কবিতা

তারিক সুজাতের কবিতা: কালের ক্যাসিনো থেকে

তারিক সুজাত | 18 Feb , 2018  

শরণার্থী

যে প্রহরে আলোছায়া খুলে দিচ্ছে
আকাশদুয়ার
তুমি কি তখন গভীর ঘুমের অতল থেকে
পাঠিয়েছিলে
স্বপ্নধোয়া সফেদ চাদর;
ঢেউয়ের চূড়ায় ডানা মেলে
ঝাঁকে ঝাঁকে ওড়ে পাখি
মেঘে মেঘে স্রোত উঠেছে
দে দোল দোলায় …
আকাশ জুড়ে নীল বালুচর
শাদা মেঘের বসতবাড়ি
ভাসতে ভাসতে তুমি এলে– এই আঙিনায়
ভাসতে ভাসতে তুমি এলে, দলে দলে
আমরা তখন খুলে দিচ্ছি
পাহাড়ঘেরা সকল সবুজ …
তুমি আমার যমজ-প্রহর
ভেসে আসা শরণার্থী-দিন
যশোর রোডে ফেলে আসা
ভয়ার্ত চোখ, বিবর্ণ মুখ!

আমার অতীত মিশে আছে তোমার খুনে
তুমি আমার অতীত থেকে
ফিরে আসা পদ্মাবতী
ও আলাওল, ও দৌলত কাজী
আরাকানে রাজসভা নেই,
নেই তোমাদের বসতবাটি
বাহাদুর শাহ’র দীর্ঘশ্বাসে
নির্বাসিতের ললাটলিপি
আছে মিশে, আছে মিশে
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভেসে আসে শিশুর শরীর
ভাসতে ভাসতে তুমি এলে, দলে দলে
যে প্রহরে আলোছায়া খুলে দিচ্ছে
আকাশদুয়ার
রক্তেভেজা বর্ণমালা বেদনার পাণ্ডুলিপি
কেন তুই আবার এলি?
আজও তো শেষ হলো না শিশুটির
শরণার্থী-দিন
টেকনাফ থেকে বেথেলহেম সবই তোর মাতৃভূমি
এতো পথ পাড়ি দিয়েও কান্না তোর মাতৃভাষা!

কবরগুলো কেমন আছে
[মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে একুশে পদকপ্রাপ্তদের জন্য
নির্ধারিত জায়গায় অযত্নে রক্ষিত কবরগুলো দেখে আসার পর
]

ফিরছি,
শহিদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানিয়ে
ফিরছি, ফিরছি
আমাদের নিজ নিজ
আলোর ভুবনে;
‘সর্বশেষ সংবাদ’ স্ক্রল থেকে
যেভাবে খবরগুলো দ্রুত সরে যায়
সর্বস্তরের নাগরিকবৃন্দ
শোকবইয়ের শূন্য পাতা
গান স্যালুট শেষে ভারী বুটগুলো
মিলিয়ে যাচ্ছে ব্যারাকের দিকে
ফুল, ফুল আর ফুল
লাল সবুজ পতাকা
ফ্রোজেন ভ্যান, ওভি ভ্যান
রিপোর্টারের কলম, ছবির মহড়া
ফিরে যাচ্ছে মোবাইল ও মুভি ক্যামেরা
জাতির শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে
এ নগর– নগরপিতা
সেই যে ফেরাল মুখ
আর তো এমুখো হলো না!
মুখোশের আড়ালে
অপসৃয়মাণ মুখগুলো
ধূসর দিনের শেষে
রহস্যময় গোধূলি আলোয় মিশে যায়।
যে জীবন জনযুদ্ধে জ্বেলেছে আগুন
নিজেকে নিঃস্ব করে যার দানে
সারি সারি উঠেছে দালান
যার কণ্ঠে জীবনের জয়গান শুনে
পত পত ওড়ে লাল-সবুজ পতাকা…
স্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার
মৌন দাঁড়িয়ে থাকে।
হায়!
তোমাদের সাইরেন বাজানো,
গানম্যান আর মনোগ্রাম-খচিত
গাড়ির জানালা থেকে বের করা হাতে
রঙ-বেরঙের বাতির ঝলকানি!
এই ব্রতচারী, এই ভাষাসংগ্রামী
এই মুক্তিযোদ্ধা, এই দেশপাগল ঘরছাড়া মানুষগুলোর
চোখ থেকে ঠিকরে পড়া দ্যুতির কাছে
ম্লান মনে হয়!
কবরের ঘাসে ঘাসে
ভিড় করে বিষন্ন বর্ণমালা
আমাদের গৌরবগাথাগুলো
শেষ পর্যন্ত করপোরেশনের হিসেবের খাতায় ওঠে!
মৃতলোকে মনে পড়ে কবির সেই বাণী
‘বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি’
অদ্ভুত আঁধারে
চেনা মুখটিকে
বড় বেশি অচেনা মনে হয়!

আক্কু

এক টুকরো বাংলাদেশ
চোখ মেলে পোখরায়
চাটগাঁর ঘন সবুজ অরণ্য আর পাহাড়ের পটভূমি
শৈশবের নীলাকাশ, কৈশোরের কথামালা
দারুণ দীপ্তিতে প্রজ্জ্বলিত নয় মাস
১৯৭১
প্রশিক্ষণশিবির দেরাদুন, রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গন
অবরুদ্ধ গ্রামগঞ্জ, মুক্তাঞ্চল
কাঁধে স্টেনগান, শাদা হাফশার্ট
সহযোদ্ধার প্রিয়মুখ সব আছে
এই হিমালয়-দুহিতা পোখরায়
৫ সেগুনবাগিচা
কথা বলে ওঠে–
আক্কু, আক্কু ডাকি
জয়বাংলা
ফিরে আসে প্রতিধ্বনি হয়ে।

প্রহরগুলো প্রহরে নেই

৩২.
দুপুর তোমাকে
খুঁজে খুঁজে
ভাসি, ভাসাই তরী
ভিন্ন আলোয় ছিন্ন মেঘে
রোদের জানালা
আলো ঝিলমিল অথৈ প্লাবনে
পাখা মেলে ওড়ে

আজ ক’টা দিন
আরও কতো বেলা
আমার সকাল
ফুল হয়ে ফোটে
রঙধনু রঙে …

এখানে আকাশ
আলোর পাত্র– পূর্ণ দুপুর রোদে।

৩৩.
দেখা দিও,
নক্ষত্র তো দূরে থেকেও
আলো ছড়ায়
হে আলোর অতিথি
শিল্পের সংসারে
দগ্ধ বাউলিনী
তোমার আঙুলে
অজস্র জীবন বেজে ওঠে
একতারায়!

৩৪.
আমি আঁকলাম
আলোর মিছিল,
ঊষাকালে মৌন মুখ
সাঁঝবেলা
ছিল না কারও
প্রত্যাশিত,
পথে পথে পাপ
অন্ধকার
কালের প্রবাহ
হে পথিক,
তুমিও কি রোদ ঝলসানো দিনে
যুদ্ধ যুদ্ধ কালে, অভিন্ন সকালে
শান্তির বারতা নিয়ে
মৌনমিছিলে সামিল হয়েছো?

৩৫.
কী করে
বাঁধি
দূরত্ব যে
আলোর আয়নায়
ডুবসাঁতারে ভাসে।

কী করে
ভাসি
নিকটের টান
মিহিসুতোয় বোনা
সময়ের জালে
সাতপাকে বাঁধা।

৩৬.
দুপুরের দেখা নেই
রাতদুপুরেও অপেক্ষায় জেগে থাকে
নিদ্রাহীন চোখ–
গাঢ় অন্ধকারে ডুবসাঁতারে
চেনাজানা পৃথিবীর অন্তরালে
আমার দুপুর
ও দুপুর,
এই ঘুম ঘুম প্রহরে একবার ভেসে ওঠো
তোমার আঙুল থেকে টুপটাপ
গড়িয়ে পড়ছে যে আঁধার,
তারই স্পর্শে জন্ম নেয় সকাল …
তোমার সকাল আদিম রাত্রির ঠোঁটে ঠোঁট রেখে
দিগন্তরেখায় আলো হয়ে ফোটে।

৩৭.
জানা ও না-জানা
অচেনাকে চেনা
যতটুকু প্রকাশিত
তার চিহ্ন ছুঁয়ে ছুঁয়ে
খালি পায়ে হাঁটছে সকাল
সুদূরের শান্ত সবুজে
দিগন্তকেও বুকে টেনে আনি,
না-জানার নির্ভার আহ্বানে
অবাক সকাল মিশে যাচ্ছে
প্রসন্ন দুপুরের খোলা দরোজায়।
তুমি ঘর, আলোর উঠোন
ভিতর-বাহির তোমাতেই লীন,
এই আলিঙ্গনে বন্দি হওয়ার নাম স্বাধীনতা
তোমার জন্য এনেছি আমার আজন্ম সূর্যোদয়।

৩৮.
দুপুর, ও দুপুর
ও আমার প্রাণপাখি,
যে খাঁচায় তোমাকে বেঁধেছি
তার সবদিকে আলো
তবু অন্ধকারে
খোলা একটি জানালা
দু’হাত বাড়িয়ে ডাকে,
বন্দি এ পৃথিবী
ওড়েনি অনেকদিন
এসো, সকালের ছিন্নডানা জোড়া দিই
আরও একজনম একসঙ্গে উড়ি।

৩৯.
অনন্ত তোমার যাত্রাপথ–
কত সকাল দিতে হবে পাড়ি
শিশুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে
দুপুরের কোলে উঠে
কান্না জুড়ে দিলে,
দুপুর, ও দুপুর
দোলনায় দোল দিয়ে দিয়ে
অবুঝ সকালটাকে
ঘুম পাড়াবে না!
রাতজাগা পাখিসব
ফেরে–দুপুরের নীড়ে।

৪০.
আছো কি নেই,
জানি– জানি না!
যতটা জেনেছি
যতটুকু পড়েছি আলোর অক্ষর
ঝলমল মুক্ত আকাশে
সেটুকুই শুদ্ধ মন্ত্র,
গাঢ় নিঃশ্বাসে রৌদ্রের ঘ্রাণ নিয়ে
নিঃশব্দ পায়ে পায়ে এসেছি সকাল
দুপুরের গভীরে
যে অবিরল স্রোত
তার সাথী হয়ে ভাসি!

(এই বইমেলায় প্রকাশিতব্য কবি তারিক সুজাতের কাব্যগ্রন্থ কালের ক্যাসিনো থেকে )
Flag Counter


2 Responses

  1. Tithi says:

    অসাধারণ!!

  2. মোঃ মেজবাহ উদ্দিন says:

    একটা ভিন্ন স্বাদের ভালো লাগা আছে লেখগুলোয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.