শ্রদ্ধাঞ্জলি, সংস্কৃতি

বৈশাখে-শীতে, শ্রাবণে-ফাল্গুনে: সনজীদা খাতুনের জন্মদিনে

sonotkumar_saha | 4 Apr , 2018  

মাত্র ক’সপ্তাহ আগে, ফাল্গুণের ২৫-১৭ বা ৯-১১ মার্চ নীলফামারীতে সম্পন্ন হলো জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের ৩৭তম বার্ষিক অধিবেশন। সবটাই সনজীদা আপা, সনজীদা খাতুনের তত্ত্বাবধানে। নীলফামারী কোনো উজ্জ্বল নগরকেন্দ্র নয়। বিশ্ব রঙ্গমঞ্চের পাদপ্রদীপ সেখানে আলো ছড়ায় খুব কমই। ঢাকা থেকে সাধারণ যাতায়াত কঠিন না হলেও তাতে বাঁকবদলের ঝঞ্ঝাট আছে। কেন্দ্র থেকে আরামে-আয়েশে অনুষ্ঠান সারতে চাইলে, প্রচারণা মাধ্যমের প্রসাদ-ভিক্ষা করলে এই জায়গা বাছাই করার জন্য কোনো যুক্তি খাড়া করা কঠিন। বরং উল্টোটাই ঘটতে পারে, সর্বোত্তম নির্বাচন যে এটা নয়, তা প্রমাণ করা খুব সহজ। এটা কি বেহিসেবি খামখেয়াল? সনজীদা খাতুন কি তবে বিচার-বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছেন? তবে এমন কেন?
আমরা আলটপকা এমন উদ্ভট কথা ভাবতে পারি। কিন্তু সাংস্কৃতি অবিভাজ্যতার কথা মাথায় থাকলে, আর ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ‘আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি’–এই সংকল্প নিয়ে এগোতে চাইলে এটা বোঝায় কোনো ভ্রান্তি থাকার কথা নয় যে, এমনটিই নীলফামারীর মতো অঞ্চলে অনুষ্ঠান করার সিদ্ধান্ত নেওয়াটাই প্রকৃতপক্ষে যথার্থ। মানবিক উজ্জীবন কেন্দ্রেই শুধু আলো জ্বালাবে না, আলোর মশাল প্রান্তেও জ্বালাতে হয়। অপরদিকে, সর্ব অভিমান ঝেড়ে ফেলে প্রান্ত থেকেও আলোর উৎস খুঁজে নিতে হয়। এবং তা দাতার অহংকার নিয়ে নয়, কেড়ে নেবার মানসিকতাতেও নয়, সশ্রদ্ধ দাতার মতো, বিনয়ী ভিক্ষুর মতো। সব কাজে এই মন্ত্রের সাধনই সনজীদা খাতুনের ব্রত। তাঁর দেখানো পথ ধরে সে ব্রত রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ও ছায়ানটেরও। তাঁর সত্য-দৃষ্টি, সৎ সংকল্প ও সৎ উদ্যম তাতে পথ দেখায়। এখনও। তিনিই তো সব ঝড়-ঝাপটা মাথায় নিয়ে মারের সাগর পাড়ি দেবার কাণ্ডারি!

এটা যে মোটেই আকাশ-কুসুম রচনা নয়, তার প্রমাণ একদিকে শত বিপদেও ছায়ানটের মাথা নত না করা; অন্যদিকে সারা দেশে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের শাখা গড়ে তুলে তার আদর্শ ও কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া। মোটেই সহজ কাজ নয়। অনেক মানব-মানবী, অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা-নিরাশা, তিক্ততা-হতাশাও তাদের সামঞ্জস্য ঘটিয়ে যা মনে হয় কল্যাণের, মনে হয় জড়ত্ব নাশের, ব্যক্তিগত স্বার্থের লোভকে জয় করার–তাদের দিকে বিভিন্ন সম্ভাবনায় উৎসুক সবাইকে, বিশেষ করে নবীন ছেলে-মেয়েদের, এক ছাতার তলে এনে সবার মাঝে গানের সুরে ঊর্ধ্বে ভাষা মুক্তির আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলা, জীবনকে অর্থবহ মনে করার প্রেরণা জোগানো। একা নয়, চারপাশে নানা পরিস্থিতির নানা জনকে নিয়ে, আত্মসম্মান না বিক্রি করে, একার ও সঙ্গী সবার সংগঠন চালিয়ে যাবার খরচপত্র মেটাবার ব্যবস্থা করে সংহতি, সুরুচি ও প্রগতির পথ দেখানো। একদিন নয়, বছরের পর বছর,যুগের পর যুগ-প্রতিষ্ঠিত ও প্রসারিত মর্যাদায় পরিবর্তমান ভবিষ্যতের কর্মসাধনার ভিত্তি মজবুত করে তাকে ক্রমাগত ইতিবাচকতায় রূপান্তরিত করে চলা। মনে হয়, তা বিপুল-সুদূর বিপুলের বাঁশি বাজায়। এই বাঁশির সুরের মর্ম শোনাতে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন সনজীদা খাতুন। সচেতন, সজাগ, ক্লান্তিহীন।
এই যে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে যাওয়া, প্রান্তেও সুরের হাওয়া বইয়ে দেওয়া, এটা যে সবার অলক্ষে কতটা ছড়িয়েছে, মরা গাঙে কী বান ডেকেছে তার আন্দাজ একটা মেলে রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের নানা শাখায় তাদের উৎসাহী কার্যক্রম থেকে। কত ছেলে-মেয়ে এখন রবীন্দ্রসংগীত গায়। ভাবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে প্রাণ ঢেলে সঠিক সুরে। এটা তো আগে কল্পনাতেও আসতো না। আর শুধু রবীন্দ্রসংগীত নয়, আমাদের সংস্কৃতির প্রাণবান প্রবাহের সব উৎসই তারা চেনাতে চায়। লালন, নজরুল, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত সেন–এঁরা প্রত্যেকে গানে-গানে আপন আপন বৈশিষ্ট্যে হাজির হন। তাঁদের সুরের স্বকীয়তা চিনতে গিয়ে চোখ যায় নানা ধ্রুপদী শাখায়। তা দৃষ্টি প্রসারিত করে হিন্দুস্তানী-কর্ণাটকী শুদ্ধ সংগীতের দিকে, গজলের আকুলতার দিকে, এমনকি পাশ্চাত্য ধারায় অপেরা ও চলতি গানের নানা ছকের দিকে। এছাড়া বাংলার ভাওয়াইয়া, ভাটিয়ালি, শ্যামা-সংগীত, কীর্তন, বাউল– এরা তো আছেই। ঢাকার ছায়ানটে কেন্দ্রীয়ভাবে চলে এদের চর্চা। আর সব কিছুর উৎসে, এই বাংলায়, সনজীদা খাতুন। অজস্র লেখায় তাঁর দিক-নির্দেশনা। নববর্ষ থেকে শুরু করে ফাল্গুণী পর্যন্ত ছায়ানটের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ফুটে ওঠে আমাদের নান্দনিক অভিজ্ঞান, চেতনায় জাগ্রত হয় উদার মুক্তির কলস্বর।

পথ চলা অবশ্য সহজ হয়নি, হয় না। সংকীর্ণতার কাঁটা পদে পদে পায়ে বেঁধে। কাপুরুষোচিত হামলায় নিভে যায় কত উজ্জীবিত প্রাণ। বিভ্রান্তি ছড়ায় কায়েমি স্বার্থচক্র। তখন, এখনও। সনজীদা খাতুন ভয় পান না। হাল ধরে থাকেন শক্ত হাতে। তাঁর হয়ে ওঠার কথা, এই জীবনসংগ্রামের কথা লেখা আছে সহজ কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে বইতে। এ তাঁর আত্মজীবনী। বছর পাঁচেক আগে লেখা।
এছাড়া তাঁর প্রতিভা বিকশিত হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাঙ্গনেও। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে সম্মানিত ‘আহমদ শরীফ অধ্যাপক’। এ পদে তিনিই প্রথম। ক’বছর আগে ভারতের বিশ্বভারতী তাঁকে বিরল ‘দেশিকোত্তম’ সম্মাননায় ভূষিত করে। তাঁর স্বীকৃতি আমাদের আনন্দ দেয়। অনুমান করি, তাঁর বহুমুখী প্রতিভাকে মর্যাদা দিয়ে বিশ্বভারতীও আজ ধন্য।

নীলফামারীতে এবারের রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গ টেনে শেষ করবো। তবে তার আগে এইরকম আর একটা আয়োজনের কথা থেকে কিছু স্মরণ করি। সেবার মেলা বসেছিল জয়পুরহাটে। মনজাগানো অনুষ্ঠানে যেমন থাকে, তার সবই তাতে ছিল। আরো ছিল স্থানীয় রাজবংশী তরুণ-তরুণীদের প্রাণোচ্ছল সম্মেলক নৃত্য। তার প্রতিটি অসংকোচ মুদ্রা এখনও আমার চোখে লেগে আছে। রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের ওই আসর বাঙালি সত্তার এই নিহিত সৌন্দর্য যেন আমার চোখের ওপর ঢেলে দিয়েছিল। আমি কৃতজ্ঞ। এও বুঝি, সনজীদা খাতুনের প্রেরণা ক্ষুদ্র আমিত্ব ছাড়িয়ে আমাদের বৃহত্তর সমগ্রকে আত্মস্থ করায় নিরন্তর উৎসাহ জুগিয়ে চলে। ‘বরষা-শরতে বসন্তে শীতে’ হৃদয়ে সংগীত আমাদের জাগ্রত হয়।
এবার নীলফামারীর কথায় আসি। আমি যেতে পারিনি। পরে জানলাম, সনজীদা আপা গিয়েছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ও নির্দেশনাতেই যথারীতি সফল সম্পূর্ণতা পেয়েছে পুরো অনুষ্ঠান। বলার কথা তাঁর অসাধরণ বাচনভঙ্গীতে তিনি সবটা শুনিয়েছেন। টুকরো-টুকরো গান গেয়ে কিছুটা হলেও শ্রোতাদের মনে বিস্ময় মেশানো তৃপ্তি জাগিয়েছেন। ক্লান্তিকে জয় করেছেন। যদিও তাঁর চলা এখন অংশত হুইল চেয়ারে। আজ পঁচাশি পূর্ণ করে ছিয়াশির দোরগোড়ায় পা তাঁর। কিন্তু বিরাম নেই সাংস্কৃতিক সংগ্রামের দ্বন্দ্বমুখর কঠিন যাত্রাপথে চলায়। কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেন তিনি? বড় বিস্ময় জাগে।

Flag Counter


2 Responses

  1. dilip kumar nath says:

    সংশপ্তক, দেশিকোত্তম, অকুতোভয় বাংলাসংস্কৃতির অগ্রসেনানী প্রবাদপ্রতিম যোদ্ধা, নেতা, দুঃসময়ের কাণ্ডারী পরমশ্রদ্ধেয়া সনজিদা খাতুনের জন্মদিনে জানাই আমার প্রণতি।

  2. গীতা দাস says:

    আমার সরাসরি শিক্ষক সনজীদা আপার প্রতি রইলো অফুরন্ত শ্রদ্ধা ও তাঁর সুস্বাস্থ্য কামনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.