললেন। বিষয়গুলো সাধারণভাবে এতটাই খারাপ ছিল এবং এর চেয়ে অনেক বেশি ভালো কখনোই ছিল না। যদিও আমি মজা করে বিষয়টা বলতে চেয়েছি কিন্তু এটা আসলে বেশ হতাশাব্যঞ্জক একটি উপন্যাস। এটা নিশ্চয় সবাই স্বীকার করে যে যেমনটা হওয়া উচিৎ আমাদের সরকার তেমনটা নয়। কিন্তু পরিস্থিতি কখনোই এখনকার চাইতে অনেক বেশি ভালো ছিল না এবং একথা ইতিহাসের প্রায় সব সরকারের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

বিল মোয়েরস: কোথাও একটা আপনি বলেছিলেন, আমাদের দেশের ইতিহাসে কলঙ্কজনক, দুর্নীতিপরায়ণ ও অদক্ষ সরকারের নজির অসংখ্য।
জোসেফ হেলার: হ্যাঁ, আমি সংবিধান প্রচলন প্রসঙ্গে অল্পস্বল্প পড়েছি। সংবিধান প্রবর্তনের আগে যে তিক্ততা ও দলাদলি ছিল, ম্যাসাচুসেটসকে সংবিধান গ্রহণ করাতে যে নানা ধরনের ফন্দিফিকির ও কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হয়েছিল, তা আমাকে একধরনের মজা দিয়েছে। সংবিধান চালুর ১০ বছরের মধ্যে ভিনদেশী ও রাজদ্রোহ সংক্রান্ত এ্যাক্ট পাশ করা হয়। ১০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ফেডেরালিস্ট দলটি জেফারসন ও মেডিসনের রিপাবলিকান ও আলেকজান্ডার হেমিলটনের কনজারভেটিভ দলে ভাগ হয়ে যায়। যে বিষয়টা আমার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে তা হলো যখন হেমিলটন বা অন্যরা এথেন্সের গণতন্ত্র ও ইতালির জনপ্রিয় প্রজাতন্ত্র নিয়ে কথা বলেন, তখন কন্ঠে থাকে সবসময় অমর্যাদার স্বর। সংবিধানে গণতন্ত্র শব্দটার কোন উল্লেখই নেই। গণতন্ত্র তাদের জন্য এমন এক হুমকি যা তারা সবসময় এড়িয়ে যেতে চান।

বিল মোয়েরস: জনতার আবেগকে তারা ভয় পেয়েছিলেন।
জোসেফ হেলার: তাদের মনে হয়েছিল যে, জনগন- এ শব্দই ব্যবহার করা হতো- ভোট দিতে জানে না, নিজেদের স্বার্থ সম্পর্কেও তারা সচেতন নয়। অন্য যে ভয়টা ছিল তা হলো জনতা আসলে জানে কিসে তাদের স্বার্থ আর তারা সে অনুযায়ীই তারা ভোট দেবে।
এথেন্সে যে গণতন্ত্রের চর্চা হতো তা নিয়ে প্লেটোর অন্যতম কঠোর সমালোচনা ছিল এই যে, আমজনতা জনপ্রিয় কোন কারণকে সামনে রেখে জনপ্রিয় কোন নেতাকে বেছে নেয়। এখন আমরা ধরে নিতে পারি যে রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রেও একই ভাবনা কাজ করে- মানুষ যা চায় তা তাদের দেয়া। প্লেটোর মতে, এর অর্থ বিশৃঙ্খল সরকার ব্যবস্থা। তিনি মনে করতেন, জনতার দ্বারা, জনতার ইচ্ছার প্রতি সংবেদনশীল সরকার এমন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয় জনগনের উপর যাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। জনগন যা চায় তা তাদের দাও, তখন নেতাদের হাতে আর সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আমার মনে হয় তিনি বেঁচে থাকলে দেখতেন, তাঁর ভয়ই সত্যি হয়েছে। যেমনটা আমি বলছিলাম, প্রার্থীরা পূরণ করতে পারবেন না জেনেই প্রতিশ্রুতি দেন যেগুলো তারা জানেন বোকা জনগন বিশ্বাস করবে আর তাদের একমাত্র উদ্দেশ্যই থাকে নির্বাচিত হওয়া।
আমি জানি না পরিস্থিতি কখনো এর চেয়ে ভালো হবে কিনা, তবে আমি অনুভব করতে পারি যে টেলিভিশনের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে রাজনীতির ধরণ পাল্টেছে প্রচন্ডরকম। আমার ছোটবেলায় ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট যখন ক্ষমতার জন্য লড়ছিলেন তখন আমার কোন ধারণাই ছিল না যে তিনি পঙ্গু ছিলেন কারণ তাঁকে আমরা কখনো দেখিনি। দেখলে হয়তো ঘটনা অন্যরকম হতো।

বিল মোয়েরস: আমার মনে হয় টিভির চেয়ে সাধারণ ভোটাররাই (the primaries) রাজনীতিতে পরিবর্তন বেশি এনেছে। জনগন যখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলছে তখন টিভির ভূমিকা বাহুল্য।
জোসেফ হেলার: প্রাচীন এথেন্সে প্রত্যেক পুরুষ সদস‌্যই রাজসভার সব জমায়েতে উপস্থিত থাকতেন এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই সরাসরি ভোট দিতেন। ওটা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ছিল না, ছিল সত্যিকারের গণতন্ত্র। তখনকার ব্যবস্থা আমাদের প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের চেয়ে, যা আমার কাছে মোটেও প্রতিনিধিত্বমূলক না, ভালোভাবে কাজ করেছে তা বলা যায় না। আমি জানিও না যে আমার এলাকার সাংসদ কে এবং তিনিও জানেন না আমি কে, নিশ্চিতভাবে তিনি এ নিয়ে মাথাও ঘামান না।
পিকচার দিস লেখার সময় অন্যতম যে বিষয়টি আমার মাথায় ছিল তা হলো কোন একজনকে মূল ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন না করে একটা আইডিয়াকে কেন্দ্র করে এগুবো। অর্থ, দখলবাজি আর বাণিজ্য মানব ইতিহাসে সদাসত্য। পিকচার দিস লেখাটি জুড়েও এ বিষয়গুলো আছে। যখন ওলন্দাজরা ইংরেজদের কাছে হারছিলো, তখন তারা তাদের অর্থ ও ব্যবসায়ীদের ইংল্যান্ডের ব্যাংক, বীমা, পুঁজি বাজারে পাঠাতে থাকলেন-আরো একবার তাতে প্রমাণ হয় যে প্রকৃতির অন্য নিয়ম থেকে অর্থের নিয়ম আলাদা। টাকাপয়সা যেখানে প্রয়োজন সেখানে নয় বরং সবসময় সেখানেই ছুটবে যেখানে তা বাড়বে এবং এক্ষেত্রে জাতীয় অানুগত্যের কোন ব্যাপার নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও আমরা তা দেখতে পাই। সম্ভবত কোন দেশের সম্পদের অধিকার নিতে এখন আর আমাদের যুদ্ধ শুরু করার প্রয়োজন নেই।
বিল মোয়েরস: একটা ব্যাপার আমাকে ভাবায়, যে দুজন মানুষকে আমি লেখক হিসেবে তারিফ করি, আপনি এবং এফ স্টোন, তাঁরা দুজনেই সম্প্রতি সক্রেটিসকে নিয়ে লিখেছেন।
জোসেফ হেলার: স্টোনের সক্রেটিস উপস্থাপন আমার থেকে একেবারে আলাদা।

বিল মোয়েরস: তিনি সক্রেটিসকে তুলে ধরেছেন এমনভাবে যিনি কিনা গণতন্ত্রকে এতটাই ঘৃণা করতেন যে নিজেকে রক্ষা করতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন কারণ এর জন্য তাঁকে মতস্বাধীনতার কাছে আবেদন জানাতে হবে যা হবে গণতন্ত্রকে যথার্থ বলে মেনে নেয়া।

জোসেফ হেলার: কিন্তু আরো একটু এগিয়ে স্টোন বলেছেন যে সক্রেটিস গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার পরিকল্পনার সাথে যুক্ত ছিলেন যার পক্ষে আমি কোন প্রমাণ পাইনি। অনেক বিশেষজ্ঞও স্টোনের বইয়ের এদিকটা নিয়ে কথা বলেছেন।
আমার কাছে সক্রেটিসের আবেদন অল্প কারণ বাস্তবে প্লেটোর দেয়া আদর্শ রূপ ছাড়া তাঁর কোন সত্যতা নেই। আমার জেনে খুব মজা লেগেছে যে সক্রেটিস নিজে কখনো এক লাইনও লেখেননি। দার্শনিক হওয়ার পক্ষে তিনি একটু বেশিই স্মার্ট। আমার বিশ্বাস তিনি হলেন তেমন মানুষদের একজন যাঁরা সব উন্নত সাংষ্কৃতিক আবহেই থাকেন, যাদের কথা আমরা কখনো শুনি না, সমাজের সত্যিকারের গুণী মানুষ যারা মানুষের দম্ভ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে অতিক্রম করতে পারেন। সক্রেটিস এক লাইনও লিখে যাননি। সক্রেটিসের মৃত্যুকে ঘিরে লেখা প্লেটোর চারটি বই বেশ জনপ্রিয়, বিশেষ করে তাঁর মৃত্যু দৃশ্য আর জীবনের বলা শেষ কথাগুলো যা দিয়ে আমি আমার উপন্যাস শুরুও করেছি, শেষও। প্লেটো যেভাবে সক্রেটিসকে উপস্থাপন করেছেন, সেই সাথে অন্য আরো কয়েকজন লেখক, তাঁদের মতো করেই আমি সক্রেটিসকে গ্রহণ করেছি। স্টোনও একই তথ্য নিয়ে কাজ করেছেন তবে পৌঁছেছেন ভিন্ন জায়গায়। আমার কাছে হেমলেটের মতোই সক্রেটিসকেও আকর্ষণীয় লাগে কারণ তিনি আমাদের কাছে অস্পষ্ট, এতটাই যে আপনি যেভাবে চান সেভাবেই তাঁকে দেখতে পাবেন।
বিল মোয়েরস: আপনার লেখার একটা অংশ আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। ‘ সক্রেটিস নিজের জীবন বাঁচাতে আইন ভঙ্গ করেন নি। তিনি জানতেন না সে আইন ভাল কিনা, কিন্তু তিনি জানতেন আইন আছে। এবং তিনি নিজের বিচার বা তাঁর মৃত্যুদন্ড এড়াতে এথেন্স ছেড়ে পালিয়ে যান নি।’

জোসেফ হেলার: এ কারণে আমি তাঁকে আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছি আর এ কারণেই প্লেটোর ‘এপোলজি’ পশ্চিমা সাহিত্যের অমর এক নিদর্শন।
বিল মোয়েরস: আপনার খুঁজে পাওয়া আইনের প্রতি এমন শ্রদ্ধার সাথে দ্বন্ধ রয়েছে রিচার্ড নিক্সন ও ওয়াটারগেট বা কর্নেল নর্থ, জন পয়েন্টডেক্সটার বা এড মেসের নৈতিকতার।

জোসেফ হেলার: ‘গুড এজ গোল্ড’এ আমি দেখিয়েছি ব্রুস গোল্ডের মতো মানুষদের জন্য রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কেবল ক্ষমতার জন্য নয় বরং সামাজিক স্বীকৃতির জন্য, সমাজের উঁচুতলার শ্রেণীভুক্ত হবার মতো সম্মানের জন্য। সুন্দরী নারীদের সাথে মোলাকাত হবে, বড় বড় পার্টিতে আমন্ত্রণ মিলবে।

বিল মোয়েরস: সক্রেটিসের সময়কালের দিকে তাকিয়ে আমাদের সময়ের এই সমাজ থেকে আপনি কি কিছু জেনেছেন?
জোসেফ হেলার: নাহ, এখানকার সমাজ নিয়ে আমার মতের পরিবর্তন হয় নি। কিন্তু আমার মত পুরোটাই তো বিরুদ্ধ মত নয়।

বিল মোয়েরস: আপাত বিরোধী আপনার মতামত।
জোসেফ হেলার: দেখুন, আপনি যদি আশা করেন যে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা সরকারের দক্ষতা বাড়াবে, তাহলে আপনাকে হতাশ হতে হবে। আবারো, হেমিলটন, জেফারসন, কার্লাইল বা অন্যরা ধরে নিলেন যে, একটা শিল্পোন্নত সমাজে সেখানকার শিল্পের চালক হওয়া উচিৎ রাজনৈতিক নেতাদের। তারা ধরে নেন যে তারা হবেন একাধারে বুদ্ধিমান, সৎ, দুরদর্শী এবং অর্থবান যারা আর নিজেদের সম্পদ বাড়ানোকে জীবনের লক্ষ্য ভাববেন না এবং কেবলই জনগনের কল্যানের দিকেই তাদের নজর থাকবে। আমরা জানি, তেমনটা হবার নয়।
এখন যদি ভালো সরকারের কথা বলা হয়, আমি স্বীকার করছি যে আমরা জানি না ভালো সরকার কেমন হয় বা হওয়া উচিৎ এবং আমার মনে হয় না কেউ তা জানে বা এ বিষয়ে আমরা সবাই একমত হতে পারবো। সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি যে আমরা একজন প্রেসিডেন্ট চাই যিনি মিথ্যা বলবেন না। আমরা এমন প্রশাসন চাই যার সদস্যরা নিজেদের বা পরিবারের বা বন্ধুবান্ধবের সম্পদ বাড়ানোর কাজে তাদের ক্ষমতা ব্যবহার করবেন না এবং যারা ছলেবলে আমাদের সাথে প্রতারণা করবেন না। আমরা দক্ষ মানুষ ভালবাসি যারা কোন একটা বিষয়ে লক্ষ্য স্থির করে তা অর্জনে প্রয়োজনে নতুন পথ খুঁজে বের করতে পারবেন। কিন্তু এসবের বাইরে যখন আমরা ভালো সরকার কি তা ভাবতে যাই, তখন আমাদের মধ্যে বিভাজন দেখা দেয় যেটা রাজনৈতিক দলগুলোতেও আছে। এক ধরনের ভাবনা হলো, একে আমরা বলতে পারি সনাতনী বা রক্ষণশীল ভাবনা, সরকার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করবে, বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করবে এবং সমাজের প্রতিটি মানুষের, এখন যুক্ত হয়েছে কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীরা, জন্য সমান সুযোগ তৈরি করবে যাতে তারা তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে আর যদি তা না পারে তাহলে সেই দুঃখও তাদেরই ভোগ করতে হবে, যেমনটা মন্দার সময় ঘটেছে।
অন্য মতটা হলো, সাধারণভাবে জনগনের মঙ্গলসাধন এবং যতটা সম্ভব মানুষের আর্থিক প্রয়োজন মেটানো
সরকারের দায়িত্ব। এই হলো সরকার নিয়ে দুটো ভিন্ন অবস্থান। কোনটা প্রয়োজন বা সরকারে কে আছে তার উপর নির্ভর করে জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয় কিন্তু সবসময়ই জনগনের ভালো কিসে তা নিয়ে মতপার্থক্য থাকেই। …

বিল মোয়েরস: রাষ্ট্রের স্থপতিরা জানতেন, এক সময় সরকারের সর্বোচ্চ দায়িত্ব হবে অতিরিক্ত বিষয়গুলোকে ঠিকঠাক করা এবং খারাপ কিছু ঘটা থেকে রক্ষা করা।
জোসেফ হেলার: হুমম কিন্তু সে খারাপগুলো আসলে কি? ভূমিকম্প, খরা বাদ দিলে এই খারাপ বলতে আসলে কি বুঝি?

বিল মোয়েরস: যুদ্ধ যেগুলো দেশের স্বার্থে নয়, ঘটে অজানা কারণে।
জোসেফ হেলার: কোন্ কোন্ যুদ্ধ আমরা করেছি যেটা আপনার আমার জাতীয় স্বার্থের সাথে সংগতি নেই?

বিল মোয়েরস: ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা বলা যায়।
জোসেফ হেলার: যে ব্যতিক্রমের কথা আমার মাথায় আসছে তা হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যাপারেও আমি খুব একটা নিশ্চিত না। এ যুদ্ধের ক্ষেত্রে এক তৃতীয়াংশ লোক এর পক্ষে ছিল, আরেক ভাগ এর বিপক্ষে ছিল আর কিছু মানুষের এ বিষয় নিয়ে মাথাব্যাথা ছিল না।

বিল মোয়েরস: ‘গুড এজ গোল্ড’ এ খুব চমৎকার একটা অংশ আছে যেখানে প্রফেসর ব্রুস গোল্ড জানতেন যে সভ্যতার শেষ ধাপের আগের ভাগে শৃঙ্খলার আড়ালে থাকে বিশৃঙ্খলা। তিনি জানতেন, আমরা সেখানে এরই মধ্যে পৌঁছে গেছি। আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যেও শৃঙ্খলা বর্তমান। এর আড়ালে আপনি কি দেখছেন?
জোসেফ হেলার: আমি এর মধ্যে শৃঙ্খলা দেখতে পাই না।

বিল মোয়েরস: এই গ্রীষ্মের দুটো কনভেনশনের দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন এগুলো কতটা সংগঠিত।
জোসেফ হেলার: ওহ, সভাগুলো সংগঠিত ছিল। নিশ্চয়। অনেকটা শুরুর আগের বিনোদন। কনভেনশনগুলো ভালো ছিল কিন্তু ভালোভাবে দেশ পরিচালনা করা অসম্ভব ব্যাপার। পিকচার দিস লেখাটির কোন এক জায়গায় আমি বলেছি যে এরিস্টটল কখন ভাবেন নি শহর মিলাবে অঞ্চলে, অঞ্চল মিলবে রাজ্যের সাথে, রাজ্যগুলো দেশের সাথে মিলে এত বড় একটা ব্যাপার হয়ে পুরোটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। নিউইয়র্ক যে কোন মাপেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে। আমার মনে হয় রাজ্য সরকারগুলোও নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। এখানে এত ভিন্ন মত যে সন্তুষ্ট করার পক্ষে তা অনেক বেশি আর ইতিহাস জুড়ে যেমনটা ছিল এখনো নিজের স্বার্থ তেমনই মানুষের প্রণোদনার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।

বিল মোয়েরস: আমলাতন্ত্রের এ কাঠামোর পেছনে আপনি কি কোন শৃঙ্খলা দেখতে পান না? সরকারের পেছনে কোন শাসন নীতি? বস্তুর পেছনে কোন সংগঠন?
জোসেফ হেলার: না।

বিল মোয়েরস: কেবল বিশৃঙ্খলা?
জোসেফ হেলার: এটা বিশৃঙ্খলা না। এজন্য ধন্যবাদ দেয়া যায় অধিকার রক্ষার আইন, সুপ্রিম কোর্ট আর স্বাধীন গণমাধ্যমকে। আমরা মুক্ত মানুষ। আমরা বেশিরভাগ মানুষই সম্ভাবনাময়। আমি বলছি বেশিরভাগ মানুষ যদিও প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র সীমার কাছাকাছি বাস করে। কিন্তু তারপরও এ অবস্থা নিশ্চয় পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশের তুলনায় ভালো। আমাদের কিছু চমৎকার ঐতিহ্য আছে। বিপ্লবের ঐতিহ্য আমাদের নেই এবং আমার মনে হয় না আমরা আর কোন বিপ্লব ঘটাতে পারবো, কারণ বিপ্লব মধ্যবিত্তের বিষয়। সমাজের অবহেলিত দুঃস্থ মানুষরা বিপ্লব ঘটায় না। বিপ্লব আসে সাধারণত শিক্ষিত মানুষের হাত ধরে। পেট্রিক হেনরি যখন বলেছিলেন ‘ আমাকে হয় স্বাধীনতা দাও, নয় মৃত্যু’, তিনি তখন এমন জায়গায় বাস করতেন যেখানে অন্য অনেক জায়গার তুলনায় বেশি স্বাধীনতা ছিল।

বিল মোয়েরস: এক হিসেবে রাজনীতি গীর্জার বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেমোক্রেটিকদের অধিবেশনে জেসে জ্যাকসনের বক্তব্য বা রিপাবলিকানদের অধিবেশনে জেরি ফলওয়েলের বক্তব্য খেয়াল করুন। আর রাজনীতি থিয়েটারের সাথেও পাল্লা দিচ্ছে। যথেষ্ট নাটক উপহার দিচ্ছে রাজনীতি আমাদের।
জোসেফ হেলার: এটা জেনে কি খুব বিরক্তি লাগে না যে, প্রার্থীদের ভোটে নির্বাচিত করার জন্য প্রস্তুত করতে নানা সংস্থা আর বিশেষজ্ঞ আছেন? তারা প্রার্থীদের বলে দেন কি পড়তে হবে, কিভাবে দাঁড়াতে হবে, কি বলতে হবে। কিন্তু এটা কি একই সাথে অসহ্য ব্যাপার নয় যে আমরা বিষয়টা জানি কিন্তু এ নিয়ে উচ্চবাক্য করি না?
বিল মোয়েরস: রাজনীতি আমাদের জাতীয় ধারাবাহিক নাটক। আমরা জানি যে আমরা নাটক দেখছি, কিন্তু আমরা দেখেই চলেছি এবং তাতে সাড়াও দিচ্ছি।
জোসেফ হেলার: যাই হোক, আমাকে এ থেকে আপনি বাদ দিতে পারেন। আমি অধিবেশনগুলো দেখি না, শেষেরটাও দেখি নি আর আমি ভোট দেই না, কারণ ভোট দেয়ার কোন কারণ আমি খুঁজে পাই না।

বিল মোয়েরস: আপনি অর্থ দেন?
জোসেফ হেলার: হ্যাঁ, অর্থ আমি দেই কারণ এটা ভোটের ফলাফল নির্ধারণে সাহায্য করে। কিন্তু আমি কখনো ভোট দেই না। কোন মানেই নেই এর। এ থেকে কিছু পাওয়া যায় না। নিউইয়র্ক টাইমসে সম্প্রতি কৃষ্ণাঙ্গদের এগিয়ে যাওয়া নিয়ে একটা সম্পাদকীয় লেখা হয়েছে। প্রায় ২৫ বছর হতে চললো নাগরিক অধিকার আইন পাশ হয়েছে। এতে লেখা হয়েছে কতজন কৃষ্ণাঙ্গ সরকারী অফিসে কাজ করছে। এ বিষয়ে আমার বলার মতো কথা হলো: যে কোন একটা বড় শহরে যান অথবা যে কোন ছোট শহরের দরিদ্রতম অংশে যান আর তারপর দেখুন ভোটের অধিকার পাওয়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের অবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে। ব্যতিক্রম এখন সামনে আনা যায়। এ দেশের, এই গণতন্ত্রের অনেক কিছুর মধ্যে ও বিষয়টা আমি ভালবাসি। এদেশে সত্যি কারো যদি ক্ষমতা থাকে তবে নির্দিষ্ট কিছু আইন মেনে চললে তার এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে তেমন কোন বাধা নেই। কিন্তু সমষ্টিগতভাবে – প্রায় ৫০ভাগের বেশি মানুষ এ দেশে দারিদ্র সীমার কাছাকাছি বাস করে।

বিল মোয়েরস: ‘ক্যাচ ২২’ তে ইয়োসারিয়ান ধরে নেয় যে প্রচলিত পদ্ধতি পুরোটাই উদ্ভট আর এ থেকে পালালেই বীর হওয়া যাবে। ও তখন একটা নৌকাতে চাপে। বইয়ের শেষভাগে দেখা যায়, তীর থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দিকে এগুচ্ছে। কিন্তু আপনার নতুন বই ‘পিকচার দিস’এ কাউকে পালাতে দেখা যাচ্ছে না।
জোসেফ হেলার: ‘ক্যাচ ২২’তে ইয়োসারিয়ান পালায় নি, পালাতে চেষ্টা করেছে। ওর সামনে বিকল্প ছিল: দুর্নীতি মেনে নিয়ে তা থেকে ফায়দা নাও , আমাদের সাথে যোগ দিয়ে আমাদের একজন হও, আমরা তোমাকে এগিয়ে নিয়ে যাবো, তোমাকে বিজয়ীর বেশে ঘরে পৌঁছে দেবো অথবা মিশনে যেতে রাজী না হয়ে জেলে যাও বা একের পর এক মিশনে যোগ দাও যতক্ষণ না পর্যন্ত তোমার মৃত্যু হয়। এ দুটো জঘন্য বিকল্প থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে ‘না’ উচ্চারণ করেই নিজেকে সে তুলে ধরতে পারে। এখন ও জানে, ও সুইডেনে যাচ্ছে না। ওকে বাইরে বের করে উপন্যাসটা শেষ হয়।

পিকচার দিস এর বিষয়বস্তু হিসেবে যুদ্ধ সেভাবে আসে নি যদিও যুদ্ধ আমেরিকা সেই সাথে এই পাশ্চাত্য ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনা। এ বইটাতে আমি বলেছি পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনা মানে সভ্যতার সমাপ্তি ঘটানো, যেমনটা আমরা জানি। ক্যাচ ২২তে আশা আছে আর এটা শেষ হয়েছে বেশ আশাব্যঞ্জকভাবে। পিকচার দিস এর ক্ষেত্রে তা নয়।

বিল মোয়েরস: আপনি এবং আই এফ স্টোন দুজনেই প্রাচীন গ্রিসে সম্ভবত গিয়েছিলেন স্বর্ণযুগের সন্ধানে আর আপনাদের দুজনেরই, আপনার বইটা লেখা হওয়ার পর, দেখা যাচ্ছে মোহভঙ্গ হয়েছে।
জোসেফ হেলার: আমাকে আরো একটু কৃতিত্ব দাও। আমি প্রাচীন গ্রিসে এখানকার চেয়ে ভালো কিছু পাবার প্রত্যাশা নিয়ে যাই নি। আমি গিয়েছি একটা ভালো উপন্যাসের জন্য বিষয় খুঁজতে। আমি বলবো: যে কোন ধরনের শিল্পী, বিশেষ করে একজন ঔপন্যাসিকের কাজের জন্য গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো কোন পরিবেশ হতে পারে না। উপন্যাসে প্রকাশ বৈশিষ্ট্যগতভাবে দ্বন্ধপূর্ণ। খুবই জটিল এটা। এ দেশে পূর্ণ স্বাধীনতা নিয়ে কিছু লিখতে পারাটা বেশ চমৎকার, এই যে একেবারে খোলা মনে কথা বলতে পারা এটা জেনে যে আমাদের মধ্যে যে কেউ চাইলে কোন আনুষ্ঠানিক শাস্তির ভয় না পেয়ে কোন সরকারী কর্মকর্তাকে অপমানসূচক কিছু বলে ফেলতে পারি, এটাও বেশ চমৎকার।
বিল মোয়েরস: তাহলে গণতন্ত্র অর্থহীন হলেও অনভিপ্রেত নয়।
জোসেফ হেলার: গণতন্ত্রের চেয়ে ভালো আর কোন রকমের সরকার ব্যবস্থা আমরা কল্পনা করতে পারি না। নিশ্চয় আমরা এখনকার চেয়ে ভালো সরকারী কর্মচারী পেতে চাইবো, চাইবো যে ক্ষমতা পেতে যারা তাদের সাহায্য করেছে তাদের চেয়ে নিজেদের দায়িত্বের প্রতি তারা বেশি মনোযোগী হবে। অথচ, গুড এজ গোল্ড-এ ব্রুস গোল্ডের ভাষ্য হলো: ক্ষমতা পাবার পর একমাত্র দায়িত্ব ক্ষমতায় টিকে থাকা।
গণতন্ত্র এক আদর্শ ধারা। সমস্যাটা এর প্রয়োগে। মানুষের সংকীর্ণ কিছু আনুগত্যের জায়গা রয়েছে- উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিজ স্বার্থ সিদ্ধি। নিজেদের উচ্চাশার জন্য লড়তে গিয়ে মানুষ সমস্যার মুখোমুখি হয়। আমরা সবাই জানি যে মিথ্যা বলা পাপ। আমরা জানি লোভ করা পাপ। আমরা জানি দেশপ্রেম এক গুণ, যদি দেশপ্রেমের সংজ্ঞা নির্দিষ্ট করে নেয়া যায় আর এতে জনপ্রিয় কোন জাতীয় স্বার্থ জড়িত থাকে। আপনাকে একটা বাক্য বলি: ‘আমাদের জানা মতে সব সমাজই ক্ষমতাসীন এক বা একাধিক দলের স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হয়।’ আপনি কি এখনকার এমন কোন দেশ বা সমাজের কথা বলতে পারবেন যার ক্ষেত্রে এ বাক্যটি প্রযোজ্য নয়?
বিল মোয়েরস: না।
জোসেফ হেলার: এ বক্তব্যটি ৩৮০ খৃষ্টপূর্বে প্লেটোর লেখা দ্যা রিপাবলিক থেকে নেয়া। এ সময়ের মধ্যে অন্য কোন সমাজের ক্ষেত্রে কি এ কথাটা অসত্য? এর উত্তরও না, ঠিক? অতীতের চেয়ে অনেক ভয়াবহ সময়ে আমরা বাস করছি কারণ নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার কৌশল আরো উন্নত হয়েছে। কিন্তু বলতে খারাপ লাগছে যে সমাজের চরিত্র ভালো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না।

বিল মোয়েরস: ভয়ংকর সময়ে মানুষ অলৌকিক কিছুর জন্য প্রার্থনা করে। এটা আমাকে আপনার ১৯৭৯ সালে বাইবেলের ডেভিডকে নিয়ে লেখা ‘গড নোজ’এর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আপনি নিজে যেখানে ঈশ্বরের নীরবতা নিয়ে ইঙ্গিত করেছেন, জানিয়েছেন যে, যখন মানুষের ঈশ্বরকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়, তখন সেখান থেকে কোন উত্তর পাওয়া যায় না। আপনি অলৌকিকতায় বিশ্বাস করেন না, তাই না?
জোসেফ হেলার: অলৌকিকতায় আমার বিশ্বাস নেই কারণ দীর্ঘদিন আমরা অলৌকিক কিছুর দেখা পাই না। কার কথা বলছি ঠিক মনে করতে পারছি না, সম্ভবত মার্ক টোয়েন, যিনি বলেছেন, ‘যত বেশিদিন আমি বাঁচবো, তত বেশি ঈশ্বরের আক্কেল নিয়ে আমার সন্দেহ বাড়তে থাকবে।’
বিল মোয়েরস: কিন্তু হয়তো সেই নীরবতার পেছনে অন্য কিছু আছে। হয়তো ঈশ্বর নীরব কারণ সেটাই আমাদের হুঁশে ফিরিয়ে আনার, দায়িত্বে সমর্পণ আর আত্ম উদ্ধারের সবচেয়ে ভালো উপায়, আমরা যাতে দেখতে পাই যে আমাদের নিজেদেরই অলৌকিক কিছু ঘটাতে হবে। হয়তো সেটাই গণতন্ত্রের মূল কথা।
জোসেফ হেলার: এটাই যদি সবচেয়ে ভালো উপায় হয় যে আমেরিকা, ভিয়েতনাম, নিকারাগুয়ার হাজার হাজার মানুষকে ধ্বংস করে – অসংখ্য, অসংখ্য জীবন নষ্ট করে- ঈশ্বর যদি এটাই করতে চায়, তাহলে আমার মনে হয় তাঁর দায়িত্ব জর্জ বুশ বা রবার্টসনের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিৎ।
আমি বিশ্বাস করি না ঈশ্বর এভাবে কাজ চালায়। আমার মনে হয় না কেউই এ কথা বলবে। আমার মনে হয় আপনি আমি এমনকি পেশাদার রাজনীতিবিদরাও একমত হবেন যে অদক্ষ সরকারের চেয়ে দক্ষ সরকার বেশি কাম্য। স্বার্থপর প্রশাসনের চেয়ে নিঃস্বার্থ প্রশাসন কাম্য। সব সুস্থ মানুষ এ বিষয়গুলোতে একমত হবেন। সমস্যা যেটা দাঁড়ায় তা হলো কিভাবে এসব অর্জন করা যায়, তা নিয়ে।
বিল মোয়েরস: সেই পুরোনো দ্বন্ধ।
জোসেফ হেলার: যাই হোক, এর কোন নিদান নেই।
বিল মোয়েরস: আপনি এথেন্সেও তা খুঁজে পান নি?
জোসেফ হেলার: না, এথেন্সে আমি তা খুঁজে পাই নি। একই সাথে আমরা সবসময় সরকারের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলি – এবং এসব অভিযোগ সরকার ব্যবস্থা শুরু থেকেই আছে। আমরা নিজেদের ঠকাই আর আগের সরকারগুলোর উপর দেবত্ব আরোপ করি। আমার নিজের অভিজ্ঞতায়, এফডিআর-এর প্রথম চার বছর ছাড়া আর আলাদা ধরনের কোন সরকার আসে নি। থমাস জেফারসন ও মেডিসনের ভাবনা ব্যতিক্রমি। জিমি কার্টার তাঁর সৎ চরিত্র নিয়ে অসাধারণ। কিন্তু আমার মনে হয় না ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নেয়া সিদ্ধান্তগুলো তত গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল। একই ব্যাপার আপনি দেখতে পাবেন যদি আপনি রাজপুরুষদের দিকে তাকান। এমন কোন ব্যবস্থার কথা আমি কল্পনা করতে পারি না যেখানে যে ধরনের মানুষকে আমরা চাই তাদের আমরা ক্ষমতায় দেখতে পারি।
বিল মোয়েরস: অতএব?
জোসেফ হেলার: অতএব এভাবেই চলতে থাকবে আর আমরা আশায় বুক বেঁধে রাখবো যে পরিস্থিতি এখন যেমন রয়েছে তার চেয়ে বেশি যেন আর খারাপ না হয়। আমি যা বলেছি তার মধ্যে স্ববিরোধীতা আছে কিছুটা। আমি সেই সব মানুষদের একজন যারা লাভের উদ্দেশ্যে চালিত ব্যবস্থা থেকে উপকার ভোগ করছি। আমি অর্থকে মূল্যায়ন করি, প্রণোদনা ভাবি এবং সেটা আমার লেখায় তুলেও ধরেছি। আমি অর্থ নিয়ে বেশ সচেতনও। আমি আমার প্রকাশকদের কাছে কম অর্থে বই বেচি না। বেশ ভালো রকম দরকষাকষি হয়। আমি আমার মূল্য জানি। আমি এটা জানি যে কতটুকু পেলে যথেষ্ট পাওয়া হয়েছে। কিন্তু আমি এটাও জানি যে যতদিন ইচ্ছা লেখা চালিয়ে যাবো, তারপর লেখা ছেড়ে আমার যা অর্থ থাকবে সেগুলোকে দ্বিগুণ তিনগুণ করার কাজ শুরু করবো।
বিল মোয়েরস: মানবপ্রকৃতির বিপথগামীতা ‘ক্যাচ ২২’ এর উপজীব্য, আমাদের রক্ষা করার জন্য তৈরি করা নিয়মগুলো শেষ পর্যন্ত আমাদের গলা চেপে ধরে। ইয়োসারিয়ান এসবের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। আপনি যেমনটা উল্লেখ করেছেন, সে তার ‘না’ উচ্চারণ করেছে এবং যাত্রা শুরু করেছে সমুদ্রে। এই লং আইল্যান্ডের দক্ষিণ তীরে আজ বিকেলে যদি ও উঠে আসে, ওকে নিয়ে আপনি এবার কি গল্প লিখবেন?
জোসেফ হেলার: যদি ও ভাসতে ভাসতে এখানে এসে পৌঁছে, আমি ওকে বলবো, এখান থেকে ভাগ। গল্পটার সুন্দর সমাপ্তি নষ্ট কোরো না। কিন্তু মনে হচ্ছে এখন আপনি আমার সাথে না, ওর সাথেই কথা বলছেন, তাই কি?

আর্টস বিভাগে প্রকাশিত রেশমী নন্দীর আরও লেখা:

ইউসুফ ইদ্রিসের গল্প: এক কামরার ঘর

উম্বের্তো একোর সাক্ষাৎকার: আমরাই একমাত্র জানি যে আমাদের মরতেই হবে

যুগলের বিয়োগাত্মক সমাপ্তি

রবার্ট শেকলির বিজ্ঞান কল্পকাহিনী: জীবনধারনের খরচ

শব্দের জাদু– অনুবাদে ঠিক কতটা হারাই?

জ্যাক লন্ডনের দুষ্প্রাপ্য ছবি

ভার্জিনিয়া উলফের ছোটগল্প: অভিশপ্ত বাড়ি

সাম্প্রতিক বিশ্বসাহিত্য : যন্ত্রের পেটে ছোটগল্প

বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতি: ওবামা চিত্র ও সংকটে বিস্ময়ে “Surreal”

চিকিৎসক হিসেবে আমার শেষদিন

লুসি কালানিথি: বৈধব্য আমার যুগল জীবনের সমাপ্তি টানেনি

আমার ভেতর যে নারীর চলন

কথাসাহিত্যিক হুয়ান রুলফোর আলোকচিত্র : আলোছায়ার অজানা স্রষ্টা

Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরাফাত হোসেন — এপ্রিল ২৫, ২০১৮ @ ১১:২৪ অপরাহ্ন

      প্রাঞ্জল সাক্ষাৎকার। দারুণ ভালো লাগল। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে |

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।