সাক্ষাৎকার

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে

রাজু আলাউদ্দিন | 27 Mar , 2018  

নাসির উদ্দীন ইউসুফ, আমাদের চিরকালের গৌরব, তিনি সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা যিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে ঝাপিয়ে পরেছিলেন। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে এসেছিলেন আমাদের জন্য অমূল্য উপহার হাতে নিয়ে: আমাদের কাঙ্ক্ষিত সবুজ ও লালের এক অমর স্বাধীনতা। তিনি যদি জীবনে আর কিছুই না করতেন, তারপরেও তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন। কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের আছে আরেকটি দিক যেটি শিল্পিত স্বভাবে বর্ণময়। তিনি অামাদের নাট্যজগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রদের একজন। নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্দেশিত/পরিচালিত নাটক মানেই মঞ্চসাফল্যে তুঙ্গস্পর্শী। সফল তিনি চলচ্চিত্র পরিচালনায়ও। নাটক ও চলচ্চিত্রে অসামান্য সাফল্যের জন্য তিনি অসংখ্যবার পুরস্কৃত হয়েছেন। যিনি আমাদের সবার অহংকার, কিন্তু নিজে পুরোপুরি নিরহংকারী স্বভাবের। কয়েকদিন আগে তার সাথে দীর্ঘ এক আলাপচারিতা হলো বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর অফিসে। যুদ্ধকালীন লোমহর্ষক নানান অভিজ্ঞতা আর তার নাট্যকলা নিয়ে শৈল্পিক বয়ান এই আলাপচারিতার মূল আকর্ষণ। বাচ্চু ভাইয়ের অননুকরণীয় বাচনভঙ্গি আর কথার তরঙ্গায়িত প্রবাহ দীর্ঘ আলাপচারিতাকে করে তুলেছে শ্রুতিসুভগ। তরুণ গল্পকার সাব্বির জাদিদের শ্রুতিলিখনে থাকছে সেই আলাপচারিতার পূর্ণাঙ্গ পাঠের প্রথমার্ধ। বি. স.

রাজু আলাউদ্দিন: প্রথমেই আপনাকে স্বাগতম জানাই। সম্ভবত আজই প্রথম আপনি বিডিনিউজে এলেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এই দপ্তরে প্রথম আসলাম। কিন্তু এত বন্ধু এখানে কাজ করে, এমনকি এর প্রধান নির্বাহী যিনি, তিনিও আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যদিও আসা হয়নি কোনদিন। আমি রাজু আলাউদ্দিনের ভক্ত বলে না এসে পারলাম না। হাহাহা।
রাজু আলাউদ্দিন: না না না। আপনার ব্যক্তিত্বের দুটো দিক আমরা জানি। প্রথম হলো, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে, আমাদের স্বাধীনতার সঙ্গে আপনার গভীর সম্পৃক্ততা। এটা একটা দিক। আরেকটা হচ্ছে, নাট্যজগতের আপনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক ব্যক্তিত্ব। প্রথমে আমি প্রশ্ন করতে চাই, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ, এটা কীভাবে ঘটল? আপনি জন্মেছেন পঞ্চাশ সালে। আপনার বয়স তখন বিশ-একুশ।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: একুশে পা দেব তখন, যখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। কিন্তু আমি মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে একুশ হয়েছি। মানে বিদ্রোহের বয়সটা একুশেই অর্জন করেছি, মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। আমি মনে করি, ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনটা খুব গুরুত্বপূর্ণ–প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি। আমার পঞ্চাশে জন্ম। ছাপ্পান্নতে প্রথম স্কুলে ভর্তি হয়েছি। ছয় বছর বয়সে। আমার প্রাথমিক স্কুল এবং হাইস্কুল–এটা ঘটেছে ষাটের দশকে। একষট্টি-বাষট্টি-তেষট্টি। সেই সময়কার বাংলাদেশে দুটো বড় আন্দোলন চলছে। একটি হচ্ছে, সাংস্কৃতিক আন্দোলন। এটা ঘটছে প্রতি ঘরে ঘরে। প্রতি মহল্লায়। পাড়ায়। গানের প্রতিযোগিতা হচ্ছে। গান গাওয়া হচ্ছে। কবিতার খুব একটা তখন চল ছিল না। নাচটা ছিল। আর বছরের শেষে নাটক।

‘‘বঙ্গবন্ধু আমাদের কথা শুনছেন, আমার চিবুকে হাত দিচ্ছেন’’

এটার কারণটা হচ্ছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলেতি পারি’–এই গানটা, আমি মনে করি, আমাদের মতো শিশুকিশোরদেরকে সাংঘাতিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। তখন রবীন্দ্রনাথের অনেক গান আমাদের পিতার মুখে, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনের কণ্ঠে শুনতে পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে এই যে সঙ্গীতের ধারাটা, তার সাথে নৃত্যের ধারাটা, তার সাথে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উন্মেষ ঘটেছিল। যেটা শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে, ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। সেটি আসলে পরিণতি লাভ করে ষাটের দশকে, রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ করার মধ্যদিয়ে সেটা আরো বেশি বেগবান হয়। কালচার এন্ড পলিটিক্স এক হয়ে গেল। আইয়ুব খান একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিল যে, রবীন্দ্রসঙ্গীত নিষিদ্ধ হবে। বাঙালি সংস্কৃতি কর্মীরা বলল যে আমরা রবীন্দ্রচর্চা করবো। তো এই কর্মকে বাধা দেয়ার জন্য যেটা করল, সেটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল। সেইখানে আমার মনে হলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানি, যেসব নেতারা তখন রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে ছিলেন, তারা এটাকে প্রধার একটি ইস্যু করলেন। এখান থেকে বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের নবযাত্রা শুরু হলো। এটার ভেতর দিয়ে আমরা আস্তে আস্তে বড় হয়েছি। তখন স্লোগান আর গান একীভূত হয়ে গেছে। এর মধ্যদিয়ে আমাদের বড় হওয়া। তখন আবার শিক্ষা আন্দোলন শুরু হলো। সেটা হলো ১৯৬২-৬৩-৬৪। এই সময়টা খুবই ইমপর্ট্যান্ট সময় বাঙালির জন্য। খুবই গুরুত্বপূর্ণ সময়। ৬৪ সালে পাকিস্তানে একটা নির্বাচন হয়েছিল। শেখ মুজিবুর রহমান তখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি, পূর্ব পাকিস্তান আমলে। সারা দেশ উনি চষে বেড়িয়েছেন। আমরা তথন ক্লাশ এইটের ছাত্র। আমরা হা করে ওই রকম একটা সুদর্শন মানুষকে দেখি। তাঁর কণ্ঠস্বরে অবাক হয়ে যাই। তাঁর এবং মওলানা ভাসানির চমৎকার একটা ব্যাপার ছিল। তারা রাজনৈতিক মঞ্চে, রাজনৈতিক বক্তৃতার সময় কবিতা আওড়াতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা মওলানা ভাসানিও করতেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ, উনারও এই অভ্যাস ছিল। তবে সবথেকে বেশি ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। আমরা এগুলি পল্টন ময়দানে, অথবা পল্টন ময়দানে নয়, মতিঝিলের কোণায় দাঁড়িয়ে তাদের বক্তৃতা শুনেছি। ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করছেন। প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছেন। এই যে শিক্ষা আন্দোলনের পরপরই এই নির্বাচন,তাতে করে যেটা দাঁড়িয়েছে, বায়ান্নর পরে যেমন চুয়ান্নর নির্বাচন, এই নির্বাচনটায়ও ঠিক সেই ঘটনা ঘটে যেতে পারত। কিন্তু সেটা ঘটল না। কারচুপি হলো। বাঙালি এখানে প্রতারিত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে হয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবে হয়েছে। সুতরাং তার একটা নতুন আন্দোলনের দরকার ছিল। সেইটেই বঙ্গবন্ধু সফলভাবে করেছেন। একষট্টিতে রবীন্দ্রনাথের গান জন্মশতবার্ষিকী নিষিদ্ধকরণ, বাষট্টিতে শিক্ষা আন্দোলন, চোষট্টিতে নির্বাচনে কারচুপি, পঁয়ষট্টিতে পাকিস্তান এবং ভারতের যুদ্ধ, পাকিস্তান বিপর্যস্ত। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তান অরক্ষিত ছিল। এইসব মিলে ছয় দফা আন্দোলন। সুতরাং আমরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি অপ্রাতিষ্ঠানিক কালাচার এন্ড পলিটিক্সের একটা শিক্ষার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছি। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধে যাওয়া ছাড়া আমাদের বিকল্প রাস্তা ছিল না। কারণ, বিশ্বাস করে যে স্লোগানটা আমি দিয়েছি, সেই স্লোগানের বাস্তবায়ন তো কর্মক্ষেত্রে দেখাতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: বাচ্চু ভাই, ওই সময় তো আপনাদের বয়সী আরো অনেক যুবক ছিলেন। সবাই তো আর যায়নি। অনেকেই গিয়েছেন। আমার প্রশ্ন হলো এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনটা ঘটেছে সবার জীবনে, তারপরও আপনি উদ্বুদ্ধ হলেন যুদ্ধে যেতে, এটার কারণ কি এই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক ঘটনা, নাকি ব্যক্তিগতভাবে কেউ আপনাকে উদ্বুদ্ধ করেছে? যেমন ধরা যাক, আপনার বাবা হয়ত আপনাকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন…

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ওখানে আসছি আমি। আমি ইচ্ছা করেই পেছনটা বললাম বোঝার জন্যে। আমি মনে করি সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষাটা আমাদেরকে জাতীয়তাবাদের দিকে ধাবিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, তার নেতৃত্ব, ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানসহ… ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের দিকে তাকালে দেখা যায়, লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় হাঁটছে, স্লোগান দিচ্ছে, দেশের স্বাধীনতা চাচ্ছে, গণতন্ত্র চাচ্ছে। এগুলো আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে। আজকে সিরাজুল আলম খানকে নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, উনি কিন্তু খুব ইনস্পায়ার করেছেন। আব্দুর রাজ্জাক, রাশেদ খান মেনন, মতিয়া আপা, তোফায়েল আহমেদ–এরা কিন্তু আমাদেরকে খুব ইনস্পায়ার করেছেন। এই মানুষগুলো যে রোল প্লে করেছে, এগুলো আমাদেরকে ইনস্পায়ার করেছে। আমাদের মনে হতো এখনই গিয়ে মরে যাই। এটা আবেগ। বয়সের কারণে হয়। আরেকটা কারণ, খুব সত্য কথা বলছি, পঁচিশে মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে আমি যখন যুদ্ধের জন্য ২৭ মার্চ বাসা থেকে বের হলাম, বাবাকে সালাম করে বের হলাম, বাবা বললেন, যাও তুমি। দেশের জন্য যুদ্ধ করো। আমার মা কাঁদছিলেন। উনি মাকে বললেন, তোমার অনেক ছেলে আছে। ছয় ছেলে আছে। যাবে একজন, অসুবিধা কী! এটা তো বিরাট ত্যাগ! কয়জনের বাবা বলে! আমার বাবা যে রাজনীতির সাথে খুব জড়িত ছিল, এমন না। তিনি সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। উনি ১৯৩০ সালের বিসিএসের ফোর্থ মুসলিম বেঙ্গল সিভিল সার্জন ছিলেন। তখন তো বাঙালি মুসলমানদেরকে বিসিএস ক্যাডার করত না ব্রিটিশ সরকার। তখন তো হিন্দুদের আধিপত্য ছিল। কুড়ির দশকে একজন মুসলমানকে নিয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা আর মুসলিম সিভিল সার্জন একসাথেই ঘটেছিল। এটা ওদের একটা প্লানও ছিল। হিন্দু সম্প্রদায়কে আনুগত্যের একটা জায়গায় ঠেলে দিয়ে মুসলিমদেরকেও অনুগত করার একটা জায়গায় হাত দিল, বিভাজনের মধ্যদিয়ে। আর আমার দুই ভাই ভাষা আন্দোলনের সদস্য ছিল। এক ভাই স্কুলে পড়তেন। এক ভাই কলেজে পড়তেন। বড়ভাই আর মেজোভাই। বড় ভাই মারা গেছেন। মেজো ভাই এখনো বেঁচে আছেন। মেজো ভাইয়ের বয়স এখন আশি। বড় ভাই বেঁচে থাকলে বিরাশি বছর হতেন।
রাজু আলাউদ্দিন: দুই বছরের ব্যবধান ছিল।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমি যখন বড় হয়েছি, মায়ের ঘরে দেখেছি, পুরনো আমলের বাড়িতে দেয়ালের সাথে খাঁজ কাটা তাক থাকে, যেখানে জিনিসপত্র রাখা হয়, ওখানে একটা লাল কৌটা ছিল। ওটা নিয়ে আমি গন্ধ শুঁকতাম। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম ওটা কী? বলা হলো ওটা টিয়ার শেল। পুলিশ মেরেছে। ভাই এনে রেখেছে। এই ধরনের ছোট ছোট জিনিসগুলো, আন্দোলনের এই অনুষঙ্গগুলো বাড়ির মধ্যেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তবে আমাদের পরিবার খুব একটা রাজনৈতিক পরিবার ছিল না। সচেতন ছিল। কিন্তু কোনো রাজনীতির সাথে আমাদের কেউ-ই জড়ায়নি।
রাজু আলাউদ্দিন: তো আপনার আব্বা বললেন যে, তুমি যাও। দেশের জন্য যুদ্ধে যাও। আপনার বন্ধুবান্ধব…
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তারা তো আগে থেকেই তৈরি ছিল। সেটার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল। ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের সময় থেকেই আমাদের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যে নির্দেশমালা, সেগুলো তো সারা দেশে যেত। এবং ঢাকাকেও বিভিন্ন মহল্লায় ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। সেখানে আমাদের একটা ভাগ ছিল পল্টন। পল্টনে একটা ছিল। সেগুনবাগিগচা, মালিবাগ, আরামবাগ, মাতাঝিল, পুরোন ঢাকার নয়াবাজার এসব জায়গা ভাগ করা ছিল। তো সেরকম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল কলেজের ছাত্রদের নিয়ে একটা সংগ্রাম পরিষদ ছিল। তাতে করে আমাদের একটা সাংগঠনিক ভিত্তি ছিল। ফলে বঙ্গবন্ধু পহেলা মার্চ যখন বললেন যে সাত মার্চ বক্তব্য রাখবেন, লোক রাস্তায় নেমে গেল। তখন আওয়ামী লীগ থেকে আমাদেরকে প্রোগ্রাম দেয়া শুরু হলো। যেগুলো আমরা অনুসরণ করব। তো সাতই মার্চে উনি বলছেন যে, স্কুল কয়টা থেকে কয়টা, অফিস আদালত কীভাবে চলবে–সমস্ত কিছু উনাদের পরিকল্পনায় ছিল। তার জন্য একটা শৃঙ্খলার দরকার ছিল। সেটা উনি করে দিয়েছিলেন। আমরা স্বেচ্ছাসেবক ছিলাম। আমরা রাতের বেলা পাহার দিতাম। সন্ধ্যায় মশাল মিছিল, রাতে পাহারা, দিনে পল্টন অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল নিয়ে যেতাম।

‘‘রাষ্ট্রটা তো শুধু বাঙালির না। শুধু মুসলমানের না। রাষ্ট্রটা মানুষের হোক।’’

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি তখন কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমি ছাত্র ইউনিয়নের সাথে জড়িত ছিলাম। তার আগে ১৯৬৬-৬৭ এবং ৬৮ পর্যন্ত জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়াকালীন আমি ছাত্রলীগের সাথে ছিলাম। ৬৮ এর শেষের দিকে সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব আমাকে আকৃষ্ট করল। তখন আমি ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করলাম। ঊনসত্তর-সত্তরে আমি ছাত্র ইউনিয়নে ছিলাম। একাত্তরে আবার ছাত্র ইউনিয়ন থেকে সরে গেলাম। তারপর আমি আর ছাত্র আন্দোলনের সাথে জড়িত হইনি।
রাজু আলাউদ্দিন: মুক্তিযুদ্ধে আপনি সেক্টর কমান্ডার ছিলেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ২নম্বর সেক্টরের অধীনে অনেক শাখা ছিল। সেখানকার ইউনিট কমান্ডার ছিলাম। সেটা আমি বলছি। আসলে ২৫ শে মার্চের ঘটনা একটু বলতে হবে। কারণটা হলো, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ যখন আমাদের উপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আক্রমণ করল, তার আগে কার্যত ঢাকা এবং বাংলাদেশ তো স্বাধীনই হয়ে গেছে। জয় বাংলার পতাকা উড়ছে। সবুজ জমিনে লাল সূর্যের মধ্যে সোনালি মানচিত্র খচিত সেই পতাকা। এবং স্লোগানও চলছে–তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো বাংলাদেশ স্বাধীন করো। তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব। চমৎকার সব স্লোগান। তখনো কিন্তু ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ আসেনি। এটা অনেকেই ভুল করে। এটা ১০ জানুয়ারি এসেছে। তিনি এয়ারপোর্টে নামার পরে। ২৫ মার্চের বিকেল বেলায় আমরা মোটামুটিভাবে কনফার্ম হয়ে গেছিলাম যে আক্রমণ হতে পারে। আমরা বত্রিশ নাম্বারে গিয়েছিলাম। বত্রিশ নাম্বারে ঢুকতে পারিনি। কলাবাগানের ওই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম। তখন মাইকে ঘোষণা হচ্ছিল যে, বঙ্গবন্ধু বলেছেন যার যার এলাকায় গিয়ে সতর্ক অবস্থানে থাকতে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা কয়টার দিকে বলেছিলেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সাতটার দিকে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: তার মানে আক্রমণের আগেই।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আর আটটার দিকে আমাদের যারা পরিচিত ছিল তারা সরাসরি এসে বললেন যে, চলে যাও। রাত্রিবেলা যার যার এলাকায় চলে যাও। যেভাবে পারো প্রতিহত করো। আমরা আক্রান্ত হতে পারি। তখন আমরা কাকরাইল হয়ে যে রাস্তাটা মতিঝিল গেছে, সেই রাস্তায় আমরা প্রতিরোধ করব ভাবলাম। নোয়াখালির বেশকিছু শ্রমিক ছিল, বরিশালের শ্রমিক ছিল, চায়ের দোকানদার, মুদির দোকানদার, এদেরকে সাথে নিয়ে, আমরা হাজার হাজার মানুষ, পুরো রাস্তা দখল করলাম। সমস্ত কিছু বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু আমাদের তো ধারণা নেই যে যুদ্ধের মতো একটা আক্রমণ হতে পারে। আমরা ট্যাঙ্ক দেখেছি যুদ্ধে। কামান দেখেছি যুদ্ধে। রাত তখন সাড়ে এগারোটার মতো। কাকরাইল মসজিদের ওখানে লাইট তখন নেই। হঠাৎ করে পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ শুরু করল। বড় বড় কামানের গোলা মাথার উপর দিয়ে ফকিরাপুলে গিয়ে পড়ছে। ধাম করে আওয়াজ হচ্ছে। মাটি কাঁপছে। বড় বড় গুলি এসে গাছ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদের হাতে ছোট ছোট কিছু হাতবোমা ছিল। ওগুলো ছুঁড়ে মেরেছিলাম। কিন্তু তাতে কী লাভ! দশ ফিট, পনেরো ফিট দূরে ছুঁড়ে মারতে পারছি। কিন্তু ওরা তো কামান দাগাচ্ছে তিন চারশ ফিট দূর থেকে। সব মানুষ পালিয়ে গেল। আমরাও সরে গেলাম। ওরা আমাদের এই রাস্তা দিয়ে সোজা চলে গেল ফকিরাপুলের দিকে। দুপাশের বাড়িঘর দোকানপাট জ্বালিয়ে দিচ্ছে। মানুষ মারছে। যারা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে ছিলা তাদেরকে মেরেছে। এরপর আমাদের বন্ধু হাসানের বাসার ছাদে উঠলাম। দেখলাম রাজারবাগ এ্যাটাক শুরু হয়েছে। তখন বারোটা অতিক্রম করেছে। সাড়ে বারোটার মতো বাজে। পিলখানায় আক্রমণ করেছে। পরে শুনেছি নয়াবাজার, নারিন্দা, সাঁখারিপট্টি সমস্ত এলাকা তছনছ করে দিয়েছে। আমরা সারারাত এগুলো জ্বলতে দেখেছি। ভোরবেলা দেখলাম আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা নগ্ন, অর্ধনগ্ন, আহত, হাতে একটা রাইফেল, কিছু গুলি নিয়ে পালিয়ে রাজারবাগ থেকে শান্তি নগরের ভেতর দিয়ে পল্টন আসছে। আমরা তাড়াতাড়ি তাদেরকে খেতে দিলাম। পানি দিলাম। লুঙ্গি দিলাম। ওরা বলল, আমরা চলে যাব। কাউকে ছাড়বে না। সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বললাম, ঠিক আছে আপনারা চলে যান। তবে অস্ত্রগুলো রেখে যান। এই প্রথম আমরা রাইফেল পেলাম। আমার মাথার মধ্যে তখন কাজ করছে, এই রাইফেল দিয়েই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। সাতটা রাইফেল পেয়েছিলাম। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু, বেবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তার বাসায় লুকিয়ে রাখলাম। সাতাশ তারিখে একটু সুযোগ পেলাম। কারফিউ তুলে দেয়া হলো। প্রথমেই আমরা দৌড় দিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে। ছাব্বিশ তারিখে আমি লুকিয়ে রাজারবাগ দেখতে গেছিলাম। ড্রেনের মধ্যে মৃতদেহ পড়ে আছে, উপুড় হয়ে। কোনোটার মাথা নাই। মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সাতাশ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে গেলাম। দেখে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। শাহবাগের দিক থেকে ঢুকেছিলাম। মধুর ক্যান্টিন, জগন্নাথ হল হয়ে দৌড়ে আবার চলে আসছি। একদেড় ঘণ্টার ব্যাপার। বাসায় এসে দেখি মা রেডি হচ্ছেন। বললেন, আমাদের সবাইকে চলে যেতে হবে। বললাম, তোমরা আলাদা যাও, আমি আলাদা যাব। অস্ত্রগুলো নিয়ে যেতে হবে। বললেন, কোথায় পেলি? বললাম, পুলিশরা দিয়ে গেছে। সাতটা অস্ত্র এনে আমরা তিনটা রিকশা নিয়ে রওনা দিলাম সোয়ারি ঘাটের দিকে। এই যাওয়ার সময় বাবাকে বললাম, বাবা, যাচ্ছি। বাবা তখন বললেন, যাও। ওরা মানুষ মারছে। ওদেরকে মারাটা ইসলামে জায়েজ আছে। বাবা তো মুসলমানই। তবে বাঙালি মুসলমান। ভালো রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। আমরা নদী পার হলাম। ওখানে, কেরানিগঞ্জে গুণদার (নির্মলেন্দু গুণ) সাথে দেখা। গুণদাকে আমি সিক্সটি নাইন থেকে চিনতাম। আমার কবিতা লেখার শখ ছিল। সেটা হয়ে ওঠেনি। এই দেখা হওয়ার ব্যাপরটা গুণদার বইতে আছে। সেখানে ট্রেনিং ছিল। ইপিআরের যে সদস্যরা পালিয়ে গিয়েছিল, পুলিশের যে সদস্যলা পালিয়ে গিয়েছিল, তারা একটা ট্রেনিঙের ব্যবস্থা করল আমাদের।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই জায়গাতেই?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ। আওয়ামী লীগের লোকজন ছিল। অন্যান্য দলের লোকজন ছিল। ওহেদুল হক ছিল। হাজার হাজার মানুষের আশ্রম হয়েছে। ঢাকার চারদিকে তো সবাই ছড়িয়ে পড়েছে। এই রকম পরিস্থিতিতে যখন ট্রেনিংটা শুরু হলো, আমাদের ছেলেপেলে, বেশ কিছু নামকরা লোকজন, তারা কিন্তু উত্তেজিত হয়ে পড়ল। ফায়ার টায়ার শিখলাম। এটা হচ্ছে সাতাশ তারিখ। আটাশ, ঊনত্রিশ, ত্রিশ, একত্রিশ–চারদিন আমরা ভালো ট্রেনিং করলাম। এরমধ্যে দেখি একত্রিশ তারিখে হেলিকপ্টার ঢুকছে আমাদের এলাকায়। তারপর দেখি সেভেন জেট যাচ্ছে। বোম্বিং হচ্ছে। কোথায় হচ্ছে ঘটনাগুলো বুঝছি না। পাকিস্তান কোন পর্যন্ত দখল করতে পেরেছে কিছুই তো জানি না। স্বাধীন বাংলা বেতার ছাব্বিশ তারিখে শুনেছি অল্প। সাতাশ তারিখে শুনেছি। ওইখানে যাওয়ার পর শুনেছি। কিন্তু এক তারিখ সকালবেলায় আমাদের কিছু সিনিয়র লোকজন ওদের যে হেলিকপ্টার উড়ছে, ওই হেলিকপ্টারে গুলি করা শুরু করল। ২ এপ্রিল সকালবেলায় প্রচণ্ড রকমের কামানের গোলার আওয়াজে আমাদের ঘুম ভাঙল। পাকিস্তান আর্মি তখন বুড়িগঙ্গা ক্রস করেছে বোট দিয়ে। আমাদের লঞ্চ দখল করে নদী পার হয়েছে। এপারে এসে সবাই নেমেছে। এক নাগাড়ে গুলি করা শুরু করেছে। বাড়িঘরে আগুন। আমার দেখা সবচে’ বড় ধ্বংস আমি কেরানিগঞ্জে দেখেছি। আমি যেটা চাক্ষুস দেখেছি। গুণদার বইয়ে খুব সুন্দর বর্ণনা আছে। হাজার হাজার মানুষকে তারা এভাবে মেরেছে। একেকটি এলাকা ঘেরাও করেছে, গুলি করেছে, আগুন দিয়েছে বাড়িতে, সবাইকে নিয়ে এসে একটা মাঠে জড়ো করেছে, তারপর গুলি করেছে। আমরা সব দেখেছি। কিন্তু কিছু করার ছিল না। এটা ভয়াবহ একটা অভিজ্ঞতা জীবনের। এত মানুষের মৃত্যু একসাথে দেখা কিন্তু কঠিন ব্যাপার। শত মানুষের মৃত্যু দেখেছি। গুণদার একটা বর্ণনা আছে। একটা মানুষ দৌড়াচ্ছে, আর্মি যখন ওকে গুলি করেছে, মাথাটা আলাদা হয়ে পড়ে গেল, তারপরও তার শরীরটা কয়েক কদম হেঁটে গিয়েছিল। এটা গুণদা লুকিয়ে দেখেছিল। আমার দেখা না। দুই তারিখের এই ঘটনার পর আমরা বসলাম সবাই মিলে। সবাই যেখানে পারে ছড়িয়ে গেল। আমরা ততদিনে জেনে গেছি ভারতে আমাদের ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেমন করে জেনেছিলাম বলতে পারব না। আসলে এমন বিপদের সময় সুখবরগুলি আগে আসে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ইন্ডিয়া যাব। কিন্তু অস্ত্রগুলো কী করব? অন্ত্রগুলো একটা বাড়িতে রেখে আসলাম। সানজিদা আপা, ওয়াহিদ ভাইয়ের সাথে ওখানে দেখা হলো। আমরা চলে আসলাম। আমি, ইমরান, মজনু–আমার অনেক বন্ধুসহ ঢাকা ব্যাক করলাম। ভাবলাম ঢাকা ব্যাক করে আমরা সবাই একত্রিত হয়ে ভারতে চলে যাব। কোনদিক দিয়ে যাব জানি না। পাঁচ তারিখের দিকে ঢাকা এসেছিলাম। ছয়-সাত তারিখে ঢাকায় ভালোই ছিলাম। ঘুমাচ্ছি টুমাচ্ছি। আর্মি আছে। চেক হচ্ছে। গুলিগালার আওয়াজ শুনছি। শুনছি বিভিন্ন বাড়ি থেকে মেয়েদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আমরা খুব একটা বের হই না। আমার বড় ভাই ছিল। সরকারি চাকরি করতেন। তিনি এসে রিপোর্ট করতেন প্রত্যেকটা অফিসে আর্মি বসে রয়েছে। প্রতিদিন যাওয়ার সময় বিদায় নিয়ে যেতেন। মারা যেতে পারেন। ভাবীর কাছ থেকে, মার কাছ থেকে। আবার বিকেলবেলা আসলে একপ্রস্থ কান্নাকাটি হতো। সাত তারিখে মা হঠাৎ কান্নাকাটি শুরু করলেন–আমার বড় মেয়েকে অনেক দিন দেখি না। এই মেয়েকে দেখার বড় সাধ। তার ইচ্ছা, মেয়ে চট্টগ্রামে আছে, তার খবর আনতে হবে। আমরা দশ ভাইবোনের মধ্যে নয় ভাইবোন ঢাকায়। উনি একা হাসবেন্ড নিয়ে চট্টগ্রাম থাকেন। আমার বড়বোনের নাম বেবি। তার বাচ্চা আছে। মা কান্নাকাটি করছেন–ওর খবর তোরা কেউ রাখিস না! যা খবর নিয়ে আয়। কিন্তু কেমন করে খবর আনব! টেলিফোন বাসায় আছে কিন্তু কানেকশন নাই। ট্রেন নাই বাস নাই। কেমন করে খবর আনতে যাব! পরে নয় তারিখে মাকে বললাম, আমাকে টাকা দাও আমি তোমার মেয়ের খবর আনতে যাব। তেরো দিনে পৌঁছেছিলাম। যাওয়ার সময় অসুস্থ হয়ে গেছিলাম। ডায়রিয়া হয়েছিল। জ্বর ছিল। চৌদ্দগ্রামে চারদিন থাকতে হয়েছিল। প্রতিদিন প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটেছি।

‘‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে’’

রাজু আলাউদ্দিন: এই অভিজ্ঞতা কিন্তু আপনি অবশ্যই আলাদা করে লিখবেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ফেরার পথে আবার হেঁটে ফিরেছি। শুভপুরে লড়াই হচ্ছে। তাই আমার যাওয়াটা হয়েছে চৌদ্দগ্রামের ভেতর দিয়ে একটা রাস্তা, যেটা এখন হাইওয়ে করবে বোধহয়, সেই রাস্তা দিয়ে। এটা কিন্তু অনেক আগের রাস্তা। বৃটিশ আমলের রাস্তা। বিকল্প একটা রাস্তা ছিল। শেরশাহ বা গ্রান্ডট্রাং রাস্তা। যাইহোক, ফেরার পথে আপা মাকে একটা চিঠি দিয়েছেন। দেখা হয়ে আপা খুব খুশি হয়েছিলেন। আমি ঢাকায় ফিরছি। চৌদ্দগ্রাম আসার পরে অনেকের সাথে দেখা। বাহার, আফজাল–যারা এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে তাদের সাথে দেখা। তারা তখনও খুব একটিভ। তারা আমার সব ঘটনা শুনে বলল যে, ইন্ডিয়াতে আমাদের অনেক আর্মি গেছে। খালেদ মোশাররফ গেছে। হায়দার গেছে। তুমি যদি পারো, যেতে পারো। তুমি এইদিক দিয়ে যেতে পারো। এখান থেকে কাছে। ওখানে মিয়ার বাজার, বিবির বাজার দুইটা জায়গা আছে। তো জায়গাটা পার হলাম। তখন দেখলাম যে, একটা দেশ ভাগ হয়েছে, যদিও তখন ভাগটা নেই, পাকঘর এবং টয়লেটটা পড়েছে ইন্ডিয়াতে, শোয়ার ঘরটা পড়েছে বাংলাদেশে। সে অদ্ভুত একটা ভাগ। এর চাইতে জঘন্য কাজ পৃথিবীতে আর হয় না। ইচ্ছা হলো আর একটা দেশকে ভাগ করে দিল। তো কাঁঠালিয়া দিয়ে পার হয়ে এক মেজরের সাথে দেখা। মেজর জাকির। বিএসএফের। সে আমাকে বলল, কী চাও? তুমি কে? আমি আইডি কার্ড দেখালাম। আইডি কার্ড দেখার পর সে বিশ্বাস করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন সে আমাকে বলল, তোমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। আমাকে গাড়িতে তুলে দূরে, একটা জায়গায় নিয়ে গেল। নাম জানি না, টিলার মতো একটা জায়গা। ওখানে গিয়ে দেখি একজন সুদর্শন লোক, জলপাই রঙের শার্ট পরা। প্যান্ট পরা জিন্সের। সিগারেট খাচ্ছেন। শুনলাম তার নাম মেজর খালেদ মোশাররফ। আমাার তো বিশাল একটা শান্তির জায়গা তৈরি হলো। আমার নামটাম সব জিজ্ঞেস করলেন। বললেন, আমরা এখানে একটা ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করেছি। তুমি আবার ঢাকায় যাও। ওখানকার ছাত্র, যুবক, যারা যুদ্ধ করতে চায়, তাদেরকে খবর দাও। তুমি গিয়ে ওদেরকে এখানে নিয়ে এসো। তো ওখানে একদিন ছিলাম। পরেরদিন আবার ঢাকায় ফিরে এলাম। এরপর ১৫ মে আমার বন্ধুদেরকে নিয়ে, শহিদ মানিকসহ, রাইসুল ইসলাম আসাদ, কাজী শাহাবুদ্দীন শাহজাহান, ওমর– আরো অনেককে নিয়ে আমি রওনা দিলাম। এবার যাওয়টা সহজ হলো। কারণ আমি রাস্তাটা চিনি এবার। বর্ডার পার হয়ে সেক্টর ২ তে খালেদ মোশাররফের কাছে একটা রিপোর্ট করলাম। পরে আমার সাথে কামাল লোহানীদের দেখা হলো। লোহানী ভাইরা বলল যে, তারা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কলকাতায় যাচ্ছে। তারা আমাকে কলকাতায় যেতে বলল। আমি একটু লেখালেখি করতাম বিধায় বলল তুমি ওখানে আসতে পারো। কয়েক বন্ধুসহ আমি কলকাতায় গেলাম। মানিক একদিকে চলে গেল। আসাদ আর বেবি আমার সাথে কলকাতায় গেল। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমি কবিতা পড়লাম।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার নিজের কবিতা?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ, জীবনানন্দ দাশকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলাম, রূপসী বাংলা যে রক্তাক্ত বাংলা, তাকে এসে একবার দেখে যেতে বললাম। কাঁঠালপাতা এখন আর ঝরে না। যা থাকে আর কি। ভালো কিছু না।
রাজু আলাউদ্দিন: কবিতাটা সংরক্ষিত আছে?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: না নেই। এমনিতে পড়েছিলাম ওখানে। এটা অনেকেই জানে। হাসান ইমাম ভাই এটাকে ভালো বলেছিলেন। তবে আমার মনে হয়েছিল এটা আমার জায়গা না। এরপর মানিকসহ আমরা চলে গেলাম ওয়েস্ট দিনাজপুর। মানিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার এক বছরের সিনিয়র। হিস্ট্রির। ছাত্রলীগের ছেলে ছিল। ওয়েস্ট দিনাজপুরে আমাদের এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং হলো। পাহাড়ি নদীতে সাঁতরানো। ভয়াবহ খরস্রোতা নদী। পাহাড়ের ওপরে ওঠা, নিচে নামা–এইসব ট্রেনিং। সেখানে ওস্তাদ কিবরিয়া বলে ইপিআর-এর একজন ওস্তাদ ছিল। তার কাছে এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং-এ বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করলাম। এসময় অর্ডার আসল, যে যেই এলাকা থেকে আসছে তাকে সেই এলাকায় গিয়ে যুদ্ধ করতে হবে। তখন আমরা আবার দলবেঁধে চললাম। দীর্ঘ যাত্রা। কোথায় দিনাজপুর! কোথায় কলকাতা আর কোথায় আগরতলা! চারদিন চাররাতের সেই জার্নি।
রাজু আলাউদ্দিন: রুমীরা তখন কোথায় ছিল?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ওরা তখন ঢাকায় ঢুকে গেছে। ঢাকায় ওরা অপারেশন করছে, আমরা ট্রেনিং নিতে গেলাম। ওরা মে মাসে একটা অপারেশন করেছিল। তারপর জুন-জুলাইতে মেজর অপারেশন হলো। আগস্টের পর থেকে আমাদের অপারেশন শুরু হয়।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনাদের অপারেশনের অন্যতম দিক ছিল কমিউনিকেশন ভেঙে দেওয়া…
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ। ঢাকা শহরে পাঁচটা পাওয়ার স্টেশন ছিল সেগুলো গুঁড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল। গাজী দস্তগীর, ফতেহ আলী, মোফাজ্জল হোসেন মায়া আরো অনেকেই এই অপারেশনগুলো করেছিল। এরা ভালোভাবেই করেছিল। আমাদের অপারেশনগুলো ছিল বাইতুল মোকাররম অপারেশন। ডিআইটি অপারেশন। মালিবাগ রেললাইন এবং রেলব্রিজ অপারেশন। কাকরাইল অপারেশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপারেশন। বিশ্ববিদ্যালয় তখন চলছে। খালেদ মোশাররফ অবাক–কী! বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে! ক্লাশ হচ্ছে! কলেজ খুলে গেছে! কী করছ তোমরা! তখন আমাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়ে গেছে। তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। আলতাফ মাহমুদ, রুমী, জুয়েল, বদী–কারো কোনো খোঁজ নেই। বিশজনেরও বেশি গেরিলাকে ওরা এরেস্ট করেছিল। সেই সময় আমাদেরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপারেশনটা করতে হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। সেটা আমরা সাকসেসফুললি করেছিলাম। ঢাকা কলেজে পড়ত সোহরাব, পরে আবাহনীতে ফুটবল খেলত। ঢাকা কলেজ, ইডেন গার্লস কলেজ, মতিঝিল স্কুল, আজিমপুর গার্লস স্কুলসহ মোট তেরোটা স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটি একসাথে ও অপারেশন করে বন্ধ করে দিয়েছিল। অনেক স্কুলের ছেলেমেয়েরা অংশগ্রহণ করেছিল অপারেশনে। খুব সাবধানে অপারেশন করা হয়েছিল। যেন লোকক্ষয় না হয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল ক্লাশ বন্ধ করা। সে জন্য টিফিন পিরিয়ডে প্রত্যেক স্কুলে যে ল্যাবরেটরি থাকে, যেখানে কেউ থাকে না সাধারণত, ওখানে গ্রেনেড মেরে দিয়েছিল ওরা। এবং খুবই সাকসেস হয়েছিল। আমি ছিলাম সৌরভের সাথে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সাইক্লোজি ডিপার্টমেন্টে, জাস্ট কেউ নেই, যেখানে লোকজন কম সেখানে ডিনামাইট মেরেছিলাম। প্রচণ্ড আওয়াজ করেছিল। আর্মিসহ সবাই দৌড় দিয়েছিল। এগুলো ঢাকার মানুষজনকে খুব সাহস জুগিয়েছিল। তেমনিভাবে বাইতুল মোকাররমের অপারেশনের উদ্দেশ্য ছিল, ইদের সময় যেন কেউ ইদটা ভালো করে না করতে পারে, শপিং করতে না পারে। তখন একটা পত্রিকা বের করতাম আমরা। যেটার নাম ছিল গেরিলা। এই নামে আমার একটা ছবি আছে। এই পত্রিকার মাধ্যমে আমরা বাইতুল মোকাররম এলাকায় সংবাদ ছড়িয়ে দিলাম। তারপরেও তো কিছু মানুষ আছে যারা ইদ করতে চায়। পাকিস্তান আর্মির অবস্থানটা খুব সুদৃঢ় ছিল। ফরেন পোস্ট অফিস এবং বাইতুল মোকাররমের মাঝ দিয়ে একটা রাস্তা আছে। আবার মোহামেডান ক্লাবের দিকে, মতিঝিলের একটা রাস্তা গেছে। আরেকটা মোহামেডাম ক্লাবের সামনে দিয়ে স্টেডিয়ামের ভিতরে একটা রাস্তা গেছে। আরেকটা হলো বঙ্গবন্ধু এভিনিউ। এই রকম চারদিকে আটটা গাড়ি রাখত। বড় বড় ট্রাক। সেখানে অনেক সোলজার থাকত। দেড়শ দুইশ। দুটো ট্রাকে ওরা পাহারা দিত ফরেন পোস্ট অফিসের রাস্তাটায়। আমাদের টার্গেট হলো ওদেরকে মারব। আমাদের লোক তো মারব না। কোনো গাড়ি, কোনো রিকশায় করে গিয়ে এ্যাটাক করা এটা খুবই রিস্কি হয়ে যায়। তাহলে কী করা যায়! ভাবলাম একটা গাড়িকে যদি আমরা কারবোম বানাই… কারবোমের ব্যবহার তখনো শুরু হয়নি এশিয়াতে। কার কোথায় পাই! তো ফকিরাপুলের ওদিক থেকে একটা কার জোগাড় করা হলো সকাল আটটার দিকে। আমাদের অপারেশনের টার্গেট এগারোটা। ফকিরাপুলে প্লাটুন কমান্ডারের দায়িত্বে ছিল রাইসুল ইসলাম আসাদ। প্রত্যেকটা মূল অপারেশনের দায়িত্বে ছিল ফেরদৌস, নাজমুল, আরিফ। আরিফ মারা গেছেন। পরবর্তীতে আমেরিকায় থাকতেন। এরপর ফিরোজ। এ রকম কয়েকজন। তখন ঠিক হলো যে এই অপারেশনটা ওরা করবে। ওরা সবকিছু ঠিক করে নিয়ে গেল। মেশিন বসিয়ে দেয়া হলো। আর ফিরোস্টান… ফিরোস্টানের মাথায় ডেটোরেটর থাকে। এটা পুরোটাই ফিক্সড করে দেয়া হয় পিকেটারের মধ্যে। পিকেটার আমরা হাত দিয়ে পিটিয়ে শক্ত করে স্ল্যাবের মতো করে দুই কেজি দিয়ে দিছি সিটের নিচে। ওখানে তারটাও দিয়ে দিছি। ওখানে জাস্ট একটা ম্যাচের কাঠি ব্লেড দিয়ে কেটে মুখটা হা করে ওখানে ম্যাচের কাঠি দিয়ে…যতক্ষণ সময় লাগে। ত্রিশ সেকেন্ড বা এক মিনিট দুই মিনিট। তো আমরা এক মিনিট সময় দিলাম। আমরা ফকিরাপুল ছিলাম। ওরা গাড়ি নিয়ে গেছে। কথা ছিল যখন বড় আকারে বিস্ফোরণ ঘটবে তখন আরো দুজন মুক্তিযোদ্ধা দাঁড়ায়ে থাকবে। যারা, ফসফরাস গ্রেনেড বলে একটা গ্রেনেড আছে, এটা আগুন ধরে যায়, সেই গ্রেনেডটা থ্রো করবে ফ্যাশন হাউস বলে কয়েকট পাকিস্তানিদের দোকান ছিল, সেখানে। আমরা চাচ্ছি ঈদের কেনাকাটা বন্ধ করতে। কিন্তু দেখা গেল, পনেরো মিনিট বিশ মিনিট চলে যায়, কিন্তু কিছু হয় না। তখন আসাদ খুব রাগারাগি করতে লাগল। তখন ওরা বলল, ঠিক আছে, আমরা তাহলে আবার যাই। ওটা নিয়ে আসি। কিন্তু নিয়ম হচ্ছে, আপনি একটা জিনিস একবার ফেইল করলে সেটা দ্বিতীয়বার আর টাচ করতে পারবেন না। কারণ এই ডিভাইসটা নিজেই অটোমেটিক্যালি ব্রার্স্ট করলে আপনি মারা যাবেন। দুই নাম্বার হলো, এটা নিয়ে আসতে গিয়ে আপনি ধরা পড়তে পারেন। তখন বড় আকারের অপারেশন বন্ধ হয়ে যাবে। সেগুলো আমাদের আগেই বলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান ছিল অস্ত্র। তো আসাদ নিজেই ওদেরকে নিয়ে গেছিল। আসাদের দায়িত্ব ছিল কী ঘটেছিল সেটা দেখা। কেন ফুটল না। আর যদি পারে আরেকটা সেটাপ নিয়ে যাবে এবং ওটা গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে উড়িয়ে দেবে। অথবা নিয়ে আসবে গাড়িটা। তো আসাদ আরিফ গেছে। গাড়িটা পাকিস্তান আর্মির দুইটা ট্রাকের মাঝখানে ছিল। দুইটা ট্রাক বিশ গজের ফারাকে দাঁড়িয়ে আছে। আর্মিরা হাঁটাহাঁটি করছে। আসাদ দেখল ওইটা অর্ধেক পুড়ে বাকিটা পোড়েনি। ওটার সাথে ময়েশ্চার ছিল। ইন্ডিয়া থেকে আমরা তো নৌকার খোলে করে নিয়ে আসছি। আবার কেরানিগঞ্জে বা সাভারে বা ধামরাইতে এটা মাটির নিচে রাখতাম। সে জন্য নষ্ট হয়ে গেছে। আসাদের কাছে আরেকটা ত্রিশ সেকেন্ডের সেটাপ দিয়ে দেয়া হয়েছিল। সেটা সে লাগিয়ে যেন ত্রিশ সেকেন্ডের মধ্যে বেরিয়ে আসতে পারে। আসাদ এটা করেছে।

‘‘উনারা আজকে হেফাজতের মতো একটি পশ্চাদপদ চিন্তার সংগঠনের সাথে মিলিত হচ্ছেন’’

বেরিয়ে এসে দেখে ওর নানা ওখানে কলা কিনছে। ওর নানা কখন যে আস্তে করে হেঁটে বাড়ি গেছে….বেঁচে গেছে। আর দুইটা ফসফরাসের গ্রেনেড কিন্তু মেরেছিল। কিন্তু ফোটেনি। মশ্চেয়ারের ঝামেলা ছিল। তো আসাদের এটা ফুটল। পুরো গাড়িটা নিশ্চিহ্ন। শুধু ছাদের একটা টুকরো ফরেন পোস্ট অফিসের নয়তলা বিল্ডিঙের ছাদের উপর নাকি পাওয়া গিয়েছিল। এরপর সাড়ে তিনটার বিবিসি নিউজ হলো–ঢাকার কেন্দ্রস্থলে গ্রেনেড বিস্ফোরণ। গেরিলা আক্রমণ। অনেক বড় ঘটনা আসলে। ঊনিশজন পাকিস্তানি সেনা মারা গিয়েছিল। আমাদের দেশের কিছু মানুষ আহত হয়েছিল। আমাদের কিছু করার ছিল না। আমরা তো আগেই নোটিশ দিয়েছি। তো এতে করে ঈদের উপর একটা ইফেক্ট পড়েছিল। আমরা বলেছি আপনারা নামজ পড়েন। কিন্তু ঈদের আনন্দটা করবেন না। আমাদের আহবানটা এমন ছিল। এটা ইংরেজিতে করেছিলাম। বাংলা টাইপ তো তখন নাই। আর ডিআইটি অপারেশন মাহবুব আলী করেছিল। অভিনয় করত মাহবুব আলী। ও আবার ইন্ডিয়া যায়নি। লোকাল ট্রেইনার। আমাদের এখানে নয়া পল্টনে ট্রেনিং নিয়েছে। আমরা মাহবুব আলীকে বলেছিলাম, তুমি এক্সপেসিক ঢুকাতে পারবে না। দুই দুই চার আর্মস করে ঢোকাও। ডিআইটিতে যে ট্রান্সমিশন টাওয়ার ছিল ওটা ফেলে দেয়ার পরিকল্পনা ছিল। ওখানে পাকিস্তানি টেলিভিশন ছিল। আর নিচে ছিল স্টুডিও। টাওয়ারের ছবি, ডাইমেনশন, দূরত্ব–এইগুলো আমরা হিসাব করতাম। ফেরদৌস আর নাজমুল মাহবুবকে নিয়ে গেছিল এই কাজে। এদিকে পনেরো দিন, বিশ দিন, একমাস ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে এক্সপ্লোসিভ নিয়ে যাচ্ছি। পাঁচতলায় মাহবুব আলীর রুম। ওখানে একটা আলমারির ভেতর রাখছি। আড়াই কেজি মতো ঢুকিয়েছি, তখন হঠাৎ করে পাকিস্তানি আর্মিদের কী এক সন্দেহ হয়েছে, তল্লাশী শুরু করে দিল। ওরা তো অন ডিউটিতে আছে। মাহবুব আলী দৌড়ে আসল। আমি তখন ফকিরাপুলে বসা। বললাম, কী হয়েছে মাহবুব? বলল, বিপদ। ধরা পড়ে যাব। নিয়ে আসতেও তো পারব না। বললাম, ওটা ব্রাস্ট করে দাও। ওরা যেন না পায়। কারণ, আমাদের মূল পরিকল্পনা যেটা, সেটা হলো না। আমাদের ইচ্ছা ছিল নিচেরটা ভাঙব। পুরো বিল্ডিঙের উপর টাওয়ারটা ফেলে দেব। ঘড়িটার উপরও। ঘড়িটা তো কয়দিন আগে ঠিক করেছে। তখন কিন্তু আমরাই নষ্ট করেছিলাম। এদিকে আমি ইসলামিয়াতে বসে থাকব। সেখান থেকে এসে ফায়ার করব ডিআইটি ভবনের নিচের তলায়। যেন বড় একটা লঙ্কাকাণ্ড হয়। কিন্তু আমরা ভাবলেই তো হবে না। ওদেরও তো একটা যুদ্ধ-পরিকল্পনা আছে। ওরা একটা কারণে চেক করছিল। ওরা তখন তিনতলায়। মাহবুব আলী লিফট দিয়ে তাড়াতাড়ি পাঁচতলায় উঠছে। ওখানে গেছে। এক্সপ্লোসিভগুলোকে এক জায়গায় করেছে। এনিমেশন দিছে। দেড় মিনিটের ফিউজ দিয়ে হেঁটে সাইকেলটা নিয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে স্টেডিয়াম পর্যন্ত এসেছে, তখন বিশাল একটা আওয়াজ হলো। পুরাট টাওয়ারটা নড়ল। পড়ল না। পুরো বিল্ডিংটার উপর ট্রাক করল। আর জানলা দিয়ে সমস্ত ফাইল, কাগজ সিনেমার শটের মতো বাইরে বের হয়ে আসতে লাগল। ওইটার একটা রিয়েল শট ব্রিটিশদের কাছে আছে। এটা আমেরিকানরাও শুট করেছিল। পাশের বিল্ডিঙে আমেরিকানদের এ্যাম্বাসি ছিল। ওরা আবার ক্যামেরা দিয়ে এগুলো শুট করেছে। সবচে মজার ব্যাপার হলো এই হচ্ছে আমাদের ডিআইটি ভবন, তারপর একটা ত্রিশ ফিটের রাস্তা, তারপাশে এখনকার গণভবন। তখন পাকিস্তান আর্মির মেইন জায়গা ছিল। যেখানে রওফুল মাহদি, মালেক থাকত। এটা পাকিস্তানিদের জন্য বিরাট মাথাব্যথার কারণ হয়েছিল। যেখানে রওফুল মাহদি বসে,ওইটার পাশের বিল্ডিং-এ আক্রমণ। যেন ওদের বারান্দায় গিয়ে করা হচ্ছে। এখন ভাবলে ভালোই লাগে।

রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনগুলোর মধ্যে একটা। ওই সময় শাহাবুদ্দিন ভাইও তো এদিকটায় ছিলেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ, শাহাবুদ্দিনও আমাদের এদিকটায় ছিল। ও একটা প্লাটুন কমান্ডার ছিল। ও ঢাকা নর্থ এন্ড ওয়েস্ট-এর একটা পার্টের দায়িত্বে ছিল। বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু করে বছিলা, এখন কল্যাণপুর ধরা যায়। এই কল্যাণপুরের ওখানে পাকিস্তানি আর্মিরা সাধারণ মানুষকে খুব ডিস্টার্ব করত। নৌকা করে যারা চলাচল করত, খাদ্যটাদ্য নিয়ে আসত, গরিব মানুষ–ওদেরকে খুব মারধোর করত। এছাড়া ওখানে শান্তি বাহিনীর কিছু ছিল, পুলিশের যে চেকপোস্ট ছিল ওখানে শাহাবুদ্দিন অপারেশন চালিয়েছিল। শাহাবুদ্দিন পরে খুব ভালো একটা কাজ করেছে। শাহবাগে যে বেতার কেন্দ্র ছিল, সেটা কিন্তু শাহাবুদ্দিন দখল করেছিল। আরেকটা কাজ শাহাবুদ্দিন ভালো করেছিল, সেটা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধু পরিবারকে তো গ্রেফতার করে রেখেছিল আঠারো নাম্বার রোডে। শাহাবুদ্দিন গিয়ে পাকিস্তানি আর্মিদের বলছে, চাবি দে। এগুলো আমাদের মানুষ। তোরা এখান থেকে যা। ১৬ তারিখ সকাল বেলায়। সাহস আছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ১৬ তারিখ?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ১৬ ডিসেম্বর। রেডিও-ও তো তাই করেছে। সে পাকিস্তানি পতাকা নামায়ে বাংলাদেশি পতাকা তুলে দিয়েছে। জয় বাংলা। আমি একবার রেডিওতে আসতাম। একবার এয়ারপোর্টে যেতাম। ১৬-১৭-১৮-১৯-২০ তারিখে প্রচার করে বেড়াতাম খারাপ কিছু ঘটেনি। থানায় বসতাম। মাইক বের করে দিয়েছিলাম। রিকশা আর বেবিটেক্সি করে ঘোষণা দিতাম–কেউ লুটপাট করবেন না। সবাই সবাইকে সাহায্য করুন। রাত দশটার পরে কেউ বেরোবেন না বাসা থেকে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা ১৬ ডিসেম্বরের পরে?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: পরে। আমি এ রকম কাজ করেছিলাম। আমরা কিন্তু খুব অর্গানাইজডভাবে এগিয়েছি। মুজিবনগর সরকারের একটা নির্দেশ আমাদের উপর ছিল। এগুলি তো আমরা পেয়ে যেতাম। ওগুলো আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রচার করতাম। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে। ওরা বলত যে কী কী করতে হবে। শত্রু এলাকায় কী করতে হবে, মুক্ত এলাকায় কী করতে হবে? আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব কী? জনগণের দায়িত্ব কী? কথিকা আকারে বলতেই থাকত। বলতেই থাকত।
রাজু আলাউদ্দিন: ওটার ট্রান্সমিশন কি খুব বেশি শক্তিশালী ছিল?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: না না। পরে পঞ্চাশ কিলোওয়াড করে দিয়েছিল। ইন্ডিয়ান ট্রান্সমিটারগুলি আমরা ইউজ করেছি। থিয়েটার রোডের ওখানে আমাদের যে অফিসটা ছিল, সেখান থেকে এটা রেকর্ডেড করে প্রতিদিন অন্য জায়গায় নিয়ে যেত। কোথায় নিয়ে যেত জানা যেত না। ভারতের অনেক বড় অবদান আছে আমাদের পেছনে। খুব কুইক ওরা একটা কন্টিসিটিড ল্যান্ড বানিয়ে ফেলেছিল। যেটা দিয়ে ওরা পুরা অপারেশনটাকে সাপোর্ট দিয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে নিজেরাও ইনভলব হয়েছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: স্বাধীনতার পর কত তারিখে শেখ মুজিবের সঙ্গে আপনার দেখা হলো?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: বঙ্গবন্ধুকে আমি ১০ জানুয়ারি রিসিভ করতে গিয়েছিলাম এয়ারপোর্টে। রাস্তায় আমার ডিউটি ছিল। উনি আসছেন, নেমে যখন ফার্মগেট হয়ে এখানে আসছেন, আমি গাড়ি ঘুরিয়ে অনেক দূর থেকে তার পিছু পিছু আসছি। এরপর গাড়ি তো আর চলে না। হেঁটে হেঁটে আমরা ঢুকে পড়লাম সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। ১০ জানুয়ারি উনার একটা বিখ্যাত বক্তৃতা আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতা। ওটার উপর নির্ভর করেই সংবিধানটা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতার কথাও তখন বলেছিলেন। একটা প্রিপারেশন তাঁর ছিল। গণতন্ত্রের কথা, সমাজতন্ত্রের কথা, সকল মানুষের সমঅধিকারের কথা। এগুলি তো তখন উনি বলে ফেলছেন। এবং অন্যান্য ধর্মের লোকদেরকে বলছেন, আমরা জানি আপনাদের উপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। পাকিস্তানের ২৩ বছর আপনারা অনেক নিপীড়িত হয়েছেন। বাংলাদেশ কোনো একক ধর্মের দেশ নয়। বাংলাদেশ সকল ধর্মের দেশ। এই কথাগুলো ১০ জানুয়ারি বলাটা খুব ইমপর্ট্যান্ট ছিল। দেশ তো খুব দ্রুত, নয় মাসে স্বাধীন হয়ে গেছে। এবং পরীক্ষিত হয়ে যাওয়ার আগেই আমরা স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছি। সেইটা উনি বলার চেষ্টা করেছিলেন। সেখানে উনি একটা কথা বলেছিলেন। একটা জায়গায় উনি বলেন: আমার কবর খোড়া হচ্ছে জেলখানার পাশে। আমি বলেছিলাম, আমি শেখ মুজিবুর রহমান মৃত্যুকে ভয় পাই না। আমি মানুষ। আমি বাঙালি। আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে দুইবার মরে না। ভেরি ইমপর্ট্যান্ট কথা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশটা স্বাধীন হয়েছে। বলেছেন: আমি একজন মানুষ। তারপর আমি বাঙালি। তারপর আমার ধর্মপরিচয়। এটা শেষে বলেছেন। সুতরাং সেক্যুলারিজমের ব্যাপারটা উনার মাথায় কাজ করেছে। উনি ছিলেন বলেই আমরা ভালো সংবিধান পেয়েছিলাম। আর হ্যাঁ, আমি অস্ত্র সমর্পণ করেছি বঙ্গবন্ধুর কাছে ৩১ জানুয়ারি। শেষ দিন ছিল সেটা। পাঁচটার পরে আর অস্ত্র নেবে না। এ্যারেস্ট করবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এতদিন দেরি করলেন কেন?

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার ভাবনায় ছিল–কেন অস্ত্র দিব আমি! অস্ত্র আমাদের কাছে রাখতে হবে। অনেক কিছু ভেবেছিলাম। আমরা রেগুলার ফোর্স বা পুলিশ ফোর্স বা অন্যকোন ফোর্সে আমরা সবাই যাব। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা দেশের দায়িত্বে থাকব। এরকম ভাবতেই পারি আমরা। আমি বলেছিলাম যে আমি বঙ্গবন্ধু ছাড়া আর কারো কাছে অস্ত্র জমা দেব না। সোলজারদের একটা অহমিকা থাকে। আমি দেখছি অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করে নাই অথচ পুলিশে এসে যোগদান করেছে। যাইহোক, শেখ কামাল একদিন ফোন করে বলল, বাচ্চু, ৩১ তারিখ বিকেল পাঁচটার সময় লাস্ট ডেট। তুই গণভবনে চলে আসবি। তখন রমনা পার্কের কাছে ছিল পুরাতন গণভবন। এটাতে আমাকে আসতে বলল। আমি সাত ট্রাক অস্ত্র নিয়ে, সাড়ে চারশর মতো সোলজার নিয়ে গেলাম। শাহাবুদ্দিন ছিল। ওর ছবি আছে। শাহাবুদ্দিন, আমি, বজলু, হাকিম। আমাদের ছবি আছে। বঙ্গবন্ধু আমাদের কথা শুনছেন, আমার চিবুকে হাত দিচ্ছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই মুখোমুখি হওয়ার অনুভূতি কেমন ছিল?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: অবাক করা অনুভূতি।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি আগেও বক্তৃতায় দেখেছেন। কিন্তু সেটা দূর থেকে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তখন তিনি আমাকে স্পর্শ করছেন। আমার মাথায় হাত দিচ্ছেন। আমার চিবুকে হাত দিচ্ছেন। তোফায়েল ভাই ছিল। শেখ কামাল ছিল। তখন উনি বললেন, তোরা অনেক কষ্ট করছিস। অনেক ভালো করছিস। তোদের জন্য আমি গৌরববোধ করছি। আমি জানতাম বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে। আমি জানতাম আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। কথাগুলো উনি এইভাবে বলতেন। আর অত্যন্ত স্মার্ট মানুষ তো! দেখতে ভীষণ সুদর্শন। তো যেটা হয়, সামনে দাঁড়ালে এক ধরনের মায়া, স্নেহ এবং এনার্জি গ্লো করত। আমরা ফিল করতাম। একটা মানুষের পার্সোনালিটি দেখে এটা হয় আর কি। আমাদের ভাবনাও উনাকে নিয়ে তাই ছিল। সুতরাং দুইটা মিলে একটা রসায়ন তৈরি হয়েছিল। এবং আমি খুব বিস্মিত, আমি খুব গৌরবান্বিত, উনি আমার অস্ত্র নিয়েছিলেন। তখন পারলে আমি কেঁদে দিই। আমরা বলেছিলাম, আমরা অস্ত্র তো দিয়ে দিচ্ছি, এখন আমরা কী করব? উনি বললেন, তোরা পড়ালেখা করবি। মানুষ হবি। মানে উনি যেভাবে ভেবেছেন আর কি। আবেগের জায়গা থেকে আমার জীবনের স্মরণীয় ঘটনা–আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না আমি বঙ্গবন্ধুর কাছে অস্ত্র জমা দিচ্ছি। এখনো বিশ্বাস হয় না। কারণ, আমার থেকে কত বড় যোদ্ধারা আছে, এটা পারেনি। কাদের সিদ্দিকী দিয়েছে আর মুজিব বাহিনী দিয়েছে। এর বাইরে প্রায় সবার অস্ত্র ডিসি সাহেবরা নিয়ে নিয়েছেন। কিছু কিছু সেক্টর কমান্ডাররা জমা নিয়েছেন। আমি সরাসরি বঙ্গবন্ধুর কাছে জমা দিয়েছি। এটার আলাদা একটা ব্যাপার আছে। সেই বিকালটা, সন্ধ্যাটা এখনো মনে আছে। জানুয়ারি মাসের ৩১ তারিখ, প্রায় ছয়টা বেজে গেছে। সূর্যটা অস্ত যাচ্ছে। রমনার বিশাল পার্কের প্রচুর গাছপালার ভেতর… অসাধারণ একটা আলো ছিল। এর ভেতর বঙ্গবন্ধুকে দেখতে সাংঘাতিক ভালো লাগছিল। সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির উপর মুজিব কোর্ট পরা কালো রঙের। কী এক কণ্ঠস্বর! জলদগম্ভীর কণ্ঠ ছিল।

‘‘আজকে জঙ্গিবাদের উত্থানের পেছনে আমাদের মৌলবি সাহেবদের যথেষ্ট খারাপ ভূমিকা আছে’’

রাজু আলাউদ্দিন: এরপরেও তো শেখ মুজিবকে কাছাকাছি অনেকবার দেখেছেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ। আমি অনেকবারই দেখেছি। আমার সুযোগ হয়েছে। আমি তো নাটক শুরু করলাম বাহাত্তরে। সেই নাটকগুলি চলতে চলতে নাট্যচক্রের খুব নামটাম হয়ে গেল।
রাজু আলাউদ্দিন: এক অর্থে আপনি নাটক তো শুরু করেছিলেন স্বাধীনতার আগেই….
নাসির উদ্দীন ইউসুফ:না, ড্রামা সার্কেলে স্বাধীনতার আগে আমি দেখতে যেতাম, আমার স্কুল বয়সে।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এর সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত হলেন স্বাধীনতার পরে?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: বাহাত্তর সালে। মামুনুর রশীদ আর কবির আনোয়ার–এদের পারাপার নাট্যগোষ্ঠী। পারাপার নাট্যগোষ্ঠী, বহুবচন আর আরণ্যক–এরা বাহাত্তর সালে নাটক শুরু করে। কবির আনোয়ার কিন্তু বাহাত্তর সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নাটক করেছে। আমি টিকিট ইত্যাদি বিক্রি করেছি। লাইট সেটআপ করেছি। বহুবচন এপ্রিল মাসে করে। আমি ওদের সাথে যেয়ে লাইট সেট করেছি। আমার একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল–ওই নাটকগুলি দেখে মনে হতো আমিও করি। একটু একটু বইটই পড়তাম। বিশেষ করে আমেরকিান সেন্টারে গিয়ে ইউরোপিয়ান লাইটের বইগুলি পড়তাম। তো সেখান থেকে লাইট সেটের আইডিয়া এসেছে। তখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি। চলচ্চিত্রও আমার খুব প্রিয় বিষয়। কিন্তু থিয়েটারটাই বেশি সময় দিলাম। তারপর তেহাত্তর সালে হঠাৎ করে আমরা ঢাকা থিয়েটারে গেলাম। ভাবলাম, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়-কেন্দ্রীক নাট্যচর্চা কেন করব! বৃটিশ কাউন্সিলে সকালবেলা লোকে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে নাটক দেখতে যেত। অদ্ভুত সকালবেলা! ওরা বিদেশি নাটক করত। আমরা বললাম, আমি আর সেলিম আর দীন দেশের নাটক করব। বাংলাদেশ এখন স্বাধীন। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাটক করব। তার ভাষার মৌলিক নাটক করব। মৌলিক নাটক লিখল সেলিম, আমিও করলাম, কিন্তু এগুলির মৌলিকত্ব দাবি করা যাবে না। কারণ, ওর কাঠামো থেকে শুরু করে ভাবনা–পুরোটাই জাঁ পল সার্তে্র দ্বারা প্রভাবিত। এটা খারাপ কিছু না।
রাজু আলাউদ্দিন: তখন তো আসলে ওইটারই সময় যাচ্ছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: জাঁ পল সার্তে, কাম্যু, আয়ানেস্কো, র‌্যাবো–এদের প্রভাব। এগুলি পড়ছি আমরা। ভাবছি, আমরা নিজেরাও নাটক করব। তখন সেলিম আল দীন আর হাসিবুল হাসান–দুজনের নাটক প্রথম ঢাকা থিয়েটারে হয়। ওরা করছে বৃটিশ কাউন্সিলে। আমরা করি ঢাকা স্পোর্টস এসেসিয়েশন মিলনায়তনে। সেটা স্টেডিয়ামের একেবারে মাথায়, ডিআইটি রোডে। এখন ওটা পাকা হয়েছে। তখন বেড়ার একটা দেয়াল ছিল। ছাদ ছিল টিনের। তিনশ লোক বসতে পারত। আমরা দুইশ পঞ্চাশ-ষাটটা চেয়ার দিতাম। তো নাটক শুরু করলাম। রবিবার সকাল সকাল। প্রথমে এক টাকা, দুই টাকার টিকিট হলো। পরে দুই টাকা, তিন টাকা হলো। এরপর তিন টাকা পাঁচ টাকা হলো। প্রতি রোববার সকালবেলায় দেখি কোনো টিকিট নাই। আগের দিন সব শেষ হয়ে গেছে। আমরা তো অবাক! শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দীন, শহীদ কাদরী, আল মাহমুদ, আবুল হাসান, গুণদা, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, রবিউল হুসাইন আসত। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাদের শিক্ষকরা আসতেন দেখার জন্য। কী করছে ওরা! আহমদ শরীফ। সেই তেহাত্তর সালে, আমাদের নাটক নিয়ে বিচিত্রা প্রথম কাভার স্টোরি করল।
রাজু আলাউদ্দিন: কাভার স্টোরি!
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেই স্টোরিটা ছিল একটু সমালোচনামূল। চুহাত্তর সালে নাটকের অনেক ভিড় ছিল। তখন হাইজ্যাক টাইজ্যাক চলছে। সময়টা অস্থির। খাদ্যদ্রব্যের একটা মন্দা হয়েছিল। যেটাকে দুর্ভিক্ষ বলে। জার্মানের এক নাট্যকার আছে পিসকার্টার। সে ডকুমেন্টারি থিয়েটার বলে একটা থিয়েটার করত। সমাজে যা ঘটে তার একটা রিফ্রেকশন। যা ঘটে তার বাস্তব উপস্থাপন নয়। এতে লোকে ইন্টারটেইন হয়। লোকে দেখে। এবং লোকে সচেতন হয়। আমরাও তখনকার সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক যে পরিস্থিতি সেগুলিকে নিয়ে আসলাম। তখন হঠাৎ করে একদিন দেখলাম যে, রেজোয়ান সাহেব, ঢাকার ডিসি ছিলেন, উনি লোকজন নিয়ে এসে বললেন, নাটক করা যাবে না। আমি পল্টু ভাইকে ফোন করলাম। পল্টু ভাই আসলেন। বললেন, তুই এরকম নাটক করছিস কেন! বললাম, সমাজে এরকমই তো হচ্ছে। আমরা এগুলি আপনাদেরকে, সরকারকে বলব না! কিন্তু ডিসি সাহেব তো ভেরি পাওয়ারফুল ম্যান। চিটাগাঙের লোক। কদিন আগে মারা গেছেন। ভালো মানুষ। উনাকে হয়ত কেউ বলেছে, নাটক বন্ধ করে দিলেন। আমি কামালকে (শেখ কামাল) ফোন করলাম। কামাল বলল, তুই আয়। আব্বা আছে বাসায়। আমি বাসায় গেলাম। তখন আর বঙ্গবন্ধুকে চাচা ডাকি না। স্যার ডাকি। যেহেতু রাষ্ট্রপতি। বললাম, স্যার নাটক তো বন্ধ করে দিল! উনি বললেন, কেন বন্ধ করল নাটক! কারণটা কী! আমি বললাম, জানি না। আমি নাটকে এই এই জিনিস করছি। বললেন, আরে কী করিস না করিস! দাঁড়া, আমি বলে দিচ্ছি। নাটক চলবে। এগুলি তো আসলেই ঘটছে। ব্যঙ্গ করে বলছে বলে তোদের গায়ে লাগছে। দোকানে জিনিসপত্র কম পাওয়া যাচ্ছে, জিনিসপত্রের দাম বেশি, এগুলি তো সত্য কথা। মিথ্যা নয়। তারপরে আমারে বলে, এইগুলি আর বেশি বেশি করিস না, বুঝছিস! আবার বলে, আরে কর কর। আমি চাই তোরা ভালো ভালো নাটক কর। আরো ভালো নাটক করিস। নাটক আবার শুরু হলো।

‘‘তিনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা জারি রেখে আপনি একটি জাতির ঐক্য আশা করতে পারবেন না’’

রাজু আলাউদ্দিন: হ্যাঁ, এইরকম আমিও শুনেছি। যেমন তখন তো বুদ্ধিজীবীদের বাকশালে যোগ দেয়ার হিড়িক পড়ে গেছে। কিন্তু শামসুর রাহমান যোগ দেননি। একজন বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে বলল যে, শামসুর রাহমান তো যোগ দেয় নাই। উনি বললেন, তাতে কী হইছে! উনার ইচ্ছা হয় নাই যোগ দেয় নাই। মানে তারা গেছে নালিশ করতে, যে, যোগ দেয়নি, তাকে একটু শাস্তি দেয়া উচিত। কিন্তু উনি বললেন, যার ইচ্ছা যোগ দেবে। যার ইচ্ছা দেবে না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সে (শামসুর রাহমান) আবার সরকারি পত্রিকায় চাকরি করে। দৈনিক বাংলায়।
রাজু আলাউদ্দিন: এরকম আরো অনেক নজির শুনছি। যেমন আল মাহমুদ। গণকণ্ঠে চাকরি করতেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: তাকে শিল্পকলায় চাকরি দিলেন।
রাজু আলাউদ্দিন: অথচ এই গণকণ্ঠ কী করছে! শেখ মুজিব এবং ওই সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে প্রচুর সমালোচনা করছে। কিন্তু উনি তো রুষ্ট হন নাই। অপনি যেটা বললেন, এটা উনার চরিত্রের সাথে ম্যাচ করে। উদারতার সাথে ম্যাচ করে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: জিয়াউর রহমানের আমলে, সাতাত্তর সালে, মার্শল ল চলছে, ঢাকা থিয়েটার থেকে আমরা প্রথম একটা রাস্তার নাটক শুরু করলাম। এই নাটকে একটা নিরীহ প্রাণীকে মেরে ফেলা হয়। সমুদ্র থেকে উঠে এসেছিল প্রাণিটা। সেটাকে চরের লোকজন ভেবেছে অশুভ। সেজন্য এটাকে বল্লম, কোঁচ, ট্যাঁটা দিয়ে মেরে ফেলেছে। মারার পর অন্ধকার হয়ে গেছে। ওরা মশাল জ্বালিয়েছে। হারিকেন জ্বালিয়েছে। তারপর তারা দেখে প্রত্যেকের চোখেমুখে রক্ত। এ ওর দিকে তাকিয়ে দেখে, হাতে-মুখে-গায়ে ছোপছোপ রক্ত। তখন ওদের অপরাধ বোধ জাগতে থাকে। এমন সময় সমুদ্র থেকে গর্জন শুরু হয়। প্রবল জলোচ্ছ্বাস শুরু হয়। চরটা ডুবে শেষ হয়ে যায়। এই হচ্ছে নাটক। এই নাটকটা যখন রাস্তায় করতেছি সাতাত্তর সালে, কোনো রাজনীতি নাই, কিছু নাই, হঠাৎ করে পুলিশ আর সেনাবাহিনী আসল। আমার তখন শিমুলের সাথে বিয়ে হয় নাই। কিন্তু আমরা একসাথে কাজ করছি। সেলিম তো নাই। এগুলোতে থাকে না। আমাকে, শিমুলকে, হাবিবুল হাসানকে এ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল রেসকোর্স ময়দানে। পুলিশ অফিসারের কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, স্যার, এইখানে কী নাটক জানি করতেছে, রাস্তায় ভিড় করে ফালাইছে। মার্শাল লয়ের ভেতর এইগুলি করে। ধরে নিয়ে আসছি। প্রায় সাত ঘণ্টা পরে আমাদেরকে ছেড়ে দিয়েছিল।

রাজু আলাউদ্দিন: তখন মোশতাক তো নাই ক্ষমতায়।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: জিয়াউর রহমান তখন ডেপুটি চিফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর। আর সায়েম হচ্ছে চিফ মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর। পৃথিবীর ইতিহাসে এটা একটা বিশাল ঘটনা, একটি দেশের প্রধান বিচারপতি চিফ মার্শাল এডমিনিসেট্রটর হচ্ছে। এ রকম কোথাও ঘটেনি।
রাজু আলাউদ্দিন: সব সম্ভবের দেশ। কী করে ঘটল আমি বুঝলাম না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: একজন প্রধান বিচারপতি কী করে মার্শাল এডমিনিস্ট্রেটর হয়!
রাজু আলাউদ্দিন: ওরা তো সংবিধানই মানেনি। সংবিধানে তো এই রকম কোনো বিধানই নাই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: একই সাথে সংবিধান রেখেছে, আবার লঙ্ঘনও করেছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা ব্যাপার, আপনি যেটা বলছিলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, প্রথমে উনি বলছেন মানুষ, এরপর বাঙালি। তারপর মুসলমান।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: হ্যাঁ। ধর্ম-পরিচয়টা তৃতীয়।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন কিন্তু রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে সেই তৃতীয় পরিচয়টা প্রধান এবং প্রধান পরিচয়টা তৃতীয় জায়গায় চলে গেছে। আপনি দেশের অগ্নি সন্তান। যে স্লোগান দিয়ে দেশ স্বাধীন করলেন সেটা আজ উল্টে গেল।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: কী আর বলব! মাঝে মাঝে আমার নির্ঘুম রাত যায়। খুব রাগ হয়। খুব ক্ষোভ হয়। রাষ্ট্রটা মুক্তিযুদ্ধের জায়গায় থাকুক। চেতনার জায়গায় থাকুক। মানুষের জায়গায় থাকুক। রাষ্ট্রটা তো শুধু বাঙালির না, শুধু মুসলমানের না, রাষ্ট্রটা মানুষের হোক। এটার জন্যই তো লড়াই। এটা আমাদের জন্য চরম হাতাশার জায়গা তৈরি করেছে মানসিকভাবে। যে কোনো মুক্তিযোদ্ধার সাথে কথা বলবেন, দেখবেন, সে খুব অস্থির। ভালোভাবে সে সবকিছুকে নিতে পারছে না। তার মধ্যে অনেক অসঙ্গতি দেখা যায়। খুব ক্ষিপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি মনে করি, এগুলির কারণ আছে। প্রাপ্তিটা তো ব্যক্তির জন্য না। প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির জায়গাটা দেশকে কেন্দ্র করে হয়েছিল। সেই জায়গাটায় আমরা হেরে যাচ্ছি। রাজু, আপনি একটা কথা খুব সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করলেন যে, ‘মানুষটা’ প্রথম ছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে, এটা তৃতীয় হয়ে গেছে। এটা আপনার কারেক্ট অবজারভেশন। এবং তৃতীয় যেটা, ধর্মপরিচয়, সেটা প্রধান হয়ে উঠেছে। ক্রমশ আমরা দেখতে পাচ্ছি, সমাজ এবং রাষ্ট্র ধর্মের সাথে একটি অবৈধ চুক্তিতে যাচ্ছে। সমঝোতায় যাচ্ছে। এটার বৈধতা আমাদের সংবিধান দেয় না। এটার বৈধতা আমাদের সংস্কৃতি দেয় না। এটার বৈধতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ দেয় না। সুতরাং আপনারা যে-ই হোন না কেন, যা-ই করেন না কেন, যে সমঝোতা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের সাথে করেন না কেন, এটা প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া গ্রহণ করার কোনো রকম অবকাশ নেই। আমরা অনেক মানুষের সাথে যখন থাকি, সময়টা কেটে যায়। একা যখন হই, তখন পীড়া দেয়। কষ্ট পাই। ক্ষোভ হয়।

রাজু আলাউদ্দিন: এই যে উল্টো যাত্রা শুরু হলো এটা তো পঁচাত্তরের পর থেকেই শুরু হয়েছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: পঁচাত্তরের সকালবেলায় যখন তারা বলতেছে যে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। ‘রেডিও বাংলাদেশ’ বলল। বাংলাদেশ বেতারের’ নাম বলল না। এবং একই সাথে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বন্ধ হয়ে গেল। বলল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। একটা জাতিকে ধ্বংস করার পূব-পরিকল্পনা ছিল। তা না হলে এটা হয় না। আমাদের পাসপোর্টে কী ছিল এটা কেউ খেয়াল করে না। বাহাত্তর সালের পাসপোর্টটা খুলে যদি দেখেন, আমার কাছে আছে, লেখা আছে রেইস বাঙালি। রেইস মানে জাতি। রেইস বাঙালি, তার পাশে লেখা আছে চাকমা, মারমা ইত্যাদি যার যার পরচিয়। কত আধুনিক চিন্তা ছিল! আর সিটিজেনশিপ বাংলাদেশি। তার মানে আমি বাঙালি, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি বাঙালি, আমি ভারতের নাগরিক। আমি বাঙালি, আমি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। আমি বাঙালি, আমি আমেরিকা বা চীনের নাগরিক। বা আমি স্পেনের নাগরিক। এটা কি আধুনিক নয়!
রাজু আলাউদ্দিন: অত্যন্ত আধুনিক।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সর্বাধুনিক। আমরা সেটাকেও বিসর্জন দিয়েছে। এটাকে ওরা সংবিধান থেকে ধ্বংস তো করেছেই, আমি বলি, আমাদের বর্তমান সরকার এই জায়গাটাতে ফিরে আসুক।
রাজু আলাউদ্দিন: এটাই তো সেই সরকার যেই সরকার যুদ্ধাপরধীদের বিচার করেছে। আমি বলব, বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করে যে অর্জনটা করেছিলেন, দ্বিতীয় আরেকটি অর্জন ঘটেছে তার কন্যার মাধ্যমে। সেটি হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এবং এটা উনি না করলে আর কেউ করত না। আওয়ামী লীগেরই আর কেউ করত বলে আমার মনে হয় না।

‘‘ঢাকা শহরের আধুনিক মানুষ যারা, তারা সবাই চিল্লায় যায়’’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: জাহানারা ইমামকে সাথে নিয়ে আমরা এই আন্দোলনটা করেছি। পরে গণ আদালত থেকে গণজাগরন মঞ্চ। আমার মনে হয়, এটি শেখ হাসিনা ছাড়া কারো করার সাহস হতো না। আমরা নিজেরাও কিন্তু নানা সময়ে ভেবেছি, উনি কি করবেন! করবেন তো? কবে করবেন?
রাজু আলাউদ্দিন: অনেকেই বলত উনি এটাকে নিয়ে খেলছেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: অনেকেই অনেক কথা বলেছে। আমাদের আবার এই জায়গাটায় উনার প্রতি বিশ্বাস আছে। আমি জানি যে, উনি বেঁচে থাকতে এই দেশটা সাম্প্রদায়িক হতে দেবেন না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু বাচ্চু ভাই, আপনি যে আস্থার কথা বলছেন, সেই আস্থাটা তো আমরা সবাই উনার উপর রাখতে চাই। কিন্তু রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেগুলি সেই সম্ভাবনাকে ম্লান করে দিচ্ছে। মানে আশাব্যঞ্জক মনে হয় না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এটা ভেবেই তো বেশি কাতর হই আমরা।
রাজু আলাউদ্দিন: এখন সন্দেহটা আরো বেশি প্রগাঢ় হয়ে উঠছে। যেমন রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। জনগণ তো কেউ এটা দাবি করে বলেনি যে, রাষ্ট্রধর্ম মানুষ চায়। এটা কে করল? একটি মানুষের ইচ্ছায়, একটি মানুষের ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের আকাঙ্ক্ষা থেকে এটা ঘটেছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ধর্মকে পুঁজি করে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে। বিসমিল্লাহিররাহ মানির রাহিম লিখছে জিয়াউর রহমান। আর রাষ্ট্রধর্ম করছে এরশাদ।
রাজু আলাউদ্দিন: এই যে দুটো জিনিস–বিএনপি তো আর এটা বাদ দেবে না। জাতীয় পার্টি কোনদিন ক্ষমতায় গেলেও করবে না। একমাত্র যেই দলটি করতে পারে, সেটি আওয়ামী লীগ। আপনি কি মনে করেন যে আওয়ামী লীগ সত্যি সত্যি এটা করতে পারবে? বা আপনি কী চান?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমি বাহাত্তরের সংবিধানের কাছে ফেরত যেতে চাই। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র বা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয়তাবাদ চাই। আগে জাতীয়তাবাদ ছিল শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদ। এখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে সাথে অন্যান্য যে জাতিসত্তা এবং ক্ষুদ্র জাতিগুলো আছে, তাদের অধিকারগুলোও সংরক্ষিত থাকতে হবে। এটা আছে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, শুধু বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে দেশটা স্বাধীন হতে পারে। কিন্তু স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পরে দেশটা সকল জাতির সকল বর্ণের সকল মানুষের। মুক্তিযুদ্ধ তো এই প্রেরণাটাই আমাদের দিয়েছে। এটা করা উচিত এবং আমার আকাঙ্ক্ষা এটা। নিকট ভবিষ্যতে হয়ত হবে না। কিন্তু একটু দূরের দিকে যদি তাকাই, আমার মনে হচ্ছে, নতুন যে প্রজন্ম উঠে আসছে, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ভেতর দিয়ে তাদের মানসিক যে জায়গা তৈরি হচ্ছে, বিজ্ঞান যেখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে, যুক্তি যেখানে একটি বড় ভূমিকা পালন করছে আধুনিক বিশ্বে; সেইখানে একটা সম্ভাবনার জায়গা দেখতে পাই। তবে বিশ্ব-পরিস্থিতি কিন্তু আমাদের পক্ষে নয়। কারণ, বিশ্ব-পরিস্থিতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি মুসলমান দেশগুলোতে সংকট এবং সেখানে আগ্রাসী ভূমিকা আছে উন্নত দেশগুলোর। আধিপত্য বিস্তার করছে পুঁজিবাদী দেশগুলো। তাতে করে মুসলিমরা মনে করছে, আগে ছিল স্যোসালিজম বা কমিউনিস্টদের সাথে পুঁজিবাদের লড়াই, এখন লড়াইটা হচ্ছে পুঁজিবাদী বনাম ইসলাম। এখানে পলিটিক্যাল ইসলাম ক্রমশ ভায়ালেন্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে একজন সাধারণ মুসলমানও ভাবছে, ওরা তো আমাদের মুসলমান ভাইদের মারছে, তাহলে ওদেরকে মারাটা বোধহয় ঠিক। এই যে সাইক্লোজিক্যাল একটা ক্রাইসিসের মধ্যে পড়েছে আমাদের মুসলিম জনগোষ্ঠী, সারা পৃথিবীতে….
রাজু আলাউদ্দিন: ফলে এখনই ধর্মীয় পরিচয় বাদ দিতে গেলে সে আরো সংকটের ভেতর পড়বে বলে আপনি মনে করছেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেজন্য আইডেন্টিটির কারণেই অনেকেই মুসলমান বলার চেষ্টা করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: আইডেন্টিটিটা ধর্মভিত্তিক জায়গায় গেলে সে নিরাপদ বোধ করে। কিংবা সে মনে করে আমি ঐক্যবদ্ধ। আমার শক্তিটা বড়।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সে জন্যই এদিকটায় যাচ্ছে। এবং সে কারণে আমাদেরকে বোঝাতে হবে যে,বাঙালি জাতিসত্তা কিন্তু এমনিতেই ধর্মের আগে আসে। আমি হাসতে হাসতে বলি, বক্তৃতায় বলি অনেক জায়গায়, মজা করে বলি, রাজশাহীতেই বলে আসলাম–এখানে অনেকে বসে আছে, কারো চেহারা চাকমাদের মতো, মনে হয় উনারা চাকমা জাতিসত্তার মানুষ। অনেকের দেখছি মাথায় পাগড়ি, হয়ত শিখ হবে। কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে খৃস্টান এটা আমরা বলছি না। প্রথম দেখাই আমরা বলি–ও ককেশিয়ান। ও চাইনিজ। ও জাপানিজ। ও ইন্ডিয়ান। নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যটা আমরা জাতিসত্তার সাথে সম্পৃক্ত করি। এবং এইটার মধ্যদিয়ে আমরা তার পরিচয় খোঁজার চেষ্টা করি। ধর্ম দিয়ে নয়। সুতরাং যে কোনো জায়গায় নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়টা দিলে সেটা অসাম্প্রদায়িক হয়। এবং সেটা মানুষের সমঅধিকারের জায়গাটাকে অনেক বেশি স্বচ্ছ করে।

রাজু আলাউদ্দিন: আপনি বলছেন মানুষের সাইক্যোলোজির ভেতর একটা পরিবর্তন এসেছে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেটার কারণও আমরা দেখতে পাচ্ছি–বিশ্ব পরিস্থিতি।
রাজু আলাউদ্দিন: বিশ্ব পরিস্থিতি, রাজনীতি, সামরিক শাসক। আমি বলতে চাচ্ছি একজন বড় রাজনীতিবিদ, তিনি মানুষের মনোকাঠামোর মধ্যে পরিবর্তন আনেন। আকাঙ্ক্ষা একটি উন্নত রূপকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান মানুষের মধ্যে। অন্যজন, যিনি বড় রাজনীতিবিদ না, তিনি সাধারণ মানুষের অবিকশিত জগতের প্রয়োগ ঘটান। এখন আমি যদি বলি, এই যে মানুষের মধ্যে ধর্মপ্রবণতা প্রবল হয়ে উঠছে, এখন সহজে কোনো রাজনীতিবিদ এসবের বিরুদ্ধে যেতে চায় না। আমার প্রশ্নটা হলো, এখন আমাদের যেসব রাজনীতিবিদরা আছেন, এরা কি তাদের সঠিক ভূমিকা পালন করছে বলে আপনি মনে করেন?
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: না, আমি মনে করছি না। আমি মনে করছি, জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ কি ধর্ম ভিত্তিক হবে নাকি গোষ্ঠীভিত্তিক হবে–এটা নিয়ে তাদের যথেষ্ট কনফিউশন আছে। পরিষ্কার ধারণা নাই। আর দুই নম্বর হচ্ছে–এক সময় আমরা দেখেছি, বঙ্গবন্ধু বা অন্যদেরকে দেখেছি দেশের সেবা করতে। মানব সেবা করতে। এখন তো ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়েছে। ক্ষমতায় তো যেতেই হবে। কিন্তু কীসের বিনিময়ে ক্ষমতায় যাব? আমি আমার সত্তাকে বিক্রি করে ক্ষমতায় যাব। আমার বিশ্বাসটাকে বিক্রি করে ক্ষমতায় যাব। আমি জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করব। আমার মনে হচ্ছে উনারা যে কোনকিছুর বিনিময়ে ক্ষমতায় থাকতে চান। উনারা আজকে হেফাজতের মতো একটি পশ্চাতপদ চিন্তার সংগঠনের সাথে মিলিত হচ্ছেন। আমি মনে করি এটা থাকা সমীচিন হচ্ছে না। আজকে জঙ্গিবাদের উথ্থানের পেছনে আমাদের মৌলবি সাহেবদের যথেষ্ট খারাপ ভূমিকা আছে। তারা ওয়াজে বসে যে পরিমাণ খারাপ কথা বলে, নারীবিরোধী কথা বলে….

‘‘শত

বর্ষের কাজ পড়ে গেছে শেখ হাসিনার উপরে’’

রাজু আলাউদ্দিন: নারীবিরোধী, প্রগতি-বিরোধী, বিজ্ঞান-বিরোধী এবং সাংস্কৃতিক সুস্থতা-বিরোধী এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্নগ্রাফি, অশ্লীল কথা বলে।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেগুলো ফেসবুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হাজার হাজার ইয়াং ছেলে লাইক দিচ্ছে। এবং তাদেরকে কেউ কিছু বলছে না। আমার কথা হলো একটা যাত্রা করতে গেলে, একটা নাটক করতে গেলে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু ওদের কোনকিছু লাগে না।
রাজু আলাউদ্দিন: আর যাত্রায় তো আপনি কারো ক্ষতিকর কোনো বক্তব্য দিচ্ছেন না। পর্নগ্রাফিক কোনো দৃশ্যও নাই। অথচ সেটার জন্য আপনাকে অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু যে জায়গাতে মানুষকে সাম্প্রদায়িক হতে উস্কানি দেয়, মানুষতে হানাহানিতে উদ্বুদ্ধ করে, সেগুলোকে আপনি অনুমতি দিচ্ছেন।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: সেদিন একটা অদ্ভুত জিনিস দেখলাম মোবাইলে। ও বলতেছে, আপনারা যখন দোজখে যাবেন, দোজখে যেয়ে দেখবেন সেখানে নারী আর নারী। নারী আর নারী। নারীরা এতই পাপী যে তাদের দ্বারা দোজখ ভরে যাবে। ভাই, একটা লোক নাই দাঁড়িয়ে বলার যে, তোর মা তো নারী! তোর বোনরা তো নারী! তোর কন্যা, স্ত্রী–সবাই তো নারী!
রাজু আলাউদ্দিন: বাংলাদেশের প্রায় প্রত্যেকটা গ্রামে মসজিদ আছে। মাদরাসা আছে। এরা এগুলোর সুযোগ নিচ্ছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এটা প্রার্থনার জন্য হলে তো অসুবিধা ছিল না।
রাজু আলাউদ্দিন: কিন্তু এটা তো শুধু ধর্মের মধ্যে নাই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এটা তো র‌্যাডিক্যাল ইসলামের জন্য রাখছে। এটা জঙ্গি ইসলাম। এই যে জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, এটা ভয়াবহ জায়াগায় বাংলাদেশকে ঠেলে দিয়েছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এটা তো পুলিশ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: পুলিশ দিয়ে তো হবে না। আপনি এটাকে ডিফেন্ড করবেন।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি এটা নির্মূল করতে পারবেন না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: নির্মূল করতে হলে আপনাকে গোড়ায় হাত দিতে হবে। আপনাকে শিক্ষাব্যবস্খায় হাত দিতে হবে। তিনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা জারি রেখে আপনি একটি জাতির ঐক্যি আশা করতে পারবেন না। একদিকে ইংরেজি মাধ্যম, যেটা বিদেশের সাথে সম্পর্কিত, যাদের ছেলেমেয়েরা বলে যে, মা মা, গাছে ব্যানানা। ও বিস্মিত যে গাছে ব্যানানা আছে। ও তো ব্যানানা ফ্রিজে দেখে আসছে সব সময়। ওটা গাছে কেন! আরেকদল হলো শুধু আরবি শিখছে। বেহেশত আর দোজখের হিসাব কষছে। নারীরা কত খারাপ সেটা বলছে। বিজ্ঞানের সাথে সেই মানুষগুলোর কোনো সম্পর্ক নাই। যুক্তিশাস্ত্রের সাথে যাদের কোনো সম্পর্ক নাই। আরেকটা হচ্ছে আমাদের বাংলা মিডিয়াম। সেখানেও একই জিনিস ঢুকে গেছে। একই পরিবারের তিনটা সন্তানকে যদি তিনটা স্কুলে পাঠাই, কুড়ি বছর পরে যদি তিনজনকে সামনাসামনি করি, একজন আরেকজনের সাথে হানাহানিতে লিপ্ত হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: কারণ, একজন আরেকজনের ভাষা বোঝে না। তার বিশ্বাসের সাথে কোনো যোগাযোগই তৈরি হচ্ছে না। একজন হয়ত শুধু যুক্তি দিয়ে কথা বলছে, আরেকজন শুধু বিশ্বাস থেকে কথা বলছে। ফলে এদের মধ্যে তো কোনভাবেই কোনো ঐক্য তৈরি হয় না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার মনে হচ্ছে, ইউনিফাইড কারিকুলাম ছাড়া, ধর্মশিক্ষাকে উইথড্রো করে, বিজ্ঞান, ইংরেজি, যুক্তিশাস্ত্র, বাংলা এর সাথে ধর্ম শাস্ত্রটাকে ইনক্লুড করে ইউনিফাইড কারিকুলাম ছাড়া আমাদের সামনে এগোবার রাস্তা নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: ধর্ম তো আগেও ছিল। আমরা জন্ম তেষট্টি সালে। দীনিয়াত বলে আমাদের একটা সাবজেক্ট ছিল সেই পাকিস্তান আমলে। কোনো অসুবিধা তো হয়নি।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমরা মাইর খেতাম মৌলভি সাহেবদের হাতে দীনিয়াত ক্লাশে। সুরা মুখস্ত করে বলতে হতো। এতে আমাদের তো কোনো অসুবিধা নাই। আমাদের সময়ে যারা হিন্দু ছিল, আমি ঢাকা নবাবপুর গভর্মেন্ট হাইস্কুল থেকে পাশ করেছি; ওখানে হিন্দু ছাত্রদের জন্য পণ্ডিত ছিল। ওদেরকে সংস্কৃত পড়াতেন। আমাদের আবার আরবি টিচার ছিল। দুই ধর্মের শিক্ষকই খুব রাগি ছিল। বেত দিয়ে পিটাত আমাদের। আমার কথা হলো তারপরেও তো আমরা এনজয় করেছি। সেই শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে। কত আদরও করেছেন তারা! সুরা পারিনি বলে মেরেছেন। আবার আদরও করেছেন। শিখায়ে দিতেন কীভাবে বলতে হবে। উচ্চারণগুলি কেমন হবে। ধরে ধরে শিখিয়েছেন। আমরা তো শিখেছি। জাফর ইকবালের উপর যে আক্রমণটা হয়েছে, জাফর ইকবালেরর দুইশ বইয়ের একটা বইও তো ধর্মের বিরুদ্ধে নাই। তাহলে কেন আক্রমণ হলো! হেইটিসপিস্ট থেকে। এই ঘৃণার বক্তব্য শুনে শুনে এই ছেলেগুলি বড় হচ্ছে।
রাজু আলাউদ্দিন: ওই ছেলেকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তুমি কোথায় দেখেছ সে নাস্তিক? ও তো বলতেই পারেনি। এমনকি কোনো বইয়ের মধ্যে নাই-ও আসলে। ওর চাচারা ওকে উদ্বুদ্ধ করেছে। তার মানে সে জানেই না কাকে সে আক্রমণ করছে। কেন করছে সেটারও কোনো পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ও ভাবছে হয়ত এই লোকটা তো ধর্মের কথা বলে না। আবার সোলাইমানের ভূত না কী একটা বইয়ের কথা বলল।

রাজু আলাউদ্দিন: সেখানে তো নাস্তিকতার কিছু নাই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: যাই হোক, আমি যেটা বলছিলাম, এই যে একটা লোককে আরেকটা লোক সহজে পেছন থেকে যেয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে বা মেরে ফেলছে, এই ইয়াং ছেলেটা, ওকে তো পড়ানো হয়েছে ভুল জিনিস। রাষ্ট্র কী করে সেই শিক্ষাকে এ্যালাউ করছে।
রাজু আলাউদ্দিন: এক অর্থে তো রাষ্ট্রই এই ঘাতকগুলোকে তৈরি করছে। রাষ্ট্র এমন একটি মানুষ তৈরি করছে, যেই মানুষ একটি নিরীহ মানুষকে খুন করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। আপনি এই যে শিক্ষাব্যবস্থার কথা বললেন, এগুলো পুলিশ দিয়ে পাহারা বসিয়ে এর সমাধান হবে না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আপনি গোড়ায় হাত দিচ্ছেন না তো। আপনি উপরেরটা কাটছেন।
রাজু আলাউদ্দিন: একটা মানুষকে প্রগতিশীল চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করবে, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করবে–এই রকম লেখাই যদি ওই কারিকুলামের মধ্যে না থাকে, তাহলে সে কী পড়বে!
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: নারী পুরুষের সমঅধিকার যদি না থাকে, নারীর ভূমিকা সম্পর্কে যদি সম্যক জ্ঞান একটা পুরুষকে না দেয়া হয় বা পুরুষের ভূমিকার জ্ঞান যদি নারীকে না দেয়া হয়, তাহলে আপনি কী করে আশা করেন যে প্রোপার কমিউনিকেশনটা হবে!
রাজু আলাউদ্দিন: আরেকটা জিনিস বাচ্চু ভাই, এটাও গুরুত্বপূর্ণ–পাঠ্যপুস্তকে আছে, কিন্তু সেই জিনিসটা যিনি শেখাবেন, সে পশ্চাৎপদ কি না, সে যদি পশ্চাৎপদ হয়, তাহলে এগুলো কিন্তু টেক্সটেই থাকবে। ছাত্রের ভেতর ঢুকবে না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার মনে পড়ে, চাঁদে যখন মানুষ গেল, মৌলবি সাহেবরা বলল, সব মিথ্যা কথা। এগুলি বিশ্বাস করবি না।
রাজু আলাউদ্দিন: সেটাই। সেটাই। আপনি দেখেন কত কত শিক্ষক মৌলবাদের সাথে যুক্ত।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: দুুই হাজার মোবাইল এক মাদরাসায় পুড়িয়ে ফেলেছে। কী অদ্ভুত!
রাজু আলাউদ্দিন: আপনি ইউনিভার্সিটিগুলোতে দেখবেন, কলেজগুলোতে দেখবেন, এমনকি বিজ্ঞানের শিক্ষক, তিনি চিল্লায় যাচ্ছেন।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: ঢাকা শহরের আধুনিক মানুষ যারা, তারা সবাই চিল্লায় যায়। আমি ঠিক জানি না কোন জিনিস তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে। আসলে প্রথম কাজটা হলো রাষ্ট্রকে খবরদারিটা করতে হবে। এমনকি আমাদের যে বাংলা এডুকেশন, সেটাতেও অনেক ত্রুটি আছে। সেগুলিকেও অনেক মানবিক করতে হবে। আমার মনে হয় এটাকে আরো আধুনিক করতে হবে। আমার মনে হচ্ছে, শত বর্ষের কাজ পড়ে গেছে শেখ হাসিনার উপরে। তিনি কী করে এইখান থেকে টেনে তুলবেন–আমি মাঝে মাঝে ভাবি তার কষ্টের কথা। তার চ্যালেঞ্জের কথা। জঙ্গিবাদকে এইভাবে কেউ মোকাবেলা করত না। শুধু যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছে তাই না। জঙ্গিবাদকে যে সাহসের সাথে মোকাবেলা করেছেন এটা কিন্তু অনেক বড় ব্যাপার। এই দিকটায় উনাকে আমি অনেক শ্রদ্ধার জায়গায় রাখি। একেক জন একেক দিকে। সবকিছু ধরে তিনি টান দিচ্ছেন। পঁচাত্তরের পরে যখন পাঠ্যপুস্তক চেঞ্জ হয়ে গেল, আরে ভাই নাটকের নামও তো চেঞ্জ হয়ে গেল! চলচ্চিত্রের নাম চেঞ্জ হলো। আগে চলচ্চিত্রের নাম ছিল কী? আঁকাবাঁকা, নীল আকাশের নিচে, ক খ গ ঘ ঙ।
রাজু আলাউদ্দিন: আপনার ‘ঘুড্ডি’, আপনি যেটাতে প্রথম অভিনয় করলেন।

‘‘জঙ্গিবাদকে যে সাহসের সাথে মোকাবেলা করেছেন এটা কিন্তু অনেক বড় ব্যাপার’’

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: কিন্তু পঁচাত্তরের পরে ছবির নাম হলো আবে হায়াত। মহল। সাংস্কৃতিকভাবে ভাষাটা বদলে যেতে থাকল। তার সাথে রাজনীতিটা। দুটোই কিন্তু খুব প্লান করে ঢুকেছে। এবং আমরা ‘বাঙালি’ও থাকলাম না। আমরা ‘বাংলাদেশি’ হয়ে গেলাম। আমাদের কিন্তু বাঙালি হিসাবে সাংবিধানিক কোনো পরিচয় নাই। কারণ আমার পাসপোর্ট আমাকে বাঙালি বলছে না। আমার ইচ্ছা ছিল আমি বাঙালি থাকব। কেউ চাকমা থাকবে। কেউ মারমা থাকবে। কেউ হাজং থাকবে। কেউ গারো থাকবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমার তো কোনো অসুবিধা নেই। বাহাত্তর সালের পাসপোর্টটা দেখলে আমার খুব ভালো লাগে। মুক্তিযুদ্ধের পরে খুব গৌরব করতাম। এই রকম একটা আধুনিক প্রস্তাবনার সাথে আমরা জড়িত ছিলাম। বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন। কিন্তু লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধে গেছে। অপ্রত্যাশিতভাবে এটা এখন সুদূরপরাহত। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এটা সম্ভব। যদি একটা ঝুঁকি নিয়ে সরকার পুরো জিনিসটাকে করে। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে শত বাধার মুখে, শত আক্রমণের মুখে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করে দেশটাকে একটি সঠিক ট্র্যাকে তোলার চেষ্টা করেছেন। এবং পাঁচ বছর তো চলছে। তার মানে উনার সরকার খুব শক্তিশালী। এই রকম একটা জায়গায় গিয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
রাজু আলাউদ্দিন: এবং সেই সিদ্ধান্তুগুলোর একটা হবে রাষ্ট্রধর্ম বাদ দেয়া।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমার কথা হচ্ছে সকল ধর্মের মানুষের সমঅধিকারকে স্বীকৃতি দেয়া। একটা লোক এই বইটা পড়ে যেন মনে না করে এই বইটা তার নয়। এমন মনে হলে তার খটকা লাগবে। সে আর বইটার ভেতর ঢুকবে না। আমি মনে করি যার যার ধর্ম তার তার। লাকুম দীনাকুম ওলিয়া দীন। সবাই যার যার ধর্ম পালন করুক। আমি মুসলিম পরিবারের মানুষ। বাঙালি, কিন্তু মুসলিম। বাবাকে দেখেছি খুব সুন্দর করে দুরুদ শরিফ পড়তেন। সকালবেলা সুরা পড়তেন জায়নামাজে বসে। আবার নামাজে পরে চা টা খেয়ে–‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণ ধূলার তলে’–রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতেন। আবার মাঝে মাঝে শেষ বয়সের দিকে এসে গাইতেন–‘যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে’। একজন মানুষকে তো এইভাবেই আমি দেখার চেষ্টা করব। এই মানুষগুলো যে সৌন্দর্য অর্জন করে সেই জায়গা থেকে দূরে গিয়ে আমরা কসাই প্রবৃত্তির মানুষ হচ্ছি।
রাজু আলাউদ্দিন: একরোখা।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: বহুমাত্রিকতা নাই।
রাজু আলাউদ্দিন: একরৈখিক বলেই একরোখা হয়। যুক্তি নাই। কালচারাল কোনো ডাইভার্সিসি নাই।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: এবং আমার কথাই শেষ কথা।
রাজু আলাউদ্দিন: অন্যের কথা শুনব না।
নাসির উদ্দীন ইউসুফ: আমাদেরকে অসহিষ্ণু করে তুলেছে।

ইতিপূর্বে আর্টস-এ প্রকাশিত রাজু আলাউদ্দিন কর্তৃক গৃহীত ও অনূদিত অন্যান্য সাক্ষাৎকার:
দিলীপ কুমার বসুর সাক্ষাৎকার: ভারতবর্ষের ইউনিটিটা অনেক জোর করে বানানো

রবীন্দ্রনাথ প্রসঙ্গে সনজীদা খাতুন: “কোনটা দিয়ে কাকে ঠেকাতে হবে খুব ভাল বুঝতেন”

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাক্ষাতকার: “গান্ধী কিন্তু ভীষণভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী ছিলেন”

নন্দিতা বসুর সাক্ষাতকার: “তসলিমার মধ্যে অনেক মিথ্যা ভাষণ আছে”

ভরদুপুরে শঙ্খ ঘোষের সাথে: “কোরান শরীফে উটের উল্লেখ আছে, একাধিকবারই আছে।”

শিল্পী মনিরুল ইসলাম: “আমি হরতাল কোনো সময়ই চাই না”

মুহম্মদ নূরুল হুদার সাক্ষাৎকার: ‘টেকনিকের বিবর্তনের ইতিহাস’ কথাটা একটি খণ্ডিত সত্য

আমি আনন্দ ছাড়া আঁকতে পারি না, দুঃখ ছাড়া লিখতে পারি না–মুতর্জা বশীর

আহমদ ছফা:”আমি সত্যের প্রতি অবিচল একটি অনুরাগ নিয়ে চলতে চাই”

অক্তাবিও পাসের চোখে বু্দ্ধ ও বুদ্ধবাদ: ‘তিনি হলেন সেই লোক যিনি নিজেকে দেবতা বলে দাবি করেননি ’

নোবেল সাহিত্য পুরস্কার ২০০৯: রেডিও আলাপে হার্টা ম্যুলার

কবি আল মাহমুদের সাক্ষাৎকার

শামসুর রাহমান-এর দুর্লভ সাক্ষাৎকার

হুমায়ুন আজাদ-এর সঙ্গে আলাপ (১৯৯৫)

নির্মলেন্দু গুণ: “প্রথমদিন শেখ মুজিব আমাকে ‘আপনি’ করে বললেন”

গুলতেকিন খানের সাক্ষাৎকার: কবিতার প্রতি আমার বিশেষ অাগ্রহ ছিল

নির্মলেন্দু গুণের সাক্ষাৎকার: ভালোবাসা, অর্থ, পুরস্কার আদায় করতে হয়

ঈদ ও রোজা প্রসঙ্গে কবি নির্মলেন্দু গুণ: “ আমি ওর নামে দুইবার খাশি কুরবানী দিয়েছি”

শাহাবুদ্দিন আহমেদ: আমি একজন শিল্পী হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না

জুয়েল আইচ: রাষ্ট্র কি কোন জীব নাকি যে তার ধর্ম থাকবে?

রফিকুননবী : সৌদি আরবের শিল্পীরা ইউরোপে বসে ন্যুড ছবিটবি আঁকে

নির্মলেন্দু গুণ: মানুষ কী এক অজানা কারণে ফরহাদ মজহার বা তসলিমা নাসরিনের চাইতে আমাকে বেশি বিশ্বাস করে

নায়করাজ রাজ্জাক: আজকের বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের যে বিকাশ এটা বঙ্গবন্ধুরই অবদানের ফল

নির্মলেন্দু গুণ: তিনি এতই অকৃতজ্ঞ যে সেই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কোনো কবিতা লেখেননি

অক্তাবিও পাস: ভারত এমন এক আধুনিকতা দিয়ে শুরু করেছে যা স্পানঞলদের চেয়েও অনেক বেশি আধুনিক

নির্মলেন্দু গুণ: মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের চেয়ে ভিন্ন সৌন্দর্য আছে

গোলাম মুরশিদ: আপনি শত কোটি টাকা চুরি করে শুধুমাত্র যদি একটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান করে দেন, তাহলে পরকালে নিশ্চিত বেহেশত!

মুর্তজা বশীর: তুমি বিশ্বাস করো, হুমায়ূন আহমেদের কোনো বই পড়ি নি

সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান: ধর্ম সাধারণত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে অনৈক্যই সৃষ্টি করে বেশি

শামসুজ্জামান খান: পাকিস্তান আমলেও যতটা অসাম্প্রদায়িক কথাবার্তা চলত, এখন সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে

মানুষ যদি এতই ধর্মপ্রবণ হয়ে থাকে তাহলে এত দুর্নীতি, ঘুষ, ধর্ষণ, লুটপাট কি হতে পারে!

বিজ্ঞানী এ এম হারুন-অর-রশিদ: উনি যখন প্রধানমন্ত্রী থাকবেন না তখন এটা দেব

Flag Counter


10 Responses

  1. শিমুল সালাহ্উদ্দিন says:

    অসামান্য প্রাঞ্জল কথামালা। বাচ্চু ভাইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে দেহটানটান করে একটা স্যালুট দিতে ইচ্ছে করছে। অভিনন্দন রাজু ভাই।

  2. Riasat Abir says:

    Loved it!

  3. আইরিন ইরা says:

    খুব ভাল লাগলো। ‘‘রাষ্ট্রটা তো শুধু বাঙালির না। শুধু মুসলমানের না। রাষ্ট্রটা মানুষের হোক।’’

  4. মাকশুম says:

    প্রাঞ্জল সাক্ষাৎকার। দারুণ ভালো লাগল। অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে – পলিটিক্যাল ইসলাম, শিক্ষা নীতি ইত্যাদি। পঁচাত্তর পরবর্তী পরিকল্পিতভাবে আমাদের জাতিসত্তার পরিচয় বদলে দেয়ার বিষয়গুলো স্পষ্ট করে উঠে এসেছে; বিশেষ করে সিনেমার নাম বদলে যাওয়ার তথ্যটি কৌতূহলোদ্দীপক।
    ধন্যবাদ সাক্ষাতকারটির জন্য।

  5. বিপাশা চক্রবর্তী says:

    অনেক কিছু জানতে পারলাম। সহজ আর সাধারণভাবে অনেক কঠিন সত্য কথাগুলো বলেছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ। রাজু আলাউদ্দিন আপনি সব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছেন।

  6. razualauddin says:

    প্রিয় লেখিকা বিপাশা, এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি পড়েছেন জেনে খুব খুশী হলাম। “সহজ আর সাধারণভাবে অনেক কঠিন সত্য কথাগুলো ” বলার একটা মনোমুগ্ধকর গুণ আছে বাচ্চু ভাইয়ের, এর কারণ তিনি যৌবনের শুরু থেকেই কথা-শিল্পী, অর্থাৎ নাটকের সূত্রে তিনি এই শিল্পিত স্বভাবের অনুগামী। কৃতজ্ঞতা জানাই আপনার স্বীকৃতির উদারতার জন্য।

  7. ইকবাল করিম হাসনু says:

    রাজু আলাউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে দারুণ সব সাক্ষাৎকার তুলে ধরে আমাদের যেভাবে আলোকিত করে আসছেন সেজন্য তিনি ধন্যবাদার্হ। তাঁর এই কাজ অব্যাহত থাকুক। রাষ্ট্র ও সমাজ সম্পর্কে প্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বাচ্চু ভাইয়ের বিবেকী স্বচ্ছ, আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর উত্তরসুরী সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ুক – এই আশা করি।

  8. খুব ভাল লাগলো। অনেক কঠিন সত্য কথাগুলো বলেছেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ ভাই।

  9. Imran khan says:

    Dear রাজু আলাউদ্দিন,
    Why are you always nicking and icking up ANTI ISLAAMIC point from the general interview, for instance ex justice Muhammad Habibur Rahman???!! He was talking about the general issues related to the war and social circumstances, however you guy pic and mix the religious matter in an inappropriate ways!!!!!! Upmost interview seems anti Islaamic expression by you, that’s horrible, pathetic!!!!!! Focus please.

    • razualauddin says:

      Imran Khan,
      আমি ইসলামবিরোধী নই, আমি মৌলবাদী অন্ধত্বের বিরোধী। আমি ইসলামের বিরোধী হবো কোন দুঃখে, যেহেতু আমি ইসলামী সংস্কৃতি ও ধ্যানধারণার মধ্যে বেড়ে উঠেছি। এটা আমারও সংস্কৃতি। কিন্তু ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা অন্ধতার সমালোচনা করার অধিকার অামার আছে একজন বাঙালি মুসলমান হিসেবে। এবং ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সঠিক ধারণা দেয়াটা ইসলামী কর্তব্য হিসেবেই আমি দেখি। আপনি ভুল ধারণা করছেন অামার সম্পর্কে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.