অনুবাদ, প্রবন্ধ

বিপ্লবী এম. এন. রায়ের সাম্যবাদ: “শুরুটা ছিল মেক্সিকোতে”

ইমরান খান | 24 Mar , 2018  

দানিয়েল কেন্ট-কাররাসকো

দানিয়েল কেন্ট-কাররাসকোর জন্ম মেক্সিকোয়। পেশায় ইতিহাসবিদ। সমসাময়িক ভারতীয় রাজনৈতিক চিন্তা এবং তৃতীয় বিশ্বের আন্ত:সম্পর্কিত ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে তিনি পিএই্চ করেছেন। বর্তমানে মেক্সিকো সিটিতে অবস্থিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় `উনাম’ (Universidad Nacional Autonoma de Mexico)-এর পোস্টডক্টোরাল ফেলো হিসেবে আছেন। দক্ষিণ এশিয়া ও মেক্সিকোয় বামপন্থী রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস নিয়ে অসংখ্য গবেষণা ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ইংরেজি ও স্প্যানিশ ভাষায়। বর্তমানে তিনি ভারতে সাংস্কৃতিক ঠাণ্ডা যুদ্ধ ও সিআইএ-এর কর্মকাণ্ড নিয়ে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করছেন।
উপমহাদেশের বিখ্যাত বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতা এম এন রায় সম্পর্কে বাঙালি জনগোষ্ঠী অনেক কিছু জানলেও গত শতাব্দির প্রথম দশকে সিআইএর তাড়া খেয়ে মেক্সিকোতে তার দুই বছরের অবস্থানকাল সম্পর্কে খুব কমই জানেন। রায়ের এই অজানা দিক নিয়ে গবেষক দানিয়েল ইংরেজিতে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছেন যেটি প্রকাশিত হয়েছিল কানাডার বাংলা জার্নাল পত্রিকার সাম্প্রতিকতম সংখ্যায়। লেখকের অনুমতি নিয়ে তার সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন ইমরান খান। বি. স.


১৯৬৪ সনে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় মানবেন্দ্রনাথ রায় লিখেছেন যে ১৯১০ দশকের শেষের দিকে তাঁর রাজনৈতিক বিবর্তনে‘‘এক রূপান্তর” ঘটে: মনেপ্রাণে জাতিয়তাবাদী থেকে স্বপ্ন দেখে হঠাৎই হয়ে ওঠেন একজন সাম্যবাদী। কয়েক লাইন পরেই তিনি লিখেছেন: ‘‘শুরুটা হয়েছিল মেক্সিকোতে।2স্মৃতিকথার বাইরে মেক্সিকোতে তাঁর দুই বছরের (১৯১৭ এর গ্রীস্মকাল থেকে ১৯১৯ এর ডিসেম্বর) অবস্থান সম্পর্কে খুব কম তথ্যই জানা যায়। আত্মজৈবনিক লেখায় যে ধরণের সীমাবদ্ধতা এবং তথ্যের স্বল্পতা থাকে, তাঁর লেখাতেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। যা হোক, মেক্সিকো যে তাঁর যাযাবর জীবনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, সে কথা নিঃসন্দেহে বলা চলে। তিনি আক্ষরিক অর্থেই বিশ্বভ্রমণ করেছেন, যথেষ্ট সময় কাটিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানী, সোভিয়েত রাশিয়া, চীন এবং কাযাকিস্তানে, তবুও তিনি মেক্সিকোর কথাই তাঁর স্মৃতিকথায় সবচেয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। ভৌগোলিক এবং সাংস্কৃতিক দূরত্ব থাকা সত্বেও পাশ্চাত্য প্রভাবমুক্ত মেক্সিকো তাঁর কাছে অদ্ভুত আপন মনে হয়েছিল। তাছাড়া, বিশ শতকের শুরুতে এই তরুণ পলাতকের কাছে মেক্সিকোকে মনে হয়েছিল তাঁর অভিজ্ঞতার পরিধিকে প্রসারিত করার উপযুক্ত ক্ষেত্র, কারণ এখানে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন বড় ধরণের ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাথে। মাত্র ২৯ বছরেই তিনি ফেরারী হয়ে বস্তুগত স্বচ্ছলতা এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন। কয়েক দশক ধরে মেক্সিকোতে ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষে অগণিত মানুষ প্রাণ হারায় এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষের দিকে সেদেশে এক নতুন সামাজিক, আদর্শগত এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। ফলে রায় সেখানে লেখা, পড়া, চিন্তা, স্বাধীন মতপ্রকাশসহ সেখানে বিপ্লবে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা পান যা কিনা তাঁর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, সমাজতান্ত্রিক এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠন করে তাঁর চিন্তাজগতে আমূল পরিবর্তন ঘটায়। বাকি জীবন তিনি এই মতাদর্শই বহন করেছেন।
এর আগে তিনি ছিলেন সহিংস জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী যা তাকে ব্রিটিশ-ভারত থেকে পালিয়ে প্রবাসে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে। মেক্সিকোতে অবস্থানের ফলে তিনি তাত্ত্বিক এবং রাজনৈতিকভাবে বিপ্লবী মার্ক্সবাদে জড়িয়ে পড়েন এবং সহিংস জাতীয়বাদে বিশ্বাস ত্যাগ করেন। একইভাবে দেখা যাবে, তার সমাজতন্ত্রে জড়িয়ে পড়ার সময়কালেই মেক্সিকোতে সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনা নিয়ে গঠনমূলক বিতর্ক চলছিল, যার ফলে ১৯১৯ এর শেষের দিকে মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। মেক্সিকোতে রায় আদর্শগতভাবে নমনীয় এবং সম্ভাবনার দিক থেকে শক্তিশালী যে পরিবেশ পেয়েছিলেন, সেটাই তাকে সমাজতন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে। এই পরিবেশই তখন আন্তর্জাতিক ভ্রাতৃত্ববোধ এবং বুদ্ধিবৃত্তিক অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শের পত্তন ঘটে এবং এই একই বৈশিষ্ট্য বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন এবং উপনিবেশ-বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শের জন্মদাতার রূপ নেয়।

এই ছোট প্রবন্ধটিতে আমরা দেখাতে চেষ্টা করব যে, বিংশ শতকের আন্তর্জাতিক বামপন্থী আন্দোলনের একজন অন্যতম পুরোধা ব্যাক্তির রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে উঠেছিল বৈপ্লবিক মেক্সিকোতে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কারণেই। ওই সময়টাকে প্রায়ই জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তি রূপে দেখা হয়। এই বিষয়টাকে আমরা বিশ্লেষণ করব রাজনৈতিক মঞ্চের অভিজ্ঞ অভিনেতাদের অভিজ্ঞতা থেকে, বুঝতে চেষ্টা করব তাঁদের কাছে এর আদর্শগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু ছিল। এই কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকারাীরা হয়ত অজান্তেই মেক্সিকোর বিদ্রোহকে বৃহত্তর এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্রোতে হারিয়ে ফেলেছেন।

উত্তর-সীমান্ত: আমেরিকায় এম. এন. রায়

রায় ঘটনাক্রমে মেক্সিকোতে এসেছিলেন। সবাই জানেন যে, ১৯১৫ সনে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ত্যাগ করার পর তাঁর উদ্দেশ্য ছিল জার্মানীতে পৌঁছে ভারতীয় বিপ্লবীদের সাথে যোগাযোগ করা যারা কিনা বার্লিন ইন্ডিয়ান কমিটির ভিত্তি তৈরি করেছিল। যা হোক, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকার অংশগ্রহণের ফলে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকারীদের উপর অত্যাচার বেড়ে যায়, যার ফলে তিনি রিও গ্রান্দে নদী পেরিয়ে দক্ষিণে পালিয়ে যান। ১৯১৬ সনে আমেরিকায় পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েক মাস তিনি পালো আল্তোতে ধনগোপাল মুখোপাধ্যায়ের আশ্রয়ে ছিলেন। মি. মুখোপাধ্যায় স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির প্রফেসর ছিলেন এবং বে এরিয়ার বুদ্ধিজীবী সমাজের সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি রায়কে ডেভিড স্টার জর্ডানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। মি. জর্ডান ছিলেন স্ট্যানফোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা, আমেরিকান অ্যান্টি ইম্পেরিয়ালিস্ট লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট, মেক্সিকোর সমাজতান্ত্রিক নেতা সালভাদর অালভারাদোর বন্ধু, ইউকাতান-এর গভর্নর এবং আসেন্দাদোস (পরফিনো ডিয়াজ সমর্থিত জমিদারেরা)-এর বিরোধী পক্ষ। মি. মুখোপাধ্যায় ওই এলাকাতে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনকারী এবং বিপ্লবীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ওই দশকের শুরু থেকেই ভূমিকা রেখে আসছিলেন এবং প্যাসিফিক কোস্ট হিন্দি অ্যাসোশিয়েশন (পিসিএইচআই) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই সাথে বর্তমানে বিলুপ্ত ঘাদার(Ghadar) নামক সংবাদপত্রটিও চালাতেন। তারকনাথ দাশ এবং যতীন্দ্রনাথ লাহিড়ীর মতো অনেক নেতৃস্থানীয় মানুষ বাংলাদেশের অনুশীলন সমিতি এবং যুগান্তর-এর মতো একই পরিবেশে বিপ্লবের প্রেরণা পেয়েছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকাকালে রায় মেক্সিকোর আসন্ন বিপ্লবের কথা শুনে থাকবেন, কারণ, আমেরিকার ওয়েস্ট কোস্টের ভারতীয় অভিবাসীদের মধ্যে তখন মেক্সিকান বিপ্লব একটি উত্তপ্ত আলোচনার বিষয় ছিল। রায় যখন সান ফ্রান্সিসকোতে পৌঁছান, তার মাত্র অর্ধশতাব্দীরও কম সময় আগে আমেরিকা মেক্সিকোর কাছ থেকে সান ফ্রান্সিসকো দখল করে। কাজেই ওই জায়গাটা ছিল বিপ্লবীদের কর্মকান্ডের একটি মূল ক্ষেত্র, বিশেষ করে যারা ইউরোপ, এশিয়া এবং ল্যাটিন আমেরিকা থেকে আগত। বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ এবং সংস্কৃতির মানুষ এখানে একত্রিত হয়ে বিপ্লবকে আরো উস্কে দিচ্ছিল। এখানে সমাবেশ ঘটেছিল আর্জেন্টাইন থেকে শুরু করে মেক্সিকান, পূর্ব ইউরোপের ইহুদী, জাপানী এবং ভারতীয়দের3। এসব মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্বাসের বিপ্লবী ছিল, বিশেষ করে এরা পার্তিদো লিবেরাল মেক্সিকানোর (পিএলএম) সমর্থক ছিল। এটি ছিল মেক্সিকোর নির্বাসিত বিপ্লবী সহোদর রিকার্দো এবং এনরিকে ফ্লোরেস মাগন-এর গঠিত বিপ্লবী দল। আমেরিকার সকল বিপ্লবী নেতার সাথে পিএলএম-এর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল এবং দলটি তাদের মধ্যে মেক্সিকোর বিপ্লবী দলগুলোর বৈপ্লবিক উদ্দেশ্য প্রচার করত। এই দলটির মুখপত্র ছিল Regenracion নামক পত্রিকা যা ওইসময়ে স্প্যানিশভাষী শ্রমিক আন্দোলনকারীদের মধ্যে বহুল পঠিত ছিল। মাঝে মাঝে Mother Earth, the Emancipator এবং Red Dawn4-এর মতো অন্য ভাষার বিপ্লবী পত্রিকাগুলোর লেখাও অনুবাদ করে প্রচার করা হত। Regenracion এর ইংরেজি পাতার সম্পাদক ছিলেন ব্রিটিশ বংশোদ্ভুত ভারতীয় বিপ্লবী উইলিয়াম সি. ওয়েন। ১৯১৪ এর শুরুর দিকে তিনি Land and Freedom এর সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পত্রিকাটি হেওয়ার্ড5 শহরের বাকুনিন ইনস্টিটিউট থেকে প্রকাশিত হত। এই ইনস্টিটিউট ছিল লালা হরদয়াল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এবং পরিচালিত বিপ্লবীদের জন্য একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। হরদয়াল ঘাদার আন্দোলনের কেন্দ্রিয় নেতা ছিলেন এবং রায়ের আশ্রয়দাতা মি. মুখোপাধ্যায়ের পরিচিত ছিলেন।

ক্যালিফোর্নিয়ার শুরুর দিনগুলোতে ১৯১৭ এর প্রথম দিকে তিনি ভারতীয় অভিবাসীদের সংস্পর্শে আসেন এবং মাস দুয়েক পর চরমপন্থী নেতা লালা লাজপাত রায়ের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। এটা পরিস্কার যে রাশিয়ান বিপ্লবের শুরুর আগে নিউইয়র্কে থাকাকালে ব্যাডিকাল সার্কেল-এর তিনি বিচিত্র সব বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিপ্লবী ধ্যানধারণার সংস্পর্শে আসেন। এদের মধ্যে ছিল অ্যানারকো-সিন্ডিক্যালিজম, সমাজতন্ত্র এবং শান্তিবাদ। রায় বিস্ময়ের সঙ্গে এমন একটি বৈপ্লবিক পরিবেশ আবিষ্কার করলেন যেখানে বিপ্লবীরা জাতীয়তাবাদ আঁকড়ে থাকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং আন্তর্জাতিকতাবাদ বা বিশ্বমানবতাবাদের প্রচারক রূপে ভূমিকা পালন করছে। ‘‘স্বাভাবিকভাবেই (…) আমাদের নতুন বন্ধু হল– যারা ছিল বিপ্লবী (…)। তারা ব্রিটিশবিরোধীও নয়, জার্মানবিরোধীও নয়, তারা শান্তিবাদী, যুদ্ধের বিপক্ষে। কেউ কেউ ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী।”6 নিউ ইয়র্কে তিনি শ্রমিক শ্রেণীর সংকট সম্পর্কে জানতে পারেন এবং উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন তাঁর কাছে সংকীর্ণতা মনে হতে থাকে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর সামনে চিন্তা এবং আন্দোলনের নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, যার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তখনো তাঁর কাছে সম্পূর্ণ রূপে ধরা দেয়নি।

১৯১৭ এর শেষের দিকে পশ্চিম উপকূলে ভারতীয় চরমপন্থী অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়, যাদের অধিকাংশই ঘাদার চক্রের সাথে জড়িত। জার্মানীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার আগে এপ্রিল মাসে আমেরিকান সরকার ১০৫ জন ভারতীয়র বিরুদ্ধে নিরপেক্ষতা লংঘনের অভিযোগ7 আনে, এদের মধ্যে ৩৬ জন ছিলেন ঘাদার আন্দোলনের সাথে জড়িত; যেমন তারকনাথ দাস, ভগবান সিং এবং সন্তোখ সিং। শীঘ্রই মি. রায়কে নিউ ইয়র্ক থেকে বহুল আলোচিত ‘‘হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলা”র আসামী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়, তবে বিচার শুরু হবার আগেই তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। বার্লিনে যাবার সম্ভাবনা নাকচ হয়ে যায় এবং পুলিশের কড়া নজরদারি ও অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় ভারতে ফেরাও অসম্ভব মনে হয়। এই পরিস্থিতিতে দক্ষিণ সীমান্তে অবস্থিত ‘‘দীর্ঘস্থায়ী বিপ্লবে আচ্ছাদিত মেক্সিকো আশার আলো দেখায়”। তিনি ক্যালিফোর্নিয়াতে তাঁর বন্ধু ডেভিড স্টার জর্ডানকে অনুরোধ করেন জেনারেল সালভাদর আলভারাদোর কাছে একটি সুপারিশপত্র পাঠাতে এবং তারপর ১৯১৭ এর গ্রীষ্মে দক্ষিণে নিয়তি-নির্দিষ্ট যাত্রা করেন। যদিও তিনি নিপীড়নের ভয় করছিলেন, তবু তাঁর মনে হয়েছিল যে, যেমন তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, যদি তিনি গন্তব্যে নাও পৌঁছান, তবু ‘‘বিদ্রোহে সরাসরি অংশগ্রহণ”8 এর একটি সুযোগ অন্তত পাবেন।

বৈপ্লবিক মেক্সিকোতে একজন বাঙালি বিদ্রোহী

মেক্সিকো নিয়ে রায়ের প্রধান পরিকল্পনা ছিল ইউকাতানে পৌঁছানো। কারণ তিনি মনে করেছিলেন যে সেখানে জেনারেল সালভাদর আলভারাদো ‘‘মায়া সভ্যতার9 উৎপত্তিস্থলে একটি সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন”। যা হোক, উপযুক্ত স্থল বা রেলপথের অভাব এবং গালফের মেক্সিকান উপকূলে আমেরিকান যুদ্ধজাহাজের আগ্রাসী উপস্থিতি তাঁর দক্ষিণ উপদ্বীপে পৌঁছানো অসম্ভব করে তুলল। অল্প কিছুদিন পর সীমান্ত অতিক্রম করার পরপরই তিনি মেক্সিকো সিটিতে আশ্রয় নেন। এখানেই তিনি পরবর্তীতে জার্মান কনসুলার কর্তৃপক্ষের সহায়তায় তুলনামূলক স্বাধীন11 এবং স্বচ্ছন্দ্য জীবনের আস্বাদ পান। জার্মান কনসুলার কর্তৃপক্ষ ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী এবং আমেরিকাবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত10। তিনি কলোনিয়া রোমার একটি অভিজাত হোটেলে থাকতেন যেখানে আরো থাকত ‘‘উদ্ধত অ্যাংলো-আমেরিকান”রা যারা কিনা পোরফিরিও ডিয়াজের ক্ষমতা হাবানোর স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত ছিল এবং সবসময় অজানা কোনো রোগে আক্রান্ত হবার ভয় করত।12 স্মৃতিকথায় আছে, মি. রায়ের মন সবসময়ই ভারতে ফিরে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে যোগ দিতে উদগ্রীব ছিল। তিনি বলেছেন যে জার্মান সরকারের সহায়তায় প্রশান্ত মহাসাগরের মেক্সিকান উপকূল থেকে জাপান হয়ে জলপথে ভারতে প্রবেশের একটি পরিকল্পনা হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ভারতে পৌঁছতে পারেননি কিন্তু দীর্ঘ ভ্রমণের ফলে ওই দেশের বিস্তীর্ন এলাকা তাঁর দেখা হয়ে গিয়েছিল। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে গুদালাহারা, মানযানিয়্যো এবং সালিনা ক্রুজ বন্দর পর্যন্ত রেলযাত্রার বর্ণনা দিয়েছেন। এই বন্দর থেকেই তাঁর জাপানগামী জার্মান জাহাজে চড়ার কথা ছিল। ব্যর্থ হয়ে তিনি আবার মেক্সিকো সিটিতে ফিরে আসেন তেহুয়ানতেপেকের ইস্থমাস এবং ভেরাক্রুজ রাজ্যের ভেতর দিয়ে। এই ভ্রমণ তরুণ যাযাবরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পার্বত্য শহর ওরিযাবায় সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালে তিনি সেখানকার কফির স্বাদ নেন এবং একে ‘‘পৃথিবীর সেরা কফি” বলে আখ্যায়িত করেন। নতুন দেশে তাঁর অভিজ্ঞতা শুধু ভূপ্রকৃতি আর কফির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মেক্সিকোর চরিত্র, তিনি দাবি করেছিলেন, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার অন্য যে কোন দেশের চেয়ে তাঁর জন্য বেশি উপযুক্ত। এর একটি কারণ ছিল, মেক্সিকানরা খুব একটা নিয়মানুবর্তী নয়। এ বিষয়ে তিনি আনন্দের সাথেই বলেছেন,‘‘সময়নিষ্ঠতার অভাব মেক্সিকোতে দোষের নয়”।13

রাজধানীতে ফিরতে বাধ্য হয়ে তিনি দ্রুতই এর ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক জীবনে জড়িয়ে পড়েন। এই শহরে অবস্থানের প্রথম দিকে এখানকার নতুনত্ব আর অসংখ্য বৈপরীত্য মি. রায়ের চোখ ঝলসে দেয়। যে রাজনৈতিক এবং নাগরিক কল্পনা পরফিরিয়াতো(১৮৭৬-১৯১১) যুগে মেক্সিকো সিটির ভিত্তি তৈরি করেছিল, সেটা গঠিত হয়েছিল ফ্রান্সের প্রতি গভীর এবং বিরোধাত্মক এক ধরণের মোহ থেকে। মেক্সিকান অভিজাত শ্রেণীর কাছে সে সময়ে ফ্রান্স ছিল সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক আদর্শ। একটা গভীর ফ্রাংকোফিলিয়া (ফ্রান্সপ্রেম) এই অভিজাত শ্রেণীকে আধুনিকতার সন্ধান দিয়েছিল এবং রায় ১৯১৭ সনে যে শহরে অবস্থান করছিলেন, তার বস্তুগত কাঠামো তৈরি হয়েছিল। ১৯১১ ছিল পরফিরিও ডিয়াজ-এর শাসনের শেষ বছর। সে সময়ে শহরের পশ্চিম অংশ পাশ্চাত্য ঢঙে গড়ে ওঠার একটা তৎপরতা লক্ষ করা গিয়েছিল, বিশেষ করে প্যারিস এবং লন্ডন হয়ে উঠেছিল আদর্শ শহর। তখনই সেখানে আধুনিক স্থাপত্যকলার সর্বোচ্চ প্রসার পরিলক্ষিত হয়: প্রশস্ত Paseo de la Reforma, আকর্ষণীয় Palacio de Bellas artes (চারুকলা ভবন) যা মার্বেল পাথর এবং ইস্পাত দিয়ে তৈরি, এবং Alameda পার্ক যা সেন্ট্রাল স্কয়ারের সাথে যুক্ত হয়েছিল। আরো বলা যায় Zocalo বা ফ্যাশনদুরস্ত Plateros স্ট্রীটের কথা যা দামী এবং বিরল বুটিকের জন্য বিখ্যাত। সমসাময়িক এক কবি দীর্ঘশ্বাসের সাথে যাকে El boulevard14 বলেছেন আখ্যায়িত করেছেন। Zocaloর অন্যপাশে গ্রাম্য আদিবাসীদের বসবাস, যারা তাদের পূর্বপুরুষের জমির উপর অধিকার হারিয়ে বস্তিতে বসবাস করছে এবং তাদের বর্তমান জীবনযাত্রা খুব কমই মানুষের নজরে পড়ে। পূর্বদিকের সরু রাস্তাগুলোতে বসবাস করে শহরের অধিকাংশ শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ যাদের বেশিরভাগই আদিবাসী এবং দরিদ্র অভিবাসী। অথচ মাত্র দুই মাইল পশ্চিমে যে জাঁকজমকপূর্ণ শহরের দেখা মেলে, তার সাথে এই নোংরা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের বিন্দুমাত্র মিল নেই।15

রায় যখন এই শহরে আসেন, তখন সেখানে পাঁচ লাখ অধিবাসী ছিল, সেখানে ছড়িয়ে পড়া সহিংস বিপ্লবের কারণে শহরের অবকাঠামো দীর্ঘদিন ছিল অপরিবর্তিত। অথচ, পূর্ববর্তী বছরগুলোতে মেক্সিকো সিটির অস্থিতিশীল পরিবেশের কারণে সেখানকার সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবন প্রচন্ড হতাশায় পর্যবসিত হয়েছিল। এই শহর বহু শাসনকাল আসতে এবং যেতে দেখেছে, বহিঃশত্রুর অপ্রত্যাশিত আক্রমণের সাক্ষী হয়েছে–বিশেষ করে পাঞ্চো ভিইয়া এবং এমিলিয়ানো সাপাতা, যাকে তৎকালীন রক্ষণশীল সংবাদপত্রে আত্তিলা বাহিনির পুনরাগমণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তদুপরি সেখানে ছিল ত্রাসের রাজত্ব, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তা। ১৯১৭ সনে সেখানে সাংবিধানিক পরিবর্তন আনা হয় যাতে বিজয়ীরা জাতিয় জীবনে স্থিতিশীলতা স্থাপনের নিশ্চয়তা দিয়েছিল। আরিয়েল রদ্রিগেস কুরির মতে, ১৯১০ দশকের শেষের দিকে শহরে শুরু হল ‘‘ শ্রেণীবৈষম্য বিরোধী এক আন্দোলন এবং এর ফলে সমাজে শৃংখলা ফিরতে লাগল”। বহু দশক ধরে যারা সমাজের ধনী এবং ক্ষমতাবান শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে এসেছে, তাদের অবস্থান স্পর্শকাতর হয়ে গেল। আর যে-দরিদ্র জনগোষ্ঠী অস্থিতিশীলতা এবং দুর্ভিক্ষের কারণে আরো দারিদ্রে পর্যবসিত হচ্ছিল, তারা নাগরিক জীবনে16 প্রধান ভুমিকা পালনে অবতীর্ন হল। শহরের গতি এবং রাজনৈতিক জীবনে একটি মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হল। জনসংহতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে স্থায়ী পরিবর্তন নিয়ে এল। ১৯১৭ সনের আগে এই শহর এবং এর অধিবাসীরা বহু বছর ধরে বংশপরম্পরায় ধনী এবং দরিদ্রদের বিভাজন দেখে এসেছে। কিন্তু এবার সৈনিক এবং কৃষকদের মাধ্যমে ‘অন্যদের’ আগমন হল, যাদের অনেকেই আদিবাসী। এরা বিভিন্ন সেনাবাহিনির সাথে এ শহরে প্রবেশ করেছিল। নাহুয়াতল কৃষকেরা দক্ষিণের মোরেলস শহর থেকে সাপাতাকে অনুসরণ করে শহরে উপস্থিত হয়। উত্তর প্রদেশ থেকে ইয়াকিসরা এসে শহরে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কারণে সম্ভ্রান্ত-অভিজাতদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়।17

স্মৃতিকথায় রায় মেক্সিকো সিটিতে তাঁর প্রথম দিনগুলোর কথা স্মৃতিকাতর হয়ে স্মরণ করেছেন। ওই সময়টাতে তিনি পোরফিরিয় প্রশস্ত boulavards স্বাধীনভাবে বিচরণ করেছেন, সচিমিল্কোর খালগুলোতে নৌভ্রমণ করেছেন এবং কলোনিয়া রোমায় অবস্থানকালে তার ঘরের জানালা থেকে ইস্তাকচিউয়াতল ভলকানোর অসংখ্য ছবি তুলেছেন। সুচেতনা চট্টোপাধ্যায় দেখিয়েছেন যে, কোলকাতায় তাঁর শেষ দিনগুলোতে মি. রায় নানান ভাবে কর্তৃপক্ষের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন, বন্ধু এবং পরিচিতজনদের দয়ার উপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়েছেন এবং একটি চাকরি যোগাড় করতে না পেরে চরম দারিদ্রে পর্যবসিত হয়েছেন আর এসবই হয়েছে উপনিবেশবিরোধী রাজনৈতিক18 সম্পৃক্ততার কারণে। কাজেই, মেক্সিকো সিটি তাঁকে এমন একটি পরিবেশ দিয়েছিল, যা ছিল পুরোপুরি কোলকাতার বিপরীত। কোলকাতা তখন একটি ধ্বংসাবশেষ।19 ঔপনিবেশিক সরকার ততদিনে ১৯১১ সনে কোলকাতাকে ফেলে দিল্লীতে তার সদর দপ্তর স্থাপন করেছে।

মেক্সিকো সিটিতে আসার পরপরই বামপন্থী সংবাদপত্র এল পুয়েবলোর সদস্যরা তাঁর সাথে যোগাযোগ করে এবং ভারতের রাজনৈতিক20 অবস্থা সম্পর্কে প্রবন্ধ লেখার আহবান জানায়। জার্মান দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ থাকায় তিনি মেক্সিকোর সরকারি কর্মকর্তাদের সংস্পর্শে আসেন এবং তাদের মাধ্যমে তিনি মেক্সিকো সিটিতে21 বসবাসরত উদার দৃষ্টিভঙ্গির বুদ্ধিজীবী, শিল্পী এবং কূটনীতিকদের সাথে মেশার সুযোগ পান। ১৯১৭ সনের শেষের দিকে রায় ঘোড়ায় চড়া শেখেন, দাবা খেলা আয়ত্ব করেন এবং সামাজিকতা বজায় রাখতে গিয়ে মদ্যপান শুরু করেন। তিনি মেক্সিকোতে তাঁর প্রথম বছরগুলোকে ‘‘জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়”22 বলে দাবি করেছেন।

তথ্যের অসামঞ্জস্য এবং বহুক্ষেত্রে অতিকথন–যেমন প্রেসিডেন্ট কারানযার সাথে তাঁর ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ, যার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই–সত্বেও মি. রায়ের আত্মস্মৃতিতে যে মেক্সিকোর কথা উঠে এসেছে, সেটা আদর্শগতভাবে উদার, ধারণাগতভাবে অস্বচ্ছ এবং রাজনৈতিকভাবে উদার প্রাক-বিপ্লব এক জনগোষ্ঠীর ইতিহাস। মেক্সিকোতে বামপন্থী রাজনীতির আবির্ভাবের ইতিহাস অনুধাবন করার জন্য তাঁর এই আত্মস্মৃতি বেশ গুরুত্বপূর্ণ (নভেম্বর ১৯১৯): এই বামপন্থী আন্দোলন শুরু হয়েছিল কিছু অস্বাভাবিক ব্যর্থতা থেকে–অনেকটা রায়ের জার্মানী যাত্রায় ব্যর্থতার মতো–এবং বিপ্লবীদের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক থেকে যারা এসেছিল তারা বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকা থেকে এসেছিল এবং সঙ্গে এনেছিল আদর্শগত নানান মতের সমাহার। ১৯১৭তে আমেরিকার একদল বিপ্লবীর সাথে মি. রায়ের বন্ধুত্ব হয় যারা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে গ্রেফতার এড়ানোর জন্য মেক্সিকোতে আশ্রয় নিয়েছিল। পরবর্তীতে ঐতিহাসিক রচনাসম্ভারে এবা Slackers হিসেবে পরিচিতি। এরা লেনিনের বলশেভিক আন্দোলন দ্বারা অনুপ্রানিত হয়ে একটি আন্তর্জাতিক মতাদর্শ প্রচার করেছিল। তাদের এই কর্মকান্ড ছিল আমেরিকান23 সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। রায়ের মতোই এরাও মেক্সিকোতে চলমান বিপ্লবের সমর্থক ছিল এবং এদের অনেকেই ভেনুস্তিয়ানো কারানযার–তিনি তাঁর আমেরিকাবিরোধী মতাদর্শের24 জন্য বিখ্যাত ছিলেন– নেতৃত্বাধীন মেক্সিকান সরকারের মিত্র বলে বিবেচিত হত। এই Slackersদের মাধ্যমেই (যারা কিনা মেক্সিকোতে তাঁদের বিদেশী পরিচয়ের উর্ধ্বে উঠেছিল) রায় পরিচিত হন আদোল্ফো সান্তিবানঞেস-এর সাথে। তিনি ১৯১১ সনে প্রতিষ্ঠিত সোশালিস্ট লেবার পার্টির একজন পুরনো নেতা। এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জার্মান থেকে আসা অভিবাসী এবং পিয়ানো বাদক পল জিয়েরল্ড25। রায় তাতে ঠাট্টা করে ‘মেক্সিকোর কার্ল মার্ক্স’ বলে অভিহিত কারণ তাঁরও মার্ক্সের মতোই লম্বা সাদা দাড়ি26 ছিল। খুব শীঘ্রই রায় এবং অন্যান্য Slackers, যেমন হোসে এলান, ফ্র্যাংক সীম্যান এবং চার্লস শিপম্যান সোশালিস্ট লেবার পার্টিতে যোগদান করেন, যার অধিকাংশ সদস্যই ছিল মেক্সিকোর পাচুকা এবং পুয়েবলোর27 শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষ। এই নতুন যোগদানকারী আন্তর্জাতিক সদস্যরাই ১৯১৮ এর ডিসেম্বরে সোশালিস্ট লেবার পার্টির প্রথম কনফারেন্স-এর আয়োজন করেন। মি. রায়ের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম কনফারেন্সে বলশেভিক আন্দোলনের সফলতাকে উদযাপন করা হয়েছিল, মেক্সিকোর সংরক্ষিত তেলের উপর সাধারণ জনতার অধিকার ঘোষনা করা হয়েছিল, ইয়াঙ্কি সাম্রাজ্যবাদের সমালোচনা করা হয়েছিল এবং ল্যাটিন আমেরিকার সকল অত্যাচারিত জনতাকে এক কাতারে আসার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এই কনফারেন্সে মেক্সিকোর বিভিন্ন রাজ্য এবং কেন্দ্রিয় ও দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো থেকে বেশ কিছু বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। যেমন, জন রীড, অান্তোনিও কাসো এবং প্লুতার্কো এলিয়াস কাইয়েস যিনি পরবর্তীকালে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।28

১৯১৮’র কনফারেন্সের পরে রায় একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। এর প্রমাণ পাওয়া যায় যখন তিনি দলের ভেতর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আগের চেয়ে শক্ত অবস্থানে পৌঁছান। সেই সাথে ১৯১৯ এর ১১ই জুন একটি প্রস্তাব সাক্ষর করেন যেখানে ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদেরকে আমেরিকা থেকে বের করে দেয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটনের প্রস্তাবের বিরোধীতা করা হয় এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের29 বিরুদ্ধে ভারতীয়দের আন্দোলনে অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া হয়। নয় মাস পর ১৯১৯ এর আগস্টের শেষে এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে মেক্সিকো সিটিতে প্রথম জাতীয় সমাজতান্ত্রিক কনফারেন্স শুরু হয়। এই কনফারেন্সে সারাদেশ30 থেকে কমপক্ষে ৬০ জন রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ইউনিয়ন নেতারা অংশ নেন। এই কনফারেন্স সম্পর্কে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তাতে মনে হয় একটি বিস্তৃত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলাই আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল। এই কনফারেন্সের সমাপ্তি ঘোষণার সময় সোশালিস্ট লেবার পার্টির নেতারা, বিশেষ করে রায় এবং হোসে এলেন তৃতীয় কনফারেন্সে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত পরিস্কার ঘোষণা করেন।31

১৯১৭ এবং ১৯১৯ সনের মধ্যে সোশালিস্ট লেবার পার্টির প্রাসঙ্গিকতা বেড়ে যায়, ফলে মেক্সিকোর বিপ্লবী চরমপন্থীদের মধ্যে মার্ক্সবাদ-এর চর্চা আরো বৃদ্ধি পায়। বৈপ্লবিক ধারণার প্রচার সত্বেও লেবার পার্টির সাথে রায়ের সম্পৃক্ততার প্রথম দিনগুলোতে বামপন্থীদের মধ্যে মার্ক্সবাদ ততটা প্রচার পায়নি। এই বামপন্থীদের অধিকাংশই ছিল নৈরাজ্যবাদী এবং উদারপন্থী ধারণার32। যদিও রায় বলেছেন যে ১৯১৬ সনে নিউ ইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরিতে প্রথম তিনি কার্ল মার্ক্স-এর দর্শনের সাথে পরিচিত হন, তবু ১৯১৯ সনের শুরু পর্যন্ত তিনি স্বদেশী আন্দোলনে বিশ্বাসী ছিলেন। মেক্সিকোতে থাকাকালীন তিনি যে লেখাগুলো প্রকাশ করেছিলেন, তাতে তাঁর এই স্বদেশী মানসিকতা স্পষ্ট। এর মধ্যে প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল La voz de la India(ভারতের কন্ঠস্বর) ১৯১৭ সনে। এই লেখাটিতে তিনি উনবিংশ শতকের ভারতীয় উদারপন্থী বিপ্লবীদের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক যুক্তিকেই সমর্থন দিয়েছিলেন এবং ‘ড্রেইন অফ ওয়েলথ’ মতবাদকে সমর্থন দিয়েছিলেন যার পক্ষে দাদাভাই নওরোজির33 মতো মানুষও সাফাই গেয়েছিলেন। তাছাড়া, তাঁর দ্বিতীয় মেক্সিকান বই La India: su pasado, su presente y su provenir( ভারত: তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত) প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১৮ সনের শেষের দিকে। বইটি তিনি কৃতজ্ঞতা সহকারে মেক্সিকানদের উৎসর্গ করেছেন। এই বইয়েও আগের লেখার মতোই ব্রিটিশবিরোধী সুর পাওয়া যায় এবং পুরো পাশ্চাত্য সভ্যতার সমালোচনা এতে রয়েছে। ভূয়া শ্রেষ্ঠত্ববোধের34 মানসিকতায় মাতালদের এক সংস্কৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন পশ্চিমা সভ্যতাকে। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার এই সমালোচক পাঠককে গান্ধীর হিন্দু স্বরাজ-এর কথা যতটা স্মরণ করিয়ে দেন, মার্ক্সের দর্শনের প্রতি ততটা জোর দেন না। এসব বই এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত তাঁর লেখাগুলো থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রায় একজন উপনিবেশবিরোধী এবং বিংশ শতকের ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সমর্থক। একই সাথে তাঁর উপনিবেশবিরোধী ক্ষোভ আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের নিপীড়িত জনগণের মুক্তির দিকে প্রসারিত হয়। এই বিষয়টা পুরোপুরি পরিষ্কার হয় ১৯১৮ সনের ৩রা সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি লেখায় যা প্রকাশিত হয়েছিল El Heraldo de Mexico নামক খ্যাতনামা পত্রিকায়। এই লেখায় তিনি মনরো ডকট্রিন-এর কড়া সমালোচনা করেন এবং পুরোনো সাম্রাজ্যবাদী চেতনাকে পুনর্জাগ্রত করার অপরাধে আমেরিকাকে আক্রমণ করেন।

ওই সময়টাতে যদিও তাঁর লেখায় কখনোই মার্ক্সবাদ বাস্তবায়ন করার কোনো সম্ভাবনা উঠে আসেনি, তবুও ১৯১৯ সনের নভেম্বরে, ন্যাশনাল সোশালিস্ট পার্টির কনফারেন্স (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) শেষ হবার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, তিনি অ্যালেনকে সঙ্গে নিয়ে মেক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টি (পিসিএম) গঠন করেন এবং খোলামেলা ভাবেই বলশেভিক পার্টির প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন। অক্টোবর বিপ্লবের পর এটাই ছিল প্রথম সমাজতান্ত্রিক দল। আগের সোশালিস্ট লেবার পার্টির যে সকল সদস্য এই নতুন দলে যোগ দিলেন, তাঁদের পরামর্শদাতা ছিলেন মিখাইল বরোদিন, যিনি ১৯১৯ সন থেকেই ছিলেন একজন রহস্যময় সোভিয়েত এজেন্ট এবং নবগঠিত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের একজন গুপ্তচর।

যেহেতু ১৯১৯ সনের আগে সমাজতন্ত্র বা মার্ক্সবাদ সম্পর্কে রায়ের পরিষ্কার ধারণা ছিল না, কাজেই বরোদিন-এর উপস্থিতি রায়ের চিন্তাশীলতা এবং মেক্সিকোর প্রাতিষ্ঠানিক সমাজতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল কারণ, বরোদিন রাশিয়ান বিপ্লবের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন এবং লেনিনের দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ঐতিহাসিকেরা এখন পর্যন্ত মেক্সিকোতে বরোদিন-এর উপস্থিতির ব্যাখ্যা পুরোপুরি দিতে পারেননি। আমরা জানি যে বরোদিন কিছুদিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এবং সেখানেই স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্যারিবিয়ান দেশগুলোতে, বিশেষ করে কিউবাতে ভ্রমণের পর এবং যুক্তরাষ্ট্রে বলশেভিকদের একটি কার্যালয় প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়ে তিনি অবশেষে ১৯১৯ সনে মেক্সিকোতে এসে উপস্থিত হন। এই রহস্যময় রাশিয়ান ব্রানটোইন ছদ্মনামে ভ্রমণ করতেন। তিনি স্প্যানিশ খুব ভালো জানতেন না। ফলে মেক্সিকোতে থাকাকালীন প্রথম দিকে তিনি লেবার সোশালিস্ট পার্টির ইংরেজি জানা সদস্যদের সাথেই যোগাযোগ রক্ষা করতেন। মি. রায় দাবি করেন যে, El Heraldo de Mexico পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ পড়ে বরোদিন তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন। কিছুদিন ঘনিষ্ঠভাবে আলোচনার পর তিনি রায়কে ‘‘হেগেলের ডায়ালেক্টিক এর সাথে মার্ক্সবাদের সম্পর্ক বোঝান”। মি. রায়ের স্মৃতিকথা মাথায় রেখে কিছু জীবনীকার মনে করেন যে, ওই আলোচনাই ছিল রায়ের মার্ক্সবাদে হাতেখড়ি। যা হোক, ব্যারি কার মনে করেন, বরোদিনের মেক্সিকোতে আগমন এবং পিসিএম গঠনের মাঝখানে যে দশ সপ্তাহ, সেই সময়টা রায় বা যে কারো মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী হবার জন্য যথেষ্ঠ ছিল না। তবে, এই রাশিয়ান গুপ্তচর ইউরোপে সমাজতন্ত্রের ভূমিকা সম্পকে রায়কে পরিষ্কার ধারণা দেয়ার যথেষ্ট সময় পেয়েছিলেন। হতে পারে রায় মনে করেছিলেন যে বরোদিন তাকে জার্মানীতে পৌঁছতে সাহায্য করতে পারবেন যাতে তিনি তার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের সমর্থন যোগাতে পারেন। এটা নিশ্চিত যে, পিসিএম প্রতিষ্ঠার কয়েক সপ্তাহ আগে রায় বরোদিনকে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, নিজের পরিচিত গণ্ডির মধ্যে যেটুকু সম্ভব তিনি বরোদিনকে রাশিয়ান বিপ্লবের সমর্থক মেক্সিকান গোষ্ঠীর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। যদি আমরা ধরেও নিই যে বরোদিন এবং রায়ের বন্ধুত্বটা ছিল শুধু যার যার দেশপ্রেমের খাতিরেই, তবু বলা যায় যে রাশিয়ান দূত খুব সচেতন ভাবেই এই বাঙালি বিপ্লবীর চিন্তুা এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গীকে প্রভাবিত করেছিলেন। ১৯১৯ এর শেষ মাসগুলো ছিল তাঁর শিক্ষার মাস। ওই সময়টা সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন যে সেটা ছিল নিজের ভেতর সমন্বয় সাধনের সময়। সময়টাকে তিনি জীবনের সেরা সময় বলেছেন। এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৯২০ এর কনফারেন্স অফ দ্য কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এ তিনি উপনিবেশের উপর তাঁর থিসিস উপস্থাপন করেন এবং সেই একই কনফারেন্সে লেনিন তাঁর যুক্তি তুলে ধরেন। এই কনফারেন্স-এর পর রায় কমিউনিজমের একজন অন্যতম কেন্দ্রীয় তাত্ত্বিক হয়ে ওঠেন।
১৯১৯ এর ডিসেম্বরে রায় মেক্সিকোকে চিরতরে ছেড়ে ভেরাক্রুজ থেকে নৌপথে পূর্ব দিকে যাত্রা করেন। তিনি তাঁর ‘‘পুনর্জন্মভূমি ছেড়ে যাচ্ছিলেন একজন মুক্তচিন্তুার মানুষ হিসেবে যার অস্ত্র ছিল নতুন এক বিশ্বাস।” মেক্সিকোতে যেসকল মানুষ এবং চিন্তাধারার সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন, সেসবই তাকে হাত ধরে নিয়ে এসেছিল কমিউনিজমে। মাত্র তিন বছর আগেই তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের সন্ধানে আমেরিকায় এসেছিলেন এবং আজ চলে যাচ্ছেন নতুন এক ধারণাকে অস্ত্র করে। ‘‘অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারহীন কোনো রাজনৈতিক স্বাধীনতায় আমি বিশ্বাস করি না।(…) এই নতুন বিশ্বাস নিয়ে আমি বিশ্ব পাড়ি দিয়ে আবার ভারত অভিমুখে যাত্রা করলাম।”

2. Roy, Memoirs. pp. 59-60
3. See Zimmer, Immigrantsagainstthestare.
4. For more on the importance of the PLM for anarchist sectors on both sides of the border at the time, see Claudio Lomnitz, The Return of Comrade Flores Magon.
5. Zimmer, Immigrantsagainstthestate. 106.
6. Roy, Memoirs. p-27.
7. Ramnath, “Two Revolutions”. pp. 16-17
8. Roy, Memoris, p. 43.
9. Ibid.
10. For more on Germany’s involvement in revolutionary Mexico see Katz, The Secret War.
11. Ray, In Freedom’s quest. p. 19.
12. Ray, Memoirs. p. 56.
13. Roy. Memoirs,p. 104.
14. Tablada. La feria de la vida (memorias), p 144.
15.For more on Mexico City in the early XX Century, see ( Michael Johns, The City of Mexico in the Age of Diaz, University of Texas Press, Austin, 1997)
16. Rodriguez Kuri, Historia del Desasosiego, p. 134.
17.Plancarte, La Ciudad de Mexico, p. 351.
18. Chattopadhyay, “Being Naren Bhattacharji”, pp. 51-53.
19. Ibid, p. 44.
20. Roy, Memoirs, 70-71
21. Ibid. pp. 96-97.
22. Ibid, pp. 123-130.
23. La Botz, American “Slackers” in the Mexican Revolution”.
24.For more on the activities of these slackers and their relationship to the Mexican political establishment at the time, see Spenser, The Impossible Triangle. pp. 51-62.
25. For more on the Partido Obrero Socialista of 1911, see Illades, Las otras ideas, pp. 259-260
26. Roy, Memoirs. 77
27. Shipman, It Had to Be Revolution, pp. 74-75, Carr, Marxism and Anarchism in the Foirmation of the Mexican Communist Party” p. 293.
28. Roy, Memoirs, pp. 141-146.
29. Carr, La izquierda mexicana a traves del siglo xx. p. 35.
30. El Heraldo de Mexico, 3 de septiembre de 1919
31. Schmitt, Communism in Mexico. p. 6.
32. Carr, Marxism and Anarchism in the Formation of the Mexican Communist Party, pp. 139-141; Gonzalez Casanova, En el primer gobierno constitucional, p. 140: Illades, Las otras ideas, pp. 271-274
33.Roy, M. N. La Voz de la India.
34.M.N. Roy, La India: su pasado, su presente y su provenir, Mexico, (n.p.) 1918.
35. On the fraught relationship between the Comintern and Latin American communists, see Caballero, Latin America and the Komintern, 1986, and Lazar y Victor Jeifets, America Latina en la International Comunista, 1919-1943.
36. M. Churchill al Departmento de Justicia”, 4 de marzo, 1920, NA, BIDJ, OG 247149, Reporte del Agente Spolansky”, 28 de enero, 1920, NA, BIDJ, OG 267149, in Cardenas, Las relaciones mexicano-sovieticas, pp. 42-46.
37. Gomez, From Mexico to Moscow”, p. 37. On Borodin’s trips in the Caribbean, see Victor Jeifets, Michael, Borodin,. The First Comintern emissary to Latin America (Part One).
38.Gomez, From Mexico to Moscow”, pp. 38-39.
39.Roy, Memoirs, pp. 178-195
40. Carr. La lzquierda mexicana a traves del siglo xx. p. 41.
41. Gomez. From Mexico to Moscow, p. 41
42. Ibid. p. 215.
43. Ibid. pp. 219-220.

Flag Counter


1 Response

  1. Dr.j.bhsttacharjee says:

    খুব তথ্যবহুল লেখা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.