আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ

ইমতিয়ার শামীম | ১৮ জুলাই ২০০৮ ১১:১০ পূর্বাহ্ন

আগুনপাখির কারও আধুনিক ব্যক্তিসত্তা নেই, ব্যক্তিমনন নেই। কিন্তু তারপরও, শেষপর্যন্ত, আধুনিক ব্যক্তিসত্তার উদ্বোধনই এর মূল গল্প, agun-p.jpg
…….
আগুনপাখি/হাসান আজিজুল হক/প্রকাশক: গাজী শাহাবুদ্দিন আহমেদ, সন্ধানী প্রকাশনী/প্রথম প্রকাশ: ফাল্গুন ১৪১২, ফেব্রুয়ারি ২০০৬/প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী/১৫৮ পৃষ্ঠা/১৬০ টাকা/উৎসর্গ: মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
…….
ব্যক্তিমননের বিকাশই এর মূল সত্য। আগুনপাখির গল্প অবিরাম বিশ্বস্ত থাকতে চায় সংসার ও সমাজের প্রতি, ধর্ম ও দেশের প্রতি। কিন্তু তারপরও গল্পের সংসার ও সমাজ, ধর্ম ও দেশ ভেঙে যায়; তার বদলে আমরা আভাস পাই ব্যক্তির উদ্বোধনের, ব্যক্তির বিকাশের। এই ব্যক্তি তার সমগ্র অতীত নিয়ে তারই সংসার, সমাজ, ধর্ম ও দেশের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে দাঁড়ায়। ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে দিয়ে নয়, ব্যক্তিত্বকে নাকচ কিংবা খর্ব করে নয়, আগুনপাখিতে ব্যক্তিকে আমরা উঠে দাঁড়াতে দেখি সংসার, ধর্ম ও রাষ্ট্রের সত্যকে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করার মধ্যে দিয়ে।

এরকম গুরুত্বপূর্ণ এক ব্যক্তি, আরও এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা — নাম নেই তাঁর। অথবা নাম আছে কোনওখানে, কিন্তু এমনই অযত্নে যে আমরা তা খুঁজে পাই না। সে-যে নারী তা অবশ্য আমরা কাহিনীর শুরু থেকেই বুঝতে পারি; কিন্তু নামহীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে সে কেবল নারীর নয়, চিহ্নিত করে সমগ্র সাধারণ মানুষের কালীন অবস্থান। একটি চরিত্রের একটি নাম দেয়া নিশ্চয়ই কঠিন ব্যাপার ছিল না; আবার এরকমও নয় যে, সচেতনভাবেই হাসান আজিজুল হক তার নাম দেন নি। আমরা যা দেখতে পাই — নাম না থাকার পরও তার অবয়ব ফুটে উঠছে, ফুটতে ফুটতে সে কেবল নারীদের নয়, সমগ্র সাধারণের ব্যক্তিকৃত রূপ হয়ে উঠছে। আবার সমগ্র সাধারণের ব্যক্তিকৃত রূপ হওয়ার পরও যে-সে নারীও হয়, তার কারণ বোধহয় এই, সবচেয়ে শোষিত হওয়ার পরও নারীই আধার সৃষ্টিশীলতার, নারীই ইতিবাচক উৎস মানুষের প্রবহমানতার। নামহীন এ নারী মুখোমুখি হয় ইতিহাসের, কেননা নামহীন মানুষদের সৃষ্টিশীলতাই প্রতিনিয়ত ইতিহাসকে খণ্ডন করতে করতেও এগিয়ে নিয়ে যায় ইতিহাসকে।

অবশ্য কেবল এই নারী — যাকে আমরা আগুনপাখিতে পাই মেজ বউ হিসেবে — শুধু সে কেন, প্রায় কারও নামই উচ্চকিত হয় না এ কাহিনীতে। কারণ যে-ভাঙন ও নির্মাণের মধ্যে দিয়ে এ-কাহিনী এগোয়, তার শুরু হয় সামন্ততান্ত্রিকতা ও ঔপনিবেশিকতা থেকে; আর সামন্তসংস্কৃতি অনায়াসে লোপাট করে ফেলতে পারে ব্যক্তির নাম, তা সে ব্যক্তি যত ক্ষমতাধরই হোক না কেন। ক্ষমতাধর ব্যক্তি থেকে শুরু করে আশপাশের প্রতিটি মানুষকে ডাকতে হয় অন্য কোনও সাংকেতিক শ্রদ্ধাবোধক পদে সামন্তসংস্কৃতির কল্যাণে। ‌’তেনাদের নাম মুখে আনা বারণ’ — তাই মেজ বউয়ের স্বামীরও কোনও নাম আমরা খুঁজে পাই না, খুঁজে পাই না ভাশুরের নাম, দেবরের নাম এমনকি সন্তানদের নাম। ডাক্তার আসে, তারও কোনও নাম নেই, ডাক্তারবাবু নামেই পরিচিত সে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজ প্রধানত সম্পর্কযুক্ত সম্বোধনের সমাজ, শ্রেণিনির্ধারিত সম্মানসূচক সম্বোধনের সমাজ। আর সেই সম্বোধনসূচক পদটি আসল নামকে লুকিয়ে ফেলে, ব্যক্তির নামের ওপর আরোপ করে সামাজিকতার পোশাক। এই পোশাক পুঁজিবাদী সমাজেও পরিবর্ধিত হয় বটে, কিন্তু তার দায় এত বেশি নয় যে সব সময়েই পরে বেড়াতে হয়। কিন্তু সামন্তবাদে সামাজিকতার এই পোশাক পরে যাবতীয় কাজ করতে হয় প্রতিটি মানুষকে, যেন সে আলাদা মানুষ নয়, যেন আলাদা কোনও অস্তিত্ব নেই তার। তাই সংসারের কর্তা হওয়ার পরও মেজ বউয়ের স্বামী পারে না একজন ব্যক্তি হতে। ধ্বংসের মুখ থেকে সে সংসারকে টেনে তোলে এবং একান্নবর্তী সংসারের জন্যে অপরিহার্য সব ট্যাবু প্রতিষ্ঠা করে। তাই অন্দরমহলের সর্বসময় কর্ত্রী তাঁর বিধবা মা, যে-অন্দরমহলে আঁচড় কাটার ক্ষমতাটুকুও সে আর হাতে রাখে না। একজন বড় ভাই আছে তার, সংসারের হাল ধরতে যত ব্যর্থই হোক না কেন, তবু বড় ভাই সে। অতএব সিদ্ধান্ত নিলেও তাকে জানায় সে প্রতিটি সিদ্ধান্ত। এরকম সব ট্যাবুর মধ্যে দিয়েই নিশ্চিত করা হয় সংসারের শৃংখলা ও শ্রমপ্রকরণ। এবং সেই শৃংখলা ও শ্রমপ্রকরণ একটু থিতু হলে উদ্বৃত্ত সময় আসে, সংসারের ট্যাবুগুলো কর্তার জন্যে উদ্বৃত্ত সময় বয়ে নিয়ে আসে এবং কর্তা নিজেকে প্রসারিত করে সমাজের মধ্যে, উপনিবেশিক কাঠামোর রাজনৈতিক ও সামাজিক তরঙ্গের মধ্যে। গ্রামের মানুষদের সংগঠিত করে সে, নির্মাণ করে এমন এক রাস্তা যা তাঁকে নীরবে বাঁচিয়ে রাখবে পৃথিবী লয় হওয়ার দিনঅবধি, রাস্তা আঁকাবাঁকা হয়ে যায়, কেননা গরিব মানুষের একচিলতে চাষের জমি বাঁচানোর দিকেও লক্ষ্য রাখে সে, শহরের রাজনীতিকদের সঙ্গেও গড়ে ওঠে তার এক ধরনের সম্পর্ক, দশ গাঁয়ে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে, বাড়িতে সংবাদপত্র পড়ে, স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করে বাড়িতে ফিরে অত রাতে, বলে দেশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা একটু পড়ে দেখতে; এবং এইসব কারণে আমরা নিশ্চিত হই, সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে থেকেও সে ওসবের ঠিক উপযোগী নয়। আবার একান্নবর্তী সংসার সংরক্ষণ ও প্রবহমান রাখার প্রতি কী এক মোহে ঘুরে ফেরে সে, এমনকি ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়েও। তার পক্ষে তাই সম্ভব হয় না আলাদা এক ব্যক্তি হয়ে ওঠা। তাই সে শেষপর্যন্ত লীন হয়ে যায় ইতিহাসের পথে, ব্যক্তি হওয়ার যাবতীয় শক্তিশালী প্রাণশক্তি থাকার পরও সে পারে না ব্যক্তিমনন বিকশিত করতে। পাতার পর পাতা জুড়ে আমরা এ কর্তার জয়জয়াকার শুনি, মেজ বউ নিজেই শোনায় তা। এমনকি পরম নিবেদিতার মতো এ কথাও বলে, কর্তা সারা জীবন হেনস্তা করেছে তাকে দুনিয়ার সব মানুষের সামনে, তাকে শুনিয়েছে রাজ্যের সব খারাপ কথা, হাত ধরে বের করে দিতে চেয়েছে ঘরের মধ্যে থেকে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাকে দিয়েছে প্রচণ্ড সম্মান। ব্যক্তিসম্পর্ক এরকমই হয়, বাইরের মানুষের কাছে যা মনে হতে পারে চরম অপমান, মনে হতে পারে চরম স্খলন, সম্পর্কে আবদ্ধ মানুষের কাছে তা এক বিশেষ সংকেতের মতো। তাদের সম্পর্কের অধরা সে মাধুরী, ভেতর থেকে উদ্গীরিত সে নির্ভরমান সম্মান ও দূরত্ব একবারমাত্রই আমরা বুঝতে পারি, যখন কর্তা দেশবিভাগের পর পাড়ি জমান পূর্ব পাকিস্তানের দিকে। তখন সে আর কোনোই জোর করে না তার স্ত্রীর ওপরে, সংসারের একেবারে শুরুতে যে-জমি কেনা হয়েছিল স্ত্রীর গয়নাবিক্রির টাকা দিয়ে সেসব আর বাড়িটা তার জন্যে রেখে সব কিছু বিক্রি করে চলে আসে সে সন্তানদের সঙ্গে। এরকম চলে আসার কারণ তো একটাই, যত মুক্ত মনের মানুষ হওয়ার চেষ্টাই করুক না সে, তার শেষ লক্ষ্য ডালপালা মেলা সংসার আগলে রাখা। পুরুষতন্ত্রকে সে সংশোধন করতে পারে, পরিশীলিত করতে পারে, কিন্তু তা থেকে বাইরে বের হয়ে আসার সাধ্য কি তার আছে? তাই শেষপর্যন্ত চলে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে সে আসলে শেষ চেষ্টা করে নিজের ক্ষমতার পরিকেন্দ্র পরিস্ফূট করার। পুরুষতন্ত্রের মোহে পরাজিতের মতো নতুন একটি রাষ্ট্রের দিকে প্রস্থান করাটাই নিজেকে রক্ষা করার শেষ পথ তার। সারা কাহিনীতে যে-নিজেকে মেলে ধরেন অফুরান হিসেবে, যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখনই ব্যক্তি হিসেবে গুটানো সে, কুণ্ঠিত সে, ব্যক্তি হয়ে ওঠার যে-টুকু সম্ভাবনা ছিল, তাও সে শেষ করে দেয় এই কুণ্ঠার মধ্যে দিয়ে, এই গুটিয়ে নেয়ার মধ্যে দিয়ে। কিন্তু তার স্ত্রী, সংসারের এককোণে জীবনযাপন করতে করতেও অতীতের অভিজ্ঞানে শেষমেশ এক পরিণত ব্যক্তি, তাই কুণ্ঠিত নয়, গুটানো নয়। নিজের অস্তিত্বের হিসেবটুকু বুঝে নেয়ার জন্যে কেবল সে-ই তাই রয়ে যায় নিজের দেশে।

পুরো উপন্যাসে কথা বলে এই নারী। শৈশব থেকে শুরু হয় তার কথা বলা। শেষ হয় দেশভাঙনের পর একা হয়ে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে। নিজের কথাই শুরু করে সে। কিন্তু নিজের কথা তো খুব বেশি নেই যে বলা যাবে। তার কথা মানেই তার বাবার কথা, নতুন মা আসার কথা, বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা, একান্নবর্তী এক সংসারের মধ্যে তার লীন হয়ে যাওয়ার কথা। বাবার সংসারে যাও বা একটু নিজের কথা ছিল, স্বামীর সংসারে সেটুকুও থাকে না। বড় সংসারে সে থই পায় না, পাওয়ার কথাও নয়। তাই তার মনে হয়, ‘জেবনের কুনো কাজ নিজে নিজে করি নাই, নিজের ইচ্ছা কেমন করে খাটাতে হয় কুনোদিন জানি নাই। আমি কি মানুষ, না মানুষের ছেঁয়া? তা-ও কি আমার নিজের ছেঁয়া?।’ অবশ্য চায়ও নি সে সেরকম হয়ে উঠতে। নিশ্চিন্তে থাকা যাবে, কোনও কিছু নিজেকে ঠিক করতে হবে না, যা করবার, যা বলবার তা সংসারের গিন্নিই করবে, শাশুড়িই করবে, এই নিশ্চিন্তিই আশ্বস্ত করেছে তাকে। এরকম আশ্বস্ত হয়ে ওঠার কথাই সে বলতে চায় সারা জীবন ধরে, কিন্তু এই আস্বস্তির আত্মমন্থনের মধ্যে দিয়ে কেবল তাকেই আমরা দেখি গল্পের শেষে অন্যতর হয়ে উঠতে।

প্রচল বাংলা কথাসাহিত্যে নারীর ব্যক্তিত্ব ধরা পড়ে এবং ক্রমশ ফুটে ওঠে মূলত তার প্রেম ও যৌনতাসংক্রান্ত সংকট, পারিপার্শ্বিকতা এবং দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু প্রেম কিংবা যৌনস্বাধীনতার বোঝাপড়া থেকে আগুনপাখির কেন্দ্রীয় ব্যক্তির ব্যক্তিসত্বা ফুটে ওঠে না। আগুনপাখি এদিক থেকে বিরাট ব্যতিক্রম। কেননা ব্যক্তির মনন গ্রন্থিত, জাগ্রত ও বিকশিত হওয়ার পথটি আসলে আরও অনেক সুদীর্ঘ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরোপুরি অন্যরকম; যৌনতার কেন্দ্র থেকে বিকাশের এই দ্বন্দ্ব শুরু হতে পারে বটে, কিন্তু সে-ক্ষেত্রেও এর পরিকেন্দ্রগুলিই কালক্রমে মূল হয়ে উঠতে থাকে। এরকম অন্যতর দ্বন্দ্বাত্মক পরিধির মধ্যে থেকে শুধু বাংলা কথাসাহিত্যে কেন, পৃথিবীর তাবৎ কথাসাহিত্যেই কোনও নারীকে আমরা ব্যক্তি হয়ে উঠতে দেখি না। কিন্তু আগুনপাখিতে আমরা সে-নারীর দেখা পাই। ইবসেনের নোরা আর হাসান আজিজুল হকের মেজ বউয়ের পথ এক নয়, কিন্তু গন্তব্য একইখানে। একঅর্থে মেজ বউয়ের গন্তব্য আরও সামনে, কেননা ব্যক্তি হওয়ার পরও তার সত্তা পুঁজিতাড়িত সংস্কৃতির নয়। একান্নবর্তী সংসারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে অভিযোজিত ও সম্পৃক্ত নারীর সবটুকু পথ হেঁটে হেঁটে সে এক ব্যক্তি হয়ে ওঠে। কেননা কেবলমাত্র সে-ই প্রত্যাখ্যান করে তার সময়ের সত্য, করতলে তুলে নেয় অতীত আর সুদূর সামনের সত্য। প্রত্যাখ্যানের এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভোরের আলোর মতো ফুটে ওঠে তার নিজস্ব সত্য, ব্যক্তির সত্য এবং সেই সত্যকেই আঁকড়ে ধরে সে। জীবনভর সে যা অর্জন করে চলে, তার কোনও কিছুই সে আলাদা করতে পারে না সংসার, ধর্ম, সমাজ ও দেশ থেকে, দেখতে পারে না নিজের করে। কিন্তু তারপর তার জীবনে এমন এক সময় আসে, যখন সে দেখতে পায় ওইসব অর্জন পড়ে আছে মাটির ওপর; সংসার, ধর্ম, সমাজ ও দেশ আর রাজি নয় সেসবের স্বীকৃতি দিতে। আর ঠিক তখনই সে বুঝতে পারে, এসব আসলে তার, কেবলই তার, আর কারও নয়, এসবই তার নিজস্ব, একান্ত, এসবই তার অর্জন। এখন এসব ফেলে দিয়ে সে কোনখানে যাবে আবার নতুন করে, আবার কোথায় যাবে ওই সংসার, ধর্ম ও দেশের ডাকে! অতএব তার জীবনে নতুন এক সময় আসে, নিজেকে উপলব্ধি করার সময়, নিজের জায়গাটুকু চেয়ে দেখার সময়। সে দেখে, সংসার-ধর্ম-সমাজ-দেশ আসলে প্রত্যাখ্যান করছে তাকে, সত্যের মতো নতুন এক জোয়াল তুলে দিতে চাইছে তার কাধের ওপর। তন্ন তন্ন করে তার সারা জীবন দিয়ে সে তখন প্রত্যাখ্যানের শক্তি তৈরি করে। সে প্রত্যাখ্যান করে তার সংসার ও ধর্মের সত্য, রাষ্ট্র ও সমাজের সত্য, কেননা অতীতকে তো বটেই, তার ভবিষ্যতকেও দুর্দমনীয় নিষ্ঠুরতায় ভেঙে চুরমার করে ফেলছে সেইসব সত্য। একা-একা সে তার একাগ্রতা ও সমগ্রতা নিয়ে অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করে আশপাশের নতুন নতুন অনিবার্য সব সত্য। পুরো পরিবার পাকিস্তানে চলে গেলেও সে রয়ে যায় ভারতে।

এইভাবে আগুনপাখি শেষ পর্যন্ত এক ব্যক্তির সারা জীবনের মধ্যে দিয়ে এক রাষ্ট্র ও সমাজের ধারাবাহিক ইতিহাস হয়ে ওঠে। সেই ইতিহাসে রাষ্ট্র, সমাজ ও ব্যক্তির প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির তৃপ্তি ও অতৃপ্তির বয়ান থাকে, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি থাকে রাষ্ট্র, ধর্ম ও সমাজের দিকে শেষমেশ চোখ তুলে তাকানো এক বোধিপ্রাপ্ত নারীর হিমচাউনি। হিমশীতল সেই চাউনি আমাদের বলে, কী ভীষণ ফাঁকি দিয়েছে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ইতিহাসের দীর্ঘ এক পর্ব, কী ভীষণ ফাঁকি এখনও আমরা বয়ে বেড়াচ্ছি সেই সময় থেকে। ব্যক্তিকে এইভাবে হাসান আজিজুল হক ইতিহাসের অন্তর্গত করেছেন, ইতিহাসের শিকার (ভিকটিম) করেছেন, কিন্তু তারপরও এই ব্যক্তি ইতিহাসের বাইরে বেরিয়ে এসেছে, ইতিহাসের নতুন এক ধারা হয়ে উঠেছে, কেননা ইতিহাসের বাস্তবতা সে তার জীবনের প্রাপ্তি ও ক্ষরণ দিয়ে সক্ষম হয়েছে অস্বীকার করতে। ব্যক্তি গতানুগতিক অর্থে ইতিহাসের অন্তর্গতই থাকে, কিন্তু কোনও কোনও ব্যক্তি ইতিহাসের গতিধারাকে জীবন ও সমাজের প্রাপ্তি দিয়ে, চারপাশের মানুষের প্রাপ্তি দিয়ে অন্যায্য মনে করে এবং তখন সে চায় ওই ইতিহাসের সমান্তরালে বয়ে বেড়াতে, অনাগতের জন্যে বিকল্প সে ইতিহাস রেখে যেতে, একদিন না একদিন ইতিহাসকে তার শাশ্বত গতিপথে ফিরিয়ে আনতে। আগুনপাখির ব্যক্তিজন্ম ঘটে এরকম সত্যের স্বার্থে।

দুই.
বলেছি, আগুনপাখিতে আধুনিক ব্যক্তিসত্তা নেই, কেননা সেটি থাকার কথাও নয়; রেলপথ নির্মাণের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকেরা একক, স্বয়ম্ভূ গ্রামসমাজগুলোর মধ্যে একধরনের সম্পর্ক গড়ে তোলে বটে, তাতে বাণিজ্যপুঁজি এমনকি একপর্যায়ে শিল্পপুঁজিও বিকশিত হতে থাকে; কিন্তু এসবের শক্তি এত বেশি ছিল না যে তা হুমকি হয়ে উঠবে পুরানো সমাজ ও সংস্কৃতির। শ্রমের উপকরণ না পাল্টালে, শ্রমশক্তি নিয়োজনের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি না হলে নতুন শ্রমসম্পর্ক তৈরি হবে কোথা থেকে, জীবনযাপনের সংস্কৃতি পাল্টাবে কেমন করে! কিন্তু ভারতবর্ষীয় সমাজে ওখানেই ছিল সবচেয়ে বড় সংকট। তা ছাড়া তাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছিল বর্ণপ্রথা, এমন এক বর্ণপ্রথা শ্রম ও পেশাভিত্তিক বিভাজনের সঙ্গেও যা জড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি বর্ণপ্রথা সম্প্রসারিত হচ্ছিল ভারতের মুসলিম সমাজেও। দেখা দিচ্ছিল আশরাফ, আতরাফ। তবে বর্ণপ্রথা যদি নাও থাকত, তা হলেও কী সাধ্য ছিল সামন্ততন্ত্রের দাপট কাটিয়ে ব্যক্তির মাথা তোলার? চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পুরানো জমিদারতন্ত্রকে বিপর্যস্ত করেছিল। উৎপাট করে নি, বরং বিন্যস্ত করেছিল নতুন এক জমিদারতন্ত্র। এরকম সমাজে ব্যক্তিমনন গড়ে ওঠার সুযোগ কোথায়, ব্যক্তিসত্তাই বা গড়ে ওঠার সুযোগ কোথায়? বিশেষ করে সেই মানুষটি যদি উঠে আসে শাসিতের দল থেকে, নিম্নবর্গের জগত থেকে, উঠে আসে নারীদের মধ্যে থেকে?

এমনকি শোষণের নানা রূপ দেখা গেলেও আগুনপাখির সাতচল্লিশের আগেপরের ওই সমাজে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তিচরিতার্থতার দানবীয় আকাক্সক্ষা থেকে কোনও শোষণ ঘটতে দেখা যায় না। সামন্ততান্ত্রিক সমাজকাঠামোর উপর উপনিবেশিক শাসনের চাপ, কাঠামোর মধ্যে পুঁজির অস্বাভাবিক অনুপ্রবেশ ও প্রকাশ ওই আকাক্সক্ষাকেও বিকৃত করে। সামন্ত মন সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে, কেন্দ্রীকরণের মধ্যে দিয়ে তা সম্প্রসারিত করতে চায় সামন্তীয় সম্পর্কের পরিধি, চায় রক্তসম্পর্কের কোলাহল ও সচলতা বাড়াতে। নিজে সে রক্তচোষাই বটে, কিন্তু রক্তচোষা হয়েও সে চায় নিজের শরীরে অসংখ্য পরজীবী বয়ে বেড়াতে। কর্তার অবস্থা তাই যত ভালো হতে থাকে ততই সেখানে এসে ভিড় জমাতে থাকে এরকম সব পরজীবী, যেমন অসংখ্য পরজীবী ছিল একসময় রায়বাড়িতেও। আশি-নব্বই বিঘে জমি হয়, গরুর গাড়ির নতুন টপ্পর হয়, ফিরে আসে বাপের আমলের তাজি ঘোড়া আর ছয় বেহারার পালকি, এইসব দেখে তার মায়ের খুশিতে ‘জিরি জিরি শাদা দাঁত’ বেরিয়ে পড়ে। বোঝাই যায়, সামন্ত মনের পছন্দ নয় ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে, অবিরাম চিন্তা ও প্রশ্নের জন্ম দিয়ে এগিয়ে চলার রীতি; একইভাবে পছন্দ নয় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য থেকে উপচে পড়া বিচ্ছিন্নতা মেনে নেয়া এবং উপভোগ করে চলা। তাই আগুনপাখিতে উপনিবেশিক হলাহলের মধ্যে পুঁজিপ্রবিষ্ট হলেও সামন্ত ধাঁচের সমাজকে আঘাত করতে পারে আহত করতে পারে এমন কোনও মানুষ, বেড়ে ওঠা দূরে থাক, জন্মই নেয় না। একান্নবর্তী সংসার-নির্মাণের নায়ক কর্তাও আসলে উপভোগ করতে চায় তার সামন্ত মনকে। ছেলেকে সে পাঠায় বোর্ডিং-এ লেখাপড়া করবার জন্যে, তারপর খোঁজ নিতে গিয়ে দেখে তার বয়ে নেয়া হাড়িভর্তি মিষ্টির পাতিল ছেলে বিলিয়ে দিচ্ছে বোর্ডিং-এর আর সবার মাঝে, তা দেখে তার মন ভরে যায়; হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত হচ্ছে দেখে সে উদ্বিগ্ন হয়, কাতর হয়, ক্ষুব্ধও হয়; কিন্তু তাতেও সামন্ত মন দূর হয় না। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে শ্বশুরের গোলা থেকে ধান বের করে বেচে দিয়ে শালার জন্যে লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করে সে, শালার নির্ভরতাটুকু উপভোগ করার সুখ ছাড়তে একটুও রাজি নয় তার সামন্ত মন, তাতে শ্বশুর যতই আহত হোক না কেন। এমনকি নিয়তি নির্ধারিত পরাজয়ও উপভোগ করে তার এই সামন্ত মন। ছেলে যখন মারা যায়, তখন শ্বশুর খবর পেয়ে এসে তাদের উত্তর-দুয়োরি ঘরের পশ্চিমধারে বসে। তখন সে ভীষণ শান্তমূর্তি নিয়ে শোনায় শ্বশুরকে, ‘সে ছিল আপনার যোগ্য নাতি, আপনি বলেছিলেন আপনার ছেলেকে আপনার কাছ থেকে পর করে দিচ্ছি বলে আমার ছেলেকেও বেশি দিন স্কুলে যেতে হবে না। আপনার নাতি আপনার কথার মান রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আপনার কথাকে সে মিছে হতে দেয় নাই।’

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নানাভাবে ভাঙচুর করে এ সমাজকে, যদিও তাতে মূল জায়গায় কোনও আঁচড় পড়ে না, ফাটলও ধরে না। বরং শ্রেণিকাঠামোয় পরজীবী মধ্যস্তর এত বেশি সম্প্রসারিত হয় যে এমনকি শাসক ব্রিটিশরাও বিস্মিত হয় তাতে। বিস্মিত হয় বটে, কিন্তু খুশিও হয় মেঘ না চাইতেই জল পাওয়াতে। মানুষে মানুষে বিভাজন তৈরির নতুন নতুন সূত্র খুঁজে পায় তারা এই ভাঙাগড়ার মধ্যে দিয়ে, কাজে লাগাতে শুরু করে সেগুলোকে। আর তার জের চলতেই থাকে আরও বহুদিন। ব্যক্তিমনন গড়ে উঠল কি উঠল না, পরিবার ভাঙল কি ভাঙল না, পুঁজির বিকাশ বিশুদ্ধ পথে ঘটল কি ঘটল না, সেসবের চেয়েও অনেক বেশি অর্থবহ এই ভাঙাগড়া। গাঁয়ের জমিদার রায়দের ২৫/৩০ বিঘা জমি নিলামে ওঠে। মানুষের দুর্দিনের সুযোগ নিতে নেই এই ন্যায়বোধ আছে কর্তার; কিন্তু এটাও জানে সে, রায়রা পারবে না ওই জমি রক্ষা করতে, সে না কিনলেও আর কেউ কিনবে। অতএব সে-ই তা কেনে। সে কেনে, কিন্তু নিজের টাকায় নয়, স্ত্রীর গয়নাবেচা টাকায়। এইভাবে একান্নবর্তী পরিবার নতুন করে উজ্জীবিত হয়, আসলে কর্তা নয়, এই উজ্জীবনে বড় ভূমিকা রাখে কর্তার স্ত্রী। নিজেই নিজেকে শোনায় সে, মেয়েমানুষের গয়না ছাড়া আর কী আছে! স্বামী চলে গেলেও গয়না থাকবে। এই বোধে সামন্ত সংস্কৃতি থাকতে পারে, কিন্তু তারও বেশি থাকে অর্থনৈতিক বিবেচনা। সংসার পরিত্যক্ত করলে, দুঃসহ দিন এলে আর কী থাকে নারীর গয়না ছাড়া? তবু সে তার মায়া ত্যাগ করে। পুরুষতন্ত্রের চাপই কি ধাত্রীর কাজ করে পেছনে থেকে? নিশ্চয়ই কিছুটা করে, কর্তা সন্তানের প্রসঙ্গ তোলাতেই তো ত্বরান্বিত হয় মেজ বউয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়া। আবার এও ঠিক, খানিকটা থাকে নিজের তাগিদ, কেননা রাগ নয়, স্বামীর চোখের মধ্যে সে দেখতে পায় নির্ভরতা। একেবারে টায়-টায় হিসেব করে কি এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পারি আমরা? কিন্তু এর ফলে যা হয়, সম্প্রদায়গত অর্থে হিন্দুর জমি মুসলমানের হাতে আসে। উপরিকাঠামোর এই সত্য নিয়েই চলে টানাহেঁচড়া। কিন্তু কেউ আর মূল ও গভীর নতুন এক সত্যের দিকে ফিরে তাকায় না, বলে না, মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যেও এবার জন্ম নিলো নতুন এক জমিদার। আর যত নতুনই হোক, যত মুসলমানই হোক, জমিদার চিরদিনই জমিদার। হিন্দুর জমি মুসলমানের হাতে এলো, মুসলমানের জমি হিন্দুর হাতে গেলো, এরকম আসাযাওয়া নেহাৎই উপরিব্যাপার; যুগের পর যুগ ধরে এরকম হয়ে আসছে। রায়দের জমি কেন তাদের হাতে আসছে, তা নিয়ে মেজ বউ নিজের মতো একটি ভাবনা তৈরি করে। রায়রা খুবই ঠাণ্ডা মানুষ, অত ঠাণ্ডা হলে তো রাজ্যপাট রাখা যায় না। যে যা চাইত, তা-ই দিয়ে দিতো, এইভাবে কি সম্পত্তি আগলে রাখা যায়? মেজ বউ ভাবছে, এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ এই ভাবনা — রায়দের ছেলেপেলেদের কেউ গ্রাম ছাড়ে নি, লেখাপড়া শেখে নি, তাই চোখের সামনে ২৫/৩০ বছরের মধ্যে তারা ফতুর হয়ে গেল। তার মানে মেজ বউয়ের মধ্যে দিয়ে আমরা আসলে দেখতে পাচ্ছি, সামন্ততন্ত্র নতুন একদিকে মোড় নিচ্ছে, শাসনশোষণ করার মেজাজ না থাকলে আগের ঠাটবাট বজায় রাখা যাবে না, এমনকি খালি শাসনশোষণেও কাজ হবে না। গ্রাম ছাড়তে হবে। লেখাপড়া শিখতে হবে। নগরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে গ্রামের ভেতর, গড়ে উঠেছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উপযোগিতা। আর এসবই মিলেমিশে নানা মিথষ্ক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করছে শাসনশোষণের নতুন নতুন ভিত। ব্যাপারটা তাই হিন্দু কিংবা মুসলমানের নয়; এইসব ভিত সম্পর্কে নিস্পৃহ ছিল বলেই রায়রা পারল না তাদের সম্পদ ধরে রাখতে।

তবে ওই ভিত যারা গড়ে তুলছিলেন কিংবা যারা ওই ভিতকে আশ্রয় করে বেড়ে উঠছিলেন, তারা অবশ্য চেয়েছেন ব্যাপারটাকে হিন্দু-মুসলমানের দ্বন্দ্ব হিসেবেই প্রতিষ্ঠা করতে। তারা এরকম চেয়েছেন, কেননা তারা চান নি রাজনৈতিক ক্ষরণ ও পুনর্গঠনের মধ্যে দিয়ে সামাজিক ও বর্ণশৃঙ্খল ভেঙে নিম্নবর্গের মানুষরা রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দাবি করার মতো শ্রেণিবর্গ হয়ে উঠুক। অতএব নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করতে চেয়েছেন তারা। টের পেয়েছেন তারা, ঝড় উঠলে কেউই নিরাপদ নয়, তবু তারা সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ঝড় চেয়েছেন। বুঝেছেন তারা ওই ঝড়ে দু’একটা ঘর হয়তো ভেঙে পড়বে, কিন্তু পৃথিবীটা তবু তাদেরই রয়ে যাবে। যদিও চিড় ধরা পৃথিবী, তবু তা তাদেরই পুরানো পরিচিত পৃথিবী। কর্তা যখন মেজ বউয়ের সঙ্গে মাঝেমধ্যে এসব নিয়ে কথাবার্তা বলে তা থেকেও বোঝা যায়, চারপাশে কৃত্রিম এই দ্বন্দ্বটিকেই অকৃত্রিম করে তোলার যাবতীয় আয়োজন দেখে ভীষণ আহত সে। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে, তা নিয়ে তার চেয়ে আহত আর কেউ হয় না, তার ছোটভাইরা তো আনন্দিতই হতে থাকে।

সামন্তপর্বে ব্যক্তির উত্থানের সম্ভাবনা সৃষ্টি করে মধ্যশ্রেণি, নিপীড়িত শ্রেণি। পুনরুত্থানের মতো বিভিন্ন সৃজনশীলতা থাকার পরও কর্তা তাই পথ হারান, মেজো বউ তাকে লতিয়ে পথ খুঁজে নেয়। এটা তো প্রথমেই বোঝা যায় পদানত মেজ বউ, অধীনত মেজ বউ, এমনকি সংসারের অন্দরমহলেরও সে সিদ্ধান্তদানকারী কেউ নয়। কিন্তু এই মেজ বউই আমাদের আগুনপাখির গল্প বলে, বলে এবং শোনায়, অথবা একা-একা শোনাতে শোনাতে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকে সমাজ আর সংসারের মধ্যে দিয়ে, অনেক ব্যক্তি তার আশপাশে থাকে বটে, কিন্তু তারা কোনও না কোনওভাবে সেই সমাজ আর সংসারের প্রতিভূ, নিবাসী কিংবা শিকার; অতএব সত্যিকার অর্থে তারাও ব্যক্তি নয়, সমাজ ও সংসারের উৎপাদমাত্র। তাদের মধ্যেই এই মেজ বউয়ের বালিকাজীবনের শুরু হয়। মা’র মৃত্যু মনে থাকে তার, কিন্তু মা’র স্পর্শ তার জীবনে কোনও স্থায়ী স্মৃতি রেখে যায় না। তবু মায়ের স্নেহে সে তার কাখালে বয়ে বেড়ায় ছোটভাইকে। যদিও সৎমা আসার পর সেই ভাইকে বড় করার জন্যে নিয়ে যায় তার মামারা। ভাগ্নেকে নিয়ে যায় তারা, কিন্তু ভাগ্নীকে যে কেন নিয়ে যায় না এও এ সমাজের এক গূঢ়, জ্ঞাত কিন্তু অনালোচিত নিয়ম। পুরুষ তো পরিবারের পুরোধা নায়ক, বংশের ধারাবাহিক নায়ক, এই নায়ক যত নাবালকই হোক, যত অবুঝই হোক, নীরবে সে প্রতিদ্বন্দ্বী সৎমার অনাগত ছেলেদের, নতুন পুরুষদের। এই দ্বন্দ্বের রাশ টেনে ধরতে হয়, কেননা অনাগত সন্তান তো ছেলে না-ও হতে পারে! কিন্তু ভাগ্নীর প্রতিপালক হওয়ার দরকার নেই, সে তো অন্য কোনও ঘরে চলে যাবে; সেটা তার সৎমারও জানা আছে, কেন সে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে অনর্থক আপাতসংকট ডেকে আনবে সংসারটিতে?

তবে ধর্মও বয়ে বেড়ায় মানুষের সাংস্কৃতিক-যোগ; ইরান-ইরাকে আমরা তার নজির দেখি, দেখি ইন্দোনেশিয়াতে, দেখি ভূÑভারতেও। ভারতবর্ষের সম্ভ্রান্ত ও সম্মানকামী বর্গের মুসলমানরা চান সংসারেই বিধবাদের সংরক্ষণ করতে, যেন বিধবা মেয়েটি রীতিমতো এন্টিক; যেমন আগুনপাখির কর্তার পরিবারও চায়। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে মেজো বউ দেখতে পায় শাদা ধূতিপরা শাশুড়িকে, লাজ-কাড়া কপালঅবধি। তা শাশুড়ি বিধবা থাকলেই কি, আর সধবা থাকলেই কি, সে তো আসলে গিন্নী এ সংসারটির। কিন্তু পাশাপাশি আরও এক সত্য খুঁজে পায় সে, এ গিন্নীর পর সংসারের সব ক্ষমতা বিধবা এক ননদের। তখন মনে হয় তার, ‘এ বাড়ির নিয়ম ঠিক হিঁদুদের মতো, এ বংশে বিধবার বিয়ে হয় না।’ হয় না, কারণ শ্রেণির সংস্কৃতিই বড় সংস্কৃতি, এইখানে হিন্দু-মুসলমানে কোনও ভেদ নেই, বনেদি আর সম্মানিত হওয়ার জন্যে পুরানো সংস্কৃতির জোয়াল টানতে হয় শ্রেণিতে ঠাঁই পাওয়া নতুন মানুষটিকেও। সংসারের প্রতি রন্ধ্রে-রন্ধ্রেও খেলা করে এই সংস্কৃতি, নারীও চর্চা করে এ সংস্কৃতির, চর্চিত হয় এ সংস্কৃতির মাঝে। অন্দরমহলও হয়ে ওঠে শ্রেণিসংস্কৃতির আর এক বলয়।

অন্দরমহলের এই সংস্কৃতির কাছে, এমনকি পুরুষতন্ত্রও শক্তিহীন অধিকাংশ সময়। সেটি আমরা হাড়ে হাড়ে টের পাই একান্নবর্তী সংসারটি ভেঙে যাওয়ার সময়। দুর্ভিক্ষের মধ্যে দিয়ে একক পরিবারের প্রতি যাবতীয় ঝোঁক দানা বাধতে থাকে এবং তাতে মূলত নেতৃত্ব দেয় বউয়েরা। আবার এটাও মনে হয়, পুরুষতন্ত্রও কখনও কখনও চায় অন্দরমহলে ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত বলয়। এইভাবে সে নিশ্চিত করে নিজের অবস্থান, কুক্ষীগত করে রাখে অন্দরমহলটিকেও। একান্নবর্তী সংসারের এই গিন্নী ওই কেন্দ্রীভূত ক্ষমতারই একপিঠ। পরিবারের কর্তা খুব ভালো করেই জানিয়ে দেন সংসারের প্রতিটি মানুষকে, অন্দরমহলের কেন্দ্রীভূত এ-আধারটিকে অগ্রাহ্য করলে তাকে মাশুল দিতে হবে। নারীর ক্ষমতাতন্ত্র এখানে পুরুষতন্ত্রের সঙ্গে মিলে তৈরি করে সুবিন্যস্ত ক্ষমতার রাজনীতির জাল, শৃঙ্খলার জাল। গিন্নী যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, মৃত্যুঅবধি বিছানায় শক্তিহীন অবস্থায় শুয়ে থাকে, তখনও তার ক্ষমতা নিঃশেষ হয় না, তাই একদিন কোনও এক পুত্রবধূ হঠাৎ ঠক করে গ্লাস নামিয়ে রাখলে ছেলেকে ডেকে সে জানায়, মন না হলে তার কাজ যেন কেউ করতে না আসে। বলে সে নম্র স্বরে, আক্ষেপের মধ্যে দিয়েই। কিন্তু ওই আক্ষেপের স্বরই নিশ্চিত করে তার ক্ষমতা এখনও শেষ হয় নি।

এরকম সব সাংস্কৃতিক-যোগের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার লড়াইয়ে নারীর ভূমিকা সংযুক্ত হয়। যদিও মেজ বউয়ের মুখেই শুনি আমরা, রাধাবাড়া আর ছেলেমেয়ে মানুষ করা ছাড়া আর কোনও কাজ ছিল না তাদের। এমনকি মেয়েদের বিয়ে বংশের বাইরে হতো না, বাইরের বংশের মেয়েকেও তেমন একটা আনা হতো না। বর্ণসমাজেরই আর-এক প্রকরণ তৈরি করে মুসলমান বাঙালিরা এরকম যাচাই-বাছাইয়ের মধ্যে দিয়ে। একান্নবর্তী সংসার, যেন সংসার নয়, মৌমাছির চাক, রাণী মৌমাছির কথাই চূড়ান্ত সেখানে। কর্তাগিন্নীর স্বামী বেঁচে থাকলে ক্ষমতার এ রূপ কেমন হতো সেটা জানা নেই আমাদের; তবে মেজ বউ যে বলেন, তা থেকে এই ক্ষমতার অবয়ব একটু হলেও ফুটে ওঠে। এই গিন্নীমায়ের বিচারক্ষমতা খুবই সূক্ষ্ম, নিশ্চিত করে মেজ বউ, কোনও কিছু নিয়েই দুই দুই করে না সে, সেজন্যেই টিকে আছে এত বড় সংসার আর এ জন্যেই তার মনে হয় যে শাশুড়ি মনে হয় ঠিক পৃথিবীর কেউ নয়!

তবে, আগুনপাখির কোনও নারীই নিষ্ঠুর নয়, যেমন নিষ্ঠুর হতে দেখা যায় না নতুন সৎমাকে, ঠিক তেমনি নিষ্ঠুর হতে দেখা যায় না কর্তা-মাকেও। সংসারের যজ্ঞ এত বিশাল যে সেখানে নিষ্ঠুরতার দেখানোর কোনও সময় মেলে না যেন। বাপের সংসারে নিঃসঙ্গ থাকে বালিকা। কেননা তার মা ছিল না, আর দাদী থাকলেও সে তো ঠিক আপনার নয়, সংসারেরও নয়, বাপজির খালা সে। তারপর আবারও মা আসে বালিকার জীবনে, কিন্তু মা কি আর হতে পারে বালিকা-সে-মা? বাল্যজীবনের নির্ধারিত অনিবার্য সব নির্জনতা আর নিঃসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে তারা তাই জড়িয়ে পড়ে নির্ভরতায়। সৎমা ও সৎমেয়ের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং বন্ধুতার এক প্রকরণ তৈরি হয় তাদের ভেতর। কিন্তু তাও আর কয়দিনের, বিয়ে হয় বালিকার, অন্তঃসত্ত্বা সৎমা কাঁদতে কাঁদতে বিদায় দেয় তার সইয়ের মতো সৎ-মেয়েকে আর সে গিয়ে ওঠে বিশাল এক একান্নবর্তী পরিবারে। বড় অথচ কেন্দ্রীভূত সেই একান্নবর্তী পরিবারে কোনও দায় নেই তার, সেখানে সে কেবল হাবুডুবু খায়, তবে নিঃশ্বাস নিতে পারে। আর দায় যে নেই, সে জন্যে তার ভালোই লাগে, মনে হয় এত বড় সংসারের দায়িত্ব নিতে গেলে হাঁপিয়ে উঠত সে। তারচেয়ে অনেক ভালো হুকুম তামিল করা। অতএব নতুন সংসারেও সে কারও সঙ্গে ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়ে না। নতুন এ-সংসারে তার এতটুকু ফুরসুত মেলে না নিজেকে নিয়ে চিন্তা করার। আর সময়ের আকাল হলে সম্ভব হয় কি নিঃসঙ্গ হওয়া? অতৃপ্ত হওয়া? আগুনপাখির মেজ বউ সময় পায় না দম ফেলার, যেমন দম ফেলতে পারে না মানুষের রাজনীতি আর ইতিহাস, সমাজ আর রাষ্ট্র; একান্নবর্তী এ সংসারটির সঙ্গে লীন হয়ে থাকে সেই রাজনীতি আর ইতিহাস; মিশে থাকে সমাজ আর রাষ্ট্র।

তিন.
কিন্তু ওই যে রাজনীতি আর ইতিহাস, ওই যে সমাজ আর রাষ্ট্র, তার অনিবার্য লক্ষ্য তো পুঁজির জন্ম দেয়া, ব্যক্তির জন্ম দেয়া। হোক উপনিবেশিক কালের রাষ্ট্র সেটি, কারবার তার পুঁজি নিয়ে। আর শেষ বিচারে, পুঁজি চায় না সামন্ততন্ত্র টিকে থাকুক। পুঁজি চায় বাজারের সম্প্রসারণ। সামন্ততন্ত্র কখনোই পারে না তা নিশ্চিত করতে। অমন রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ইতিহাস তাই কেন বহন করবে সামন্তকে, সামন্ততন্ত্রকে? এইসব জিনিস প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ব্যবহারের জন্যে গুদামে তুলে রাখা যায়, কিন্তু বহন আর কতদিন করা যায়? এই অস্বীকৃতির সূত্রেই সমস্ত আবরণ সরিয়ে, সমস্ত আবরণ ছিঁড়ে আগুনপাখির ব্যক্তিসত্তা বেরিয়ে আসতে থাকে। আধুনিক ব্যক্তিসত্তা মুৎসুদ্দী পুঁজির আবরণ সরাতে থাকে। ব্যক্তি গ্রামকে পিছে রেখে শহরে যেতে থাকে, ব্যক্তি শিক্ষাকেই বড় মনে করতে থাকে।

হাসান আজিজুল হক অবশ্য পুঁজির পিছে ছুটে বেড়ানো ব্যক্তির নির্মাণপ্রক্রিয়ার দিকে চোখ রাখেন নি; বরং শুরু থেকেই তিনি তাঁর মনযোগ নিবদ্ধ করেন গ্রামীণ নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনের দিকে, তাদের ব্যক্তি¯ত্তা বিকাশের দিকে। তবে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে গেলেও শোষণের চূড়ান্ত চালচিত্র বলতে যা বোঝা যায়, মানুষের দানব হয়ে ওঠার চালচিত্র বলতে যা বোঝা যায় তা আমরা পাই না হাসানের লেখাতে। কেননা তিনি বিশ্বাস করেন, ‘চোখের নিচের দিকে একটু কোমলতা থাকা ভালো।’ তাই বোধহয় কোনও জমিদার দানবের আমরা দেখা পাই না, কিংবা নতুন কর্তাও ঠিক দানব হয়ে উঠতে পারে না। কিন্তু পরিপ্রেক্ষিত কীভাবে দানব হয়ে ওঠে, মানুষকেও দানব করে তোলে, সেটি তিনি বেশ ভালো করেই মেলে ধরেন আমাদের সামনে। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর দাঙ্গার বর্ণনা তারই সাক্ষী। এইসব দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর দাঙ্গা একান্নবর্তী সংসারটিকেও জড়িয়ে ফেলে। ঝর ঝর সেই বৃষ্টির দিনটির কথা মনে করা যাক, এত বৃষ্টি যে মেজ বউয়ের মনে হচ্ছে চারপাশে শাদা চাদর টাঙিয়ে দিয়েছে কেউ। ওরই মধ্যে হেঁসেলঘরে চুরি করতে এসেছে খিড়কির কোণের বাড়ির আকলি নামের মেয়ে। ভেজা জবজবে মোটা একটা চট বুক থেকে পা পর্যন্ত ডান হাত দিয়ে ধরে আছে সে। কী করে যে শরীরও এক বড় শত্র“ হয়ে ওঠে নারীদের! তাই চটের মধ্যে দিয়ে যেমন অভাব, তেমনি উগড়ে পড়তে থাকে আকলির শরীর। দেখে আর ভাবে নাকি বলে মেজ বউ, ‘‘খেতে পায় না, তবু এত বড়ো বড়ো দুটো বুক ক্যানে যি তার, কি কাজে লাগবে আল্লা জানে! অমন করে চটটো হাত দিয়ে ধরে আছে মেয়েমানুষের শরম বাঁচাইতে কিন্তুক তবু ঢাকা পড়ে নাই ঐ পব্বতের মতুন বুক।’’ এই ভাত চুরি করতে আসা মেয়েটিকে দেখে কী যে হয় মেজ বউয়ের, দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধের ওপর এতদিন ধরে জমে ওঠা ক্ষোভ আর রাগের প্রতিশোধ নেয়ার স্পৃহা জেগে ওঠে। তাই নিজের ঘরের অভাবঅনটনের কথা জানা থাকার পরও সে একটি মাটির হাঁড়িতে থাবা থাবা চাল তুলে একদম ভর্তি করে নিয়ে আসে, তারপর তুলে দেয় আকলির হাতে। এইভাবে প্রতিশোধ নিতে পেরে সে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু তারপরও অভাব কি সরে যায় অত সহজে? তারপরও তো একদিন বাড়ির বাইরে এসে খামারে দাঁড়িয়ে সে দেখতে পায়, সাঁঝরাতে পুকুরের ঢাল ধরে মাঠের মধ্যে জড়ো হচ্ছে ন্যাংটো সব অভাবী মানুষরা। এখন গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে তারা। এইসব মানুষদের দেখতে দেখতে সেই প্রথম উপলব্ধি করে মেজ বউ, রাতের অন্ধকারও মানুষের কত দরকার! একান্নবর্তী পরিবারটিকে একক পরিবার করে তোলার পথ তৈরি করে দিয়ে যায় এই দুর্ভিক্ষ আর যুদ্ধ। বিছানায় পড়ে যাওয়া গিন্নীর অসুস্থতার সময়েই এর ক্ষীণ সূত্রপাত, পরে তা আরও বাড়ে, অভাবের তাড়নায় একান্নবর্তী সংসারে যে দ্বন্দ্বের শুরু হয়, তার প্রথম প্রকাশ ঘটে অন্দরমহলে, মায়েরা ছেলেপুলেদের খাওয়ার সময় বসে থাকতে শুরু করে, এই খাওয়াদাওয়া তদারকির কথা বিধবা ননদটির, কিন্তু সেখানে হাজিরা দিয়ে মায়েরা চেষ্টা করে তাদের সন্তানদের ভাগ বাড়ানোর। তারপর বাড়িতে কন্ট্রোলের শাড়ি আসে, ননদ তা বিলি করে ভাবীদের সবার মাঝে, কিন্তু সেই বিলিবন্টন পছন্দ হয় না কারও, যদিও সবার কাপড় একই জাতের, পাড়ের ওই রংটি ছাড়া। তারপর একদিন অন্দরমহলের সেই দ্বন্দ্বে মুখোমুখি হয় দু’ ভাই। মারামারি হয় তাদের, রক্তপাতও। আর ভাতের চাল ফুরিয়ে আসতে থাকে। কিন্তু সংসারের সবাই গায়ে বাতাস লাগিয়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে, যেন ব্যাপারটি তাদের কারোর জানা নেই। তারপর একদিন আর চুলো জ্বলে না। কিন্তু একান্নবর্তী সংসারটিতে এই নিয়ে কেউ এগিয়ে যায় না কর্তার সঙ্গে কথা বলতে। ভাত রাধা হয় না। কিন্তু আশ্চর্য, ছেলেপেলেরাও কেউ হেঁশেলে খেতে যায় না, যেন তাদের জানাই ছিল আজ আর রান্না হবে না, যেন তাদের বাপ-মা তাদের আগে থেকেই বলে দিয়েছিল হেঁশেলঘরে খেতে না যেতে। কর্তা চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে, অপেক্ষার মধ্যে নিরীক্ষা করে তার কর্তৃত্ব সত্যিই বহাল আছে কি না। তারপর বউকে না করে মাথা ঠুকতে। বলে, এই দিনটির জন্যেই অপেক্ষা করছিল সে। দেখতে চাইছিল, কেউ আসে কি না? ভাই আর ভাই আছে কি না? তারা এসে বলে কি না, চিরকাল তো তুমিই দেখভাল করেছো, এই সংকটে তোমাকেই তো হাল ধরতে হবে। তারপর সে আরও বলে, কাল সকালে বের হবে সে, যেখান থেকে পারা যায় এক গাড়ি ধান আনা হবে, তবে ওই ধান শেষ হওয়ার আগেই ভাই ভাই ঠাঁই ঠাঁই হয়ে যাবে।

এইভাবে একান্নবর্তী পরিবারটির ভাঙন নির্ধারিত হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষ, যুদ্ধ আর অভাব এর অন্যতম কার্যকারণ বটে, কিন্তু সবটাই কি? সংসারবিভক্তির ঘোষণা দেয়ার সময় কর্তা যা বলেন, তা থেকে আমরা এরও বেশি কিছু অনুভব করি বোধহয়। তিনি বলেন:

যুদ্ধু চলছে সারা দুনিয়ায়, এখনো শেষ হয় নাই যুদ্ধু, সেই যুদ্ধ একরকম করে পার হয়ে এইছি। দুর্ভিক্ষ আকাল মারী কিছুই ভেদ করতে পারে নাই এই সংসারের। কতো সংসার ছারখার হয়ে গেল, কতো মানুষ দুনিয়া ছেড়ে গেল, আমাদের কিছু হয় নাই। আর কিছু নয়, বাড়ির ছোটরা যেদিন না খেয়ে উপোস করে দিন কাটালে, আমার মাথায় বাজ পড়ল না, তাদের বাপ-চাচাদের মাথাতেও বাজ পড়ল না। পড়া উচিত ছিল, সংসার ভাঙার জন্যে যে বাপ-চাচারা ছেলেমেয়েদের উপোস করিয়ে অপেক্ষা করতে পারে তাদের মরাই ভালো। সেইদিনই আমি ঠিক করেছি, সকলের মনোবাঞ্ছা আমি পূরণ করব। মানুষ না হয়ে স্ত্রৈণ হয়েছে যে পুরুষমানুষ তার আর এক সংসারে থাকার কোনো দরকার নাই।

তা হলে আমরা কি বলব, পুরুষতন্ত্রের পরাজয় ঘটে ওইদিন, আর অন্দরমহলের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এতই উলঙ্গ হয় যে তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ ক্ষিপ্ত কর্তার গলা থেকে বের হয়ে আসে এ আর্তনাদ? এ কি কেবলই ক্ষমতার লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ, না এক হাহাকারেরও? এইখানে হাসান আমাদের মুখোমুখি করান মানুষের এবং মানুষের সত্তার দ্বৈত-র সামনে। ভাইদের স্ত্রৈণ আখ্যা দেয়ার মধ্যে দিয়ে কর্তা তার পুরুষতান্ত্রিক ক্ষিপ্রতাই প্রকাশ করেন, কিন্তু নির্ভর সব মানুষদের অরক্ষণীয় থাকার বেদনায় বিচ্ছুরিত তার ওই হাহাকার সামন্তীয় গর্ভ থেকে উঠে এলেও আপ্লুত করে আমাদের। প্রতিটি সংস্কৃতিরই নিজস্ব মাধুরী থাকে, সামন্ত সংস্কৃতির মাধুরীও আমরা টের পাই এর মধ্যে থেকে। পুরো উপন্যাসে হাসান ভিক্টোরীয় শুচিতা দেখিয়েছেন। একের পর এক সন্তান হয়েছে বিভিন্নজনের, কিন্তু তারপরও মনে হয়েছে, স্বয়ংক্রিয় পন্থায় এই বংশবৃদ্ধি ঘটে চলেছে, মানুষের ভালোবাসার, মানুষের যৌন আকাক্সক্ষার যেন কোনও সম্পর্ক নেই এই বংশবৃদ্ধির সঙ্গে। তবে সংসারের ভাঙনপর্বে এসে টের পাই, পরিবারটির কেউ যৌনদাস, কেউ আবার যৌনদাসী। যৌনতার দাসত্ব পাকাপোক্ত করতেই তাদের এত আয়োজন। মুখে মুখে ‘আমি ভাগাভাগি চাই নাই’ বললেও তাই তাদের পক্ষপাত সংসার ভাঙনের পক্ষে।

সংসার ভাগ হয়ে যাওয়ার পর বিধবা ননদ যখন কাঁদতে কাঁদতে বলে, জমি দেয়া হলেও তার সব কিছু কেড়ে নেয়া হয়েছে, তার কবরের জন্যেও তো ওই জমি কোনও কাজে লাগবে না, তখন কি মনে হয় না, শেষ হাসি ওই পুরুষতন্ত্রই হাসল? শ্বাসরুদ্ধকর অভাব থেকে বাঁচবার জন্যে মায়েরা হয়তো আলাদা হতে চেয়ে ভুলই করেছিল, হয়তো তাতে যৌনদাসত্বেরও বড় দায় ছিল; কিন্তু সেজন্যে সবকিছু ছত্রখান করে দেয়ার আয়োজন পুরুষতন্ত্রের পক্ষেই সম্ভব। কর্তা যখন তখন তার বিধবা বোনকে বলে, ‘এখন তোর একার একটি বাড়ি নয়, সব ভাইয়ের বাড়িই তোর বাড়ি’, তখন সে নিজেও কি অনুভব করে না, কী ভীষণ এক মিথ্যা কথা বলছে?

তবে একান্নবর্তী পরিবার যখন ছত্রখান হয়ে যায়, ব্যক্তি ও বিচ্ছিন্নতার উত্থান তখন আর বেশি দূরে থাকে না। আধুনিক ব্যক্তিমনন তৈরি হয় একদিকে সামন্তীয় সমাজের ভাঙন ও পুঁজিবিকাশের উন্মত্ততার সওয়ার হয়ে, অন্যদিকে সহায়সম্পদ সব হারাতে হারাতে মুক্ত ও উন্মূল হওয়া মানুষের মধ্যে দিয়ে। এইবার একটু-একটু করে সেই ব্যক্তির চেহারা দেখতে থাকি আমরা। দেখি, কর্তাকে প্রশ্ন করছে মেজ বউ, সব বাঙালি মুসলমানদেরই যদি একসঙ্গে এক দেশের মধ্যে না রাখতে পারে, তা হলে আর আলাদা দেশের কথা উঠছে কেন? দেখি, সংসারের এক তুচ্ছ গৃহিনীর মধ্যে যে-প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, সে প্রশ্নের জবাব দিতে না পারলেও এগিয়ে চলছে দেশভাঙনের উদ্যোগ। তখন কর্তাই তার বউয়ের প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা চালায়, যদিও নিজেও সে ক্ষুব্ধ ভীষণ, আর ওই ক্ষোভ চাপাও থাকে না তার কথাতে, মহাবিরক্ত হয়ে সে বলে, ‘এই জিন্না লোকটা একটা দিন জেল খাটলে না, একটা দিন উপোস করলে না গান্ধীর মতো, মুসলমানের কিছুই নাই তার, জামাকাপড় আগে পরত সাহেবদের মতো, এখন মুসলমানদের নেতা হয়েছে, সেরওয়ানি পরে, মাথায় পরে তার নিজের কায়দায় টুপি।’ তবে তার ভাইরা লাফাতে থাকে, বলতে থাকে, ‘তৌহিদের ক্ষ্যমতা জানো? তৌহিদি শক্তির সামনে হিদুঁ মালাউন দাঁড়াইতে পারবে না। এক মোসলমান, সত্তরজনা কাফের!’ তারপর দেশ ভাঙলে কর্তা আরও ক্ষুব্ধ হয়, কিন্তু বছরদশেক পর সেও চলে যায় নতুন দেশে।

জীবনের যে বয়ান হাসান শুরু করেছিলেন, তাতে শেষমেশ এই কালটিই যাবতীয় জটিলতার সৃষ্টি করে, আবার জটিলতার মধ্যে দিয়ে জীবনের গাঢ়তর সুসমাচারটি ব্যক্ত করে। আমরা দেখতে পাই, রায়বাড়িতে যাচ্ছে সেই মেজ বউ, বছরান্তে যে-কেবল যেত বাপের বাড়ি। কিন্তু তাও আর কয় বছর? জীবন গড়িয়ে যায়, শৈশব-কৈশোর হয়ে ওঠে স্মৃতিঘরের বিষয় এবং তখন ভয়ও জমতে থাকে, মনে হয় ফিরে গেলে স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠার সুখটুকু নষ্ট হয়ে যাবে। বাপের ওই বাড়ি বাদে মেজ বউকে যেতে দেখি শুরুতে প্রথম শ্বশুরবাড়িতে আসার পর রাজবাড়ির কর্তামায়ের কাছে আর একবার দেখি মোষের গাড়িতে করে গ্রামের নতুন সড়ক দিয়ে রেলস্টেশন দেখতে যেতে। সংসার ভাঙনের পর অবশ্য হেঁটে হেঁটে মাঝেমধ্যে বিধবা ননদের বাড়ি যায় সে; কিন্তু তাও আর কয়দিন! কিন্তু দাঙ্গার ভয়াবহকাল তাকে আরও পরিণত করে। তাকে দেখি, রায়বাড়িতে যেতে। সেই রায়দের বাড়ি, যে রায়দের জায়গাজমি কেনার মধ্যে দিয়ে তাদের একান্নবর্তী সংসারটি ভরে উঠেছিল। সেই রায়দের বড় ছেলে মারা যায় কলকাতায় হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময়। তার খুব ইচ্ছে জাগে একবার সেই সন্তানহারা মায়ের কাছে যেতে। তার নিজের ছেলেও তো মারা গেছে, যদিও অমন বিভৎসতার মধ্যে দিয়ে নয়, তারপরও সে তো জানে সন্তানের মৃত্যুযন্ত্রণা!

কিন্তু এই যে যাওয়া, এর মধ্যে দিয়েই মেজ বউ আরও ভালো করে জেনে গেল, কত বড় ফাটল তৈরি হয়েছে তাদের সবার মধ্যিখানে। মর্মস্পর্শী এই সাক্ষাৎকারপর্বটুকু মৃত্যুস্মৃতিকে আরও ভারী করে তোলে। দাঙ্গায় মৃত্যুর যন্ত্রণাকর বর্ণনা, কিন্তু তারও চেয়ে যন্ত্রণাকর ওই অনুভূতি, কোথায় ছেলেটি মরে পড়ে থাকল, লাশটির দাহ হলো না, গঙ্গা না পেলে কারও মুক্তি হয় না, কারও পাপক্ষয় হয় না, ছেলেটি রয়ে গেল সেই মুক্তির বাইরে, পাপপঙ্কের মধ্যে। তখন এত যে ইচ্ছে করে মেজ বউয়ের রায়গিন্নীকে জড়িয়ে ধরতে, কিন্তু ওই ইচ্ছেই তার মনে এই বোধ জাগিয়ে তোলে, আর সম্ভব নয়; সম্ভব যে নয়, তার কারণ তারা দুজন হিন্দু-মুসলমান। আর হিন্দু-মুসলমান এখন একজন আরেকজনকে খুন করে ফিরছে। কেবল এক প্রগাঢ় হাহাকার উঠে আসতে দেখি তার হৃদয় থেকে : ‘আঃ হায় রে! মানুষ লিকিন বুদ্ধিমান পেরানি।’ সে রায়গিন্নীর চোখে পানির বদলে ধক ধক আগুন দেখে, সে রায়গিন্নীকে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে দেখে আর অতীতে পরিভ্রমণ করে — বিয়ের পর নতুন বউ হয়ে কর্তা-মার সামনে যাওয়ার কথা, তার গড়ানো গয়নায় নিজের সর্বাঙ্গ ভরে ওঠার কথা, বড়খোকা মারা গেলে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে ভচ্চায্যির বুকে টেনে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার কথা।
বোধকরি মেজ বউয়ের এইদিনই বোধিপ্রাপ্তি ঘটে, যদিও তার বহিঃপ্রকাশের জন্যে আমাদের অপেক্ষা করতে হয় আরও দশ-দশটি বছর।

চার.
হাসানের এই আগুনপাখি, এক নারীর অন্তর্গত বয়ান আর জনপদে লীন প্রাত্যহিকতা যার বড় অবলম্বন, প্রায় পুরো সময়ই দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র ও রাজনীতির তোপের মুখে। একেবারে শুরুর দিকে হাসান যখন আমাদের মেহমান আপ্যায়নে কেতাদুরস্ত জিনের গল্প শোনান, মিষ্টি আনতে মানা করায় যে-জিন টিনের চালে খুব শব্দ করতে থাকে, ওই জিন তারপর ভেগে যায় এই রাষ্ট্র ও রাজনীতির আক্রমণে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামেরই একটি দিক দেখি আমরা, তবে খুব নগ্ন সে-দিক। সেখানে কোনও নায়ককে খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে কোনও আশা খুঁজে পাওয়া যায় না, সেখানে মানুষ কেবলই স্বাধীনতা নামের এক ঘোরের মধ্যে হিন্দু আর মুসলমান হয়ে যেতে থাকে। এইভাবে যে-সব চরিত্র আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে, তারা সবাই একেকটি বড় শিকার, রাজনীতির শিকার, সাম্প্রদায়িকতার শিকার, দুর্ভিক্ষের শিকার, ক্ষুধার শিকার, যুদ্ধের শিকার, ভাঙনের শিকার। এরা হতে চেয়েছিল ইতিহাসস্রষ্টা, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অসহায় বলি ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না।

আগুনপাখি উপন্যাসের উৎস হাসানেরই লেখা ‘একটি নির্জল কথা’ গল্প, যেটি সংকলিত হয়েছে ২০০৭ সালে প্রকাশিত তাঁর বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইটিতে। একই কাজ করেছিলেন গল্পকার কায়েস আহমেদ, টেনেটুনে তাঁর দেশবিভাগকেন্দ্রিক একটি গল্পকে উপন্যাস বানিয়েছিলেন, যার কোনও প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে ওই মন্তব্য করা সম্ভব নয়। ‘একটি নির্জল কথা’ গল্পে নারীটি বাধ্য হয় পূর্বপাকিস্তানে চলে আসতে, কিন্তু আগুনপাখি উপন্যাসে সে চলে আসার যাবতীয় আয়োজন প্রত্যাখ্যান করে। নতুন এক উপসংহার তৈরির জন্যে হাসান আজিজুল হককে আগুনপাখিতে যেতে হয়েছে নতুন নতুন বিবেচনা ও ঘটনার মধ্যে দিয়ে। তাই বর্ণনাভঙ্গি যদিও বা একই থাকে, নারীটি তার কথা শোনাতে থাকে, কিন্তু আগুনপাখির নারীর গন্তব্য হয় অন্যখানে। প্লেটো ও অ্যারিস্টটল যে রেপ্রিজেন্টশনাল দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দিয়েছিলেন, হাসান তাঁরই প্রতিনিধিত্ব করেন দু উপসংহার দিয়ে, কিন্তু একই শ্রেণিবর্গের মানুষকে অবলম্বন করে। ‘একটি নির্জল কথা’ গল্পের পরিণতিকে আগুনপাখি উপন্যাসে পাল্টে ফেলার মধ্যে দিয়ে ফলত দু’রকম হাহাকারকেই বের হয়ে আসতে সাহায্য করেন তিনি, যারা রয়ে গেছে তাদের হাহাকার, যারা চলে এসেছে তাদের হাহাকার। দু’রকম সত্যকে দুমড়ে মুচড়ে বের করে আনেন তিনি: যারা চলে এলো তাদের জীবনের অনিবার্য সত্য, আর যারা রয়ে গেল তাদের জীবনের অনতিক্রম্য সত্য। কিন্তু উপসংহার যাই হোক না কেন, দেশবিভাগের যন্ত্রণাময় অথচ নিষ্ফলা দিকগুলোই অনবরত চুলোচুলি করতে থাকে দুটো লেখাতেই। তবে আগুনপাখি এগিয়ে যায় জীবনের সুগভীর ব্যপ্তি নিয়ে; কেননা হাহাকার, যন্ত্রণা, রক্তপাত, নিষ্ফল দেশভাগ সব কিছুর পর সেখানে অসংখ্য ব্যক্তির অন্তর্নিহিত অনুভবকে এক ব্যক্তির মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখি আমরা। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন গ্রামীণ জনপদে কতটুকু সঞ্চারিত হয়েছিল, কীভাবে সঞ্চারিত হয়েছিল সেটিরও ভিন্নতর এক অবলোকন ও আখ্যান হয়ে ওঠে এ-কাহিনী।

এরকম একটি কাহিনী দাঁড় করানোর জন্যে ভাষা ব্যবহারের প্রশ্নটি খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, না চাইলেও। হাসানের ক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে। ভাষাকে মাটি থেকে সর্বশক্তি দিয়ে টেনে তুলেছেন তিনি, ভাঙচুর করেছেন, প্রতিস্থাপন করেছেন বাস্তবতার আলোবাতাসে। ভারতবিভাগের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ বাঙালি এক নারীর আধুনিক ব্যক্তিসত্তা উদ্বোধনের বাস্তবতাটিকেই বড় করে দেখেছেন তিনি, তাই একদিকে তাঁকে বইতে হয়েছে সমসাময়িকতার সর্বসাধারণত্ব, আবার একইসঙ্গে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে হয়েছে সেই সর্বসাধারণত্বের দিকে। এইভাবে ভাষার সর্বসাধারণত্বও চ্যালেঞ্জের সামনে পড়েছে তাঁর এ লেখায়। মানুষের মুখের ভাষার সাহিত্য-প্রকরণ তৈরি করেন তিনি গোটা উপন্যাস জুড়ে, ভাষার সর্বসাধারণত্বকে ধারণ করার পরও তা সর্বসাধারণত্বকে প্রতি মুহূর্তে খর্ব করে চলে। ভাষা, এমনকি মুখের ভাষাও, লিখিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার প্রত্যক্ষ রূপটি হারায়, শৈল্পিকতা সৃষ্টি ও যুক্ত করার মধ্যে দিয়ে সে অনবরত তার নিজের প্রত্যক্ষ রূপ তৈরি করতে থাকে, যে-প্রক্রিয়ার কোনও শেষ নেই; এদিক থেকে দেখতে গেলে অবশ্য বিষয়টিতে নতুনত্ব নেই। কিন্তু শৈল্পিকতা কতটুকু নিরাভরণভাবে সৃষ্টি ও যুক্ত করা সম্ভব হলো, বাস্তবতাকে সে কতটুকু অকৃত্রিমভাবে শৈল্পিক করে তুলতে পারল সেটিই বোধকরি এর নতুনত্বের দিক। আর তা পুরোপুরি নির্ভর করে লেখকের সামগ্রিক দর্শনের ওপর, বোধের ওপর। হাসানের শৈল্পিকীকরণ তাই শুরু হয় লিখতে বসার আগেই, কেননা নিজের দর্শন ও বোধ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নিয়েই তিনি লিখতে বসেন। আগুনপাখিতে ভাষার অন্তঃস্থ জীবনপ্রবাহের চিরন্তনতা ভাষারীতিকে সংযুক্ত করেছে সর্বসাধারণত্বের সঙ্গে, কিন্তু তীক্ষè অনুভূতিময়তা ভাষারীতিকে আবার করে তুলেছে সর্বসাধারণত্বের প্রতিদ্বন্দ্বী। শরৎচন্দ্রের যেসব গল্পউপন্যাস একদা হাসানের চোখের সবটুকু জল শুষে নিয়েছে, সেইসব কাহিনীর নারীরা পরিশীলিত হয়ে উঠেছে আগুনপাখির গিন্নী, বিধবা ননদ, দাদী, রায়গিন্নী, কর্তা-মা এবং মেজ বউদের মধ্যে দিয়ে। এবং এরকম বিবিধ পরিশীলনের কারণে ভাষারীতিতে যুক্ত হয়েছে তীক্ষè অনুভূতিময়তা। বোধহয় হাসানের এই শরৎ পাঠঅভিজ্ঞতার কারণেই, সচেতনভাবে তিনি যতই ভিক্টোরিয়ান শূচিতার বিরোধী হোন না কেন, তাঁর লেখার নারী-পুরুষ সব চরিত্রই যৌনতার প্রত্যক্ষ তাড়না থেকে মুক্ত থাকে। আবার এ-ও হতে পারে, যেমন তিনি নিজেই বলেছেন তাঁর এক সাক্ষাৎকারে, সৈয়দ শামসুল হকের পথটা ঠিক তাঁর পথ নয়, এই সচেতন ঘোষণাই তাঁকে বিরত রাখে মনজ-দৈহিক জটিলতাগুলোর বয়ান থেকে। কিন্তু একেবারেই যে তিনি নিস্পৃহ থাকেন, সেরকমও নয়; সংসার যখন ভেঙে যাচ্ছে, ভাইদের তখন ‘স্ত্রৈণ’ বলে আখ্যায়িত করছে কর্তা, ওই সম্বোধনের মধ্যে দিয়েই তিনি নির্মাণ করে দেন যৌনতার প্রাদুর্ভাব, যৌনতার উৎপাত!

হাসানের আগুনপাখি আরও এক কারণে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে, এটিই আমাদের কথাসাহিত্যের একমাত্র উপন্যাস, যেখানে ভারতবিভক্তিকে দেখা হয়েছে নারীর আত্মা দিয়ে, নারীর শরীর দিয়ে, নারীর বুকজোড়া তৃষ্ণা দিয়ে। এবং এই নারী একেবারেই সাধারণ এক নারী, কোনও অনুকুল প্রতিবেশ কিংবা আন্দোলন থেকে নয়, তার যা শিক্ষা তা একেবারে জীবনযাপন থেকে পাওয়া, পুরুষতন্ত্রের খরখরে তাপ শুষে নিতে নিতে সে তৈরি করেছে তার নিজস্ব দীপ্তি, নিস্ফলা রাজনীতির রক্তপাতে ভিজতে ভিজতে সে তৈরি করেছে নিজস্ব অবয়ব। জীবনের গভীরতর দর্শনের মুখোমুখি হয় সে জীবন থেকে এবং তাই হয়ে ওঠে আধুনিক এক ব্যক্তি। তাকে আমরা বলতে শুনি:

মানুষ কিছুর লেগে কিছু ছাড়ে, কিছু একটা পাবার লেগে কিছু একটা ছেড়ে দেয়। আমি কিসের লেগে কি ছাড়লম? অনেক ভাবলম। শ্যাষে একটি কথা মনে হলো, আমি আমাকে পাবার লেগেই এত কিছু ছেড়েছি। আমি জেদ করি নাই, কারুর কথা অবাধ্য হই নাই। আমি সবকিছু শুদু নিজে বুঝে নিতে চেয়েছি। আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না ক্যানে আলেদা একটো দ্যাশ হয়েছে গোঁজামিল দিয়ে যিখানে শুদু মোসলমানরা থাকবে, কিন্তুক হিঁদু কেরেস্তানও থাকতে পারবে। তাইলে আলাদা কিসের? আমাকে কেউ বোঝাইতে পারলে না যি সেই দ্যাশটো আমি মোসলমান বলেই আমার দ্যাশ আর এই দ্যাশটি আমার লয়। আমাকে আরো বোঝাইতে পারলে না যি ছেলেমেয়ে আর জায়গায় গেয়েছে বলে আমাকেও সিখানে যেতে হবে। আমার সোয়ামি গেলে আমি আর কি করব? আমি আর আমার সোয়ামী তো একটি মানুষ লয়, আলেদা মানুষ, খুবই আপন মানুষ, জানের মানুষ কিন্তুক আলেদা মানুষ।

যেন অনেক আগে মরে যাওয়া সন্তানের হৃদয়ের কাছে সে দাঁড়িয়ে থাকে আর পৃথিবীর দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করে :


সকাল হোক, আলো ফুটুক, তখন পূবদিকে মুখ করে বসব। সুরুজের আলোর দিকে চেয়ে আবার উঠে দাঁড়াব আমি।
আমি একা। তা হোক, সবাইকে টানতে পারব আমি।
একা।

এবং আমরা ভোরের আলোয় দেখতে থাকি একজন আধুনিক ব্যক্তির জন্ম, ব্যক্তিমননের জন্ম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যতাময় নারীসত্তার জন্ম। একা এক ব্যক্তি সে, কিন্তু একা হলেও সে ধারণ করে সমগ্রকে। আবার সে পুঁজিতন্ত্রের ব্যক্তিও নয়, আগুনপাখির প্রেক্ষাপট থেকে যে-পুঁজিতন্ত্র সামনের দিনগুলোতে রাষ্ট্র ও সমাজে আরও বড় দানব হয়ে উঠবে, সাম্প্রদায়িকতা ও দেশবিভাগের রাজনীতিকে দোর্দণ্ড প্রতাপে আরও বহু বছর বয়ে বেড়াবে সেই পুঁজিতন্ত্রেরও প্রতিদ্বন্দ্বী সে। আর প্রতিনিধি সুচেতনার, নিম্নবর্গের মানুষের।

যুক্তরাজ্য; ০৮ আষাঢ়-২৯ আষাঢ় ১৪১৫/ ২২ জুন-১৩ জুলাই ২০০৮

গল্প ছাড়া মানুষ নেই, সব মানুষের গল্প আছে, গল্প সে বলবেই।
হাসান আজিজুল হক

সাহিত্যের যাবতীয় চশমা খুলে লিখতে বসেন হাসান আজিজুল হক। মারাত্মক আবেগের চশমা, ধর্ম-সম্প্রদায়ের চশমা, — সবকিছুই খুলে রাখেন তিনি। যদি কেউ তাঁর চোখে কোনও চশমা দেখেই থাকেন, বলতে হয় bidhobader-katha.jpg…….
বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প । হাসান আজিজুল হক । সময় প্রকাশনী । ফেব্রুয়ারি ২০০৭ । প্রচ্ছদ: কাইয়ুম চৌধুরী । ১০০ টাকা ।
…….
নির্লিপ্তির চশমা সেটি। ওই এক চশমার গুণে আমাদের চারপাশের এত আবেগ, এত স্বপ্ন, এত ধর্ম, এত বিভেদ সবই এক অন্য রূপ পায় হাসানের গল্পে। গল্প-উপন্যাসের গাঁথুনিকে নিরাবেগী ও যৌক্তিক বললে গদ্যলেখকরা সাধারণত উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। এইভাবে লেখকের নিরাবেগী ও নির্লিপ্ত বোঝাপড়ার ক্ষমতার সঙ্গে অনেকেই তাঁর গদ্যে আবেগ থাকা না-থাকার বিষয়টি গুলিয়ে ফেলেন। হাসান এ ধারণার অন্যতম প্রধান শিকার। বিশেষ করে তাঁর স্বপ্ন, আবেগ, ধর্ম ও বিভেদের কথাই লিখছি এ কারণে, সবশেষ গল্পের বই বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্পতে তাঁর এই নিরাবেগ ও নির্লিপ্তি নতুন এক মাত্রা পেয়েছে নিরূপায়তার ক্রোধ ও ক্রন্দন সর্বজনীন হওয়ার মধ্যে দিয়ে।

হাসানের লেখায় আবেগ ও স্বপ্নের এই নতুন জন্ম ছুঁতে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের অপেক্ষা করতে হয় গল্পের শেষ অবধি। ‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর ক্ষেত্রে যেমন — ‘অহন তুমি কাঁদতিছো? অহন তুমি কাঁদতিছো?’ সংলাপের নম্র বক্রতা ও অসহায়তা দিয়ে আমরা অনুভব করি তাঁর নির্লিপ্তি জন্ম দিচ্ছে কী এক গভীর ক্ষতের জগত, বইয়ে দিচ্ছে আবেগের কী এক প্রস্রবন, বাঁচিয়ে রাখছে স্বপ্ন কী এক বেঁচে থাকার! যতক্ষণ না এই প্রান্তরে পৌঁছান ততক্ষণ কিছুতেই হাসান রেহাই দেন না তার নিরাবেগকে। এই নিরাবেগের সঙ্গে হাসানের পরিশীলিত, ঋজু ও ঝকঝকে গদ্যরীতি যুক্ত হলে পরাস্ত আবেগ সম্পূর্ণ উধাও হয়। ফলে আবেগের চশমা খুলে হাসান যে আবেগ দেখেন তা রূপান্তরিত হয় অথবা জন্ম নেয় প্রমিত আবেগের রূপে।

পূর্বসূরি কথাসাহিত্যিক জগদীশ গুপ্ত কিংবা মানিক বন্দোপাধ্যায়ের প্রতি হাসান আজিজুল হকের যে সশ্রদ্ধ আকর্ষণ, তা দিয়ে অবশ্য তাঁর এই নির্লিপ্তিকে ব্যাখ্যা করা যায় না। হতে পারে, এ রকম একটি গন্তব্যে পৌঁছতে তাদের লেখার ধরন হাসানকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু আরও বড় সত্য হলো, হাসানের এক সহজাত দক্ষতা রয়েছে আবেগকে অদৃশ্য করে ফেলার, আবেগকে রূপান্তরিত করার। আর সেটি বারবার সম্ভব হয় পারিপার্শ্বিক আর্থ-সমাজ, ভূগোল ও সময় সম্পর্কে হাসানের নিরবধি অভিজ্ঞানের ফলে। তিনি নিজেই যেমন বলেন, তাঁর লেখার যাবতীয় উৎস হলো বাস্তবতা; আর ওই বাস্তবতা যে-অসম্ভব নির্দয়তা ও কল্পনার পাঁকেচক্রে জড়িয়ে থাকে, নিরাবেগী বোঝাপড়া ছাড়া সম্ভব নয় সেসবের মধ্যে থেকে কোনও কিছু তুলে এনে প্রকাশ করা। কিন্তু হাসান ওই কাজটিই করেন, কেননা তা তাঁর সহজাত প্রবণতার সঙ্গে মেলে। ফলে তাঁর বাক্য হয় অসম্ভব নির্মেদ ও তীক্ষ্ণ, যদিও নিরাশ্রয়ী তীক্ষè বাক্যগুলি সম্পর্কবদ্ধ হয়ে দৃশ্যজ চিত্রকল্প তৈরি করতে গিয়ে অনিবার্যভাবেই আশ্রয় নেয় কাব্যিকতার। বাস্তবতাকে স্বাচ্ছন্দ্যময় করার জন্যেই এ কাব্যিকতা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কেননা বাস্তবতার তলদেশে যাবতীয় আবেগ ডুবিয়ে দিয়ে বাস্তবতাকেই ফের স্ফূরিত করা এ ছাড়া সম্ভব হয় না। এইভাবে এই বাস্তবতা আবেগের একটি বিশেষ ভরকেন্দ্র তৈরি করে যা আপাতদৃষ্টিতে আবেগময় নয়, বরং অবরুদ্ধ আবেগজাত। অবরুদ্ধ আবেগ প্রকাশে বিকৃতির যে ভয় ও আশংকা থাকে, হাসানের নির্লিপ্ত অন্তর্দৃষ্টি ও লেখনরীতি কাজ করে তার প্রতিষেধকের।

দুই.
বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইয়ে হাসানের নির্লিপ্তি স্পর্শ করেছে জাতীয়তাবোধের মৌলিক ও বিকৃত স্বর, কথিত গণতন্ত্রঅভিমুখিনতা আর ধর্মজ রাজনীতির বিষয়আশয়। কিন্তু এই নির্লিপ্তির মধ্যে দিয়ে যে নিরুপায়তার ক্রোধ ও ক্রন্দন উপচে উঠেছে তা প্রতিটি গল্পেই ছড়িয়ে দিয়েছে ধানীলংকার ঝাঁঝ। প্রকৃতার্থে এই ঝাঁঝই এ বইয়ে হাসানের রক্ষাকবচ, এই ঝাঁঝের কারণেই খুলে পড়েছে এতে সাহিত্যের সব চশমা।

তবে কাল-ভূগোল আর আর্থসামাজিক বৈষয়িক বিবেচনাগুলি ছাড়াও আরও অনেক কিছুই আছে এ বইয়ের গল্পে। প্রথমত হাসানের এসব লেখার সংলাপআশ্রয়ী গল্পের কাঠামো আর সংলাপ আগের চেয়ে অনেক খোলামেলা। শব্দ ও বাক্যের খুব স্পষ্ট সর সর শব্দ প্রতি মুহূর্তে আমাদের তাড়িয়ে ফেরে এইসব গল্পে। সব মিলিয়ে হাসানের পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভাষার মসৃনতায় যুক্ত হয়েছে উদ্দেশ্যহীনতার অস্থিরতা। দ্বিতীয়ত আঞ্চলিক ভাষারীতিকে জীবনযাপন, দ্বন্দ্ব ও মনোভঙ্গী প্রকাশের চালক হিসেবে ব্যবহার করার মধ্যে দিয়ে হাসান নেমেছেন এক অপর-নিরীক্ষণে। তৃতীয়ত ব্যক্তি হাসানও সশব্দে উপস্থিত তাঁর এসব নতুন কোনও কোনও গল্পে। ফলে লেখকের শ্রেণিঅবস্থানের সঙ্গে পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গতি-অসঙ্গতিও তীব্র কোনও কোনও গল্পে। এইসব গল্পে একদিকে প্রথম পুরুষ (আমি) চেষ্টা চালায় অপরাপর শ্রেণিগুলির পরিপ্রেক্ষিতে নিজেকে সংরক্ষিত রাখার। কিন্তু তারপরই আবার সেই প্রথম পুরুষ নিজের লেখকসত্বা সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে মনযোগী হন অন্যান্য শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দিকে। হাসানের ভাষার শক্তিমানতা এসব গল্পের একটি পরিণতি দিতে পারলেও লেখকের শ্রেণিগত অসহায়তা ও শৈল্পিকতার আকাক্সক্ষার দ্বন্দ্বের সাক্ষী এ গল্পগুলো।

হাসানের লেখার নতুন এ স্বর যাবতীয় দুর্বলতাসহ প্রথম ধরা পড়ে ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’তে, যে বই একই সঙ্গে গল্প ও ব্যক্তিগত গদ্য। মানবচরিত্রের যা সচরাচর বৈশিষ্ট্য, — উত্তাপ ও ঝাঁঝ পেরিয়ে সে প্রবেশ করে নিস্পৃহতার জগতে, — হাসান আজিজুল হকের ক্ষেত্রে তা হয় নি, বরং নিস্পৃহতার কারণেই ঝাঁঝ যুক্ত হয়েছে তাঁর লেখাতে। প্রথম পর্বে (সম্ভবত ‘আমরা অপেক্ষায় আছি’ অবধি) তাঁর লেখায় তিনি নির্লিপ্তির মধ্যে দিয়ে আবেগকে স্থৈর্যের রূপ দেন, — কেননা তখনও তাঁর কোনও না কোনওখানে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু এখন তিনি কোনও স্বপ্ন দেখেন না, একেবারেই স্বপ্নহীন এখন তিনি। অক্ষমতা ও নিরূপায়তার মধ্যে দিয়ে মানুষ তাঁর সমসময় সম্পর্কে যে বোধিসত্বা অর্জন করে, তা তাঁর মধ্যে ঘটায় নীরব ক্ষরণ, তা তাঁর মধ্যে খুব গোপনে জন্ম দেয় উদ্বেগ আর ক্রোধের। এই ক্ষরণ, এই উদ্বেগ ও ক্রোধই এখন তাঁর গল্পে উঠে আসছে তীব্র ঝাঁঝসমেত। ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’র পর ‘মা-মেয়ের গল্প’ বইয়ে এই ঝাঁঝ সুস্পষ্ট,Ñ যা একটি উপসংহার তৈরি করেছে বিধবাদের কথা ও অন্যান্য গল্প বইয়ে। স্বপ্ন আর দেখেন না বলেই হয়তো প্রকৃতিনির্ভরতাও এসেছে হাসানের কোনও কোনও গল্পে।

তিন.
হাসানের এ বই নাকি ছাপা হওয়ার কথা ছিল আরও আগে। কিন্তু বইটির নামগল্প অর্থাৎ ‘বিধবাদের কথা’ ছাপানোর জন্যে নেয় একটি লিটল ম্যাগ। সম্পাদকের পক্ষ থেকে তাঁকে অনুরোধ করা হয়, পত্রিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত গল্পটি কোনও বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্যে। লিটল ম্যাগ প্রকাশের বিপত্তি সম্পর্কে আমাদের সবারই কমবেশি ধারণা আছে। ফলে হাসান আজিজুল হকের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে এবং শেষপর্যন্ত বইটি বাজারের মুখ দেখে ২০০৭-এর বইমেলাতে। আর এতসব কাণ্ডকারখানার তোড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর ‘বিধবাদের গল্প’ ছাপা হওয়ার আগেই বিভিন্ন লেখকআড্ডায় আলোচিত হয়ে ওঠে। দু বোনের ভুল বিয়ে, তাদের দু ছেলের ভিন্ন পথ রূপকার্থে আমাদের এতসব ইতিহাসের অন্তর্গত করে, এতসব অন্তর্দ্বন্দ্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়, এতসব অন্তর্ক্ষরণ ঘটায় যে শেষপর্যন্ত গল্পটি হয়ে ওঠে মহাভারতের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। কালো ও শাদার আত্মিকতা ছিঁড়তে ছিঁড়তে, শোকসত্ত্বা বুনতে বুনতে এ গল্পে বাঙালি মুসলমান ক্রমান্বয়ে পরিশীলিত হয় আর মুসলমান বাঙালি বিকৃত হতে থাকে। কিন্তু তারপরও একই রক্তজাত হওয়ার নিরূপায় নিয়তি তাদের তাড়িয়ে ফেরে। দু বোন চেষ্টা করে আবারও একটি কাথা বুনতে। কিন্তু সেই কাথা বোনা হবে কি না কেউ জানে না। জানে না, নাকি দুটো কাথাই বোনা হবে। আর দুটো কাথা বোনা হলে জোড় কে মেলাবে, কীভাবে মেলাবে। তারা কেবল নকশা আঁকার কাজ করে আর সন্ধ্যা নামছে বলে কাঁথাটা আলগোছে ভাঁজ করে রেখে দেয় কালো সিন্দুকের ডালা খুলে একেবারে তলাতে।

এই এক গল্পের কাছে আমাদের বার বার ফিরে আসতে হবে নতুন হাসানের মন ও বিভঙ্গ অনুভব করবার জন্যে, আমাদের সমাহিত সব অর্জন ও কালযন্ত্রণাকে অনুভব করবার জন্যে। তবে গল্প তো শুধু এই একটিই নয়, এ বইতে হাসান রেখেছেন আরও ছ’টি গল্প। ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ ও ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ গল্প দুটিতে রয়েছে আদিবাসীরা। ‘একটি নির্জল কথা’য় রয়েছে ভারতবিভক্তির ফলে উন্মূল হয়ে এ দেশে আসা সন্তানহারা একজন মায়ের প্রতিদিনকার জীবনযাপনের কাছে হেরে-হেরেও বেঁচে থাকা স্মৃতিহাহাকার। যে সন্ত্রস্ত জীবনে আমরা এখন প্রায়অভ্যস্ত তারই আখ্যান ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’ এবং ‘ভূতের ভবিষ্যত’ গল্পে। আর আছে খানিকটা দলছুট গল্প ‘অতিথি সৎকার’।

চোখে পড়ার মতো ব্যাপার হলো, সাতটি গল্প মিলেমিশে হাসান আজিজুল হকের গল্পের নতুন অর্থময়তা তৈরি করেছে। আর এই অর্থময়তা তৈরি হয়েছে চিত্রল অনুভবময় ক্ষুধা, নারী ও প্রকৃতিনির্ভরতার মধ্যে দিয়ে। আবার, এ তিন অনুভবই যাবতীয় সৃষ্টিময়তার উৎস ও গন্তব্য। আপাতদৃষ্টিতে যে গল্পগুলিতে (‘দূরবীনের নিকট-দূর’, ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ এবং ‘অতিথি সৎকার’) প্রথম পুরুষ হিসেবে হাসানও ক্রমউন্মোচিত, সে গল্পগুলি আসলে যাবতীয় ব্যাকরণকে পরাস্তকারী ক্ষুধা ও ক্ষরণের গল্প। ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ ও ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ গল্পে তিনি এবং তার বহিরাগত একাত্মতাওয়ালা সঙ্গীরা একাত্ম হওয়ার চেষ্টা চালান আদিবাসীদের ভূগোল আর সমাজে। ‘অতিথি সৎকার’ গল্পে তিনি বিপ্লবী দলের এক নেতার সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে যেতে যেতে হঠাৎ যাত্রাবিরতি দেন নেতার এক আত্মীয়বাড়িতে। এ সব গল্পের উপস্থাপনা মনে করিয়ে দেয় তাঁর আত্মগত গল্পের নকশা ‘চালচিত্রের খুঁটিনাটি’কে। কিন্তু গতিময় দৃশ্যকল্প আর দৈববাণীর মতো বিভিন্ন সিদ্ধান্তের জন্যে দ্বিধান্বিতও হতে হয় এগুলিকে শুধু নকশার পর্যায়ে রাখতে :

“ছোট রাস্তাটিও শেষ। একেবারে ডবল দাঁড়ি দেওয়া। এইখানে পৃথিবীর কিনারা, সময়ও শেষ, জায়গাও শেষ। পা ফেলতেই কিনারার বাইরে, সময়ের বাইরে। কিনারা পেরিয়ে ভুক্তাবশিষ্ট এটোকাঁটা সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। বিলটা পারদ-শাদা, নিভাঁজ ধাতব চাদরের মতো পাতা, কোনো প্রতিফলন নেই, শুধু দিনের তীব্র আলো ছিটকে ফেলে দেয়। সেদিক থেকে যত তাড়াতাড়ি পারা যায় চোখ সরিয়ে আনতে পারলেই ভালো। রাতে অন্তত বিলের পূবপাড়ের চওড়া বাদামি মাটির উপর পাতা অমৃতডাঙি গাঁ-টিকে দেখতে পাওয়া যায়। শদুয়েক গজ চওড়া, মাইলটাক লম্বা এক চিলতে উঁচু-নিচু জমিতে সাঁওতালদের একটির পর একটি পড়ো-পড়ো বাড়ি। সাঁওতালরা কিছুতেই পুরো পড়তে দেবে না, তারা তালি মারবে, ধ্যাবড়া ধ্যাবড়া আঁকাবাঁকা সেলাই করবে, গাছের হাড়, মানুষের হাড় গুঁজে দিয়ে চালাগুলিকে খাড়া করে রাখবে। ন্যাকড়াফালি, শুকনো পাতা, মাটি দিয়ে বুজিয়ে দেবে আর যদি কোনো, যদি কোনোমতে একখানিও আস্ত মাটির বাড়ি থাকে, তাহলে সাঁওতালবউ সিঁদুর-মাটি লেপে, নীল-মাটি, গেরুয়া-মাটি লেপে, আলকাতরা-মাখানো দরজায় শিকল দিয়ে সেখানে জীবনের ছায়া আর শান্তি আটকে রাখবে। সেই অমৃতডাঙির পশ্চিম শিওরে তীরসোজা সরলরেখায় বিল আর পৃথিবীর কিনারা, পুবে তেমনিই সরলরেখায় ভীষণ সবুজ ধানের মাঠ। অমৃতডাঙিতে একটিও ভিটে নেই, মাটি আর ঘরের মেঝে একই সমতলে। এখানে সেখানে উঁচু মাটির ডিবিগুলিতে গোখরো আর উইপোকা আর গাঁয়ে ঢোকার মুখে একটিমাত্র নিখুঁত অক্ষয় বিশাল বট যাতে ওরা যে এখনো কেন বেঁচে আছে, তার কারণ বোঝা যায়।” — (দূরবীনের নিকট-দূর)

“গোরস্থানে গেলে এরকম হয়। মনে হয় কেউ নেই, কেউ আসবে না, তারপরই বাতাসই যেন এক একটি হালকা মূর্তি হয়ে হাত-পা তুলে নাচতে থাকে। তেমনিই, এতক্ষণ কেউ কোথাও ছিল না, বাড়ি নয়, ঘর নয়, মাঠ নয়, পথ নয়Ñ তারপরেই ধীরে ধীরে কাঠি-বসানো পতাকা, তারপর দুই সারি পতাকার ভিতর দিয়ে হাওয়া থেকে তৈরি হাওয়া মানুষেরা নিঃশব্দ চিৎকারে ধেয়ে আসছে বড় রাস্তার দিকে।” — (দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে)।

“কিন্তু পাখিদুটো গেল কোথায়? ওরা কি উড়ে গেছে? হতেই পারে না — সরিতেন্দু বলল, দুটোই পড়েছে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ভিটের ঢালুতে ভাঁট জঙ্গলের মধ্যে তাদের কিছু কিছু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাওয়া গেল। একটাতে বন্ধ-রাখা অটুট ঠোঁট, অন্যটার শরীরের নিচের অংশ। সেটা হাতে নিতে দপদপ করছে হৃৎপিণ্ড। সেখানকার মাংস তপ্ত। সরিতেন্দু খুব সুদর্শন। এখন এমন কুৎসিত লাগল ছেলেটাকে!” — (অতিথি সৎকার)

চার.
কিন্তু অবহেলা সহ্য করে শেষ পর্যন্ত এই গল্প তিনটিতে টিকে থাকে সরল ক্ষুধা। এই সরল প্রসঙ্গটি উঠে না আসা পর্যন্ত নাগরিক বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির আদিবাসীসংক্রান্ত সুশীল উদ্যোগকে আর একটি বিপ্লবী দলের নেতার সঙ্গে একই মাইক্রোবাসে মফঃস্বলযাত্রায় আমাদের পাঠকদেরও তেমন গরম বা হাঁসফাঁস লাগে না। বরং বেশ আরামই লাগে। আর এই আরামের কারণে আদিবাসীদের জন্যে নিবেদিত সুশীলদেরও একেবারে আত্মার সঙ্গীই মনে হয়। সুশীল মধ্যবিত্তরা আদিবাসীদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার ক্যারিকেচার দেখাতে ‘দূরবীনের নিকট-দূর’ গল্পে আদিবাসী উৎসবে যায় আর একটানা কয়েকদিন ধরে মদ্যপানের তীব্র লালসায় খাবি খেতে থাকে। আর এর ফাঁকে ফাঁকে যা হয় আর কি, — সাঁওতালদের অতিথিবরণ উপভোগ করতে করতে নিজেদের উদারতা ও স্বার্থত্যাগের নজির স্থাপন করে চলে। যদিও সাওতালদের ভাষায় গাওয়া গান শুনতে শুনতে সুশীলদের ভারি অসুবিধাই হয়, আর ‘দোষ’ ও ‘অপরাধ’ দূর করতে সাওতাল বুড়ি, প্রৌঢ়া, কিশোরী ও যুবতীরা বাংলা ভাষায় নতুন করে গান গাইতে থাকে।

কিন্তু ক্ষুধা উঠে আসে, কেননা দূরবীন গল্প জানে, আর হাসান পারেন না দূরবীনকে সামাল দিতে। কেননা ‘গল্প ছাড়া মানুষ নেই, সব মানুষের গল্প আছে, গল্প সে বলবেই।’ আর বাতাসে চোখ ভাসতে থাকে। আর এমন নয় যে সেসব চোখ লাল রঙের কুকুরের চোখ। বরং চোখগুলো সব রক্তঝরা লাল চোখ, বাতাসের চোখ, রোদের চোখ, জমির আর আকাশের চোখ। এইসব চোখ জ্বলজ্বল করে তৃষ্ণায়, অপার এক তৃষ্ণায়, তারপর নিভে যায় জলের ভারে। জলের নিমজ্জিত অজস্র চোখ পায়ে মাড়ালেই কোথায় সে জল আর কোথায় সে চোখ, — পড়ে থাকে শুধু কাঠকয়লা! আর অতিথি সৎকার করতে আসতে থাকে পচুইভর্তি মাটির কলস, ছোট ছোট গ্লাস। কলসির মধ্যে ছলাৎ ছলাৎ করতে থাকে কুল কুল করতে থাকে কত ফুর্তি, কত মজা, কত বসন্ত-রাতের রমণসুখ, কত স্মৃতি, কত বিস্মৃতি, রাতপাখির ডাক, কখনো কুচকুচে কেউটের নিঃশব্দ বুকে হাঁটা, হয়তো কখনো একটু নড়ে ওঠে কলসি, ককিয়ে কেঁদে ওঠে দারুণ ব্যথায়। এবং তাই কলসীদোলা আবিলতা নিয়ে উদারতা জাগে আর এও জানতে ইচ্ছে করে হাসানের, কী করে এই সাওতালরা বেঁচে থাকে, বাঁচে কেমন করে?

গল্প এইবেলা আরও গল্প তৈরি করে; এ-ও কি সম্ভব এইসব সুশীল মানুষ শিখতে পারবে তাদের মতো বেঁচে থাকা? দারুণ ত্রাসে, দারুণ ক্ষোভে দূরবীন চিতাবাঘ হয়ে ওঠে, বোমাবাজ হয়ে ওঠে, এইবেলা সে সুশীল মানুষদের অক্ষমতা দেখিয়ে দেয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে মাটি পুড়িয়ে, ঘাস পুড়িয়ে, গাছ পুড়িয়ে, বাতাস পুড়িয়ে আকাশ পুড়িয়ে সংগুপ্ত হাসিতে ফেটে পড়ে,

“শিখতে লারবেন ছার, শিখতে লারবেন? আমরা সোমবছর কি খাই তাই জিগাছেন? আমরা শাকপাতা ছিঁড়্যা খাই, ঘাস কালাই সেদ্ধ করে খাই, খামচে খামচে মাটি তুলে খাই, খিদেয় প্যাটে মাটি লেপি, ইঁদুরÑছুঁচো মেরে খাই, শামুক গুগলি খাই। আমাদের কুন্নো অভাব নাই।…আর কুনো ধান আমরা দেখি না। আমাদের দিষ্টি নাই।

“এইবার সে একটু শান্ত হয়। কেননা আগুন নিভে আসে। এইবার ‘সে কেমন জুড়িয়ে যেতে যেতে’ বলে, ‘সাঁওতাল-ওঁরাও-রা না খেঁয়ে খেঁয়ে শিখেছে ক্যামন করে খেয়ে-পরে বাঁচতে হয়।’”

আদিবাসীদের সঙ্গে সংহতি ও একাত্মতাওয়ালাদের আর এক গল্প ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে ডিম ডিম রবে’ অবশ্য এক দেবী আছেন। হাসানের গল্পের উৎস যদি বাস্তবতাই হয়ে থাকে তা হলে আমার ধারণা, ইনি মহাশ্বেতা দেবী। তিনি যাচ্ছেন রাজশাহীর সাঁওতাল আর ওঁরাওদের মধ্যে সংহতি ও একাত্মতাওয়ালা সবাইকে সঙ্গে করে। ঢোল, মাদল বাজছে বটে, কিন্তু দ্রিম দ্রিম, ঘোরলাগা, দোল-লাগা নয় সেই ঢোলমাদল, বরং ঢ্যাপঢ্যাপানো। আর সেই শব্দে দুই দিকে দুই রুঠো শুকনো যুবতীদের সঙ্গে দেবীও নেমে পড়েছেন, দুলছেন, নাচছেন। কোথাও বেসুরো সুরে শোনা যাচ্ছে অতিথিবরণের বেসুরো গান। গানের চেয়ে অনেক বেশি উচ্চকিত বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দের মধ্যে কেমন এক আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ‘‘… মা এসো গো, রানী এসো, ধুলোকাদার মধ্যে দিয়ে এসো, হাড়-ফাটানো রোদের মধ্যে দিয়ে এসো, খালি পায়ে ফাটা-পায়ে বাবুদের ফাঁকা মাঠের ভিতর দিয়ে রক্ত ঝোঁঝাতে ঝোঁঝাতে এসো, মাঘের কনকনে ঠাণ্ডার মধ্যে ছেঁড়া শাড়ির ফোকর দিয়ে এসো। এসো গো, ছেলেপিল্যার ভোকের মধ্যে, ফাটা শানকির কান্দনের মধ্যে, যবের শীষে, গমের শীষে, চাল-পচুনির আমানির সোয়াদে এসো।’’

এ ভাবেই সর্বগ্রাসী ক্ষুধা জেগে উঠতে থাকে, ‘‘…আমরা খেতে পাই না, আমাদের শুয়োরগুনো, ছাগলগুনো, গরুটো মোষটো, মুরগিগুনো, ডোবার শোলটাকি মাছগুনো পর্যন্ত খেতে পায় না। সবাই খালি রোগা হচে আর মরে যেচে।’’

এই ক্ষুধার্ত মানুষদের দেবী মানে মহাশ্বেতা দেবী দিব্যি দিতে চান, ‘‘চায়ের কাপে পচুই খাস। ঘরে ভাত নেই খাবার নেই, আর ভাত পচিয়ে মদ খাস?’ শুনে একজন বলে, ‘এক কাপ দুই কাপ খাই গ, কুন্ শালা বেশি খায়, ঊরি বাবা মায়ের সামনে খেতে পারি? আপনারা সব অতিথি আসিচ্ছেন, তাই আজ এট্টু…’’

হ্যাঁ, অতিথিরা মানে সংহতি ও একাত্মওয়ালা অতিথি এসেছেন; তাই আজ একটু মন খুলে খাওয়াদাওয়া করতে পারছে আদিবাসীরা। কেননা অতিথিদের জন্যে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ঘুরে মুঠো মুঠো সরু মোটা নানারকম চাল জোগাড় করা গেছে পুরো বিশ কে.জি.। একটি শাদা হাঁস, — তাও পাওয়া গেছে ভাগ্যগুণে। মুষ্ঠিচালের গরম খিঁচুড়িবোঝাই বিশাল ডেকচির মধ্যে সাঁতরে বেড়াচ্ছে দা দিয়ে কুটি কুটি করা সে হাসের মাংস। এ হেন গরম খিঁচুড়ি খেতে খেতে আনন্দে সাঁওতাল আর ওঁরাওদের চোখ মুদে আসে; কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দু মাইক্রোবাসে করে আবারও শহরের দিকে রওনা হন বমি সামলাতে ব্যতিব্যস্ত সংহতি আর একাত্মওয়ালারা। আর আদিবাসীপাড়া আবারও নির্জন, পরিত্যক্ত ও জনহীন হয়ে পড়ে। হাসানের ভাষায়, ‘‘সৃষ্টির প্রথম দিনের মতো।’’

আমরা জানি না, সৃষ্টির প্রথম দিন কেমন ছিল। কিন্তু হাসান আজিজুল হকের সৃজনক্ষমতা সর্বগ্রাসী। তাই এই নির্জনতা ও জনহীনতায় পরিত্যক্ত অঞ্চলে আমরা খুঁজে পাই সৃষ্টির প্রথম দিবসটিকে।

এসবের পাশাপাশি হাসানের ‘অতিথি সৎকার’ যেনবা ক্ষুধার জাদুবাস্তবতা। এক বিপ্লবী রাজনীতিকের সঙ্গে দল বেঁধে জিপে করে সাতক্ষীরা যাওয়ার এই গল্প শুরু হয়েছে আধুনিকতার উপদ্রব পাটকেলঘাটা ব্রিজের মুখে। জিপ সেখানে কিছু সময়ের জন্যে আটকে গেলেও তাদের মধ্যে অবশ্য তেমন কোনও উদ্বেগ কাজ করে না। কেননা ব্রিজ থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম কোণেই তাদের গন্তব্য, যেখানে নেতার আত্মীয় বা বোনজামাইয়ের বাড়ি। শেষপর্যন্ত অবশ্য হেঁটে যেতে হয় না তাদের। গাড়ি ফের উঠে পড়ে খাদ থেকে এবং জিপ সোজা ঢুকে পড়ে খুব বড় পড়ো এক উঠোনে। এবং তখনই আসল গল্পের শুরু হয়। কীর্তিমান বামনেতার দুলাভাই চেক লুঙ্গি আর ফর্শা গেঞ্জি গায়ে বেরিয়ে আসেন। হাসানের বয়ানে লিখতে গেলে, “ছিপছিপে চেহারা, চোখ দু’টি শান্ত না নিস্পৃহ ঠিক বলতে পারি না। আমাদের বন্ধু বাম নেতা তাঁর শ্যালক, অতি মধুর সম্পর্ক কিন্তু ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বেলাতেও উচ্ছ্বাস কিংবা হৃদয়চাঞ্চল্য প্রকাশ করা বাম রাজনৈতিক ঐতিহ্যে একরকম নিষিদ্ধ। কিন্তু গৃহকর্তার তো সে বালাই নেই, তবু তিনি কেমন একটা জণ্ডিস-জর্জর হলুদ চোখে চেয়ে মৃদু গলায় শুধু বললেন, বাড়িতে সব ভালো? আম্মা ভালো আছেন?”

গৃহকর্তার নিস্পৃহতার চূড়ান্ত রূপ দেখা গেল আরও একটু পরে, তারা দুপুরে কিছুই খান নি বলার পরে। ততক্ষণে ক্ষুধা যেন আকাশের মতো ভেঙে পড়ছে তাদের সকলের ওপরে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে জেগে উঠছে আরও তীব্র অবিনাশী ক্ষুধা। আর সেই অবিনাশী ক্ষুধাকে উপহাস করতেই বুঝি গৃহকর্তা অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটাতে শুরু করলেন। বাড়ির মধ্যে থেকে এক ছোকরা অতিথিদের জন্যে নিয়ে এলো বগলে পুরানো মাদুর, হাতে পানি ভরা বিরাট এক পিতলের জগ। তারপর সে আবারও ফিরল দু হাতে দুটি গামলা নিয়ে। একটিতে একটু একটু ঢেউ তুলছে ‘নিরুৎসাহজনক পাতলা ঠাণ্ডা ডাল’ আর আরেকটিতে ‘ডেলা পাকিয়ে আছে ভাতের দানা’। ক্ষুধা ততক্ষণে তাদের সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে ফেলেছে, তারা একজন আরেকজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন ক্ষুধার তোড়ে, তাই তাদের শুধু এটুকুই মনে হলো, ‘‘খুব ভালো কথা হচ্ছে গামলা দুটোই পুরোপুরি ভরা।’’ এরপর ছোকরার পাশাপাশি গৃহকর্তাও এলেন একহাতে একবাটি পুঁইশাক আর আরেক হাতে চীনেমাটির বাসন নিয়ে। এবার শুরু হলো ক্ষুধাহত্যার পর্ব।

“আমরা চমৎকার শৃঙ্খলায় তক্তপোশের উপর বসে যাই। করকরে ঠাণ্ডা ভাত পুঁইশাক দিয়ে মেখে দুএক গ্রাস মুখে তুলে আমাদের নেতা বন্ধুটির মুখের দিকে চেয়ে দেখি। অস্বস্তি আর লজ্জায় তাঁর বামপন্থী মুখ সামান্য আরক্ত — গোঁফজোড়া ওঠানামা করছে। ভগ্নিপতি একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলেন, একটি কথাও বললেন না। আশ্চর্য দ্রুততায় শেষ তণ্ডুলকণাটি, পুঁইশাকের সর্বশেষ পাতাটি আর ডালের তলানিটুকু পর্যন্ত অদৃশ্য হলো আর নিজের নিজের গর্ত পুরোপুরি বুজিয়ে ফেলায় পাঁচ মিনিটের মধ্যে আমাদের সকলের মুখের চামড়ায় স্বাভাবিক রং ফিরে এল। আলো রোদ হাওয়া ভালো লাগতে লাগল, জিপের মালিক আমাদের ভীষণ বড়োলোক বন্ধু আবার খুনসুটি চালাতে শুরু করলেন। বাংলাদেশের মানুষের নিদারুণ অবস্থা আর আসন্ন বিপ্লব নিয়ে দুচারটে কথা শুরু করাও এখন সম্ভব বলে মনে হলো। এর মধ্যে কয়েকবার আমি আমাদের ধনী বন্ধুটিকে দেখেছি। কোনো খাবারেই কখনই তাঁর তেমন আগ্রহ দেখিনি। মুখে খাবার নিয়ে এমন এলিয়ে চিবোনোর অভ্যাস তাঁর যেন ভিতরে ঢুকতেই চাইছে না মুখ-ভরা খাদ্য, উগড়ে পড়ল বলে। হুইস্কি-টুইস্কি হলে একটু-আধটু লোভ করতে দেখেছি তাঁকে কখনো কখনো। অত যে কথা বলেন, মুখে তাঁর একটি শব্দ ছিল না এতক্ষণ। তক্তপোশে বসার আগে যখন ভাত ডাল সাজানো হচ্ছিল, বিবর্ণমুখে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন সবার পিছনে। আর খাওয়ার সময় একবার দেখেছিলাম তাঁকে। কি গভীর মনযোগ তাঁর, যেন সাধনায় বসেছেন। একটি শাকপাতা তাঁর বাসন থেকে সরানোর চেষ্টা করলে যেন একবোরে সিংহের মতো ঝাঁপিয়ে পড়বেন।”

কিন্তু, তারপর যা হয়, পেট ভরতেই মাওলানা ভাসানী যেমন আল মাহমুদকে বলেন, নাও এবার তোমার কবিতা শোনাও, তেমনি এবার বুদবুদিয়ে তির্যক সব ভাবনা উঠে আসতে থাকে পরিতৃপ্ত পেটের মধ্যে থেকে। তৃপ্তি অর্জনের পর সমালোচনায় আক্রান্ত হতে আর বাধে না তাদের। কেননা ‘পছন্দ অপছন্দ সব খাবার আগে, খাওয়া হয়ে গেলেই তৃপ্তি অবিকল এক।’

তবে ভগ্নিপতি আরও অনেক কাণ্ড করতে জানেন। শিকার থেকে ফিরে মুখোমুখি হলেন তারা সেইসব কাণ্ডকারখানার। পুকুরে তখন মাছ ধরতে নেমেছে বোধহয় পুরো গাঁয়ের মানুষ, বড় বড় রুই কাতলা জাল ফেলে তুলে আনছে তারা, শুকনো ডাঙায় সেই সব মাছ লাফালাফি করছে আর তাদের প্রতিটি আঁশের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তীব্র মৃত্যুপূর্ব আকুলতা। আরও আছে দুটি খাসী, খুঁটিতে বাধা অবস্থায় তারাও অপেক্ষা করছে মৃত্যুর জন্যে। এরই মধ্যে কোনওখান থেকে স্তব্ধতা ফুঁড়ে কার যেন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “সোবাই কি মাছ পালো — মেয়াভাই বলে দিইছে মাছ যেন সোবাই পায়, বাড়িতি মানী অতিথি খাবে, তাদের সম্মানে গাঁয়ের সোবাইকে মাছ দিতি হবে হবে, সোবাই কি পাইছে? অলো, কথা কস্ না ক্যানো –।”

এবং অনেক রাতে অতিথিরা যখন খেতে বসলেন, “তখন প্রচুর আলো, প্রচুর বাতাস, প্রচুর মানুষ, সামনে ধরে দেওয়া হচ্ছে নকশা-করা চিনেমাটির বাসন, তাতে রাখছে ঘিয়ে জবজবে ধোঁয়া-ওঠা পোলাও, রুইমাছ ভাজার এক একটি বিরাট টুকরো, প্লেট ছাপিয়ে বাইরে গিয়ে পড়ছে, মুরগির রান, মাছের কালিয়া, দোপেয়াজা, খাসির কোর্মা — ঘুমচোখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছি না। সত্যি বলতে কি জীবনে আর কখনো এত বিপুল খাদ্যবস্তুর দিকে এত ভাবলেশহীন নিস্পৃহ চোখে চেয়ে দেখিনি।”

কেন এমন করলেন গৃহস্বামী? তিনি কি আসলে বামমনাদের বোঝাতে চাইছিলেন ক্ষুধার ভাষা? বোঝাতে চাইছিলেন প্রকৃত সমতার ভাষা? তাই প্রথমবেলা অবহেলামেশানো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন, আর রাতে গাঁয়ের সব হতদরিদ্র মানুষসহ ভোজনের আয়োজন? এইসব চিন্তা নিয়ে আমরা এগুনোর আগেই হাসান জানিয়ে দেন, “বছরতিনেক পরে, একাত্তর সালের প্রথম দিকেই, এপ্রিল-মে মাসে হবে, খবর পেয়েছিলাম, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর একটি দল এক ঝাঁক বুলেটে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল ওঁর দেহ। সঙ্গে ছিল তাঁর একমাত্র কিশোর পুত্র।”

পাঁচ.
গল্পে হাসান ভবিষ্যতদ্রষ্টা হতে চান না, — এই অর্থে তার গল্পে কোনও গন্তব্য নেই। ব্যাপারটিকে বেশির ভাগ সময়েই আমরা স্বপ্ন না থাকার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলি। নামহীন গোত্রহীন-এর একটি গল্পে যেমন, কোনখানে যাবে তা জানা নেই তার, তবে কোথাও না কোথাও যেতে হবে। ‘ফেরা’ গল্পে যেমন, ডোবাটা ছোট, অস্ত্রটি যে কোনও মুহূর্তে তুলে আনার আকাক্সক্ষাও থাকে। লোকমুখে এ গল্প এত প্রচারিত যে, নিজের লেখার অর্থময়তা প্রমাণ করার জন্যে কাউকে আমি তাঁর সাক্ষাৎকারে বয়ান করতে পড়েছিলাম, “হাসান আজিজুল হকের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখা গল্প ‘ফেরা’তে এক মুক্তিযোদ্ধা পুকুরের মধ্যে ফেলে দেয়া অস্ত্র অনেকদিন পর আবার তুলে আনে।” ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই আনন্দিত যে হাসানের গল্প এভাবে তিল থেকে তাল হচ্ছে এবং ব্যক্তি হাসানই ম্যাজিকরিয়াল হয়ে উঠছেন। তবে হাসানের এই পর্বের গল্পে ভবিষ্যতহীনতা সুস্পষ্ট হওয়ার পরও কোনও এক স্বপ্নময়তা উঠে আসছে তাঁর নারীদের মধ্যে দিয়ে। জগতের সব কিছুর ওপর আস্থা হারালেও হাসানের অভিজ্ঞান নারীতে স্বপ্নময়। হাসানের নারীসম্পর্কিত এই অভিজ্ঞান তাঁর ভবিষ্যতহীনতা ও গন্তব্যহীনতার সঙ্গে দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখে।

আর নারীর কত মূল্যের বিনিময়ে, কত অসম্ভব হাহাকারের মধ্যে দিয়ে যে এই স্বপ্ন বেঁচে থাকে! নিরুদ্দিষ্ট বেঁচে থাকাটাও তখন কী যে ভালো আর আবেগময় হয়ে ওঠে! ‘একটি নির্জল কথা’য় এ রকম এক আবেগময় মা এগিয়ে চলেন আত্মকথনের মধ্যে দিয়ে। এরকম সব কথন আত্মকথনের মধ্যে নীরব হয়েই তো সম্ভব হয় কোনও এক অজানায় বেঁচে থাকা স্বপ্নের খোঁজ পাওয়া! সমবয়সী সৎ-মায়ের সঙ্গে বন্ধুতায় যেন দুই বোন হয়ে পড়ার স্মৃতি, বিয়ের পরে স্বামীর কাছ থেকে তার শরের কলম কালিতে ডুবিয়ে কোনোমতে নাম সই করতে শেখার স্মৃতি…আরও কত স্মৃতি তার। এতগুলো ছেলেমেয়ের মা হয়েছে সে, স্মৃতি তো থাকবেই তার। কিন্তু সবচেয়ে নৃশংস স্মৃতি এই, ছেলে তার মারা গেছে পুলিশের কাছ থেকে ছাড়া পাওয়ার পর সান্নিপাতিক জ্বরে। এই ছেলে সেলাইকলের মতো গুনগুনিয়ে ওঠে মায়ের মনে, যার কবর সে ফেলে এসেছে আরেক দেশে। সেই মা বলে চলে :

“সারা জেবন খ্যালোম-দ্যালোম, হাঁটলোম-ফিরলোম, এতগুনো ছেলেমেয়ের মা হলোম, কিন্তুক আমি জানি, আমি বাঁচি নাই। কে বিশ্বেস করবে এই কথা? আমি এ্যাকন জীয়ন্তে মরা। ছেলে য্যাকন চলে গেইচে, কি কাঁদন সব কাঁদচে। সেই কাঁদনের রোলের মধ্যে এ্যাকমনে একটো কতাই বলেছেলোম যি, আল্লা, ছেলেকে তুমি বেহেশত-দোজখ যিখানেই রাখো, সি তুমার ইচ্ছা, আমার কুনো কতা নাই, তবে আমার মরণের পরে আমাকে ছেলের কাছে রাখবে। নাইলে মায়ের কাছে দায়ী হবে তুমি। ছেলের কাছে থাকার লেগে সারা জেবন আমি মরে থাকলোম। বিশ্বেস কর ধনরা, আমি বাঁচি নাই।

“সেই মরাকে টানতে টানতে ই দ্যাশে আনলে। কত্তা আর নাই। নাইলে তাকে শুদোতম। ছেলেদের কাছে শুদোই, বল্, ক্যানে আমাকে ই ভিন্ দ্যাশে আনলি। ই দ্যাশ দ্যাশের লোকদের লেগে ভালো — আমাকে ক্যানে লিয়ে এলি! কুন্ দোজখিরা দ্যাশ ভেঙেছে, তাতে আমার কি? আল্লা, আল্লা, আমার মুখটো যি খারাপ হয়ে যেচে। সব মায়ের পুত ভালো থাকুক। কেউ দোজখি লয়। আমি জানি আমি দোজখি, জরমো থেকে দোজখি। একবার খালি বেহেশত থেকে বাতাস আইছিল। খোকার মুখ দেখেছেলোম আমি। মায়ের বুকে পনেরো বছর ছিল। তাইতে বলছি, ছেলম তার কাছে, ই দ্যাশে আনলি ক্যানে, একবার শুদুইলি না বুকের ভ্যাতর কি হচে, গলায় দাড়ি বেঁধে টানতে টানতে লিয়ে এলি।”

এইসব বিলাপের মধ্যে পার্থিব-অপার্থিব সব সত্য একাকার হয়ে যায়। কিন্তু আধার নামতেই থাকে, দুপুরবেলায় রুপোর টুকরোর মতো সব প্লেন উড়ে যায়; হাহাকার ও আঁধারের মধ্যে হাবুডুবু খেতে খেতে বুড়ি মা বলে সাঁঝবেলার রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বেলে দিতে।

হাসানের ‘বিধবাদের কথা’ স্পষ্ট করে কিছু বলে না, কিন্তু আমরা স্পষ্টই জেনে যাই, সৃষ্টির সপক্ষে অনুরণিত যাবতীয় হাহাকারের সবটুকু অধিকার কেবল নারীর। নিঝুমপুরের দু বোন মিলে আমাদের ইতিহাস একটাই, কিন্তু তাদের দু ছেলের মতো এ ইতিহাসের অন্তর্গত ধারা দুটো। অথচ এই ইতিহাসের গতি নির্ধারণে তাদের কোনও ভূমিকাই নেই। দু বোনের বিয়ে হয় একই পরিবারের দু ভাইয়ের সঙ্গে। দু বোনের মতো দু ভায়েরও চেহারা একই রকম। আর তফাৎও একই, — একজন শাদা, একজন কালো। কথা ছিলো শাদার সঙ্গে শাদার বিয়ে হবে, কালোর সঙ্গে কালোর। কিন্তু মৌলভী ভুল করে ফেললো। বিয়ে হলো শাদা বড় ছেলের সঙ্গে ছোট কালো মেয়ের, আর কালো ছোট ছেলের সঙ্গে বড় শাদা মেয়ের। তারপর মৌলভীরও কি আর সাধ্য আছে সেই ভুল শোধরায়?

“কিছুই করার নাই, কিছুই করার নাই, আল্লার কালাম পাঠ করা হইছে, বাঁশের চেয়ে কঞ্চি দড়, আল্লাতালা নিজেই বাঁধা তাঁর কালামের কাছে, আল্লার সাধ্য নাই তাঁর কালাম ডিঙি মেরে পেরিয়ে যাবার।”

তবে এই বিয়ের সর্বগ্রাসী তাৎপর্য দেখা দিলো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে। তার আগে দু বোনের দু ছেলে হলো। এবং এখানেও হাসানের প্রতীকায়নের খেলা, ছেলেরা পেলো মায়ের গায়ের রং। শাদা মা রাহেলার শাদা ছেলে রাহেলিল্লাহ, কালো মেয়ে সালেহার কালো অথবা ঘনশ্যামল ছেলে সাহেবালি। আবার এক বোনের ছেলে ন্যাওটা হলো আরেক বোনের। সাহেবালিকে যাবতীয় প্রশ্রয় দেয় রাহেলা আর রাহেলিল্লাহকে মাথায় করে রাখে সালেহা। রাহেলিল্লাহর কালো বাপ সহ্য করতে পারে না তার শাদা ছেলের নিকষ কালো কাণ্ডকারখানা। আবার সাহেবালীর বাপে সহ্য করতে পারে না শেখ মুজিবের প্রতি তার কালো ছেলে সাহেবালির পক্ষপাতিত্ব। কেমন করে সহ্য করবে, ‘দেশকে’ যে ‘ওই শেখ মুজিবই ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিচ্ছে’! ইতিহাসের যাবতীয় আকস্মিকতার মতো এসবও অদ্ভুত আকস্মিকতা! আবার এক গোলকধাঁধাও। এমন তো বলা যাবে না কালো বলেই তা কালো, এমনও বলা যাবে না শাদা বলেই তা। আপাতদৃষ্টিতে হাসানের এই প্রতীকায়ন যত সিঁধেই মনে হোক, তিনি আমাদের নিয়ে প্রবেশ করেন শাদা-কালোর গোলকধাঁধায়।

যা হাসানের সহজাত নয় বলে এতকাল আমাদের ধারণা ছিল, তাও দেখি তাঁর করতলে খেলা করছে, শুধু ‘বিধবাদের কথা’য় নয়, এ বইয়ের আরও সব গল্পে। যেমন, নিষ্ঠুরতার বয়ান। ‘বিধবার কথা’য় রাহেলার ছেলে রাহেলিল্লাহ স্কুলে যাওয়া বাদ দিলো সেখানে কমিন হিন্দুদের ছেলেরাও পড়ে বলে। অথচ কালো বাপের ষোলআনাই ইচ্ছে ছিল ছেলে তার স্কুলেই পড়–ক। আবার সালেহার ছেলে সাহেবালি মক্তব থেকে পালিয়ে এলো, যদিও বাপ চেয়েছিল ছেলে তার মওলানা হোক। ‘বিধবাদের কথা’ এইভাবে বাংলাদেশের আদর্শের দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত প্রতিটি পরিবারের গল্প হয়ে উঠতে থাকে, ইতিহাস-আখ্যান হয়ে উঠতে থাকে। রাহেলিল্লাহ জন্মনিষ্ঠুর, খেঁকশিয়ালের এইমাত্র চোখমেলা বাচ্চাটাকেও সে হত্যা করে কাঁধে করে ঘুরে বেড়াতে পারে প্রচণ্ড রিরংসা নিয়ে। সাহেবালী সেরকম নয়, তুলে আনা পদ্মফুল সে অনায়াসে দিয়ে দিতে পারে তার খালাকে, কেননা তার মা তো নিজেই এক পদ্মফুলের মতো। কিন্তু শুকানো পদ্মফুলের গন্ধও সহ্য হয় না রাহেলার মরা খেকশিয়ালের বাসী রক্তের মতো। ফুল সে ছুঁড়ে ফেলে আর তা কুড়িয়ে নিয়ে যত্ন করে রেখে দেয় সালেহা। সেই শুকনো পদ্মপাপড়ির ঘ্রাণে বিহ্বল বাতাসেরা ঘুরপাক খায় সালেহার ঘর জুড়ে। মরা খেকশিয়ালের লাশ আর উৎকট ঘ্রাণ কাঁধে নিয়ে রাহেলিল্লাহ বড় হতে থাকে। সাহেবালী বড় হতে থাকে একেবারেই গন্ধবিহীন। তারা যত বড় হয়, যুদ্ধ ততই ঘনিয়ে আসে। যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। আর দুই ভাই শপথ করে যার যার পুত্র নিধন করার। এক ভাই শপথ করে আরেক ভাইকে হত্যা করার। সেটাই তো সঙ্গত যুদ্ধের সময়ে! কিন্তু তারপরও তো কথা থাকে। সে কথাই হাসান বলেন :

“এখন তারা দুইবোন কি করবে? এই দুই মা কি করবে? তাদের দেশ নেই, সমাজ নেই, মানুষ নেই, মানুষকে ভালোবাসার অধিকার নেই, ঘৃণা করারও অধিকার নেই, তাদের স্বামী নেই, পুত্র নেই, যদি থাকেও তাতে কিছুমাত্র অধিকার নেই। তারা রাঁধে বাড়ে, স্বামীপুত্রকে খাওয়ায়, নিজেরা খায় কি খায় না। তারা আদেশ করে না, আদেশ মানে। তবু মানুষ যে তারা, কেমন করে দূরে থাকে, স্বামী মরবে, পুত মরবে, অতি কঠিন কষ্ট, অতি তীব্র বিষ তাদের দেহে যতটা ধরে তার চেয়ে বেশি জোর করে ঢুকিয়ে দিয়ে তাদের মুখ সেলাই করে দেওয়া হবে কিন্তু মরবার অধিকার দেওয়া হবে না। এঁটো হাতে বোনের মুখের দিকে তীব্র চাউনিতে চেয়ে থাকে রাহেলা। ঘটনাগুলি সব যখন ঘটে যাবে, তোর ছেলে যখন আমার ছেলেকে সরিয়ে দেবে দুনিয়া থেকে, আমার ছেলে যখন তোর সোয়ামির কলজেটা ছিঁড়ে নেবেÑযখন স্বামীরা নেই, ছেলেরা নেই তখন আমরা কি একজন আরেকজনকে খুন করব, একে অপরের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ব, নখ দিয়ে ছিঁড়ে নেব গলার নালি, উপড়ে নেব চোখ! আমরা কি করব? আমার স্বামী মেরেছে তোর স্বামীকে, আমার ছেলে মেরেছে তোর ছেলেকে, আমরা দুই বোন, সালেহা বুন আমার, রাহেলা বুবু আমার, এই পেয়ারা আদ্দেক আমি খাইছি, বাকি আদ্দেক তুই খা, আমি বাবার বাঁ কোলে চড়ি, তুই ওঠ ডান কোলে, দুধ নেই, তবু আয়, মায়ের এক বুকের দুধ তুই খা, আর এক বুকের দুধ আমি খাই।”

যুদ্ধ, যে আদর্শ নিয়েই সংঘটিত হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত কী দেয় মানুষকে? বেঁচে থাকা দু বোনের স্থির ও দ্রবীভূত বেদনার মধ্যে দিয়ে সেই সত্যের কাছে পৌঁছান হাসান। তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তিতে আমরা পেয়েছিলাম শান্তির এই দর্শন: এ হলো এমন সময় যখন বিহ্বল পুত্র কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যায় তার মৃত জনকের খাটিয়া; আমরা পেয়েছিলাম যুদ্ধের এই দর্শন: এ হলো এমন সময় যখন পিতার কাঁধে চেপে বসে মৃত পুত্রের খাটিয়া। কিন্তু ‘বিধবাদের কথা’ থেকে কী পাই আমরা? মাত্র নয় মাসের, অথচ ধর্মের উন্মত্ততায় এতই বিধ্বংসী এই যুদ্ধ যেখানে পিতাও বেঁচে থাকে না মৃত পুত্রকে কবরে শোয়াবার জন্যে! ৩৫ বছর পেরুনোর পর মুক্তিযুদ্ধের চাওয়াপাওয়ার যে পরিণতি দেখেন হাসান, যে গ্লানি ও ক্রোধে দ্রবীভূত হন তিনি তা থেকেই কি খুঁজে পান এই আখ্যান? এটি এমন এক আখ্যান, যেখানে যাবতীয় সৃজনশীলতা নিয়ে নারীরা মরে মরেও বেঁচে থাকে আর পুরুষ কেবলই হারিয়ে যায়, যুদ্ধ নিঃশেষ করে ফেলে তার সকল সৃষ্টির ক্ষমতা। খরখরে এক দ্রষ্টব্যহীন, নিয়তিহীন প্রান্তরে দাঁড়িয়ে দুই বোন আবারও কাঁথা বুনবার কাজ শুরু করে, নকশা আঁকতে থাকে, সুতো বাছতে থাকে। কেউ কোনও কথা বলে না। কাঁথার আধেক জুড়ে সালেহা ফুটিয়ে তোলে তার সারা জীবন, আর এমন এক পৃথিবী যা সে নিজেই দেখে নি কোনও সময়, এমন সব শিশুও থাকে সেই নকশায় যাদেরও সে কোনওদিন দেখে নি, তবে হয়তো তার ওই না দেখা পৃথিবীর ওই না দেখা শিশুদের নমুনা হিসেবেই তার কোলজুড়ে এসেছিল সাহেবালী। সে সেই সাহেবালীর জন্যে একটি কন্যে, ধান দূর্বা, এলাহি ভরসা, বট অশত্থের পাতা, মাছ আর হরিণ আর শিকায় রাখা হাঁড়ি এইসবও আঁকে। তারপর সুতা বাছাই করে, কেননা কাঁথা যেদিন শেষ হবে, সেদিন সেখানেই মাথা রেখে মরতে হবে তাকে। পৃথিবীতে এখন তার একটি কাজই বাকি আছে, — এই মরে যাওয়া। আর রাহেলাও কাঁথা বোনে, কাঁথার প্রান্তে আঁকে বিরাট একটি শিকল, যা দিয়ে সে আটকে ফেলবে সালেহার সব নকশা। এইভাবে হাসান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে মিলিয়ে দেন একই তরঙ্গে। এইভাবে নির্লিপ্ততা নয়, প্রবল এক ক্রোধ থেকে তিনি আবার ফিরে যান শুরুতে অথবা শুরুর মতো একটা কিছুতে।

ছয়.
নির্লিপ্ততা পেরুনো আবেগের ধানীলংকা ঝাঁঝ চূড়ান্তে পৌঁছেছে হাসানের ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ গল্পে। আমাদের মানুষরা তো গত কয়েক দশকের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথে এমনই এক মানুষে পরিণত হয়েছে যে অনায়াসে মানুষকে তারা এখন ৮০/৯০ টুকরো করে ফেলতে পারে, ১৬০/১৭০ টুকরো করে কেটে পুরানা ঢাকা থেকে আবাহনী মাঠ পর্যন্ত মুড়িমুড়কির মতো ছড়াতে ছড়াতে যেতে পারে। এই নিস্পৃহ নৃশংসতার সংস্কৃতি, এই মানবিক অবমাননার সংস্কৃতি, এই অবরুদ্ধ ভয়ের সংস্কৃতিই হাসানের এ গল্প জুড়ে। এই এক সংস্কৃতিতে আক্রান্ত সময় রয়েছে তাঁর ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’ গল্পটিতে। এই যে সব সংস্কৃতির তাণ্ডব এখন আমাদের এই দেশে, সমাজে, রাজনীতিতে, গ্রামে, নগরে সেখানে মানুষের আজ হাহাকার করবারও কোনও অধিকার নেই। হাসানের এ সব গল্পেও কোনও হাহাকার নেই, কোনও কান্না নেই, এমনকি কোনও ফোঁপানিও নেই। হাসান তার অবরুদ্ধ ক্রোধ ও আবেগ নিয়ে শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রকৃতির কাছে, প্রকৃতির নিচে। যেভাবে টিটন তার নিরীহ ও অনুগামী বন্ধুকে খুন করেছিল, এমনকি দেহটাকেও আর ফেলে রাখে নি মাঠের ভেতর যাতে কেউ কবর দিতে পারে, ঠিক একইভাবে সে নিজেও তাই খুন হয়ে যায় প্রকৃতির রহস্যময়তার দৃষ্টান্ত তৈরি করে দিতে। সারা গল্প জুড়ে রহস্যগল্পের মতো ছমছমে অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি, কী উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে আমরা পড়ি দুটি হত্যার বিবরণ! এমনকি হত্যার পরেও এক সন্ত্রাসের তীব্র আশংকা। কেননা কলজে বিসমিল্লাহ সবই তো টিটন উপড়ে ফেলেছিল তার বন্ধুর; ইটের ভাটার গনগনে আগুনের মধ্যে সে জ্বলছে হৃদয়হীনতা নিয়ে। এখন মৃত্যুর পর টিটন তার দিকে যত আগুনে ঠাণ্ডা চাউনিতেই চেয়ে থাকুক, তাতে কিছু আসে যায় না। এবার টিটনকে আর ছাড় দেবে না সে, ভূতেরও ভবিষ্যত আছে, — এই সত্য মৃত্যুর পর জানতে পেরেছে সে। পরশুরামের ‘ভূষণ্ডীর মাঠ’কে ফিরিয়ে আনেন হাসান, তবে তামাশা হিসেবে নয়, রূঢ় হিংস্রতা হিসেবে। যেন তিনি মার্কসের কথাকেই একটু ঘুরিয়ে বলেন, প্রতিটি গল্পই দুইবার লেখা হয়, একবার কমেডি হিসেবে একবার ট্র্যাজেডি হিসেবে। আমরা দেখি এই প্রথম সেই বন্ধুটি টিটনকে নাম ধরে ডাকে, বলে, আয় লড়ি আমরা, হাড্ডাহাড্ডি লড়ি।

মৃত্যুর পর পর্যন্তই কেন এগিয়ে যায় বাস্তবতার সহগ আর আরজ আলী মাতুব্বরের মুগ্ধদ্রষ্টা হাসানের চোখ? কারণ তিনি কোনওখানে আর আশা দেখেন না, সম্ভাবনা দেখেন না।

‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’-এও যেমন: ধর্ষণ করা হলো ফুলিকে। ছোট কোষা নিয়ে একেবারে সুন্দরবনের মধ্যেই ঢুকে পড়ে ফুলি কয়েকটি গুগলি, চিংড়ি আর শামুকের পিছু পিছু। তারপর ঘাসের ঢাল বেয়ে খানিকটা ওপরে উঠে একটি সুন্দরি গাছের তলায় হাঁড়িটি শিয়রে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে লাল রোদের ভেতর গুটিশুটি মেরে। তারপর ঘুম ভেঙে দেখে হাত পনেরো দূরে হেঁতাল আর বেতবনের মধ্যে অর্ধেক শরীর ডুবিয়ে তারই মতো মোহঘুমে শুয়ে আছে ডোরাকাটা। কিন্তু সে ভয় পায় না। আর যেন একযুগ তাকিয়ে থাকে সেই বাঘের দিকে। আর বাঘটিও হঠাৎ ঘুম ভেঙে যেন একযুগ ধরে তৃষ্ণার্ত চোখে তাকিয়ে থাকে ফুলির দিকে। তারপর আয়েস করে মস্ত একটা হাই তুলে আবারও দেখতে লাগল তাকে। তাদের মধ্যে নীরব এক যুদ্ধ চললো খানিকক্ষণ। অনেকক্ষণ তার সামনে পিছে ঘুরে, আড়চোখে তাকিয়ে ডোরাকাটা বিরাট এক লাফে ঢুকে পড়ল জঙ্গলের মধ্যে। এই এতক্ষণ ফুলি নিজের কথা ভাবে না, সে ভাবে, যাই হোক না কেন, কিছুতেই হাড়ির ওসব খেতে দেয়া যাবে না ডোরাকাটাকে। এরকম এক ডোরাকাটা তার কিছুই করল না। কিন্তু তাকে ধর্ষিত হতে হলো একটু পরে মানুষেরই কাছে।

আর তারপর জ্ঞান হারাতে হারাতে ফুলি দেখল ডোরাকাটা বিদ্যুৎ ঠিকরে পড়ছে চোখের ওপর। একটা মুণ্ডু গড়িয়ে পড়ল খালের ওপর। আর মুণ্ডুছেঁড়া দেহটা নিয়ে একান্ত অনুগতের মতো ফুলির কাছে বসে পড়ল ডোরাকাটা।

এখানেও হাসানের সেই প্রকৃতিনির্ভরতা। ধনীদের জন্যে আছে বিচার বিভাগ আর গরীবের কণ্ঠে আছে কেবল এই হাহাকার, ‘আল্লায়, আল্লায় অ্যার বিচার কইরবো।’ ডোরাকাটা ছাড়া তাই কে আর পাশে দাঁড়াবে ফুলির?

বিধবার কথা ও অন্যান্য গল্প বলছে, জীবনের উপান্তে এসে হাসান আজিজুল হক এখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো আঁকুপাকু করছেন সভ্যতার সংকটের মধ্যে। ‘মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ’, তাই পারছেন না আস্থাহীন হয়ে পড়তে, আবার মানুষ যে বড় দানব হয়ে উঠেছে, পারছেন না এই রূঢ় সত্যকে অস্বীকার করতে। তাঁর অসহায়, বেদনার্ত ও ক্রুদ্ধ চোখ তাই ভূতের ভবিষ্যতে, একান্ত অনুগত ডোরাকাটার দিকে।

সংলাপআশ্রয়ী দৃশ্যজ চিত্রকল্পের জন্ম দিতে সক্ষম এক কথ্য ভাষার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে হাসানের এই অসহায়তা, এই বেদনা আর এই ক্রোধ। এ সব গল্পের বেদনা ও ক্রোধকে স্পর্শ করার জন্যে বোধ হয় এর কোনও বিকল্পও ছিল না। হাসানের ভাষা পরিশীলিত, এ কথা বহু পুরানো, বহুবার প্রমাণিত সত্য। কিন্তু সংলাপও যে কথাসাহিত্যে অনবরত শক্তিমান দৃশ্যজ চিত্রকল্পের জন্ম দিতে পারে, সংলাপই যে একক ও অনন্য বর্ণনাভঙ্গি হয়ে উঠতে পারে তা তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন আমাদের। তাঁর পরিশীলিত ভাষাও উন্নীত হয়েছে অন্য এক স্তরে। আর তার কারণও হাসানের ক্রমরূপান্তর। ‘ফুলি, বাঘ ও শিয়াল’-এ যেমন পড়ি :

“তবে সে এখনও নিজেকে ঠিক জানে না। কি যে ঠিক করতে হবে বুঝতে পারে না। নিজের শরীরের বাইরেটা দেখতে পায়, কিন্তু শরীরের ভিতরে কি যে বিজবিজ বিড়বিড় করে, শিরশির টনটন করে ফুলি কিছুতেই ধরতে পারে না। তার বুক দুটি সুপারির মতো শক্ত তবে তার চাইতে একটু বড়। হাত পড়লেই ব্যথা করে। সেখানে একটুও লোম নেই। অথচ নাভির নিচে, দুই ঊরু যেখানে একসঙ্গে মিলেছে, সেখানে ত্রিভুজের মতো জায়গাটায় হালকা চিকন ধোঁয়াটে রোম দেখা দিয়েছে। ফুলি দেখেছে, জঙ্গলের ভিতর হালকা বালির চর, তার উপর সরের মতো মাটি, তার উপর নরম কচি দুর্বাঘাস। এসবের কিছুই কি সে বুঝতে পারে? বিরক্তিতে মুখ তার কুঁচকে ওঠে।”

হাসান লিখছেন: “ফুলির মানচিত্রে একটা ফুটকি, খুব ছোটো কালো একটা ফুটকি। ঐটুকুতেই প্রাণ। কোমর সামান্য ভারী হয়েছে, কঠিন যন্ত্রণার সঙ্গে বুকের সুপারি দুটি বাড়ছে, কোমল ত্রিভুজের উপর রোঁয়ারা ঘন হচ্ছে। সন্ধের মুখে নিঃশব্দ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

‘বিধবার কথা’তে তিনি লিখছেন: “এদিকে সমস্ত রাত ধরে অন্ধকারে সারা বাংলাদেশ জুড়ে বৃষ্টি হচ্ছে, বিদ্যুৎ ললপাচ্ছে, মাটির তলা থেকে গুম গুম আওয়াজে বাতাস ধসে পড়ছে, তখন খুব সকালে টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে রাহেলা এক পা এক পা করে উঠোন পেরিয়ে, ঘরের দাওয়া পেরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল বামুনের মেয়ে ন্যাংটো মরে পড়ে আছে। সোনা দিয়ে গড়া ভাঙা পুতুল, না-ই বা থাকল পরণে একটি সুতো, নিজের আব্র“ নিজেই রেখেছে মেয়ে, শুয়ে যে আছে কি ভঙ্গি তার, উপুড় হয়ে আছে। বিশালাক্ষী এই কন্যার মুখটি কিন্তু আকাশের দিকে তোলা। মরার সময় চোখের পাতা পড়েনি, পাথরের চোখ, শাদা জমিনের উপর গোল কষ্টিপাথর বসানো, তাদের মাঝখানে আবার দুই বিন্দু হিরের কণা! শরীরে তার আঘাত তেমন কিছু নেই। মেয়েকে উপুড় করে শুইয়ে পিঠের উপর বসে ঘাড়টা ভেঙে মুণ্ডু উপরের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আছে একটি মোক্ষম আঘাতের চিহ্ন। দুই উরুর মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গেছে শরীরের সমস্ত রক্ত।

“মাথা থেকে, বুক থেকে এক টানে ময়লা শাড়িটা সরিয়ে নিজের খোলা দুই বিশাল বুকের দিকে হিংস্র চোখে চেয়ে রইল রাহেলা: এত বিষ খেয়েছে এখান থেকে তার ছেলে! এত রক্ত ঝরেছে যেখান থেকে এই মেয়ের, তার নিজের ঠিক সেই জায়গা থেকেই একদিন রাহেলিল্লাহ নামে এক দানব বেরিয়ে এসেছিল! রাহেলা দুই হাতে নিজের চুল ধরে মাটিতে মাথা ঠুকতে লাগল, টেনে হিঁচড়ে ফেলতে চাইল তার বুক, তারপর মরা মেয়ের কপালে বার বার চুমু খেয়ে পা ছড়িয়ে অর্ধোলঙ্গ অবস্থায় সেখানে বসে রইল।”

তিনি লেখেন: “সে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল তখন পিছন থেকে তার দিকে চেয়ে কয়েকবার ককিয়ে উঠল সবর, থেমে থেমে কয়েকবার, যেন শেষবারের ককানিটা থেমে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মাটির ঢেলার মতো গড়িয়ে পড়বে তার মরা দেহ: আমি আমার একমাত্র পুত্রের জন্য শেষবার কাঁদি, জন্মের শেষ কান্না কাঁদি, আকাশ চিরে কাঁদি, বাতাস পূর্ণ করে কাঁদি, বুক ফাটিয়ে কাঁদি, আমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে কান্না ঢুকুক, বাঁশির মতো বেজে উঠুক, বাজের মতো ফেটে পড়–ক। শুনে রাখ্, সবর বলে, তোর জন্যি এই আমার শ্যাষ কান্না, রাজাকারের জন্যি আমার কাছে মরণ ছাড়া তার আর কিছু পাওনা নাই। আমার হাতেই তুর মরণ, তোর নিস্তার নাই। নিজির হাতে নিজির কলিজা এই আমি কাটি ছিঁড়ি ফালায়ে দিতেছি।”

এইভাবে হাসানের লেখার নির্লিপ্তি ও নিরাবেগ ক্রমাগত এক বিধবা সময় খনন করে চলে; আমরা হিম হয়ে যাই, আমাদের শরীরে জ্বালা ধরে, আমাদের মধ্যে কান্না ও আক্রোশের জন্ম নেয়। যে নির্লিপ্তি এতদিন কঠিন বরফ হয়ে জমাট বেধেছিল, নির্লিপ্তির সেই বরফগলা চোরাফাঁদে ডুবে যেতে যেতে এখন এত আতংক, অনিশ্চয়তা আর এত মৃত্যুর আশংকা আমাদের ঠেঁসে ধরে যে তা নিয়ে উপহাস করার কোনও শক্তি আমরা খুঁজে পাই না। যে নির্লিপ্তি এতদিন ছিল ছিপছিপানো মাঞ্জা মারা এখন সেই নির্লিপ্তির খরখরানো ধারে আমরা ক্ষতবিক্ষত, ব্যান্ডেজ বাধতে ব্যতিব্যস্ত। আমাদের তিনি একটি দেশের জন্মকথা শুনিয়েছেন, আবার সে দেশের বন্ধ্যাত্বের কথাও শুনিয়েছেন। আমাদের তিনি ইতিহাসের কথা বলেছেন, তেমনি সে ইতিহাসের জোড়াতালিটুকুও দেখিয়েছেন। আত্মজা ও একটি করবী গাছ দিয়ে যার শুরু হয়েছিল, বিধবাদের কথা এখন তাঁরই মুখে।

বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রিয় সাধনদা’, সাধন চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশ্যে লিখেছেন, ‘সাহিত্য দিয়ে আমরা কি করব/ কলম কি কখনো তপ্ত ইস্পাত হবে।’

আমার মনে হয়, ওই প্রশ্নের উত্তরও পেয়ে যাই আমরা এসব গল্প থেকে।

লেখা : এমা রোড, লন্ডন। ১-২০ চৈত্র ১৪১৪, ১৪ মার্চ-০৩ এপ্রিল ২০০৮

শহীদুল জহিরের মৃত্যুর পরপরই কোনও কিছু লেখার বেলায় আমার ব্যক্তিগত সুবিধা ও অসুবিধা দুটোই হলো, তাঁর সঙ্গে আমার মুখোমুখি পরিচয় ছিল না। দশকওয়ারি সাহিত্যবিভাজনে বিশ্বাসী সম্পাদক ও
sj1.jpg…….
শহীদুল জহির
…….
আলোচকরা যাদের গায়ে আশির দশকের ছাপ লাগিয়েছিলেন, শহীদুল জহিরসহ আমাদের অনেকের গায়েই সেই ছাপ এতদিনে সুস্পষ্টভাবে বসে গেছে অনেকটা জন্মদাগের মতো। আক্ষরিক জন্মের কথা ধরলে তিনি আমার একযুগ আগে পৃথিবীতে এসেছেন। তবু এখন সম্পাদক ও আলোচকদের প্রতি কৃতজ্ঞ আমি,–তাঁরা আমাদের একই সময়ের বৃত্তে আবদ্ধ করেছেন জন্যে। আশির দশকের উল্লেখযোগ্য সব লেখকের সঙ্গেই ধীরে ধীরে আমার পরিচয় হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু শহীদুল জহির। তাঁকে আমি মুখোমুখি দেখি নি। তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয় নি।

কালাকালের অর্থে এই দেখা হওয়া না-হওয়া অবশ্য কোনও বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু মানুষ যখন বেদনার্ত হয় তখন মহাকালের কথা ভাবে না। মৃত্যুগন্ধী সময়ের আবেগই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে। এ জন্যেই হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটির কথা বলতে গিয়ে হয়তো ব্যক্তিটির সঙ্গে স্মৃতিচারকের স্মৃতিগুলিই বড় হয়ে ওঠে। যতক্ষণ না তা হারিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটিকে অবলম্বন করে নিজেকেই বড় করে তোলার মতো না হয় ততক্ষণ তা দৃষ্টিকটূও নয়। সত্যিকার অর্থে মানুষটির প্রতি ব্যক্তিগত মুগ্ধতা ছাড়া এইসব সময়ে অন্য কোনও বয়ান খুব বেশি প্রীতিকর মনে হয় না। অথচ তেমন কোনও সঞ্চয়ই নেই আমার, যা দিয়ে আমি তাঁর সঙ্গে একটু ব্যক্তিগত হতে পারি।

তারপরও কোনও না কোনওভাবে তিনি আমার ব্যক্তিগত আত্মার সঙ্গী। কারণ ব্যক্তিগতভাবে আমি তাঁর পাঠক এবং আমরা একই সময়ের মানুষ। কারণ যে জনপদ আর মানুষগুলো তাঁর জনপ্রিয় সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে বেড়ে ওঠে, বেড়ে ওঠে বেশ ক’টি ছোটগল্পে, কাকতালীয়ভাবে হলেও তাঁর মতো আমিও সেই জনপদের মানুষ। তাঁর মতো আমারও পিতার ভিটে সিরাজগঞ্জ জেলাতে। তাঁর রায়গঞ্জ আমার চেনা জায়গা, চেনা ওই গোপন রাজনীতির ক্ষত ও ক্ষতি। ‘ক্ষত যত ক্ষতি তত’ এই সত্যেরই তো মুখোমুখি করেন তিনি তাঁর কথাসাহিত্যে। আমরা আমাদের শৈশব কৈশোরের দিনগুলোয় জনপদের সেই ক্ষত ও ক্ষতিকে দেখেছি রক্তপাতের মধ্যে দিয়ে, অশ্রুপাতের মধ্যে দিয়ে। এমনকি যখন আমরা প্রায়উন্মূল হয়েছি সিরাজগঞ্জ থেকে এবং বিশেষত সিরাজগঞ্জ শহরবাসী কারও টেলিফোন পেলেই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি কারও মৃত্যু অথবা দুর্ঘটনার খবর পেতে, এই ক্ষত ও ক্ষতি তখন আরও ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হয়েছে। যেমন, এক সকালে এক বন্ধুর ফোন পেয়ে আমি জানতে পারি ফিরোজ মাস্টার খুন হয়েছেন। ফিরোজ মাস্টার ছিলেন সিরাজগঞ্জ জনপদে গোপন রাজনীতির এক কিংবদন্তি। গোপন রাজনৈতিক জীবন পেরিয়ে তিনি তখন একটি ডানপন্থী দলে যোগ দিয়ে নির্জন জীবনযাপনের পথ বেঁছে নিয়েছেন। প্রতিদিন রাতে খাওয়ার পর বাড়ি থেকে বের হন এবং হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে একটি কালভার্টের ওপর গিয়ে কিছুক্ষণ একা একা বসে থাকেন। এক রাতে তিনি হাঁটতে বেরিয়ে আর ফিরে আসেন না। তাঁকে উদ্ধার করা হয় নিহত অবস্থায়।

আরও একদিন গভীর রাতে খবর এলো, ভয়ানক এক গাড়িদুর্ঘটনা ঘটেছে বগুড়া মহাসড়কে। নিহত হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধা ও একদা গণবাহিনীর সংগঠক মির্জা আবদুল আজিজ ও ম. মামুন। গুরুতর আহত আরেকজন গণবাহিনীর সংগঠক ও জাসদ নেতা আবদুল হাই। ম. মামুন ছিলেন গোপন রাজনীতির কালে ফিরোজ মাস্টারের প্রিয় অনুসারী। যৌবনে কামারখন্দে দিনেদুপুরে এক পুলিশ অফিসার হত্যার দায়ে ম. মামুন অভিযুক্ত হয়েছিলেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি যুক্ত হন স্থানীয় একটি সাপ্তাহিক পত্রিকাতে।

দূর থেকে এরকম যত মৃত্যুর খবর পেয়েছি কিংবদন্তিময় একটি সময়ের একেক সংগঠকের ততবারই কেন জানি মনে পড়েছে সে রাতে পূর্ণিমা ছিলর কথা। বললে হয়তো বিশ্বাস হবে না–কিন্তু ওই জনপদের অধিবাসী আমরা জানি, রায়গঞ্জ-কামারখন্দ-জামতৈল জনপদের কোনও কোনও এলাকার চেয়ারম্যান হওয়ার মানে জেনেশুনে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। অথচ সেই মৃত্যুর মোহে প্রতিবারই কেউ না কেউ নির্বাচন করে, চেয়ারম্যান হয় এবং কোনও এক রাতে অথবা দিনে খুন হয়ে যায়।

এও এক জাদুবাস্তবতাই বটে!

দুই.
ক্ষত ও ক্ষতি নিয়ে এইভাবে আমরা সিরাজগঞ্জ থেকে প্রায়উন্মূল হয়েছি, প্রায় সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছি সিরাজগঞ্জের সঙ্গে, পৃথিবীমুখী হয়েছি তারপর আমাদের প্রিয় মার্কেজের বুয়েন্দিয়ার মতো। মাকের্জের উপন্যাস শত বছরের নির্জনতায় গভীর এক ক্রান্তিকালীন সময় আছে। হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া সেখানে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে আবারও দূর অভিযানে বের হওয়ার। কিন্তু তার স্ত্রী উরসুলা কিছুতেই রাজি হয় না বসতি ত্যাগ করতে। বুয়েন্দিয়া তাকে বলে, দূরঅভিযানে যেতে তার কোনও অসুবিধাই নেই, কেননা ‘এখনও এখানে আমাদের কেউ মারা যায় নি। মরে মাটির তলায় আত্মীয় কেউ না শোয়া পর্যন্ত কোনও জায়গায় কারও অধিকার বা প্রেম জন্মায় না।’ সে কথা শুনে তার বউ উরসুলা শান্ত কঠিন কণ্ঠে বলে, ‘তা হলে আমি এখানেই মরব, যাতে তোমরা সবাই এখানেই থাকো।’ মানুষের মাটি, স্বদেশ ও বসতি গড়ে ওঠে এরকম সব বুয়েন্দিয়ার আত্মার শোক দিয়ে, এরকম সব উরসুলার হৃদয়ের শোক দিয়ে। শহীদুল জহিরের গ্রামের বাড়ি ছিল রায়গঞ্জে, কিন্তু তিনি জন্ম নিয়েছিলেন পুরানো ঢাকায়। নিজের এক বসতি তিনি স্থাপন করতে চেয়েছেন তাঁর সব গল্পউপন্যাসের মধ্যে দিয়ে। সেইখানে কখনও তরমুজের ঘ্রাণ পাওয়া যায়, ডালপুরিভাসা তেল টগবগিয়ে ফোটে, ইঁদুর ও বিড়াল খেলা করে, আবদুল করিম বারবার কাচের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখে, পাতকুয়ায় সুবোধ চন্দ্র ও তার স্ত্রী স্বপ্না বারবার পড়ে যায়। কখনও আবার তিনি যেন বা জেনেশুনেই সংখ্যালঘু হয়ে যান, বিচ্ছিন্নতার বদলে ডুবে যান সংখ্যালঘুতার বিপন্নতায়। বিবিধ অঞ্চল ও আঞ্চলিক ভাষাকে তিনি অবলম্বন করেছেন বিভিন্ন গল্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বজায় রেখেছেন সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসের উপস্থাপনস্বর।

আমাদের সেই জনপদের একঘেয়ে মুথা ও মেঠো সমতল, খরখরে গ্রীষ্মের দাবদাহ সঞ্চয় করে রাখা প্রায়উৎপাটিত নিঃসঙ্গ বটগাছ, আঁকাবাঁকা মেঠোরাস্তা, অথবা বর্ষায় ডুবে যাওয়া রুপালি আকাশ, কর্দমাক্ত রাস্তা এবং একজন চেয়ারম্যান খুন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খুন হওয়ার জন্যে প্রস্তুত আরও সব হবু চেয়ারম্যান, এসব কিছুই শহীদুল জহির একে একে কব্জা করে নিয়েছিলেন। তাঁর মতো আর কেউ জানে নি, এইসব জনপদ ও মানুষের গল্প সত্যিই গল্প মনে হয়। আমাদের গ্রামগুলোর মানুষের গল্প, জীবন, হতাশা, সংগ্রাম আর যৌনতাও এত বিচিত্র যে এই আমিও যখন তা এমনকি সিরাজগঞ্জেরই কাউকে শুনাই, শুনতে শুনতে তারা বলে, এইসব আজগুবি গল্প কোনখানে পাই’ছো? সলপের গল্প, না? ভেবে দেখুন, ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত একজন মানুষ দণ্ডিত হওয়ার পর্যায় এড়াতে গ্রামের সালিশে অজ্ঞান হয়ে গেল। কিছুতেই তার সংজ্ঞা আর ফিরিয়ে আনাই যাচ্ছে না। দাঁতের মধ্যে চামচ ঢুকিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে তাকে পানি খাওয়ানোর। কিন্তু সে পণ করেছে কিছুতেই কিছু খাবে না। হঠাৎ একজন কী মনে করে একগ্লাস দুধ এনে ঠোঁটের ওপর রাখতেই অজ্ঞান মানুষটা গরুর দুধের ঘ্রাণ পেয়ে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত হওয়ার যাবতীয় আশঙ্কা ভুলে ঢক ঢক করে তা গিলে ফেলল। আবার এই মানুষটিই যখন প্রবীণ আর স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত, একদিন হঠাৎ তার পাড়াপড়শিদের সম্পর্কে দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অভিযোগ করার প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সেই যে ট্রেনে চড়ল, নিজের এলাকার নাম মনে না থাকায় সে আর পারল না নিজের বাড়িতেও ফিরে আসতে। গ্রামের মানুষদের কাছে সে বেঁচে রইল নিরুদ্দেশ এক গ্রামবাসী হিসেবে। কেউ আবার বুড়ো হয়ে গেল প্রচণ্ড বর্ষার সময় বোয়াল মাছের গ্রাসে অণ্ডকোষ হারানোর স্মৃতি নিয়ে। আবার যুদ্ধ যখন চলছে, তখন এমন একজন মানুষকে পাওয়া গেল, যে মৃত, অর্ধমৃত সব খানসেনা আর রাজাকারদের লিঙ্গ কেটে একটি টুকরিতে জমা করত। জালিম খানসেনা আর তার দোসরদের জন্মক্ষমতাই সে নষ্ট করে দেবে, এই তার একমাত্র আকাক্সক্ষা।

এরকম এক জনপদ যেখানে আছে সেখানে শুধুমাত্র জাদুবাস্তবতা দিয়ে শহীদুল জহিরকে বিচার করতে যাওয়া এক অর্থে তার প্রতি অবিচার করা। আমি অবশ্য তাঁর পাঠক হই অনেক পরে। সম্ভবত ১৯৯৩ সালে। মারুফ রায়হানের আগ্রহে মাটি পত্রিকার গল্পসংখ্যায় শহীদুল জহির লেখেন ‘আমাদের কুটিরশিল্প’, আমি লিখি ‘বালকের বামহাত’। ততদিনে তিনি জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা লিখে সুপরিচিত। কিন্তু আমার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল গল্পপাঠক হওয়ার মাধ্যমে। তাঁর লেখার শক্তিমত্তা নিয়ে আমার কোনও সংশয় ছিল না, এখনও নেই; কিন্তু তাকে ‘জাদুবাস্তবতা’র ঘেরটোপে বন্দি করতে আমি বরাবরই দ্বিধান্বিত হয়েছি। অনেক পরে বাংলাপিডিয়াতে একটি সংক্ষিপ্ত মন্তব্য পাই তাঁর সম্পর্কে, সেটিকেই বরং অনেক ঠিক মনে হয়। তাঁর লেখার অন্যতর একটি রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সেখানটাতে, বলা হয়েছে শহীদুল জহিরের সে রাতে পূর্ণিমা ছিলতে প্রকাশ পেয়েছে বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম।

এর মধ্যে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিশ বছর পার হয়েছে গত বছর। আমাদের বুর্জোয়া রাজনীতির ধারাবাহিকতায় ১৯৭৫ সালে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে যে রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি হয় এবং ক্রমাগত যা ধর্মাশ্রয়ী বিশ্বরাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় বিকৃত গণতন্ত্রচর্চার ধারা গড়ে তোলে, কবিতায় এই পরিস্থিতির একটি মনোজগত ও সংঘবদ্ধ ছায়া পড়ে শামসুর রাহমানের উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বইটিতে। কয়েক বছরের মধ্যেই সৈয়দ শামসুল হক লেখেন স্মৃতিমেধ নামের উপন্যাস, যাতে স্বাধীনতার দশ বছর পর শহীদ এক মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী জিনাত এক রাজাকারকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে সবাইকে অস্থির করে তোলে। বিস্মিত, আহত ও ক্রুদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা দেবর মুখোমুখি হয় তার ভাবি জিনাতের। আর জিনাত নিজেই নিজেকে অপমানিত করে মুক্তিযোদ্ধাদের জাগিয়ে তোলার প্রস্তুতি নেন এই পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ে, তোরা রাজাকারকে মন্ত্রী বানাতে পারিস, আমি পারি না স্বামী বানাতে? এই উপন্যাস পত্রিকায় ছাপা হওয়ারও বছরপাঁচেক পর ১৯৮৭-তে আমাদের হাতে আসে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা। যাকে অনেকেই প্রথমে প্রবন্ধের বই মনে করে হাতে নেন, তারপর ‘ও’ বলে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেন। এ বইটি থেকেই মূলত শহীদুল জহিরকে জাদুবাস্তবতার লেখক হিসেবে অভিহিত করা হতে থাকে। যদিও দর্শন হিসেবে জাদুবাস্তবতার চেয়ে অস্তিত্ববাদই এতে অনেক বেশি প্রকাশিত হয়েছে।

জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনী লতিয়ে ওঠে ১৯৮৫ সালে, ঢাকার লক্ষীবাজার লেনে। এ কাহিনী প্রকৃতার্থে বাংলাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পথপরিক্রমার কাহিনী, যে রাজনীতি ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর লুপ্ত হয়েছিল, ১৯৭৫-এর পর আবার ফিরে এসেছে মহাসমারোহে। যুদ্ধাপরাধী, যে প্রত্যয়টি ব্যবহারে ইদানিং আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, এক অর্থে তা অনেক বেশি নিরীহ। কেননা এই প্রত্যয়টি কেবল যুদ্ধের অপরাধকেই উচ্চকিত করে, ধর্মীয় রাজনীতির নিষ্ঠুরতা এ প্রত্যয়ে ঢাকা পড়ে যায়। অথচ একাত্তরের স্মৃতি, যন্ত্রণা ও অভিজ্ঞান থেকে আমাদের কাছে ধর্মীয় রাজনীতি যুদ্ধাপরাধের সমার্থক। রাজাকার, আলবদর বা আলশামস প্রত্যয়গুলির প্রয়োগ বরং তাই বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অনেক ইতিহাসচেতনাজাত। যাই হোক, এটি ভিন্ন প্রসঙ্গ। তারপরও মনে পড়ল, কারণ শহীদুল জহিরের এ উপন্যাসে বদু মওলানা খানসেনাদের দোসর, যে একাত্তরে মানুষকে চাপাতি দিয়ে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে তার বাড়ির ছাদ থেকে জনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এই বদু মওলানারই ছেলে আবুল খায়ের তার পিতার চেতনাসমেত মহাসমারোহে ফিরে আসে লক্ষীবাজার লেনে। সে আবিষ্কার করে মেয়ের নাম মোমেনা রাখার মধ্যে দিয়ে এই মহল্লার এক অর্বাচীন প্রকারান্তরে তার প্রতি, তার আদর্শের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে। কেননা একাত্তরে ওই অর্বাচীনের বোন মোমেনাকেই তো তারা ধর্ষণ করেছিল। তার মানে একাত্তরকে এ বান্দা ভুলে যায় নি। আবদুল মজিদ,–সে আবুল খায়েরকে ভাষণ দিতে দেখে এবং দ্বিধান্বিত হয় এবং দ্বিধার এই জগত ক্রমশ বাড়তে থাকে। তার এই দ্বিধাকে আরও স্থায়ী করে এলাকাবাসী,–যারা বদু মওলানার ভয়ে ভীত–নিজেদের বাড়ি থেকে উৎপাটিত হওয়ার ও নির্যাতিত হওয়ার কিংবা আবারও চাপাতির কোপে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার ভয়ে যাদের পক্ষে সম্ভব নয় আর জেগে ওঠা। সৈয়দ হকের স্মৃতিমেধ-এর সঙ্গে শহীদুল জহিরের জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কাহিনীর একটি শ্রেণিরূপ তফাৎ সুস্পষ্ট। স্মৃতিমেধ-এ পুরুষেরা, মধ্যবিত্ত পুরুষেরা, তাদের ওপর, তাদের নারীদের ওপর খানসেনা ও তাদের দোসরদের ধর্ষণ-নির্যাতন ভুলে গিয়ে একই শ্রেণীতে লীন হয়ে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত নারীটিকেই বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চালাতে হচ্ছে নিজের ইতিহাসগত অস্তিত্ব। আর শহীদুল জহিরের উপন্যাসে নিম্নধ্যবিত্ত পুরুষ তার অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা চালাচ্ছে তার আত্মার নিগড়ে বাধা এক নারীর স্মৃতিকে ঘিরে নতুন এক নারীর উদ্বোধনের মাধ্যমে।

শহীদুল জহিরের দ্বিতীয় উপন্যাস সে রাতে পূর্ণিমা ছিলও মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ের গল্প। অবক্ষয়িত সময়, গুপ্ত সব হত্যাকাণ্ড এসব এখানে শান্ত সমাহিত পূর্ণিমা রাতের নিচে। গোপন রাজনীতিতে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে বুর্জোয়া ও সাম্যবাদী উভয় রাজনৈতিক শক্তিরই ধর্মীয় রাজনীতির কাছে পরাস্ত হওয়ার আখ্যান তুলে ধরার প্রয়াস রয়েছে এতে। সপরিবারে একটি হিন্দুপরিবারকে হত্যা করার অভিজ্ঞতাকে মূলসূত্র ধরে শহীদুল জহির এ ঘটনাকে নিজের সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে উন্নীত করেন এমন এক অভিজ্ঞানে, যার ফলে খুব সাধারণ পাঠকও বুঝতে পারেন এটি আসলে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার রূপক উপাখ্যান। বন্যার স্রোতের মতো বাক্যের পর বাক্য বেরিয়ে আসে এ উপন্যাসে, প্রায়ই আমাদের মনে থাকে না কে এ সব বাক্যের কথক, লেখক নিজে নাকি কোনও চরিত্র, নাকি কোনও প্রতিচরিত্র। চাঁদের অমাবস্যা বিভ্রমও রয়েছে একইসঙ্গে। শহীদুল জহিরের আলোচকরা বিশেষত এ উপন্যাসটিকেই জাদুবাস্তবতার প্রামাণ্য বই হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।

আমার মনে হয়, জাদুবাস্তবতার যোগ যতটুকুই থাক না কেন, শহীদুল জহিরের সাহিত্য আলোচনার জন্যে এ প্রত্যয়টি যথেষ্ট নয়। ২০০৫-এ বাংলা সাহিত্যের জাদুবাস্তবতাসংক্রান্ত এক লেখায়ও প্রসঙ্গক্রমে আমি লিখেছিলাম, “এইসব ছাপ ছাড়াও শহীদুল জহির টিকে থাকতে পারেন, তাঁর কথাসাহিত্যের একটি উপসংহার তৈরি করতে পারেন।” এ ছাড়াও লিখেছিলাম, ‘‘যে জন্যে তাঁর লেখার প্রতি আমাদের মনযোগ ও মোহাচ্ছন্নতা তৈরি হয় তা হলো লোকজ উপাদান, ভূগোলের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগ এবং একই প্রসঙ্গে ঘুরপাক খাওয়ার মতো গ্রামীণ (গ্রাম্য নয়) ভাষাভঙ্গি। বিশেষত এই ভাষাভঙ্গির কারণে নগরের কাহিনীতে প্রবেশ করার পরও শহীদুল জহির পাঠকের কাছে স্বস্তিকর মনে হয়, কেননা আমরা আসলে নিজেদের মধ্যে পরিক্রমণ করতেই ভালবাসি এবং এই ভাষাভঙ্গি পুনরাবৃত্তির মধ্যে দিয়ে অপার এক দুলুনি তৈরি করে। কিন্তু এসবের পাশাপাশি ইতিহাসবোধের প্রতি উপেক্ষা অথবা অমনোযোগ শহীদুল জহিরের লেখা ও অনুভূতির বিস্তৃতিকে সীমিত করে ফেলতে পারে, যা আমরা বিশেষ করে তাঁর সব উপন্যাসেই লক্ষ্য করি। তাঁর জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা সে রাতে পূর্ণিমা ছিল উপন্যাসে আমরা একটি জাতির জাদুবাস্তবতাময় ক্রান্তিকাল খুঁজে পাই বটে, কিন্তু তা কি আমাদের মধ্যে সেই জাতির হাজার বছরের মিশে যাওয়া ইতিহাসবোধের ক্ষরণ ঘটাতে পারে? না কি আমরা হঠাৎ হোঁচট খেয়ে থেমে গিয়ে সীমিত এক পরিসরেই আনন্দিত হতে থাকি?’’ তাঁর মুগ্ধ পাঠকদের দলে থেকেও এ রকম একটি মন্তব্য করায় তিনি কী মনে করেছিলেন, সেটি আমার আর কোনওদিনই জানা হবে না।

তিন.
মৃত্যুগন্ধী এই সময়ে পুরানো ওই অনুভূতিটুকু আবারও উল্লেখ করছি শুধু এ কারণেই যে অপরিচয়ের বদলে তাঁর সঙ্গে পরিচিত হওয়াটাই যৌক্তিক ছিল আমার চিন্তাগুলোকে আরও পরিণত করতে। যদি আমার তাঁর সঙ্গে পরিচয় হতো, যদি আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলতাম, তা হলে নিশ্চয়ই তাঁর লেখার এরকম সব দিকই হতো তাঁর ও আমার আলোচনার বিষয়। এখন তাঁর সঙ্গে আর কারোরই দেখা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। যদিও কবি সমুদ্র গুপ্তের সঙ্গে যতবার দেখা হবে ততবারই আরও বেশি করে আমার মনে হবে তাঁর কথা এবং হয়তো আনমনে চেষ্টা করব একই বংশোদ্ভূত দুজনের চেহারার মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উদ্ঘাটনের।

এমন হয়েছে, কয়েকবারই আমাদের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে আমাদের বন্ধু গল্পকার ও সরকারি কর্মকর্তা ফয়জুল ইসলামের কারণে। আমি আগ্রহী হয়েছি সেই মানুষটিকে দেখতে, যার বিছানা বরাবর একটি টিভি এমনভাবে প্রতিস্থাপন করা যাতে মানুষটি শুয়ে থেকেও আরাম করে রিমোট ঘুরিয়ে টিভি দেখতে পারে। তাঁর সম্পর্কে ওপরের স্পর্শকাতর বিভিন্ন সব বাক্য লেখার ও ছাপানোর পর আমি তাঁকে আমার তখনকার সর্বশেষ বইটি (মাৎস্যন্যায়ের বাকপ্রতিমা) পাঠাই পাঠ করতে। এবং কয়েকদিন পরে উত্তেজিত কিংবা নিরুত্তেজিত ফয়জুল ইসলাম আমাকে বলে, ‘স্যার তোমাকে নিয়ে যেতে বলেছে।’ এই বলাবলি বেশ কয়েকবার ঘটে, আবদুল করিমের গ্লাস ভেঙে জানালার পাশে রাখার মতো। কখনও আমি হাসি, ‘যেতে তো হবেই, আপনি ওনাকে স্যার বলেন, আর আমি তাকে ভাই বলব। আপনি কীভাবে স্যার বলেন সেটা তো আমাকে দেখতে হবে।’ কখনও ফয়জুল আমাকে শোনায়, শহীদুল জহির কার কার লেখার প্রশংসা করেছেন। শুনতে শুনতে বলি, ‘বড় লেখকরা সব সময়েই প্রশংসা করেন। এমনকি খারাপ লেখকদের লেখায়ও মহৎ উপাদান খুঁজে পান। উত্তেজিত হবেন না, ধৈর্য হারাবেন না।’ আসলে যদি আমাদের যাওয়া হতো তা হলে কী নিয়ে কথা বলতাম আমরা? এই জাদুবাস্তবতার ঘোর? অথবা অস্তিত্ববাদ? অথবা বাস্তবতা ও সুরিয়ালিজম? অথবা এসব কিছুই নয়! আমরা কথা বলতাম দুর্ধর্ষ নকশালী ইসমাইলকে নিয়ে, বাংলাদেশের পতাকা যে সবসময় মাথায় বেধে রাখত মাথায় যুদ্ধকালে আর স্বাধীন সিরাজগঞ্জ শহরে প্রথম প্রবেশ করেছিল যার বাহিনী। অথচ পরে যে পুরো বাহিনীই খুন হয়ে গেল নিজেদের মধ্যেই যুদ্ধ করে! হয়তো কথা বলতাম ফিরোজ মাস্টারকে নিয়ে, গণবাহিনী নিয়ে, গোপন রাজনীতি নিয়ে, ধর্মজ রাজনীতির হিংস্র কদর্য মানুষগুলিকে হত্যা না করে কেন গোপন রাজনীতির মানুষগুলো কেবল নিজেদের মধ্যেই হানাহানি করেছে সেসব নিয়ে। আর মুক্তিযুদ্ধ,–সে কথাও নিশ্চয়ই উঠত। বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার দুর্বলতার কথা কে না জানে! আর এই জন্যে জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পোস্টিং দিলে তিনি বিব্রতও হয়েছিলেন ভীষণরকম।

প্রবাদ হিসেবে এটি প্রতিষ্ঠিত, নিজেকে শহীদুল জহির সরিয়ে রেখেছিলেন আর সব লেখক থেকে অনেক দূরে। কিন্তু মানুষ থেকেও কি? যাকে তাঁর একাকীত্ব ও নির্জনতা বলছি তাকে কি আমরা ব্যাখ্যা করব শুধু লেখকদের আড্ডায় তাঁর অনুপস্থিতির তত্ত্ব দিয়ে? রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করতে করতে তিনি কি শুনতেন না মানুষের কথা? এই যে এত মানুষ, এত চরিত্র, এত অঞ্চলভাষা তা তিনি পেলেন কোথা থেকে? বেশ কয়েক বছর আগে কথা পত্রিকায় কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের নেয়া তাঁর একটি সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম। উত্তর দেয়ার ভাষাভঙ্গি থেকে মনে হয়েছিল, মানুষ থেকে তিনি যত নির্জনে ছিলেন বলে শোনা যায় তত নির্জনে ছিলেন না সম্ভবত। মিডিয়া থেকে দূরে ছিলেন এবং এই দূরত্বই তাঁকে এ ছাপ এঁটে দিয়েছে। কেননা লেখক হিসেবে মিডিয়ার প্রতি অনেকের যে দাসত্ব রয়েছে, শহীদুল জহিরের দাসত্বহীনতা সে ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয়, অনুকরণীয়। দাসত্বের গ্লানি ঢাকার জন্যে তাঁকে তাই ঠেলে দেয়া হয়েছে নির্জনতার প্রকোষ্ঠে।

শহীদুল জহিরের কাছে শেষ পর্যন্ত যাওয়া হলো না, কেননা মোটা দাগে বলতে গেলে ফয়জুল ইসলামের সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ কমে এসেছিল। কেন, সেটা খুবই ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে দূরত্বও অনেক দূরত্ব কমিয়ে আনে। ফয়জুলই আমাকে তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানালেন প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। আমি সেই মৃত্যুর দৃশ্যকল্পের অনেকটাই অনুমান করতে পারলাম, কেননা আমি নিজেও দীর্ঘকাল একা থাকতে অভ্যস্ত ছিলাম। আমি দেখতে পেলাম, একজন মানুষ ভর দুপুরে প্রচণ্ড ব্যথা নিয়ে কষ্ট পাচ্ছেন। মুগ্ধ পাঠকদের কেউ কাছে নেই, পদাধিকার বলে অনেক ক্ষমতা থাকলেও সেই সময় ‘জ্বি স্যার’ বলার মতো কেউই তাঁর কাছে নেই। তিনি অনেক কষ্টে সিড়ি ভেঙে ভেঙে নামতে নামতে একসময় নোংরা সিঁড়িতেই বসে পড়লেন। দুপুরের উজ্জ্বল আলো পৃথিবীর সবখানে। ইস্কাটনের ওইসব সরকারি বাসাগুলো দেখার ভাগ্য আমাদের অনেকেরই আছে। তিনি তাঁর অস্তিত্ব ঘোষণা করার চেষ্টা করছেন চারপাশের উজ্জ্বল আলোর কাছে। চেষ্টা করছেন বসন্তের বাতাস টেনে নিতে অবাধ্য বুকের ভেতর। অপেক্ষা করছেন নিজস্ব এক জাদুবাস্তবতার। টেলিফোন করছেন বোনের ছেলের কাছে। কিন্তু ঘুমন্ত মানুষের কানে রিংটোন খুব সহজে পৌঁছায় না, তা সে যত আপনই হোক না কেন। কেউ তার কোনও কাজে আসে নি, কেবল তাকে মানুষ ভেবে হঠাৎ করেই তাকে দেখে ছুটে এসেছে ‘সামান্য’ এক কাজের মানুষ। সে তাকে রিকশায় করে হলি ফ্যামিলিতে পৌঁছে দিয়েছে। তারপর ডাক্তারদের প্রসঙ্গ না হয় থাক। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা তাঁর অনেক নিঃসঙ্গতা ও মহীয়ানতার সন্ধান পেয়েছি, তিনি তাই নিয়ে বেঁচে থাকুন এই পৃথিবীতে।

চার.
ইংল্যান্ডে তুষার পড়লেও লন্ডনে তুষারপাত বিরল এক ঘটনা। গত গুড ফ্রাইডে’তে হঠাৎ করেই ঘোষণা আসে, আগামীকাল থেকে তুষার পড়তে পারে। ওই রাতে আমি অনেকদিন পর সিগারেট কিনি আসন্ন হিমের আশঙ্কায়। শনিবার সকালে দেখি, সত্যিই এই মার্চের মধ্যে, যখন সামার খুব কাছে চলে এসেছে, ঝির ঝির করে তুষার পড়ছে আকাশ থেকে। পরদিন রবিবার, সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে আর তখনও আমি শুয়ে, স্ত্রী বাইরে থেকে টেলিফোন করে আমাকে আবারও তুষারপাতের খবর জানায়। আমি ওঠার পর জানালা খুলে মুখে একটু বরফ মেখে অভ্যাসবশত ই-মেইল চেক করতে বসি এবং ইনবক্সের প্রথমেই চোখ আটকে যায় ফয়জুল ইসলামের চিঠিটিতে : ‘শহীদুল জহির হ্যাজ ডায়েজ টুডে: লাইফ ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান ডেথ।’ আমার চ্যাটিংবক্সে লালবৃত্ত জ্বলজ্বল করছে, কিন্তু মাহবুব মোর্শেদ সেই লাল বৃত্ত পেরিয়ে একই মেসেজ দেয়। আমি এইসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে জানালার পাশে এসে দাঁড়াই।

দেখি সমস্ত প্রাকৃতিক নিয়ম ভঙ্গ করে আমার প্রিয় বাংলাদেশের কার্পাস তুলোর মতো পেঁজা পেঁজা শাদা শাদা নৃত্যরতা তুষার ঝরে পড়ছে, গলে পড়ছে জানালার কাচে, রাস্তার ওপরে, লাইটপোস্টের গায়ে, ওক আর চেরিনাস্ট গাছের গায়ে। মনে হচ্ছে, যে প্রকৃতি এতদিন নীরবে তার সঙ্গী ছিল সেই প্রকৃতি আজ ভেঙে পড়ছে শহীদুল জহিরের শোকে। এই কদিন আগেই এক প্রিয় মানুষকে আমি লিখেছিলাম, মানুষকে বা হাতের উল্টো পিঠে কান্না মুছে হাসি আনতে হয়। আজ আমিও সেই চেষ্টা করি, কাঁপা কাঁপা হাতে তুষারের দিকে চোখ কুঁচকে তাকিয়ে সিগারেট জ্বালানোর চেষ্টা করি, মনে মনে বলি, যিশু চলে গেছেন, যিশু তুষারে ঢেকে যাচ্ছেন।

১০ চৈত্র ১৪১৪/ ২৪ মার্চ ২০০৮

আর্টস-এ প্রকাশিত লেখা

আগুনপাখি: ব্যক্তিনির্মাণযজ্ঞ
বিধবা সময়ের গল্প
সেদিন তুষার ঝরেছিল
রেখো মা দাসেরে মনে…
মঙ্গামনস্ক শরীরীমুদ্রা

লেখকের আর্টস প্রোফাইল: ইমতিয়ার শামীম
ইমেইল: imtiar@gmail.com

ফেসবুক লিংক । আর্টস :: Arts

free counters
Free counters

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (1) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন গিয়াস আহেমদ — জুলাই ১৯, ২০০৮ @ ৩:০১ অপরাহ্ন

      আগুনপাখি নিয়ে ইমতিয়ার শামীমের আলোচনা-বিশ্লেষণ বেশ চমৎকার হয়েছে। তিনি উপন্যাসটির গভীরে প্রবশে করতে পেরেছেন। সম্প্রতি আমিও এই উপন্যাসটি নিয়ে একটা আলোচনা লিখেছি। সেই আলোচনা ইমতিয়ার শামীমের আলোচনার কাছে নস্যি! জয়তু ইমতিয়ার শামীম!

      আগুনপাখি নিয়ে আমার লেখাটির একটি সংশোধিত ভার্সন পোস্ট করতে পারি। যদি কারো আগ্রহ থাকে…কিংবা সম্পাদক যদি অনুমোদন করেন তাহলে…।

      আর্টস পাতার পক্ষ থেকে
      আপনি আপনার প্রকাশিত লেখার লিংক এখানে দিতে পারেন।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com