arts.bdnews24.com » সুরমা জাহিদ: আমি আমার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি

সুরমা জাহিদ: আমি আমার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি

শিমুল সালাহ্উদ্দিন | ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ১২:২৪ অপরাহ্ন

ভূমিকা ও সাক্ষাৎকার: শিমুল সালাহ্উদ্দিন

অন্য অনেকের মতোই, ঊনপাঠক আমি, সুরমা জাহিদের নাম এবারই প্রথম শুনলাম। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তির পর। এবং তাকে পাঠ করার পর মনে হলো, আমাদের অগোচরে কত মানুষ যে নিভৃতে কত অমূল্য কাজ করে চলেছেন, তাদেরই একজন তিনি। রক্তক্ষয়ী এক মুক্তিসংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্বাধীন দেশ পেয়েছি আমরা, অন্তত দুই লক্ষ নারীর সম্ভ্রমও হয়েছে লুট। বঙ্গবন্ধু তাদের দিয়েছিলেন সান্মানিক বীরাঙ্গনা উপাধী। ডেকেছিলেন বোন বলে। কিন্তু এই সমাজে এখনো অনেক বীরাঙ্গনাই বেঁচে আছেন কায়ক্লেশে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে, তাদের সাথে কথা বলেছেন সুরমা জাহিদ। লিখেছেন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে একাধিক বই। সেসব বইয়ে তাদেরই জবানীতে উঠে এসেছে একাত্তরে নির্যাতনের শিকার মানুষদের রোমহর্ষক বর্ণনা। তাদের ভয়ানক বেঁচে থাকার দলিল, নিঃসন্দেহে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেরই আরেক অধ্যায়। ১৯৯৭/৯৮ থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত সুরমা জাহিদ কাজটি অবিরত রেখেছেন। সহজ সরল নির্মোহ এই মানুষটির সাথে আলাপে তার সারল্য গভীরভাবে স্পর্শ করেছে আমাকে। সুরমা জাহিদের জন্ম নরসিংদীর রায়পুর থানার রাজাবাড়ি গ্রামে ১৯৭০ সালের দশই অক্টোবর। পিতা মরহুম আলফাজ উদ্দিন আহমেদ, মাতা আম্বিয়া আকতার, স্বামী মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন। দুই সন্তানের এ জননী বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য।

মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য বিভাগে এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়ে একেবারেই স্বল্পপরিচিত লেখক থেকে আলোচিত সাহিত্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন বর্ষিয়ান মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সুরমা জাহিদ।

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্লামালিকুম আপা, শুভসকাল। কেমন আছেন?
সুরমা জাহিদ: জ্বী,আসসালামু আলাইকুম, ভালো আছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: স্যরি আপা, ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেলো।
সুরমা জাহিদ: না ঠিক আছে, আপনার ফোনের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। (পাশে শিশুর কান্নার শব্দ)
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার নাতী মনে হয় উঠে গেছে, এখন আমরা কথা বলতে পারবো তো?
সুরমা জাহিদ: এখন কথা বলা, আহা, ও তো উঠে গেছে। ঘুমিয়েছিলো একটু আগে। যখন ঘুমায় তখনি আপনাকে ফোন করতে বলেছিলাম। ওর শব্দে কী সমস্যা হবে?

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: না আপা, আমরা কথা বলতে পারি, কোন সমস্যা না থাকলে। ওকে রাখার কেউ আছে তো, তাই না?
সুরমা জাহিদ: হ্যাঁ, বলেন, সমস্যা নেই, কথা বলতে পারি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: তাহলে শুরু করি আপা?
সুরমা জাহিদ: জ্বী জ্বী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: প্রথমেই আপনাকে অনেক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি, আপনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য শাখায়, এবং আপনার একটি অসামান্য বই, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে, তাকে বাংলা একাডেমি বিবেচনায় নিয়েছে, এবং আপনি পুরস্কারটা পেয়েছেন। এবং এর কারণে আপনি একটা অপরিচিত নাম থেকে আলোচিত নামে পরিণত হয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচুর কথা, চেনা-অচেনার আলাপ আছে, এটা নিয়ে। এ পুরস্কারের কারণেই আলোচিত হয়ে ওঠা। আপনার কেমন লাগছে এখন?
সুরমা জাহিদ: আসলে যে অনুভূতিটা, আমি অবশ্যই বাংলা একাডেমিকে কৃতজ্ঞতা জানাই। আর আমার যে অনুভূতিটা না, তা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু বলতে পারছি না। এতোটাই আনন্দিত আমি,যা প্রকাশ করার মতো নয়। আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি তাদের প্রতি, যাদের নিয়ে আমি এ কাজটা করেছি। যারা বীরমাতা তাঁদের আমি স্মরণ করছি আজকে আমার এই প্রাপ্তির দিনে। তাঁরা যদি আমার সাথে খোলামেলাভাবে কথা না বলতেন, এমনিতেও যদি কথা না বলতেন, তাহলে হয়তো কাজটা করাই সম্ভব হতো না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপা, আপনি, অনেক অনেক বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমরা দেখতে পাচ্ছি, এই কাজটির পরিকল্পনা আপনি প্রথম কবে করলেন?
সুরমা জাহিদ: আমি আসলে শুধু বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে ছোটবেলা থেকেই শুনতাম, আমার আব্বা, দাদা, চাচা ওদের কাছে, সবসময়ই গল্প শুনতাম। তারপর আস্তে আস্তে বড় হলাম। দেখলাম একটু বড় হতেই যে, একটা শব্দ আসছে বীরাঙ্গনা, ঐখানে আসলেই, ঐ শব্দটা আসলেই সবাই কেমন চুপ হয়ে যেতো। তখন ছোট। আরেকটু বড় হওয়ার পরে আমার আব্বাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম বীরাঙ্গনা কী, তাঁরা কারা? ঐ সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। তখন আব্বু বলেছে, তুমি বড় হও, আস্তে আস্তে নিজেই জানবে। যখন বড় হলাম, জানতে পারলাম, আমার একটা অনুসন্ধানী মন জানতে চাইলো, কী এমন কষ্ট তাদের, যা আমি ছোটবেলায় জানতে পারি নাই। কি ছিলো বাস্তবের ঘটনাগুলো, এই প্রশ্নগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো। নিজেকেই প্রশ্নগুলো করতাম। জানার জন্য নানা খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম আমি। পেলাম না কোন জায়গায় কোন সন্ধান। লেখালেখি যারা করেন তাদের কাছে জানতে পারলাম ডক্টর নীলিমা ইব্রাহিম এ বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। ওনার বই পেলাম, পড়লাম। তবে ওনার বইয়ে তো তেমন কিছু, মানে নাম ঠিকানা নেই, কন্টাক্ট থাকবে না, থাকার কথাও না!
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি বীরাঙ্গনা বলছি—
সুরমা জাহিদ: জ্বী, আমি বীরাঙ্গনা বলছি। তারপর ওনার সাথে আমি সরাসরি দেখা করলাম। ওনি এতোটাই আনন্দিত হয়েছিলেন যে আমি এ মুহূর্তে ঠিক বোঝাতে পারবো না। এমনকি উনি বিশ্বাসও করতে পারেন নাই যে আমি এ বিষয় নিয়ে কাজ করবো বা কাজ করতে পারবো। উনি আমাকে প্রচুর উৎসাহ এবং সাহস দিয়েছিলেন। বারবার উনি একটা কথা বলেছেন, এ কাজটা অনেক কঠিন, অনেক ধৈর্য্য ধরে করতে হবে, তুমি কাজটা করো, সময় নিয়ে, আদর দিয়ে কাজটা করো। উনি বলেছিলেন, তুমি যেহেতু এতো খুঁজে আমার কাছে আসতে পেরেছো, তুমি কাজটা পারবে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি নীলিমা আপার কাছে গিয়েছিলেন কত সালে?
সুরমা জাহিদ: এটা আপনার ৯৭/৯৮ এর দিকে। তখন ওনি আস্তে আস্তে অসুস্থতার দিকে চলে যাচ্ছেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: ওনি তো ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলেন!
সুরমা জাহিদ: জ্বী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সুরমা আপা, আপনি তাহলে ৯৮/৯৯ থেকে এই সাক্ষাৎকার নেয়ার কাজটা সিরিয়াসলি শুরু করেছেন!
সুরমা জাহিদ: জ্বী।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আমি দেখলাম যে আপনি বিভিন্ন জায়গায়, খুঁজে খুঁজে বীরাঙ্গনাদের বের করেছেন, এবং পেয়ে তাদের ইন্টারভিউ করেছেন। এই যে খুঁজতে থাকা সবসময়, তারপর গিয়ে তাঁদের সাথে কথা বলা, আপনি সাংবাদিকতামূলক একটি দীর্ঘসময়ব্যাপী কাজ করেছেন। জার্নালিস্টিক কাজ আসলে, সাংবাদিকতার একটা টুল আপনি ব্যবহার করেছেন।
সুরমা জাহিদ: জ্বী, এভাবে ছাড়া তো আর পথ ছিলো না কাজটা করার। নীলিমা আপাও এ পদ্ধতির কথাই বলেছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনার সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়েছে কাকে খুঁজে বের করতে?
সুরমা জাহিদ: কষ্ট হয়েছে আপনার, প্রায় প্রত্যেককে খুঁজে বের করতেই। বেশিরভাগজন তো পরিচয়ই গোপন করে ফেলেছেন প্রায়। আমি ওদের কথা বলি, যারা খারাপ অবস্থায় আছে। সেটা হলো, কুমিল্লার, আমার কিন্তু সব নাম এ মুহূর্তে মনে নাই—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: সেটা না থাকারই কথা, আপনার বইয়ে তো আপনি লিখেছেনই, মানুষ বই পড়বে, এতো জনের সাথে এতো দীর্ঘসময় ধরে কাজ করেছেন—
সুরমা জাহিদ: জ্বী, তো কুমিল্লায় একজন আছেন, ওনার ঘটনা তীব্র কষ্টের, তখন উনি অনেক ছোট ছিলেন, ওনাকে এমন অত্যাচার করা হয়েছে বেঁধে রেখে যে, ওনার যে কোমরের জয়েন্টটা, সেটা ডিসপ্লেস হয়ে যায়। উনি দীর্ঘসময় হাঁটাচলা করতে পারেন নাই। তাঁকে উদ্ধার করার পর স্থানীয় ডাক্তাররা বলেছেন, প্রথমে সাময়িকভাবে ভালো হবে, তারপর ঢাকা নিয়ে যান, ভালো চিকিৎসা না হলে ভবিষ্যতে অসুবিধা হবে। তখন ওনার চিকিৎসা করার মত মন মানসিকতা সহায় সম্বল কোনটাই হয়তো ছিলো না, না থাকারই কথা, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে, সময় সুযোগও কম ছিলো, সেসময় তো আর চিকিৎসাটা হয় নাই, না হওয়াতে, তাঁর বিয়ে হয়, বিয়ে হওয়ার পরে, মেয়েও হয়, তবে সে হাঁটাচলা করতে পারছে না। সংসারে, তখন তাঁর হাজব্যান্ড আরেকটা বিয়ে করে, আমি জাস্ট উদাহরণ দেয়ার জন্য দিচ্ছি, তাঁদের বাড়িতে অনেক গ্রামের ভিতরে তখন তিরিশ-পয়ত্রিশটা গরু, রঙিন টিভি, মানে ধনী তাঁরা, বলতে গেলে বলা যায়, গৃহস্থ পরিবার

শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বী, ধনী গৃহস্থ পরিবার—
সুরমা জাহিদ: জ্বী, জ্বী, জ্বী, তারপর সে আবার বিয়ে করে, বিয়ে করার পরে তাঁকে এমন একটা ঘরে রাখা হয়, একটাই ঘর তাঁর, সংসার তাঁর দুনিয়া তাঁর জগৎ, তাঁর সতীন আছে, তাঁর হাজব্যান্ড, ইচ্ছে করলে কিন্তু তাঁর কাছে একটা মানুষের খাবার ওনার কাছে কিছুই না, প্রতিদিন হয়তো ফেলাই যায়, আমি গিয়ে দেখলাম তাঁর পরিবার তাঁর জন্য কিছু করেন না, শুধু থাকার একটা ঘর দিয়েছে, থাকেন। যখন আমি প্রথম তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম, দেখি কী, হাঁটতে পারে না, সে যে ভিক্ষা করে খাবে সে উপায়ও নাই। কারণ তাঁর পায়ের অবস্থা খারাপ। ওরকম অবস্থা। তখন, তাঁর সাথে কথা বললাম, সবকিছু জানতে পারলাম। জানার পরে, খুবই কষ্ট হয়েছে আমার। আমি যেভাবেই হোক, ওনাকে কিছু সহযোগিতা করে ব্যাংকে একাউন্ট করে, যৌথভাবে আরেকজনের সাথে একটা একাউন্ট করে কিছু টাকা দিয়েছিলাম, মাসে মাসে যেনো তিনি তিন-চারহাজার টাকা পায়। কিছুদিন পরে আমার কাছে ফোন এসেছে, তাঁর হাজব্যান্ড প্রেসার দিচ্ছে এ টাকা তুলে তাঁর হাজব্যান্ডকে দিয়ে দিতে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। একদম আদর্শ পুরুষতান্ত্রিক আচরণ—
সুরমা জাহিদ: মানে এটা এজন্যই বললাম যে, অনেক সচ্ছল একটা পরিবার, তারপরও একজন বীরাঙ্গনার সাথে এই কাজটা করেছে। তারপরে মমতাজ আছেন, শ্রীপুরের, ওনার অবস্থা আরো করুণ। ওনাকে যখন টর্চার করা হয় তখন ওনার সাত-আটমাসের বাচ্চা ছিলো পেটে। পেটেই বাচ্চাটা মারা যায়। মরা বাচ্চাসহ হানাদাররা তাঁকে নির্যাতন করে। তখন গ্রামের মানুষ কেটে-টেটে তাঁর বাচ্চাটা বের করে, তাঁকে বাঁচানোর জন্য। ফলে তাঁর পায়খানা আর পেশাবের রাস্তা এক হয়ে যায়। দীর্ঘ চার-পাঁচবছর ঢাকা মেডিক্যালে বড় বড় কয়েকটা অপারেশন করেও ডাক্তাররা কিছুই করতে পারে নাই। তাঁর ভেতরে এতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তখন তাঁর পায়খানার রাস্তাটা পেটের, নাভির কাছে করে দেয়া হয়েছে। আমরা তো নির্দিষ্ট সময়ে বাথরুমে যাই, ওনার সবসময় পেটের কাছে কাপড়ে সেটা পড়তে থাকে। এটাতো বোঝেনই, এসব বলাও কঠিন, কত নির্মম অবস্থা—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বী। ভয়ানক। এরকম ভয়ানক অভিজ্ঞতাগুলোর মুখোমুখি যারা হয়েছেন, তাদের কাছ থেকে ফার্স্টহ্যান্ড অভিজ্ঞতাগুলো আপনি শুনেছেন, আপনি লিখেছেন, দারুণ কাজ, আপনার লেখালেখির দিকে তাকালে দেখি, আপনি ভ্রমণকাহিনী লিখেছেন, ‘দেখে এলাম সিঙ্গাপুর’, আপনার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে লাগাতার গবেষণা, সেখানে রয়েছে ‘বহির্বিশ্বে গণমাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ’, ‘আমরা যুদ্ধশিশু’, আপনি আদিবাসী বীরাঙ্গনাদের নিয়ে লিখেছেন, ‘এই সংগ্রামে আমিও আদিবাসী বীরাঙ্গনা’, মুক্তিযুদ্ধ ও বীরাঙ্গনাদের নিয়ে অনেক বই, মানে আপনি একাধিক বই আসলে এই গবেষণা ব্যবহার করে লিখেছেন, এসব কী প্রত্যেকটাই আলাদা আলাদা বই ? নাকি একই বইয়ের বিভিন্ন সংস্করণ?
সুরমা জাহিদ: না না, প্রত্যেকটাই আলাদা বই। আদিবাসী বীরাঙ্গনা যারা, তাদের নিয়েই ‘এই সংগ্রামে আমিও আদিবাসী বীরাঙ্গনা’ বইটা করা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা।
সুরমা জাহিদ: প্রত্যেকটা বইয়ে আলাদা আলাদা ঘটনা।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপা, আপনার লেখালেখির শুরু কবে? সেই সময় আপনার লেখক বন্ধু কারা ছিলেন?
সুরমা জাহিদ: আমার, আ! এইখানে একটু বলার আছে। আমি ছোটবেলায়ই লিখতাম, লিখে লিখে রেখে দিতাম। প্রকাশ করতাম না। লেখক বন্ধু তাই বলতে পারেন, নেই। এর আরেকটা কারণ, আমার ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর, আমার হাজব্যান্ড সরকারী চাকরি করেন, সেই সুবাদে আমাকে প্রচুর মফস্বল শহরে থাকতে হয় প্রথম, নতুন চাকরি, সেই সুবাদে। আর দুই বছর একবছর পরপরই বদলী, আমি যে কোথাও স্থায়ী হয়ে কিছু করবো সেটাও করতে পারি নাই। আমার বিয়ের পরে, ছেলেমেয়ে হওয়ার পরে আমি আবার পড়াশুনা শুরু করি। তার জন্য আমার যে লেখক-লেখিকা বন্ধু হবে, সেটা হয় নাই। আরো পরে, যখন গাজীপুর আমার হাজব্যান্ড বদলী হয়ে এলেন, তখন থেকে আমি ঢাকায় একটু আসা যাওয়া করি, গাজীপুর থেকেও কিন্তু ঢাকা অনেক দূরে, তারপর ঢাকায় আসার পরে, তখন থেকে আমি ঢাকার সাহিত্য জগতে একটু চলাফেরা করি, তাও খুব বেশি যে করতে পারছিলাম তা না। কারণ আমাকে ফিল্ডের থেকে কাজগুলি উঠিয়ে আনতে হচ্ছিল। আমি ফিল্ডের থেকে উঠিয়ে এনে তারপর সেটা লিখে, রেডি করা, আমাকে প্রচুর সময় দিতে হচ্ছিল। ফলে আমি যে খুব একটা বেশি আড্ডাবাজি করবো, লেখালেখি নিয়ে আড্ডা দিবো সেই সুযোগ পাই নাই। সাহিত্য অনুষ্ঠান বা মিটিং-এও তাই খুব একটা যাই নাই আমি। যাই, খুব কম। সময় সুযোগ হলে। আর বন্ধুর কথা তো বললেন, আমি একটা সময়ে নিয়মিত ইত্তেফাকে লিখতাম, তখন রাহাত খান ভাই উনি আমাকে মোটামুটি বেশ একটা সহযোগিতা করেছেন, এইটা একটা বিরাট সহযোগিতা পেয়েছি, আর মৎস্য অধিদপ্তরের মানুষদের কথা না বললে অন্যায় হবে, আমার স্বামী সেখানে কাজ করলেও, সেখানকার প্রায় প্রত্যেকটা মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে, যেহেতু আমার স্বামী ওখানে চাকরি করেছে, প্রত্যেকটা জেলায় উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের অফিস আছে, আমি একজন মহিলা মানুষ, সবসময় সবজায়গায় গিয়ে থাকা যায় না, অনেক সমস্যাই আছে, থাকে—
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে, মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আপনার থাকার ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন, সেটা একটা বড় ব্যাপার।
সুরমা জাহিদ: জ্বী, জ্বী এটা একটা বিরাট সাপোর্ট, এটা ছাড়া এই কাজ হতোই না, এটার জন্য মৎস্য অধিদপ্তরকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: অসাধারণ। আপা, এখন আপনি কি লেখালেখি করছেন?
সুরমা জাহিদ: এখন, আমি আসলে সারাদেশে বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করতে করতে অনেক মানুষের সাথে মিশেছি। বিশেষ করে অনেক মুক্তিযোদ্ধার সাথে আমি কথা বলেছি। যেহেতু বীরাঙ্গনা যারা বেঁচে আছেন বা ছিলেন প্রায় অনেকের সাথেই আমি কথা বলেছি, সেগুলো আমার বইয়ে স্থান পেয়েছে, এবং বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজটা একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে, এখন আমি মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কাজ করছি। তাঁদের নয়মাসের অভিজ্ঞতার মৌখিক বয়ান লিখছি। অনেকেই আমাকে অনুরোধ করেছেন তাঁদের মুক্তিযুদ্ধের কথা, তাঁরা চান আমি লিখি। তো সে কাজটাই এখন করছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আচ্ছা। দারুণ। আপনার সংসার, আপনার চারপাশের জগৎ নিয়ে যদি আমাদেরকে বলেন! একটু আগেই আপনার নাতির শব্দ পাচ্ছিলাম আমি। আপনার দিনমান কিভাবে কাটে আসলে—
সুরমা জাহিদ: (হাসির শব্দ), আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে বড়, ব্যাংকে আছে, এক্সিম ব্যাংকে, মেয়ে ছোট, সে আর্কিটেক্ট, তার হাজব্যান্ডও আর্কিটেক্ট, তাদের একটা বেবি আছে, এখন আমরা যখন চাকরি করি নাই তখনো আমাদের মা, শ্বাশুড়িরা, নানী, দাদী, ওনারা আমাদের বাচ্চা পেলেছে, বড় করায় সাপোর্ট দিয়েছে,
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আসলে, সাপোর্টের চেয়ে আমার মনে হয়, এখানে বাচ্চার প্রতি মায়ের মতোই একটা অনুভূতি কাজ করে, অন্তত নারীদের মধ্যে, এটা ওয়ার্কিং মাদারদের জন্যও দারুণ—
সুরমা জাহিদ: হ্যাঁ, আমি লেখালেখিই করি সারাদিন, আর বেবিটা আছে, ও আমার জানপাখি, ও আমার কাছে থাকে। ওরা তো বেশি দেশের বাইরে থাকে, তো সবসময়ই আমার কাছে থাকে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। আপনার নাতির নাম কি রেখেছেন?
সুরমা জাহিদ: জুওয়েরিয়া আজম।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। বাবা রফিক আজমের সাথে মিলিয়ে জুওয়েরিয়া আজম। না?
সুরমা জাহিদ: না। শুধু বাবা না, আমার মেয়ের নাম জুঁই। তাই জুওয়েরিয়া আজম। বাবা মা দু’জনের নামের সাথেই মিলিয়ে।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। আপা, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার যে আপনি পেয়েছেন এই খবর সবার আগে কার কাছে শুনলেন?
সুরমা জাহিদ: মহাপরিচালক। উনি ফোন করেছেন। আমি তো বিশ্বাসই করতে পারি নাই। আমি চিৎকার করে উঠেছি। উনি বলেন কী, আপনার চিৎকারে আমি ভয় পেয়ে গিয়েছি। (হাসি)
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: (হাসি) আচ্ছা।
সুরমা জাহিদ: তারপর আমি যখন আমার হাজব্যান্ডকে জানালাম, তখন তিনি কেমন জানি একটু অবিশ্বাস অবিশ্বাস করছেন। কোন উচ্ছ্বাস নাই। ওনি সেদিন আবার অফিসে ছিলেন, যদিও শনিবার ছিলো, আমি বলার পর বিশ্বাস করে নাই, পনেরো মিনিট পর ফোন করে বলেন, তুমি একটু টিভি দেখো তো, ইনডিপেনডেন্ট নিউজ চ্যানেল বা চ্যানেল আই দেখো তো, নাম-টাম আসছে কী না! এভাবেই বলছেন কথাটা। পরে আমি টিভি ছাড়লাম। ছেড়ে দেখি যে সত্যি সত্যি টিভির নিচে লম্বালম্বি করে পুরস্কার পাওয়া সবার নাম দেখাচ্ছে। তখন মানে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করলো সবাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এই প্রাপ্তি আপনার কাছে কেমন?
সুরমা জাহিদ: আসলে এটা বললাম না, বলে বোঝানো যাবে না। এটা আমার কাজের বড় স্বীকৃতি। আমি সারাজীবনই কাজের মধ্যে ছিলাম। কোন অনুষ্ঠানে খুব একটা যেতে পারি নাই, কোন লেখকের সাথে তেমন আড্ডা দেই নাই। আনিস স্যার আমাকে, আনিস স্যার আর আনিস ভাবী আমাকে প্রচুর উৎসাহ দিয়েছেন, অসম্ভব সাহস ও শক্তি দিয়েছেন, সবসময় আমাকে তাঁদের সন্তানের মতো মনে করে আদেশ উপদেশ সব দিয়েছেন, আমি মানার চেষ্টা করেছি, ওনাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, ওনারা এতোই বড় মানুষ, আমার কৃতজ্ঞতায় ওনাদের কিছু যায় আসে না, আমি যখন স্যারকে বললাম স্যার, আমাকে তো বাংলা একাডেমি থেকে এটা জানিয়েছে। তখন তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা অনুষ্ঠানে ছিলেন।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বঙ্গবিদ্যা সম্মেলনে ছিলেন।
সুরমা জাহিদ: জ্বী, এটাই, ওনি অভিনন্দন দিলেন, আমার পরিবারের সবাইও খুব খুশি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপনি যে অসামান্য কাজ করেছেন, ঐতিহাসিক কাজ করেছেন তাতে শুধুমাত্র বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার না, নিশ্চয়ই একুশে, স্বাধীনতা পুরস্কারও আপনি পাবেন, এই পুরস্কারটা অপরিচিত আপনার নাম যেভাবে সবার কাছে পরিচিত করলো, সেটা নিশ্চয়ই আপনার কাছে রোমাঞ্চের—
সুরমা জাহিদ: অবশ্যই, প্রতিমূহুর্তে মূহুর্তে এটা আমাকে পুলকিত করছে, প্রতি মূহুর্তে মূহুর্তে, প্রতি মূহুর্তেই আমি আমার নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছি, মনে হচ্ছে। প্রতিটি মূহুর্ত এখন আমি উপভোগ করছি, আমার বইগুলো স্পর্শ করে করে দেখছি।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: আপা, আমরা আপনার নিরোগ ও আনন্দময় দীর্ঘজীবন কামনা করি। আপনাকে আবারো অভিনন্দন। আপনি কী এমন কিছু বলতে চান, যা আমরা মিস করে গেছি?
সুরমা জাহিদ: (একটু চুপ থেকে) আমি আমার হাজব্যান্ডের কথা একটু বলতে চাই।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বী আপা অবশ্যই। আপনি যে কী দারুণ ভালোবাসেন ওনাকে বুঝতে পারছি, আমি আপনাকে ওনার কথা একবারও জিজ্ঞেস করি নাই, কিন্তু এ পর্যন্ত তিনবার উনার কথা আপনি এনেছেন। বলুন, কি বলতে চান।
সুরমা জাহিদ: তাই? (লজ্জ্বার হাসি)
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: জ্বী আপা, তাই।
সুরমা জাহিদ: আমি যেটা বলতে চাই, উনি যদি আমার পাশে না থাকতেন, আমার আজকের এ পুরস্কার, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ, কোন কিছুই সম্ভব হতো না। অসম্ভব একজন ভালোমানুষ, ভালো একটা কাজ করার জন্য আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন, অনেক, যেটা আসলে বলার মতো না। অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেও সহযোগিতা করতে পারা একটা বড় ব্যাপার।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: মানে, ওনার সহযোগিতা আপনার সাফল্যকে ত্বরান্বিত করেছে, এটা বলা যায় তো!
সুরমা জাহিদ: জ্বী, অবশ্যই। ওনাকে তো সামনে আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা যায় না, আমি প্রচণ্ডভাবে ওনার কাছে কৃতজ্ঞ।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: এখন পর্যন্ত ওনার অনুভূতি কি? ওনি কতটুকু প্রকাশ করেছেন আপনার কাছে?
সুরমা জাহিদ: উনিও অনেক আনন্দিত। এতই আনন্দিত যে, আসলে একেকজনের একেকরকম, ওনার আনন্দ বা উল্লাস আসলে বাইরে থেকে বোঝা যায় না, বহিঃপ্রকাশ কম, কিন্তু আমার এ অর্জনে, আমি পরিপূর্ণভাবে ওনার আনন্দ দেখতে পেয়েছি, মানে আমি পেয়েছি, আমার পরিবার পেয়েছে, সেটাও কম কথা বলা চুপচাপ মানুষের কাছ থেকে বিরাট একটা পাওয়া। ওনি এতটাই আনন্দিত হয়েছেন যে ওনার আনন্দ দেখে আমি ভড়কে গেছি। আজকেও সকালে বললাম, দুনিয়ার যে যাই বলুক না কেন, তুমি আনন্দিত হয়েছো, তুমি খুশি হয়েছো এটাই আমার সবচেয়ে বড় (পাওয়া)। কারণ, কাজটার দিকে উনিই আমাকে ঠেলে দিয়েছেন। ওনার উৎসাহ ছাড়া এটা হতোই না।
শিমুল সালাহ্উদ্দিন: বাহ্। অভিনন্দন। অনেক ধন্যবাদ আপা আপনাকে, আমাদেরকে সময় দেবার জন্য। আপনার এই আনন্দ আপনি ধরে রাখুন, আপনার আরো অনেক সাফল্য আমরা কামনা করছি।
সুরমা জাহিদ: জ্বী, আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনি যে খোঁজ করে আমার পর্যন্ত পৌঁছে কথা বলেছেন, সেজন্য বিশেষ ধন্যবাদ।

Flag Counter

সর্বাধিক পঠিত

প্রতিক্রিয়া (4) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাহিদ সুমন — ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৮ @ ২:৪৬ অপরাহ্ন

      খুবই জরুরি কাজ করেছো শিমুল। আমরা বেশিরভাগই ঊনপাঠক, কিন্তু ভাব ধরি, জগতের সকল কিছু জানি। সুরমা জাহিদের সারল্য স্পর্শ করল।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সৌরভ শিকদার — ফেব্রুয়ারি ৯, ২০১৮ @ ৪:২৯ অপরাহ্ন

      খুবই আন্তরিক সাক্ষাৎকার। কবিকে ধন্যবাদ জরুরি কাজটি করায়। সুরমা জাহিদেরমতো সারল্য ও নিবেদন খুবই দুর্লভ। তার প্রতি শ্রদ্ধা।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পারভেজ খান — ফেব্রুয়ারি ১২, ২০১৮ @ ১০:৫১ পূর্বাহ্ন

      সহজ সরল ও সাবলীিল। লেখা পড়ে মনে হয়নি যে, এটা কোনো সাক্ষাৎকার । মনে হয়েছে দুজন অতি সাধারন মানুষের পাশে বসে তাদের আলাপচারিতা শুনছি। ভাল লেগেছে। খুবই। অভিনন্দন সুরমা জাহিদকে। স্যালুট।

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।
 


Disclaimer & Privacy Policy  |  About us  |  Contact us

© bdnews24.com