শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিদায় মাহমুদুল হক। এ জীবনের জন্য বিদায়।

kajal_shaahnewaz | 22 Jul , 2008  

মাহমুদুল হক আমার প্রিয় লেখক। আজ সকালে (২১ জুলাই ২০০৮) সাড়ে দশটায় তাঁকে দেখতে গেলাম ২৭৪, শেখ সাহেব বাজার (আজিমপুর) এর বাসায়। অনেকগুলি লেন বাইলেন, অনেক ছাদের নিচা, ৯০ ডিগ্রী হাটার
mahmudul-haque-2.jpg
মাহমুদুল হক (বারাসাত, ভারত ১৯৪০ — ঢাকা ২১/৭/৮) এ বছরের মে মাসে লালবাগের বাসায় লেখক; ছবি. Atiqul Alam

বাঁক, আধ খোলা দরজার আহবান পার হয়ে প্রাক্তন উঠানের ওপর অর্ধসমাপ্ত সিঁড়ি ধরে আধা খোলা একটা দোতলায় উঠে দেখি শুয়ে আছেন মাহমুদুল হক — বাংলা গদ্যের এক অতি দক্ষ সেনাপতি, অসংখ্য ভাষাযুদ্ধের সার্থক বিজয়ী, অনিন্দ্য সুন্দর ব্যজস্তুতি আর বক্রোক্তি’র সেনা প্রধান।

মাহমুদুল হক মারা গেছেন বলে বিস্ময় লাগছিল না। কবে থেকেই তো উনি লিখতেন না! বাসাভর্তি তাঁর অতিচেনা স্বজনেরা দরকারী কাজ ও শোকে মুহ্যমান। পাড়ার ছেলেরা গম্ভীর মুখে আসা যাওয়া করছে। শিখশা বাজারের এই এলাকাটা বেশ গা ঘেষাঘেষি করা, মনে হয় অনেকেই অনেকের চেনা। কোনো কিছুতেই লোকবলের অভাব নাই। স্বেচ্ছাসেবী ও নিশ্চয়ই অনেক।

স্বজনদের মধ্যে কয়েকজন বিভিন্ন বয়েসের সাহিত্যসেবীদের মুখও দেখা গেল। তাঁর বয়েসি। তবে তরুণমুখও আছেন। সকালেও কেউ কেউ নাকি এসেছিলেন।

কতগুলি প্লাস্টিকের চেয়ারে আমরা কি একটার জন্য যেন বসে আছি। এরকম আরো কয়েকটা চেয়ার তাঁর খাটের দুই পাশে রেখে একটা কালো মোটা চাদর দিয়ে পা থেকে মাথা পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। কে যেন জিজ্ঞেস করে: বুদ্ধিজীবি গোরস্তানে? আরেকজন বলে: ঠিক নাই, আজিমপুরেও বলা আছে। কে জানে ঢাকা শহরের কোন এলাকার মাটি তাঁকে নেবে। দোলাচল। মাটির জাহাজ, তুমি কোন বন্দরে ভিড়বে?

এক কোনায় একটা পাখির খাঁচা খানিকটা অবহেলায় একটু কাত হয়ে আছে। খাঁচায় দুইটা বিদেশী চেহারার পাখি। হঠাৎ হঠাৎ ঝাপটা দিচ্ছে। শোকের বাড়িতে এমন হয়, মাঝে মাঝেই সবাই চুপ হয়ে যায়। এই ঘন বসতির মধ্যেও আমরা বিষণ্ন হয়ে যাচ্ছিলাম যখন, শব্দশূন্যতায় আক্রান্ত হচ্ছিলাম, তখন একবার দুইবার খাঁচার ভিতর অচিন পাখি দুটি ছটফট করে উঠল।

বারটা বাজলে কে যেন বলে: বাংলা একাডেমীতে নিতে হবে। এবার বিদায় দেন। ঘরের ভিতর থেকে তিনজন বোন এলেন। উত্তর দক্ষিণ বরাবর শোয়ানো লেখক ভাইটির শেষ মুখ দেখে প্রায় নিঃশব্দ কান্না যেন একটু শক্তি পেল জীবনের বোনদের। আলুথালু বড়বোন ভাইয়ের কাছে গিয়ে বললেন: ভাই আপনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন, আমরা যদি আপনাকে কোনো বেদনা দিয়ে থাকি। আর আমরাও আপনাকে সব দাবি থেকে মুক্তি দিয়ে দিলাম, যদি কোন দাবি থেকে থাকে। যে ভাষায় বললেন তা এত বিষণœ, এত গোছালো আর সহজ যে সবার চোখ ভিজে উঠল। লেখক না একবার বলেছিলেন, তাঁর গদ্যশৈলীর পিছনে মায়ের কথা বলার ভঙ্গিটা ভীষণ প্রভাবিত করেছিল! বোনদের কথা বলা শুনে আমার মনে হল: তাইত তাইত তাইত!

মাটির জাহাজ এলেন বর্ধমান হাউসে। মৃত কবিলেখকদের শেষকৃত্যের আগের টার্মিনাল-এ। সবুজ ঘাসের পাশে তাঁকে উঁচুতে রাখা হল।

নগরের অনেকেই এলেন; সাহিত্য যশঃপ্রার্থী, কবি, গল্পলেখক, চলচ্চিত্রকার, সাংবাদিক, ফটোগ্রাফার, স্বজন, বান্ধব, নারী পুরুষেরা। সবাই ভিড় করে তাঁর সুরমা লাগানো আধখোলা চোখ দুইটা দেখলো, তাঁর দৃঢ় চিবুক দেখলো, তাঁর শুয়ে থাকা দেখলো।

আশেপাশে তাকাই। তাঁর গল্পের মূল চরিত্রেরা কোথায়? আজকে কি তাদের আসা দরকার ছিল না? প্রিয় লেখককে শেষবারের মত চাক্ষুষ দেখতে মন চাইল না তাদের? জয়নাল কৈ, মনোহর কৈ, আলমাছ বিবি?

কিন্তু না, দুএকটা ব্যতিক্রম বাদে মাটির জাহাজের চারদিকে আমরা সবাই রুমাল ব্যবহারকারীরা ভিড় করে থাকি। জীবিত মাহমুদুল হক আমাদের দরকার নাই, আমাদের দরকার মরহুম মাহমুদুল হককে। একটা মৃত রুমাল, কবরে ছুঁড়ে ফেলার জন্য।

আমাদের পত্রিকাঅলা, চ্যানেল টিভি, বাংলা একাডেমী, সারস্বত সমাজ — সবাই প্রতিদিন একটা নতুন রুমালের সন্ধানে নেমেছি।

বিদায় মাহমুদুল হক। এ জীবনের জন্য বিদায়।

kajal.shaahnewaz@gmail.com

ছবির সৌজন্য: মাহমুদুল হক পেজ, ফেসবুক।


4 Responses

  1. শাকিল হাসান says:

    ধন্যবাদ কাজল শাহনেওয়াজ, মর্মস্পর্শী লেখাটার জন্য।

    এই লেখক ৮১ সালের পর থেকে আর লেখেনি শুনেছি — এতগুলি ভাল ভাল উপন্যাসের পর এই এতগুলি বছর কেন নিশ্চুপ ছিলেন,এই শুলুকসন্ধান কেউ করেছে? এই অনুসন্ধানে লেখকের অন্তর্জগতের না জানা অনেক সংবাদ হয়ত জানা যেত। আমার মত অনেকেই আশা করে আছে, কবি জীবনানান্দ দাশের মত তাঁরও অনেক অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির দেখা পাব আমরা।

    শাকিল হাসান

  2. এহেছান লেনিন says:

    খুব বেশিদিন হয়নি। এই সেদিন আজিজ মার্কেটে গিয়ে মাহমুদুল হকের প্রতিদিন একটি রুমাল বইটি অনেক খুঁজে বের করলাম। যখন বইটি কোথাও পাচ্ছিলাম না তখন বইওয়ালাদের ওপর খুব রাগ হয়েছিল। ভাবছিলাম এমন একজন লেখকের বই তারা কেন রাখে না।

    বইওয়ালাদের ওপর রাগ হয়েছিল বই না রাখাতে, আজ ঈশ্বরের ওপরই রাগ হচ্ছে।

    সাহিত্যিকের সঙ্গে দেখা করার খুব ইচ্ছে ছিল। দেখা আমার হয়েছে কথা আর হয়নি।

    বিদায় মাহমুদুল হক, বিদায়।

    এহেছান লেনিন

  3. papree rahman says:

    কাজল শাহনেওয়াজ,

    আপনার লেখাটির জন্য ধন্যবাদ জানাই। আমিও মাটির জাহাজকে দেখতে গিয়েছিলাম প্রথম ও শেষবারের মত। বেশিক্ষণ তার কাছে থাকতে পারি নি। চলে এসেছি, আমার কাছে কোনো রুমাল ছিল না বলে।

    পাপড়ি রহমান

  4. সৈয়দ তারিক says:

    মনকে নাড়া দিলেন, কাজল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.