কবি কুমার চক্রবর্তী’র কবিতায় অধিবিদ্যক চিন্তা-ভ্রমণ

মতিন বৈরাগী | ৫ এপ্রিল ২০১৮ ১:৪৬ অপরাহ্ন

অর্জুন জানত, যুদ্ধ হলো নিজেকে
গৌরাবান্বিত করার এক বিপর্যয়কর পথ, ও প্রত্যাহার
এক সার্থক খেলার বিপর্যাস,
আর কুরুক্ষেত্র উপহার দেয় এমন এক মনস্তত্ত
যেখানে জয়ীরা পরাজিত আর পরাজিতরাই জয়ী
[ অধিবিদ্যাসিরিজ কাব্য]

মানুষ চিন্তা করতে পারে। চিন্তাশীল মানুষই সংবেদনশীল। চিন্তা মূলত একধরণের নিজস্ব ভ্রমণ। চিন্তাই মানুষকে অনুসন্ধানে উৎসাহিত করে। চিন্তাই উপলব্ধিকে বাড়িয়ে দেয়, সচেতন করে, মনজগতে নিষ্ক্রয় চিন্তাকে চেতনস্তরে নিয়ে আসে। চিন্তার এই ভ্রমণ থেকে দর্শনের সৃষ্টি। অধিবিদ্যক ধারণাগুলো চিন্তার ভ্রমণ থেকেই সংগৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত, কল্পনা ও অভিজ্ঞতায় যুক্ত হয়ে অনুসন্ধানকে নিয়ে যায় নির্মাণের দিকে। লেখক কবি বা সৃজনশীল মানুষ চিন্তার ভ্রমণ থেকেই নির্মাণকলায় উদ্দীপনাগুলোকে কাজে লাগায়। প্রকাশে সে সব হুবহু তেমন থাকেনা, এগুলো স্বপ্নের দৃশ্যপটের মতো বদলায়, তখন প্রকাশে এর জটিলতাগুলো স্ফূর্ত হয়।

একজন কবি বা শিল্পী অন্যদের থেকে অনেকখানি ভিন্নতর। যদিও সে সামাজিক মানুষ এবং প্রকৃতি ও পরিবেশের সংগে সমানভাবে যুক্ত। কিন্তু তার ভিন্নতা এইটুকু যে সে গতানুগতিকতার বাইরেও চিন্তা করে, এবং চিন্তা থেকে উদ্ভুত বিষয়াবলী তার মনে প্রাণে যে আবেগ সঞ্চার করে তা প্রকাশে গতি দেয়। শিল্পকলাও মানুষের চিন্তাপ্রসূত সৃষ্টি। আবেগ আর কল্পনা এর মূল বাহন হলেও উদ্ভবে রয়েছে চিন্তারই আনুকুল্য। শিল্পকলায় চিন্তাভ্রমণ থেকে নানাকিছুর যোগ নতুন চিন্তার পরিধি তৈরি করেছে।

কবিতা মূলত চিন্তাভ্রমণের লিখিত রূপ, কন্ঠরূপও হতে পারে। হোমার লেখেনি বলেছে মুখে মুখে আর আমাদের চারণ কবিদের অধিকাংশই কণ্ঠের। এই রূপের মধ্যে সন্নিবেশ ঘটেছে সময়কালের সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্বিক বিষয়াবলী। তাই হোমার তার কাব্যে এমন কতগুলো দেবতার স্থান সংকুলান করেছে যা ওই সমাজের চাহিদা ছিল এবং এদের রূপ মানুষের মতো। আবার নিয়তিকে উচ্চমাত্রা দিয়ে শ্রবণপ্রিয়দের কাছে তার বর্ণনা জনপ্রিয় করে তুলেছিল, যদিও ইলিয়ড অডিসি কাব্যের সবটুকু তার একার সৃষ্টি নয়, যেমন নয় মহাভারত।
‘কবিতা মূলত বিচ্ছিন্ন মানুষের গান’ বলেছেন কুমার চক্রবর্তী, আর চেসোয়াব মিউশ বলেছেন ‘প্রথম যে আন্দোলন, সে হ’লো গান করে ওঠা।’

কবি কুমার চক্রবর্তীর তিনখানি কাব্য: সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলিক বাতিঘর, তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ এবং অধিবিদ্যা সিরিজ। নামকরণ থেকেই তাঁর আত্মভ্রমণের নানা বিষয়ের আকর আমরা পেয়ে যাই কাব্যের বহুমাত্রিক গঠনে।

শূন্যতার জলছাদ
সমুদ্রের ঘ্রাণ আর জলের অজস্র বঙ্কিমতা

অন্ধকার নক্ষত্রগুলোকে অনক্ষণ পলিশ করে

জল: কেন্দ্রহীন ও বৃত্তময়
চিহ্ন
আমরা আছি কেনোনা আমরা কোথাও নেই
[ সমুদ্রের কাছাকাছি: চিহ্নহীন]

জল ছাদ শূন্যতার, আমরা আছি শূন্যতার ভিতর। আমাদের অস্তিত্ব শূন্যতার মধ্যে অর্থাৎ অনস্তিত্বের মধ্যে। আর আমাদের মাথার উপর রয়েছে জলছাদ, মানে আকাশ, মানে মেঘমালার আস্তরণ, মানে সে ছাদ এক ভঙুর নিরাপত্তা এবং এই জলছাদের ভেতর দিযে আমরা অবলোকন করি নক্ষত্রজগত যাকে কখনও বিভাহীন মনে হয়, আবার ঝকঝক করে মেঘমালা সরে গেলে, অর্থাৎ জলছাদ যেন তাকে ঘষে মেজে পরিস্কার করে দিয়েছে। ‘জল: কেন্দ্রহীন ও বৃত্তময়’ প্রতীক হিসেবে জল বৃত্ত অর্থৎ ফোটা আর শেষ পঙক্তি ‘আমরা আছি কেনোনা আমরা কোথাও নেই’–এই এক দর্শন এই এক সত্যানুসন্ধান: আসলে কী আছি? এই এক জিজ্ঞাসা। এই পঙক্তির বিরোধাভাস দ্বারা চিন্তাভ্রমণকে দর্শনভিত্তিক রূপ দেয়ায় কবিতাটিতে এ্যাবসার্ডিটির উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। কবি কুমার চক্রবর্তীর কোনো কোনো কবিতা বিষাদাক্রান্ত হলেও সে তার মধ্যদিয়ে উপস্থিত হতে চেয়েছেন জীবনের নতুন সত্যে।

বিষাদাক্রান্ত হলে তুমি এখানে এসো
এই মৌন নদীর ধারে
দেখবে তোমার রক্তের ভেতর নিহত ঘুমেরা
আবার নড়াচড়া শুরু করে
আর তুমি শুনতে পাবে সেই অধিবিদ্যক ধ্বনির
গুপ্তকথা

[ সমুদ্র, সমুদ্র,বিষণ্নতা ও অলিক বাতিঘর কবিতা]

অধিবিদ্যার অনুসন্ধানে রয়েছে বিশ্বের অস্তিত্ব, মানুষের অস্তিত্ব, সত্যের ধারণা, বস্তুর গুণাবলী, সময, স্থান, সম্ভাবনা ইত্যাদির দার্শনিক আলোচনা । এই ধারার জনক অ্যারিস্টটল। অধিবিদ্যায় দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয : সর্বশেষ পরিণাম কি ? এবং কিসের মত ? মেটাফিজিক্স এর একটি মূল শাখা হল সৃষ্টিতত্ত্ব এবং অন্যটি তত্ত্ববিদ্যা। আর যখন কবি বলেন ‘বিষাদাক্রান্ত হলে তুমি এখানে এসো/ এই মৌন নদীর ধারে’ তখন একটা অনুসন্ধান এবং তা থেকে সিদ্ধান্ত চলে আসে ‘দেখবে তোমার রক্তের ভেতর নিহত ঘুমেরা/আবার নড়াচড়া শুরু করে’ এই সিদ্ধান্ত কেন? কারণ মানুষ তার জীবনপরিধির সময়কালে যে তিত-তিক্ততা, যে অসাহয়ত্ব, যে নির্মমতাকে অবলোকন করে, এবং যা তার সত্তাজগতে ‘ডাজাইনের’ কারণে গ্রহণে অসমর্থ হয়, অথচ তার নিদান তার আয়ত্তে থাকেনা, সে যেন আটকে পড়া শিকার, এরূপ পরিস্থিতিতে মূল সত্তায় যে বিভ্রাট ঘটায় তা শারীরিক মানসিক বস্তুগত অবস্তুগত সব কিছুতে এক অতৃপ্তিদায়ক বিষন্নতা ফুটিয়ে তোলে এবং শরীর ও মনকে নিস্ক্রিয় করে দেয়। তখন অন্তর্দাহ মুছে নিতে, প্রশমন খুঁজতে, চিন্তাজগতে সুবাতাস ফিরে পেতে তার এমন একটা অবলম্বন দরকার যা নির্ভরতা দিতে পারে, আর এই পরিভ্রমণই হয়ে উঠতে পারে নিদান। সে প্রান্তর হতে পারে, কোনো সরাইখানার খোলা জানালা, পর্বতের সু্উচ্চ ধবল চূড়া, সমুদ্রের সূর্যোদয়, হতে পারে কারো চোখের দু’ফোটা অশ্রুর। তবে তা দেয় সেই মানুষকে যে মানুষ হৃদয়বৃত্তি ধারণ করে। পতিত মানুষ ‘ডাসম্যান’ এই ভ্রমণে যেতে পারে না। ঘুম মানুষকে নতুন ভ্রমণে যুক্ত করে, স্বপ্ন মানুষকে আহ্লাদিত করে। আর তা হলো নিজ অস্তিত্বের উচ্চারণ ‘আমি আছি কারণ আমি ভাবতে পারি’ চিন্তার ভেতর দিয়ে বিষণ্ণতাক্লিষ্ট মানুষটি নদীর কাছে আরেক বিশালত্বের ছায়া দেখতে পারে সে হলো সমুদ্র।

জীবন মৃত্যুর চেয়ে কঠিন
মৃত্যু জীবনের চেয়ে কঠিন
তার ছক শাদা-কালো
তার সীমানা আভরণপ্রিয়

এই সত্য স্পষ্ট হয় দ্বিমাত্রিক দ্যোতনা নিয়ে, ‘জীবন মৃত্যুর চেয়ে কঠিন’ একটা সাধারণ সত্য ঠিক বিপরীত ‘মৃত্যু জীবনের চেয়ে কঠিন’ এই সত্যকে ধারণ করলে একটা অন্যটাকে ‘বাতিল’ করে এবং দুটি সত্যকে দ্বিমুখি করে নতুন সত্যে উপনীত করে আর তা হলো ‘জীবন মৃত্যুর চেয়ে কঠিন’ কারণ পরিস্থিতির আলোকে একজন মানুষ মৃত্যু চাইলেই মৃত্যকে গ্রহণ করতে পারেনা। এর মধ্যে সংশয় থাকে, বাঁচার আকাঙ্ক্ষা থাকে। এমনি বৈপরীত্য দিয়ে জীবনের জয়গানই মানুষ গায়, কবি সেই সত্যকে তার দার্শনিক প্রজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করেছেন কাব্যদ্যোতনায়, আর তারপরই তিনি বলছেন ‘তার ছক শাদা-কালো/তার সীমানা আভরণপ্রিয়’ এ্খানেও বৈপরীত্য আছে, বিরোধাভাস আছে, কারণ ছকটি শাদা যদি হয় তা হলে এক সহজ সত্যে প্রকাশ ঘটল, কিন্তু কালো হলো আশঙ্কার অন্ধকার অর্থাৎ জ্ঞাততা ও অজ্ঞতার সন্নিবেশ। সে জানতে পারে কখনও মৃত্যু সহজ, সাধারণ, শাদা কিন্তু আবার তার মধ্যেও বিরোধ তাকে জানিয়ে দেয় মৃত্যু ভয়াবহ, সে কালো, সে অন্ধকার।[ জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় এমনি মনোদ্বান্দ্বিকতার উপস্থিতি রয়েছে] সক্রেতিশ কিন্তু মৃত্যকে গ্রহণ করেছিলেন বিচারের রায়ে, পালিয়ে বাঁচতে পারতেন, তিনি বলেছিলেন মৃত্যুতো নিরুদ্বিগ্ন ঘুম। ব্রুনোও মুক্তি পেতে পারতেন পাদ্রীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে, কিন্তু তিনি তার সত্যের প্রয়োজনে গ্রহণ করেছিলেন মৃত্যুকে। জোন অব আর্ক গ্রহণ করেছিলেন মৃত্যু। তিনিও মুক্তি পেতে পারতেন ক্ষমা চেয়ে। কিন্তু গ্যালালিও পারেন নি। মৃত্যু তার কাছে কালোই থেকে গেছে।

তোমার দু-ফোঁটা অশ্রুর চিরপ্রতীক্ষায়
গেঁথে রাখি চোখের দর্পণে অতঃপর
বিদায় করেছি ভাষা আতিথেয়তায়
যে পথে গিয়েছে প্রেম অবিস্মরণীয়..
(সমুদ্র.বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর কাব্যের ভূমিকা)

০৩.

তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ, নামকরণে রয়েছে একধরণের বিমূর্ততা। তবে দিয়ে শুরু অর্থাৎ তদপূর্ব কোনো ঘটনা, কোনো কাঙ্ক্ষা, কামনা বাসনার স্ফূর্তির লগ্ন বা কোনো জটিল মুহূর্ত, বিষয়াবলীর জট অপসারণ পারঙ্গমতার ক্ষণ, কিংবা রয়েছে ভাবনার প্রান্তসীমা পেরিয়ে কোনো এক বিমূর্ত ভাবনার মূর্তায়ন আর তখন ব্যক্তি, কবি বলছেন ‘তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ’ দুটি ভিন্নভিন্ন আনন্দধারার আগমন প্রত্যাশার উচ্চকন্ঠ স্বরক্ষেপন। যা গান হয়ে যায়। হাওয়া হৃদয়কে আবিলতায়, শীতলতায়, পেলবতায় মুক্ত করে আবদ্ধতা থেকে, আর হর্ষনাদ মানে আনন্দধ্বনিরব সমস্ত সময়ের মগ্নতাকে ভেঙে প্রাপ্তিপারঙ্গমতায় ভরিয়ে দেয়।

‘সৃষ্টির রূপ ও স্বরূপ প্রকাশ করতে গেলে ভাষাকেন্দ্রিক প্রতীকী-শৃঙ্খলায় আবদ্ধ মানুষের মনের জানালার কপাট খুলে দেখতে হবে প্রথমে। এই সেই মানুষ, যে জ্যাক লাঁকা কথিত ‘আয়না পর্ব’-র সময় থেকেই বন্দী হয়েছে কতক সামাজিক, জৈবিক আর রাষ্ট্রীয় নিয়মে। কিন্তু সে মুক্তি চায়, অনিশ্চয়তাবদ্ধ ঠিকানাহীন বৈশ্বিক বস্তুবলয়ে অবস্থান করে সে চায় তার নিজস্ব অহংসত্তাকে নির্দিষ্ট সত্যমাত্রায় প্রকাশ করতে। যে নতুন ভাষায়, নতুন চিন্তায়, নতুন রঙে, নতুন ফর্মে সত্যকে তুলে ধরতে পারে, সেই হয় স্রষ্টা। [প্রবন্ধসমগ্র, মঈন চৌধুরী]

[যদি এমন হতো, ] .. ‘তবে এসো হে হাওয়া’ তা’ হলে সহজ বোধে নিয়ে বলে ফেলা যেতো হ্যাঁ, এর আগের ঘটনার সমাধানসূত্র ব্যক্তির বা কবির বোধগ্রাহ্য হয়েছে, এবং এখন প্রশমন চাই ক্লান্তির, চাই আনন্দ মগ্নতার আদিঅন্ত ভেঙে, তা না হবার কারণে এই নামকরণেও একধরণের এ্যাবসার্ডিটির উপস্থিতি দেখতে পাওয়া যায়। অর্থাৎ কোনো একটা বিষয় ব্যক্তিকে যে ভাবনায়, না হয় বিষয়ের জমাটবদ্ধতা ভাঙার শঙ্কায়, বা অনুসন্ধানের দীর্ঘ প্রলম্বিত সময়ের শৃংখল টুটায় কায়িক মানসিক চাপ তৈরি করেছিল এবং সে চেতনাহীনের মতো এক গড্ডালিকা চেতনায় মোহগ্রস্থের ন্যায় সেই পীড়ন সহ্য করে গনিত ভাষ্যটিকে রূপান্তরের পর্যায়ে নিতে পেরেছেন এবং বলে উঠছেন তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ সেই হলো তার চেতনায় ফেরা।

এই কবিতাগ্রন্থে রয়েছে অনেকগুলো কবিতা, আছে একটি দীর্ঘ পরিভ্রমণের কবিতা। যদিও ক্ষণকালবাদী তিনি নন, তবুও কবিতাটির নানা মাত্রিকতা দেয়ার জন্য প্রত্যেকটি পর্বকে স্বয়ংসম্পূর্ণতায় এবং চিন্তার নানাস্তরিক বিন্যাস বোধ উৎকর্ষতায় পৌঁছানোর জন্য স্পষ্ট করেছেন। পর্বের নিজ গণ্ডিতে দাঁড়িয়ে থাকবার চৌহদ্দি আবার বৃত্ত ভেঙে দিলে মিলে যেতে পারে একই শরীরে। দীর্ঘ এ কবিতাটিতে নানা কিছু নানা ভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার মিশেলে।

কাছিমেরা উঠে আসে সমুদ্রগর্ভের দিক থেকে
ডিমপাড়ে তারা অমায়িক জ্যোৎস্নায়
ঢিমগুলো একা একা হাঁটে অনিরূদ্ধ সৎসাহসে
মেঘজালে তারাও উড়তে থাকে আকাশের মারবেলের সাথে

এখন বিষন্নবোধ করি
সমুদ্রকে মনে হয় লুকিয়ে থাকা আয়নার মহল
মুখ ও মুখোশ আজ অনর্গল একাকার হয়
মধ্যগর্ভ থেকে জাগে অসংখ্য খিলান
জলভাষা শিখে নিয়ে বুদবুদেরা বাতাসের নৌকা হয়ে যায়
আমিও আত্মস্থ করি, প্রগলভতা, পানসির পালগুলো উড়ে যায়
রাত্রি বাড়ে, বেড়ে চলে
পিপ্পলের ছায়ারাশি সন্তর্পনে হাঁটাহাঁটি শুরু করে।

তার চিন্তার নানা পরম্পরা বাস্তব ও অবাস্তবকে ছুঁয়ে এমন এক বাস্তবের সৃষ্টি করেছে যে তা বাস্তব বলেই ভ্রম হয়। বাতাসের নৌকা, অমায়িক জ্যোৎস্নায়, আকাশের মারবেল, সমুদ্রকে মনে হয় আয়না মহল, ছায়ারাশি সন্তর্পনে হাঁটাহাঁটি করে। এর প্রত্যেকটিতেই রয়েছে পরাবাস্তবতার উপস্থিতি।

কুমার চক্রবর্তী দীর্ঘ কবিতা প্রসংগে গ্রন্থে প্রবেশের দরজায় কিছু বক্তব্য রেখেছেন। আর তাতে তার মেধার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি লক্ষণীয়। ‘আমাদের মন সংবেদনশীল আর আমাদের মনস্তত্ত্ব প্রবহমান। ফলে ভরকেন্দ্র থেকে যখন কবিতা বেরোয় তখন তা হবে দীর্ঘ এবং কখনও বহুস্বরিক-এটাই দস্তুর’। বিষয় যদি দাবী করে বিস্তৃতির তা হলে তা দীর্ঘ হয়ে যাবে, কবিতাই লিখিয়ে নেবে। কবিতা নিজেই সেই অনুজ্ঞা।

কুমার চক্রবর্তী নান্দনিক কবিতায় বিশ্বাসী, সামগ্রিক শিল্পসত্তার স্পর্শপ্রিয়তায় তার কবিতাগুলো উন্মুখ। কতকটা বিমূর্তভাবনায় ডুবে ভাবনার উৎসমুখ তৈরিতেও পারঙ্গম। তবে এসো হে হাওয়া, হে হর্ষনাদ কাব্যটি অসাধারণ কাব্যিক গুণে সমৃদ্ধ। এ যেন সিসিফাসের সেই ঘটনার মতো পাঠককে খানিকটা ধাঁধায় পড়তে হয়, এবং ফিরে আসতে হয় পূর্বের পাঠে, তবেই চেতনা জাগ্রত হয়।

পাতার বাক্সগুলো আজ ভরে উঠেছে নগ্ন বাতাসে
ভরে উঠেছে দেহধাম, সন্ধিকাল আর সরলবর্গীয় যত বোধ

আগ্রহী পাঠক পড়ে দেখতে পারেন তার এই কাব্যটি।

০৪.

জন্মমৃত্যুর মাঝে যে নৌকা তার কোনো মাঝিমাল্লা নেই
নিজেই সে চলে–জন্ম থেকে মৃত্যুতে, বস্তু থেকে অনস্তিত্বে
(বস্তু থেকে ছায়ায়)

০২.
আমি ঘুমাই
আমার চোখ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আয়নাগুলোকে দেখতে থাকে
(আমি ও আয়না)

০৩.
কিন্তু সময় মানেই সময়হীন, কখনও রেখে যায়না সংকেত
সবাইকে সে দেয় সূর্যাস্ত আর নিজে থাকে স্বাধীন
(সময় ও তুমি)

০৪.

কারণ তোমারে শরীর হলো সেই সরলবর্গীয় গাছ যেখানে
দিনের বেলায় পাতারা নিজেদের লুকায় আর রাত্রি হলে
বের হয়ে আসে নক্ষত্র-স্নায়ুর কাছে
(নক্ষত্র-স্নায়ুর কাছে)

৫.

একা একা নদী হয়ে থাকো
কুয়াশা ছাড়াই হোক এবারের হেমন্তভ্রমণ
(তোমার নিকটে এসে দেখি)

০৬.

ভেঙে গেছি আমি আজ, জলদগম্ভীর মন সার
বলি আমি হে বন্ধুরা, শোনো, বন্ধু নেই তো আমার..
(সমস্ত বন্ধুকে)

এমন হৃদয়বৃত্তির পঙক্তি যার হৃদমাঝারে জমে জমে ঝরনার জল হয়ে আছে, প্রপাত কল্লোল হয়ে গেছে, আসমানের ধ্রুবজ্যোতির মতো রাঙায় মন, তার বন্ধুবান্ধব কতকটা দুর্ভিক্ষ কবলিত হতেই পারে, কারণ এই দার্শনিক মন যা সতত অনুসন্ধানপ্রিয়তায় তন্ময় তার কাছে চলমান আনন্দতো আনন্দ নয়, এক ভয়বহতা নিয়েই ঝাপটা মারে।

কুমার চক্রবর্তীর কবিতাগুলো থেকেই তার ব্যক্তিগত জীবন-যাপন অনুভব করা যায়। তিনি যে নির্জনতাপ্রিয় এবং অনেকসময়ই একাকী তা তার প্রকাশের শত ডানায় উড়াল দেয়া থেকে জেনে নেয়া যায়। যে ওড়ে আর অবলোকন করে, অবলোকন করে আর মিলায় তার বিশ্বাসের সাথে, তার কাম্যের সাথে, তার প্রত্যাশার সাথে।

কবি কুমার চক্রবর্তীর তৃতীয় কাব্য অধিবিদ্যা সিরিজ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৭ সালে। নামকরণ থেকে সহজেই অনুমেয় যে তার এই কাব্যের কবিতাগুলো দার্শনিক জিজ্ঞাসা নিয়েই উপস্থিত আছে। তার এই দর্শন কখনও সংশয়ের, কখনও ভাবে প্রবহমান, কখনও জীবন জিজ্ঞাসার। যেমন তিনি তার উৎসর্গ পত্রে কাউকে উল্লেখ করেননি, অন্তঃত কোনো নাম তো নয়ই। তিনি বলেন ‘কাউকে নয়, কাউকেই যে নয়! কেউ নেই, আছি শুধু আমি’ এবং তার পর বলেন আমি আছি আছে আমার অপর’–এই আত্ম এবং পর নিয়ে তার ভ্রমণ। তার অধিবিদ্যক চিন্তার ভ্রমণ ‘সেলফ’ কে জানা বোঝা অনুসন্ধান করা এবং বিশ্বাত্মার সাথে যোগ ও। কবি কুমার চক্রবর্তীও চিন্তা ভ্রমণে বার বার প্রশ্ন তুলেছেন কে আমি, আর তখনই যুক্তিগুলো হয়ে উঠেছে দার্ঢ্য,আবার হয়েছে আর্তির। প্রবেশনে তার একটি কবিতাই রয়েছে, ভারি সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী জমাটবাঁধা শব্দের এক দার্শনিক অভিজ্ঞান। তিনি বলছেন ‘পৃথিবী হলো বস্তু, রূপ আর বাস্তবতা, বস্তুু রূপায়িত হয়ে হয় বাস্তব। রূপ তাই বস্তুর আকাঙ্ক্ষা ও তৃপ্তি। …মানুষ আসলে বস্তু ও প্রতিভাসনির্মাতা মাত্র’। মাত্র আট পঙক্তির এই প্রবেশনপত্র আর তার মধ্যে শব্দ মাত্র ৮৩ টি। কিন্তু আনন্দ এইখানে যে এই ছোট্ট লেখাটিই তার চিন্তাভ্রমণে মৌলিক। এতে বিধৃত দার্শনিক জিজ্ঞাসাগুলো নানাভাবে ব্যক্তি জীবনকে প্লাবিত করেছে। আর প্রতিবারই উচ্চারিত হয়েছে ‘আমি’র সন্ধান।

একজন ‘আমি’ যখন বিচ্ছিন্নতা বোধসহ তার বিশ্বে অবস্থান করে তখন তার চিন্তা জগতে দেখা দেয় সংহতি ও বিভ্রান্তি। দর্শন ও জ্ঞানতত্ত্বে সবকিছু হজম করার পরেও, ‘কী, কোথায়, কেন’-কেন্দ্রিক প্রশ্নের শেষ হয় না। ভাষানির্ভর ‘আমি’র চিন্তা বারবার বিনির্মিত হয়ে নতুন চিন্তা জন্ম দেয়। চিন্তা থেকে অধিবিদ্যা বাদ দিয়ে, যৌক্তিক ও গানিতিক বিজ্ঞান গ্রাহ্য করে বলা যায়, একজন ‘আমি’ হল একটি ‘জীবনবস্তু।’ জীবনবস্তুর নিজস্ব ধর্ম আছে। একজন ‘আমি’ জন্ম নেয়ার পর যে সব জৈব কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, তাই হল জীবনবস্তুর ধর্ম। [ মঈন চৌধুরীর প্রবন্ধের আলোকে]

কুমার চক্রবর্তীর কবিতা নান্দনিকতার শ্রেষ্ঠ চূড়াটি স্পর্শ করতে চাইছে সর্বদা। এখানেই একজন কবির সার্থকতা যে তিনি প্রতিবারই একটি ভালো কবিতা লিখতে চেয়েছেন। তবে ভিন্ন মত তো থাকতেই পারে। কারণ শিল্প মানুষের জন্য। তবে এটাও স্বীকার করতে হবে কুমার চক্রবর্তী কেবল মাত্র কাব্যে নয়, প্রবন্ধ সাহিত্যেও এমন কিছু কাজ করেছেন যা বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে বিবেচনা পাবার যোগ্যতা রাখে। তার মেধা অসাধারণ এবং বিষয়কে অসাধারণ করে বলার শক্তি তাঁর আছে। সে কারণে তিনি অনেকেরই ঈর্ষার কারণ হতে পারেন। আমিতো তার লেখার একজন অনুরাগী পাঠক থাকতেই ভালোবাসব।

জীবন এক ফাঁদ যার অন্ধ্রেরন্ধ্রে খেলা করে গোপন সমুদ্র
তুমি তার আত্মাকেন্দ্রে খুঁজে পেলে কাঠের ঘোড়াগুলো
জানলে না একবার যা হারায় ফিরে আসে না তা আর এমনকি
জোড়াতাড়া স্বপ্নেও, অতএব প্রত্যাহার করলে নিজেকে, আর
মনোভার নিয়ে ত্রিকালদর্শীর মতো ছুটে বেড়োলে ফাঁদ থেকে ফাঁদে।

মার্কস ‘কল্পনা’ শক্তির মহিমা স্বীকার করে নিয়েই বলেছিলেন যে কল্পনাশক্তি মানব সভ্যতার উন্নয়নে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। অতএব ‘কল্পনা’ ‘ব্যক্তিত্ব’ প্রভৃতির গুরুত্ব মেনে নিয়েছিলেন তিনি। তিনি আরো মনে করতেন ইতিহাস হচ্ছে মানবস্বভারের রূপান্তর। কিন্তু রূপান্তর মানে সামগ্রিক বদল নয়। দক্ষতা ও প্রয়োজন অনুসারে ইতিহাসে মানবচরিত্রের রূপান্তর ঘটে আর বিকাশ ঘটে উৎপাদন শক্তির প্রভাবে’। কুমার চক্রবর্তীর চিন্তাভ্রমণ কল্পনা শক্তিরই জাগরণ যা নানা অবয়বে দৃশ্যমান হয়ে আছে তার সৃষ্টিকর্মে।
Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (5) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আশরাফুল কবীর — এপ্রিল ৫, ২০১৮ @ ৯:৫৪ অপরাহ্ন

      বইয়ের দীর্ঘ আলোচনা ভাল লেগেছে। নান্দনিক কবি কুমার চক্রবর্তী এবং বইয়ের আলোচককে শুভেচ্ছা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prokash — এপ্রিল ৬, ২০১৮ @ ১১:০০ অপরাহ্ন

      অধিবিদ্যা সিরিজের কবিতা আমি পড়েছি। এতটাই ব্যস্ত থাকতে হয় পেশার কারনে যে কবিকে তা জানানো হয়ে ওঠেনি। তারপর সংকোচওতো থাকে। মূঢ় আমি কি বলতে কি বলে ফেলি , কখন বলি , আমাকেও তিনি চেনেন না। এই সুযোগ পেলাম।
      ওনার প্রবন্ধও ভালো লাগে। তার অনেক বইই আমার সংগ্রহে রয়েছে।

      তার ভাষাটিতো অপূর্ব, অপরূপ। আমাকে টানে খুব।

      আর আলোচনাটিও সুন্দর। কবি ও আলোচক দুজনকেই অভিনন্দন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জুনান নাশিত — এপ্রিল ১০, ২০১৮ @ ১:৫১ অপরাহ্ন

      আলোচনায় গভীরতা ও আন্তরিকতার ছাপ স্পষ্ট। এটুকু কুমারদা’র অবশ্যই প্রাপ্য।
      উভয়কে অভিনন্দন এবং শুভ কামনা

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বীরেন মুখার্জী — এপ্রিল ১২, ২০১৮ @ ২:১৫ অপরাহ্ন

      গভীর এবং অর্থপূর্ণ আলোচনা। অনেক ভালো লেগেছে। কবি কুমার চক্রবর্তী এবং আলোচক কবি মতিন বৈরাগীকে অভিনন্দন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com