গল্প

এল সাগুয়ারো: একটি ফনিমনসা ও একটি ক্যাকটাসের গল্প

আনিসুজ জামান | 2 Mar , 2018  

ফনিমনসা গাছটা লজ্জায়, বিমর্ষতায় নুইয়ে পরছে কিন্তু ওর পড়শি এল্ সাগুয়ারো, আঠারো-হাতি দানবীয় চৌকো ক্যাকটাসটা রাগে ক্রোধে থরথরিয়ে কাঁপছে। ওদের পায়ের কাছে লুটিয়ে ইরমা, ফুঁপিয়ে কাঁদছে, অনবরত বলে চলছে “না, না, না” । ওর উপর পৃথিবীর আদিতম উম্মত্ততা, যাকে পশুত্ব বললে পশুকুলকে হেয় করা হয়। জায়গাটা নোগালেস, অ্যারিজনা প্রদেশ! বিকেল হেলে পরেছে! আকাশের লাল রঙের সাথে ইরমার নীচের ভেজা মরু-বালু একাকার। সব শেষ হওয়ার পরও নিথর শবাসনে শোয়া, শুধু দুই রানের কাঁপন থামাতে পারছিল না সে।

নোগালেস সনোরা প্রদেশ ও নোগালেস আরিজনা প্রদেশের বর্ডার পার হয়েছে ওরা গতকাল। বর্ডার পার করতে দালাল যা চেয়েছিল তা থেকে ওর কাছে কিছু কড়ি কম ছিল। তারপরও শুধু ওর বুকটা দেখার ও এক চুমুর বিনিময়ে বলেছিল বাকীটা লাগবে না। ও রাজী হয়ে পায়ে হেটেছে গত আঠারো ঘন্টা। মাঝে মাঝে দৌড়ুতে হয়েছে, মাঝে মাঝে শুয়ে থাকতে হয়েছে বালিয়াড়ির মাঝে, আশেপাশে ছড়ানো ছিটানো কাটা ঝোপ দানবীয় ক্যাকটাসের মাঝে। সাথের একমাত্র ব্যকপ্যাকে তেমন কিছুই নেই। কিছু শুকনো খাবার, দুটো টুনা মাছের টিনজাত ক্যান ও ব্যান্ডেজ। পরনের প্যান্ট, ব্রা ছড়ে যাওয়া, নীল জিন্সের প্যান্টের সাথে বালুর রংয়ের সাথে মেলানো ব্লাউজ আর এক জোড়া প্যান্টি ব্রা থাকলেও দানবটি চুমু দেবার সময়ই প্যান্টিটা নিয়ে নেয় আর ওর সামনেই ওটির গন্ধ শুঁকে শিহরিত হয়।

ইরমা এসেছে সান মার্কোস থেকে, যাবে ফিনিক্সে, কার্লোস এর কাছে। হালিস্কো প্রদেশের খনি শহর সান মার্কোস-এর পত্তন ঘটেছিল স্প্যানিয়ার্ডদের হাতে, আঠারো শতকে। আরও মাস কয়েক আগের কথা। টগবগে যুবক কার্লোস-এর ২৩তম জন্মদিনে প্লাজায় দেখা আঠারোর ইরমার সাথে। ঘোড়ায় চড়ে এসেছিল ওরা। চারজন। প্লাজার কোনায় চুপটি করে বসে থাকা ভরাট শরীরের ইরমার সাথে চোখাচোখি হবার সাথে সাথেই একপাক ঘোড়ার আমন্ত্রন পায় ইরমা। কেউ আমন্ত্রন জানালে–খুব নোংরা বা মাতাল না হলে–প্লাজা কেন্দ্রের চারিদিকে একপাক ঘড়ির কাঁটার মতো ঘোরাটাই এখানকার রীতি। কার্লোস-এর হাত ধরে ইরমা। প্লাজার একমাত্র আম গাছটাতে বউল এসেছে তখন। নার্দ বা গন্ধরাজের গন্ধ বিলীন করে দিয়েছে গায়ে মাখা সস্তা ও দামী সুবাস। একপাক ঘোরার পর হাতে নার্দ নিয়ে আরো একপাক, তারপর মা’র চোখকে ফাকি দিয়ে কার্লোস-এর ঘোড়ায় চড়ে, অনেক রাত পর্যন্ত গ্রামের এখানে ওখানে ঘোরাঘুরি, শেষ পর্যন্ত ঘরে ফিরে মা’র বকুনী খাবার আগে মিনিট দুয়েকের ঠোঁট চোষাচুষি। পরের চারদিন প্রচন্ড উম্মত্ততায় মেতে থাকলেও কুমারিত্ব বিসর্জন দেয়নি ও, বাসরের অপেক্ষায়। এতে করে কার্লোস-এর টান আরও বাড়ে। চতুর্থদিন মায়ের সঙ্গে ওকে পরিচয় করিয়ে দেয় ইরমা। পঞ্চম দিনে আমেরিকায় নিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গ্রাম ত্যাগ করে কার্লোস। এরই মাঝে অনেক কষ্টে প্রতিবেশীর ফোন ধার করে ছ’বার কথা হয়েছে। আসবার জন্য যে ডলার পাঠিয়েছে কার্লোস, তা দিয়ে কোন রকম বাসে ও পায়ে হেঁটে বাকীটা দালাল দিয়ে বর্ডার পারি দেয়া সম্ভব।

মারিকোপা-য় পৌছুনোর পর কার্লোসকে নির্দিষ্ট জায়গায় পায় না ওরা। হাতে ডলারের কিছুই অবশিষ্ট নেই। নেই খাবার বা পানি, গত দশ ঘন্টা পেটে খাবার বা পানি পরে নি। গলা শুকিয়ে কাঠ। অনেক গুণে ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েও দালালের মন ভেজানো যায় না। সে নগদ চায়। জীবন বাঁচাতে ও কার্লোসকে এক নজর দেখতে পাবার ইচ্ছেয় ক্যাকটাসের আড়ালে যেতে বাধ্য হয় ইরমা। দলেন অন্য সকলে; একজন মহিলাসহ তখন অন্য চারজন দূরে অপেক্ষা করছে।
আরো কয়েক মিনিট ধকল সামলিয়ে ইরমা ওদের সঙ্গে যোগ দেয়। -চলো -বলে। অন্য সকলের মুখে একটু কেমন যেন হাসি দেখলেও পিঠে মহিলার হাতের স্পর্শ পায় সে।

আগের দিন, মারিকোপা, বর্ডার শহর, নোগালেস-এর পাশেই দুটো দানবীয় ক্যাকটাস হাত ধরাধরি করে দাড়িয়ে আছে রাতের শীতলতার জন্য। সারাটা রাত খুব জ্বলেছে। তারপর বিকেলের দিকে এসে পৌঁছেছে এই যুবক, ওদের নীচে সূর্যের একটু আড়াল নিয়ে খাওয়া সেরে হাতের ছুরি দিয়ে একটির গায়ে লিখেছে 9+C=Love| । তারপর থেকেই চুপচাপ বসে। ওকে নিয়ে কথা চলছে ক্যাকটাসগুলির মধ্যে। ওরা শিকড়ে শিকড় লাগিয়ে কথা বলে। এমন সময় বাইশ-হাতি ক্যাকটাসটা দূরে দেখতে পায় পিট-এর গাড়ি FORD – 350। সাথে ওর পাহাড়াদার কুকুর। পিট কার্লোস-এর গাড়িটার কাছে গাড়ি থামিয়ে কিছু একটা পরীক্ষা করছে। কিছুক্ষণ পর উঠে দাড়িয়ে গাড়ি থেকে ওর স্নাইপার রাইফেলটা হাতে নেয় ও একটা বোতল থেকে খানিকটা তরল আগুন পেটে চালান করে উঁচু টিলাটার দিকে হাটা ধরে। বাইশ-হাতি সব বোঝে। কার্লোসকে অনুনয় করে পার্শ্বের ঝোপে গিয়ে লুকোতে। কার্লোস ওর কথায় কান দেয় না। কিছুক্ষণ পর গুলির শব্দে থমকে দাড়ায় প্রকৃতি। বাইশ-হাতি আর্তনাদ করে ওঠে। ওর গায়ে গুলি বিধেছে। কার্লোস কেন যেন শুয়ে পরে। শুধু মাত্র এক ঝলক লাল রং এসে প্রেমের চিহ্নটাকে লাল করে দেয়।
পরের দু’দিন হেঁটে শেষে গাড়িতে করে কার্লোস-এর ডেরার দরজায় টোকা দিতে পারে ইরমা। রং ওঠা কালচে সবুজ পুরোনো গাড়িটা ওকে নামিয়ে দিয়েই উধাও হয়ে গেছে দালাল। দরজা খোলে মধ্যবয়সী আলফনস, কার্লোস-এর বন্ধু। -তুমি নিশ্চয়ই ইরমা হবে- বলে আলফনস।
হ্যা – উত্তর দেয় ইরমা। -কার্লোস কোথায়? -দুজনে একই সাথে প্রশ্ন করে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে উত্তরের অপেক্ষায়। উত্তর আর পাওয়া যায় না।
-আজকের রাতটা তুমি এই বিছানায় ঘুমোও – বলে আলফনস ছোট ঘরের একটি মাত্র বিছানা দেখিয়ে।
-আমি দিনে ঘুমাই আর কার্লোস রাতে- বলে সে – কাল নিশ্চয়ই কার্লোস এসে পরবে।
-ধন্যবাদ -বলে ক্লান্তিতে ভেঙে পরা ইরমা। নোংরা কাপড় জামা নিয়েই সে বিছানায় উঠে ঘুমে ঢলে পরে। এতই গভীর ঘুম যে কার্লোস-এর সঙ্গে মিলনের সুখ স্বপ্নটুকুও সে দেখতে পারে না।
শুধুমাত্র ক্যাকটাসগুলো আরও বেশী নিবিড় ভাবে জড়িয়ে ধরে একে অপরের শিকড়কে আর ফনিমনসার নুইয়ে থাকা মাথাটা কোনদিনও আর সোজা হবে না।

Flag Counter


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.