প্রবন্ধ, বই

২৪০ বছর পর হালেদ সাহেবের বাংলা ভাষার ব্যাকরণের দ্বিতীয় মুদ্রণ

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী | 27 Feb , 2018  

বাংলাভাষীরা বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান করেছেন, কিন্তু আমরা ভুলে যাইনি যে অবাঙালি বহু পণ্ডিত ও গবেষকরাও এই ভাষাকে তাদের মেধা ও মনন দিয়ে ভালো বেসেছিলেন এবং এই ভাষার গদ্যরূপ ও ব্যাকরণ নির্মাণে রেখেছিলেন অসামান্য অবদান। বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল কোনো বাঙালির হাতে নয়, হয়েছিল এক জ্ঞানদীপ্ত ইংরেজ পণ্ডিতের হাতে ১৭৭৮ সালে, তার নাম নাথানিয়েল ব্রাসলি হালেদ। তিনিই প্রথম বাংলা ব্যাকরণ রচয়িতা বলে যেমন আমরা গৌরববোধ করি, তেমনি আমরা বাংলাদেশিরা আজ এ কারণেও গৌরববোধ করতে পারি যে সেই ঐতিহাসিক বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হতে যাচ্ছে দীর্ঘ ২৪০ বছর পর স্বনামধন্য প্রাবন্ধিক ও গবেষক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর সম্পাদনায় এবারের বইমেলায়। প্রকাশনার ২৪০ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেছে জার্নিম্যান বুকস প্রকাশনী। সম্পাদকের পরিশ্রমী ও গবেষণালব্ধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি প্রকাশ করা হলো বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম-এর পাঠকদের জন্য। বি.স.

নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ
[১৭৫১-১৮৩০]


প্রচ্ছদ চিত্র: A Grammar Of The Bengal Language

বাংলা ভাষার ব্যাকরণের প্রথম গ্রন্থটি ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল। এর লেখক একজন ব্রিটিশ–নাম নাথানিয়েল ব্রাসি হালেদ (১৭৫১-১৮৩০)। ইংরেজিতে লিখিত এই ব্যাকরণ গ্রন্থের প্রচ্ছদনাম দেয়া হয়েছিলর A Grammar Of The Bengal Language। মূলতঃ ইংরেজিতে লিখিত হলেও এতে বাংলায় লেখা অনেক অক্ষর, শব্দ, বাক্য, পদ্যাংশ ও শ্লোক বাংলা হরফেই মুদ্রিত হয়েছিল ; কয়েকটি স্থানে কিছু ফারসি লিপিও ছিল।
হালেদ সাহেব লিখিত A Grammar Of The Bengal Language সম্পর্কে দু’টি বিষয়ে পাঠকের কৌতূহল থাকা স্বাভাবিক। প্রথম প্রশ্নটি হতে পারে বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ রচনা করতে গিয়ে হালেদ কী লিখেছিলেন। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হতে পারে সেই থেকে বিগত প্রায় আড়াই শত বৎসরে বাংলা ব্যাকরণের কীরূপ পরিবর্তন হয়েছে।

ইংরেজি ভাষায় লেখা বাংলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ A Grammar Of The Bengal Language গ্রন্থটির পৃষ্ঠা সংখ্যা ২৪৮। মূল গ্রন্থভাগ শুরু হয়েছে প্রথম ত্রিশ পৃষ্ঠার পর। প্রথমাংশের শিরোনাম-পৃষ্ঠার পর রয়েছে পঁচিশ পৃষ্ঠাব্যাপী লেখকের ভূমিকা এবং পরবর্তী পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে সূচীপত্র এবং সংশোধন ও সংযোজনের বিজ্ঞাপন ইত্যাদি।
গ্রন্থটি আকারে হালের A4 মাপের কিছু ছোট–যাকে বলা হতো Crown আকারের কাগজ–তার এক-অষ্টমাংশ। মুদ্রিত এলাকার পরিমাপ কমবেশি ৬.৫ x ৪.৫ ইঞ্চি। পাতার শীর্ষভাগে (Header) গ্রন্থের নাম ও পৃষ্ঠা নম্বর মুদ্রিত ছিল। বেজোড় সংখ্যক পৃষ্ঠার শীর্ষভাগে বাম প্রান্তে পৃষ্ঠা সংখ্যা এবং জোড় সংখ্যক পৃষ্ঠার ডান প্রান্তে পৃষ্ঠা সংখ্যা উল্লিখিত হয়েছিল। শীর্ষভাগে গ্রন্থনাম দুই অংশে মুদ্রিত হয়েছিল: বেজোড় সংখ্যক পাতার শীর্ষে A GRAMMAR OF THE এবং জোড়সংখ্যক পাতার শীর্ষে BENGAL LANGUAGE মুদ্রিত হয়েছিল।
পাঠক লক্ষ্য করবেন গ্রন্থের নামপত্রে চারটি অংশ রয়েছে। মধ্য ভাগে লেখা গ্রন্থের নাম ও লেখকের নাম :
A
GARMMAR
OF THE
BENGAL LANGUAGE
BY
NATHANIEL BRASSEY HALHED

এর ওপরে–নামপত্রের শীর্ষ ভাগে লিখিত ছিল :
বোধপ্রকাশ শব্দশাস্ত্র
ফিরিঙ্গিনামুপকারার্থ
ক্রিয়তে হালেদঙ্গ্রেজী
যার অর্থ হলো যে, হালেদ ফিরিঙ্গিদের উপকার সাধনে এই গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। বাঙ্গালায় নিযুক্ত ব্রিটিশ রাজকর্মচারি ও বণিকদের জন্য–যারা বাঙলা ভাষা শিক্ষায় আগ্রহী–হালেদ সাহেব গ্রন্থটি রচনা করেছিলেন। ইংরেজি Grammar শব্দের তিনি বঙ্গার্থ করেছিলেন “শব্দশাস্ত্র”। নামপত্রের তৃতীয়ভাগে অর্থাৎ গ্রন্থ ও গ্রন্থাকারের নামের পরে লিখিত ছিল:
ইন্দ্রাদয়োপি যস্যান্ত নয়যুঃ শব্দবারিধেঃ।
প্রক্রিয়ান্তস্য কৃৎস্নস্য ক্ষমোবক্তু নরঃ কথ।।
যার অর্থ হলো : ইন্দ্র ইত্যাদি (দেবতারা)ও যে শব্দসমুদ্রের কুলকিনারা পেলেন না, সেই শব্দবারিধির কলাকৌশল মানুষের পক্ষে কী ক’রে বলা সম্ভব!
নামপত্রের শেষভাগে মুদ্রণস্থল এবং প্রকাশবর্ষের কথা নিম্নরূপ উল্লিখিত ছিল:
PRINTED
AT
HOOGLY IN BENGAL
M DCC LXXVIII.

অর্থাৎ গ্রন্থটি বাঙ্গালা দেশের হুগলিতে মুদ্রিত এবং ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে (বাঙলা ১১৮৫ সন) প্রকাশিত। মুদ্রকের নাম উল্লেখ করা হয় নি ; তবে আমরা জানি মুদ্রাঙ্কনে যার প্রধান ভূমিকা ছিল তিনি চার্লস উইলকিনস সাহেব (১৭৪৯-১৮৩৬)–যিনি লোহা খোদাই ক’রে, ছাঁচে সীসা ঢালাই ক’রে মুদ্রণ কাজে ব্যবহার্য সচল বাংলা অক্ষর বা টাইপ তৈরি করেছিলেন। হালেদের গ্রন্থে ব্যবহৃত বাংলা অক্ষরের উচ্চতা প্রায় আধা ইঞ্চি। জন ক্লার্ক মার্শম্যানের (১৭৯৪-১৮৭৭) সূত্রে আমরা জেনেছি হুগলিতে অবস্থিত অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানায় মুদ্রিত হয়েছিল A Grammar Of The Bengal Language গ্রন্থটি। এর জন্য উন্নতমানের কাগজ ও কালি আমদানি ক’রে নিয়ে আসা হয়েছিল ব্রিটেন থেকে। মুদ্রণের মান ছিল চৌকষ। এই প্রায় আড়াই শ’ বছর পরেও কাগজ ও ছাপার মান অনেকাংশে অক্ষত রয়েছে। প্রসঙ্গত: উল্লেখ করা যায় অ্যান্ড্রুজ সাহেবের ছাপাখানার নাম জানা যায় নি। সে সময় দোকান, ব্যবসায়িক দপ্তর বা কারখানা ইত্যাদির নাম দেয়ার চল হয়েছিল কি-না তাও নিশ্চিত ক’রে বলা যায় না।
২.
হালেদের বাংলা ব্যাকরণ গ্রন্থে আটটি অধ্যায় রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ ভূমিকার পর একটি বিষয়সূচী রয়েছে ভাষান্তরক্রমে যা নিম্নরূপ দাঁড়ায় :
১ম অধ্যায়
ভাষার উপাদান / পৃ: ১
২য় অধ্যায়
বিশেষ্য পদ / পৃ: ১৬
৩য় অধ্যায়
সর্বনাম / পৃ: ৭৫
৪র্থ অধ্যায়
ক্রিয়াপদ / পৃ: ১০০
৫ম অধ্যায়
শব্দবিশেষণ ও শব্দযোগ / পৃ: ১৪৩
৬ষ্ঠ অধ্যায়
সংখ্যা লিখন / পৃ: ১৫৯
৭ম অধ্যায়
বাক্যে পদ সংস্থাপনের ক্রম / পৃ: ১৭৭
৮ম অধ্যায়
উচ্চারণ ও ছন্দপ্রকরণ / পৃ: ১৯০
উপর্যুক্ত ৮টি পৃথক অধ্যায়ের পর রয়েছে ‘সংযোজনী’ অংশ (Appendix)। সূচীপত্রের পর রয়েছে শুদ্ধিপত্র।
আনুপূর্ব হালেদের মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি ব্যাকরণ রচনা করা যাতে বাঙ্গালা দেশে কর্মরত একজন ব্রিটিশ রাজকর্মচারী শুদ্ধভাবে বাঙলা ভাষা বলতে ও লিখতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ব্যাকরণ রচনার তৎকালীন প্রচলিত রীতি সম্পর্কে তিনি পরিপূর্ণভাবে অবহিত ছিলেন। তাই প্রথম অধ্যায়ে বাংলা বর্ণমালা সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন–কারণ ধ্বনি ও অক্ষরই ভাষার মৌল উপাদান। এই অধ্যায়টি ১ থেকে ৪৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সুবিস্তৃত। প্রথমেই তিনি বাংলার বাম থেকে ডান দিকে লেখার রীতি যা আরবী ও ফারসীর বিপরীত–সে কথা তুলে ধরেছেন। এমনকী টেবিল-চেয়ারের অবর্তমানে লেখার সময় বাঙ্গালার মানুষ বাম হাতে কাগজ ধ’রে নলখাগড়ার কলম দিয়ে কীভাবে লেখালিখি করে সেকথাও সবিস্তার বর্ণনা করেছেন। এ কারণে তারা বড় আকারের কাগজে লিখতে পারেনা ; বড় মাপের কাগজকে ভাঁজ ক’রে ক্ষুদ্রাকৃতি ক’রে নেয়।
তিনি লিখেছেন, বাঙলা বর্ণমালায় সংস্কৃত ভাষার মতই পঞ্চাশটি অক্ষর রয়েছে যার প্রথম পর্বে ১৬টি এবং দ্বিতীয় পর্বে ৩৪টি বর্ণ রয়েছে। প্রথম পর্বে রাখা হয়েছে স্বরবর্ণসমূহ কেননা স্বরবর্ণ ব্যাতিরেকে দ্বিতীয়পর্বের ব্যঞ্জনবর্ণগুলো উচ্চারণ করা যায় না। বাঙলা অক্ষরগুলোর পাশেই ইংরেজী তথা রোমান অক্ষরে উচ্চারণ লিখে দিয়েছেন। বর্ণমালার বিন্যাস যেমন প্রথম সারিতে ক-বর্গীয় অক্ষর, ২য় সারিতে চ-বর্গীয় অক্ষর ইত্যাদির যৌক্তিকতাও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।
ব্যঞ্জনবর্ণের উচ্চারণ স্বরবর্ণ ছাড়া সম্ভবপর নয়। তাই প্রতিটি অক্ষরের উচ্চারণ পদ্ধতি তিনি একের পর এক ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন, ‘ম’ সম্পর্কে তিনি লিখেছেন :
ম gmo or mo, the fifth nasal ; but has the sound of m in common discourse; as মানুষ maanoosh–a man
প্রচুর জায়গা নিয়ে তিনি শ, ষ, ও স এই তিনের সমরূপ অথচ পৃথক উপস্থিতির কারণ ও যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি লিখেছেন:
These letters are by no means interchangeable in the original dialect; but each has its own office, and peculiar usage.
একইভাবে তিনি য-ফলা (্য), র-ফলা ( ্র) ইত্যাদির রূপ, ব্যবহার এবং যুক্তাক্ষর গঠনের ক্ষেত্রে রূপের পরিবর্তন ও অবস্থান উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন।
বাঙলা ভাষার প্রথম ব্যাকরণ গ্রন্থটিতে বড় আকৃতির বাঙলা অক্ষর ব্যবহারের কারণে একটি পৃষ্ঠায় পংক্তির সংখ্যা কম বেশী ২০। যে পৃষ্ঠায় যুক্তাক্ষর, রেফ, হসন্ত ইত্যাদি ছিল সে পৃষ্ঠায় পংক্তি সংখ্যা আরও কম। অর্থাৎ দুই পংক্তির মধ্যে যথাপ্রশস্ত ফাঁকা জায়গা রাখা হয়েছে। যে পৃষ্ঠায় বাঙলা অক্ষর ছিল না সে পৃষ্ঠায়ও পংক্তির সংখ্যা ২২ অতিক্রম করে নি। এ কারণে মূল গ্রন্থ পাঠ আজও সহজ এবং স্বল্পায়াসে বোধগম্য।
বাঙলা ‘র’ ক্ষেত্রে ব-য়ে শূন্য র এবং পেট-কাটা ৰ দু’টি রূপই ব্যবহৃত হয়েছে। তবে প্রধানতঃ ৰ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ‘ল’ দেখতে অনেকটাই ন এর মতো, ন দেখতে ন এর মতো।

এ অধ্যায়ের বিস্তৃত পরিসরে লেখক ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে স্বরবর্ণ যুক্ত হ’লে অক্ষরের রূপ কেমন হয় তা উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন। বাংলা ভাষার বর্ণপরিচয়ের জন্য প্রথম অধ্যায় যথেষ্ট। অধ্যায়ের শেষভাগে হালেদের মন্তব্য এরূপ:
I might observe, that Bengal is at present in the same state with Greece before the time of Pherecydes; when poetry was the only style to which authors applied themselves, and studied prose was utterly unknown|

অত:পর তিনি “মহাভারতের দ্রোণপর্ব্ব” থেকে এক অধ্যায় ইংরেজী অনুবাদ সহযোগে উদ্ধৃত করেছেন। অনুরূপ অনুবাদ গ্রন্থের সর্বত্র পরিদৃষ্ট।
হালেদের ব্যাকরণের কোনও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে যদি আলোকপাত করতে হয় তবে প্রথমেই যে বিষয়টি বিচার্য হ’য়ে ওঠে তা হলো কেবল পুথি থেকে পদ্যের উদাহরণ প্রদান এবং কেবল উক্তরূপ পদ্যের ভিত্তিতেই বাঙলা ভাষার বিশ্লেষণ। পদ্যের চাল গদ্যের চাল থেকে সর্বদাই ভিন্ন যেমন কি না মৌখিক ভাষা লৈখিক ভাষা থেকে ভিন্ন। তৎকালীন লিখিত গদ্য থেকে উদাহরণ দেয়া সম্ভব হ’লে হালেদের ব্যাকরণ আরও বাস্তবসম্মত হওয়ার সুযোগ ছিল মনে হ’তে পারে। একই ভাবে যে সব ব্যাকরণবিদ বাঙলা ব্যাকরণ রচনার ক্ষেত্রে কেবল মৌখিক ভাষার বিশ্লেষণে কৃতসংকল্প, তারাও ব্যাকরণের উপযোগিতা সীমিত ক’রে ফেলেন।
উদাহরণ দিতে গিয়ে হালেদ বিভিন্ন পুথি থেকে পদ্যাংশ ও শ্লোক উদ্বৃত করেছেন ; তবে তাঁর কাছে শ্রেয়োতর বিকল্প ছিল ব’লে প্রতীয়মান হয় না। গ্রন্থের সংযোজনী (Appendix) অংশে হালেদ তাম্রফলকে উৎকীর্ণ একটি দরখাস্ত থেকে মুদ্রণ করেছে। গদ্যে লিখিত দরখাস্তের ভাষ্য নিম্নরূপ :-
৭স্বীরাম
গরিবনেওাজ শেলামত
আমার জমিদারি পরগনে কাকজোল
তাহার দ্বই গ্রাম দরিয়া শীকিস্তী হইয়াছে
শেই দ্বই গ্রাম পয়শতী হইয়াছে চাকলে একবরপূরের
শ্রী হরেকৃষ্ণ চৌধুরি আজ রায় জবরদস্তী দখল করিয়া
ভোগ করিতেছে আমি মালগুজারির শরবরাহতে
মারা পড়িতেছি উমেদওয়ার জে শরকার হইতে আমিন
ও এক চোপদার শরজমিনতে পহুচিয়া তোরফেনকে
তলব দিয়া লইয়া আদালত করিয়া হকদারের হক দেলায়া
দেন ইতি শন ১১৮৫ শাল তারিখ ১১ শ্রাবণ।
ফিদবি
জগতধির রায়
গদ্যে লেখা দরখাস্ত। তৎকালীন বাঙলা গদ্যের এটি প্রতিনিধিত্বশীল নমুনা কি না তা নিশ্চিত ক’রে বলা না গেলেও সে সময়কার বাংলার গদ্যের দুরবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ থাকে না।
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত হয়েছে ৪৬ সংখ্যক পৃষ্ঠার ঊর্দ্বাংশে। কোন ফাঁকা জায়গা না-রেখে একই পৃষ্ঠায় শুরু হয়েছে ২য় অধ্যায়। এই অধ্যায়ের শিরোনাম Of Nouns। এ অধ্যায়ে কয়েকটি অংশ রয়েছে যথা (ক) Of Substantives, (খ) Of Cases, (গ) Of Numbers। অধ্যায়ের শুরুতে হালেদ নামজাতীয় বাঙলা শব্দের লিঙ্গভেদ বর্ণনা করেছেন এবং লিঙ্গান্তরকরণের সূত্র উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করেছেন। দ্বিতীয় পর্বে হালেদের আলোচনার বিষয় কারক ও বিভক্তি। এই পর্বটি সুবিন্যস্ত না-হলেও পরিষ্কার যে হালেদ বাঙ্গালা ভাষায় সাত ধরনের কারক আবিষ্কার করেছেন এবং চার শ্রেণীর বিভক্তি তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছিল। কারক-বিভক্তি বর্ণনার উদাহরণস্বরূপ একটি অংশ হালেদের ব্যাকরণ থেকে উদ্ধৃত করা হলো :
The Inflexion which most usually occurs in Bengal nouns is made by the addition of the letter এ a; as দোষে dosha from দোষ dosh–a crime: মানুষে maanoosha from মানুষ maanoosho–a man; which may be called the Oblique Case in general, from its frequent use.
দ্বিতীয় অংশের শেষপর্বে হালেদ নাম পদের বচন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে হালেদের একটি উক্তি স্মরণীয় :
I have said that Bengal nouns have neither dual nor plural numbers, I may add that neither is wanted. The dual is found in no modern language; and probably never existed but in the Arabic and its branches, in the Shanscrit, and in the Greek. … In the Bengal language the same form of noun serves for the singular and plural।
তিনি ‘মানুষ’ শব্দের বহু বচন হিসেবে ‘বহুত মানুষ’ লেখার চলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। অনুরূপ উদাহরণস্বরূপ তিনি উদ্ধৃত করেছেন পুথি থেকে :
(ক) সত সত হস্তী বীর মারে এক ঘায়
(খ) সর্ব লোক কহে যাও রাজার নিকট
অত:পর তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে নাম পদের বহুবচনত্ব সচরাচর ‘গণ’ শব্দ যোগে ইংগিত করা হয় যেমন ‘সৈন্য’ থেকে ‘সৈন্য গণ’ ‘পণ্ডিত’ থেকে ‘পণ্ডিত গণ’ ইত্যাদি। তবে তাঁর নজর এড়ায়নি বহুবচনের অন্যান্য রূপ। তিনি উদ্ধৃতি দিয়েছেন :
(ক) সিংহনাদ শব্দ করিয়া বানর গূণা আইসে;
(খ) সকল পাষ- দিগের পাপ ক্ষয় হইল।
নিতাই চৈতন্য অবিস দরশন দিল।
(গ) যুদ্ধতে পাড়িয়া সবে স্বর্গপুরে জায়।
বদ্ধ গণে তাহার দিগরে না দেখি উপায়।
এ অধ্যায়ের শেষাংশে প্রাপ্য হালেদের পর্যবেক্ষণটিও প্রণিধানযোগ্য :
I must not omit that in the modern and corrupt dialect of Bengal the Syllable iv raa is sometimes added to the nominative of a singular noun to form a plural: ছানা-ছানারা।
গ্রন্থের মূলাংশের ৭৫ পৃষ্ঠার শেষভাগে তৃতীয় অধ্যায়ের সূচনা। এই অধ্যায়ের আলোচ্য বিষয় বাঙলা ভাষার ‘সর্বনাম’। গ্রন্থের ১০০ সংখ্যক পৃষ্ঠা অবধি হালেদ সর্বনাম বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তবে শুরুতেই তিনি স্পষ্ট ক’রে নিয়েছেন যে ‘আমি’ এবং ‘তুমি’ সর্বনাম নয় ; ‘আমি’ এবং ‘তুমি’ সংলাপসূচক অভিব্যক্তি মাত্র।
এ অধ্যায়ে তিনি সর্বনাম-এর বচন, লিঙ্গান্তর এবং কারক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। হালেদ নিবিড়ভাবে বাঙলা ভাষায় লিখিত পুথি পাঠ করেছেন এবং যথোপযুক্ত উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর বক্তব্য ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর ব্যাখ্যান প্রায়োগিক। ভাষার ব্যবহার তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন নিবিড়ভাবে এবং মূল রীতি এবং ব্যতিক্রম উভয়েই তিনি উল্লেখ করেছেন। এক স্থানে তাঁর পর্যবেক্ষণ এ রকম:
Custom has established that the এ a of এই should be constantly changed into ই ee, and the অ o of অই into উ oo, in all oblique cases.
বাঙলা ব্যাকরণের সূত্র উন্মোচন করতে গিয়ে হালেদ ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য ভাষার সঙ্গে, বিশেষ ক’রে সংস্কৃত, ল্যাটিন, গ্রীক ইত্যাদির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। যেমন :
এই and অই when coupled with nouns, do not change their case like the adjectives and demonstratives of Latin and Greek, but continue in the nominative, like those of the English, whatever inflexion the substantive to which they belong way have assumed …
৩.
চতুর্থ অধ্যায়ে হালেদ বাঙলা ভাষায় ক্রিয়াপদের গঠন ও ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থের ১০০ সংখ্যক পৃষ্টার নিম্নভাগে এ-অধ্যায় সূচিত হয়ে শেষ হয়েছে ১৪৩ পৃষ্ঠায়। এ অধ্যায় লিখতে গিয়ে হালেদ পৃথিবীর অন্যান্য বিখ্যাত ভাষার ক্রিয়াপদের গঠন ও ব্যবহারের কথা স্মরণ করেছেন। সংস্কৃত, আরবী, গ্রীক এবং ল্যাটিন–এই চার ভাষাতেই ক্রিয়াপদের তিনটি ভিন্ন কাজ থাকে যথা প্রথমতঃ কাজটি কী তা জানান দেয়া, দ্বিতীয়তঃ কখন কাজটি সম্পাদন করা হচ্ছে তা ইংগিত করা, এবং তৃতীয়তঃ কারকের বচন। কাজটি কখন সংঘটিত হচ্ছে তার ওপর নির্ভর ক’রে ক্রিয়াপদের শেষাংশ পরিবর্তিত হয়ে থাকে (Inflexion)। কাজটি পুরাঘটিত নাকি অসমাপনী তার ওপরও নির্ভর ক’রে ক্রিয়াপদের আকার বা রূপ। ফারসী ভাষায় ক্রিয়া পদের পূর্বে ভিন্ন একটি শব্দ বসে যেমন কি না ইংরেজীতে ক্রিয়াপদের পূর্বে shall এবং will বসে ভবিষ্যতমূলক ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে। এ সব কারণে ইংরেজী ভাষায় মূল ক্রিয়াপদের গঠনে রূপান্তর খুব কম।
গ্রন্থটি ব্রিটিশ সাহেবদের উপকারার্থে লিখিত। তাই ইংরেজী ভাষায় ক্রিয়াপদের রূপ এবং ব্যবহার সবিস্তার বর্ণনা করা হয়েছে। ইংরেজীতে লেখা হয় I have written–বাংলায় have, has ইত্যাদির মতো ক্রিয়াপদের পূর্বে ব্যবহার্য কোনো সহায়ক পদ নেই। এইসব বিবেচনায় হালেদ সাহেব মন্তব্য করেছেন “the Bengal . . . has certainly the superiority over those of the English …”
বাঙলা ভাষায় ‘আছি’ শব্দটি সহায়ক পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং অন্য ক্রিয়াপদের সঙ্গে ব্যবহৃত হওয়ার ক্ষেত্রে “আ” অংশটি লুপ্ত হয়ে যায় যেমন খাইতে+আছি=খাইতেছি–এ সূত্রটি হালেদ উদাহরণযোগে পরিচ্ছন্নভাবে ব্যাখা করেছেন। তবে বাঙ্গালার মানুষ যে ক্রিয়াপদকে সম্ভ্রমার্থে ও তুচ্ছার্থে ব্যবহার ক’রে সে সম্পর্কে হালেদ অবহিত ছিলেন ব’লে মনে হয় না। তাই দেখা যায় ‘তুই করিস’ এবং ‘তুমি কর’ কে তিনি যথাক্রমে অভিন্ন বাক্যের এক বচন এবং বহুবচন বিবেচনা করেছেন:

হালেদ দুঃখ করেছেন যে বাঙ্গালার লোকসাধারণের নির্বিচার প্রয়োগরীতিতে মূল ক্রিয়াপদ সরাসরি ব্যবহৃত না হয়ে সর্বত্র ‘করণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে ব্যবহৃত ক্রিয়াপদের সংখ্যা ক্রম হ্রাসমান। অতঃপর তিনি ১৩৪টি ক্রিয়াপদের একটি তালিকা দিয়েছেন যেগুলো ‘করণ’ শব্দ না-ক’রেই ব্যবহার করা সম্ভব। কার্যতঃ যৌগিক ক্রিয়াপদ বাঙলা ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য বটে। হালেদ সাহেব যৌগিক ক্রিয়াপদ গঠনের বিভিন্ন নমুনা সন্নিবেশ করেছেন।
হালেদের ব্যাকরণ গ্রন্থের পঞ্চম অধ্যায় শুরু হয়েছে ১৪৩ পৃষ্ঠার নিচের দিকে। এ অধ্যায়ের শিরোনাম ‘শব্দবিশেষণ ও শব্দযোগ’। এই অধ্যায়ে হালেদ শব্দ বা নাম বিশেষণ এবং ক্রিয়া বিশেষণের গঠন, বাক্যে অবস্থান ও ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও তিনি ‘শব্দযোগ’ নামে একটি ধারণার কথা আলোচনা করেছে যা অভিনব:
The most common of the শব্দযোগ are these which follow–ভিতর within, মধ্যে মাঝে in the widest of ; (answer to the seventh or locative case) সহ সহিত সঙ্গে with, together with, হইতে by ; (the third Shanscrit case) as কৃষ্ণ হইতে গড়া হইয়াছিল এই’ ঘর ….
এই শব্দগুলো অব্যয় জাতীয় এবং অন্বয়মূলক। উল্লেখ্য যে, হালেদ সাহেব শব্দযোগ বলতে preposition শব্দটি ব্যবহার করেছেন। সন্ধি নিয়ে কোনও আলোচনা করেন নি হালেদ সাহেব, কিন্তু মৃগাক্ষ শব্দটিকে যৌগিক বিশেষণের ‘চমৎকার’ উদাহরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ক্রিয়া বিশেষণ সম্পর্কে আলোচনা শুরু করার আগে বিদেশী শব্দের ভূমিকা প্রসঙ্গে হালেদ কৌতূহলোদ্দীপক মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে ইংরেজী Serpent শব্দটি সংস্কৃত থেকে উদ্ভূত কারণ সংস্কৃত ইংরেজী থেকে প্রাচীনতর: Serpents < Serpens < Serpo < সৃপ > সর্প। তাঁর পর্যবেক্ষণ এমত যে, গ্রীক ভাষার চেয়ে ল্যাটিন অধিকতর প্রাচীন বিধায় শব্দরূপ, রূপের পরিবর্তন ও শেষাংশের বিচারে (Inflexion) সংস্কৃতের সঙ্গে ল্যাটিনেরই সাযুজ্য বেশী।
ষষ্ঠ অধ্যায় (Chapter VI.) শুরু হয়েছে ১৫৯ সংখ্যক পৃষ্ঠার শেষ ভাগে। এ অধ্যায়ে কেবল বাংলা সংখ্যা লিখন পদ্ধতিই তিনি আলোচনা করেন নি, হিসাব রাখার পদ্ধতি ও সূত্রসমূহও আলোচনা করেছে। কড়ি, গণ্ডা, পণ ইত্যাদি লেখার সংকেতও তিনি উল্লেখ করেছেন যা আজকাল কোনও গ্রন্থে আর লভ্য নয়।

সপ্তম অধ্যায় শুরু হয়েছে গ্রন্থের ১৭৭ পৃষ্ঠার মধ্যভাগে। এ অধ্যায়ের বিষয় বস্তু বাঙলা ভাষার বাক্যে পদ সংস্থাপনের ক্রম তথা বাক্যগঠন রীতি (Syntax)। হালেদ সাহেব আগেই অন্য জায়গায় উল্লেখ করেছেন ক্ষুদ্রতম বাক্যে প্রথমে কর্তা, পরে কর্ম ও শেষে ক্রিয়াপদ সন্নিবেশিত হয় যেমন “আমি ভাত খাই”। প্রথমেই দেখতে পাই তার খেদোক্তি যে বাঙ্গালা দেশের মানুষ শব্দ নির্বাচন, প্রয়োগ, বাক্য গঠন, বানান, লেখার সময় অক্ষরের গঠন ইত্যাদি বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করে না ; বিদেশী ভাষার শব্দ ব্যবহৃত হচ্ছে নির্বিচারে। শব্দ সাজানোর ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার অভাব; কার্যতঃ গঠিত বাক্য দুষ্পাঠ্য, অর্থোদ্ধার দুরূহ। হালেদ সাহেব দুঃখ ক’রে বলেছেন:
“The forms of letters, the modes of spelling, and their choice of words are equally erroneous and absurd … They seldom separate the several words of a sentence from each other or conclude the period with a stop”–
বাঙলা ভাষার এ হেন বিশৃঙ্খল অবস্থা সম্বল ক’রেই ব্যাকরণ রচনায় ব্রতী হ’তে হয়েছিল হালেদ সাহেবকে।
বাংলা বাক্যে পদ সংস্থাপনার ক্রম সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে হালেদ সাহেব শুরুতেই সংস্কৃত ভাষার প্রশংসা করেছেন। এ অধ্যায়ে প্রচুর উদাহরণ সহযোগে বাঙলা ভাষার বিবিধরূপ বাক্যে বিভিন্ন শব্দক্রমের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। তবে এখানে হালেদ যতটা বর্ণনামূলক ততটা বিশ্লেষণমূলক নন। ফলে বাঙলা ভাষার বাক্যে পদ সংস্থাপনের ক্রম এবং বাক্যগঠন বিষয়ক সূত্রাবলী সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত ও শ্রেণীবদ্ধ হয় নি। — বাঙলা ব্যাকরণের এই দুর্বলতা অদ্যাবধি দেখা যায়। কার্যতঃ বাঙলা ভাষার বাক্যে পদ সংস্থাপনার সূত্রাবলী এখনো সম্পূর্ণভাবে আবিষ্কার ও শ্রেণীকরণের অপেক্ষায় আছে। এটি কঠিন কোনও কাজ নয়–কেবল শ্রমসাধ্য ও সময়সাপেক্ষে। বলা দরকার, ইতোমধ্যে বিদেশী ভাষা বিশেষ ক’রে ইংরেজী ভাষার সিনটেক্স বাঙলায় অনুপ্রবেশ করেছে।
হালেদের গ্রন্থে উপসর্গ ও অনুসর্গের পৃথক আলোচনা সীমিত। সন্ধি ও সমাসের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু বাঙলা বাক্যে পদ গঠন কালে একাধিক শব্দের যুক্তকরণ সম্পর্কে হালেদ অনবহিত ছিলেন না। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন :
The particle সম prefixed to a word, makes a kind of superlative; as পূর্ণ fall, সম্পূর্ণ very full.
অন্যত্র তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন যে:
আকার signifying figure বাappearance is frequent by added to an adjective বা substantive to for me a compound epithet of similitude, as মানুষাকার, like a man বক্তাকার, like blood ইত্যাদি।
গ্রন্থের ১৯০ পৃষ্ঠার মধ্যভাগে অষ্টম অধ্যায়ের শুরু। এই অধ্যায়ের বিষয়বস্তু উচ্চারণরীতি ও ছন্দপ্রকরণ। এক পর্যায়ে হালেদ লিখেছেন:
Whenver in word containing more than two separate consonants, the last letter is a constant, the included vowel is ommilted; as আকাষ, নন্দন, বাতাস pronounced aakaash, nondon, baataas.
বাঙ্গালা দেশের মানুষের লেখার সময় অভিন্ন শব্দ পরপর ব্যবহার করার ক্ষেত্রে শব্দটি একবার লিখে ২ অক্ষরটি ব্যবহার করে। যেমন, টন২ করে জন মন্দ২ যায়। এ রীতি পর্যবেক্ষণ ক’রে হালেদ লিখেছেন:
When the same word is repeated twice togethers, the latter is denoted by the figure 2.
উদাহরণটি ব্যাকরণ গোত্রীয় নয় বটে, কিন্তু এ ভাবেই তিনি বাঙলা ভাষার ব্যবহারিক বিবিধ সূত্রাবলী আবিষ্কার ও লিপিবদ্ধ করেছেন। অনুস্বার [ ং ] ব্যবহার ক’রে শব্দসংক্ষেপণের রীতিও তিনি পর্যবেক্ষণ ও লিপিবদ্ধ করেছেন:
চাং = চালান, জাং= জামিন,
তাং= তারিখ, সাং= সাকিন, মোং= মোকাম
পৃষ্ঠা ১৯৬-২০৭ পর্যন্ত পরিসরে বাঙলা পদ্যের ছন্দ প্রকরণ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করেছেন হালেদ সাহেব।
২০৭ সংখ্যক পৃষ্ঠার মধ্যভাগে সংযোজনী পর্বের শুরু। এখানে গদ্যে লেখা একটি দরখাস্তের পাঠ ও ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে যা অষ্টাদশ শতাব্দীর বাঙলা গদ্যের নমুনা বটে–বিষয়টি আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।
৫.
যে কোনও ভাষার ব্যাকরণ দু’টি কাজ করে। প্রথমতঃ এটি একটি ভাষার শব্দ ও বাক্য গঠনের সূত্রগুলো আবিষ্কার করে, এবং দ্বিতীয়তঃ লিপিবদ্ধ ব্যাকরণ ভাষার ব্যবহারকে একটি প্রমিত রূপ পরিগ্রহণের দিকে চালিত করে। ব্যাকরণ রচিত হওয়ার পর মানুষ স্বীয় ভাষাকে লিপিবদ্ধ ব্যাকরণের আলোকে প্রকাশের চেষ্টা করে। ফলে একটি অলঙ্ঘ্য চক্রাবর্তের সৃষ্টি হয় ; ব্যাকরণ এ ভাবেই ব্যাকরণকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। ব্যাকরণের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে বিশেষ ক’রে নবোণে¥ষিত ভাষা স্থৈর্য্য ও স্থিতি লাভ করে। কিন্তু এর ফলে ভাষার বিকাশ রুদ্ধ হয়ে যায় তা নয়। ভাষার বিকাশের অন্যতম উৎস নতুন-নতুন শব্দ চয়ন। মননশীল ব্যক্তিরা গভীর চিন্তা-ভাবনার সুপ্রকাশের স্বার্থে ভাষাকে প্রচলিত রীতির ব্যতিক্রমে ব্যবহার ক’রে ভাষার বিকাশ ঘটিয়ে থাকেন।
জনাব উইলিয়াম জোনস্ যে ফারসি ব্যাকরণ গ্রন্থটি লিখেছিলেন তা’ অনুসরণ করেছেন হালেদ সাহেব। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনার জন্য তিনি বাংলার সঙ্গে সংস্কৃতি ভাষার যে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে সেগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল সংস্কৃত ভাষার জ্ঞান ব্যতিরেকে বাংলা ভাষার গঠন সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব নয় কারণ উভয়ই অভিন্ন বংশজাত, আত্মীয়তা দূরসর্ম্পকীয় হয়তো ।
সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা বাঙলা ভাষার মৌল কাঠামোর সূত্রাবলী নিরূপণে হালেদ সাহেবকে প্রভূত পরিমাণে সাহায্য করেছে। হালেদ এমন একটি ব্যাকরণ প্রণয়ন করতে নিয়ত করেছিলেন যা পাঠে একজন বিদেশী সহজে বাঙলা ভাষা আয়ত্ত করতে সক্ষম হবে। একই সঙ্গে তিনি উপদেশ দিয়েছেন বাঙলা ভাষা শিক্ষার্থীকে ফারসী ও হিন্দোস্তানী ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ সম্পর্কে অবহিত হওয়ার জন্য। তাঁর রচিত উদাহরণ সমৃদ্ধ ব্যাকরণ গ্রন্থটি সহজপাঠ্য ও সহজপাচ্য।
এটি ঠিক বিদেশী হওয়ায় এবং বাংলা ভাষার এবং আদর্শস্থানীয় হিসেবে ইতোপূর্বে রচিত কোনও ব্যাকরণের উদাহরণ না-থাকায় স্বাভাবিকভাবেই হালেদ সাহেবের প্রচেষ্টায় অনিবার্য সংকীর্ণতা ছিল। বাংলা ভাষায় মধ্যম পুরুষে আপনি, তুমি ও তুই তিনটি ভাগ ও প্রথম পুরুষে বচনভেদে দু’টি ভাগ। তৃতীয় পুরুষে সে ও তিনি এ দু’য়ের সম্মানবাচক পার্থক্যও রয়েছে। এটি তিনি অনুধাবন করতে পারেন নি। কিন্তু এই ব্যর্থতা খুব বড় ভুল মান করা ন্যায্য হবে না। পরিভাষার সমস্যাও ছিল। ‘শব্দযোগ’ নামীয় একটি পরিভাষা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন যা পরবর্তীকালে আর ব্যবহৃত হয় নি। পরবর্তীকালে শতাধিক বৎসরে বিভিন্ন ব্যাকরণবিদের হাতে ‘উপসগর্’, ‘অনুসর্গ’, ‘যৌগিক ক্রিয়া, ‘প্রযোজক ক্রিয়া’, ‘অসমাপিকা ক্রিয়া’, ‘ণিজন্ত ধাতু, ‘সমাস’, ‘সন্ধি’, ‘অপভ্রংশ’, ‘লগ্নক’ ইত্যাদি হরেক রকম লাগসই পরিভাষা সৃষ্টি হয়েছে যেগুলো ব্যাকরণের সূত্রগুলোকে শ্রেণীবদ্ধ করতে সাহায্য করেছে। এই সুযোগ হালেদ সাহেব লাভ করেন নি।
যত সীমাবদ্ধতাই থাকুক না কেন এ কথা অনস্বীকার্য হালেদ সাহেব রচিত ব্যাকরণ গ্রন্থটি বাঙলা ভাষার ব্যাকরণ রচনায় ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ভিত্তিপ্রস্তরের দায়িত্ব পালন করেছে। তাঁর অব্যবহিত উত্তরসূরী উইলিয়াম ক্যারি মহোদয়ও বাংলা ভাষার ব্যাকরণ রচনা করেছিলেন। তিনি অনেকাংশে হালেদ সাহেবকে অনুসরণ করেছেন তবে অনেক বিষয় সংযোজন করেছেন যা হালেদ সাহেবের দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়েছিল যেমন আপনি-তুমি-তুই এর পার্থক্য তিনি সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন।
এ কথা তর্কাতীত প্রচলিত বাঙলা ভাষা প্রধান দু’টি স্রোতের সম্মিলন–একটি সংস্কৃত অন্যটি অবিমিশ্র বাঙলা। সংস্কৃত শব্দের বহুলতা এ ভাষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কেবল শব্দ নয়, পদ ও বাক্যের গঠনও সংস্কৃতঘেঁষা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাঙলা গদ্যের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাঙলা ভাষায় সংস্কৃত’র প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে ; এ প্রভাব সংস্কৃত শব্দের অধিকতর ব্যবহারে, এ প্রভাব সংস্কৃত বাক্যগঠন রীতির অনুসরণে। গদ্যে এ প্রভাব আজও অব্যাহত আছে। এর ফলে বাঙলা ভাষা ঋদ্ধ হয়েছে ; ভাষার প্রকাশক্ষমতা প্রশস্ততর হয়েছে। এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, হালেদ সাহেবকে অনুসরণ ক’রে সংস্কৃত ব্যাকরণের আলোকে বাঙলা ব্যাকরণ রচনা করাই শ্রেয়। খাঁটি সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রে সংস্কৃত ব্যাকরণ প্রয়োগের যৌক্তিকতা যেমন বিদ্যমান তেমনি বাঙলা ভাষার যে অংশটি বাঙলা শব্দাশ্রয়ী তার ব্যাকরণ পৃথক ক’রে লেখার সুযোগ অবশ্যই আছে। একটি বাক্য বিবেচনা করা যাক: “ভাত খাইতে খাইতে হঠাৎ তিনি হাত ধুইয়া উঠিয়া পড়িলেন।” ‘খাইতে খাইতে’, ‘ধুইয়া’ এবং ‘উঠিয়া পড়া’ এই তিন পদের পরিচয় নিরূপণের জন্য বাঙলা ব্যাকরণ আবশ্যক বটে।
ব্যাকরণের উদ্দেশ্য নিয়ম প্রণয়ন নয় বরং ভাষার সূত্রানুসন্ধান। বাঙলা ভাষার বাক্যগ্রন্থণ প্রণালী এবং সংস্কৃত ভাষার বাক্যগ্রন্থণ প্রণালী সকলক্ষেত্রে অভিন্ন নয়। যে যে ক্ষেত্রে ভিন্নতা রয়েছে সে সে ক্ষেত্র বাঙলা ব্যাকরণ গবেষকদের মনোযোগের উপযুক্ত অধিক্ষেত্র। কিন্তু এ বিষয়েও প্রয়োজন হলে সংস্কৃতি ব্যাকরণের আদর্শ বিবেচনা করার যেতে পারে। সর্বশেষ ২০১১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে পবিত্র সরকার ও রফিকুল ইসলামের সম্পাদনায় ‘প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ”। হালেদ সাহেব যে সকল বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করেছিলেন তা’ আলোচনা করা হয়েছে অনেক বিশদ ক’রে। হালেদ সাহেব যে সকল বিষয় আলোচনা করেন নি সেগুলো যুক্ত করা হয়েছে। গত শতাধিক বৎসরে নানা ব্যাকরণবিদের হাতে উদ্ভাবিত অসংখ্য পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার ক’রে বাঙলা ব্যাকরণের ভাষাও প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু এখানেই কাজ শেষ হয়ে গেছে এমন নয়। ইতোমধ্যে গদ্য ভাষার ব্যাপক প্রসারণ ঘটেছে এবং বিভিন্ন লেখকের রচনায় এমন অনেক বাক্যগঠন প্রণালী দৃশ্যমান হচ্ছে যা এখনও বিশ্লেষণ এবং অন্তর্নিহিত সূত্রাবলী আবিষ্কার ও শ্রেণীকরণের অপেক্ষা রাখে।

A GARMMAR OF THE BENGAL LANGUAGE
BY NATHANIEL BRASSEY HALHED
দ্বিতীয় সংস্করণের সম্পাদক: ফয়জুল লতিফ চৌধুরী
প্রথম প্রকাশ: ১৭৭৮ খৃষ্টাব্দ
প্রথম জার্নিম্যান বুকস সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০১৮
প্রচ্ছদ: তারিক সুজাত
মূল্য: ৭৫০ টাকা

Flag Counter


8 Responses

  1. Sudipta says:

    বিশ্লেষণ খুবই চম‌ৎকার।

  2. ফরিদ আহমেদ says:

    ছোটবেলা থেকে কেবল নামই শুনেছি এই বইয়ের। এই প্রথম বিস্তারিত পড়লাম। আমাদের দেশেই প্রকাশ হলো।বাহ্। প্রকাশককে ধন্যবাদ। কিন্তু বই মেলা শেষ। ভাবছি এখন কোথায় পাবো। শাহবাগের আজিজ মার্কেটে ভারতীয় বই পাওয়া সহজ কিন্তু ব্রাসি হালেদের ব্যাকরণ কি তারা রাখবে?

  3. Sudipta says:

    @ফরিদ আহমেদ
    ভূমিকার নিচে এই বইয়ের প্রকাশন সংস্থা জার্নিম্যান বুকস লেখা রয়েছে। তাদের কাছে বইটা পাওয়া যাবে। আজিজ মার্কেটেও খোঁজ করতে পারেন।

  4. গনী আদম says:

    খুব ভালো লাগলো জেনে যে ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন এই বইটি এখন আর দুর্লভ থাকছে না। প্রায়োগিক প্রয়োজনে না হোক, সংগ্রহের খাতিরে হলেও এটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত দামী একটি বই।

    তবে কথা রইলো ইংরেজ সেই মহান ব্যাকরণবিদের নামের উচ্চারণ নিয়ে। ছোটোবেলা থেকে যে রকম শুনে আসছি, শ্রদ্ধেয় ফয়জুল লতিফ চৌধুরী ভাইয়ের লেখায় তা মিলছে না! হ্যালহেড না হালেদ? দু’টোই সঠিক হতে পারে না। মাঝের ‘হ’-টা উহ্য হতেই পারে। কিন্তু বিশেষ করে ইংরেজের নাম আরবীয় ‘খালেদ’-এর সমোচ্চারণ শব্দ হয় কেমনে?

    গুগল বলছে, পুরনো জমানার হ্যালহেডই সই। হালেদ অশুদ্ধ। লিংক দিয়ে দিচ্ছি, যে কেউ শুনে দেখতে পারেন।
    https://www.howtopronounce.com/halhed/

  5. রায় বাবু says:

    হ্যালহ্যাডে’র এর ব্যাকরণের কথা সবসময় শুনেছি। বই পত্রেও পড়েছি হ্যালহ্যাড বা হ্যালহেড। অবশ্য প্রচ্ছদে লেখা দেখছি ‘ক্রিয়তে হালেদঙ্গ্রেজী’। তাই মনে হয় ইংরেজ সাহেব Nathaniel Brassey Halhed নিজের নাম হালেদ-ই লিখতেন।

  6. মুহিত খান says:

    খুব আগ্রহ নিয়ে প্রবন্ধটি পড়লাম। দীর্ঘ প্রবন্ধ বাংলাভাষার প্রথম ব্যাবকরণ বইটি সম্পর্কে যা জানার ছিল সব জানা হয়ে গেল। ৭৫০ টাকা দিয়ে বই কেনার আর দরকার হবে না। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।

  7. রফিক সুলায়মান says:

    উনার নাম নাথানিয়েল ব্রাসি হ্যালহেড। এখানে ব্রাসলি এবং হালেদ দেখে বিস্মিত হলাম।

  8. রুবেল says:

    নামের বানান ভুলের পরে আরেকটি বিষয়ে খুবই অবাক হয়েছি যে, বইটি জার্নিম্যান বুকসের নামে কপিরাইট দেখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.