arts.bdnews24.com » মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড

মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড

সোহেল হাসান গালিব | ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ৮:৪৬ অপরাহ্ন

সম্ভ্রান্ত হিন্দু-বংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রুপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ‘ওরিয়েন্টাল’। কিন্তু ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তারা হয়ে যায় ‘মিয়া সাহেব’। মৌলানা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুশকিল; তবু ও নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপের আর অন্ত নেই।

আমি ত টুপি-পায়জামা-শেরওয়ানি-দাড়িকে বর্জন করে চলেছি শুধু ঐ ‘মিয়া সাহেব’ বিদ্রুপের ভয়েই–তবুও নিস্তার নেই।

[নজরুল রচনাবলী, চতুর্থ খণ্ড, বাংলা একাডেমি, ২৫ মে ১৯৯৩, পৃ ২৬-২৭]

বাঙালি মুসলমানের একটা বিরাট দায় বাঙালি হবার। আরব-ভূখণ্ডের সাথে তার যে একটা সম্পর্ক আছে, এই বুঝি তা ফাঁস হয়ে পড়ে। এমন একটা শঙ্কা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় সর্বদাই। ভাব দেখলে মনে হয়, এটা যেন কেউ জানে না। ইতিহাসের কোন সন্ধিক্ষণে ইন্দো-ইরানীয় সভ্যতার আছর এসে পড়েছিল ভারতীয় জীবনে, তা নিয়ে দামোদর ধর্মানন্দ কোসম্বী যাই বলুক না কেন, বাঙালি হিন্দুর কোনো মাথাব্যথা নেই। কেননা ঐসব সংশ্রব-সংযোগ কবেই ছিন্ন হয়ে গেছে। নতুন করে তা ঘুচাবার প্রশ্ন ওঠে না।

বাংলাদেশের হিন্দু বিন্দুমাত্র উতলা নয় রাষ্ট্রসীমানার বাইরে কাশী-মথুরা-বৃন্দাবনে পাঠানো প্রেমপত্র লুকিয়ে ফেলতে। কিন্তু বাঙালি মুসলমানের কোশেশ বড়ই করুণ। তার মধ্যে গুমরে মরে স্যাটলার-সাইকোলজি বা অভিবাসী-মানসিকতা। কেননা তার ঠুঁটো আভিজাত্যবোধ তাকে দিয়ে একদিন একথা বলিয়ে নিয়েছিল, তাদের পূর্বপুরুষ এসেছে আফগান থেকে, বসরা থেকে, আরব শেখ ছিল তারা…ইত্যাদি। সে তখন ভুলে যেতে চেয়েছে, সে যে এদেশেরই কৃষকের সন্তান। এখন আমৃত্যু বাসনা তার ভূমিপুত্র হবার। আমি বলছি শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কথা। যারা ঔপনিবেশিক বিদ্যায়তনের সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে উৎপাদন-ব্যবস্থার থেকে উৎখাত হয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় মুখ থুবড়ে পড়েছে। তারপর যারা সাংস্কৃতিক বলয়ে গিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইছে নতুনভাবে। তাদের কায়দাগুলি কেমন? খেয়াল করলে দেখা যায়, এরা প্রথমেই তৎপর হয় পরিচয়ের কিছু চিহ্ন খসিয়ে ফেলতে। যেমন নাম।

ধরা যাক, কারো নাম তসলিম আহমেদ। ডাক নাম বা নিক নেম সজীব। হঠাৎ দেখা গেল সে হয়ে গেছে ‘সঞ্জীব পুরোহিত’। এই ‘পুরোহিত’ শব্দ নাজিলের হেতু কী? অনুমান করা দুরূহ নয়। কারো নাম ছিল মোহাম্মদ নোমান। রাতারাতি সে হয়ে উঠল ‘স্বকৃত নোমান’। তেমনি আলতাফ শাহনেওয়াজ একদিন হয়ে যায় ‘নির্লিপ্ত নয়ন’। এ.বি.এম সালাহউদ্দিনও কবে সহসা ‘অনিন্দ্য আকাশ’। এমন অজস্র উদাহরণ দেয়া যাবে। আমাদের দেশের অধিকাংশ লেখকেরই এই অবস্থা। এটা একটা ট্রেন্ড হিশেবে দাঁড়িয়ে গেছে।

ঠিক একইভাবে, একই কারণে এদের জবান থেকে খসে পড়ে বাপ-দাদার বুলি, সেখানে ঢুকে পড়ে ‘প্রমিত’, সূচের মতো। বেরোয় ফাল হয়ে। এ কিন্তু গ্রামকে নগর দ্বারা প্রতিস্থাপন নয়। এ হলো আমাদের লোকায়ত জীবনাচারকে অপসারণ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, আজও বাংলার অর্ধ-শিক্ষিত সেকুলার, বলা ভালো সিউডো-সেকুলার, এই মর্মে জ্ঞান দিতে চায়, কিভাবে আপনি সর্বজনীন লেখক হবেন। তাদের দাবি হলো, আপনার লেখায় কোনো ধর্মীয় অনুষঙ্গ মায় ধর্মীয় কোনো শব্দ থাকতে পারবে না। থাকলে আপনি গোষ্ঠীলেখক বা সাম্প্রদায়িক লেখক হয়ে যাবেন। ভাষাকে ধর্মীয় শব্দের ‘আছর’ থেকে মুক্ত করাই আপনার লেখকজীবনের, এমনকি জাতীয় জীবনের একমাত্র সংগ্রাম।

এদের সঙ্গে তর্ক করতে লজ্জাই লাগে। কৌতুকবোধও হয়। এরা মূলত আত্মগ্লানিদগ্ধ, ফলত বাংলাদেশের হীনম্মন্য উঠতি লেখক। খবর নিলে জানবেন, হয়তো এদের মধ্যে কেউ কেউ পাশ করেছে মাদ্রাসা থেকে। ইসলাম নিয়ে তাদের মনে আছে আন্তরিক লজ্জা ও ভীতি। আধুনিক হতে না পারার ব্যথা ও বেদনা। তাই কারো লেখায় আরবি-ফারসি শব্দ বা ধর্মীয় অনুষঙ্গ দেখলেই এরা ধার্মিকতার বাইরে আর কোনো অর্থ উৎপাদন করতে পারে না।

উনিশ শতকের শুরুতে কাঁচাপয়সাঅলা বাঙালদের বাবু হয়ে উঠবার জন্য যেমন রীতিমতো মদ-গেলা ও মাগিবাড়ি যাওয়াটা জাহির করতে হতো, এদের দশাও তেমনি। এদেরও মুখে নিষ্করুণ এক সর্বজনীনতার দোহাই ছাড়া আর কিছু নেই। আর তাদের সর্বজনীনতা মানে হলো, ধর্মীয় আলামত মুছে ফেলা। অর্থাৎ সমাজের একটা বিশেষ অংশের চিন্তা-মননকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন।

অথচ, যেকোনো সংস্কারের মধ্যে সংস্কার ভেঙে পড়ার উপাদান লুকিয়ে থাকে। গোপন সেই ইশারাগুলি কুড়িয়ে নিয়ে তাকে নতুনরূপে বিন্যাস করা, তাতে নতুন তাৎপর্য সঞ্চার করা প্রকৃত লেখকের কাজ।


আরবি-ফারসি শব্দ প্রয়োগের ব্যাপারটা যেভাবে মুসলমানির চেষ্টা বলে বিবেচিত, আমার ধারণা ভারতের অন্য জায়গায়, কিংবা হিন্দি ভাষার ক্ষেত্রেও বিষয়টাকে এভাবে দেখা হয় না। তার মানে, আমাদের বাঙালিয়ানার মধ্যে বারো আনা প্রতিক্রিয়াশীলতা ঘাপটি মেরে বসে আছে। বাঙালি সেকুলাররা প্রকৃত প্রস্তাবে সাম্প্রদায়িক।

বাংলার জনগণের সঙ্গে নাফরমানি করে আরবি-ফারসি শব্দ ছেঁটে ও ঝেঁটে বিদায়পূর্বক তারা যে একটা ভাষা পয়দা করতে ইচ্ছুক, তাকে ‘প্রমিত’ নামে ভাষার ফপর-দালালি বলা যেতে পারে। যা আমাদের জন্য ফাঁপর বিশেষ।

বাংলার সেকুলারদের সেই এক বিশেষ প্রমিতের পক্ষে মরণকামড় দিয়ে পড়ে থাকার মনস্তত্ত্ব এখানেই। শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুর ক্ষেত্রে এই প্রমিতপ্রীতির কারণ অবশ্য ভিন্ন। সে ভিন্ন কারণটাকে আমি বলছি আতঙ্ক। সেটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার।

নবাবি আমল পর্যন্ত, এই বাংলায় বহিরাগত মুসলমান যখন শাসনক্ষমতায় ছিল, আমরা দেখতে পাই, সাহিত্য-নিকুঞ্জে আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে পড়ছে মৌমাছি-গুঞ্জনের মতো। তারা কিন্তু নবারের কোনো ফরমান পেয়ে আসে নি। এসেছিল প্রজা-মনের মধুপর্ক সাজাতে। এর সাক্ষ্য দেবেন ভারতচন্দ্র। কিন্তু ব্রিটিশ পিরিয়ডে যখন হিন্দু-মুসলমান পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠল, বুঝে নিতে চাইল নিজেদের হিস্যা, তখন উভয় পক্ষ থেকেই শুরু হলো বর্জনের সংস্কৃতি। ঐ মৌমাছি যেন আর মধুপ রইল না, হয়ে উঠল একেকটা হুলদ কীট।

আরবি-ফারসি শব্দ বাঙালি হিন্দুর কাছে ধরা দিল তার ঐতিহাসিক পরাজয়ের ভগ্নস্তূপে বিজাতীয় ঔদ্ধত্যের নিশানরূপে। উনিশ শতকে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের উত্থান সে পরাজয়কে চিহ্নিত করেছিল বেশ দক্ষতার সাথে। তাই সৃষ্টি হলো এক অমোচনীয় ক্ষত তার ঔপনিবেশিক মর্মে। একই সঙ্গে ধর্মের গভীরে। পূজা-অর্চনা বা কৃত্য-সম্পাদনায় এ ভাষার প্রয়োগ যবনের গৃহে জলপানের মতো। অন্নপাপ যথা। প্রায় এমনই ফতোয়া মিলবে ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়-রচিত কলিকাতা কমলালয়-এ। ক্রমান্বয়ে এ পাপ প্রসারিত হলো সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে গ্লানির আকারে। এই গ্লানি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অতীতের কাল্পনিক বিশুদ্ধতার হাতছানি তাকে নিয়ে দাঁড় করাল বৈদিক যুগে।

পক্ষান্তরে, নতুনভাবে জেগে ওঠা সংস্কৃত-বাংলা ধর্মান্তরিত, ভাগ্যলাঞ্ছিত, শূদ্রমনা বাঙালি মুসলমানের কাছে হয়ে উঠল ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নের শব্দচাবুক। তাই ফারসি-বাংলার এত উৎপাত, প্রাদুর্ভাব আমরা লক্ষ করি তাদের সংক্ষুব্ধ জঙ্গনামায়, পুথিকাব্যে।

অস্বীকার করবার জো নেই, এসব শব্দের আতজবাজি দেখলেই পাকিস্তানবাদের দামামা বেজে ওঠে কারো কারো স্মৃতিতে। এবং তা অমূলক নয়। অবধারিতভাবেই সামনে চলে আসে ৪৭ এবং ৭১-এর পটভূমি। হিন্দুনিধন ও বিতাড়নের ইতিহাসের সাথে দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসলামকে জড়িয়ে ফেলেছে ঐ পাকিস্তানবাদই। কাজেই শব্দের আতসবাজির আড়ালে আজও মতাদর্শের বোমা হিশেবে খুব সহজেই ফুটে ওঠে কয়েকটি আইকন–হেফাজতের উত্থান, জঙ্গিবাদ ইত্যাদি। এদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের সমান্তর কোণে ঐ ভাষিক চিহ্নব্যবস্থাকে আমরা পাঠ করি অবচেতনে। প্যারানয়েড সমাজমানসের বয়ান সর্বৈব সঠিক, আমি তা বলি না। কিন্তু এটাই এখন সবচেয়ে দাপুটে ব্যাখ্যা, সুফি-সালাফি টীকা-টিপ্পনি সমেত হাজির।

এ কারণে আপনি কখনো পাবেন না জাফর গাঙ্গুলি নামের কোনো হিন্দুকে। ভাবছেন, জাফর তো বাংলা শব্দ নয়। তাহলে রবিন ঘোষ বা যিশু সেনগুপ্তের বেলায় কী বলবেন? অর্থাৎ, বাংলা শব্দের পাশে ইংরেজি-ফরাসি-পর্তুগিজ বসাতে সমস্যা নেই, ঘোরতর আপত্তি শুধু আরবি-ফারসি শব্দের বেলায়।


এবার একটু উল্টো কথা বলি। আমি আমার ছেলের নাম রেখেছি ‘ব্রত’। গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনের মেটোনিমি আকারে হয়তো তা লুকিয়ে ছিল কোথাও। খুব সচেতনভাবে তাকে যে রিকল করেছি তা নয়। কিন্তু কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিল না আমার শ্বশুরকুল। এ নামের মধ্যে কেমন একটা হিন্দুয়ানি ব্যাপার রয়ে গেছে বলে তাদের বিশ্বাস। এমনিতেই আমার ব্যাপারে আগে থেকে সন্দেহ ছিল। এবার নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া গেল। বুঝলাম, একটা আধা-হিন্দু ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিয়ে তারা খানিকটা অনুতপ্ত। সে অনুতাপ লাঘব করতে খাঁটি ‘মুসলমানি’ একখানা নাম বের করতে হলো ব্রতর জন্য। অর্থাৎ এখনো, আরবি শব্দের নামই এদেশে মুসলমানির নোক্তা।

শ্বশুরবাড়ি থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুরান ঢাকার বেচারাম দেউরীতে একদিন হঠাৎ চোখে পড়ল একটা দোকানের সাইনবোর্ড–‘মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’। পড়তে গিয়ে একটু খটকা লাগল, ‘মক্কা’ কেন? ভাবতে শুরু করলাম, সেই পবিত্র নগরীতে কী কী ধাতুর খনিজ পাওয়া যায়। ভাবনা কিছুদূর এগুতেই মায়াবী পর্দা দুলে উঠল যেন। ভেসে এল দমকা হাওয়ার মতো এই শহরের কয়েকটা পাবলিক বাসের নাম–‘জাবালে নূর’, ‘ছালছাবিল’, ‘মনজিল’। ‘হেরা’ নামের একটা গাইড বইও সম্ভবত একবার খুঁজে পেয়েছিলাম ফুটপাতে। বাড়ি ফিরে, আশ্চর্যজনকভাবে, ট্যাক্সিভাড়া দিতে গিয়ে টাকার গায়ে মসজিদের ছবি দেখে আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল।

অদ্ভুত এক প্রতীতি জন্মালো বটে : অর্থ লেনদেনে সবসময় দুটো পাল্লা পরস্পর ভারসাম্য রেখে চলে–পাপবোধ এবং পুণ্যবোধ। বুর্জোয়া রাষ্ট্রে কোনো ব্যবসাই চলে না এই দুই পাল্লা সমান না হলে। চ্যারেটির লন্ঠন না জ্বালিয়ে যেমন পেরুনো দুষ্কর লুণ্ঠনের ছায়া-পথ।

অনেক আগে, গুলশান মার্কেটের মালিক সমিতির সভাপতি, আমার বন্ধুর মামা, প্রথম যে-বার হজে যান, বলেছিলেন, ‘হজ করে এসে ব্যবসাপাতি সব গুটায়া ফালামু। জীবনে বহুত ব্যবসা করছি।’

না, কিছুই গোটান নি তিনি। উত্তরা ‘জমজম’ টাওয়ারে এবার তার মদের দোকান পাওয়া গেলে আমি অবাক হব না। বরং সেটাই স্বাভাবিক।

কিন্তু কথা হলো, এ জীবন তো ব্যবসা নয়। তার চেয়ে বড় কথা, এতক্ষণ যা বললাম সে নিছকই টঙঘরের আড্ডা। সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নাই।

টিপ্পনী:
১. দীনবন্ধু মিত্রের সধবার একাদশী নাটকে পূর্ববঙ্গের বাঙাল জমিদার রামধন রায়ও কলকাতায় পৌঁছে মদ গিলে ও ‘মাগীবারী’ গিয়ে বাবুদের পংক্তিতে উঠে আসতে পারে না। তার আক্ষেপ, ‘পুঙ্গির বাই বাঙ্গাল বাঙ্গাল কর‌্যা মস্তক গুরাই দিচে–বাঙ্গাল কউশ ক্যান– অকাদ্য কইচি তবু ক্বলকত্বার মত হবার পারচি না? ক্বলকত্বার মত না র্কচি কি? মাগীবারী গেচি, মাগুরি চিকোন দুতি পরাইচি, গোরার বারীর বিস্কাট বক্কোন করচি, বাণ্ডিল খাইচি–এতো কর‌্যাও ক্বলকত্বার মত হবার পারলাম না…।’ (সাজ্জাদ শরিফ, ‘বাংলা কবিতার ছিন্নপথ’)

২. আহমদ ছফা তার ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন।

(সোহেল হাসান গালিবের প্রকাশিতব্য গ্রন্থ বাদ-মাগরিব থেকে অপ্রকাশিত একটি প্রবন্ধ)
Flag Counter

প্রতিক্রিয়া (7) »

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিমুল সালাহ্উদ্দিন — ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ১:৫৫ পূর্বাহ্ন

      টঙ-ঘরের আড্ডার ছলে লেখা এক দারুণ প্রবন্ধ পড়লাম। সুলিখিত। হিউমারাস। খুবই শক্তপোক্ত সব যুক্তি দিয়েছেন কারো ধার না ধেরে।কিছু উচ্চারণতো খুবই সাহসী। অভিনন্দন গালিব ভাই। বইটা বগলদাবা করতেই হবে।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দিব্য রায়হান — ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ৮:৪৮ পূর্বাহ্ন

      অতিসরলীকরণদুষ্ট
      সোহেল হাসান গালিব তার মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড শিরোনামের লেখায় তথাকথিত ‘আরবিফারসি বিরোধীদের’ একহাত নিতে গিয়ে যে যে কথা বলেছেন তাতে মা, মাটি, মাতৃভাষার প্রতি যারা ভক্তি করেন তাদের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য প্রকাশ পেয়েছে। তিনি একজন বঙ্গভাষী, এ ভাষায় কাব্যচর্চা করেন, দেশজাতিদ্রোহী হিসেবে তার বদনাম নেই। কিন্তু তার বক্তব্য অতিসরলীকরণদুষ্ট।
      আমি সোহেল হাসান গালিবের মতো গম্ভীর তত্ত্বালোচনার চেষ্টা করবো না। সে যোগ্যতা আমার নেই। একজন মনেপ্রাণে বাঙালি হিসেবে কয়েকটি কথা বলবো। সোহেল লিখেছেন, ‘বাঙালি মুসলমানের একটা বিরাট দায় বাঙালি হবার। আরব-ভূখণ্ডের সাথে তার যে একটা সম্পর্ক আছে, এই বুঝি তা ফাঁস হয়ে পড়ে।’ জাকির নায়েকীয় চিন্তাপুষ্ট হেফাজত ইসলাম অধ্যুষিত (তাকে আর প্রান্তিক আগাছা বলার সুযোগ আছে কি?) বঙ্গদেশে কেউ যদি বাঙালিত্ব ধরে রাখার জন্য বিপরীতমুখী কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায় তাকে এত খারাপ লাগে কেন? এরা যে বাঙালিত্ব আর হিন্দুত্বকে প্রায় সমার্থক দাবি করছে তাদের ব্যাপারে একটি সরাসরি বাক্য ব্যয় করেননি লেখক। ‘ভূমিপুত্র হবার বাসনা’ যে একটি নিন্দ্যনীয় বিষয় তাও জানলাম, এ লেখা থেকে। ‘বাঙালি সেকুলাররা প্রকৃত প্রস্তাবে সাম্প্রদায়িক’ বাক্যটির মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামানীকরণ তো আছেই, একে কারো কাছে বাবুনগরীয়ও মনে হতে পারে।
      ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ইত্যাদির পান্ডিত্যপূর্ণ আলোচনার স্থান এটি নয়। সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞতা আমার নেই। কিন্তু মোটা দাগে বলতে পারি, ভারতীয় উপমহাদেশ তথা বঙ্গভূমির মাটিতে যেভাবে সনাতন ধর্মের বিস্তার তা তো কয়েক হাজার বছরের। আর্য অনুপ্রবেশ, পরের ব্রাহ্মণ্যবাদ, বৌদ্ধহিন্দু দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক বৈরিতার ইতিহাস মাথায় রেখেই বলছি। কোনো বাঙালি হিন্দু আজ কয়েকহাজার বছর আগের পূর্বপুরুষ কোল, ভীল, অ্যানিমিস্ট অস্ট্রালয়েডদের হারানো ধর্মাচরণের জন্য আক্ষেপ করবে এটা নিশ্চয়ই সোহেল আশা করেন না। মাটি, ভাষা পরিবেশগত কারণে বাঙালি, বিশেষ করে হিন্দুর কাছে উত্তরবঙ্গের ঘাড়ের কাছে থাকা হিমালয়ের বাসিন্দা হিন্দু পৌরাণিক দেবদেবীরা পরিচিত বা কাছের মনে হবেন সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? সনাতন ধর্মের সূত্র ধরেই হিন্দুর কাছে মথুরা,বৃন্দাবনের সঙ্গে যোগাযোগে শঙ্কাসঙ্কোচ আসে না। ভাষাও এখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। সে তুলনায় আরবভূমি বাঙালির জন্য বিদেশ। তারপরও সুদূর আরবের ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতিজাত ইসলাম বিভিন্ন কারণে (ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচারের বিপরীতে ইসলামের সাম্যের বাণী প্রধান কারণগুলোর একটি) বিভিন্ন মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ গ্রহণ করেছে। তার ইতিহাস বেশিদিনের নয়। ভারতের বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে তার সমন্বয়মূলক সংশ্লেষণ এখনও চলছে। কখনো কখনো তা সৃষ্টি করছে আত্মপরিচয়ের সঙ্কটও। যেমনটা বিশ্বের সর্বত্রই কমবেশি হয়েছে ও হচ্ছে। এখন কেউ যদি ধার্মিক মুসলিম হয়েও নিজের মাটির কাছে থাকতে নিজের নাম স্বকৃত নোমান কিংবা অমিত ইসলাম রাখতে চান তাহলে সোহেলের আপত্তি করার কী আছে? বিশেষ করে স্বকৃত তো নোমান অংশটি বাদ দেননি। লেখকের অন্য গুঢ় উদ্দেশ্য যদি না-ও থাকে, এটা এককথায় ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ।
      আরব ভূখন্ডের সঙ্গে ভারত তথা বাংলার সম্পর্ক পুরোটাই ইসলামের সাম্যের বাণী আর সুফি সাধকদের সুললিত শান্তিপূর্ণ তৎপরতার ইতিহাস নয়। এর মধ্যে আছে রক্তপাত, মন্দির ধ্বংস, ধর্মান্তরকরণ, লাঞ্ছণার প্রতিবাদে বা এড়ানোর জন্য নারীদের আত্মাহুতি, জিজিয়া কর, মালে গনিমতের ইতিহাস। বিপরীতে আছে রাজা গণেশের মতো মুসলিমবিদ্বেষী কিংবা দাড়ির ওপর কর বসানো শাসকের স্মৃতিও। কাজেই ঢালাও কিছু বলে দেওয়া সহজ কিন্তু চারদিক বিবেচনা না করে কথা বললে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হতে পারে। যে চিন্তার ধারাবাহিকতায় নিব্রাস ইসলামরা ধর্মরক্ষার নামে মানুষ জবাই করে তা থেকে ‘মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’ এর ভাবনাস্রোতটি দৃশ্যত বেশি দূরে নয়। আমি মোটেই বলছি না এটা লেখকের সচেতন চেষ্টা। বাঙালি মুসলমান যে বাংলা নাম বাদ দিয়ে সমানে দুর্বোধ্য এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে শ্রুতিসুখকরও নয় এমন আরবি নাম রাখা শুরু করেছে তা সোহেলের নজর এড়িয়ে যাওয়ার কথা নয়। তিনি নিজেই এ মানসিকতার শিকার। এ মানসিকতাই কয়েকশ বছরের ‘খোদা হাফেজ’কে ছুড়ে ফেলে ‘আল্লাহ হাফেজ’ ধরে আরবি আর ফারসির শংকর করে। তাহলে অগ্নি উপাসকের বংশধরের ‘হাফেজ’-ই রাখা কেন বাপু?। আর এ দেশের বিশেষ করে নারীদের বেশভুষায় যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তাতে সংশ্লিষ্ট নারীর নাম জানার পর তিনি যে বাঙালি এবং আফগান বা বাহরাইনী নন তা নিশ্চিত হওয়ার প্রয়োজন হলে বাক্যালাপ করাই একমাত্র উপায়। কিন্তু সোহেল কী তা প্রয়োজন হলেও সবসময় পারবেন? সবাই পরপুরুষের সঙ্গে কথা বলেন না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সোহেল হাসান গালিব — ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ১২:১৬ অপরাহ্ন

      @ দিব্য রায়হান,

      প্রথমত আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ, বিশদ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বলে। আপনার অভিযোগগুলি সম্ভবত সত্য, অন্তত আপনার বলার আন্তরিক ভঙ্গি থেকে মনে হলো। তারপরও সামান্য কিছু কথা আমার তরফে বলার আছে। সেটা পয়েন্ট আকারে বলছি।

      ১। “বঙ্গদেশে কেউ যদি বাঙালিত্ব ধরে রাখার জন্য বিপরীতমুখী কিছু প্রতিক্রিয়া দেখায় তাকে এত খারাপ লাগে কেন?”

      আপনার এই খেদোক্তির মধ্যেই কিন্তু উত্তরটা লুকিয়ে আছে। বাঙালি মুসলমানকে কেন সব সময় বাঙালিত্ব ধরে রাখার জন্য পেরেশান হতে হবে তা নিয়েই তো আমার তর্ক। বাঙালি হবার লক্ষ্যে আমরা যা করি, তা হলো আত্মবিলোপ। নিজেকেই খারিজ। আমি বলছি এটা অনাবশ্যক। এর মাধ্যমে বাঙালিত্ব অর্জন হয় না। আর ওইটুকু খারিজ না করলে বাঙালিত্ব হারায়ও না। কিন্তু করলে আত্মবিলোপের কিছু সংকট তৈরি হয়।

      ২। “এরা যে বাঙালিত্ব আর হিন্দুত্বকে প্রায় সমার্থক দাবি করছে তাদের ব্যাপারে একটি সরাসরি বাক্য ব্যয় করেননি লেখক।”

      প্রয়োজন মনে হয় নি, কারণ এগুলা যারা বলে তারা ফ্যানাটিক। আমি তর্ক করতে ইচ্ছুক, যেসব চিন্তা বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে প্রভাবসঞ্চারী সেসব নিয়ে।

      ৩। “‘ভূমিপুত্র হবার বাসনা’ যে একটি নিন্দ্যনীয় বিষয় তাও জানলাম, এ লেখা থেকে।”

      না, আমি কোথাও নিন্দা করি নি। আমি বলেছি অনাবশ্যক। কারণ এখানকার মুসলমানরা অধিকাংশই কৃষকসন্তান। তা সত্ত্বেও ভূমিপুত্র হবার বাসনা করে তার ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা অভিবাসীবোধের কারণে।

      ৪। “কোনো বাঙালি হিন্দু আজ কয়েকহাজার বছর আগের পূর্বপুরুষ কোল, ভীল, অ্যানিমিস্ট অস্ট্রালয়েডদের হারানো ধর্মাচরণের জন্য আক্ষেপ করবে এটা নিশ্চয়ই সোহেল আশা করেন না।”

      আমি এ ধরনের কিছু বলি নাই। ভারতীয় সংস্কৃতির উৎসমূলও যে ভারতের বাইরে, সে সম্পর্কে একটা শক্তিশালী মতের উল্লেখ করেছি মাত্র। ফলে বাইরে থেকে মতাদর্শ আসাটা কোনো সমস্যা নয়। ফলে, বাংলাদেশের মুসলমানের আরব-সংযোগ আর হিন্দুর ভারত-সংযোগ দুইই বহির্মুখী, রাষ্ট্রসীমানা ও ভাষাসীমানা পেরুনোর ব্যাপার। দূরত্বের হেরফের সত্ত্বেও হিন্দুর পক্ষে যেমন কাশী-গয়ার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বন্ধন অনুভব দোষের নয়, মুসলমানেরও মক্কামদিনার সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংরাগ থাকা অবান্তর নয়। যদি তাকে আমরা অবান্তর বলে মনে করি, তাহলে প্রকারান্তরে এ ঘোষণাই দেয়া হয় যে, মুসলমানিত্ব ত্যাগ না করে বাঙালি হওয়া যাবে না। মনে রাখা দরকার যে, বাঙালি উনিশ শতক থেকেই মুসলিমপ্রধান একটি ভাষাগোষ্ঠী। ঈদ জাতীয় পার্বণের শুরু দুর্গাপূজার বহু আগে। বাঙালির বর্ণাশ্রয়ী সনাতন ধর্মের যে রূপটি আমরা এখন দেখি, তার বয়স এক হাজার বছরের বেশি নয়। ইসলামের বয়সও অনুরূপ।

      ৫। “এখন কেউ যদি ধার্মিক মুসলিম হয়েও নিজের মাটির কাছে থাকতে নিজের নাম স্বকৃত নোমান কিংবা অমিত ইসলাম রাখতে চান তাহলে সোহেলের আপত্তি করার কী আছে?”

      আপত্তি নেই। আমি শুধু একটা ট্রেন্ড হিশেবে এর মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে চেয়েছি। তাদের বাপদাদারা যে চিন্তা করে নাম রেখেছিলেন, সে চিন্তা কী কারণে ও কোন পথে খারিজ হয়ে যাচ্ছে, সেটা বোঝার চেষ্টা আর কি। আপনার বক্তব্য অনুযায়ী তাহলে তাদের পিতৃপুরুষ মাটির কাছাকাছি ছিলেন না! এই হচ্ছে আয়রনি।

      ৬। “যে চিন্তার ধারাবাহিকতায় নিব্রাস ইসলামরা ধর্মরক্ষার নামে মানুষ জবাই করে তা থেকে ‘মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’ এর ভাবনাস্রোতটি দৃশ্যত বেশি দূরে নয়।”

      এতক্ষণ আপনার তর্কটা উপভোগ্যই ছিল। কিন্তু এইখানে এসে আপনি জাজমেন্টাল হয়ে উঠলেন। এবং যে রায় দিলেন তার কোনো এভিডেন্স পেলাম না। নিছকই মন্তব্য মনে হলো। বিপজ্জনকভাবে তা সো-কল্ড প্রগতিশীলের অবচেতন।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন দিব্য রায়হান — ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ৫:৫৮ অপরাহ্ন

      সোহেল হাসান গালিব আমার অভিযোগগুলোকে সম্ভবত সত্য বলেছেন। যেন খুব অবভিয়াস বিষয়গুলোতেও তিনি নিশ্চিত নন। তাও তাকে অনেক ধন্যবাদ। মোটের ওপর সংযত তার প্রতিক্রিয়া। কিন্তু আমাকে যেরকম শেষে জাজমেন্টাল হওয়ার জন্য দোষারোপ করলেন সেরকমই একটা তকমা তিনি আবার আমার গায়েও সেঁটে দিলেন- সো কল্ড প্রগতিশীল বলে। এ দেশে আদৌ কোনো সত্যি প্রগতিশীল আছে এটা কিন্তু কেউ কেউ বিশ্বাসই করেন না! যাক আমি তর্ক লম্বা করবো না। গালিবের সব কথা আমি মানি না তাও নয়। অনেক বিষয়েই একমত। শুধু পয়েন্ট ধরে কয়েকটি কথা বলবো:
      ১. গালিব যাকে আত্মবিলোপ বলছেন তার পেছনে অসহায়ত্ব কিংবা বিশুদ্ধতাবাদজনিত রক্ষণাত্মক প্রবণতা দুটোই কাজ করতে পারে সেটা তো স্পষ্ট। কোন প্রেক্ষাপটে বাঙালির একাংশ সে পথে যায় তা নিশ্চয় তার নজর এড়ায়নি। সে আলোচনার জায়গা অবশ্য এটি নয়।
      ২. বাঙালি মুসলমানের মনের ভেতর অভিবাসীবোধ যদি ‘ঘাপটি মেরেই থাকে’ তবে তার কারণটিও তো বিবেচনার বিষয়। অবচেতনের সে বিশ্বাস কী এ ভূখ-ে তার ধর্মবিশ্বাসের তুলনামূলক অবাচীনত্ব আর ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আপেক্ষিক সাযুজ্যহীনতার স্বীকৃতি না?
      ৩. গালিব দেখানোর চেষ্টা করছেন, এ ভূখণ্ডে ইসলাম ও হিন্দু ধর্মের (বর্ণাশ্রিত রূপ ইত্যাদি) সময়কাল কার্যত এক। এর চেয়ে ঢালাও কথা আর কী হতে পারে! তাহলে কি মোটা দাগে বলতে হবে বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয়ের সময় থেকেই (বা কিছু কমবেশি আগে পরে) এ অঞ্চলে ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম পাশাপাশি যাত্রা শুরু করল? বৈদিক ধর্মের সঙ্গে প্রাচীন বা মধ্যযুগের বাংলায় প্রচলিত হিন্দুধর্মের যেন আদৌ কোনো যোগসূত্র নেই! ‘ঈদজাতীয় পার্বণের শুরু দুর্গাপুজার অনেক আগে থেকেই’ বলে গালিব কী প্রমাণ করতে চাইছেন বুঝলাম না। বাঙালির দূর্গাপুজা মাত্র কয়েকশ বছরের বিষয় বটে। কিন্তু দুর্গাপূজা মানেই কি হিন্দু ধর্ম! তার আগের বৈদিক দেবদেবীর পুজা প্রসঙ্গে কী বলবেন গালিব?
      ৪. মনে হয় গালিব জোর দিয়ে ইসলাম আর হিন্দু ধর্মকে বাঙালির কাছে সমান ‘এলিয়েন’ বা ‘ফরেন’ দেখানোর প্রয়াস পাচ্ছেন। বলছেন: হিন্দু ধর্ম ভারত থেকে এসেছে। বাংলাদেশের হিন্দুকে ভারতমুখী হতে হয় ইত্যাদি। বাংলা জনপদের ইতিহাস ১৯৪৭ সালে শুরু হয়েছে ধরে নিলে কেবল তা মেনে নেওয়া যেতে পারে। সারা বিশ্বের মুসলমান ভক্তি আর অনুপ্রেরণার জন্য আরবমুখী হবে সেটা খুবই যৌক্তিক। কিন্তু দাঁতমাজার সহিহ কায়দা থেকে পায়জামার ঝুলের উচ্চতা যখন আরবের বিশেষ অঞ্চল বা তরিকা স্থির করে দেয় সেই আবহে লোকে গালিবকথিত আত্মবিলোপমূলক কাজ করায় প্ররোচিত হয়। এটা হয়তো ভুল। পলায়নী মনোবৃত্তি। কিন্তু বাস্তবতা।
      ৫. নামবদলকারীদের বাপদাদারা ঠিকই কমবেশি মাটির কাছে থেকেই সন্তানদের নামকরণ করেছিলেন। কিন্তু তারা খাঁটি বাঙালিই ছিলেন। বাঙালি বলে কুণ্ঠিত ছিলেন না। এখন বাঙালিত্বের অনেক কিছুই অনেক বাঙালি মুসলমানের কাছে পরিত্যাজ্য হয়ে উঠছে। সমস্যাটা সেখানেই।
      ৬. সবশেষে বলি,
      “যে চিন্তার ধারাবাহিকতায় নিব্রাস ইসলামরা ধর্মরক্ষার নামে মানুষ জবাই করে তা থেকে ‘মক্কা মেটাল ইন্ডাস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’ এর ভাবনাস্রোতটি দৃশ্যত বেশি দূরে নয়।”
      আমার বক্তব্যের এ অংশটি হয়তো ওভাররিঅ্যাকশন হয়ে গেছে। আমি আসলে বলতে চেয়েছি, এ ধরনের ভাবনা থেকে নিব্রাসরা নিজেদের পছন্দের উপাদান বের করে নিতে পারে। গালিবের চিন্তা তাদের সমগোত্রীয় তা মোটেও বলতে চাইনি।
      দিব্য রায়হান

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন prokash — ফেব্রুয়ারি ৮, ২০১৮ @ ৬:৪৩ অপরাহ্ন

      পুরো বইটাই পড়া দরকার। তার পর আলাচনা সমালোচনা তক্ক বিতক্ক। বইটা কোথায় পাই? মুসলমানদের বাঙ্গালী হয়ে ওঠার কঙ্করময় মত, পথ আর সাম্প্রদায়িকতা, অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে মতান্তর, ভেদ বোধ ইত্যাদি নিয়ে তুমুল চর্চা দরকার। কবি ও লেখক গালিবের এ পুস্তক পাঠজগতে বেশ দরকারী পুস্তক বলে মনে করছি।
      প্রকাশ

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মোহাম্মদ আব্দুর রাযযাক — ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ @ ২:১৪ অপরাহ্ন

      মূল লেখা এবং সেটার বিভিন্ন অংশের উপর বিভিন্ন জনের মন্তব্য থেকে মনে হোল যে ‘খাঁটি বাঙ্গালী’ আর ‘বাঙ্গালী মুসলমান’ দুই ভিন্ন প্রজাতির মানুষ। ব্যপারটা কি আসলে তাই? আমার মনে হয় এই তর্কটা মোটামুটি ভাবে অর্থহীন। ব্যক্তিভেদে রুচিভেদ তো সার্বজনীন সত্যি; সেটা মেনে নিলেই তো আর তর্কের অবকাশ থাকে না।

    • প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন Afsan Chowdhury — ফেব্রুয়ারি ২১, ২০১৮ @ ৭:৪৩ অপরাহ্ন

      Many thanks for an excellent and insightful article on the complex process of identity formation and legitimacy. Historians would say that the Bengali identity itself is a political construction of a very late formation and even territorially no Bengal ever existed unless convenient for the invaders whether extra-Bengal or extra -Indian. Its a crisis of the colonial middle class which has evolved over time and not of the peasantry who subscribe to community identity more than any other including so called “nation-identities’. Great piece. Where can i get your book. Please e=mail me an address. Thanks and congrats.

আর এস এস

আপনার প্রতিক্রিয়া জানান

 
প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন:
১. ছদ্মনামে করা প্রতিক্রিয়া এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের সূত্রে করা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না। বিষয়সংশ্লিষ্ট প্রতিক্রিয়া জানান।
২. বাংলা লেখায় ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
৩. পেস্ট করা বিজয়-এ লিখিত বাংলা প্রতিক্রিয়া ব্রাউজারের কারণে রোমান হরফে দেখা যেতে পারে। তাতে সমস্যা নেই।