সাক্ষাৎকার

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেবার যদি এই সরকার হেরে যেত তাহলে কিন্তু দেশটা মৌলবাদী দেশে পরিণত হতো

রাজু আলাউদ্দিন | 3 Dec , 2018  


নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আমাদের চিরকালের গৌরব, তিনি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছিলেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছিলেন আমাদের জন্য অমূল্য উপহার হাতে নিয়ে: আমাদের কাঙ্ক্ষিত সবুজ ও লালের এক অমর স্বাধীনতা। তিনি যদি জীবনে আর কিছুই না করতেন, তারপরেও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের আছে আরেকটি দিক যেটি শিল্পিত স্বভাবে বর্ণময়। তিনি অামাদের নাট্যজগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন। নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশিত/পরিচালিত নাটক মানেই মঞ্চসাফল্যে তুঙ্গস্পর্শী। সফল তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও। নাটক ও চলচ্চিত্রে অসামান্য সাফল্যের জন্য তিনি অসংখ্যবার পুরস্কৃত হয়েছেন। যিনি আমাদের সবার অহংকার, কিন্তু নিজে পুরোপুরি নিরহংকারী স্বভাবের। এ বছরের মার্চে তার সাথে দীর্ঘ এক আলাপচারিতা হয় বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর অফিসে। যুদ্ধকালীন লোমহর্ষক নানান অভিজ্ঞতা আর তার নাট্যকলা নিয়ে শৈল্পিক বয়ান এই আলাপচারিতার মূল আকর্ষণ। বাচ্চু ভাইয়ের অননুকরণীয় বাচনভঙ্গি আর কথার তরঙ্গায়িত প্রবাহ দীর্ঘ আলাপচারিতাকে করে তুলেছে শ্রুতিসুভগ। দীর্ঘ সেই আলাপচারিতার প্রথম প্রর্বটি প্রকাশিত হয়েছিল ২৭ মার্চ। তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদের শ্রুতিলিখনে থাকছে সেই আলাপচারিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠের দ্বিতীয় পর্ব। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: আপনার নাটকের জায়গায় ফিরে আসি। আপনি বলছিলেন যে,স্বাধীনতার পরপর আপনি নাটকে যুক্ত হলেন সেলিম আল দীনের সঙ্গে। তখন আপনারা করছেন ইউরোপীয় ধাঁচের অ্যাবস্ট্রাক্ট নাটক। এবং ধীরে ধীরে ওই জায়গা থেকে বাঙালি, দেশজতা, এইখানকার সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির জায়গাটা আবিষ্কার করতে শুরু করলেন। এটা করতে করতে নাটকের এমন একটা জায়গায় আপনারা পৌঁছে গেলেন, বিশেষ করে সেলিম আল দীনের রচনা, আপনার নির্দেশনার ফলে এখন আমরা দেখছি নাটকের মৌলিক এবং সমৃদ্ধ একটি ধারা গড়ে উঠেছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আলাদা একটি জনরা।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, আলাদা একটি জনরা তো অবশ্যই। এবং সম্ভবত আপনি পশ্চিমবঙ্গের নাটকের সঙ্গে বাংলাদেশের নাটকের তুলনা করতে গিয়ে কোথাও একবার বলেছিলেন, ওরা অনেক বেশি কলোনিয়াল থিয়েটার করছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: না, এটা আমাদের এখানেও আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: তো খুব অল্প সময়ের মধ্যে আপনি এই জায়গাটায় পৌঁছলেন কীভাবে?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এতে আসলে সেলিম আল দীনের বড় অবদান। এই যে দুইটা তিনটা নাটক করার পর আমরা খুব জনপ্রিয় হলাম। ‘সংবাদ কার্টুন, বিদায় মোনালিসা’। অনেক লোক আমাদের নাটক দেখল। আমাদের নাম ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু সেলিম আর আমি বসে বসে ভাবছিলাম, আমি তো মুক্তিযুদ্ধ-ফেরা লোক। আমি একাত্তর সালে গ্রামে গেছি। গ্রামের লোকজনের সাথে মিশেছি। বাধা দেয়ার কেউ ছিল না। নিয়ন্ত্রণ করার কেউ ছিল না। জেলেদের সাথে রাত কাটিয়েছি। নৌকায় এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় গেছি। এই মানুষগুলোকে আমি দেখে ফেলেছি। তখন দেখেছি, যুদ্ধের মধ্যেও তারা গান গাচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যেও এন্টারটেইনমেন্টের জন্য মা তার সন্তানকে ঘুম পাড়ানি গান শোনাচ্ছে। আদর করছে। বিয়ের সময় প্রেম হয়েছে। বিয়েও হয়েছে। হয়ত আনন্দ-উচ্ছ্বাসটা ছিল না। কিন্তু একটি আয়োজনে সংস্কৃতি যতটুকু দাবি রাখে তার সবই হয়েছিল। এটা অস্বীকার করা যাবে না। তো আমার নিজের মনে হয়েছে, আমি গ্রামের মানুষ হিসেবে গ্রামের যে কাজগুলো দেখেছি, ছোটবেলায় বহুরূপী হয়ে চৈত্রসংক্রান্তিতে দেখতাম, সেইগুলোর কথা মনে ছিল। কিন্তু অতটা সচেতন ছিলাম না। সেলিমের অনেক অভিজ্ঞাতা। কারণ সেলিম তার বাবার সাথে ১৫/১৬ বছর ঘুরে বেড়িয়েছে সারা বাংলাদেশে। প্রায় বিশটার মতো জেলায় সে স্কুলে পড়েছে। ছয়মাস তিনমাস করে। তার বাবা কাস্টমস-এ ছিলেন। এই জন্য ঘুরে বেড়িয়েছে। তো সেইখানে সে নানা রকম ফর্মের সাথে পরিচিত হয়েছে। এবং সেগুলি তাকে খুব প্রভাবিত করেছে। আমি যে খুব দেখেছি তখন, তা না। আমি বেশ কিছুদিন যাত্রা দেখেছি, পালা দেখেছি, চৈত্রসংক্রান্তিতে কিছু কিছু নৃত্য দেখেছি। পুঁথিপাঠ দেখেছি। আমার জ্যাঠা হাসান হোসেনের পুঁথি পাঠ করতেন, রেহালে রেখে, মহররমে। মহররমের দিন সব গ্রামের লোক আসত পুটলি পাটলি নিয়ে, উনি সুন্দর করে সুর করে গান করতেন। আর পাঠ করতেন কবিতার মতো করে, গল্পর মতো করে। সব লোক কানত আবার হাসত।
রাজু আলাউদ্দিন: মীর মশাররফের বিষাদ সিন্ধুর মতো…
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ওই রকমই। তবে এটা হচ্ছে গ্রামের পুঁথি। সেলিম একদিন বলল যে-কাজগুলি আমরা করছি এগুলি তো আমাদের না। বিষয় লিখছি আমি, তুইও করছিস, কিন্তু এটা তো আমাদের থিয়েটার না। ইন্ডিয়ান হাই কমিশনে ওদের একটা লাইব্রেরি ছিল। ওটা ছিল বঙ্গবন্ধু এভিনিউ-এ। আর আমেরিকারটা ছিল পল্টনে। এই লাইব্রেরিতে ঢুকে তখন আমরা যে বইগুলি পড়া শুরু করলাম, দেখলাম ওদের কাঠামোর সাথে আমাদের বেশিরভাগ নাট্যকাঠামোর মিল আছে, চলমান নাটকগুলোর। প্রশ্ন আসল আমাদের নিজেদের কি কিছু ছিল না! এরমধ্যে সেলিম হঠাৎ করে ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’ শুরু করল। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’টা একটা টার্নিং পয়েন্ট। ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’তে অনেক গান। আর পুরো জিনিসগুলি পয়ারের ছন্দে বাঁধা। এবং অন্তমিল ছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে অনুপ্রাস?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: অনুপ্রাস। তো তখন আমরা নিজেরা এটা করা শুরু করলাম। কিন্তু আমরা কিছুই জানি না। আমাদের ভাণ্ডারে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এই ফর্মটা কী হতে পারে! আমি তখন ওয়েস্টার্ন কিছু ফিল্মও দেখে ফেলেছি। তখন মনে হলো ওই রকম কিছু করা যায় কি না। আমি তখন পালা সম্পর্কে অতকিছু জানি না। সেলিম আমাকে বলে, কর, কিন্তু আমি তোর সাথে একমত না। তুই করতে পারিস। কিন্তু আমি যেটা করেছিলাম, ফোক সুরটাকে আশ্রয় করেছিলাম পুরো প্রযোজনার জন্য। আর নাচের মধ্যে আমি একতাল এবং তিনতালের দিকে ধাবিত হয়েছি। শিমুল যেহেতু ভালো গান করত, শিমুলকে দিয়ে গানের অংশগুলো করাতাম। তারপরে সুজা বলে একজন ছিল, আসাদ ছিল, পীযুষ ছিল। ওই নাটক দিয়ে বড় বড় এ্যাক্টররা এলো। এবং এই নাটকটা–মুনতাসির ফ্যান্টাসি:মিউজিক্যাল কমেডি– এই নামে অবিশ্বাস্য সাড়া জাগাল। বিশ্বাস করা যায় না। শত শত মানুষ বেইলী রোডে দাঁড়িয়ে থাকল টিকেটের জন্য। একটা শো শেষ করে আরেকটা শো করতে হয়েছে, একই দিনে। নতুন একটা শিল্প-আঙ্গিকও বাঙালি সন্ধান করল।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’ বেরোনোর পরে এটা একটা বিরাট জাম্প। আবার এইখান থেকে আরেকটা জাম্প হলো..

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তদ্দিনে আমি আবার কয়েকটা দিন গ্রামে ঘুরে এসেছি। পালা গান দেখেছি। দেখলাম একজন দুইজন গান গায় আবার ফ্যাটা মারে–এইখান থেকে ঘটনাটা বোঝার চেষ্টা করলাম। ফিরে এসে আমি `চরকাটা’ ডকুমেন্ট পুরাটা ওই আঙ্গিকে করলাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার একটা জিনিস মনে হয়। আপনার সঙ্গে সেলিম আল দীনের যে শৈল্পিক সম্পর্ক, এটা এইভাবে বলা যায় যে, একজন শুধু তত্ত্বটা আবিষ্কার করলেন। আরেকজন সেই তত্ত্বটা প্রয়োগ করে দেখালেন যে এই তত্ত্বটা বাস্তব রূপ দেয়া সম্ভব। উনি ছিলেন তাত্ত্বিক আর আপনি ছিলেন এর প্রয়োগকারী। এটা এইভাবে বলা যায়–মার্কস যদি তত্ত্বটা দিয়ে থাকেন তাহলে লেলিন এটার প্রথম প্রয়োগ ঘটিয়ে দেখালেন যে একটি রাষ্ট্রও তৈরি করা সম্ভব এরকমভাবে।

“অসংখ্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে কিন্তু তার কাঠামো খুব দুর্বল”

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আপনি ভালো কথা বলেছেন। তবে আমি মনে করি এই তুলনাটা সঠিক না। এই যে ‘চরকাটা’র পরে কিন্তু আমরা ‘শকুন্তলা’য় আসলাম। আমরা কিন্তু তখনো পৌঁছাই নাই এখন যে জায়গায় বাংলা নাটক আছে। আমরা বলছি যে, জাতীয় নাট্য-আঙ্গিক নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় নাট্য-আঙ্গিকের মধ্যদিয়ে বাংলা নাটককে নতুন অভিব্যক্তি দেয়ার জন্য আমরা আন্দোলনটা করছি। নাট্য-আন্দোলন। কিন্তু তখনো আমরা সেই জায়গায় পৌঁছাইনি। আমরা ‘শকুন্তলা’য় কিন্তু খুবই ক্লাসিক্যাল, ধ্রুপদী একটি ভাষা ব্যবহারের মধ্যদিয়ে গেছি। ‘চিতার গনগনে আগুন ফুঁড়ে বেড়ে ওঠে চিরন্তন বট, মানুষের চর্বি ও চুলে..’ এটা শুনে কয়টা লোক বুঝছে! লোকে হা করে তাকিয়ে থেকেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটার ল্যাঙ্গুয়েজ ক্ল্যাসিক্যাল।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: একেবারে ক্ল্যাসিক্যাল। ছন্দোবদ্ধ। এইভাবে ‘শকুন্তলা’ করলাম। শকুন্তলা চ্যালেঞ্জ করল কালিদাসকে। শকুন্তলার মৃত্যু হয়েছে। ওর দশমন্তের সাথে দেখাই হতে পারে না। স্বর্গ এবং মর্ত্যের ষড়যন্ত্রে তার জন্ম। ফুল অব কন্ট্রাডিকশন শকুন্তলা। সেলিম বলছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এসে বললেন, ওরে বাবা! সেলিম আল দীন তো মহাঝামেলা শুরু করে দিল। আমার মনে আছে, সুনীলদা এসে নাটকটা দেখেছিলেন। স্ক্রিপ্টও নিয়ে গেছিলেন। খুব একটা একমত হতে পারেন নাই। সেটা ওনার ব্যাপার। কিন্তু বুঝেছিলেন যে এটা একটা নতুন ধারা শুরু হচ্ছে। এটা বলেওছে। তার একটা লেখায়ও আছে। সাতাত্তর আটাত্তর সালের পরে আমি আর সেলিম খুব গ্রামে যাওয়া শুরু করলাম। দেখার জন্য, বোঝার জন্য। আমাদের দেশের মানুষ প্রতি সন্ধ্যায় যেভাবে এন্টারটেন হয়, সেই মাধ্যমটা কী? সেই মাধ্যমটা হলো গীতল। গল্প বলার প্রবণতা আছে। গীতলতা আর হলো গল্প। এরসাথে নৃত্য যোগ হয়েছে। ওইটাকে যে পাঁচালি বলে তখন আমি বুঝি নাই। অনেক পরে রবীন্দ্রনাথ পাঠ করতে গিয়ে পাঁচালী সম্পর্কে ভালোভাবে জানলাম। রবীন্দ্রনাথ পাঁচালীর খুব ভক্ত ছিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এই জন্য শেষের দিকে এসে উনি বলতেন না যে নাটক লিখেছি। উনি বলতেন পালা লিখেছি।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ১৯৭৯-৮০-৮১ এই তিনটে বছর আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেলিম বলল, বাচ্চু, পালা অথবা যাত্রা যদি তুই ঘেঁটে দেখিস, এরপর বড়ু চণ্ডীদাশের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন যদি পড়ে দেখিস, তাহলে বুঝবি এটা হলো আমাদের থিয়েটার। এটা অনির্বাণ আর চৈতন্যদেবকে বাদ দিয়ে তো বাংলা থিয়েটার হয় না। তাহলে চৈতন্যদেবের থিয়েটারটা কোথায়! প্রশ্ন করা শুরু করল। ওদিকে ওয়েস্টার্ন থিয়েটার নিয়ে আমাদের বন্ধুরা নাটক করছিল, ঢাকারই। খুব ভালো করছিল তারা। তারা বলল যে এগুলো তো প্রাক্তন। চলে গেছে। এগুলো নিয়ে তোমরা আবার কথা বলছ কেন! আমরা তখন বললাম, একটা স্বাধীন দেশের কি স্বাধীন শিল্পরীতি থাকবে না! তার নিজস্ব শিল্পরীতি, যেটা সম্পূর্ণ তার নিজের! যেটা এই মাটি থেকে উৎপন্ন হয়েছে। এই জল, এই কাদা, এই আবহাওয়া, এই বৃক্ষ-তৃণলতা ঘিরে তার স্বপ্ন বিস্তার করেছে এই ছোট ছোট শ্যামলা রঙের মানুষগুলো! অতীতের কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে শত শত বছর ধরে এই স্বপ্নগুলো দেখেছে! তখন আহমদ শরীফ সাহেবের সাথে যেয়ে আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ এবং এদের পুঁথিগুলো পাঠ করা শুরু করলাম। আমাদের আঙ্গিকগুলো অন্য রকম। পুঁথির অসাধারণ আঙ্গিক আছে। চোতসংক্রান্তি একটি বহুমাত্রিক পারফরম্যান্স। পালা, মনসামঙ্গলা–আমরা কেন এই জিনিসগুলোকে বাদ দেব! সুতরাং আঙ্গিকটা আপনি ভাঙুন। কিন্তু বিষয় নির্বাচনে সম্পূর্ণ রূপে নিজের দেশের প্রকৃতি, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ভাষার জায়গাটা লক্ষনীয়। শুধু প্রমিত ভাষায় আবদ্ধ থাকলাম না। সুর-তাল-ছন্দে–অর্থাৎ পাঁচালির দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করলাম। সেই তখন থেকে আমরা বলছি ঔপনিবেশিক থিয়েটারের বিরুদ্ধে স্বাধীন দেশের, স্বাধীন জনগণের অনেকগুলো নিজস্ব শিল্পরীতি, নাট্যরীতি, অভিনয়রীতি রয়েছে; যেগুলো নিয়ে আমরা আধুনিক কালে এসে দাঁড়াতে পারি। তখন আমরা ল্যাটিন আমেরিকার কথা বলতাম। তারা আধুনিক হয়েছে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যের উপর দাঁড়িয়ে। ওয়েস্টের আগ্রাসন ছিল। আমরা এই কথা হাসতে হাসতে বলেছি, তখন বয়স কম ছিল, ত্রিশের কোঠায়–পৃথিবীর সবচে’ আগে ভারতবর্ষে শেক্সপিয়র পাঠ করানো হয়েছে। ওদের দেশে তখন পাঠ্য ছিল না। কারণটা হচ্ছে আমাদেরকে উপনিবেশ করা হয়েছিল। পরে পাকিস্তান এসে সেটাকে আরো পোক্ত করল ধর্মের নামে। সুতরাং বাংলাদেশ কখনোই স্বাধীন ছিল না। এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি তাদের কখনোই তৈরি হয়নি। যে-মধ্যবিত্ত শ্রেণির হাতে একটি কালচার তৈরি হবে। সেই প্রমিত জায়গাটা এচিভ করতে পারিনি আমরা, রবীন্দ্রনাথ ছাড়া। রবীন্দ্রনাথ ছাড়া যেহেতু আর কেউ করে নাই, রবীন্দ্রনাথ যেহেতু এই কাজটা করেছে, এবং উনি পরে নাটক বলতেন না, উনি নিরাবরণ থিয়েটারের কথা বলছেন বারবার; তাহলে তো কোনো কিছুই থাকছে না মঞ্চে, শুধুমাত্র তোমার বাচিক এবং তোমার শরীরের অভিনয় দ্বারা সবকিছু বোঝাতে হবে। এত আধুনিক একটা রীতিকে বাদ দিয়ে, সেই জোব্বাজাব্বা পরে, সেই বড় বড় সেট করে থিয়েটারটা করার দরকারটা কী! একটা নদীর ভঙ্গির মধ্যে তো ছন্দ আছে। একটা আঙ্গিক আছে। ভাওয়াইয়া আর ভাটিয়ালীর তফাতটা তো বুঝতে হবে আমাকে। দুটো দুই জায়গার। একটা ভাটি অঞ্চলের আরেকটা রাঢ় অঞ্চলের কাজ। ভাটিয়ালী তৈরি হয়েছে পুববঙ্গের নাব্যতে, নিচু এলাকায়। যেমন নদীমাতৃক এলাকায় মনসা অনেক বেশি পূজনীয়। অন্য জায়গায় অন্য দেবতা আছে। বেহুলা লখীন্দরের যে পারফরম্যান্স হয় দিনের পর দিন, গ্রাম এলাকায়.. আমি কৃষ্ণলীলা দেখেছি সাতরাত। ওখানে যে অভিনয়, যে নৃত্য, যে সঙ্গীত এবং যে সংলাপ এবং যে বাক্য গঠনরীতি–আমাদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কথাটা বললে বিতর্ক হবে, তবু আমি বলব, আমরা খুব বেশি ফোর্ট উইলিয়াম দ্বারা শাসিত হলাম দীর্ঘ সময়। আমার মনে হয় এটাকে চ্যালেঞ্জ করেছে পূর্ববাংলার নাট্যজনরা। সেলিম এদেরই নেতৃত্ব দিয়েছে। সেলিম গবেষণা করেছে। প্রমাণ করেছে। সে দেখিয়েছে পদে পদে।

রাজু আলাউদ্দিন: তবে চৈতন্যের দিক থেকে আপনি যদি সহযাত্রী না হতেন তাহলে এটা প্রয়োগ করাও সম্ভব হতো না। মানে আপনি তো দেখালেন যে এটা সম্ভব। আর নাটকের বড় সাফল্য নির্ভর করে মঞ্চায়নের উপর। কারণ আপনারা যে নাটকগুলো করছেন, মনে রাখতে হবে যে, এগুলো সফোক্লিসের নাটক না। তার নাটক পাঠ করেই এর আনন্দের বেশিরভাগ অংশটা পাওয়া যায়। টেক্সটা এতই শক্তিশালী। বা শেক্সপিয়রের নাটক। কিন্তু আপনারা একটা ঝুঁকি নিলেন, একটা হলো যে টেক্সট এবং এরই সঙ্গে এর উপস্থাপন, এর সজ্জা, কাঠামো।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এমনকি লেখ্যরীতিও চেঞ্জ হয়ে গেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: লেখ্যরীতিও চেঞ্জ হয়ে গেছে। ফলে এখানে আপনার কৃতিত্বও অনেক। তো আমি মনে করি সেই চ্যালেঞ্জটা আপনিও নিয়েছেন। এবং আপনাদের দুজনের মিলিত চেষ্টায় এটা সোনায় সোহাগা হয়েছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এখন তো বাঙালি এবং বাংলা নাট্যরীতি নিয়ে সারা পৃথিবীতে আলোচনা হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এর কারণ হলো আপনারা প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে নতুন ঘরানা করে দেখিয়েছেন। ইউরোপ এখন দেখতে চায় তোমার সংস্কৃতির নতুন কী কী জিনিস আছে। এবং সেগুলোর প্রতি ওরা আকৃষ্ট হয়।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: উপন্যাস তো মাত্র দুইশ বছর। দুইশর একটু বেশি হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আমাদের?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমাদের। কিন্তু আমাদের আখ্যান তো বহু পুরনো। শত শত বছরের পুরনো। দুটো নাটক অনুবাদ করল অথবা দুটো ইংরেজি নাটক করল–সেটার মধ্যদিয়ে তো বাংলা থিয়েটারের জন্ম হতে পারে না। প্রতি সন্ধ্যায় মন্দিরে পূজা দেয়ার সময় যে সঙ্গীত এবং নৃত্যটা হয়, সেটা তো রিচুয়াল। সেটাই তো পারফরম্যান্সের মূল সূত্র আমাদের। আমাদের ব্রহ্মপুত্রের ওইদিকে যে রংজারি হয়, সেখানে জারি গানের কত সুন্দর পারফর্ম। দুইশ আড়াইশ বছর ধরে এটা চলে আসতেছে। আমরা আধুনিকরা, যারা কলকাতার বাবু-সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে ঢাকায় একটা বাবু-ক্লাশ তৈরি হলো, তারা কোনোদিন ভাবল না, তার নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রয়েছে।

“মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তেমন কোনো বড় উপন্যাস হয়নি”

রাজু আলাউদ্দিন: বাচ্চু ভাই, আঙ্গিকগুলো আপনারা যেভাবে তৈরি করেছেন, সেভাবে তো আর ছিল না; কিন্তু ওর মধ্যে উদ্দীপনাটা ছিল। সে জন্য আমি বলি আঙ্গিক ছিল না। কিন্তু ওটার বীজগুলো ছিল। বীজগুলো একজন বড় শিল্পী এসে সেগুলো বিকশিত করেন। আপনারা সেগুলো করেছেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেটাই। তবে আমি শেক্সপিয়র করব, আমি ইবসেন করব, আমি সফোক্লিস করব। কেন করব না! এটারও উত্তরাধিকার আমি এই পৃথিবীর মানুষ হিসাবে। কিন্তু আগে নিজেকে চেনার জন্যে, নিজেকে বোঝার জন্যে, নিজের জনগোষ্ঠীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার জন্যে শিল্পীকে তো নিজের ভাষায় কথা বলতে হবে। নিজের দেশের পরিবেশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে। শেক্সপিয়রের কিং লিয়ার তো অসাধারণ একটা নাটক, কিন্তু শাহজাহান একটি ভালো নাটক হয়েও দাঁড়াতে পারল না বাংলা থিয়েটারে, এখন পর্যন্ত। কয়েকটা ভালো পারফর্ম্যান্স হয়। কিন্তু কদিন পর আর থাকে না। হারিয়ে যায় নাটকটা। কিন্তু কিং লিয়ার হচ্ছে, হেমলেট হচ্ছে, আমাদেরগুলো হারিয়ে যাচ্ছে কেন! ওর কাঠামো, ওর বাক্যরীতি, ওর গঠন সবকিছু ওয়েস্ট। এটা আমাদের নয়। যে মানুষটা কথা বলছে আর যে মানুষটা শুনছে তাদের মাঝে এক ধরনের কমিউনিকেশন আছে। কিন্তু সেটা গভীরে না। হৃদয়ের একেবারে গোপন তারটায় টোকাটা মারছে না। শব্দটা পাচ্ছে না। ধ্বনিটা পাচ্ছে না। ফলে মনে রাখছে না। তাই এক সময় এটা অতীত হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং বাংলা থিয়েটারকে বাংলা থিয়েটারের আদলে দাঁড়াতে হবে। আমাদের লড়াইটা হচ্ছে, আমরা যেহেতু একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক, মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমরা–আমরা নিজস্ব শিল্পরীতি, নিজস্ব আঙ্গিক, অভিনয়রীতি, লেখ্যরীতি–এগুলি কি চর্চার মধ্যে আনব না! এগুলি নিয়ে কি আধুনিক হব না!

রাজু আলাউদ্দিন: নিশ্চয় নিশ্চয়। আপনি যখন নিজের সত্তার আবিষ্কার ঘটাচ্ছেন বা এটার বিকাশ ঘটাচ্ছেন, আপনি তখন এই পৃথিবীর সংস্কৃতির মধ্যে নতুন কিছু যুক্ত করছেন। এটাকে আমি অনাধুনিক বলব কেন!
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এটাই তো আধুনিক। এটাই তো হওয়া উচিত। যার যার ঐতিহ্য দিয়েই তো তুমি আধুনিক হবে। এটাকে বাদ দিয়ে তো তুমি আধুনিক হতে পারবে না। কথার কথা বলছি, ধরেন, জেমস জয়েসের ইউলিসিস যখন পড়েছি, প্রথম প্রথম বুঝিনি। এখনো অনেক কিছু বুঝি না। কিন্তু কথা হচ্ছে, ওইটা পাঠের মধ্যে যে শক্তিটার পরিচয় পাই, ওটাতে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর শতবর্ষের শক্তির সন্ধান পেয়েছি। ওর বাক্যরীতি থেকে শুরু করে ওর চরিত্রগুলো এত শক্তিশালী–ভাবাই যায় না। সে রকম জায়গায় তো এখানে রামায়ন মহাভারত ছিল। সেলিমের পাশাপাশি আমি অনেক দিন পর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে দেখলাম। একটা বিশাল ভাবনা নিয়ে সে দুটো উপন্যাসে হাত দিয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: চিলেকোঠার সেপাই আর খোয়াবনামা
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেখানে বুঝতে পারছিলাম যে, মানুষটা যাওয়ার চেষ্টা করছে। এর আগের যে উপন্যাসগুলি, উনি বলে না, অন্যদের কথাও বলছি, সে উপন্যাসগুলির মধ্যে…ঠিক আছে আমাদের উপন্যাসগুলির কনসেপ্টটাই একটা ওয়েস্টার্ন কনসেপ্ট। কাঠামোটাও তাই। কিন্তু আখতারুজ্জামানের মধ্যে আমি দেখেছি যে বিউপনিবেশিকরণ করার একটা প্রচেষ্টা তার পুরো রচনার মধ্যে আছে। এই কাজটা সেলিমের নাটকে যেরকম, ইলিয়াস স্যারের উপন্যাসে সেরকম। ইলিয়াস স্যার আমার আবার শিক্ষক ছিলেন। আমি খুব সৌভাগ্যবান। জগন্নাথে ইলিয়াস স্যার আর শওকত আলী আমার শিক্ষক ছিলেন। দুজনই আমার প্রিয় শিক্ষক। আর ছিলেন রাহাত স্যার। বাংলা পড়েছি। কিন্তু ভালো তো পারলাম না বাংলাটা। ভালো হওয়া যেত। স্যাররা খুব চেয়েছিল। ইলিয়াস স্যার আর শওকত স্যার বলত–বাচ্চু, তোমার বাংলাটা আছে, ঠিকঠাক করে লেখ। বড় বড় লেখা লিখবা। আমি ছোট ছোট লেখা লিখতাম। ৫০/৬০ পৃষ্ঠা লিখে ছেড়ে দিতাম। বড় লেখা লিখতে ভালো লাগত না। কিন্তু আসলে দীর্ঘ লেখা না লিখলে আমার মনে হয় না বিষয়গুলি বের হয়।
রাজু আলাউদ্দিন: নাটকের ক্ষেত্রে এই যে একটা নিজস্বতা তৈরি করেছেন, আপনি যখন দুটো ছবি বানাতে গেলেন, নাটকের অভিজ্ঞতার প্রয়োগ কি সিনেমাতে ঘটছে? আদৌ ঘটছে কি? যদিও দুটো ভিন্ন মাধ্যম। কিন্তু আপনি দীর্ঘদিন একটা মাধ্যমে যে অর্জনটা করলেন, এটা তো আপনার মস্তিষ্কে স্থায়ীভাবে আছে। আপনি যখন সিনেমার মতো আরেকটি মাধ্যমে কাজ করতে গেলেন, সেখানে তার প্রয়োগ কি কোথাও কোথাও ঘটছে বলে আপনি মনে করেন?

“একটা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা আমি কোনো উপন্যাসের মধ্যে পেলাম না”

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার দুইটা ছবিতে মুক্তিযুদ্ধের খুব আবেগ দেখতে পাবেন। কিন্তু ‘গেরিলা’তে একটা মহাকাব্যিক বিস্তার আছে। একটা জনপদ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা আছে, বীরত্ব আছে, বহুমাত্রিক চরিত্রগুলোর ঘোরাফেরা দেখতে পাব আমরা। এটা সাধারণত আমাদের চলচ্চিত্রে ছিল না। সেই জায়গা থেকে যদি বলেন তাহলে এটা সেলিম আল দীনের নাটকের একটা প্রভাব। সেই কীত্তনখোলা, হাতহদাই, যৈবতী কন্যার মন। আমিও খুব চেষ্টা করেছি গেরিলাতে। আবার একাত্তরের যিশুতে খুব সরলীকরণ আছে। এটাও আর্টের একটা আঙ্গিক বটে। বাইবেলের বিভিন্ন স্টেঞ্জাকে সংলাপ বানিয়ে ফেলছি। বানিয়ে তখন যা ঘটছে, অর্থাৎ যে গণহত্যা হচ্ছে, সেই গণহত্যা এবং মানুষের নিধন নিয়ে যিশু কী বলেছেন, সেটা একজনের মুখ দিয়ে আবার বলাচ্ছি। একটু থিয়েরটিক্যাল। আমার মনে হয় সেটারও একটা দরকার ছিল। এখন মনে হয় না করলেও পারতাম। কিন্তু থিয়েটারের কাঠামোর প্রভাব যিশুতে আছে। ‘
রাজু আলাউদ্দিন: গেরিলাতে অপারেশনের কিছু দৃশ্য দেখে আমার মনে হয়েছে আপনার অপারেশনের বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রয়োগ ওখানে আছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তার কারণ হলো, এটা তো হক ভাইয়ের একটা উপন্যাস, উপন্যাস উনি বলছেন, কিন্তু আসলে এটা একটা বড়গল্প; নিষিদ্ধ লোবান, হক ভাই এমনিতে তো ভালো লিখেন সেটা তো আলাদা কথা, কিন্তু আমার মনে হয়েছে উপন্যসে যেভাবে ভূমি থেকে রস নিয়ে তারপর চরিত্রগুলো নির্মাণ করতে হয়, এখানে সেটা ছিল না। যার জন্য আমাকে নিজের অভিজ্ঞতাগুলি বিলকিস চরিত্রটার সাথে থিতু করার চেষ্টা করেছি। যাতে মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক একটা প্রেক্ষাপট উঠে আসে। ওটাও ভালো। ওটার মধ্যে অন্য রকম কাজ ছিল। আমার মনে হয়েছে আরেকটু গভীরে যেয়ে কাজ করি। যার জন্য সিরাজ ক্যারেক্টারটা উনি যেভাবে লিখেছেন আমি একটু ভেঙে অন্যভাবে করেছি। বিলকিস ক্যারেক্টারটা অন্য রকম করেছি। তারপর পুরনো ঢাকার একটা সর্দারকে চরিত্র হিসেবে নিয়ে এসেছি। তার দোদুল্যমানতা, তার আবার ঘুরে দাঁড়ানো। লোকটাকে মুসলিম লীগ মনে হচ্ছিল। এই রকম জায়গা আমি তৈরি করেছি। লোকটা মুসলিম লীগের সমর্থক কিন্তু রাজাকারদের সমর্থন করছে না। এটা তো বাংলাদেশে ঘটেছে। আমার না খুব ইচ্ছা, চলচ্চিত্রে একটা আধুনিক মহাকাব্য নির্মাণ করব। সেই শক্তিটা আমার নাই। সেই মেধাটা নাই। সেই বয়সটা নাই। আমি ভাষা আন্দোলন নিয়ে একটা কাজ করতে চাচ্ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটার স্ক্রিপ্ট কি আপনি লিখবেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: একটা টিম নিয়ে লিখতে হবে। নানাদিকের ঘটনা আসতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: রিসার্চ দরকার।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: রিসার্চ দরকার। কারণ তখন অনেকেই জেলে ছিল। তাদের পরিবারগুলো বাহিরে কেমন ছিল। আন্দোলন হচ্ছে। অন্য ঘটনা নিয়ে জেলে গেছে। এদিকে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছে। অনেকে আবার মুক্তি পেয়ে ভাষা আন্দোলনে যোগদান করেছে। চুয়ান্ন সালে তারা কেমন ছিল। প্রেম-ভালোবাসা-বিশ্বাসঘাতকতা–সবই তখন ঘটেছে। এবং ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাঙালির কোনো মহাউপন্যাস নেই। মহাচলচ্চিত্র নেই।

রাজু আলাউদ্দিন: মহাউপন্যাস নেই। মহাঔপন্যাসিকই কি আছে!
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: নাই। আমি তো এটাই আপনাকে বলছি।
রাজু আলাউদ্দিন: অথচ ভাষা আন্দোলন হলো স্বাধীনতার প্রথম বিস্ফোরণ।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার এই প্রশ্নগুলো আমি বারবার করি সবাইকে। আচ্ছা, ভাষা আন্দোলনের উপর বড় একটা উপন্যাসের নাম বলো তো? শেষ বিকেলের মেয়ে একটা বড়গল্প। ভালো গল্প। কিন্তু উপন্যাস না। একবার হুমায়ূন ভাই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কী ধরনের উপন্যাস হবে আপনি বলেন? আমি বললাম, আমি ওয়ার এন্ড পিস-এর মতো উপন্যাস চাই। হুমায়ূন ভাই বলল, এই সময়ে ওইসব হয় নাকি! হুামায়ূন ভাই যেভাবে কথা বলে আর কি। খুব ইন্টারেস্টিং মানুষ। জীবনে অনেক আড্ডা-টাড্ডা মেরেছি উনার সাথে। তো আমি আপনাকে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা কথা বলি, ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন কোনো বড় উপন্যাস তৈরি হয়নি, যেটা একটা সমগ্র জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা-সাফল্য-ব্যর্থতার কথা বলে, হৃদয়ের কথা বলে; মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যদি আপনি বলেন, অসংখ্য উপন্যাস তৈরি হয়েছে কিন্তু তার কাঠামো খুব দুর্বল। যেমন ধরেন হুমায়ূন ভাইয়ের জোছনা ও জননীর গল্প–এইটার আয়োজনটা কিন্তু ঠিক ছিল। কিন্তু এক্সিকিউশনটা আমার মনে হয়নি সঠিকভাবে তিনি করেছেন। এটা নিয়ে তার সাথে আমার বিতর্ক হয়েছিল। আমাকে খুব স্নেহ করতেন বলেই হয়ত অনেক রাগারাগি করেন নাই। তো একদিন উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন জোছনা ও জননীর গল্প ভালো লাগেনি তাহলে, আমার কোন উপন্যাসটা আপনার ভালো লেগেছে ইদানীংকার, বলতে হবে আপনাকে? আমি বললাম, মধ্যাহ্ন। বললেন, মধ্যাহ্ন পড়েছেন আপনি? বলেন কী! পড়েছেন আপনি? তারপর নানা প্রশ্ন করলেন আমি আসলেই পড়েছি কি না। যেহেতু শেখের কথা বলতে পারছি, জুলেখা চরিত্রের কথা বলতে পারছি, ঘটনা বলতে পারছি, ১৯০৫ থেকে ১৯৩৯ এর প্রেক্ষাপট–তারপর উনি নিশ্চিত হলেন। বললাম, এইটা কিন্তু আপনার ভালো উপন্যাস। বহুল পঠিত না। কিন্তু এইটা আস্তে আস্তে লোকে পড়বে। কিন্তু সেইটা তো ভাষা আন্দোলনের আগের গল্প। এমনকি ঊনচল্লিশে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্লাস আমাদের ভারত এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের আগেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারপরই তো আমাদের ভাষা আন্দোলন। তো ভাষা আন্দোলন নিয়ে যেমন হয়নি, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও তেমন কোনো বড় উপন্যাস হয়নি। একটি লোকের অসম্ভব ভালো একটি লেখা আছে, তার আত্মজৈবনিক লেখা। আমি এত ভালো লেখা খুব কম পড়েছি।
রাজু আলাউদ্দিন: কোনটা সেটা?

“ওরা ধর্মটাকে নোংরাভাবে ব্যবহার করেছে”

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: মাহবুবুল আলমের গেরিলা থেকে সম্মুখ যুদ্ধ। এইটা যদি পান, পড়ে ফেলবেন। এইটার মধ্যে অদ্ভুত একটা ব্যাপার আছে। একটা ছোট্ট গেরিলা ব্যান্ড অপারেশন করছে; রংপুরে, বাংলাদেশের এখানে ওখানে। সত্য ঘটনা। রাজাকার, আল বদরের সাথে যুদ্ধ-লড়াই-বিশ্বাসঘাতকতা, দেশপ্রেম-আত্মত্যাগ সবকিছু চরিত্র ধরে ধরে করেছেন। যুদ্ধ করতে করতে ডিসেম্বরে যখন মুক্তিবাহিনীসহ মিত্রবাহিনী ঢুকে গেল, তখন ওদের সাথে মিলে শেষ পর্যন্ত বিশাল একটা যুদ্ধের পরে রংপুর দখল হয়েছিল। এত ভালো কাজ, আমি খুব কম পড়েছি। দুই খণ্ডের বই। প্রায় ৬০০/৭০০ পৃষ্ঠা। মাহবুবুল আলমের আত্মজৈবনিক লেখা। উনি এক সময় ডিসি ছিলেন। একটা ছোট্ট গেরিলা ব্যান্ডের লিডার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের একজন নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। অনেক দিন চাকরি করেছেন। এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত। মারা যাবেন বোধহয়। মুক্তিযুদ্ধের আরো কয়েকটা ভালো লেখা আছে। সেটা আমি বলছি না। কিন্তু আমার মনে হয়েছে যে, যুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ, একটা জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা আমি কোনো উপন্যাসের মধ্যে পেলাম না। একটা চরিত্রের মধ্যে চোখের কোনো বর্ণনা পেলাম না, যে-চোখ একটা দেশ দেখছে। বা একটা মুক্তি দেখছে। আমি বোঝাতে পারছি কি না? সেই চোখটা তো অনুপস্থিত।
রাজু আলাউদ্দিন: মানে তার কোনো ভিশন তৈরি হচ্ছে না। হয়ত ঘটনা আছে, বর্ণনা আছে বা কয়েকটা চরিত্র আছে; কিন্তু কমপ্লিট একটা ভিশন নেই।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: নেই তো। আমি যখন পদ্মা নদীর মাঝি পড়ি, তখন তো আমি কুবেরকে দেখতে পাই না।
রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ হ্যাঁ, একটা রাষ্ট্র তৈরি হতে দেখা যায়। ওই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন হোসেন মিয়া।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: মনে হয় নিখুঁত নেগেটিভ চরিত্র। কিন্তু কী যে স্বপ্নবাজ একটা মানুষ! একটা দেশকে সে তৈরি করছে। আমরা তো মানিক বন্দোপাধ্যায় পর্যন্ত পৌঁছতে পারলাম না।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা প্রশ্ন করি বাচ্চু ভাই, জানি না অনেকে প্রশ্নটাকে বিতর্কিত ভাববে কি না। কদিন আগে অক্টাবিও পাসের একটা ইন্টারভিউ পড়তে গিয়ে প্রশ্নটা আমার মাথায় এসেছে। স্পেনে যখন গৃহযুদ্ধ হয়, ফ্রাঙ্কোর বিরুদ্ধে পৃথিবীর অনেক বুদ্ধিজীবী–অক্টাবিও পাস, স্টিফেন স্পেন্ডার–অনেক স্বেচ্ছাসেবী রিপাবলিকানদের পক্ষে কাজ করেন। তো প্রশ্নকর্তা অক্টাবিও পাসকে জিজ্ঞেস করছে, এই অভিজ্ঞতা আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করছে? উনি বললেন যে, আমার পূর্বের অনেক বিশ্বাসকে সমূলে বদলে দিয়েছে। যে কোনো যুদ্ধকে আমার কাছে অর্থহীন মনে হয়। কারণ, এই যে যুদ্ধ করতে গেছি, একই বিল্ডিং-এর দেয়ালে এপাশে আমরা, ওপাশে শত্রুপক্ষের সৈন্যরা। তারা কী বলছে আমি শুনতে পাচ্ছি। আমার যে শত্রু সেও মানুষ। আমিও মানুষ। আমি কেন যুদ্ধে যাচ্ছি! কার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাচ্ছি? কিন্তু তখন এটা আমি বলতে পারিনি। কারণ সেটা তখন বললে লোকে আমাকে দেশদ্রোহী ভাববে। আমার প্রশ্নটা হলো, যখন আমরা পাকিস্তানিদেরকে মারলাম, কোনো কোনো মুহূর্তে কি আপনার মনে হয়েছে এই লোকটির মা আছে, বাবা আছে, বউ আছে, সন্তান আছে?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেপ্টেম্বর মাসে আমার মনে হয়েছে। রোভা নামে একটা গ্রাম আছে। সাভার থানা, তারপর নদী, নদীর ওইপারে গ্রামটা। এটা ধামরাই থানায় পড়েছে কিন্তু সাভারের সব থেকে কাছে। সেখানে পরিত্যক্ত বাড়িতে আমাদের একটা ঘাঁটি ছিল। গ্রামের লোকজন খাওয়াতো আমাদেরকে। ওখানে থাকতাম। ওখান থেকে বাইরে এসে অপারেশন করতাম। তখন মাত্রই পৌঁছেছি আমরা। একদিন সকালবেলা আমরা নাস্তা করছি, গ্রামের একজন দৌড়ে এসে বলল, স্যার পাকিস্তানের আর্মি আসছে নৌকা করে। আমরা তাড়াতাড়ি যেয়ে নদীর পাড়ে একটু আড়াল নিয়ে জঙ্গলের মধ্যে বসে আছি। দেখছি যে দুইটা নৌকা করে ওরা আসছে। কাছাকাছি যখন আসছে, আমাদের সুবাদার আশরাফ ছিল, ও এলএমজি থেকে গুলি ছুড়ল। নৌকাটা ডুবে গেল। কয়েকজন মারা গেল ওখানেই। দুতিনজন ডাঙায় উঠে এলো। তখন ও গুলি করল। আরো একজন মারা গেল। দুইজন বেঁচে রইল। আমি বললাম এ্যারেস্ট করো। এ্যারেস্ট করা হলো। আমার সামনে নিয়ে আসা হলো। ওরা পশতু। উর্দুও জানে না। আমাদের আশরাফ, ও পশতু জানত। ও পশতুতে জিজ্ঞেস করছে আর আমাকে বাংলায় বলতেছে। বলছে, স্যার, ও তো চলে যেতে চায়।
রাজু আলাউদ্দিন: কোথায় চলে যেতে চায়?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ও দেশে চলে যেতে চায়। ও বলে যে, ও যুদ্ধ করবে না। কারণ, আমাকে বলছে যে এখানে অনেক বেশি কাফের, আমাকে এই জন্য পাঠাইছিল। আমি কাফের মারতে এই জায়গায় আসছি। বয়স খুব বেশি হলে আঠারো বছর বয়স। সবার ছোট ছেলে। সুন্দর দেখতে।
রাজু আলাউদ্দিন: সুন্দরই হওয়ার কথা।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: প্রায় ছয় ফিট লম্বা। আমাকে বলে যে, স্যার, আমাকে মারবেন না। তো আমি বললাম যে ওকে এ্যারেস্ট করে রাখো, পরে দেখা যাবে। একটা সময় ওদেরকে হ্যান্ডওভার করে দেব। আশরাফ বলে, স্যার, ওকে এ্যারেস্ট করবেন, ওকে হ্যান্ডওভার করবেন, দেশ কবে স্বাধীন হবে জানি না আর আমি এটা বহন করব! আরো কত এ্যারেস্ট করব, আপনি নিজে হাঁটবেন নাকি ওদের হাঁটাবেন! পাকিস্তানিরা এ্যাটাক করলে আপনি কোথায় যাবেন আর ওরা কোথায় যাবে! আর একটা গ্রামে তো থাকছেন না। এক সপ্তাহ না হয় এখানে থাকছেন, পরের সপ্তায় তো অন্য গ্রামে চলে যাবেন। ওদের জন্য গার্ড বানাইতে হবে। এগুলো স্যার কইরেন না। সুবাদার আমাকে বলল আপনি পিছে যান। আমি কমান্ডার, কিন্তু মানতেছে না। আশরাফ বলছে যে, তুই এখানে আসছিস ক্যাঁ? ও বলল যে এই এই ব্যাপার। আমি আসছি কাফের মারতে। আশরাফ বলল, তুই লোক মারছিস কোনো? বলল, আমি কোনো লোক মারিনি। তো কী করছিস? আমি ডিউটিতে আসছি। মানিকগঞ্জের ঘিওর থানায় ওর ডিউটি ছিল। আশরাফ বলে, তুই ধরা পড়ছিস, তুই এখন কী করবি? তোকে তো মেরে ফেলব। ও বলে যে, আমাকে মেরো না, আমি আর এখানে আসব না। আমি সব বুঝে ফেলছি। আমাদের দুইজনকে তোমরা ছেড়ে দাও, আমরা ঝিলাম চলে যাব। ঝিলামের তীরে আমাদের বাড়ি। ওখানে আমার মা আছে। ওখানে বোনরা আছে। আমি গ্রামের মানুষ। গরিব মানুষ। কিছু বেতন পাইতাম। আশরাফ বলছে, তোরা ঝিলাম যাবি? তোদের পাঠায়ে দিচ্ছি। এই যে নদীটা দেখছিস, এর নিচ দিয়ে একটা রাস্তা আছে, এই রাস্তা দিয়ে সোজা ঝিলাম যাওয়া যায়। সোজা একটা বাস পাবি বাসে উঠে ঝিলাম চলে যাবি। যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে এইসব রসিকতা করছে আশরাফ। ততক্ষণে ও রাইফেল থেকে বেয়নেটটা নিল। এরপর মারল। একটা লাথি মারল। পানিতে পড়ল। আমার খুব খারাপ লাগল। আমার মনে হচ্ছিল রাখলেই তো পারতাম। কিন্তু রাখাও তো সম্ভব না।
রাজু আলাউদ্দিন: কাকে আপনি রাখবেন! ও যে আপনাকে আবার সুযোগ মতো হত্যা করবে না, তার নিশ্চয়তা কী!

“পরবর্তী রাজনীতিতে শেখ হাসিনা চ্যাম্পিয়ন”

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এমন আরেকটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল আমাদের। সেটা ছিল একটা রাজাকার। সাভার থানা যখন দখল করি, ওদেরকে এ্যারেস্ট করি। বাঙালি দেখে মনে করলাম, থাকুক না! শুধু ওদের অস্ত্রগুলো নিয়ে রেখে দিয়েছিলাম। ওরা আমাদের অস্ত্র নিয়ে ভাগতে চেয়েছিল। এগুলি হয়। সেটা আরো পরের ঘটনা। এটা ডিসেম্বরের কথা। আর সেপ্টেম্বর মাসে পানিতে পুরো বাংলাদেশ জলবদ্ধ। ওবারের মতো বৃষ্টি কিন্তু কোনোবার হয়নি। গত বছর ২০১৭ তে ওই রকম বৃষ্টি হয়েছিল। আপনি যে কথটা বললেন, অক্টাবিও পাস যেটা বলেছিলেন, আমার অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। আশরাফ এখনো বেঁচে আছে। ভাবি মাঝে মাঝে, আচ্ছ, ওই লোক দুটোকে না মারলে কী হতো! ওরা তো আর যুদ্ধ করতে চায়নি। ওরা ফিরে যেতে চেয়েছিল।
রাজু আলাউদ্দিন: এখানে একটা ব্যাপার–আমরা যুদ্ধ করছি আত্মরক্ষার জন্য। ওরা আসছে আক্রমণ করতে। ওরা আগ্রাসী। প্লেন টেক্সট হিসেবে এইটেই আমরা দেখি। আসলে একজন সোলজার কে? একজন সোলজার হলো একটা দাস। সে একটা কমান্ডারের দাস। সেই কমান্ডার হচ্ছে, সব্বোর্চ জায়গায় গেলে, ভুট্টো অথবা ইয়াহিয়া অথবা আইয়ুব খান। তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য একটা বিশাল জনগোষ্ঠীকে, আর্মিকে ব্যবহার করেছে। আসলে আর্মির তো দোষ নেই। ও তো জানেই না, আপনি যেটা বললেন, ও কাফের মারতে আসছে। এইসব প্রোপাগাণ্ডা ওরা ছড়িয়েছিল। বাঙালিরা কাফের। ওরা হিন্দু।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এরা ক্লাশ এইট নাইনে হয়ত পড়ত। তখন পড়ালেখা কম হতো। কৃষকের সন্তান। রাষ্ট্র তো আমার কাছে মনে হয় খুবই কঠিন একটা যন্ত্র। নিরস। কোনো রসকষ নেই। তবে সংবিধান কিছুটা রস দিতে পারে। রস সাপ্লাই করতে পারে সংবিধান।

রাজু আলাউদ্দিন: সংবিধান দানব থেকে মানবিক রাষ্ট্র বানাতে পারে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: মানবিক রাষ্ট্রই তো চেয়েছি আমরা। হয়ত যুদ্ধটা অমানবিক ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রটা মানবিক চেয়েছিলাম। ওর কিন্তু কোনো স্বপ্ন ছিল না। ওর চাওয়া ছিল দুইবেলা খেয়েদেয়ে ভালো থাকব। এখন বাংলাদেশের সব মানুষ মোটামুটি খেতে পারে। কেউ না খেয়ে মরে না। জনগণ সুখী আছে। যদি অসুখী হতো, তাহলে রাস্তাঘাটে আন্দোলন চলত। যে কয়টা আন্দোলন হচ্ছে, ওগুলি কিন্তু চাকরিজীবীদের আন্দোলন। শিক্ষক এবং গার্মেন্টসের আন্দোলন। নির্বাচনের বছর বলে এগুলো আবার চাড়া দেয়। এগুলির সাথে শেকড়ের খুব একটা সম্পর্ক নাই। এগুলি ভাসমান। আমার মনে হয় কৃষক এবং শ্রমিকরা যদি বিপদে পড়ে তাহলে আন্দোলন হবে। যার জন্য আজকে বেগম জিয়া গ্রেফতার হয়ে পানিশমেন্ট হয়ে গেল, মানুষ চুপচাপ। আপনি কোনো ইস্যুতে জনগণের সাথে সম্পর্কটা তৈরি করতে পারেননি। আজকে আপনার পক্ষে জনগণ দাঁড়াবে কেন! আপনি জনগণের ইস্যু নিয়ে তো কথা বলেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: খালেদা জিয়াকে যখন সেনানিবাস থেকে আইনগতভাবে সরানো হলো, এটাকে ইস্যু করা তার উচিত ছিল না। বরং নৈর্ব্যক্তিক বিষয় ইস্যু করলে, যেটার সাথে ব্যক্তির সম্পর্ক নাই, তাহলে কিন্তু মানুষের সমর্থন অনেক বেশি পেতেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আর ইস্যু যেগুলো আসে, সেগুলো এ্যাডজাস্ট করছে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আমার মনে হয় ওরা কিন্তু হিরো হয়ে যেতে পারত, যদি খালেদা জিয়া জামাত ত্যাগ করতে পারত। আমি জানি, একদিন না একদিন জামাতকে বাদ দিতেই হবে যদি বিএনপি সত্যি সত্যি বড় হতে চায়। আরো শক্তিশালী হতে চায়। এখনই কেন ওরা বাদ দেয় না!

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: কখনোই বাদ দেবে না। পঁচাত্তর ওদের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ছিল। আওয়ামী লীগের সবচে বড় জিনিস হচ্ছে…. কথিত আছে, কথাটা অনেকটা সত্যিও বটে, জিয়াউর রহমান যখন আওয়ামী লীগের সাথে একটা সমঝোতা করতে চেয়েছিল, তখন আওয়ামী লীগ বলেছিল, আমরা সারা জীবন সংগ্রাম করেছি সেনা শাসনের বিরুদ্ধে। তাদের সাথে মিলে সরকার গঠন কেন করব! সাংঘাতিক বড় সত্য কথা। এই জন্যই পলিটিক্যাল পার্টি হিসেবে দাঁড়িয়ে গেল। এরা কিন্তু দাঁড়াতে পারল না। কারণ, আদর্শিক জায়গায় ওরা পরনির্ভরশীল। এবং ওরা ধর্মটাকে নোংরাভাবে ব্যবহার করেছে। তবে হ্যাঁ, এখন যদি ধর্মান্ধ রাজনীতি, জঙ্গিবাদ এবং পলিটিক্যাল ইসলাম খুব জনপ্রিয়তা পেয়ে যায় তাহলে বিএনপির জন্য সুদিন আসতে পারে। সেটা দেখা যাবে কী হয় সামনে। কিন্তু আমার মনে হয় মানুষের মিনিমাম প্রয়োজন যদি আপনি মিটিয়ে দেন, মানুষ খুব বড় কিছু আর চায় না রাস্তায় নেমে। এটা মানুষের একটা স্বভাব। মানুষ শান্তিটা চায়। ও ভালো থাকতে চায়। ওর বড় আকাঙ্ক্ষা নেই। ও ফ্ল্যাগ ওড়াতে চায় না। ও প্লেনে চড়তে চায় না। আমি একটা কথা বলি, ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো, ১৭ ডিসেম্বর বিকেল বেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দাঁড়িয়ে আছি মুক্তিযোদ্ধারা, একদল লোক আমাদের দেখতে আসল। আমার আচরণ দেখে হয়ত একজন বুঝেছে যে, আমি নেতৃস্থানীয় কেউ হব। আমাকে সে বলল, বাবা শোনেন, খুব খুশি হইছি দেশ স্বাধীন হইছে…আবেগে যা বলা যায় আর কি। তারপর বলল, স্কুলটা কবে খুলবে? কালকে খুলবে? ১৭ তারিখে বলছে ১৮ তারিখে স্কুল খুলবে কি না। তারমানে আমাদের বুঝতে হবে একটা মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফেরত যেতে চায়। আপনি দেশটাকে স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি করে দেন, মানুষজনই সোনার দেশ বানিয়ে ফেলবে। কাউকে কিছু করতে হবে না। আমরা স্বাভাবিক জীবনযাপনের পরিবেশটা এখনো পর্যন্ত দিতে পারলাম না। কিছুটা দিয়েছে বলেই এখন শান্ত। আমাকে অনেকে বলছে যে, খালেদা জিয়াকে ধরলে এটা হবে ওটা হবে। কিচ্ছু হবে না। কারণ, গত দশ বছরে দেশটার গুণগত একটা পরিবর্তন হয়েছে। তার পরবর্তী রাজনীতিতে শেখ হাসিনা চ্যাম্পিয়ন। উনি উনার মতো করে দেশটাকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিচ্ছেন। আমার মনে হচ্ছে বর্তমান সরকার কিছুটা হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার জায়গাটা বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। পুরোপুরি করছে সেটা আমরা বলব না। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তন করে বাহাত্তরের সংবিধানের কাছাকাছি গেছে। ওই দুইটা বাদ দেয় নাই। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা আবার দিয়েছে। সকল ধর্মের সমান অধিকার ছিল কয়েক বছর আগে। সেটাকে পরিবর্তন করেছেন–ধর্মনিরপেক্ষতা। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। বিএনপি কোন গিফটা নিয়ে জনগণের সামনে আসছে? তাদের উপহারটা কী? তাদের পলিটিক্যাল ডিসকোর্স কী? কিচ্ছু না। একটা ভালো অপজিশন দরকার ছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: মানে একটা স্ট্রং অপজিশন পার্লামেন্টে থাকা উচিত। একটা সুস্থ রাষ্ট্রে যদি স্ট্রং অপজিশন না থাকে তাহলে কিন্তু ধীরে ধীরে একটি ভালো সরকারও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। বা নানাভাবে করাপ্টেড হতে থাকে। এই না থাকাটা দুর্ভাগ্য।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে কিন্তু যথেষ্ট চেষ্টা করা হয়েছিল, এমনকি মন্ত্রীপরিষদের সদস্যও করা হবে বলা হয়েছিল; কিন্তু ওরা তো আসে নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই জায়গাগুলোয় ভুল করছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তারপর বোমাবাজি করে এমন একটা সিচ্যুয়েশন করল যে নির্বাচনটা ইমার্জেন্স হয়ে গেল। ইমার্জেন্স অব ফাইফ জানুয়ারি নির্বাচন–আমি এরকম একটা বক্তৃতা দিয়েছিলাম। আমরা জানি নির্বাচনটা সেইভাবে সিদ্ধ নয়, শুদ্ধ নয়; কিন্তু তারপরেও এটার প্রয়োজন ছিল। কারণ সেবার যদি এই সরকার হেরে যেত তাহলে কিন্তু দেশটা মৌলবাদী দেশে পরিণত হতো। সেই ভয় থেকেই তো নির্বাচনটা করা হয়েছিল। সেই জায়গায় আমরা মনে করি এটা ঠিকই ছিল। কিন্তু আমি মনে করি সংস্কৃতির জায়গাটা যদি আরো গুরুতরভাবে বিবেচনা করত…
রাজু আলাউদ্দিন: মানে বর্তমান সরকার?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ।
রাজু আলাউদ্দিন: শিক্ষার জায়গাটা যদি…
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: শিক্ষা এবং সংস্কৃতি।
রাজু আলাউদ্দিন: এই দুটো হলো মূল জায়গা। তাহলে বাকিগুলো আস্তে আস্তে পরিবর্তন হয়ে যাবে। আজকের মৌলবাদের উত্থান বলি বা জঙ্গিবাদ বলি…
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এবং দুর্নীতিও। যেটা সবার নজরে আসছে। এটা একটা খারাপ দিক। যেমন ব্যাংকের যে ঘটনাগুলো, এটা নিয়ে কথা হচ্ছে সারা দেশে। এগুলো তো সমাজটাকে কলুষিত করবে।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার কি মনে হয় না যে, যারা লেখক এবং বুদ্ধিজীবী, তাদের সরব হওয়া উচিত? কারণ এটা তো শুধু রাজনৈতিক নেতাদের বলার বিষয় নয়। একজন বড় শিল্পী, তারও ভূমিকা আছে। আমাদের লেখক শিল্পীদের সেই ভূমিকা কি দেখতে পান?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এখন অনেক কম। সেটা সম্ভবত এই কারণে যে, আওয়ামী লীগ যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একটি শক্তি এবং তাকে আমরা শিল্পীরা সমর্থন করছি, সুতরাং এই মুহূর্তে সামনে নির্বাচন বিধায় বড় রকমের কোনো বিপদে আওয়ামী লীগকে ফেলার চেষ্টা করছি না। কিন্তু আমি মনে করি, আগামী দিনে আমাদের কথাগুলো সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় বলতে হবে। আমরা বলছি না যে আমরা বিরোধিতা করছি। কিন্তু খারাপকে খারাপ বলা, ভালোকে ভালো বলার অধিকার আমাদের আছে। সুতরাং যে অসঙ্গতিগুলো আমাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক সমাজে ঘটেছে; সেগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলা।
রাজু আলাউদ্দিন: এগুলো আমলে না নিলে পরে আর ঠিক হবে না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমি আশাবাদী, আস্তে আস্তে নতুন যে জেনারেশন আসছে, এরা অনেক দিক থেকে মুক্ত। এইটা আমার ভালো লাগে। আমি কথা বলে দেখেছি যে, তারা যখন কম্পিউটারটা চালাচ্ছে, তারা ইনফিনিট ওয়ার্ল্ডের ভেতর ঢুকছে, দুষ্টুমিও করছে, সেটা পার্ট অব দ্য লাইফ; অনেকে নষ্টও হচ্ছে। আমি মনে করি যে, বিজ্ঞানের যে অ্যামেজিয়েসগুলো তৈরি হয়েছে, এগুলো অন্তত আমাদের ব্যবহারিক জায়গায় জ্ঞান দিয়েছে। এইখান থেকে মুক্তির জায়গাটা খুঁজতে হবে। এটা আমার মুক্তির জন্য টুলস কি না।

রাজু আলাউদ্দিন: তারমানে আপনি নতুন প্রজন্মের ব্যাপারে খুবই আশাবাদী। এদের হাতে আমাদের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। তো বাচ্চু ভাই, আপনার সাথে কথা আসলে শেষ হয়নি। আরো গল্প, আরো বহুদিক আছে যেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে এবং আমার ইচ্ছা ভাবিষ্যতে আপনার সাথে আরেক দফা বা তারপরেও যদি কয়েক দফা বসতে হয় অবশ্যই আমরা বসব। আজকে আপনি যে দীর্ঘ সময় দিলেন, অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, ঘটনা জানালেন এ জন্য আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আপনাকেও অভিনন্দন।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

“হযরত রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আলীকে (রা.) বললেন, ‘রাসুলুল্লাহ’ লেখার দরকার নেই, ‘রাসুলুল্লাহ’ শব্দটা কাট”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে
শিল্পী রফিকুন নবী: ওই বাড়িতে আমরা বঙ্গবন্ধুকে বইটা দিলাম

শামসুজ্জামান খান: নিজের দলের কোনো সমালোচনা করব না, অন্যদের করব– তাহলে তো সে পার্সিয়াল হয়ে গেল

মোহাম্মদ রফিক: আমার কাছে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ অসম্পূর্ণ উপন্যাস মনে হয়

Flag Counter


2 Responses

  1. Md. Jillur Rahman says:

    মৌলবাদি বলতে কি বোঝেন আপনারা? আপনারা অন্যদের মৌলবাদি বলে গালি দেন! আপনাদের এই কথার দ্বারা এটাই প্রমাণ করে আপনারা ধর্ম মানেন না। নামে মাত্র মুসলমান। ‌মৌলবাদি কাদের বলা হয়? মৌলবাদি তাহারা যাহারা তাহাদের ধর্মের মূল বা সব বিষয়গুলি মেনে চলে।’ তাহলে?

  2. Tanvir Zahir says:

    রাজু আলাউদ্দিনের নেয়া সাক্ষাৎকারগুলো সিরিয়াস পাঠ্য। সমস্যা হয় ওগুলো ব্লগে প্রকাশ হওয়ায়। সবসময় পড়া হয়ে ওঠে না। ছাপা বই হিসেবে হাতে থাকলে বেশিরভাগই এতদিনে পড়া হয়ে যেত। দেশে থাকি নে বলে খবরও রাখা হয় না বই হয়ে বেরুলো কি না।
    এটা দেখে ভালো লাগে যে সংস্কৃতিবান মানুষেরা, প্রথম শ্রেণীর সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সিনেমার অভিনেতা-অভিনেত্রী পর্যন্ত, সবাই আওয়ামী লীগকে বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে সমর্থন করছেন। কিন্তু যেটা ভালো লাগে না সেটা হোল আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক শাসনামলে ইসলামী জঙ্গি হামলা হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়ায় মিডিয়ায় বাংলাদেশকে উগ্র ইসলামী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে আওয়ামী লীগকে দায়ী করবার প্রচেষ্টা। বিদেশী মিডিয়ায় কাজটা করা হচ্ছে বেশি। সত্যি ঘটনা হোল ইসলামী উগ্রবাদীদের প্রতিক্রিয়া আওয়ামী লীগের শাসনামলে বেশি দৃশ্যমান হলেও তাদের সৃষ্টি আওয়ামী লীগের হাতে নয়। জামাত-বিএনপির হাতে। আওয়ামী লীগের সময় তাদেরকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে হয়েছে কারণ এর নীতিমালা ছিল তাদের বিরোধী। আমাদের মিডিয়া খুব কার্যকরভাবে তুলে ধরছে না যে জঙ্গিরা তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা নেয়ার আগে। তবে শেখ হাসিনাকে চ্যাম্পিয়ন নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াটা চমৎকার লেগেছে। তিনি আসলেই সেরা।
    genre শব্দটার উচ্চারণ সম্ভবত জনরঅ। অ-কারান্ত। শব্দটা আদিতে ফরাসি হওয়াতেই এর e- বর্ণটার উচ্চারণ অ-এর মতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.