বইয়ের আলোচনা

তিমিরে তারানা পাঠ: মুগ্ধতার বাইরে থেকে

কাজী নাসির মামুন | 26 Feb , 2018  

border=0কোনো শিল্পসৃষ্টিরই একাকী অর্থ হয় না। কেননা ব্যক্তির প্রেক্ষিতে কোনো শিল্পকর্মই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। পূর্ববর্তী বা মৃত শিল্পস্রষ্টার কর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েই নতুন সৃষ্টির মূল্যায়ন হয়। টি এস এলিয়ট প্রায় এমনটাই বলেছেন। সে ক্ষেত্রে কবিতার অভিনবত্বের ধারণা শুধু সেকেলে নয়, অকার্যকরও। তবে পূর্ববর্তী কবিদের পারম্পর্য বজায় রেখেই একজন কবি নিজের কবিতায় স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন। সোহেল হাসান গালিবের তিমিরে তারানা কাব্যগ্রন্থটি পড়তে পড়তে এ কথাগুলো মনে হয়েছে আমার। আরও একটা কথা ভাবনায় এসেছে। অভিনবত্বের উচ্চাভিলাষ পরিত্যাগ করলেই এ যুগের সচেতন পাঠক কবিতায় ভিন্নতার সূত্রটি আবিষ্কার করতে পারেন। সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন পাঠের অভিনিবেশ আর শিল্পচেতনার একপেশে রুচি পরিহার করা। অর্থাৎ কবিতার ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের সঙ্গে নিজের রুচি মেলানো এবং পাঠকসত্তার বিকাশ সাধন। কেননা পাঠকের কাব্যরুচিও সংস্কারে বাঁধা পড়ে। এসব বলবার কারণ হলো, আমার অভিজ্ঞতায় যতদূর বুঝেছি উচ্চ প্রশংসা অথবা অতি নিন্দার বাহারি কথাবার্তা ছাড়া সাম্প্রতিক কালে কাব্য সমালোচনার অন্য কোনো ধারা চোখে পড়ছে না। যে-কোনো শিল্পকর্মকে আমরা মুগ্ধতা থেকে গ্রহণ করি। এমন কি ‘অতি নিন্দা’র যে-প্রসঙ্গটি আমি টেনেছি সেটিও নেতিবাচক মুগ্ধতার মনস্তাত্ত্বিক প্রকাশ বলে আমার ধারণা। কোনো সৃষ্টিকর্মকে ক্রিটিক্যালি গ্রহণ করবার দরকার আছে। যার অর্থ হলো মননশীলতার চোখ দিয়ে ওই সৃষ্টিকর্মের বৈশিষ্ট্য নিরূপন, প্রায়োগিক ত্রুটিগুলো নজরে আনা। ব্যক্তিগত ভালো লাগা মন্দ লাগার আবেশ ছড়ানো নয়। আবার শৈল্পিক ত্রুটির খোঁজখবর দেওয়া মানে নিন্দা করা নয়। ত্রুটি মাত্রাতিরিক্ত বোধ হলে সমালোচকের কি এমন দায় পড়ে গ্রন্থালোচনা করার? দায় পড়ে যদি নিন্দাই উদ্দেশ্য হয়। এই ক্ষতিকর প্রবণতা এড়াবার উপায় হলো শিল্পের চলমান আবহে কেবল যে-গ্রন্থটি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হবে সেই গ্রন্থটিই আলোচনায় তুলে আনা। এ ক্ষেত্রে ত্রুটি চিহ্নিত হলেও উদ্দেশ্য থাকে মূল্যায়ন। নিন্দা নয়। শিল্পভাষায় একে বরং নাম দেওয়া যায় ‘ক্রিটিক্যাল রেমিডি’।

আমার তিমিরে তারানাপাঠ মুগ্ধতার জায়গা থেকে নয়। মূল্যায়নের জায়গা থেকে। তবে আমার পরিশীলিত মনন যতটা শৈল্পিক পরিচর্যা পেলে পরিতৃপ্তি পায় সেটুকু অবলীলায় ধারণ করছে সোহেল হাসান গালিবের এই সাম্প্রতিকতম কাব্যগ্রন্থটি। প্রথমত কারণ হলো কাব্যগ্রন্থের নামকরণের মধ্যে যে-সাঙ্গীতিক অনুপ্রাস কার্যকর আছে, তা আসলে সামগ্রিক কবিতায় মূর্ছনার মতো ছড়ানো ছিটানো। একাডেমিক আলোচনার মতো শোনালেও আমার পাঠের বাস্তবতা তা-ই বলে। এবং তা একক কোনো কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে নয়। সামগ্রিক কবিতার সারবত্তায় প্রকল্পিত স্মরণীকা হিসেবে কাজ করছে তার এই সুরেলা ভাবভঙ্গি। ফলে পাঠকের পক্ষে একটুও বেসুরো পথে হাঁটবার উপায় নেই। লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার ভয় আছে। মনোযোগী হবার সামান্য ঝুঁকি নিতে পারলে পাঠক পেতে পারেন পরিতৃপ্তির সেই শিল্পনির্যাস যা আমাকে প্ররোচিত করেছে পাঠোপলব্ধি লিখতে। আর একজন কবি মৃত কবিদের উতরানোর আগে নিজেকে উতরাতে চান। গালিব সম্ভবত পরিস্ফুট সার্থকতা পেয়েছেন অন্তত এই বিশেষ দিকটায়।

বাংলা কবিতার সমালোচনার ধারাটি আমার রপ্ত হয়নি। অথবা বলা যায় সেই সমালোচনার মূল সূত্রটি অনাবিষ্কৃত নতুবা আজও প্রতিষ্ঠা পায়নি। যতটা নজরে এসেছে তাতে এইটুকু পরিষ্কার যে, বিভিন্ন রসবোধের প্রত্যক্ষণ বা রস সাব্যস্তকরণের মধ্যেই আটকে রয়েছে বাংলা কবিতার সমালোচনার মৌলিক সূত্রটি। সংস্কৃত রসতত্ত্ব থেকে আগত এই শিল্প সমালোচনা মূলত ভাবগত; প্রকরণচেতন নয়। একই কবিতার মধ্যে বিভিন্ন ভাব, বিষয়, ভাষা ও বোধের সমন্বয় চিহ্নিত করাই বাংলা কাব্যালোচনার মূল লক্ষ্য। ফলে তা সংশ্লেষণধর্মী।

তিমিরে তারানা আলোচনা করতে গেলে ইউরোপের বিশ্লেষণী পর্যালোচনার ধারা পরিহার করলে সুবিধা বেশি। কেননা সেই বিশ্লেষণ বিভিন্ন কাব্যান্দোলন থেকে উদ্ভুত নানা মতবাদে বিভক্ত। প্রতীকবাদ, চিত্রকল্পবাদ, ডাডাবাদ, অভিব্যক্তিবাদ- এরকম মতবাদের ভিত্তিতে সুনির্দিষ্ট আলোচনায় পরিণতি পায় সেই ব্যাখ্যা। এদিক থেকে গালিবের কবিতা বরং ভারতবর্ষীয় তথা দেশজ কাব্যরীতির অনুসারী। পশ্চিমা রীতির বিবেচনায় কোনো একক মতবাদে বিশ্লিষ্ট হবার মতো নয়। একই কবিতায় তার বোধ বহুধা বিভক্ত এবং তা বহু রসের সমন্বয়ে হয়ে উঠেছে আকীর্ণ হৃদয়ের। সেই হৃদয় রোমান্সের নয়। পরিশীলিত আবেগের এবং ভাবাবেগ বর্জিত। গালিবের স্যাটায়ার চটকদার নয় বরং স্বশিক্ষার আঁচ-লাগা। কোথাও একটু দুর্মর হয়ে উঠবার প্রেরণা পেলেও পরক্ষণেই নান্দনিক প্রজ্ঞার শাসনে গুটিয়ে থাকে। এই গুটানো ভাবটি তার কবিতার স্বভাব ও স্বাতন্ত্র্য। কোনো শিল্পসৌকর্যের অভাব মনে করলে ভুল হবে। উৎপলের কবিতা পড়তে গিয়ে আমি প্রথমটায় এই ভুল করেছি। পরে বুঝেছি কবিতার উৎকর্ষ কখনো কখনো বারবার পঠনের মধ্য দিয়ে আবিষ্কৃত হয়। পানের খিলি মুখে দেওয়া মাত্রই স্বাদ লাগে না। কষ কষ একটা বিস্বাদ মুখে লেগে থাকে। কিন্তু সুপোরি চুন আর জর্দার মণ্ড তৈরি হলে পানের স্বাদ মুখে জেঁকে বসে। সমঝদার মাত্রই ওইটুকু কালক্ষেপনের দায় নেবেন। কেননা কবিতা কেবল আবৃত্তির কণ্ঠানুশীলন নয়, ভাষার নির্মিতিকে উপলব্ধি করা। আর প্রকল্পিত টেক্সট হয়ে উঠবার অন্ত:প্রেরণা ছাড়া আজকের যুগে কবিতা গুরুত্বশীল হয়ে উঠবার অন্য কোনো উপায় নেই। গালিবের কবিতা সেই ‘নিরুপায়’ পরিণতির দিকে অভিলাষী হয়ে ওঠে। তাই ইমিডিয়েট প্লেজার বা তাৎক্ষণিক আনন্দে তার কবিতার সুরাহা নেই। নান্দনিক ঐতিহ্যের পারম্পর্যে তিনি তার কবিতাকে কতটা গ্রাহ্য করে তুলতে পেরেছেন, সেখানেই তার গুরুত্ব। কেননা আজকের দিনে পাঠক একটি বিমূর্ত ধারণার মতো। তাৎক্ষণিক আনন্দের মধ্যে যারা আবেগ নিষ্পন্ন করে কবি ও কবিতাকে বাহবা দিতে চান, তারা ঠিক পাঠক নন। জনতা। জনতা অতি বিবেচ্য হলে শিল্পের উৎকর্ষ কমে। কবিতাকে তাই প্রবহমান সময়ে স্থাপন করতে হয়। তখন পরীক্ষিত হয় কবিতার শিল্পিত আনন্দের মাত্রাগুণ, রসগ্রাহীতা ও পাঠকের দিকে সেই কবিতার অন্তর্গত প্রবণতার আকর্ষণ। পাঠক নিজেও কাল প্রবাহের আসামী। পাঠচক্রে তার নিজেকেও যাচাই করতে হয় সত্যিকারের পাঠক হিসেবে। তিমিরে তারানা পড়ে মনে হয়েছে এই কাব্যগ্রন্থটি কালপ্রবাহের মধ্যে নিজেকে যাচাই করতে উৎসুক।

সেই ঔৎসুক্য একটা দার্শনিক সারবত্তা নিয়ে হাজির। ‘তিমির’ যেন জাগতিক নেতির রূপক। যার মাঝে ‘তারানা’ তথা সুরের ব্যঞ্জনা বিদ্রুপের মহিমা নিয়ে পুরো জগতটাকেই ব্যঙ্গ করছে। যদি বলি বাংলা কবিতার রসতত্ত্বের বিবেচনায় হাস্যরসের সঙ্গে করুণরসের সংহতি তার কবিতাকে দেশজ ফ্লেবার দিয়েছে, তবে ভুল হবার কথা নয়। কেননা তিমিরে তারানারূপ নির্ভর নয়, রস নির্ভর। চিত্রকল্প উপমা বা প্রতীকের ভারমুক্ত এই কাব্যগ্রন্থ নান্দনিকতার অত্যাচারে পাঠককে বিহ্বল করে তোলে না। যা এ সময়ে অতি-চর্চিত একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফ্যান্টাসির জগতে হেঁয়ালির অনন্যতা দিয়ে চিন্তাহীন সময়ের শূন্যস্থান পূরণ। এটি কোনো কোনো সময় কাব্যের অসহায়ত্বকে প্রকাশ করে। পরিপাশ্বের জগত নিয়ে যখন কবির আর কিছুই বলবার থাকে না, তখন ‘ভালোলাগার বিভ্রান্তিময় পৃথিবী’তে আশ্রয় খুঁজেন। সেই বিভ্রমের জগতে পাঠকও কিছুকাল তড়পাতে থাকেন। নিরীক্ষার ফল স্বরূপ দু একটি টেক্সটে এই প্রবণতা সীমিত হলে ভালো। নইলে চিন্তার দৈন্য বিস্তারিত হয়। স্বঘোষিত দায়মুক্তি কবিকে ‘অকাজ’-এ নিযুক্ত রাখে। কবি সেই ফাঁদ থেকে বের হতে পারেন না। প্রশ্ন হতে পারে চিন্তার প্রকাশই কি কবিতা? আমি বলবো, না। চিন্তার প্রকাশ নয়, চিন্তার পরিচর্যাই কবিতা। কেননা কবির কোনো দায়মুক্তি নেই। নান্দনিকতার চরম বিমূর্ততা তৈরী করে তিনি কেবলই এড়িয়ে যেতে পারেন না পারিপাশর্^কতাকে। চাণক্য বলেছেন, এমন কি আছে যা কবির দৃষ্টি এড়ায়? এই এড়িয়ে চলবার নীতি কবিকে গ্রাস করলে ‘শিল্প”শিল্প’ বলে তিনি চিৎকার করেন। কিছুদিন পর পাঠক নিজেও সেইসব কবিতার বিভ্রমে কোনো এইসথেটিক ইউটিলিটি খুঁজে পান না। গালিব এই কাব্যগ্রন্থে সেই ‘বিভ্রম’ কিছুটা ডিঙাতে পেরেছেন বলে মনে হলো। ‘রেল’ কবিতায় তিনি বললেন: সব নারীর মধ্যে মা ও মাগির বাস। পরবর্তী পংক্তিতে মা ও মাগিকে সমান্তরাল রেললাইন হিসেবে তুলনা করলেন। প্রথম কথাটা আঁতকে উঠার মতো। মনে হলো আরও উদ্ধত কথার মধ্য দিয়ে নারীর স্বরূপকে তিনি চটকদারভাবে উপস্থাপন করবেন। তা হলো না। কারণ তার কবিতার সেই গুটানো স্বভাব। আর এই স্বভাবই কবিতাটিকে দার্শনিক পরিণতির দিকে নিয়ে যায়। যে-চিন্তা এখানে পরিচর্যা পায় তা হলো নারীর ভিতর মা ও মাগির দুই সাংঘর্ষিক সত্তাই ‘শতাব্দীর ভয়াবহ ট্রেন-দুর্ঘটনা’ নিয়ে আসে পৃথিবীতে। চিন্তা এখানে নিগূঢ়ভাবে ব্যাপ্ত হয়েছে। প্রকাশ পায় নি। অর্থাৎ নান্দনিক আড়াল রচনা করেছে।

এই গ্রন্থের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো হেঁয়ালি কথার মধ্য দিয়ে একটা সিরিয়াস পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া। ‘মৎস্যগন্ধা থেকে যোজনগন্ধা’ ‘একটি উত্তাল সঙ্গমের ব্যবধান’- একথা বলার পর আমাদের সামাজিক প্রপঞ্চে লুকিয়ে থাকা একটা মৌলিক প্রশ্নের মধ্যে কিছুক্ষণ স্থিত হয় তার চিন্তা: ‘তবু কোন পুরুষ নির্বাচিত করে বেশ্যাকে’ ‘তার পুত্রের জননী বলে?’ অথবা ‘সমকামীদের বিয়েতে কি দেনমোহরের ব্যবস্থা থাকবে?’- একথা বলার মধ্যে স্যাটায়ার তীব্রতর হলেও যাচ্ছে-তাই হেঁয়ালির মতো তা কিন্তু লক্ষ্যচ্যুত নয়। সমাজের একটা ব্যতিক্রম যৌন চেতনার পক্ষে বা বিপক্ষে বিদ্ধ করে আমাদের মনস্তত্ত্বকে। কোনো ‘অকেজো’ বিভ্রমের দিকে যাত্রা করে না।

এই কাব্যগ্রন্থে প্রখর বিমূর্ততা নাই। ফলে অনর্থ বোধের পীড়া দেয় না। কখনো কখনো স্যাটায়ার তার কবিতার প্রবেশদুয়ার কিন্তু অভিমুখ অন্য কোথাও। ইঙ্গিতের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।’ওড়ে পপকর্ন পাপধর্মের বাতাসে’মজাদার এই পংক্তি দিয়ে শুরু হয়’পপকর্ন’ কবিতাটি। কিন্তু কয়েক লাইন পড়ার পর বোঝা যায় এই কবিতার উদ্দেশ্য মজার মধ্যে সীমিত নয়। বরং পরিপাশ্বের ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে কবির নান্দনিক বোঝাপড়া টের পাওয়া যায় এই লাইন দুটোয়:

ক্ষমাশীলতার এই দেশে
চন্দ্রমল্লিকার ভালো নাম : গুমহত্যা

এবং পাঠক আরেকটু অগ্রসর হলেই দেখবেন সামাজিক নৃশংসতাও কবিতার বিষয় নয়। ব্যক্তিগত প্রণয়গ্রন্থনার মতো শেষ বাক্যটি চমৎকার মায়া-জাগানিয়া হয়ে ওঠে :

শান্তি, বলো দেখি, শাহানার কাছে গেলে
কেন খুনিদেরও ঘুম পায়?

এই গ্রন্থে গালিবের কিছু কবিতা শিল্পিত সহমর্মীতায় পাঠককে কাছে টানে। কবিতায় ট্র্যাজিক এটমসফেয়ার তৈরী করতে গিয়ে স্মৃতিকাতরতা এবং প্রেমানুভূতির কাঙালিপনায় বহু বাংলা কবিতাকেই ভাবাবেগে অপচয় হতে দেখি। গালিবের আবেগ সংহত। কিটস যেটাকে ‘নেগেটিভ কেপাবিলিটি’ বলেছেন আমি সেটাকে বলি বস্তুনিষ্ঠ ধারণ ক্ষমতা। কবির ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা আবেগের পরিমিতির মধ্য দিয়েই কবিতায় প্রকাশ পায়। কবি ধারণক্ষম হলেই রোমান্টিক কাতরতা কাটিয়ে উঠতে পারেন। এই গ্রন্থে গালিব সম্ভবত এ দিকটায় ভালো পরিচর্যা দিয়েছেন।’একগুচ্ছ অভিশাপ যেন এই কাশফুল’- এই লাইন দিয়ে একটি কবিতা শুরু হলেও স্মৃতিমৈথুনের অভিশাপ কবির নিজের সত্তাকে আক্রান্ত করে না অথবা কবির মানসপ্রতিমাকে অভিশম্পাতগ্রস্ত করাও কবিতার স্থূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় না। কাশফুলের প্রতীকের মধ্যে ব্যক্তি কবির স্থূল আবেগ দারুণভাবে নির্বাপিত হয়। তাই দ্বিতীয় লাইনে কবি যখন বলেন : ‘যখন কিছুই নেই আর, তখন কে আসে কাছে?’ তখন পাঠক কবির অনুভূতির সঙ্গে সমব্যথী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে।

‘কিছু ফুল গোরস্থানেও ফোটে’- এরকম কিছু মর্মঘাতী অনুভূতি গালিবের কবিতায় মরমী আবেশ নিয়ে আসে। ঠিক মরমী না হলেও অধিবিদ্যিক এবং সেই অর্থে আধ্যাত্মিক। মরমী কবিতার সহজিয়া ভঙ্গিটি নেই কিন্তু অন্তর্গত বোধে আত্মিক রহস্য উন্মোচনের প্রশ্নশীল গতিবিধি তার সেইসব কবিতাকে রহস্যময় করে তুলেছে। আর তাই হয়তো সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় এসে তিনি জানতে পারেন : ‘অসমাপ্ত পৃথিবীর পথ’। কবরঘনিষ্ঠ এরকম কবিতার মধ্য দিয়ে কবির মুত্যুচিন্তা নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করে।

একটা কথা খুব বিশ^স্ততার সাথে বলতে ইচ্ছে করে। গালিবের কবিতা প্রচল টেকনিকের বাইরে নয়। ট্রেডিশনাল। ‘শুচিতা’ ‘তমা’- এরকম সম্বোধন দিয়ে যে-কবিতা শুরু হয়েছে তাতে কেউ কেউ জীবনানন্দীয় প্ররোচনা টের পেতে পারেন। কিন্তু স্ববিরোধের মতো শোনালেও দৃঢ়ভাবে আরও একটা কথা বলা দরকার। গালিবের কবিতায় জীবনানন্দীয় ঘোর নাই। তিমিরে তারানাপাঠ করে কোথাও ঘোরগ্রস্ত হওয়ার কারণ দেখি না। বিচিত্র বোধের মধ্যে পাঠককে বরং সচেতন করে তোলে তার কবিতা। জলের পাকের মতো বিহ্বল-করা ঘোরের কবিতায় এ দেশের পাঠক আবিষ্ট হতে ভালোবাসে। এধরনের একপেশে প্রচল রুচিকে মান্য করেনি গালিবের কবিতা। তার কবিতা অবচেতনার নয়। সচেতনতার। ঘোরগ্রস্ত করে না। ঘোর ভাঙে। ঠিক এই জায়গায় তিনি ট্রেডিশনাল নন। প্রচলের বাইরে বিষয়বৈচিত্রের মধ্য দিয়ে তিনি সাহস নিয়ে হেঁটেছেন। হয়তো নিজস্ব রুচির নির্মাণের দিকে যেতে চেয়েছেন।কিন্তু চেতনার এই রূপ শিল্পিত মোহের দিকে নিতে চাইলে আরও শৃঙ্খল ভাঙার প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। আরও দুর্মর ও খাপছাড়া হওয়া দরকার। তার কবিতা মেয়েদের খোঁপার মতো আঁটসাট। এলো চুলের অবাধ্যতা মেনে নিলে’সচেতনতার শিল্পরূপ’ তার কবিতার নিজস্ব প্রবণতা হয়ে দাঁড়াবে।প্রচলের বাইরে তার কবিতায় এইটুকু সম্ভাবনা আমি দারুণভাবে আঁচ করি এবং আনন্দ পাই।
Flag Counter


1 Response

  1. সাইফ সিরাজ says:

    পড়লাম। কাব্য নিয়ে এমন আলোচনাই দরকার। মুগ্ধতার চাদর পরে ক্রিটিক করা সম্ভব হয় না অনেক ক্ষেত্রেই। বড়জোর রিভিউ লিখা যায়।

    কাজী নাসির মামুনকে ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.