প্রবন্ধ

শহীদ মিনার: চেতনার বাতিঘর

farid_ahmed_dulal | 21 Feb , 2018  

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে যে-সৌধ নির্মিত হয়েছে, যে সৌধে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে তো বটেই, বিভিন্ন উপলক্ষে বাঙালি মিলিত হয় তা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে আশ্রয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শহীদ মিনার-এর নকশা সারাদেশেই যে এক তা নয়। বিভিন্ন নকশার শহীদ মিনারের স্থাপত্যে শিল্পীর কী দৃষ্টিভঙ্গি তা আমরা সবাই জানি না; এমন কী কেন্দ্রীয় যে শহীদ মিনার, তার স্থাপত্যে মা ও সন্তানের সমন্বিত উপস্থাপনের যে শিল্পিত উপস্থাপনা, তা-ও বোধকরি বাঙালি মাত্রই অবগত, তা-ও নিশ্চয়ই সঠিক নয়; কিন্তু শহীদ মিনারের চেতনার যে বিষয়টি সে-টি বাঙালি মাত্রই জানেন। অবশ্য এ-ও তো সত্য, বাঙালির এই চেতনার আঙিনা শহীদ মিনার প্রসঙ্গে এক শ্রেণির বাঙালির (?) অবজ্ঞা অথবা কটুক্তি যে আমরা শুনিনি তা কিন্তু নয়; এবং অপ্রিয় হলেও সত্যি সেইসব কটুক্তিকারীদের কখনো আইনের আওতায় এনে দণ্ডিত করা হয়েছে তেমনটি কখনো শুনেছি বলে স্মরণে আসছে না। এ কথা অবশ্যই সত্যি, যারা শহীদ মিনার নিয়ে কটুক্তি করে, তারাও এর চেতনার শক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; যেমন ওয়াকিবহাল ছিলো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। কিন্তু বাঙালির আধুনিক-বিজ্ঞানমনষ্ক-প্রাগ্রসর অংশ নিজেদের চেতনার সাথে শহীদ মিনারের সম্পৃক্তির বিষয়টি কোনোদিন কোনো অবস্থায় বিস্মৃত হননি; যে কারণে বাঙালি তাদের সংকটে-সংগ্রামে-হতাশায়-বঞ্চনায় শহীদ মিনারের শরণাপন্ন হয়ে নিজের ভেতরের চেতনাছুরিটিকে শান দিয়ে নিয়েছে।

কী প্রেক্ষাপটে বাঙালির জীবনে একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটি আবশ্যিক হয়ে উঠেছিলো সে বিষয়ে ইতিহাস ঘেটে রচনাটিকে দীর্ঘ করতে চাই না; আমার বিশ্বাস প্রতিটি সচেতন বাঙালি জানেন, ১৯৪৭-এ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত ‘পাকিস্তান’ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার অব্যাবহিত পরেই পূর্ববঙ্গের মানুষ- পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ বুঝে যায় ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়!’ বাঙালিকে সাংস্কৃতিকভাবে নির্মূল করতেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে অগ্রাহ্য করে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু করার ষড়যন্ত্র করে। শুরু হয় প্রতিবাদ, ফুসে ওঠে বাংলাদেশ। বাঙালির সেই আন্দোলন সংগ্রাম আর পাকিস্তানি দুঃশাসনের পীড়ন নীতির কারণেই বাঙালির সৌর্য-বীর্য আর সংগ্রামের ইতিহাসে যুক্ত হয় ১৯৫২, যুক্ত হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি। বাঙালির শহীদ দিবস এবং বিশ্বের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে শিশুদের পাঠ্যসূচিতে তো বটেই; এ ছাড়াও আছে এ বিষয়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। চাইলে যে কেউ এ সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত আর ইতিহাস জেনে নিতেই পারে। আমি বর্তমান রচনায় শহীদ মিনার সম্পর্কে সামান্য কিছু ভাবনার কথা উপস্থাপন করতে চাই।
কুমড়ো ফুলে ফুলে
নুয়ে পড়েছে লতাটা,
সজনে ডাঁটায়
ভরে গেছে গাছটা
আর, আমি ডালের বড়ি
শুকিয়ে রেখেছি,
খোকা তুই কবে আসবি।
কবে ছুটি?
-চিঠিটি তার পকেটে ছিলো,
ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।

“মাগো, ওরা বলে,
সবার কথা কেড়ে নেবে
তোমার কোলে শুয়ে
গল্প শুনতে দেবে না।
বলো মা, তাই কি হয়?
তাই তো আমার দেরি হচ্ছে।
তোমার জন্যে কথার ঝুড়ি নিয়ে
তবেই না বাড়ি ফিরবো।
লক্ষ্মী মা রাগ করো না,
মাত্র তো আর কটা দিন।”

“পাগল ছেলে”
মা পড়ে আর হাসে,
“তোর ওপর রাগ করতে পারি।”

(কুমড়ো ফুলে ফুলে ॥ আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ)
কবির এই কবিতার পঙক্তি বলে দেয় ভাষা আন্দোলনের প্রভাব কতদূর বিস্তৃত ছিলো। নিভৃত পল্লীর এক
স্নেহশীলা নারীও ভাষার জন্যে আত্মত্যাগের মহিমায় আলোড়িত হয়েছিলেন নিজের শহরবাসী সন্তানের রক্তের বেদনায়। আবার আমরা যদি আলাউদ্দিন আল আজাদ-এর কবিতা পড়ি-
স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার? ভয় কি বন্ধু আমরা এখনো
চারকোটি পরিবার
খাড়া রয়েছি তো। যে-ভিৎ কখনো কোনো রাজন্য
পারেনি ভাঙতে
হীরার মুকুট নীল পরোয়ানা খোলা তলোয়ার
খুরের ঝটিকা ধুলায় চূর্ণ যে-পদপ্রান্তে
যারা বুনি ধান
গুণ টানি, আর তুলি হাতিয়ার হাঁপর চালাই
সরল নায়ক আমরা জনতা সেই অনন্য।

ইটের মিনার
ভেঙেছে, ভাঙুক। ভয় কি বন্ধু, দ্যাখো একবার আমরা জাগরী
চারকোটি পরিবার।

এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
শিয়রে যাহার ওঠে না কান্না, ঝরে না অশ্রু?
হিমালয় থেকে সাগর অবধি সহসা বরং
সকল বেদনা হয়ে ওঠে এক পতাকার রং।

এ-কোন মৃত্যু? কেউ কি দেখেছে মৃত্যু এমন,
বিরহে যেখানে নেই হাহাকার? কেবল সেতার
হয় প্রপাতের মোহনীয় ধারা, অনেক কথার
পদাতিক ঋতু কলমেরে দেয় কবিতার কাল?

ইটের মিনার ভেঙেছে, ভাঙুক। একটি মিনার গড়েছি আমরা
চারকোটি কারিগর
বেহালার সুরে, রাঙা হৃদয়ের বর্ণলেখায়।

(স্মৃতির মিনার ॥ আলাউদ্দিন আল আজাদ)
আলাউদ্দিন আল আজাদ-এর এ কবিতায় বাঙালির চেতনার ঠিকানা খুঁজে পাই, আনন্দ-বেদনা খুঁজে পাই। বাঙালির সেই স্মৃতির মিনার পাকিস্তানি দুঃশাসন ভেঙে দিয়েছিলো ১৯৫২ সালে, সেই কষ্টের কথাই উচ্চারিত হয়েছে এ কবিতায়। কিন্তু মানুষের চেতনাকে অতটা সহজে গুড়িয়ে দেয়া যায় না; গুড়িয়ে দেয়া যে যায় না, পাকিস্তানি দুঃশাসন তা প্রত্যক্ষ করেছে ১৯৭১ পর্যন্ত। ঢাকার ফজলুল হক হলের প্রাঙ্গণে ভেঙে ফেলা বাঙালির চেতনার মিনার ছড়িয়ে গেছে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায়।
১৯৭১-এ বাঙালি যখন বঙ্গবন্ধুর আহবানে বুলেটের সামনে বুক পেতে দাঁড়িয়েছে পাকিস্তানি নৃসংশতার বিরুদ্ধে; যখন ২৫ মার্চ রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে নিরস্ত্র অসহায় ঘুমন্ত মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন বিশ্ব দেখেছে হানাদার বাহিনি নির্বিচারে মানুষ হত্যার পাশাপাশি গুড়িয়ে দিয়েছে আমাদের চেতনার ‘শহীদ মিনার’। ১৯৭১-এ একনদী রক্তের বিনিময়ে আমরা বিজয় অর্জন করেছি, পতাকা অর্জন করেছি, অর্জন করেছি নিজেদের স্বাধীন ভূ-খণ্ড; পাশাপাশি আমরা অর্জন করেছি আমাদের চেতনার শহীদ মিনার। আমাদের এ অর্জন কিছুতেই অকিঞ্চিৎকর নয়! আমাদের রক্তে কেনা প্রতিটি অর্জনকে বাঁচিয়ে রাখতে বাঙালির প্রতিটি সন্তান দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হবে এই প্রত্যাশা যে কোনো শুভচেতনা সম্পন্ন বাঙালির। বাঙালির শহীদ মিনার সম্পর্কে চেতনার স্তরটি বুঝতে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি নাটকের একটি সংলাপের কথা স্মরণ করছি:
এই যে শহীদ মিনার–এ মিনার বাঙালির চেতনার মিনার; এ মিনারের দিকে তাকিয়ে আমরা আমাদের কষ্ট দেখি, আমাদের আনন্দ বেদনা দেখি, এ মিনার আমাদের অহংকারের মিনার; আমার সন্তান বিপ্লবকে তাই শৈশবেই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম এ মিনারের সাথে। [পজ] বাবা বিপ্লব। তুমি বিপ্লব জেনে মরে যাবার আগে আমার ভালো লাগছে। আমার বিপ্লবকে আমি হারিয়ে ফেলেছি সত্যি
কিন্তু তোমার চোখে আমি স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি!

(দীর্ঘ দুঃসময় ॥ ফরিদ আহমদ দুলাল)

সামান্য দৃষ্টি দিলেই আমরা দেখবো, ২১ ফেব্রুয়ারি টেলিভিশনের পর্দায় অথবা ২২ ফেব্রুয়ারি পত্রিকার পাতায় গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত হচ্ছে একুশের প্রহরে প্রহরে শহীদ মিনারে মানুষের ঢল। স্মরণকালের উপচেপড়া ভিড়, জাতি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করছে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের। মিডিয়ার এসব দৃশ্যাবলী আমাদের আশান্বিত করে, আমাদের উজ্জীবিত করে, স্বসংস্কৃতির প্রতি জাতির এই সশ্রদ্ধ অভিবাদন যেনো কানে কানে বলে যায়–

নক্ষত্রপুঞ্জের মতো জ্বলজ্বলে পতাকা উড়িয়ে আছো আমার সত্তায়
………………
আমার এ অক্ষিগোলকের মধ্যে তুমি আঁখি-তারা
যুদ্ধের আগুনে,
মারীর-তাণ্ডবে,
প্রবল বর্ষায়
কি অনাবৃষ্টিতে,
বারবণিতার
নূপুর নিক্বণে,
বণিতার শান্ত
বাহুর বন্ধনে,
ঘৃণায় ধিক্কারে,
নৈরাজ্যের এলো-
ধাবাড়ি চিৎকারে
সৃষ্টির ফাল্গুনে
হে আমার আঁখিতারা তুমি উন্মীলিত জাগরণে।
তোমাকে উপড়ে নিলে, বলো তবে, কী থাকে আমার?
উনিশশো বাহান্নোর কতিপয় তরুণের খুনের পুষ্পাঞ্জলি
বুকে নিয়ে আছো সগৌরবে মহীয়সী।
সে-ফুলের একটি পাপড়িও আজ ছিঁড়ে নিতে দেবো না কাউকে।

(আমার দুঃখিনী বর্ণমালা/ শামসুর রাহমান)

কিন্তু বাস্তবতা কী। যদি গভীরে দৃষ্টি দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়, বোঝা যাবে; গণজোয়ারের এই প্রাবল্যের কারণ চেতনার উজ্জীবন নয় বরং সৌজন্য-আনুষ্ঠানিকতা, ভিড়ের প্রতি আত্মসমর্পণ। যে ভিড়ে নেই প্রেমের গভীরতা, নেই অঙ্গিকারের নিবেদন, নেই ব্রতের প্রতি আত্মোৎসর্গের অহংকার, নেই সংযম-নৈবেদ্যনিবেদন। ভিড় হারিয়ে যাবার সাথে সাথে হারিয়ে যায় আবেগ; ভিড় যেন জোয়ারের জল, ক্ষণকাল থৈ থৈ চঞ্চল অতঃপর সুনশান নীরবতা-ধু-ধু মরু বিস্তীর্ণ বালুচর। এ যেন প্রেম নয়, মেকি পরকীয়া।
যে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য দিয়ে নিবেদনের আলোড়ন–শ্রদ্ধা প্রদর্শনের ঘনঘটা, সেই শহীদ মিনারই সারাবছর হয়ে হয়ে থাকছে অবহেলার ইট-সিমেন্টের পরিত্যক্ত অঞ্চল, প্রাকৃতিক ক্রিয়াদি সারার প্রকৃষ্ট আড়াল! দু’চারটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাস্তব চিত্র এমনই। আজকের এই প্রবল সংকটের বিষয়টি কবি শামসুর রাহমান আগেই উপলব্ধি করেছিলেন, তাই হয়তো তিনি তার একই কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন–
এখন তোমাকে ঘিরে উতল বেলেল্লাপনা চলছে বেদম,
এখন তোমাকে নিয়ে ঘিরে খিস্তি-খেউড়ের পৌষমাস।
তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো,
বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা।

(আমার দুঃখিনী বর্ণমালা/ শামসুর রাহমান)
আমার পর্যবেক্ষণ যদি ভুল না হয়, এবং এ বিপর্যয় থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যদি জাতির জন্যে জরুরী বিবেচি হয়, তাহলে অনতিবিলম্বে বিষয়টিকে বিবেচনায় এনে কিছু কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যিক মনে করি; এবং এ আবশ্যিকতার উদ্যোগ হবে ত্রিপাক্ষিক। প্রথমপক্ষ সরকার, দ্বিতীয়পক্ষ স্থানীয় সামাজিক নেত্রীবৃন্দ ও স্থানীয়সরকার বিভাগ এবং তৃতীয়পক্ষ শিল্প-সাহিত্য অঙ্গনের আত্মনিবেদিত কর্মীকুল। ভাবনার বিষয়টিকে অর্থবহ করতে সামান্য কিছু কর্মপ্রস্তাব এখানে উপস্থাপন করছি; আমার এ কর্মপ্রস্তাবকে পর্যালোচনা, সংযোজন-বিয়োজন করে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ এবং ফলপ্রসু কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করে সমাজকে বিজ্ঞানমনষ্কতার পথে, প্রগতির পথে এগিয়ে নেয়া যেতে পারে; সমাজে আজ যে কূপমণ্ডুকতা আর ধর্মান্ধতার আবহ বিরাজ করছে তা থেকে জাতিকে পরিত্রাণ দেবার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। অবশ্য বর্তমান নিবন্ধকারে মনে যথেষ্ট সংশয়, বিড়ালের গলায় ঘন্টাটা বাঁধবে কে? বিশেষকরে নীতিনির্ধারকদের সিংহভাগ যখন কূপমণ্ডুক-ধর্মান্ধ এবং কাণ্ডজ্ঞানহীন! কূপমণ্ডুকতাকে তারা আশ্রয় ভেবে বসে আছে। আশাবাদ যেটুকু, তা হচ্ছে আত্মনিবেদিত সংস্কৃতজন, যারা আজও মানুষের কল্যাণ চিন্তায় ‘ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে চলেছেন।’ আমার মতো একজন অযোগ্যের প্রস্তাবে যদি সামান্য আশার আলো থাকে, তাতে আপনাদের সংঘবদ্ধতার শক্তি যোগ করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলুন। সমাজের প্রাগ্রসর শ্রেণি যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে সোচ্চার হতে পারেন, তাহলে সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসন আমাদের সাথে একাত্ম হতে বাধ্য হবেন। ১৯৭১-এ যে জনযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা লক্ষ প্রাণের রক্তের বিনিময়ে দেশমৃত্তিকাকে শত্রুমুক্ত করেছিলাম, সেই শক্তিকে যুক্ত করতে হবে বাঙালির চেতনার প্রতীক শহীদ মিনারের সম্ভ্রম রক্ষার্থে।
জাতীয় ঐক্য এবং সামাজিক অগ্রযাত্রার স্বার্থে শহীদ মিনারের পবিত্রতা ও সম্ভ্রম রক্ষার্থে করণীয়–
ক. প্রত্যেক জেলায়-উপজেলায় শহীদ মিনারকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হোক একটি সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স, যে কমপ্লেক্সে মুক্তমঞ্চ, মিলনায়তন, পাঠাগার, বিপনীবিতান ইত্যাদি থাকবে।
খ. সাংকৃতিক কমপ্লেক্স পরিচালনার জন্য আপাতত একটি অবৈতনিক কমিটি কাজ করবে।
গ. মিলনায়তনে নিয়মিত দর্শনীর বিনিময়ে ভালো ছবি প্রদর্শিত হবে।
ঘ. মিলনায়তনে যেসব নাটক অভিনীত হবে তার টিকিট বিপনীবিতানের প্রত্যেক দোকান বাধ্যতামূলকভাবে কিনবেন।
ঙ. সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে বিভিন্ন জাতীয় দিবস সমূহ উদযাপিত হবে এবং বছরে ন্যুনতম ১০টি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে, এবং প্রতি বছর দশ সেমিনারের নির্বাচিত প্রবন্ধ নিয়ে (জেলাভিত্তিক) একটি সংকলন প্রকাশ করা হবে এবং সারাদেশের সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হবে।
চ. প্রতিবছর উপজেলা পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে, এসব প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্য হবে, নতুন প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনষ্ক হিসোবে গড়ে তোলা।
ছ. বার্ষিক বাজেটের সংস্কৃতি খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দিতে হবে।
জ. সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স-এ এলাকার বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানাদি স্বল্প ভাড়ার বিনিময়ে বাস্তবায়িত হতে পারে।
ঝ. সাংকৃতিক কমপ্লেক্স-এর যাবতীয় আয়ের অর্ধেক কমপ্লেক্সের উন্নয়ন কাজে ব্যয়িত হবে। বাকি অর্ধেক কেন্দ্রে প্রেরণ করা হবে; অথবা সবটাই কমপ্লেক্সের কাজে ব্যয় করা যাবে।
ঞ. শহীদ মিনার এবং ভাষাশহীদের স¤পর্কে কেউ অশোভন অথবা অমর্যাদাকর উক্তি করলে তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে।
সত্যি যদি আমরা দেশমাতৃকার কল্যাণ চাই তাহলে, কেবল বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা না আওড়ে বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক, অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে এমন এক সময় আসবে যখন বাংলা দেশের মাটিতে বিজ্ঞানমনষ্কতা, প্রাগ্রসর চিন্তা, বুদ্ধির মুক্তি ইত্যাদি শব্দ উচ্চারণ দ-ণীয় হয়ে যাবে; আমাদের স্বাধীন দেশে মানুষের সামাজিক-রাজনৈতিক এবং মননের মুক্তি হয়ে উঠবে সুদূর পরাহত। বাঙালির এত দিনের লড়াই-সংগ্রাম হবে অর্থহীন। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম! জয় বাংলা!’ অমোঘ উচ্চারণ হবে ভূলুণ্ঠিত।

Flag Counter


1 Response

  1. প্রত্যেক জেলা-উপজেলায় একেকটা সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের বাজেট হবে এক দেড়শ কোটি টাকা, ২০/২৫ কোটি টাকা খরচ করে বাকিটা মেরে দেয়া হবে। তৈরির দুএক বছরের মধ্যে ছাদ ধসে পড়বে, কমপ্লেক্স পরিচালনার দায়িত্ব নেবে ছাত্রলীগ/যুবলীগ। এটি চালানোর নামে শুরু হবে দেদারসে চাঁদাবাজি। জাতীয় দিবস উদযাপনের নামে হবে কেবল জাতীর পিতার জন্মদিন, মৃত্যুদিবস, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন। বছরে ন্যুনতম যে ১০টি সেমিনার হবে, তার বিষয় হবে কারা শেখ মুজিবর রহমানকে মারলো, কারা ঐ সময় সব সুযোগ সুবিধা পেলো, এ জাতীয়…, এবং (জেলাভিত্তিক) এর সংকলন প্রকাশের নামে শুরু হবে আরেক দফা চাঁদাবাজি। এদেশের ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সব কেবল দরিদ্র আমজনতার জন্য। সরকারের আমলা, ক্ষমতাসীন দলের লেজুড় বা ব্যাংক লুটেরাদের কোন চেতনাই ছোঁয় না। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হবার পর দেশটার মালিকানা কিভাবে কিভাবে যেন চলে গেছে একদল দানবের হাতে। ৯০% সরকারি আমলা, পুলিশ, শিক্ষক বা রাজনীতিবীদ আজ একেকটা মানুষের মুখোশ পরা দানব। দিনে দিনে ঝাড়ে বংশে তারা বাড়ছে আর বাড়ছে। এই দানবকূলের কাছ থেকে মনুষ্যত্বের আশায় আশায় দিন পার করছি বোকা আমরা!! সরকারি কর্মচারি, আর ক্ষমতাসীনরা ছাড়া দেশের অন্যরা কি মানুষ!! আহা আইনের শাসন!! আহা স্বাধীনতা!! আহা চেতনাবাজির ব্যবসা!!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.