অনুবাদ, ইতিহাস, দর্শন

মিশেল ফুকোর

শৃঙ্খলা ও শাস্তি: জেলখানার জন্ম (কিস্তি ১১)

audity_falguni | 16 Jul , 2008  

gloucesterjail.jpg
ব্রিটেনের গ্লুচেস্টার সংশোধনাগার

—————————————————————-
শাস্তির কোমল পন্থা
—————————————————————–

কিস্তি: ১০

অনুবাদ: অদিতি ফাল্গুনী

খণ্ড ২ : শাস্তি

২য় অধ্যায়: শাস্তির কোমল পন্থা (The gentle way in punishment)
(পৃষ্ঠা ১২৩-১৩১)

(গত সংখ্যার পর)

সংশোধনাগারের এই ব্যবস্থা শুধুই যে গার্হস্থ্য অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষায় জরুরি জটিল স্বার্থগুলোর পুনর্বিন্যাস করবে তাই নয়। বরং সংশোধনাগার নৈতিক বিষয়ের অনুজ্ঞাও নির্ধারণ করবে। সংশোধনাগারের সেল বা ক্ষুদে কুঠুরি যেন খ্রিষ্টীয় সন্ন্যাসীদের মঠের আদলে গড়া যা আগে শুধু ক্যাথলিক দেশগুলোতেই দেখা যেত। ক্যাথলিক মঠের আদলে গড়া সংশোধনাগারের wal-st-j.jpg
ফিলাডেলফিয়ায় ওয়ালনাট সড়কের জেলখানা

এই সেলগুলোই প্রটেস্ট্যান্ট সমাজে সেই যন্ত্রের রূপ ধারণ করে, যার মাধ্যমে কেউ গার্হস্থ্য অর্থনীতি এবং ধর্মীয় বিবেকবোধ দু’টোরই পুনর্গঠন করতে পারে। একদিকে অপরাধ ও আর একদিকে ন্যায়পরতা ও পুণ্যের পথে ফিরে আসা — জেলখানা যেন এই ‘দুই ভুবনের মধ্যবর্তী স্থান’টুকু গঠন করে। দুই ভুবনের মধ্যবর্তী এই স্থানটুকুই যেন ব্যক্তিগত রূপান্তরের জায়গা যা রাষ্ট্রকে ফিরিয়ে দেবে তার অতীতের সেই বশমানা প্রজাকে যে প্রজা পরবর্তী সময়ে আইন অমান্যকারী বিদ্রোহীতে রূপান্তরিত হয়েছিল। জেলখানা বা সংশোধনাগার নানা প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে আইন না মানা এই বিদ্রোহী বা অপরাধীকে পুনরায় পরিশুদ্ধ করে রাষ্ট্রের কাছে আবার ফিরিয়ে দেবে। ব্যক্তির ‘আত্মশুদ্ধি’র জন্য সৃষ্ট জেলখানারূপী এই যন্ত্রকেই হ্যানওয়ে সংশোধনাগার বলে অভিহিত করেন। ১৭৭৯ সালে হাওয়ার্ড এবং ব্ল্যাকস্টোন এই সাধারণ নীতিমালাই কার্যকরী করেন। ঠিক এ সময়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করায় বৃটিশ অপরাধীদের নির্বাসন দণ্ড হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ব্যবস্থা রদ হয় এবং শাস্তিব্যবস্থা সংশোধনের জন্য একটি আইন গৃহীত হয়। অপরাধীর আত্মা এবং আচরণের রূপান্তরের জন্য দেওয়ানি আইনে শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ডের প্রচলনও এ সময়েই হয়। এই আইনটি বিল আকারে গ্রহণের সময় মুখবন্ধে হাওয়ার্ড এবং ব্ল্যাকস্টোন ব্যক্তিগত কারাদণ্ডকে মোট তিন/তিনটি কাজ সম্পন্ন করার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বলে মত পোষণ করেন। ব্যক্তিগত কারাদণ্ড যে তিনটি কাজ করতে প্রধানতঃ সক্ষম তা’ হলো, অপরাধীকে ভয় পাইয়ে দেওয়া, অপরাধীর আত্মা পরিবর্তন এবং অপরাধীকে চিত্ত পরিবর্তনের জন্য জেলখানায় শিক্ষানবিশী সময় কাটাতে সাহায্য করা। জেলখানায় থেকে এই শিক্ষানবিশী কালে অপরাধীকে ‘নির্জন বন্দিত্ব, নিয়মিত কাজ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধের প্রভাবের মাঝে’ সময় কাটাতে হয়। অপরাধীদের দুর্ধর্ষ কাণ্ডকারখানা দেখে যেসব সাধারণ মানুষ অতীতে মনে মনে অমন দুর্ধর্ষ কাজকর্ম করার জন্য প্রলুব্ধ হয়েছে, জেলখানার এসব সুশৃঙ্খল নিয়মকানুন তাদের সেসব প্রলোভন হতে নিশ্চিতভাবেই সরিয়ে আনবে। একই সাথে খোদ দুর্ধর্ষ অপরাধীরাও ‘নিজেদের সংশোধন করতে এবং কাজ করার অভ্যাস অর্জনে সমর্থ হবে (১৭৭৯ সালের আইনের মুখবন্ধ)।’ এই আইনের পরই নারী ও পুরুষের জন্য দু’টো পৃথক সংশোধনাগার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এবং এই পৃথক পৃথক সংশোধনাগারে থাকবে একে অপর হতে বিচ্ছিন্ন সব কয়েদি যারা ‘সবচেয়ে কঠোর ও দাসমূলক শ্রমে দণ্ডিত হবে। যে অপরাধী যত বেশি অশিক্ষিত, উদাসীন ও একগুঁয়ে প্রকৃতির, তাকে ততই কঠোর শ্রমে দণ্ডিত করা হবে।’ তাকে চাকার ভেতর দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে মেশিন ঘোরাতে বলা হবে, কপিকল ঠিক করতে বলা হবে। বলা হবে মার্বেল ঘষতে, শণ পিটাতে, কাঠ ফাঁড়তে, কাপড়ের ন্যাতা কাটতে, দড়ি বানাতে এবং চটের থলে সেলাইয়ের মতো যাবতীয় কাজ করতে। আইনের মুখবন্ধে বড় বড় নানা কথা বলা হলেও বস্তুতঃ ব্রিটেনে এসময় কেবল একটি মাত্র সংশোধনাগার স্থাপন করা হয়। এটি নির্মাণ করা হয়েছিল গ্লুচেস্টারে। এই সংশোধনাগারটির কার্যক্রম ১৭৭৯ সালের আইনের প্রাথমিক পরিকল্পনার সাথেই যা একটু সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছিল। এই আইনের আওতায় সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধীদের জন্য পরিপূর্ণ আটকাদেশের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। অন্য অপরাধীদের জন্য দিনের বেলা সবাই মিলে একসাথে কাজ করা এবং রাতে আলাদা আলাদা সেলে থাকার ব্যবস্থা অনুমোদন করা হয়েছিল।

এরপর এলো সংশোধনাগারের ফিলাডেলফিয়া মডেল। নিঃসন্দেহে এটি ছিল সবচেয়ে বিখ্যাত মডেল। যেহেতু এটি সাধারণ মানুষের মনে মার্কিনী ব্যবস্থার রাজনৈতিক উদ্ভাবনার সাথে জড়িত প্রপঞ্চ হিসেবে ঠাঁই পেয়েছিল। পাশাপাশি এই মডেলটি সংশোধনাগারের অন্যান্য মডেলের মতো খুব দ্রুতই ব্যর্থ হয়ে মুখ থুবড়ে পড়বে বলেও কেউ মনে করে নি। ১৮৩০ সালের শাস্তি ব্যবস্থা সংস্কারের আগ পর্যন্ত এই ফিলাডেলফিয়া মডেল ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সংশোধন করা হয়। ১৭৯০ সালে উদ্বোধিত ওয়ালনাট সড়কের জেলখানা খ্রিষ্টীয় বন্ধুসভার প্রত্যক্ষ প্রভাবে ঘেন্ট এবং গ্লুচেস্টারের১০ জেলখানার অনুকৃতি হিসেবে নির্মিত হয়। জেলখানার ভেতরের কারখানায় কাজ ছিল বাধ্যতামূলক। এবং কয়েদিদের সেখানে দিনভর খাটতে হতো। কয়েদিদের পরিশ্রম হতে জেলখানা কর্তৃপক্ষ তার অর্থকরী প্রয়োজন মেটাত। পাশাপাশি কয়েদিদের ব্যক্তিগত ভাবেও পুরস্কৃত করা হতো যাতে করে এই কয়েদিরা অর্থনীতির কঠোর জগতে নৈতিক এবং বস্তুগত ভাবে পুনরায় প্রবেশ করতে পারে। কয়েদিদের ‘সারাক্ষণই উৎপাদনমূলক কাজে নিযুক্ত রাখা হতো যেন তারা জেলখানার ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। কোনোক্রমেই তাদের অলস বসে থাকা চলতো না এবং তারা অল্পস্বল্প টাকাও সঞ্চয় করতে পারতো যাতে বন্দিদশা কাটার পর তারা উপায়হীন না হয়ে পড়ে (লা হোশেফ্যুকোদ-লিয়াঁকোর্ট, ৯)। এভাবেই এক কঠোর সময়-সূচী এবং টানা পাহারা ও তত্ত্বাবধানের আওতায় কয়েদিদের দৈনন্দিন জীবন বিন্যস্ত করা হতো। দিনের প্রতিটি মূহুর্তই কোন নির্দিষ্ট কাজের জন্য নির্ধারিত ছিল। এবং সেই নির্দিষ্ট সময়ের ছিল নির্দিষ্ট বাধকতা ও বাধানিষেধ। ‘খুব ভোরেই কয়েদিরা ঘুম থেকে উঠে পড়ে। যাতে করে সূর্য ওঠার আগেই তারা বিছানা তুলে, হাতমুখ ধুয়ে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে তাদের কাজ শুরু করে দিতে পারে। সকালের এই মুহূর্ত হতে কোনো কয়েদিই আর কারখানা বা কাজের জায়গা ছাড়া অন্য কোথাও অর্থাৎ তাদের ব্যক্তিগত কুঠুরিতে যেতে পারে না। রাতের বেলা একটি ঘণ্টার শব্দে তাদের কাজ শেষ হয়। তারপর ঠিক আধাঘণ্টা সময়ের ভেতর তাদের বিছানা করে শুয়ে পড়তে হয় এবং এরপর তারা জোরে জোরে কথাবার্তা বলা বা এতটুকু শব্দও আর করতে পারে না।’ (টার্নব্যুল ১৫-১৬)। গ্লুচেস্টার জেলখানায় সবার জন্য নির্জন বন্দিত্ব দস্তুর ছিল না। অতীতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অথবা জেলের ভেতর বিশেষ দণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্যই নির্জন বন্দিত্বের বিধান ছিল। ‘নির্জন সেলে বসে, কোনো কাজ ছাড়া বা মন অন্য কোনো দিকে ফেরানোর উপায় ব্যতীত অপরাধীকে দীর্ঘ ও উৎকণ্ঠিত প্রহরগুলো পার করতে হতো। এবং বসে বসে অতীতের নানা স্মৃতি শুধু তাদের কষ্টই দিত। যে স্মৃতিতে অতীতের আরো কিছু অপরাধীর সাথে মিলে করা তার দুষ্কৃতির স্মৃতি শুধুই তাকে কষ্ট দিয়ে ফিরবে।’ (তিতার্স ১৯৩৫, ৪৯)। ঘেন্টের কারাগারে অবশ্য কয়েদির আচরণ অনুযায়ী বন্দিত্বের মেয়াদ ওঠা-নামা করতো। ১৮২০ সাল অবধি কারা পরিদর্শকরা নথিপত্র ঘাঁটার পর কয়েদিদের ভালো আচরণের ভিত্তিতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ক্ষমা আদায় করতেন।

উপরন্তু, ওয়ালনাট সড়কের এই জেলখানার কিছু একান্ত নিজস্ব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। সংশোধনাগারের অন্যান্য মডেলগুলোতে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্য ওয়ালনাট সড়কের সংশোধনাগারেও বিকশিত করা হয়। এই চারিত্র্যর ভেতর সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্য ছিল শাস্তিকে প্রকাশ্যে প্রদর্শন না করা। জনগণ বিচারের রায়ে ঘোষিত শাস্তি এবং কেন ঠিক এই নির্দিষ্ট শাস্তিই দেওয়া হয়েছে তার কারণ জানতে পারবে তবে শাস্তি প্রদানের ব্যাপারটি ঘটবে গোপনে। না স্বাক্ষী হিসেবে, না শাস্তি প্রদানের আমানতকারী হিসেবে, কোনোভাবেই যেন জনতা হস্তক্ষেপ করতে না পারে। জেলখানার উঁচু দেয়ালের ভেতরে অপরাধী সাজা খাটছে এটাই উদাহরণ হিসেবে যেন যথেষ্ট। ১৭৮৬ সালের আইনে বড় শহরের সড়কগুলোতে গুরুতর অপরাধের দায়ে সাজা পাওয়া বন্দিদের শ্রমে নিযুক্ত করে যেমন সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেখতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল, ওয়ালনাট সংশোধনাগারের নতুন মডেলে সেই ব্যবস্থাও আর রইলো না।১১ কয়েদি এবং তাদের পরিদর্শকদের ভেতরেই শুধুমাত্র উন্মোচিত হয় শাস্তি এবং সংশোধনের প্রক্রিয়াসমূহ। এই প্রক্রিয়াগুলোই সামগ্রিকভাবে ব্যক্তির রূপান্তর সূচীত করে। প্রতিদিন জেলখানা বা সংশোধনাগারে কয়েদি যে দৈনন্দিন কাজগুলো করতে বাধ্য হয়, তাই যেন তার আগেকার শরীর এবং অভ্যাসকে রূপান্তরিত করে। রূপান্তরিত করে তার মন এবং ইচ্ছাশক্তি। যেহেতু কারা কর্তৃপক্ষ কয়েদির আধ্যাত্মিক রূপান্তরের জন্য তার প্রতি বিশেষ মনোযোগ প্রদান করে : ‘বাইবেল এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচরণের বইগুলো দেওয়া হয়। শহর ও উপশহরের বিভিন্ন স্থানে খুঁজে পাওয়া যায় এমন বিভিন্ন ধর্মের পুরোহিতদের সপ্তাহে একবার জেলখানায় এসে ধর্মীয় প্রার্থনা সম্পাদন করতে বলা হয়। পুরোহিত শ্রেণী ছাড়াও ব্যক্তির মানসিক উন্নতিতে প্রভাব রাখতে সক্ষম যেকোনো ব্যক্তিকেই কয়েদিদের আধ্যাত্মিক রূপান্তরের জন্য জেলখানায় যে কোনো সময় ঢোকার অনুমতি দেওয়া হতো।’ (তিতার্স ১৯৩৫, ৩-৪)। তবে, কয়েদিদের এই আধ্যাত্মিক রূপান্তরের দায়ভার ন্যস্ত ছিল কারা প্রশাসনের উপর। নির্জনতা এবং আত্ম-পরীক্ষাই যথেষ্ট ছিল না। বিশুদ্ধ ধর্মীয় প্রেরণাদানও পর্যাপ্ত নয়। যত বেশি পারা যায়, কয়েদির মন নিয়ে কাজ করতে হবে। কারাগার যদিও এক প্রশাসন যন্ত্রই বটে, তবে একে একই সাথে হতে হবে ‘চিত্ত রূপান্তরের যন্ত্র’। জেলখানায় প্রথম পা রেখেই কয়েদিকে পড়তে হতো জেলখানার নিয়মাবলী। ‘একই সাথে, কারা পরিদর্শকরা কয়েদির অন্তরে নৈতিক দায়বোধ জোরদার করতে চাইতেন। কয়েদি যে অপরাধ করে জেলখানায় এসেছে, কারা পরিদর্শকরা কয়েদির কাছে তার সেই কৃত অপরাধেরই প্রতিনিধিত্ব করে। যে অপরাধ কয়েদি এই কারা পরিদর্শক সহ গোটা সমাজের সাথে করেছে, তার মন্দত্ব গোটা সমাজে প্রভাব ফেলেছে। তাই তাকে জেলখানায় রাখা হয়েছে। যেন সাধারণ মানুষ তার শাস্তির কথা জানতে পারে এবং বুঝতে পারে যে কীভাবে কর্তৃপক্ষ সমাজের প্রতি কোনো অন্যায় করা হলে তার ক্ষতিপূরণ করে এবং কীভাবে অপরাধীকে সংশোধন করে। তারপর কারারক্ষীরা কয়েদিকে দিয়ে সানন্দচিত্তে তার দায়িত্ব পালনের প্রতিশ্র“তি আদায় করে। যেন অভিযুক্ত কয়েদি ভাল ব্যবহার করে তেমন শপথ তাকে দিয়ে করানো হয়। কারা পরিদর্শকরা অবশ্য বিনিময়ে তাকে প্রতিশ্র“তি বা আশা প্রদান করে যে ঠিক মতো চললে জেলখানায় তার শাস্তির মেয়াদ শেষ হবার পূর্বেই তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে…নির্দিষ্ট সময় পরপর কারা পরিদর্শক বা কারারক্ষীদের দায়িত্বই হয়ে দাঁড়ায় অপরাধীদের সাথে সংলাপের পর সংলাপে বসা, যাতে এই কয়েদিদের মানুষ ও সমাজের সদস্য হিসেবে কর্তব্য সম্পর্কিত সবক দেওয়া যায়।’ (টার্নব্যুল, ২৭)।

প্রত্যেক কয়েদির ব্যক্তিগত আচার আচরণ সম্পর্কে কারা কর্তৃপক্ষ যে খোঁজখবর রাখতো অর্থাৎ, প্রত্যেক অপরাধী সম্পর্কে কারা কর্তৃপক্ষের ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিকশিত এই জ্ঞান যে কয়েদিদের আচরণের নিয়ন্ত্রণ এবং রূপান্তরের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে — শর্ত এবং প্রতিক্রিয়া, অর্থাৎ দু’ভাবেই ভূমিকা রেখেছে, নিঃসন্দেহে এটিই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। যখনি কোনো নতুন কয়েদি আসত, ওয়ালনাট সড়ক সংশোধনাগার কর্তৃপক্ষ কয়েদির অপরাধ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন হাতে পেত। এই প্রতিবেদনে কোন অবস্থায় অপরাধটি সঙ্ঘটিত হয়েছে, বিবাদীর উপর করা পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা তদন্তগুলোর একটি সংক্ষিপ্তসার, বিচারের রায় ঘোষণার আগে ও পরে তার আচরণ প্রভৃতি খুঁটিনাটি বর্ণনা থাকতো। অপরাধীর ‘পুরনো অভ্যাসগুলো ধ্বংসের জন্য কোন কোন পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য’ এই প্রতিবেদন কারা কর্তৃপক্ষের কাছে একটি অদ্বিতীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতো।১২ অপরাধীর বন্দিত্বের পুরো মেয়াদকাল জুড়েই তাকে নজরে রাখা হবে। তার দৈনন্দিন আচরণ নথিবদ্ধ করা হবে এবং ১৭৯৫ সালের আইন অনুযায়ী কারা পরিদর্শক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত এলাকার ১২ জন গণ্যমাণ্য ব্যক্তির ভেতর হতে প্রতি সপ্তাহে দু’জন করে পরিদর্শক জেলখানা পরিদর্শন করবেন। তাদেরকে জেলখানার যাবতীয় ঘটনাপ্রবাহ জানানো হবে। এই কারাপরিদর্শকরা প্রত্যেক কয়েদির আচার-আচরণ সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবেন এবং শেষপর্যন্ত তারা সিদ্ধান্ত নেবেন যে সদাচারণের ভিত্তিতে কোন কোন কয়েদিকে শাস্তির মেয়াদ পুরো হবার আগেই মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। এভাবে প্রত্যেক কয়েদির ব্যক্তিগত তথ্য জানা থাকার ফলে কারা কর্তৃপক্ষে জেলখানার ভেতরে কয়েদিদের আচরণ অনুযায়ী তাদের পৃথক পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করতে সক্ষম হয়। জেলখানায় আসার আগে করে আসা অপরাধের প্রকৃতি নয়, বরং জেলখানায় তাদের আচরণ অনুযায়ী এই শ্রেণীবিভাজন হতো। এভাবেই জেলখানা এক চিরস্থায়ী নিরীক্ষাকেন্দ্র হয়ে দাঁড়ায় যেখানে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ বা মন্দত্বের বিন্যাস করা সম্ভবপর ছিল। ১৭৯৭ সাল হতে কয়েদিদের মোট চারভাগে ভাগ করা হতে থাকে। প্রথম ভাগে পড়তো নির্জন সেলে দণ্ডিত সেই সব কয়েদি যারা ভয়ঙ্কর অপরাধ করেছে বা যারা জেলখানায় বসেই খুব মন্দ আচরণ করেছে। দ্বিতীয় ভাগে ছিল সেইসব অপরাধী যারা ‘পুরনো অপরাধী হিসেবে ইতোমধ্যেই সুপরিচিত…যাদের অবক্ষয়িত নৈতিকতা, ভয়ঙ্কর চরিত্র, অনিয়মিত আচরণ বা বিশৃঙ্খল ব্যবহার’ তাদের জেলে থাকা অবস্থায়ই পরিস্ফূট হয়ে ওঠে। তৃতীয় বর্গে পড়তো সেইসব অপরাধী ‘যাদের অপরাধ করবার আগের ও পরের পরিবেশ পরিস্থিতি ও চরিত্র একথাই বিশ্বাস করায় যে তারা ঠিক অভ্যাসগত ভাবেই অপরাধী নয়; অর্থাৎ দুর্ঘটনাক্রমে অপরাধী।’ চতুর্থ ভাগে রাখা হতো এক বিশেষ শ্রেণীর অপরাধীদের। তারা জেলখানায় সদ্য আগত এবং এত স্বল্প সময়ের ভেতরেই তাদের ব্যক্তিগত স্বভাব বা আচরণ সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু জানা যায় নি। তাদের জেলখানায় আগত একদম শিক্ষানবিশী শ্রেণী হিসেবে দেখা হতো। এমনকি তাদের চরিত্র সম্পর্কে আরো বেশি কিছু জানা থাকলেও হয়তো উপরের তিন বর্গের কোনোটিতেই তাদের রাখা যেত না। (তিতার্স ১৯৩৫, ৫৯)। এভাবে কয়েদিদের বিষয়ে প্রাতিস্বিকীকৃত জ্ঞানের এক বিপুল ভাণ্ডার গড়ে উঠছিল যা কয়েদিদের সম্পর্কে তথ্যনির্দেশিকা হিসেবে কারা কর্তৃপক্ষ ব্যবহার করতো। নির্জন কুঠুরিতে থাকার দায়ে দণ্ডিত অপরাধীদের ক্ষেত্রে তার অপরাধের চেয়েও অধিকতর বিবেচ্য হয়ে দাঁড়াল জেলখানায় করা তার আচরণ। একজন ব্যক্তি হিসেবে প্রত্যেক কয়েদির ভেতর সুপ্ত বিপদের সম্ভাবনা এবং তার প্রতিদিনকার আচরণে এই সুপ্ত বিপদের ঝলক যতটা পাওয়া যায়, তার উপর ভিত্তি করেই কারা কর্তৃপক্ষ ঠিক করতো কোন কয়েদির সাথে কেমন ব্যবহার করা হবে। জেলখানা এভাবেই জ্ঞানযন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

সংশোধনাগার সম্পর্কিত উপরোক্ত ফ্লেমিশ, বৃটিশ এবং মার্কিনী মডেলগুলোর তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে আইন সংস্কারকগণ কর্তৃক উত্থাপিত সংশোধনাগার এবং শাস্তির নানা প্রস্তাবনার ভেতরে যে কেউ কিছু সাদৃশ্য এবং বৈপরীত্যের দিক খুঁজে পাবেন।

সাদৃশ্যমূলক ক্ষেত্রসমূহ : শাস্তির আপাতঃ লক্ষ্য বিষয়ে ফ্লেমিশ, বৃটিশ এবং মার্কিনী মডেলগুলোর ভেতর সূচনায় হঠাৎই কেউ সামান্য বৈসাদৃশ্য লক্ষ্য করতে পারেন। তবে, অন্তর্নিহিত কিছু মিল কিন্তু রয়েছে। ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই এই ‘সংশোধনাগার’গুলো স্থাপন করা হয়েছিল। তবে, এই সংশোধনাগারগুলো অবশ্য অপরাধ চিরতরে ‘ধুয়েমুছে’ দেবার লক্ষ্যে স্থাপিত হয় নি। বরং তারা স্থাপিত হয়েছিল অপরাধের পুনরাবৃত্তি এড়াতে। ‘মানবীয় শাস্তির যা মূল কারণ সেই অপরাধকে শেষ করা সংশোধনাগারের লক্ষ্য ছিল না। অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত শুধু নয়, সংশোধনাগারের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল অপরাধীর আত্মাকে ন্যায়পথে পরিচালিত করা…’ (ব্ল্যাকস্টোন ১১)। পেনসিলভেনিয়াতে বাক্সটন ঘোষণা দেন যে মঁতেস্কু এবং বেক্কারিয়ার নীতিমালার উচিত ‘স্বতঃসিদ্ধের শক্তি’ অর্জন করা এবং ‘শাস্তির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অপরাধ আর হতে না দেওয়া’ (ব্র্যাডফোর্ড ৩)। সুতরাং, অপরাধ ধুয়ে-মুছে ফেলার জন্য শাস্তি নয়, বরং একজন অপরাধীকে মানুষ হিসেবে রূপান্তরিত করাটাই ছিল এধরনের সংশোধনাগারের লক্ষ্য। সে অপরাধী প্রকৃতই অপরাধী হোক বা নিছক অপরাধী হবার লক্ষণ তার ভেতর প্রকাশিত হোক, যাই হোক না কেন। শাস্তির উপাদানে অপরাধীকে চরিত্রগত ভাবে সংশোধনের কলাকৌশল থাকতে হবে। সংস্কারপন্থী আইন প্রণেতাদের সাথে রুশও এখানে একমত। নিছক প্রতীকী অর্থেই কি রুশ বলেন না: ‘আমরা শ্রমকে সহজ করার জন্য যন্ত্রপাতি আবিষ্কার করেছি। মানবসমাজের এক ক্ষতিকর অংশকে পুণ্য ও শান্তির পথে ফেরাতে সবচেয়ে গতিশীল ও কার্যকরী পদ্ধতি যারা আবিষ্কার করেন এবং পৃথিবী হতে মন্দের একটি অংশ যারা বিনাশ করেছেন’ সেই জেলখানার উদ্ভাবকদের কতটা প্রশংসাই না করা উচিত!১৩ সর্বোপরি, আইনবিদ ও তাত্ত্বিকদের প্রকল্পের মতো, সংশোধনাগারের ব্রিটিশ এবং মার্কিনী মডেলগুলোয় শাস্তিকে প্রাতিস্বিকী বা ব্যক্তিকীকরণের পদ্ধতি প্রয়োজন হয়। অপরাধীর ব্যক্তিচরিত্র এবং অন্যের জন্য যে পরিমাণ বিপদ সে বয়ে বেড়ায়, তার উপর ভিত্তি করেই শাস্তির মেয়াদ, প্রকৃতি, তীব্রতা এবং শাস্তি প্রদানের পন্থা নির্ধারিত হওয়া উচিত। ব্যক্তিচরিত্রের ভিন্নতা অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থাও নানা ধরনের হবে। সার্বিক রূপরেখার দিক হতে বিবেচনা করলে, আমস্টার্ডামের রাসফুইস মডেল দেখে উদ্বুদ্ধ হওয়া ফ্লেমিশ, বৃটিশ ও মার্কিনী এই নয়া সংশোধনাগারগুলোর মডেল আইনী সংস্কারকদের প্রস্তাবনা হতে খুব ভিন্নধর্মী কিছু ছিল না। প্রথম দৃষ্টিতে এমনও কারো মনে হতে পারে যে এই ফ্লেমিশ-বৃটিশ-মার্কিনী মডেলগুলো আমস্টার্ডামের রাসফুইসেরই একটি বিকশিত রূপ। কিম্বা, নিরেট প্রতিষ্ঠানগত মাত্রার দিক হতে দেখলে, এই ফ্লেমিশ-বৃটিশ-মার্কিনী সংশোধনাগারগুলো যেন রাসফুইসেরই স্কেচ বা খসড়া ছবি।

তবু, বেশ পরিষ্কারভাবেই অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে যখন এই প্রাতিস্বিকী বা ব্যক্তিকীকরণকৃত সংশোধনের কৌশলগুলো কেউ সংজ্ঞায়িত করতে পারে। পার্থক্য যা তা শুধুই ব্যক্তির কাছে পৌঁছনোর প্রক্রিয়ায়। কিম্বা, যে পন্থায় দণ্ডপ্রদান ক্ষমতা অপরাধীর নিয়ন্ত্রণ হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়, সেই পন্থায়ও পার্থক্য থাকতে পারে। অথবা, অপরাধীর রূপান্তরের জন্য যেসব যন্ত্রোপকরণ প্রয়োজন হয় সেসব যন্ত্রোপকরণের প্রশ্নেও এই ফ্লেমিশ-বৃটিশ-মার্কিনী মডেলগুলোর ভেতর পার্থক্য থাকতে পারে। শাস্তির তাত্ত্বিক ভিত্তি নয়, বরং শাস্তিতে ব্যবহৃত প্রযুক্তি বিষয়ে তাদের পারস্পরিক পার্থক্য ছিল। যে পদ্ধতিতে শাস্তি অপরাধীর দেহ ও আত্মার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে, সেই পদ্ধতি নিয়ে ফ্লেমিশ-বৃটিশ-মার্কিনী মডেলের পার্থক্য থাকলেও আইনী ব্যবস্থায় শাস্তি যেভাবে সন্নিহিত করা হয়, তা নিয়ে এই মডেলগুলোর মাঝে কোনো দ্বিমত ছিল না।

মোটামুটি এটাই ছিল সংস্কারপন্থীদের পদ্ধতি। প্রয়োগসীমার ঠিক কোন বিন্দুতে শাস্তি তার চাপ প্রয়োগ করতো এবং ব্যক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতো? প্রতিনিধিত্ব। ব্যক্তির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব, ব্যক্তির সুবিধা ও অসুবিধার প্রতিনিধিত্ব, আনন্দ ও নিরানন্দের প্রতিনিধিত্ব। এবং যদি শরীর দখলই শাস্তির উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে নির্যাতনের চেয়ে সামান্য কম যে কোনো শাস্তিই দেওয়া হয়ে থাকে মূলতঃ অপরাধী এবং শাস্তির দর্শকদের কাছে শাস্তিকে প্রতিনিধিত্বের বিষয় হিসেবে ফুটিয়ে তোলার লক্ষ্য থেকেই। ঠিক কোন ধরনের যন্ত্রোপকরণের সাহায্যে কেউ এই প্রতিনিধিত্বের কাজটি করতো? অন্যান্য নানা ধরনের প্রতিনিধিত্ব অথবা বিভিন্ন ধরনের ভাবনার সংযোজনের (যেমন, অপরাধ-শাস্তি, শাস্তির প্রয়োগে কল্পিত অপরাধ-অস্বাচ্ছন্দ্যের ধারণা) মাধ্যমে শাস্তির কাজটি সমাধা করা হতো। শুধুমাত্র প্রচারণার উপাদানেই এজাতীয় যুগলবন্দি ভাবনা কাজ করতে পারতো। সবার চোখে শাস্তির দৃশ্যগুলো তাদের প্রতিষ্ঠিত বা পুনরুৎপাদিত করতো। শাস্তির এই তত্ত্ব প্রচারিত হতো এবং প্রতিমুহূর্তে চিহ্নের জটিলতার বৈধতা ফিরিয়ে আনতো। শাস্তির ক্ষেত্রে অপরাধীর ভূমিকা ছিল অপরাধ ও অপরাধ আইনের মুখে দ্যোতিতের সত্যিকারের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করা। অপরাধ আইনের নিয়মানুসারে শাস্তিকে অবশ্যই সঙ্ঘটিত অপরাধের সাথে অমোঘভাবে সংযুক্ত হতে হবে। এই দ্যোতিত অর্থকে পর্যাপ্ত এবং প্রত্যক্ষভাবে উৎপাদন করার মাধ্যমে, এবং অপরাধ আইনের দ্যোতক ব্যবস্থাকে পুনরায় কার্যকরী করার মাধ্যমে এবং শাস্তির চিহ্ন হিসেবে অপরাধের ধারণাকে কাজ করতে দেবার মাধ্যমে অপরাধী সমাজের প্রতি তার দেনা পরিশোধ করে। এভাবেই, অপরাধীর ব্যক্তিগত সংশোধন ব্যক্তিকে আইনের বিষয় হিসেবে পুনরায় সংজ্ঞায়িত করার প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত করে। চিহ্ন ও প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থার পুনরুৎপাদনের মাধ্যমে এই নিশ্চিত করার কাজটি সম্পন্ন হয়। সংশোধনমূলক শাস্তির যন্ত্রোপকরণ সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে। শাস্তির প্রয়োগবিন্দু এখানে প্রতিনিধিত্ব নয়। বরং অপরাধীর দেহ, সময়, প্রতিদিনের ভাবভঙ্গী এবং কাজকর্মই শাস্তি প্রয়োগের লক্ষ্য। অপরাধীর আত্মার সংশোধনও অবশ্য গুরুত্বপূর্ণ আর একটি লক্ষ্য। তবে, অপরাধীর আত্মা ঠিক যতটা পরিমাণ নানা মন্দ অভ্যাসের আস্তানা, আত্মাকে ঠিক ততদূর পরিমাণ সাফসুতরো করাই শাস্তির লক্ষ্য। আচরণের নীতি হিসেবে, অপরাধীর দেহ ও আত্মা সেই উপকরণ গঠন করে যা শাস্তিমূলক হস্তক্ষেপের জন্য প্রস্তাব করা হয়। ব্যক্তিকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহারের অধীত বিদ্যার উপর শাস্তিমূলক হস্তক্ষেপ প্রতিনিধিত্বের শিল্পের চেয়ে অনেক বেশি নির্ভর করে বা নির্ভর করতে হয়: ‘নৈতিক এবং শারিরীক প্রভাব খাটানোর দ্বারা প্রতিটি অপরাধেরই যে নিরাময় সম্ভব, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই।’ সুতরাং, শাস্তি বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির যা থাকতে হবে তা হলো ‘সংবেদনের নীতিমালা সম্পর্কে কিছু জ্ঞান এবং স্নায়ুতন্ত্রে যে সংবেদগুলো ধরা পড়ে সে সম্পর্কেও জানা থাকা’ (রুশ, ১৩)। এবং এই শাস্তিতে যেসব যন্ত্রোপকরণ ব্যবহৃত হয়, তা আর বারম্বার পুনরুৎপাদিত ও প্রচারিত প্রতিনিধিত্বের জটিলতা নয়। বরং জোর প্রয়োগের নানা আঙ্গিক, বিভিন্ন বাধানিষেধের ছক ব্যবহৃত ও পুনরাবৃত্ত হওয়া। অপরাধীর শরীরে কলঙ্কদাগ দেওয়া নয়, বরং তাকে দিয়ে সদাচারের অনুশীলন করিয়ে নেওয়াটা এই নয়া জমানার শাস্তির লক্ষ্য। সময় তালিকা মেনে চলা, কয়েদিদের জেলখানার ভেতর বাধ্যতামূলক চলাফেরা, নিয়মিত কাজকর্ম, নির্জনতায় ধ্যান করা, সবাই মিলে কাজ করা, নৈঃশব্দ, শ্রদ্ধা, ভাল অভ্যাস প্রভৃতি। এবং শেষপর্যন্ত এই যে নানা কৌশলের মাধ্যমে অপরাধীকে সংশোধন করা হয়, সেই অপরাধী আর সামাজিক চুক্তির মৌলিক স্বার্থের নিকট বন্দি এবং বিচারপ্রক্রিয়ার অধীনস্থ কোনো ব্যক্তি থাকে না। বরং অপরাধীর চারপাশে তাকেই কেন্দ্র করে এবং তার উপর যে বিভিন্ন অভ্যাস, নিয়মকানুন, আদেশ এবং কর্তৃত্ব অনুশীলন করা হয় সেসবেরই সে অধীনস্থ হয়ে ওঠে। একসময় সে স্বয়ংক্রিয় ভাবে নিজের ভেতরেই এই যাবতীয় অভ্যাস, নিয়মকানুন, আদেশ এবং কর্তৃত্ব সক্রিয় হতে দেয়। সুতরাং, অপরাধ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার সম্পূর্ণ ভিন্ন দু’টো পন্থা আছে। হয় সামাজিক চুক্তির আওতায় আইনের অধীনস্থ ব্যক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। অথবা, ক্ষমতার সাধারণ ও বিস্তারিত আঙ্গিক অনুযায়ী ব্যক্তিকে অনুগত নাগরিক হিসেবে গঠন করতে হবে।

wal-st-j-2.jpg
ওয়ালনাট স্ট্রীট জেলখানা

এসবকিছুই অনুমানমূলক পার্থক্যের চেয়ে বেশি কিছু দাঁড়াবে না। কারণ, যদি না দমনমূলক শাস্তি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল বয়ে না আনে, তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাধ্য বা অনুগত ব্যক্তি তৈরির প্রশ্নটিই দেখা দেয়। একটি পরিপূর্ণ সময়-তালিকা অনুসারে অপরাধীকে আচরণ বা ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ, সুঅভ্যাস অর্জন, শরীরের নিয়ন্ত্রণ প্রভৃতি বিষয় যার শরীর নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং যে ব্যক্তি এই নিয়ন্ত্রণ করার কাজটি করে, তাদের উভয়ের মাঝে একটি বিশেষ সম্পর্ক নিদেশ করে। এই সম্পর্ক শুধুই শাস্তির জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীকে শুধুই নিরর্থক করে তোলে না, বরং প্রদর্শনীর বিষয়টি পুরোপুরি বাদ দেয়।১৪ শাস্তি প্রদানকারীকে অবশ্যই পরিপূর্ণ ক্ষমতা চর্চা করতে হবে, যেন কোনো তৃতীয় পক্ষ এখানে হাত বাড়াতে না পারে। যে অপরাধীকে সংশোধন করা হবে, তার উপর চর্চিত ক্ষমতার আচ্ছাদনে তাকে একদম ঢেকে ফেলতে হবে। অন্ততঃপক্ষে শাস্তির এই প্রকৌশলের প্রতি সম্পর্কের দিক হতে বিবেচনা করলে বলা যায় যে গোপনীয়তা অনুজ্ঞামূলক। একইভাবে স্বায়ত্ত্বশাসন। তার থাকতে হবে নিজস্ব সক্রিয়তা, নিজস্ব নিয়মকানুন, কলাকৌশল ও জ্ঞান। শাস্তির এই কলাকৌশলের নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে নিজস্ব প্রথা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাম্য ফলাফল সম্পর্কেও। যে আইনী ক্ষমতা অপরাধ ঘোষণা করে এবং শাস্তির সাধারণ সীমানাগুলো নির্দিষ্ট করে, তার সাথে শাস্তির সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোথাও যেন ধারাবাহিকতায় একটি বিচ্ছেদ বা একটি সুনির্দিষ্ট পার্থক্য রয়েছে। এভাবেই, শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার চর্চায় প্রধান যে দুই প্রতিক্রিয়া বা ফলাফল দেখতে পাওয়া যায় তা হলো গোপনীয়তা এবং স্বাধিকার। তবে, তাত্ত্বিক দিক হতে এই দুই ফলাফল অগ্রহণযোগ্য। শাস্তির নীতির রয়েছে অবশ্য দুটো লক্ষ্য। প্রথমত, সমাজের শত্রু (অপরাধী)-র শাস্তিতে সব নাগরিকের অংশগ্রহণ। দ্বিতীয়ত, শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার চর্চাকে আইনের প্রতি পর্যাপ্ত এবং স্বচ্ছ করে তোলা যা জনগণের কাছে শাস্তিকে সংজ্ঞায়িত করে। গোপন শাস্তি এবং আইনী বিধিমালায় নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি এমন সব শাস্তি, নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যায় এমন যত যন্ত্রোপকরণ এবং শর্তের ছায়ায় চর্চিত শাস্তিপ্রদানকারী ক্ষমতা সংস্কারের গোটা কৌশলের সাথে আপোষ করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। বিচারের রায় ঘোষণার পর, পুরনো ব্যবস্থায় চর্চিত ক্ষমতাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এক ধরনের ক্ষমতার চর্চা করা হতো। নয়া জমানার যে ক্ষমতা আজ শাস্তি প্রয়োগ করছে, তা অতীতের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ক্ষমতার মতোই স্বেচ্ছাচারী এবং স্বৈরাচারী হবার হুমকি দেয়।

সংক্ষেপে, মতদ্বৈধতা ছিল মোটামুটি এমন: শাস্তিমূলক নগরী অথবা দমনমূলক প্রতিষ্ঠান? একদিকে শাস্তিমূলক ক্ষমতার সক্রিয়তা যা কিনা সামাজিক পরিসরের মাধ্যমে বণ্টিত হয় এবং সর্বত্রই দৃশ্য, প্রদর্শনী, চিহ্ন, তত্ত্ব হিসেবে উপস্থিত। এই সক্রিয়তা একটি খোলা বইয়ের মতো সহজপাঠ্য এবং নাগরিকদের মনের চিরস্থায়ী পুনরায় বিধিবদ্ধকরণের মাধ্যমে কাজ করে। যা নাগরিকদের মনে অপরাধ করার ইচ্ছা জাগ্রত হলেই তার বিরুদ্ধে একগাদা বিধিনিষেধ সৃষ্টি করার মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল করে। সার্ভান একেই বলেন ‘মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম যত তন্তুতে’ অদৃশ্য এবং অর্থহীনভাবে কাজ করা। শাস্তিপ্রদান ক্ষমতা সামাজিক নেটওয়ার্ককে পূর্ণদৈর্ঘ্যে চালিয়েছে। এবং সামাজিক নেটওয়ার্কের প্রতিটি বিন্দুতে এই ক্ষমতা কাজ করবে। এবং অন্তিমে শাস্তিপ্রদান ক্ষমতা কিছু মানুষের উপর অন্য কিছু মানুষের ক্ষমতা চর্চা হিসেবে বিবেচিত হবে না। বরং ব্যক্তির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে, শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার নিবিড় বা ঘনবিন্যস্ত (compact) সক্রিয়তা হলো অভিযুক্তের শরীর এবং সময়ের দায়িত্ব বিষয়ক পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুমান, কর্তৃত্ব এবং জ্ঞানের ব্যবস্থার মাধ্যমে অভিযুক্তের চলাফেরা এবং আচরণের নিয়ন্ত্রণ, অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত ভাবে পুনরুদ্ধার করার জন্য তাদের প্রতি প্রয়োগকৃত সমন্বিত অস্থিবিদ্যা, ক্ষমতার সায়ত্ত্বশাসিত প্রশাসন যা কঠোর অর্থে সমাজদেহ এবং বিচারগত ক্ষমতা হতে বিচ্ছিন্ন। জেলখানার আবির্ভাব শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণকে চিহ্নিত করে। অথবা, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, শাস্তিপ্রদান ক্ষমতা কি ‘শাস্তিমূলক নগরী’তে (আঠারো শতকে কৌশলগত লক্ষ্য গ্রহণের সাথে সাথে জনপ্রিয় বেআইনী কাজকর্ম যেমন হ্রাস পেয়েছিল) নিজেকে একটি বৃহৎ সামাজিক সক্রিয়তার আড়ালে লুকিয়ে আরো বেশি কর্মক্ষম হবে? অথবা, শাস্তিপ্রদান ক্ষমতা একটি দমনমূলক প্রতিষ্ঠানে নিজেকে বিনিয়োগ করে, সংশোধনাগারের চারদিকে আবদ্ধ পরিসরে বেশি কার্যকরী হবে?

যে কোন ক্ষেত্রেই এটি বলা যেতে পারে যে আঠারো শতকের শেষভাগে শাস্তিপ্রদান ক্ষমতাকে সংগঠিত করতে গিয়ে একজন তিনটি পন্থার মুখোমুখি হতেন। প্রথম পন্থাটি ছিল পুরনো রাজকীয় আইনের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং তখনো পর্যন্ত সক্রিয়। অন্য দুটো পন্থা নিবর্তনমূলক, উপযোগবাদী এবং সংশোধনমূলক শাস্তির ধারণার প্রতি নির্দেশ করতো যা সামগ্রিকভাবে সমাজের আওতাধীন। তবে, এই তিন পন্থা শাস্তি প্রদানের কৌশল নির্ধারণের প্রশ্নে একে অপরের থেকে বেশ আলাদা ছিল। ঢালাওভাবে বললে, রাজকীয় আইনের আওতায়, শাস্তি হলো সার্বভৌম সম্রাটের উৎসব। রাজকীয় আইনে শাস্তি প্রতিহিংসার উৎসবমূলক চিহ্ন অভিযুক্ত ব্যক্তির শরীরে লেপন করে। একই সাথে তা দর্শকদের চোখের সামনে এমন এক আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করে যা যেমন তীব্র তেমন ধারাবাহিকতাহীন, অনিয়মিত এবং সর্বোপরি আইনের উর্ধ্বে। সম্রাট ও তাঁর ক্ষমতার শারিরীক উপস্থিতিই রাজকীয় আইনের আওতায় শাস্তির মুখ্য প্রতিপাদ্য। অন্যদিকে সংস্কারপন্থী আইনবেত্তাগণ শাস্তিকে দেখতেন অপরাধীকে অনুগত প্রজা বিশেষতঃ বিচারব্যবস্থার অনুগত প্রজা হিসেবে পুনরায় উপযুক্ত করে তোলার প্রক্রিয়া হিসেবে। সংস্কারপন্থীদের আইনে শাস্তি চিহ্ন নয়, বরং প্রতীক ব্যবহার করে। ব্যবহার করে প্রতিনিধিত্বের বিধিবদ্ধ শ্রেণী যাকে সবচেয়ে দ্রুত প্রচার দেওয়া হবে। দেওয়া হবে শাস্তি দৃশ্যের প্রত্যক্ষদর্শী নাগরিকদের দ্বারা যতটা সম্ভব ঢালাও অনুমোদন। তৃতীয়ত, সেসময়কার যে প্রকল্পের আওতায় জেলখানা একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিকাশ লাভ করছিল, সেই প্রকল্পের আওতায়ই শাস্তিকে দেখা হতো ব্যক্তির উপর জোর খাটানোর একটি পদ্ধতি হিসেবে। শরীরকে প্রশিক্ষিত করবার পদ্ধতিগুলো প্রয়োগ হতো শাস্তির মাধ্যমে। অপরাধীর শরীরে কোনো কলঙ্কদাগ লেপন নয়, বরং শাস্তি হবে এমন যা অপরাধীর অভ্যাস এবং ব্যবহারে চিহ্ন হিসেবে রয়ে যাবে। সংস্কারপন্থীদের মতবাদ সুষ্ঠুভাবে শাস্তি পরিচালনার জন্য একটি বিশেষ ক্ষমতা গঠনের প্রস্তাবনা দিয়েছিল। সুতরাং, আমাদের রয়েছে সার্বভৌম সম্রাট এবং তাঁর ক্ষমতা, সমাজদেহ এবং এর প্রশাসনিক যন্ত্রকৌশল, চিহ্ন, প্রতীক, দাগ; উৎসব, প্রতিনিধিত্ব, অনুশীলন, পরাভূত শত্রু, বিচারব্যবস্থার আওতাধীন প্রজাকে পুনরায় সুনাগরিক করে তুলবার প্রক্রিয়া, প্রত্যক্ষ জবরদস্তির আওতাধীন ব্যক্তি, অপরাধীর নির্যাতিত শরীর, প্রতিনিধিত্বের স্বার্থে ব্যবহৃত তার আত্মা, প্রশিক্ষণের আওতাধীন শরীর। আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে উপরোক্ত তিনটি কৃৎকৌশলকে সূচীত করে এমন পরস্পর মুখোমুখি তিনটি সারির উপকরণ আমরা দেখতে পাচ্ছি। তাদের আইনের তত্ত্বের মাপে আঁটা যায় না (যদিও আইনের তত্ত্বের সাথে তারা মাঝে মাঝে মিলে যায়)। না তাদের বিভিন্ন আইনী যন্ত্রোপকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের সাথে শণাক্ত করা যায় (যদিও ইত্যকার উপকরণ এবং প্রতিষ্ঠানের উপর ভিত্তি করেই তারা প্রতিষ্ঠিত)। না তাদের নৈতিক পছন্দ হতে পাওয়া যায় (যদিও তারা শেষমেশ তাদের ন্যায্যতা খোঁজে নৈতিকতাতেই)। ক্ষমতার তিনটি ক্রিয়াপদ্ধতির উপর ভিত্তি করে শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার চর্চা হয়ে থাকে।

তাহলে সমস্যাটি দাঁড়াচ্ছে নিম্নোক্ত: শেষমেশ কীভাবে ক্ষমতার তৃতীয় পন্থাটিই গৃহীত হলো? কীভাবে শাস্তিপ্রদান ক্ষমতার দমনমূলক, দৈহিক শাস্তিমূলক, নির্জন ও গোপন মডেলটি প্রতিনিধিত্বমূলক, দৃশ্যমূলক, দ্যোতক, প্রকাশ্য এবং সমষ্টিগত মডেলকে হারিয়ে দিল? কীভাবে শাস্তির শারীরিক চর্চা (যা নির্যাতন নয়) তার প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যম জেলখানার সাহায্যে শাস্তির সামাজিক নাটকের চিহ্নের স্থলাভিষিক্ত হলো? স্থলাভিষিক্ত হলো শাস্তি প্রচারের অতি দীর্ঘায়িত শাস্তির উৎসবের?

(খণ্ড ২, ২য় অধ্যায় শেষ, চলবে)

তথ্যনির্দেশ

১০. এই খ্রিষ্টীয় বন্ধুসভাও আমস্টার্ডামের রাসফুই এবং স্পিনহুই সমূহ চিনত। দ্রষ্টব্য, সেল্লিন ১০৯-১০ পৃষ্ঠা। যেকোনো ক্ষেত্রেই ওয়ালনাট স্ট্রিট প্রিজন ছিল ১৭৬৭ সালে উদ্বোধন হওয়া ভিক্ষাগৃহ এবং বৃটিশ প্রশাসনের উপস্থিতি সত্ত্বেও খ্রিষ্টীয় বন্ধুসভা শাস্তি বিষয়ক যেমন আইন প্রবর্তন করতে চেয়েছিল তার একটি ধারাবাহিকতা।

১১. এই আইনের ফলে কিছু বিশৃঙ্খলা দেখা যায় যা রুশ, ৫-৯ পৃষ্ঠায় এবং ভোক্স ৪৫ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছেন। জে, এল, সিয়েগেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে শাস্তিগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা করা হবে না। কয়েদিদের জেলখানায় আনা হবে রাতের অন্ধকারে। জেলখানার রক্ষীরা কয়েদিদের পরিচয় প্রকাশ না করার শপথ নেবে এবং বাইরের কাউকে কারাগার প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হবে না। (সেল্লিন, ২৭-৮)। উল্লেখ্য যে সিয়েগেলের এই প্রতিবেদন আমস্টার্ডামের রাসফুইস সংশোধনাগারকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল।

১২. বি.রুশ এই কারাপরিদর্শকদের একজন, ওয়ালনাট সড়কের সংশোধনাগার পরিদর্শনের পর বলেন: ‘নৈতিক যতœ: ধর্মোপদেশ প্রচার, উত্তম বই পাঠ, কাপড়চোপর এবং কক্ষের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাথরুমের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এই কারাগারে লক্ষ্য করা গেছে। কেউ উঁচু গলায় কথা বলে না। যতটা সম্ভব অল্প পরিমাণে মদ ও তামাকু গ্রহণ চলে। অল্প অশ্লীল কথাবার্তা। সারাক্ষণই কাজকর্ম চলে। উদ্যানগুলোর যত্ন বা পরিচর্যা নেওয়া হয়। বাগানগুলো সত্যিই সুন্দর। বারোশ’ বাঁধাকপির ফলন ফলেছে দেখলাম। (তিতার্স ১৯৩৫, ৫০)।

১৩. রুশ, ১৪। মানব সত্তার রূপান্তরের এই কৃৎকৌশল চিন্তা হ্যানওয়ে প্রস্তাবিত সংশোধনাগারেও পাওয়া যায়। ‘হাসপাতাল ও মন্দত্বের ধারণা পাশাপাশি খাপ খায় না। আসুন, তবু আমরা জেলখানাকে আর দশটি অপরাধের আখড়ার পরিবর্তে একটি বৈধ এবং কার্যক্ষম সংশোধনাগার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চালাই।’ (হ্যানওয়ে, ৫২)।

১৪. দ্রষ্টব্য, দ্যুফ্রিশ দ্যু ভালাজের কল্পনায় শাস্তির যে জাঁকালো প্রদর্শনীর কথা ভাবা হয়েছে, রুশ তার কঠোর সমালোচনা করেন।

a_falgun@yahoo.com


2 Responses

  1. সেলিনা শিরীন শিকদার says:

    এমন একটি কাজে ব্রতী হবার জন্য আপনাকে অভিবাদন অদিতি। অনেক ভাল লাগা জানাই। একটা ছোট্ট অনুরোধ, তথ্য নির্দেশ আরেকটু বড় ফন্ট দেয়া যায় না?

    সেলিনা শিরীন শিকদার

  2. কামরুল says:

    অনুবাদগুলোর ডাউনলোড লিংক দেয়ার অনুরোধ রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.