বইয়ের আলোচনা

ছোটগল্পের সম্ভাবনাময় গদ্য

মাজহার সরকার | 6 Mar , 2018  

গল্পে কেবল গল্পই থাকবে তাতো নয়। তবে ঘটনাহীন আধুনিক গল্পের সময়েও চাই না গল্প থেকে গল্পটাই হারিয়ে যাক। তবে অতিরিক্ত গবেষণা, তথ্যমুখীতা, ভাঁড়ামো, লোক হাসানোর চেষ্টা ও নৈতিক বাণীর চাপে যখন প্রকৃত গল্পের সংখ্যা কমে আসছে তখন আমার হাতে এলো ‘মৃত্যু ও মিডিয়া এক্সপোজার’ ছোটগল্পের বইটি। বইটিকে আমি সাম্প্রতিক বাংলা ছোটগল্পের সম্ভাবনাময় গদ্য হিসেবে দেখছি।

‘খুন হওয়ার আগে একজন কী ভাবছে? একদল তরুণ তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নেওয়ার পর কী করছে? একজন মানুষ সোশাল মিডিয়ায় একটা মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে কী নিয়ে আলাপ করছে? প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও একজন প্রেমিক তার প্রেয়সীর বাড়িতে কেন যাচ্ছেন? একটি বাড়ির বারান্দায় কেন শিশুর লাল জামা ঝোলে, অথচ তাদের দেখা যায় না? বিজ্ঞান অনেক এগিয়ে যাওয়ার পরও কেন একটি মাত্র দরিদ্রের গ্রাম থেকে যায়? বেতন না হওয়ার মাসে একজন মধ্যবিত্তের কী হয়? মুক্তিযুদ্ধে একজন যোদ্ধা বিল সাঁতরানোর পর কী হয়েছিলো? একটি জনপদের সবাই উকুন আক্তান্ত কেন হল? মানুষগুলো হারিয়ে কোথায় যায়? জীবনে প্রথম যৌনতার স্বাদ কেমন ছিল?’ বইটির প্রথম ফ্ল্যাপে এ কথাগুলো থেকে বইটি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া সম্ভব। মোট ঊনচল্লিশটি ছোট গল্প নিয়ে ‘মৃত্যু ও মিডিয়া এক্সপোজার’। লেখক গ্যারান্টি দিচ্ছেন, ‘৯৫ ভাগ গল্পের দৈর্ঘ্যই এক হাজার শব্দের নিচে।’

‘মেঘদূত ও লাল ফুল’ গল্পে লেখক কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যের বিরহকে এই সময়ে এনে পৌঁছিয়েছেন, রামগিরি পর্বতে নির্বাসিত এক অভিশপ্ত যক্ষের প্রিয়াবিরহ। লাবণী হলেন এখানে অলকাপুরীর রম্যপ্রাসাদের প্রিয়া। যক্ষ আষাঢ়ের প্রথম দিনের নববর্ষার মেঘকে যে বার্তা দিয়েছিলেন তাই আজ পাঁচশ বছর পর বৃষ্টি হয়ে ঝরলো লাবণীর গায়ে। তার আগে মেঘকে পাড়ি দিতে হয়েছে নানা নগর, নদী, তৃণভূমি, জনপদ, পাহাড় আর বৈশ্বিক জালবায়ু পরিবর্তনের দিনগুলোকে।

লাবণীর প্রেমিক তাকে স্বীকার করতে চায়নি। প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই লাবণী যাচ্ছিলো আত্মহত্যা করতে। বার্তাবাহী মেঘ লাবণীকে তার ফোটায় ফোটায় ভিজিয়ে দিলে সে ভুলে গেলো আত্মহত্যার কথা। তার হৃদয় আমার প্রেমিকের প্রতি অনুরক্ত হলো। সেদিন লাবণীদের পুরো জনপদ ভালবাসার বৃষ্টিতে ভিজেছিলো।

জগতের সব অসমাপ্ত প্রেমকে লেখক প্রাপ্তি দিতে চান। আর তাই কালিদাসের মেঘের বার্তা নিয়ে তন্ময় ইমরানের মেঘও যেন লাবণীর কাছে পৌঁছে গেছে। আসন্ন মিলনকাল এইবার পূর্ণ হলো বর্ষণে।

বইয়ের প্রতিটা গল্পই হালকা চালে শুরু ও শেষ। শিল্প নির্মাণের যে কৌশল তার কোন চেষ্টাই এসবে নেই। আমাদের সমাজে ব্যক্তিমানুষ যেমন করে টুকরো টুকরো হয়ে বিভাজিত হয়ে পড়ে, অর্ধোন্নত জীবের মতো বিকশিত হয়, সংবেদনা হয় বৃন্তচ্যুত, সেসব মানুষের গভীরের হাহাকার নেই। গল্পের চরিত্রগুলোও শিল্পের বিচারে অগভীর। কিন্তু শিল্প মানেই কী জীবনের অনুলিপি? জীবনে যা ঘটে বা ঘটছে তা হুবহু লিখে গেলেই তো গল্প নয়। জীবনের বাস্তবতা ও গল্পের বাস্তবতা এক নয়। তবে প্রচলিত শিল্পরুচি থেকে সরে এসে একজন ধারাভাষ্যকারের মতো লেখক যেভাবে একের পর এক গল্প বলে গেছেন সেগুলোতে রয়েছে যুক্তি নির্মাণের পরীক্ষা, রয়েছে মানবিক অনুভূতি জাগানোর আকাঙ্ক্ষা, আছে শুভবোধের শংসা ও খারাপ গুনের নিন্দা। এবং এই কারণে গল্প পড়া থেকে পাঠক বিচ্যুত হন না, থেকে যান একেবারে গল্পের শেষ শব্দ পর্যন্ত।

মানুষের অসঙ্গতি বুঝানোর জন্য লেখক কখনও কখনও প্রাণীকেও ব্যবহার করেছেন। যেমন ‘বংশধর’ গল্পটিতে দুটি গরুকে দেখা যায় মানুষের মতো কথা বলতে যারা মরে যাওয়ার আগে বংশ রক্ষা করতে চেয়ে দুটো গাভী দেখে কামাতুর হয়ে পড়ে। জৈবিক মানুষের বাস্তবতা দুটো নিরীহ প্রাণীর ওপর আরোপ করার কারণে কিংবা লেখকের অতি কৌতুকধর্মী বয়নের কারণে দারুণ উপলক্ষ নিয়েও গল্পটা শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনা হারিয়েছে। এমন আরও কতোগুলো গল্প হলো- ‘রাজনৈতিক’, ‘উকুনের আক্রমণ ও একটি জনপদের গল্প’, ‘বিপ্লব, ইঁদুর ও পরকাল’। তবে ‘মিসিং হিউম্যান’, ‘ক্যারিনের পকেট’, ‘মডেল নাজিম’ ও ‘রহমতের ফেরেশতা’ ও ‘মার্ডার’ এমন রূপক গল্পগুলো মানবিক মানুষের ধ্বসে যাওয়ার অনেকটুকুই চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে পেরেছে।

‘ছাগল মানে ম্যা’ গল্পটিতে এক সারি তুলসী গাছকে নিয়ে গল্প সাজানো হয়েছে। গল্পের শুরুটা হয়েছে এভাবে- “গ্রামের হিন্দুপাড়া আর মুসলমানপাড়ার মাঝখানে হঠাৎ এক সারি তুলসী গাছ গজিয়ে উঠলো। মুসলমানের দাবি, এটা তাদের সীমানায় পড়েছে। হিন্দুদের দাবি তাদের সীমানায়!” এখানে ‘হিন্দুপাড়া’ ও ‘মুসলমানপাড়া’ বলতে প্রতীকি অর্থে দুই ধর্মের অতিউৎসাহী মানুষকে বুঝে নিয়ে পড়া শুরু করলে সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প কীভাবে ছড়ায় তার একটা প্রচ্ছায়া পাই। দুই পক্ষই তুলসী গাছের মালিকানা দাবি করলে দাঙ্গা লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। পাঠকও সেই প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেন।

কিন্তু তুলসী থেকে কাহিনী শুরু করলেও গল্প গিয়ে শেষ হয় বিশটা ছাগলে। তারা তুলসীগুলোকে খেয়ে ফেলে। দ্বন্দ্বের অবসান হয়ে গেছে ভাবলেও আসলে নতুন সংকট তৈরি হয় ছাগলকে নিয়ে। কিন্তু “তুলসীগাছ খাওয়ার অপরাধে দুই পক্ষকেই একটা করে ছাগল দেওয়া হলো। মুসলমানরা তাদের ছাগল আল্লাহর উদ্দেশ্যে কোরবানি দিল। আর হিন্দুরা ভগবানের উদ্দেশ্যে বলি।”

কিন্তু ছাগলের মালিক দুই কিশোরের কী হলো সেটা গল্পে আর জানা যায় না, একজন গিয়েছিলেন পানি খেতে আর আরেকজন প্রস্রাব করতে। তাদের দুটি ছাগলকে যখন পুলিশী সিদ্ধান্তে দুই পক্ষকে দিয়ে দেওয়া হলো তারা কোন প্রতিবাদ করেননি। সম্ভবত ছাগলের তুলসী গাছ খেয়ে ফেলাকে তারাও অপরাধ হিসেবেই নিয়েছে!

‘ফেইসভ্যালু’ গল্পটিতে আছে নেতার রাস্তায় কলার খোসা পরিষ্কার নিয়ে গণমাধ্যমে তোলপাড়ের কাহিনী। ‘ব্লা ব্লা ব্লা’ গল্পটাতে আছে একঘেয়ে জীবনে সবকিছুর প্রতিই যখন আমাদের অনীহা তখন লেখকের ভালো লেগে যায় একটি বই। আবার সেই বইকেও ভালো লাগা না লাগার দোলাচলে দেখা যায় অসাবধানতাবশত সিগারেটের আগুনে বইটা পুড়ে যায়। তখন আবার একঘেয়ে জীবন শুরু হয়।

বইয়ের অন্যতম সেরা গল্পটা সম্ভবত ‘হৃৎপিণ্ড’। লেখক চিকিৎসাসেবা নিতে ডাক্তারের কাছে গিয়ে শোনেন তার হৃৎপিণ্ড নেই। কিন্তু লেখক নিজেকে নিয়ে চিন্তিত না থেকে চিন্তিত থাকেন চিকিৎসককে নিয়ে। কেননা, হৃৎপিণ্ড নিয়ে মানুষ যদি বাঁচে তাহলে তার অধীত বিদ্যা মার খেয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত দেখা গেলো লেখক নিঃসন্তান, দুই বছর আগে সরকারি এক হাসপাতাল থেকে একটা শিশু চুরি করে এনেছিলেন তিনি। আজ সেই শিশুটাকে কোলে নিয়ে তার স্বগতোক্তি, “আমি জানি সেদিন থেকেই আমার হৃৎপিণ্ড নেই। বাচ্চাটা হাসছে, যেন সে পুরোটাই একটা হৃৎপিণ্ড হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এমন আরও কিছু উজ্জ্বল গল্প হলো ‘লাভ পিল’, ‘জীবনের প্রথম যৌনতার স্বাদ’, ‘অলৌকিক ক্ষমতা, দরবেশ ও যুদ্ধ’ ও ‘বাসররাতে জন্য জমিয়ে রাখা তিল’।

বইটির নাম গল্প ‘মৃত্যু ও মিডিয়া এক্সপোজার’। একজন বিখ্যাত অভিনেতা রোগশয্যায় থেকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের অপেক্ষা করছেন। কেননা সম্ভাব্য মৃত্যুর হাত থেকে তিনি বেঁচে গেলেও তার মৃত্যুর খবর শুনে প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে রওয়ানা দিয়েছেন তাকে দেখার জন্য। তাই মরে গেলেও বাঁচার অভিনয়টা করতে হবে তাকে। আশপাশে তাকে ঘিরে ধরেছে প্রিন্ট ও টিভি সাংবাদিকরা। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী এলেন। অভিনেতা না মরেও চোখ খোলা রেখে মরার অভিনয় করলেন। মারা গেলেন আরও দুই মিনিট পর।

প্রধানমন্ত্রী বলছেন, “আরে আমার কানের কাছে কালেমা পড়ে মারা গেছেন তিনি। আল্লাহর নেকবান্দা ছাড়া কেউ এমন করে! অথচ বিরোধীদল তাকে কতোবার নাস্তিক বলেছে!” এটা গল্প হিসেবে অবাস্তব হলেও যে বাস্তবতা নিয়ে দারুণভাবে এগুচ্ছিলো কাহিনী, সামান্য কিছু খেলো বাক্য ও সম্ভবত গল্পকারের তাড়াহুড়োর কারণে গল্পটা ঠিক দাঁড়ায়নি। একটা চমৎকার শুরু থেকে সামান্য একটা চুটকিতে গল্পটার অপমৃত্যু হয়েছে।

বইটির একটি মায়াভরা গল্প ‘টুকি লাল জামা’। আত্মজৈবনিক ঢঙে বলা এ গল্পটিতে দেখা যায় লেখকের বাসার সামনের বাসার বারান্দায় তিনটা শিশুর কাপড় ঝোলে সারাদিন। লেখকের নিজের বাসায় শিশু না থাকার শূন্যতা নিয়ে থাকেন পুরো পরিবার। লেখক বলছেন, “রাতে ওই বাসার বারান্দার দিকে তাকিয়ে দেখলাম টুকি সাইজের বাবুটার একটা লাল জামা ঝুলছে।…লাল জামা থেকে সেই শরতের রাতে বাবুটার গায়ের দুধের গন্ধের সাথে মিষ্টি এক ঘামের গন্ধ ভেসে আসছে যেন!”

কিন্তু লেখক জানতে পারেন শিশুগুলোর বাবা-মা এসেছেন মিয়ানমার থেকে। তাদের সরাসরি ‘রোহিঙ্গা’ না বলে লেখক তার মায়ের জবানিতে বলেন, “কী নাকি যুদ্ধ লাগছিল! ওরা নাকি সাগর পাড়ি দিয়ে পালাইছিল। বড় বাচ্চাটা নাকি নৌকায় গুলি লেগে মারা গেছে। আর ছোট দুইটা নাকি গুলিতে নৌকা ডোবার সময় মায়ের হাত থেকে তলিয়ে গেছে।” কিন্তু “বাচ্চাগুলো নেই এ কথা মনে করতে চান না প্রতিবেশী স্বামী-স্ত্রী। তাই প্রতিদিন নিয়ম করে জামা কাপড় শুকাতে দেওয়া। সে রাতেও দেখি লাল টুকি জামা সামনের বারান্দায়। জামাগুলো কেন ভেসে এসেছিল!”

বই: মৃত্যু ও মিডিয়া এক্সপোজার, লেখক: তন্ময় ইমরান, প্রকাশক: আদর্শ, প্রচ্ছদ: মোস্তাফিজ কারিগর, পৃষ্ঠা: ১২০, মূল্য: ২২০
Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.